বানুর সওয়াল জেনে গেল ফিরে সরাইখানায়
‘য়েমনের শাহজাদা! নিল চেয়ে হাতেম বিদায়
মুনীর শামীর কাছে, তারপর রহস্য-সন্ধানে
চলিল আল্লার নামে সে নির্ভীক দিগন্তের পানে
সম্পূর্ণ অচেনা পথে (যে পথের শুরু আছে, যার
শেষ খুঁজে পায় নাই কোন দিন যাত্রী হুঁশিয়ার,
অস্পষ্ট যে পথ-চিহ্ন হয় নাই চেনা কোনো দিন,
দূরের কাফেলা যত যে পথের আঁধারে বিলীন,
ফররুখ আহমদ হাতেম তাই-কে এভাবেই অঙ্কন করেছেন নিজ কাব্যগ্রন্থে। আধুনিক কাব্যভাষার মধ্য দিয়ে লোককথা পেয়েছে নতুন মাত্রা। ভাষার মুনশিয়ানা ও দার্শনিকতা- উভয় দিক থেকে ফররুখ পরিচয় দিয়েছেন অনন্যতার। গল্পের বিষয়বস্তু তিনি পেয়েছিলেন বাংলার লোকজ ঐতিহ্য পুঁথি থেকে। বিশেষ করে সৈয়দ হামজার লেখা ‘আদি ও আসল ছহি বড় হাতেম তাই’ সব সময় সঙ্গে নিয়ে ঘুরতেন তিনি। সৈয়দ হামজা পুঁথি সাহিত্যের প্রধান কবিদের একজন। ফকির গরিবুল্লাহর শাগরেদ। তবে তিনিও মৌলিক রচয়িতা নন। হাতেম তাই আখ্যানের ধারণা তিনি পেয়েছেন উর্দু লেখক হায়দার বখশ হায়দরির ‘আরয়েশে মহফেল’ থেকে। আর এজন্যই তার পুঁথির ওপরে লেখা তরজমায়ে আরয়েশে মহফেল। হায়দরির বই প্রকাশিত হয় ফোর্ট উইলিয়ামের উর্দু বিভাগ থেকে। তারপর ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলায়। সৈয়দ হামজার পর মুহম্মদ দানেশও পুঁথি লেখেন হাতেম তাইয়ের পটভূমিকে ভিত্তি ধরে। ফলে পুঁথির বিকাশ কেবল বাংলা সাহিত্যের স্বতন্ত্র একটা দিককে হাজির করে না; প্রমাণ করে বাংলায় উর্দু সাহিত্যের বিকাশের ভিন্ন একটা দিকও।
ফোর্ট উইলিয়ামে বাংলার পাশাপাশি হিন্দুস্তানের আরও কিছু ভাষা পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। প্রথম সারিতেই ছিল উর্দু। বাংলা ভাষার জন্য যেমন দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন উইলিয়াম কেরি, উর্দুতে সেই ভূমিকা পালন করেন জন গিলক্রিস্ট। একথা প্রমাণিত যে, বাংলা ভাষার আধুনিকায়নে ফোর্ট উইলিয়ামের ভূমিকা ব্যাপক। সমান্তরালে একথাও সত্য উর্দু ভাষার আধুনিকায়নেও ফোর্ট উইলিয়ামের ঠিক একই ভূমিকা পালন করেছে। ফলে অন্তত ঊনিশ শতকে বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি বাংলা জুড়ে উর্দু সাহিত্যেরও একটা রেনেসাঁ ঘটেছিল। যদি দাবি করা হয় বাংলার পাশাপাশি এ অঞ্চলে উর্দু ভাষাকেন্দ্রিক সমান্তরাল এক আধুনিকায়ন ঘটেছিল, তাহলে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ইতিহাসের সেই সত্যটি এখনো অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে। তার কারণে পঠিত হয় না ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও উত্তরবঙ্গের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস।
এক.
ইসলাম প্রসারের মধ্য দিয়ে বাংলা যখন বৃহত্তর মুসলিম দুনিয়ার সঙ্গে যুক্ত হলো, তাদের সঙ্গেই এ অঞ্চলে প্রবেশ করেছে আরব ও পারস্যের জীবনাচার ও সংস্কৃতি। আরব-পারসিক সংস্কৃত বাংলার পূর্বতন সংস্কৃতির সঙ্গে মিলে লাভ করেছে স্বতন্ত্র রূপ। এখানকার নগরীগুলোতে একই সঙ্গে চর্চিত হয়েছে বাংলা, ফারসি ও আরবি। সুলতানি আমলে রাজধানী ছিল সোনারগাঁও, আর এ সময় দরবারি ভাষা ছিল ফারসি। পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে বাংলা, ফারসি ও আরবির বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য। এজন্য ত্রয়োদশ শতকের সুফি শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার নামে হক গ্রন্থের পর থেকে বহু ফারসি পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়। মোগল আমলে যখন দিল্লিতে উর্দুর উত্থান ঘটে, তখন তার বার্তা বাংলায় পৌঁছতেও দেরি করেনি। ঢাকা ও মুর্শিদাবাদ নগরীর উত্থানের পর উত্তর ভারতের বিপুল মানুষ বাংলায় জায়গা করে নিতে থাকে। বাংলার শাসকরা তখন হিন্দুস্তানি ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন। স্বাভাবিকভাবেই বাড়তে থাকে উর্দুর কদর। বাংলা অঞ্চলে উর্দুর দৃশ্যমান স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১৭০৭ সালের পর। ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরই উত্তরসূরিদের গৃহযুদ্ধ বেধে যায়। শাহ আলম থেকে শুরু করে মুহাম্মদ শাহ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ধারা। দিল্লিতে তখন বিশৃঙ্খলা। ফলে সেখানকার বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিকরা ঢাকা ও মুর্শিদাবাদে আনাগোনা বাড়াতে থাকে। কেউ কেউ তো রীতিমতো স্থায়ী বসতি করে ফেলে। মুর্শিদকুলি খাঁ, শুজাউদ্দীন খান ও আলীবর্দী খানের আমলে মুর্শিদাবাদ, আজিমাবাদ, হুগলি ও ঢাকা পরিণত হয় সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্রে। ফারসির পাশাপাশি উর্দুর চর্চাও এগিয়ে যায় সামনে।
আলীবর্দী খানের আমলে মুহম্মদ ফকিহ দরদমন্দ নামে উর্দু কবির নাম জানা যায়। সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন উর্দু সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক। তার সভাকবি ছিলেন কুদরাতউল্লা কুদরাত ও ফারহাতউল্লা ফারহাত। নবাব মহলের গ্রন্থাগারে আজো রক্ষিত রয়েছে বহু মূল্যবান আরবি, ফারসি ও উর্দুর প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। এদিকে ১৭৯৯ সালে মহীশূরের শাসক টিপু সুলতান ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হলে তার পরিবারকে কলকাতায় পাঠানো হয়। টিপুর পরিবারে উর্দু ভাষায় জ্ঞানচর্চা, কাব্যসাধনা ও পৃষ্ঠপোষকতা বহুদিন অব্যাহত ছিল। এ পরিবারেই জন্ম নেন তাওফিক, সুলতান এবং রহিমের ন্যায় সাহিত্যিকগণ। বিশেষ করে তাওফিকের বাসভবনে আবদুর রহিম, তামান্না গোরখপুরী, ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দী সোহরাওয়ার্দী, আবদুল গফুর নাসসাখের মতো পণ্ডিতদের যাতায়াত ছিল।
দিল্লিতে নাদির শাহ ও আহমদ শাহ আবদালির অভিযানের কারণে সেখান থেকে কবি সাহিত্যিকদের আরও স্রোত পূর্ব দিকে সরে আসতে থাকে। এভাবে বাংলা উর্দু সংস্কৃতি ও সাহিত্যে মুখর হয়ে ওঠে। বাংলার সেই নয়া যাত্রার যুগে দিল্লি, দাক্ষিণাত্য ও লখনৌ থেকে শিল্পী ও সাহিত্যিকরা আসতে থাকে। বিশেষ করে, ১৮৫৬ সালে লখনৌয়ের শাসক ওয়াজিদ আলি শাহ পদচ্যুত হলে সেখান থেকেও আসেন আরও একটা দল। এভাবে বিপুল সংখ্যক কবি ও সাহিত্যিক পূর্বদিকে চলে আসেন। আশ্রয় গ্রহণ করেন মুর্শিদাবাদ এবং ঢাকায়।
ব্রিটিশ সরকার ফোর্ট উইলিয়াম প্রতিষ্ঠা করলে বাংলার পাশাপাশি উর্দু ভাষাতেও পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়। বাংলার মতো উর্দু গদ্যের বিকাশেও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অবদান ব্যাপক। ক্রমে উর্দু ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি ঘটতে থাকে। কলেজ থেকে মীর আম্মান, শের আলী আফসোস, হায়দর বখশ হায়দরীর নেতৃত্বে আরবি ও ফারসি গ্রন্থের সহজ-সরল উর্দু অনুবাদ বের হয়। মীর আম্মানের বাগ-ও-বাহার উর্দু গদ্য সাহিত্যের ইতিহাসে পরিচিত পুস্তক। বিশেষ জায়গা দখল করে রয়েছে শের আলি আফসোসের বাগে উর্দু এবং হায়দর বখশ হায়দরীর তারিখে নাদেরি। আসলে উর্দু গদ্য সাহিত্যের প্রথম কেন্দ্র কলকাতা। কেবল বই না; এখান থেকেই যাত্রা শুরু হয় উর্দু পত্রিকার। ১৮২২ সালের ২৭ মার্চ কলকাতা থেকে উপমহাদেশের প্রথম উর্দু সাপ্তাহিক জামে জাঁহানুমা প্রকাশিত হয়।
দুই.
কলকাতার পাশাপাশি ঢাকাতেও যাত্রা শুরু করে উর্দু সাহিত্য। তবে সেই যাত্রা দৃশ্যমান হতে শুরু করে আঠারো শতকের শেষ দিকে। ঢাকার নওয়াবের পৃষ্ঠপোষকতা ও এখানকার রাজনৈতিক স্থিতাবস্থার কারণে এখানে বহু কবির সমাগম ঘটে। ধীরে ধীরে তৈরি করে উর্দু সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্বর। এই সময়েই ঢাকায় আগমন করেন মির্জা জান তাপিশ। ঢাকায় উর্দু ভাষার ইতিহাসে তার নাম যুগান্তকারী। তিনি জন্মগ্রহণ করেন দিল্লি। ঢাকায় পা রাখেন ১৭৮৬ সালের দিকে। নবাব শামসুদ্দৌলার (১৭৭০-১৮৩১) পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে তিনি দশ-বারো বছর অতিবাহিত করেন। ব্রিটিশ সরকার নবাবকে রাজদ্রোহের অভিযোগে কারাগারে দেয়। সঙ্গে ছিলেন তাপিশও। যদিও দ্রুতই সরকার তার পাণ্ডিত্য ঠাহর করতে পেরে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে চাকরি দেয়। ফারসি ভাষায় নথি ও পাণ্ডুলিপি লেখার কাজ করতেন তিনি। কাজের বাইরে করতেন পড়াশোনা ও লেখালেখি। তার প্রথম প্রকাশিত বইয়ের নাম ‘শামসুল বয়ান ফি মুসতাহালাতি হিন্দুস্তান’; নামকরণ করা হয় ঢাকার নবাবের সম্মানে। এটি মূলত বাগধারা, প্রবাদ ও পরিভাষা বিষয়ক ফারসি গ্রন্থ। তার কবিতায় কবি মির্জা ইয়ার বেগ সায়েলের প্রভাব দেখা যায়। পরবর্তীতে তিনি খাজা মীর দর্দের শিষ্যত্ব নেন। তিনি প্রাচ্য বিদ্যা এবং ক্যালিগ্রাফিতেও দক্ষ ছিলেন। ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইনায়েতুল্লাহ বাঙ্গালীর ‘মসনবি বাহার-ই-দানিশ’ নামক ফারসি বইয়ের উর্দু পদ্যানুবাদ করেন। এনায়েতুল্লাহ বাঙ্গালির সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য যদিও নেই; তবে নাম দেখেই স্পষ্ট তিনি বাংলার মানুষ ছিলেন। যাহোক, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকেই প্রকাশিত হয় তার উর্দু কবিতা-সংকলন ‘কুল্লিয়াতে তাপিশ’।
পূর্ব বঙ্গের উর্দু ঐতিহ্যে তাপিশের পরে সবচেয়ে প্রভাবশালী নাম হাফেজ ইকরাম আহমদ যায়গম। রামপুরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাংলার প্রধান উর্দু কবিদের বড় অংশই মূলত যায়গমের শাগরেদ। তার শিষ্যদের মধ্যে ফরিদপুরের আবদুল গফুর নাসসাখ, ঢাকার মাহমুদ আযাদ ও খাজা আবদুল গাফফার আখতার, কোলকাতার ওয়াহশত এবং সিলেটের হাকিম আশরাফ আলী মাস্ত উল্লেখযোগ্য। আব্দুল গাফুর নাসসাখ ঢাকায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তার আরেক পরিচয় তিনি নওয়াব আবদুল লতিফের ভাই। পূর্ব বাংলার উর্দু কবিতার বিকাশে তিনি ভূমিকা রাখেন। ১৮৬০ সালে প্রকাশিত হয় তার কাব্যগ্রন্থ দফতরে বেমিসাল। এটি উর্দু কবিতার জন্য আদর্শ মানদণ্ড স্থাপন করে। তাকে কেউ কেউ বাংলার গালিব হিসেবে অবিহিত করেন। তবে কবিতার চেয়েও তার সবচেয়ে প্রভাবশালী কাজ ‘তাজকিরায়ে সুখনে শুয়ারা’। ফারসি ও উর্দু কবিদের জীবনী সংকলন এটি। এদিকে মাহমুদ আজাদ (১৮২৮-১৯০৭) ছিলেন নাসসাখের সমসাময়িক। তিনি তার সময়ের একজন বিশিষ্ট উর্দু কবি। তার ছোট ভাই সৈয়দ মুহম্মদ আজাদ (১৮৪৬-১৯১৭) ছিলেন উর্দু সাহিত্যের হাস্যরস নির্ভর রচনার পথিকৃৎ। তাদের লেখা প্রকাশিত হতো দিল্লি ও আগ্রার বড় বড় পত্রিকায়।
ঢাকার আগা আহমদ আলী ইস্পাহানী (১৮৩৯-১৮৭৩) প্রধানত ফারসি ভাষার সাহিত্যিক ছিলেন। তবে তিনি উর্দু ভাষাও চর্চা করতেন। মির্জা গালিবের সঙ্গে তার সাহিত্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। তিনি গালিবের কবিতার সমালোচনা করে লেখাও প্রকাশ করেছেন। গালিব তার জবাবও দিয়েছেন। মির্জা গালিব ও তার মধ্যকার সাহিত্যিক বিতর্ক ঊনিশ শতকে দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে অন্যতম প্রধান ঘটনা। তার উর্দু রচনার মধ্যে রয়েছে রিসালায়ে মুখতাসিরুল ইশতেকাক। শিষ্যদের মধ্যে প্রধান ছিলেন মুহাম্মদ আশরফ, ফিদা সিলেটী প্রমুখ। হফত আসমান নামে তিনি মসনবির ইতিহাস রচনা করেন, যা তার পাণ্ডিত্যের বহিপ্রকাশ হিসেবে এখনো টিকে রয়েছে। এছাড়া ধ্রুপদি ফারসি রচনাগুলো তিনি সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন। তিনি ঢাকা শহরের ইতিহাস নিয়েও একটি গ্রন্থও প্রণয়ন করেছিলেন।
ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দি সোহরাওয়ার্দী ঢাকা মহসিনিয়া মাদ্রাসার প্রথম সুপারিনটেন্ডেন্ট ছিলেন। আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। তিনি উর্দু গাইড ও ফারসি দুরবীন পত্রিকার সম্পাদনা করতেন। এছাড়া তিনি স্যার সৈয়দ আহমদ খানের বিখ্যাত জার্নাল তাহযিবুল আখলানে প্রবন্ধ লিখতেন নিয়মিত। তার ফারসি কবিতা শিরাজের জাদরেল কবিদের কাছেও সমাদৃত ছিল। বিভিন্ন ভাষায় তার রচনার সংখ্যা বাহান্ন। কবিতার পাশাপাশি তিনি ব্যাকরণ, পদার্থবিদ্যা, ভাষাতত্ত্ব, মনোবিদ্যা ও নারীশিক্ষা বিষয়ক গ্রন্থ লিখেছেন। তার কন্যা খুজিস্তা আখতার বানু মিলাদুন্নবী সম্পর্কে কাওকাবে দুররি নামে উর্দু গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি হেনরী উডের নীতিমূলক ইংরেজি গ্রন্থ আইনায়ে ইবরাত নামে উর্দুতে অনুবাদ করেন। তার অন্য রচনা সীরাতুন নবী ও তালিমুন নিসা। বাস্তবিক অর্থে ঢাকার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে সোহরাওয়ার্দী পরিবারের ভূমিকা ছিল ব্যাপক।
ঢাকার উর্দু ঐতিহ্য আলোচনায় মুনশি রহমান আলী তায়েশ (১৮২৩-১৯০৮) অন্যতম নাম। তিনি একাধারে উর্দু কবি, সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক। তার প্রথম রচনা গুলযারে নাত কানপুরের নিযামি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। উর্দু ভাষার কবিতার সংকলন দিওয়ানে তায়েশ। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে তিনি একজন ঐতিহাসিক হিসেবে অধিক পরিচিত। ১৯১০ সালে লেখা তাওয়ারিখে ঢাকা তার শ্রেষ্ঠ রচনা। গ্রন্থটিতে সংক্ষিপ্ত আকারে বাংলার ইতিহাস এবং উনিশ শতকে ঢাকার ভৌগোলিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিবৃত্ত লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
ঢাকার আলোচনা থাকবে, অথচ হাকিম হাবিবুর রহমানের (১৮৮০-১৯৪৭) প্রসঙ্গ আসবে না; সেটা সম্ভব না। সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তার সম্পাদিত উর্দু মাসিক সাহিত্য পত্রিকা মাশরিক ছিল পূর্ব ভারতে প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা। পরবর্তীতে তিনি ঢাকার নবাব পরিবারের খাজা মুহাম্মদ আদিলের সম্পাদনায় উর্দু পত্রিকা জাদু প্রকাশনায় যুক্ত থাকেন। পাশাপাশি তিনি ছিলেন বড় মাপের সংগ্রাহক। মুদ্রা, পাণ্ডুলিপি, দুর্লভ বই এবং দুষ্প্রাপ্য বস্তুর চমৎকার সংগ্রহ ছিল তার। তার সংগ্রহের একটি অংশ এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে স্থানান্তরিত হয়েছে। তিনি বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে—
- আল-ফারিক। এটি একটি অভিধান যা তিব্ব এবং অন্যান্য মুসলিম বিজ্ঞানের কারিগরি পরিভাষা ব্যাখ্যা হাজির করে।
- আসুদেগানে ঢাকা। ঢাকা এবং এর আশেপাশের সমাধি ও গুরুত্বপূর্ণ কবরস্থানের বর্ণনা দেয়া বইটিতে। সমাহিত বিশিষ্ট পণ্ডিত ও সুফিদের জীবনীমূলক স্কেচ তৈরি করা হয়েছে।
- ঢাকা আজ সে পাচাস বারস পেহলে বইটি বর্ণনামূলক। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের বর্ণনা।
- সক্রেটিসের জীবনী সম্পর্কিত হায়াত-ই-সুকরাত; এবং
- মাসাজিদে ঢাকা। ঢাকার মসজিদগুলির বর্ণনা। তার রচনাবলি ঢাকার ইতিহাসের আকরগ্রন্থ হিসেবে ঐতিহাসিক মহলে সমাদৃত।
আহমদ হুসাইন ওয়াফির (মৃত্যু ১৯৪০) ঢাকা মুহসিনিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। তিনি কাব্য ও নাটক উভয় মাধ্যমেই খ্যাতি অর্জন করেন। তার জনপ্রিয় নাটক বিমারে বুলবুল কয়েকবার মঞ্চস্থ হয়। এছাড়া সৈয়দ শরফুদ্দীন শরফ আল-হুসাইনী (১৮৭৬-১৯৬০) গুলিস্তান-ই-শরফ ও দাবিস্থান-ই-শরফ নামে দুখানি কাব্য রচনা করেন। এর বাইরে বেদার বখত, মওলবি আবদুল ওয়াহহাব, মওলানা মোজাফফর উদ্দীন নদভী, হাফেজ নাসের আহমদ, খাজা শিহাবুদ্দিন এবং নাসির হোসাইন খেয়াল ঢাকাকেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
পূর্ব বাংলায় বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় ঢাকার নবাব খাজা পরিবারের অবদান অনস্বীকার্য। খাজা হায়দর জান, খাজা আসাদউদ্দীন কাওকাব, খাজা আবদুর রহিম সাবা, খাজা আহসানউল্লাহ শাহীন, খাজা আতিকউল্লাহ শায়দা, খাজা মুহাম্মদ আফজাল, খাজা নাজিমউদ্দীন উনিশ ও বিশ শতকে উভয় ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেন। খাজা মুহম্মদ আযম ইসলামী পঞ্চায়েত ঢাকা নামক উর্দু পুস্তিকা রচনা করেন। নবাব খাজা আহসানউল্লাহ কুল্লিয়াত-ই-শাহীন নামে উর্দু কাব্য রচনা করেন। তার অপর গ্রন্থ তাওয়ারিখে খান্দানে কাশমিরিয়ান ইতিহাসমূলক রচনা। সঙ্গীত রচনাতেও তার মুনশিয়ানা ছিল। তিনি অনেকগুলি ঠুংরি গান রচনা করেন। তার উৎসাহ ও আর্থিক সহায়তায় আহসানউল কাসাস নামক একটি উর্দু সাপ্তাহিক ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়।
ঢাকায় বাংলা সাহিত্যে যখন শিখাগোষ্ঠীর কার্যক্রম শুরু হয়েছে; তার আগেই জাদু পত্রিকা প্রকাশিত হয় ঢাকা থেকেই। ঢাকার নওয়াব পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত এই পত্রিকায় বিভিন্ন ধরনের লেখা হাজির হতো। কখনো ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে, আবার কখনো দর্শন নিয়ে। থাকতো বিশ্বের বিভিন্ন বিষয়ের অনুবাদও। পত্রিকায় লিখতেন রেজা আলি ওয়াহশাত, শরফুদ্দিন শরফ, ফিদা আলি খান, বদরুজ্জামান বদর এবং সেই সময়ের ঢাকার বিখ্যাত চিন্তকগণ। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ রচনার কারণে উত্তর ভারতের সাহিত্যিক মহলে পরিচিতি অর্জন করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের পরে ঢাকা থেকে আরও কিছু পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হচ্ছে খাওয়ার, নাদিম, আব ও গিল এবং পাসবান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সেখানকার উর্দু ও ফারসি বিভাগের শিক্ষকরা এখানে উর্দু সাহিত্যের বিকাশে ভূমিকা রাখেন। এদের মধ্যে বিশের দশকে ফিদা আলি খান ও পঞ্চাশের দশকে আন্দালিব শাদানি অন্যতম। ফিদা আলি খান মূলত ভাষা, ব্যকরণ ও সাহিত্য সমালোচনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের বিষবৃক্ষ উর্দুতে অনুবাদ করেন। অন্যদিকে আন্দালিব শাদানি নিজে ছিলেন পুরোদস্তুর কবি। উর্দু ভাষায় রচিত তার একাধিক গ্রন্থের মধ্যে নিশাত-ই-রফতা, তাহকিক কী রওশনি মেঁ, সাচ্চি কাহানিয়াঁ, পায়াম-ই-ইকবাল এবং রুবাইয়াত-ই-বাবা তাহের প্রধান।
ঢাকায় সেই সময় বৈশ্বিক বিভিন্ন ক্লাসিকের অনুবাদ করা হয়েছে। মার্কো পলোর ভ্রমণকাহিনী, মে মিডলটন উপন্যাস, অস্কার ওয়াইল্ডের গল্পের মতো বিদেশী রচনা তখন অনূদিত হয়েছে উর্দুতে। পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছে সফরনামা। খান মুহম্মদ জাহাঙ্গীরনগরী লালবাগ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। তিনি তার হজ্বে যাওয়ার বিবরণ লিখে গেছেন। এছাড়া চীন, জাপান, রাশিয়া ও কাশ্মিরে ভ্রমণের বিষয়ে পাণ্ডুলিপি এখনো পাওয়া যায়।
মুশায়েরা উর্দু সংস্কৃতির জনপ্রিয় দিক। স্বাভাবিকভাবেই ঢাকায় আয়োজিত হত মুশায়েরা। ঢাকায় হাবিবুর রহমানের বাসভবনে প্রতিমাসে একবার মুশায়েরার বসত। ১৯৩০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মুশায়েরায় আয়োজন করা হতো। মুশায়েরায় পঠিত শের-শায়েরির মধ্য থেকে বাছাই করা শের গুলদাস্তা নামক পত্রিকায় প্রকাশ করে বিনামূল্যে বিতরণ করা হতো। হাকিম সাহেবের মুশায়েরায় কবি নজরুল ইসলামও একবার উপস্থিত ছিলেন। মুসলিম সাহিত্য সমাজ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনও মুশায়েরার আয়োজন করত। পাকিস্তান আমলে ঢাকার উর্দু কবি সৈয়দ শরফউদ্দীন শরফ আল-হুসাইনি তার বেগমবাজারে এবং কবি হাফেজ জহুরুল হক মোবারকী বকশীবাজারে মুশায়েরা বসাতেন। সে সব আসরে হাজির থাকতো রেজা আলী ওয়াশত, কাইফা চিরিয়া কোঠী, ফজলে করিম ফজল, আন্দালীব শাদানী, সলিমুল্লা ফাহমী, হায়দার দেহলভী ও ইকবাল আজীমের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিরা।
তিন.
উর্দু বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে সিলেটের অবদান সাধারণত আলোচিত হয় না। চতুর্দশ শতকে শাহ জালাল যখন শিষ্যসহ সিলেটে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন, তখনই এ জনপদের ভাগ্যে পরিবর্তন শুরু হয়। শাহ জালালের শিষ্যদের মধ্যে অনেকেই জ্ঞানতাত্ত্বিক অবদান রেখেছেন। শায়খ নূরুল হুদা আবুল কারামাত ছিলেন হযরত জালাল উদ্দীন মুজাররাদের সর্বশ্রেষ্ঠ শিষ্য। তিনি ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তুর্কিস্তান থেকে হিন্দুস্তানে এসেছিলেন। রাজা গোবিন্দ নিহত হওয়ার পর তাকে শ্রীহট্ট শহর উপঢৌকন দেয়া হয়। শায়খ নূরুল হুদার পরিবার এখানেই সমৃদ্ধি লাভ করে।
সেই নূরুল হুদার বংশধর শায়খ আলী শের বাঙালি ছিলেন শত্তরিয় তরিকার প্রধান সুফিদের একজন। তিনি নুজহাত আল-আরওয়ার ব্যাখ্যা লিখেছেন। তিনি সত্য পথের সন্ধানে সিলেট ত্যাগ করে ভ্রমণ করেন অযোধ্যা, দিল্লি এবং কিলুখারি। সেখানে তিনি নিজেকে গাউসুল আওলিয়ার সামনে হাজির করেন এবং তার শিষ্য হন। নিজ শায়খের সাথে আলী শের গুজরাট, বাহরোচ এবং আহমেদাবাদ ভ্রমণ করেন। বসবাস করতে থাকেন মালিক ইমাদ রুমির মসজিদে। এভাবে কিছু দিন কাটানোর পর শায়খ হিজাজে চলে যান। আলী শের তাই বাহরোচ ছেড়ে আহমেদাবাদে ফিরে আসেন এবং সেখান থেকে গোয়ালিয়রে যান। সেখানে তিনি শায়খের নির্দেশে শরহে নুজহাত আল-আরওয়া রচনা করেন। ৯৭০/১৫৬২ সালের কয়েক বছর পর তিনি মারা যান। আহমেদাবাদে তাকে সমাধি অবস্থিত।
সিলেটের প্রথম দিকের একজন লেখক মওলবি নাসির উদ্দীন হায়দার। শাহ জালালের জীবনী হিসেবে পরিচিত ফারসি গ্রন্থ সাহিলে ইয়ামান তার লেখা। বইটি তিনি লিখেছিলেন ১৮৫৮ সালে। পরবর্তীতে বইটি উর্দুতে অনূদিত হয় তারিখে জালালি নামে। আরেক কবি হাজি আল্লাহ বখশ হামিদের পূর্বপুরুষ ছিলেন মোগল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। সিলেটের জকিগঞ্জে তার পূর্বপুরুষ স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। তিনি উর্দু, ফারসি ও আরবি— তিন ভাষাতেই সমান পারদর্শী ছিলেন। তার সবচেয়ে পরিচিত বইয়ের নাম তোহফাতুল হাসানাইন। তার চাচাতো ভাই আশরাফ আলি মাস্ত ছিলেন একাধারে একজন মৌলভী, হাকিম, কবি, পালোয়ান, লেখক এবং জমিদার। তিনি অত্যন্ত চমৎকার উর্দু কবিতা লিখতেন। তৎকালীন ভাষারূপ ও বাগধারার ওপর তার অগাধ দখল ছিল। কুস্তির কৌশলগুলোকে কবিতার ছন্দে বর্ণনা করা ছিল মাস্তের অনন্য কৃতিত্ব। তার রিসালায়ে কুস্তি গ্রন্থটি দীর্ঘ কবিতার আকারে রচিত। ৭৫টি শ্লোকের ভেতর দিয়ে তিনি বর্ণনা করেছেন সমস্ত ব্যায়ামের নাম এবং পদ্ধতি। ফারসি ও আরবি ভাষাতেও তার বুৎপত্তি ছিল। নাসসাখ তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘তাজকিরা-ই-শুয়ারা’ গ্রন্থে মাস্তের কাব্যকর্ম উদ্ধৃত করেছেন। বিশেষ করে তাসভিরে গাম কবিতাগ্রন্থ রচনার জন্য তিনি উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে স্বতন্ত্র জায়গা পাওয়ার যোগ্য।
হাজী সাঈদ বখত কাব্যচর্চায় ছিলেন হাফেজ ইকরাম যায়গমের শিষ্য। তিনি ১৮৫৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি উর্দুর একজন দক্ষ কবি ছিলেন। ফারসি ভাষাতেও কাব্যচর্চা করতেন। তার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দুটি গ্রন্থ রয়েছে। প্রথমটি মোখলিসুল আকায়েদ এবং দ্বিতীয়টি রিসালা-ই-মাসায়েল-ই-মাউতি। তিনি কবিতার ছন্দে সাল বের করাতেও বিশেষজ্ঞ ছিলেন। মাওলানা অজির উদ্দিন মুহাম্মদ তার মৃত্যু নিয়ে শোকগাঁথা লিখেছেন। এদিকে হাজি আবদুল্লাহ আশুফতা ছিলেন ঊনিশ শতকের অন্যতম প্রধান উর্দু কবি। নাসসাখ তার সুখন-ই শুয়ারা এবং লালা শ্রী রাম তার গ্রন্থ খুমখানা-ই জাভিদে আশুফতার নাম উল্লেখ করেছেন। তার প্রশংসা বিবৃত হয়েছে হাফিজ হুশিয়ারপুরী সম্পাদিত ‘পূর্ব পাকিস্তানের উর্দু সাহিত্যিক’ ও প্রফেসর ইকবাল আজিম রচিত ‘পূর্ববঙ্গে উর্দু’ গ্রন্থ এবং ঢাকার অন্যতম কবি ও লেখক সলিমুল্লাহ ফেহমির রচনায়। এ ছাড়া ডক্টর আন্দালিব শাদানির তার প্রবন্ধে আশুফতার রূপক কাব্য গিলা-ই-দোস্তানার উল্লেখ করেছেন।
আবদুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলি বিশ শতকের গোড়ার দিকে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একই সঙ্গে আলেম, কারি ও কবি। একই সঙ্গে লিখেছেন বাংলা, আরবি ও উর্দুতে বই। তার লেখা উর্দু বইয়ের মধ্যে রয়েছে আল কওলুস সাদিদ ফিল কিরাত ওয়াত তাজভিদ এবং মুন্তাখাবুস সিয়ার। প্রথমটি কোরান পাঠের রীতিনীতি ও দ্বিতীয়টি রাসুল (সা.) এর জীবনী। এছাড়া আনোয়ারুস সালিকিন এবং নালায়ে কলন্দর নামেও বই রচনা করেছেন তিনি ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন।
এভাবে এগিয়ে যেতে থাকলে সিলেটের উর্দু বুদ্ধিজীবীদের নামের তালিকা দীর্ঘ। রয়েছে মওলবি মুহম্মদ মুসলিম, মওলবি আবদুস সাত্তার, মওলবি ফাইয়াজ উদ্দীন, হামিদ বখত হামিদ, গোলাম মহিউদ্দীন, আবদুর রাজ্জাক সিলেটী, আবদুল কাদের সিলেটী, মুহম্মদ হাসান রেজা এবং আব্বাস আলি নকশেবন্দীর মতো শতাধিক নাম। সিলেটের বানিয়াচং উপজেলার অধিবাসী মৌলবি ফরজাম আলী বেখোদ ছিলেন মির্জা জান তাপিশের শিষ্য। উর্দু সাহিত্যে তিনি যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। শামসুল ওলামা আবু নসর ওয়াহিদের বাড়িও সিলেট, বহুভাষী এই পণ্ডিত বাংলার মুসলিম শিক্ষার সংস্কারে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছেন।
এছাড়া সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে জনৈক মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল কাদির রচিত ‘আল-জাওয়ামি আল-কাদিরিয়াহ ফি মুতাকাদাত আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামাআত’ শিরোনামে একটি বই। বইয়ের শেষে লেখকের বংশলতিকা দেয়া হয়েছে। এই বংশলতিকা থেকে প্রমাণিত হয় যে, তার পূর্বপুরুষেরা দীর্ঘদিন ধরেই সিলেট অঞ্চলে জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত।
চার.
উর্দু গদ্যের দুনিয়ায় নাতেকের নাম খুবই পরিচিত। তবে অবাক করা তথ্য হচ্ছে, তিনি এক অর্থে চট্টগ্রামেরই মানুষ। ১৮৭৮ সালে লখনৌয়ে জন্মগ্রহণ করেন নাতেক; তার পুরো নাম সাইদ আহমদ। প্রাথমিক জীবনেই হায়দারাবাদ থেকে প্রকাশিত এক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে কানপুরে বসবাস শুরু করেন। সেখানেও তার থাকা হলো না। জীবনের শেষ দিকে তিনি চট্টগ্রামে চলে আসেন। ১৯৫০ সালে তিনি এখানেই মারা যান। বদর পীরের মাজারের পাশে তার কবর অবস্থিত। ইতিহাস ও সাহিত্য সমালোচনার মতো বিষয়াবলি নিয়ে সমকালীন উর্দু জার্নালগুলোয় ছিল নাতেকের সরব উপস্থিতি। এর বাইরে বুস্তানে মারেফাত ও মুসাফিরে দামেশকি তার অন্যতম প্রধান রচনা।
চট্টগ্রাম যে মধ্যযুগ থেকেই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পরিণত ছিল, তার প্রমাণ বাংলা সাহিত্যে আরাকান ও চট্টগ্রামের কবিদের অবদান। উর্দু ঐতিহ্যের জন্যও একই কথা সমানভাবে সত্য। কেবল ঐতিহাসিক অন্বেষার অভাবে সেগুলো চোখের আড়ালে রয়ে গেছে এখন পর্যন্ত। বাংলার উর্দু সংস্কৃতিতে প্রধান নারী সাহিত্যিক রাহাত আরা বেগম (১৯১০-১৯৪৯ সাল)। ছোট গল্প রচনার ক্ষেত্রে তিনি মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। বিশেষ করে প্রেমি অউর দিগার আফসানে, বাঁসুরি কি আওয়াজ, দিলনাওয়াজ, শাব কি পুকার এবং ইনকিলাব রচনা তাকে অন্যান্য সাহিত্যিক থেকে আলাদা করে রেখেছে। তার লেখা প্রকাশিত হয় তাহজিবে নিসওয়ান, সোহাইল এবং ইসমাতের মতো সাহিত্য পত্রিকায়। তিনি চট্টগ্রামের মানুষ। তার বাবা কামাল উদ্দীন ছিলেন শামসুল উলেমা উপাধি প্রাপ্ত এবং কোলকাতা আলিয়ার সুপারিনটেনডেন্ট। নওয়াব আবদুল লতিফ ছিলেন তার নানা। জীবন কোলকাতায় শুরু করলেও রাহাত আরা বেগমকে চলে আসতে হয় চট্টগ্রামে। তার সন্তান জামাল নজরুল ইসলাম পরবর্তীতে পদার্থবিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন।
এভাবে এগিয়ে যেতে থাকলে চট্টগ্রামের যে বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমের ইতিহাস সামনে হাজির হয়; তা ঢাকা ও সিলেটের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। মওলবি মুহম্মদ ওয়াজিহুল্লাহ খান ইসলামাবাদী ঊনিশ শতকের শেষ দিকে শেখ সাদীর গুলিস্তান উর্দুতে অনুবাদ করেন। ফউজুল কবির খান, মুনির আহমদ ইসলামাবাদী, মওলবি আবদুর রশিদ সিদ্দিকী এবং আবদুল বারি চট্টগ্রামের উর্দু ঐতিহ্যে অবদান রেখেছেন। মওলবি মুহম্মদ আসগর হোসাইন সিদ্দীকি সুফিবাদের ওপর লিখেন বহুল সমাদৃত গ্রন্থ মিসবাহুস সালিকীন। অন্যদিকে মুহম্মদ ইসমাইল আল কাদেরি লিখেছেন তাজকিরাতুল মাওলা। তালিকায় আরও অজস্র নাম যোগ করা যায়, যোগ করা যায় অজস্র বইয়ের নামও।
১৯৪৭ সালের পর উর্দুভাষীদের বড় একটা অংশ চট্টগ্রামে আশ্রয় নেন। চাকরি কিংবা নানা কারণে এখানে বসবাস করতে শুরু করেন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা মানুষও। তারা নিজ নিজ রচনায় চট্টগ্রামকে তুলে আনেন। তামান্না ইমাদি ও ইকবাল আজিম দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে বসবাস করেছেন। তাদের রচনাবলিতে ফুটে উঠেছে চট্টগ্রামের জনজীবন।
পাঁচ.
ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামের বাইরে পূর্ব বাংলার যে বিস্তৃত অঞ্চল, তার মধ্যে থেকেও কবি সাহিত্যিক দেখা গেছে। ফরিদপুরের নাসসাখ, নোয়াখালীর মওলানা উবায়দুল হক, কুমিল্লার খলিলুর রহমান, সিরাজগঞ্জের আবু নাজিম মুহম্মদ কাজেম উদ্দীন এবং রংপুরের আবুল ফজল ফাইয়াজ তাদের মধ্যে প্রধান। নাসসাখ সমকালে অপ্রতিদ্বন্দ্বী কবি। তাকে নিয়ে উর্দু ভাষায় একাধিক গবেষণা হয়েছে। উবায়দুল হক তাসাউফ নিয়ে বেশ কিছু লেখা প্রকাশ করেছেন। আবু নাজিম মুহম্মদ কাজেম উদ্দীন শিশুতোষ রচনায় মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছেন।
পূর্ব বঙ্গে উর্দুর প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গেলে বৃহত্তর ময়মনসিংহ; বিশেষ করে কিশোরগঞ্জকে উল্লেখ করতেই হয়। বৌলাইয়ের সাহেব বাড়ি থেকে আবদুল হাই আখতার এবং খালেদ বাঙালি উর্দু ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় স্থাপন করেন। বিশেষ করে খালেদ বাঙালিকে বলা যেতে পারে পূর্ব বাংলার প্রধান উর্দু কবি। খালেদ বাঙালি তথা মাহবুবুর রব সিদ্দীকির জন্ম ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১২ ফাল্গুন। খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারে ১৮৯১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। তিনি এখানকার আবহাওয়া, জনজীবনকে নিজের কবিতার বিষয়বস্তু আকারে হাজির করেছেন। বাংলার বর্ষা নামে তার একটা দীর্ঘ কবিতার কয়েক লাইন অনুবাদ করলে দাঁড়ায়—
যৌবন ফিরেছে বাগে, পূর্ণ তাই কানায় কানায়
কুড়ি ও ফুলেরা যেন স্নান করে হয়েছে নির্মল,
বজ্রের চমক চলে, চারদিকে মেঘ ছেয়ে যায়
নারীর চুলের মতো দোল খায় তটিনীর জল।
মাত্র ৫৪ বছরের জীবনে খালেদ বাঙালির লেখা প্রবন্ধের সংখ্যা ২৪, কবিতা ৪০ এবং গজল ১৫০ টির বেশি। তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতো নাক্কাদ, আলমগীর, আদিব, জবান এবং জাদীদ উর্দু পত্রিকায়। তারপরও খালেদের সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক সফলতার একটি হলো ‘আখতার’ পত্রিকা। বৌলাই থেকে তিনি সাহিত্য সাময়িকীটি প্রকাশ করেন। গবেষকদের বড় অংশের দাবি, আখতার প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালে। তবে ২০২১ সালে আগ্রা থেকে প্রকাশিত নাক্কাদ পত্রিকায় তাকে আখতার পত্রিকার এডিটর হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে। সময় যেটাই হোক, সেই সময়ে কিশোরগঞ্জের মতো একটা অখ্যাত অঞ্চল থেকে উর্দু সাহিত্য পত্রিকা বের করা সাধারণ কোনো কথা ছিল না। আখতারের সম্পাদকীয়তেই খালেদ বাঙালি স্বীকার করেছেন পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক অতীতের সঙ্গে উর্দু ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। সে সময়ের বাংলা, ইংরেজি ও উর্দুর অধিকাংশ পত্রিকা ছিল কোলকাতা কেন্দ্রিক। তিনি একটা ভিন্ন নজির তৈরি করতে চেয়েছিলেন; সেক্ষেত্রে দারুণভাবে সফলই বলা চলে। আখতার পত্রিকায় যারা লিখেছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম নিয়াজ ফতেহপুরী, দিলগীর আকবরাবাদী, ওয়াকিফ বিহারী, মায়েল এলাহাবাদী এবং বিসমিল বেরিলভি। তারা প্রত্যেকেই উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে স্বমহিমায় উজ্জ্বল।
কিশোরগঞ্জের আজিমুদ্দিন হানাফির নামও এইখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি ছিলেন বিখ্যাত সংস্কারক কেরামত আলি জৈনপুরীর শাগরেদ। আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় তার জ্ঞান ছিল অগাধ। ফরায়েজি আন্দোলনের ফলে বন্ধ হয়ে যাওয়া মসজিদ ও জুমার জামাত পুনরায় চালু করার জন্য তিনি কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এ সময় বিভিন্ন স্থানে তার সঙ্গে আলেমদের বাহাস হয়। আজিমুদ্দিন মোট ৪৫টি পুঁথি রচনা করেন। ইসলামের বিজয়, ধর্মীয় সমস্যা, নারী অধিকার, রোমান্টিক কাহিনী, দুঃখ, ভালবাসা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কর্মফল দর্শন ইত্যাদি বিষয় তার লেখায় স্থান পেয়েছে। পুঁথিগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি আরবি ও উর্দু ভাষায় রচিত। আরবি ইতিহাসবিদ আল ওয়াকিদী (৭৪৭-৮২২) রচিত ফতহুশাম তিনি উর্দু থেকে বাংলায় তর্জমা করেন। তার কিছু লেখা রিসালায়ে আজিমুদ্দিন হানাফি শিরোনামে প্রকাশিত হয়।
উর্দুকে কেবল মুসলমানি ভাষা হিসেবে হাজির করার প্রবণতা রয়েছে বিভিন্ন মহলে। অথচ উর্দু ভাষায় পূর্ব বাংলার হিন্দুদের অবদান নেহায়েত কম না। শরীয়তপুরে ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন শান্তিরঞ্জন ভট্টাচার্য। তিনি ছিলেন একাধারে উর্দু ভাষার পণ্ডিত, গবেষক ও সাহিত্যিক। মূলত উর্দু থেকে বাংলা ও বাংলা থেকে উর্দুতে অনুবাদে তিনি ব্যাপক অবদান রাখেন। ১৯৬৬ সালে তিনি বাঙালি হিন্দুয়োঁ কী উর্দু খিদমত বইয়ের জন্য রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন। এই বইটিতে উর্দু ভাষায় অবদান রাখা অন্তত ৭৯ জন সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীর কথা বলা হয়েছে। তারা সবাই বাঙালি হিন্দু। তার মানে বাংলায় উর্দু ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার ক্ষেত্রে হিন্দুরাও পিছিয়ে ছিল না।
ছয়.
পূর্ববঙ্গের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের বিস্মৃত অধ্যায় উর্দু ভাষা ও সাহিত্যের সমৃদ্ধ উপস্থিতি। এই ইতিহাস বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের আখ্যান। ঢাকা, মুর্শিদাবাদ ও কোলকাতার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অনুবাদ-আন্দোলনে উনিশ শতকে বাংলা ও উর্দু ভাষাকেন্দ্রিক সমান্তরাল আধুনিকায়ন সংঘটিত হয়।
ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রাম পূর্ববঙ্গের উর্দু বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের প্রধান স্তম্ভ। এ ছাড়া ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, নোয়াখালী, কুমিল্লা, রংপুরসহ বিস্তৃত অঞ্চলে উর্দু ভাষায় সৃজনশীলতা ও পাণ্ডিত্য বিকশিত হয়েছিল। এটা এ ভাষার পরিসরের ব্যাপকতা প্রমাণ করে। অন্যদিকে এ ঐতিহ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বহুত্ববাদী চরিত্র। উর্দু কেবল মুসলমান সমাজের ভাষা ছিল না; বাঙালি হিন্দু পণ্ডিতরাও অনুবাদ, গবেষণা ও রচনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। বাংলা, ফারসি ও আরবির পাশাপাশি উর্দু ছিল পূর্ববঙ্গের শিক্ষিত সমাজের আরেকটি বৌদ্ধিক মাধ্যম। অনুবাদ, তাজকিরা, সফরনামা, কাব্যসংকলন, অভিধান, সাময়িকী মিলিয়ে এটি ছিল এক পরিপূর্ণ সাহিত্য-সংস্কৃতি জগৎ।
দুঃখজনকভাবে জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচর্চার সংকীর্ণ পরিসরে এই সমান্তরাল ঐতিহ্য অনেকাংশেই আড়ালে থেকে গেছে। ফলে ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামের উর্দুভিত্তিক বৌদ্ধিক ইতিহাস যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। অথচ এই ধারার পুনর্মূল্যায়ন আমাদের সামনে হাজির করে পূর্ববঙ্গের এক বহুভাষিক, বহুসাংস্কৃতিক ও আন্তঃআঞ্চলিক পরিচয়। বাংলার আধুনিকতার ইতিহাস কেবল বাংলা ভাষার একরৈখিক বিকাশ নয়। বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতি ও বহু ধারার সংলাপে গড়ে ওঠা এক জটিল ও সমৃদ্ধ প্রক্রিয়া।
তথ্যসূত্র
- আজিম, ইকবাল। মাশরেকি বেঙ্গল মেঁ উর্দু। ঢাকা: মাশরিক কো-অপারেটিভ পাবলিকেশন, ১৯৫৪।
- ভট্টাচার্য, শান্তিরঞ্জন। বেঙ্গল মেঁ উর্দু সাহাফাত কি তারিখ। কলকাতা: মাগরেবি বেঙ্গল উর্দু একাডেমি, ২০০৩।
- খান, হালিম দাদ, সম্পাদক। বৌলাই বাড়ির ৪০০ বছর। ঢাকা: কালান্তর প্রকাশনী, ২০১৯।
- রাশিদি, ওয়াফা। বেঙ্গল মেঁ উর্দু। দিল্লি: উর্দু পাবলিশিং হাউস, ১৯৫৫।
- ইউসুফ, মনিরউদ্দীন। আমার জীবন, আমার অভিজ্ঞতা। ঢাকা: কালান্তর প্রকাশনী, ১৯৯২।
- কলিমুল্লাহ। “মাশরেকি বেঙ্গল কা এক কাদিম উর্দু জাদিদ।” মাহে নও। করাচি।
- আখতার। উর্দু সাময়িকী। ময়মনসিংহ।
- জাদু। উর্দু সাময়িকী। ঢাকা।
- নাক্কাদ। উর্দু সাময়িকী। আগ্রা।
- সাকি। উর্দু সাময়িকী। দিল্লি।