আবুল ফকির জীবনের প্রথম যৌনসম্ভোগ লাভ করে নবম শ্রেণিতে থাকতে তারই একজন প্রতিবেশী সহপাঠিনীর সঙ্গে পারস্পারিক সম্মতির ভিত্তিতে, এটা আবুল ফকিরের ভাষ্য। আবুল ফকির কথা বেশি বলে এবং সকল বিষয়েই তার কিছুটা মাতুব্বরি ফলানো চাই এমন একটি ভাব নিয়ে সর্বদা বিরাজ করে। সময়ে-অসময়ে নিজেকে জাহির করাতে আবুল ফকিরের অতি-উৎসাহী ও আগবাড়ানো স্বভাবের কথা সকলের জানা আছে। ফলে বন্ধুরা তার এইসব উদ্ভট কাহিনি শুনে মজা পেয়ে থাকলেও, আরে অই ফাপর মারতাছে বলে সমস্ত ব্যাপারটিকে হাস্যকর বলে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। কারণ আবুল ফকির সুযোগ পেলেই তার বিচিত্র যৌনজীবনের কথা বন্ধুদেরকে রসিয়ে রসিয়ে বলে যে বিশেষ আনন্দ পেয়ে থাকে তা তার চকচক করতে থাকা চোখের দৃষ্টি দেখেই আন্দাজ করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হওয়ার পর তারই ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট একটি মেয়ে ও আবুল ফকিরকে ঘিরে যৌন কেলেঙ্কারিমূলক কিছু কথা পুরো ক্যাম্পাসে চাউর হয়ে গিয়েছিল কেননা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশেপাশের এলাকায় সেই মেয়েটি এবং আবুল ফকিরকে অনেকে প্রায়ই গল্পগুজবরত অবস্থায় ঘোরাফেরা করতে দেখেছে। মেয়েটির সৌন্দর্য ও আবুল ফকিরের কিছু মার্কামারা স্বভাবের জন্য ঘটনাটি সকলের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছিল অল্প সময়ের মধ্যে। বন্ধুরা প্রথমে চাউরটিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেনি। বন্ধুমহলে যৎপরিমাণ জনপ্রিয়তা থাকলেও বন্ধু হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা অতটা গুরুত্ববহ ছিল না কেবল আবুল ফকিরের অস্বস্তিদায়ক স্বভাবের ফলে। তবে ধীরে ধীরে যখন পুরো ঘটনাটি রটতে রটতে সিনিয়র-জুনিয়র নানান জনের বিবরণে বিভিন্ন মাত্রা লাভ করে ডিপার্টমেন্টের কতিপয় শিক্ষক-শিক্ষিকা অব্দি পৌঁছাল আবুল ফকিরের বন্ধুরা ভীষণ বিরক্ত ও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। তারা পুরো ব্যাপারটিকে নিতান্ত একটি গুজব বলে নানান জনের কাছে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে যেন সকলে মেনে নেয় ঘটনাটি নিছক বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যদিও পুরো সময়টিতে আবুল ফকিরকে বিকারহীন থাকতে দেখা যায় এবং মেয়েটিও আশ্চর্য রকমভাবে প্রতিবাদহীন নীরবতা পালন করে। আবুল ফকিরকে তার বন্ধুরা প্রথম দিন থেকে উত্তরবঙ্গের একটি অজগাঁ থেকে উঠে আসা সরল ও নির্বোধ লোক হিসেবেই গ্রহণ করেছিল। তবু পুরো রটনাটিকে নিছক গুজব বলে বাতিল করে দিতে চাওয়ার মধ্যে যতটুকু বন্ধুত্ববোধ ছিল, তার থেকে বেশি মুখ্য ছিল নিজেদের সম্মান ও মুখ রক্ষার বিষয়টি।
পুরো ঘটনাটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত ও বিরক্ত ছিল মোহাম্মদ আজম নামের বন্ধুটি। ঘটনাক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিনেই আবুল ফকিরের সঙ্গে আজমের পরিচয় হয়েছিল। পরবর্তীতে আজমের মাধ্যমেই অপর বন্ধুদের সঙ্গে আবুল ফকিরের যোগাযোগ ঘটেছিল এবং আজমের আনুকূল্যে বন্ধুমহলে সে একটি স্থান লাভ করেছিল। আবুল ফকির যে আজমের রুমমেট একথাও কারও অজানা ছিল না। ফলে বন্ধুমহলের অসন্তোষের তাপটুকু আজমকে সহ্য করে নিতে হয়েছিল মুখ বুজে। যেদিন বন্ধুমহলে আজমের মানুষ নির্বাচন সম্পর্কিত কাণ্ডজ্ঞান নিয়ে আরেকদফা সমালোচনা হয় সেদিন থেকে আবুল ফকিরকে তার কাছে একটি উপদ্রব বলে মনে হতে থাকে। আবুল ফকিরকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে। নানান ছলছুতায় বাসা পরিবর্তন করে পালপাড়ায় তুলনামূলক ছোট একটি এক কামরার বাসায় নূরে আলমের সঙ্গে উঠে আসে। সঙ্গ ত্যাগ করে আবুল ফকির থেকে সম্পূর্ণ মনোযোগও সরিয়ে নেয় আজম। সময়ের সাথে সাথে আবুল ফকিরের ঘটনাটি ক্যাম্পাসের চুটকি গল্পের অন্তর্ভুক্ত হয়ে সকলের কাছে স্বাভাবিকতায় নিঃকদর্য হয়ে ওঠে। ক্যাম্পাসের বহু ঘটন ও অঘটনের স্রোতে আবুল ফকির বন্ধুমহলের আরোপিত অজগাঁ-র সরল ও নির্বোধ লোকটি পরিচয় ঝেড়ে ফেলে স্বপরিচয়ে একটি নতুন স্থান লাভ করে ও বন্ধুমহল ত্যাগ করে স্বগোত্রীয় অন্য একটি মহলের একজন হয়ে ওঠে।
আবুল ফকিরের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ হওয়াতে অনির্বচনীয় স্বস্তি ও মুক্তি লাভ করে মোহাম্মদ আজম। একই সাথে আবুল ফকির গোত্রীয় মানুষ সম্পর্কে সে একটি গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি লাভ করে। নির্বোধ ও হীন মানসিকতা সম্পন্ন মানুষ নিজের চারপাশের সকল কিছুকে হেয় প্রতিপন্ন করতে করতে এক সময় অবশিষ্ট হিসেবে আর কিছু না পেয়ে নিজেকেও হেয় করতে দুবার ভাবে না, এবং এই কাজটি করে সে এক প্রকার জ্ঞানহীন ও বাহাদুরি ফলানো-মার্কা আনন্দ অনুভব করে বলেই মোহাম্মদ আজমের বিশ্বাস পোক্ত হয়। পরবর্তীতে আবুল ফকির সম্পর্কিত আর কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত রাখে নিজেকে। বন্ধুদের আড্ডায় কথা প্রসঙ্গে কখনো বিষয়টি উঠে এলে পুরো ব্যাপারটিকে সে, জীবনকে যে যেভাবে নেয় তার কাছে তেমনই এরকম কিছু নিরাসক্ত দার্শনিক উক্তি দিয়ে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করে। এই সময়টিতে সে মানুষ সম্পর্কে আরো বেশি দূরদর্শী ও সচেতন হয়ে উঠার আন্তরিক চেষ্টায় নূরে আলমের সঙ্গে নিরাপদ দূরত্বের একটি বাসোপযোগী বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলে। এখন অব্দি নূরে আলমের চরিত্র ও অভ্যাসে অস্বস্তিদায়ক ও অপকারী তেমন কোনো বৈশিষ্ট্যের খোঁজ না পেলেও নিরাপদ দূরত্বটি বজায় রাখতে সে সর্বদা সচেষ্ট থাকে। আজমের এমন আচরণ কিঞ্চিত উদ্ভট মনে হলেও সম্পূর্ণ ব্যাপারটিকে নূরে আলম পারিপার্শ্বিকতা ও মানুষের বিচিত্র ও ব্যাখ্যাতীত নানা স্বভাব বহিঃপ্রকাশের অংশ হিসেবে ধরে নিয়ে আপনমনে বাস করতে থাকে।
নূরে আলম প্রধানত বিনয়ী, মুখচোরা ও ঘরকুনো স্বভাবের হলেও তার চরিত্রে স্বতন্ত্র এক প্রকার দুরন্তপনা পরিলক্ষিত হয়। কেবল কাছের মানুষেরা তার স্বভাবের এই দিকটির কথা জানে। প্রয়োজন অতি তীব্র না হলে নূরে আলমকে কখনো ঘর থেকে বের হতে দেখা যায় না। আজ অব্দি আজম ব্যতীত নূরে আলমকে অন্য কোনো লোকের সঙ্গে কথা বলতে দেখেনি মোহাম্মদ আজম। নূরে আলমের এমন প্রকট বন্ধুহীনতা আজমকে সন্দিহান ও কৌতূহলী করে তোলে। সঙ্গী হিসেবে নূরে আলম কতটুকু নিরাপদ যাচাই করতে কিছু আর্থিক লেনদেন করে সততার পরিচয় পায় আজম। তবু বারকয়েক হাজার দুয়েক টাকা ইচ্ছে করে আলগোছে অরক্ষিত ফেলে রেখে নূরে আলমের চারিত্রিক দৃঢ়তার পরীক্ষা নেয় সে। নূরে আলমের সততার প্রশ্নে সহজ হতে পারলেও বন্ধুহীনতার ব্যাপারটি নিয়ে প্রায়ই ভাবিত হয় সে। নূরে আলম স্বল্পভাষী। ফলে তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে আজমের মধ্যে এক প্রকার প্রাকৃতিক দ্বিধা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাছাড়া নূরে আলমের রুচি সম্পর্কেও এখনো সে পরিষ্কার কোনো ধারনা লাভ করতে পরেনি। এজজ্য হঠাৎ কথা বলার প্রয়োজন হলে আজম বিষয়-সংকটে ভোগে। তবে একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শেষ করে বাসায় ফিরে বন্ধ দরজার সামনে প্রায় সমবয়সী অপরিচিত একজন লোককে দেখে তার মনে কিছু প্রশ্নের উদয় হয়। লোকটি নিজেকে ফয়সাল নামে পরিচয় দিয়ে নূরে আলমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে দাবি করে। ভরদুপুরের এই ঘটনাটি আজমকে দারুণভাবে অবাক করে এবং নূরে আলম সম্পর্কিত তার কৌতূহলকে তাড়িয়ে সজাগ করে তোলে। পৃথিবীতে নূর আলমের কোনো বন্ধু আছে শুধু এই ব্যাপারটি আবিষ্কার করে আজম আনন্দিত হয়ে ওঠে। ফয়সালের সঙ্গে কথা বলার পর আজমের সকল প্রকার সন্দেহের চূড়ান্ত নিরসন ঘটে। এরপর থেকে নূরে আলমকে সে সম্মানের চোখে দেখা শুরু করে এবং তার বন্ধুত্ব লাভে আজম আন্তরিক হয়ে ওঠে। ফয়সালের ভাষ্যে, সে-ও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও নূরে আলমের জেলার মানুষ। নূরে আলম ও ফয়সাল বাল্যবন্ধু। ফয়সালের আর্থিক দুরবস্থা থাকায় নূরে আলম প্রতি মাসে এক হাজার টাকা করে তাকে দিয়ে থাকে। নূরে আলমের আন্তরিক সাহায্যে সে এখন অব্দি পড়াশোনা জারি রাখতে পেরেছে ফয়সালের মুখ থেকে এমন অনেক ভালো ভালো কথা শোনার পর আজম আরো উৎসাহী হয়ে ওঠে ও ফয়সালকে খুঁটিনাটি প্রশ্ন করে নূরে আলম সম্পর্কে তার সকল জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে চেষ্টা করে।
সময়ের বহমানতায় মোহাম্মদ আজমের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সমাপণের সময় ঘনিয়ে আসে। দীর্ঘ এ সময়কালে আজম আবুল ফকিরকে যে প্রায় ভুলে গিয়েছিল এটা সে বুঝতে পারে একদিন বাহির থেকে ঘরে ফিরে আবুল ফকিরকে নূরে আলমের সঙ্গে আলাপরত অবস্থায় তার বিছানায় বসে থাকতে দেখে। আবুল ফকিরের আচমকা উপস্থিতি ও তার সঙ্গে নূরে আলমের স্বাভাবিক আলাপচারিতার দৃশ্যটি আজমকে কিছুক্ষণের জন্য হতবাক করে দেয়। অপ্রত্যাশিত এই পরিস্থিতিটি মোকাবেলায় মোহাম্মদ আজম যে মোটেও প্রস্তুত নয় এটা বুঝতে পারা যায় তার ভাষাহীন নিশ্চলতায়। আজমকে ঘরে ঢুকতে গিয়ে দরজায় থমকে দাঁড়াতে দেখে আবুল ফকির বিছানা থেকে উঠে গিয়ে তার চিরাচরিত ভঙ্গিতে উচ্চকণ্ঠে বলে উঠে, আরে বন্ধু কেমন আছো? তুমি তো আমারে ভুলেই গেছো। আমি কিন্তু ঠিকই তোমার খবর রাখি। অনেক্ষণ ধরে বসে আছি। কই গেছিলা? এতগুলো কথা একসঙ্গে বলে আজমকে প্রতিউত্তর দেয়ার সুযোগ না দিয়ে যখন আবুল ফকির তাকে জড়িয়ে ধরে আজমের তখন তড়িতে স্পৃষ্ট না হয়েও তড়িতাহতের মতো অনুভূত হতে থাকে। আজমের ঘাড়ের পিছন থেকে মুখটা সরিয়ে এনে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আবুল ফকির পুনরায় বলে ওঠে, অনেকদিন হয় তোমার সাথে দেখা হয় না। আজ অনেকদিন পর ভার্সিটিতে আসলাম তো। ভাবলাম তোমার একবার খোঁজ নিয়ে যাই। ক্যাম্পাসে রফিকুলের সাথে দেখা হইছিল। ওর কাছ থেকেই তোমার বাসার খোঁজ পাইলাম। মোহাম্মদ আজম উত্তরে বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পায় না। দীর্ঘকাল পর হঠাৎ নিজে যেচে এসে খোঁজখবর নিতে আসায় আবুল ফকিরের এমন স্বতঃস্ফূর্ত আন্তরিকতার দরুণ আজমের কিঞ্চিত অপরাধবোধ হতে থাকে। মনে মনে আজম নিজেকে অমানবিক বলে মৃদু ভর্ৎসনা করে ও লজ্জিত হয়। ফলে উত্তরে বলার মতো সে আর কোনো কথাই খুঁজে পায় না। আজমের নিরবতায় আবুল ফকিরের কণ্ঠ কিছুটা ক্ষীন হয়ে আসে। সে ধরে নেয় আজম বোধ হয় আবুল ফকিরের প্রতি পূর্ব রাগ এখনো ভুলতে পারেনি। মৃদু কণ্ঠে সে আজমকে কথাটা বলে, বন্ধু তুমি মনে হয় এখনো আমার উপরে রাগ কইরা আছো। আবুল ফকিরের এমন অনুতাপী বাক্যে আজমের নিরবতা ভাঙে। মুচকি হেসে সে বারবার মাথা নাড়িয়ে না-না বলে আবুল ফকিরকে আশ্বস্ত করে। নূরে আলমের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেয়। বিছানায় তার পাশে বসে অনেক কথায় হাল-হকিকত জেনে নেয়। আবুল ফকিরের প্রথম বলা কথাগুলো নিয়ে খটকা প্রকাশ করে বলে, অনেকদিন পর ক্যাম্পাসে আসলা কথাটার মানে কী? এতদিন তাহলে কোথায় ছিলা? আবুল ফকির তখন হাসতে হাসতে আরো কিছু কেলেঙ্কারি ও রাজনৈতিক ঝামেলায় ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হওয়ার কাহিনী শোনায়। পড়াশোনায়ও যে সে অনেকটা পিছিয়ে গিয়েছে এই কথাটা আজমকে ভেঙে না বললেও সে বুঝতে পারে। আজমের আরও খারাপ লাগে এই ভেবে যে যতই হোক আবুল ফকির তার ক্যাম্পাসে পরিচিত প্রথম বন্ধু, তার সম্পর্কে এতদিন এতটা বেখবর থাকা উচিত হয়নি। আবুল ফকির চলে যাওয়ার পর নূরে আলমও এই কথাটি বলেছিল তাকে। কথা প্রসঙ্গে আজম তখন নূরে আলমকে আবুল ফকির সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে জানতে চায় ওরা দুজন পূর্ব পরিচিত কি-না। নূরে আলম তার স্বভাবজাত মুচকি হেসে ঈষৎ মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলে, ক্যাম্পাসে কিছু প্রয়োজনে বেশ কয়েকবার ওর সাথে যোগাযোগ হইছিল। আবুল ফকিরের মতো মানুষের সঙ্গে নূরে আলমের কী প্রকার প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে এটা ভেবে সে ভেতরে ভেতরে তাজ্জব বনে যায়। অনধিকার চর্চার আশঙ্কায় এ ব্যাপারে বেশি কিছু জিজ্ঞেস করা থেকে নিজেকে সংবরণ করে আজম। তবে আবুল ফকিরকে মানুষ হিসেবে নূরে আলমের কেমন মনে হয়েছে এ কথাটি জিজ্ঞেস করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারে না। নূরে আলম শুধু একটি বাক্যে বলে যে, মানুষ হিসেবে তো ও-কে বেশ আন্তরিকই মনে হলো। আবুল ফকির চলে যাওয়ার আগে কিছুটা খেদ নিয়েই বলে যে, পড়াশোনা মনে হয় আমারে দিয়া আর হবে না বন্ধু। ভাবতেছি ব্যবসা করব। ব্যবসায় কিছু না হইলে বিদেশ চলে যাব। দোয়া কইরো। আবুল ফকিরকে বিদায় দিয়ে বিষণ্ন মনে আজম ঘরে ফিরে নিজেকে বিছানায় ছুঁড়ে দেয়। বুক খোলা শার্ট গায়ে শুয়ে ঘুরতে থাকা সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ঘূর্ণাবর্তে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার কথা মনে হতে থাকে তার। মানুষ সম্পর্কিত বিচিত্র ধারণা তার ভাবনাকে আচ্ছন্ন করে তোলে। মানুষের চরিত্রের বিচিত্র দিক ও স্বভাবের বৈপরীত্যের কথা ভেবে মনে মনে আজম অবাক ও বিহ্বল হয়ে ওঠে।
নূরে আলমের সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার পর আজম আর কাউকেই বন্ধু হিসেবে তেমনভাবে গ্রহণ করেনি। জীবনের বহুবিধ ব্যস্ততা ও মানুষ সম্পর্কে তার সতর্ক হয়ে ওঠাও বন্ধু না পাওয়ার একটি কারণ। তবে নিয়মিত আনাগোনার ফলে ফয়সালের সঙ্গে তার একটি আন্তরিকতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফয়সাল এলেই নূরে আলম যেন কিছুটা মুখর হয়ে উঠে এই বিষয়টি আজমের দৃষ্টি এড়ায় না। ফয়সালের উপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে আলোচনায় আজম নূরে আলমের সঙ্গে মানুষ, পৃথিবী, রাজনীতি-সহ বিভিন্ন বিষয়ের অবতারণা করার চেষ্টা করে। রাজনীতি বিষয়ে ফয়সাল আগ্রহী হলেও নূরে আলম দৃঢ় নিরাসক্তি প্রদর্শন করে। মানুষ ও পৃথিবী সম্পর্কে নূরে আলমকে মধমপন্থি বলে মনে মনে সাব্যস্ত করে নেয় আজম। তবে নূরে আলমের প্রতি মোহাম্মদ আজমের শ্রদ্ধার মনোভাব অনাক্রান্ত-ই থাকে।
জীবন অনেকদূর এগিয়ে এসেছে সময়ের স্বাভাবিক নিয়ম মেনে। জীবনের জটিলতার সঙ্গে বুঝে উঠে এখনো স্থির হতে পারেনি আজম। মানুষ ও পৃথিবী সম্পর্কে তার বিবেচনা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয়েছে ব্যাপক। অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরে উঠেছে বিবিধ গল্প, ঘটনা ও মানবিক সম্পর্কে। তবু যেন অবসরে আনমনে বসে থাকলে স্মৃতি থেকে হঠাৎ কোনো পরিচিত-অর্ধপরিচিত বন্ধু উঠে এসে টেনে নিয়ে যায় অতীতের এক কামরার ছোট কোনো ঘরে। বন্ধুমহলের সকলের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়েছে অনেক আগেই। রফিকুলের সঙ্গে বছর তিনেক আগে একবার দেখা হয়েছিল। বিয়ে থা করে পুরোদস্তুর সংসারী। হাই স্কুলের শিক্ষকতা ও ছাত্র পড়িয়ে দিন চলে যাচ্ছে তার। আবুল ফকিরের কোনো সন্ধান নেই। তবে নূরে আলমকে মনে পড়ে প্রায়ই। গত হয়ে যাওয়া জীবনের কথা ভেবে মন আর্দ্র হয়ে ওঠে। জীবনের চলিঞ্চু স্রোতে নিজেকে নিদারুণ একাকী মনে হতে থাকে মোহাম্মদ আজমের।