দক্ষিণের খোলা জানলাটা বেশ কয়েকবার বাতাসে দুমদুম করে পরস্পরে বাড়ি খেল। মিলনের মা আলুথালু হয়ে শুয়ে ছিল সাপের শুকনো খোলসের মতো একগাদা দলা পাকানো কাঁথা বুকে, পায়ে, গলায়, পায়ের গোড়ালিতে প্যাঁচিয়ে। অন্ধকার, আঁধারের জন্য দক্ষিণের জানলাটা ভালো মতো দেখা যায় না এমনই রাতে শুয়ে শুয়ে মিলনের মা মনের ব্যাথায় কাঁদে ঘুমের ঘোরে। তার খাটের নিচে আটমাসের শিশু মিলনের লাশ পড়ে আছে পাথরের মতো। হঠাৎ মিলন গুমরে গুমরে হাত পা আছড়ে কেঁদে ওঠে। মিলনের মা শেফালি ধড়ফড় করে জেগে উঠল।
হারিকেনের আলোটা বাড়িয়ে দিয়ে সে বসে বসে ফোঁপায়। মিলন কি মরে গেছে! ‘রহিমা! ও রহিমা! আমার মিলন কোনাই?’ শেফালি চ্যাঁচিয়ে ওঠে। ঝড়ের বেগে খাট থেকে নেমে সে চৌকির তলে উঁকি মারে। খাটের তলে কেউ নাই। ফাঁকা। সে বুঝতে পারে, দুঃস্বপ্ন তাকে ঘুমের ভেতর তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। এখনই তো দুঃস্বপ্ন দেখার সময়। কলেরা আর জ্বরের ঘোরে যখন তার মিলন বিছানায় কাতরাচ্ছে… শেফালি আর্তনাদ করে ওঠে। তার পেশী ও দুধভর্তি বুক চিমসে টান খায়।
ঘরে মিলনকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানি গান গাইতে গাইতে হাঁটছে শেফালির বোন রহিমা। কাঁথার ভেতর থেকে বেড়ার ফাঁক দিয়ে গলে আসা বিকালের মূমূর্ষ রেখার মতো রশ্মি মেলে তাকে দেখছে শিশু মিলন। টমেটোর মতো ফোলা ফোলা হাত সে একটু করে মেলে প্রজাপতি হতে গিয়ে হঠাৎ কেঁদে ওঠে। মিলনের অধর, ওষ্ঠ জোড়া-তালে কাঁপতে থাকে। রহিমার চোখে ঘুম। কিন্তু ঘুম চাপিয়ে তার ভেতর কলেরার ভয়। গ্রামের পর গ্রাম সাফ হয়ে যাচ্ছে মানুষ মরে। মিলনের পর মরবে শেফালি, তারপর সে। মিলনের বাপ কলেরায় মরবে না। সে মরবে পুলিশের গুলি খেয়ে। এ ব্যাপারে রহিমা নিশ্চিত।
রহিমার কোলে মিলনকে দেখে শেফালি শান্ত হয়। তাকে পাশ কাটিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো শেফালি রান্নার ঘরে যায়। ঘরে খাওয়ার কিছু নাই। কিন্তু তার বুকে তো খাবার আছে। মিলনের খাবার। মিলন খায় না। শেফালি তার ভরাট স্তন মিলনের সামনে হাঁ করে রাখলে সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। শেফালি থালা নামিয়ে নিজের স্তন পিষে পিষে বের করতে থাকে তরল দুধ। বেড়ার ফাঁক দিয়ে লক্ষ করে রহিমা দেখছে কি না। রহিমাকে দেখতে দেওয়া যাবে না। নিজের দুধ খেয়ে শেফালি তরতাজা হবে, এটা রহিমা মোটেও পছন্দ করে না। শেফালি দ্রুত থালাটা মুখের সামনে তুলে তার দুধ গিলতে থাকে। মিলনের বাপ পুলিশ থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। ঘরে খরচাপাতি কিছু দেয় না। মাঝে মাঝে মিলনকে দেখতে আসে তার বাপ। কিন্তু বেশিক্ষণ থাকে না।
শেফালি ঘরে ফিরলে রহিমা বলে, ‘মিলনরে কোলে ল বোইন, ঘুমামু।’ তারপর হঠাৎই তার গলা অস্বাভাবিক রূঢ় হয়ে যায়। শেফালির মুখে দুধ লেগে আছে। এটা সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। রহিমা গোশশায় রাগারাগি করতে থাকে, ‘আবার তুই ওর মুখের খাওন কাইড়া নিলি! আবারও! আবারও…’ শেফালি কিছু বলে না। সে মিলনকে কোলে নেয়। ব্লাউজের বোতাম খুলে মিলনকে দুধ খাইতে দেয়। মিলন স্তনের আঠালো ঘেমো গন্ধে মুখ ফিরিয়ে নেয়। মিলন প্রথমে গুমরে গুমরে কাঁদে। তারপর রাক্ষসের মতো গর্জে কাঁদতে থাকে। শেফালির ইচ্ছে হয় গলা টিপে ধরে সারা জীবনের জন্য কান্না বন্ধ করিয়ে দেয়!
রহিমা ঘুমাতে চলে গেছে। শেফালি মিলনকে কোলে নিয়ে একটা পাটিতে বসে আছে। মিলনের কান্না এখন ধীর হয়ে এসেছে। শেফালির এক ফোঁটা অশ্রু মিলনের গালে টপকে পড়ে। তারপর আরেক ফোঁটা, তারপর আরেক ফোঁটা। কলেরার জন্য শেফালির ভয় হয় না। শেফালির ভয় সেই আলগা ছায়াটার জন্য। যেটা মাঝে মাঝেই একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। আর নিজে নিজে নড়ে। যেই ছায়া মিলনের বাপ অনেক রাতে হাওড় থেকে মাছ ধরে ফেরার সময় নিজের সাথে অজান্তে নিয়ে এসেছিল। সেহরির নলার সাথে ছায়াটা শেফালির ভেতর ঢুকে যায়। মিলন তখন পেটে ছিল। শেফালির শুরু হয়ে যায় পেটের বেদনা। আঁতুড়ি মোচড়ায়। মিলন অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে। কখনো গভীর রাতে খিলখিল করে হেসে ওঠে পেটের ভেতর। শেফালির ঘুম ভেঙে যেতো সেই সব হাসির শব্দে। আতঙ্কে পেট ধরে সে বসে পড়তো দীঘল যন্ত্রণা আর নিশ্বাস শরীরে প্যাঁচিয়ে প্যাঁচিয়ে। সেইসব দিনের কথা মনে করে শেফালি আজ আরও অস্থির হয়ে আছে। তার কেন জানি মনে হয় কালো ছায়াটা তার মিলনকে সুযোগ পেলেই নিয়ে যাবে।
শেফালি মিলনকে কোলে নিয়ে দরজা খুলে বের হয়। তার চোখ দুটি টকটকে লাল হয়ে আছে। বড় বড় নিশ্বাসে তার গলার ভেতর থেকে ঘ্যাসঘাস শব্দ বের হয়ে আসে। বাড়ির পেছনে পুকুরের অপর পাড় থেকে বেপারি বাড়ির বিশাল সীমানা শুরু। দুর্ভিক্ষের কালে না খেতে পেরে তাদের যে শিশুরা মারা যেত। যে শিশুরা মায়ের পেটে থাকতেই মরত, অথবা নিজেও মরত, মাকেও মারত। তাদের এই সীমানায় পোঁতা হতো। মিলনকেও কি এখানে গর্ত করে ছুঁড়ে দিয়ে বড় বড় মাটির চাক ফেলে গাঁড়া হবে? তার মিলনও কি সেইসব বাচ্চাদের মতো প্রতিরাতে ঘুরে বেড়াবে ছায়া হয়ে। মাটির তল থেকে কাঁচা গলায় কান্না করতে থাকবে। মানুষ মাটিতে কান পাতলে সেই কান্না শুনতে পাবে। তার মিলনও বুঝি ছায়া হয়ে মানুষের বাচ্চাদের মারতে থাকবে। নিজেদের সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
ঘরের পেছনে এসে শেফালি গাছের গোড়ায় বসে। বেপারি বাড়ির সীমানায় গাছতলায় একটা একেলা চেরাগ জ্বলছে। চেরাগের আলোয় কেউ একজন কবর খুঁড়ছে। লোকটাকে ভালো মতো দেখা যায় না। কে সে! কার জন্য গর্ত খুঁড়ছে সে। কোথায় কে মারা গেছে। শেফালি ধীর পায়ে এগুতে থাকে। লোকটাকে নানাভাবে দেখার চেষ্টা করে। মিলনকে কঠিনভাবে বুকে চেপে রাখে। বুকের ভেতর ঘুমন্ত মিলন সেঁদে যায় ক্রমে। শেফালির আঁশটে গন্ধে মাঝে মাঝে মিলন জেগে উঠে এদিক ওদিক তাকিয়ে আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে।
লোকটা মিলনেরই বাপ। শেফালি অনেকদিন পর মিলনের বাপকে দেখে তব্দা মেরে যায়। তার বলতে ইচ্ছে করে আমাদের খাওন দে। আইজ আর হলাইতে পাইত্তি ন। আইজ মোগো খাওন দিয়াই যাবি! কিন্তু শেফালি সেসব আর বলে না। তার গলায় সকল অভিযোগ আটকে যায়। ‘মিলনের বাপ! তুঁই এহানে কার লাইগা গর্ত কইরতাছো?’ মিলনের বাপ ক্রুর হেসে ওঠে। হাসতেই থাকে। ‘ক্যান, মিলনের লাইগা! তোরা বেডিরা কি কবর খুঁড়তে পারস?’ শেফালি উদ্ধত ফনা তুলে তাকে খুব জোর দিয়ে একটা চড় কষে। মিলনের বাপ প্রতিউত্তরে আরও জোরে কবর বানাতে থাকে। সে গর্তে নেমে পাড় সমান করে ছাঁচতে থাকে। হাতে চেরাগ নিয়ে মাপ নিখুঁত করে। শেফালি তার মিলনকে নিয়ে ছুটতে ছুটতে ঘরে ফিরে আসে। ঘরের দরজা ভালো মতো আটকে সে মিলনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে।
মিলনের বাপ ক্লান্ত হয়। সে হাঁক দেয়, ‘ও শেফালি! পানি দিয়া যা। বড্ড তিষ্ট লাইগ্যে। ওই মাগির ঝি মাগি! কতা হুনস না?’ ঝিরিঝিরি করে শনপাতা দুলছে। মিলনের বাপ দেখলো, কয়েকটা কাক তার মাথার ওপরের ডালে এসে বসলো। না ওগুলো তো কাক না। শকুন। মিলনের বাপের রাগ ওঠে। সে উঠে মাটির একটা ঢেলা নেয়। ক্ষিপ্র হাতে সেটা ছুঁড়ে মারে সেই শকুন কয়েকটির দিকে। মাটি ঢেলাটি টুপ করে পুকুরের পানিতে পড়ে। শকুনগুলো কয়েকটা উড়াল দিয়ে আবার তার মাথার ওপরের ডালে এসে বসে। মিলনের বাপকে ছিঁড়ে খুঁড়ে খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে তারা। মিলন মাটিতে দোজানু হয়ে বসে আছে। মাটির আদ্রতায় তার পাছার লুঙ্গি ভিজে ত্যানা হয়ে গেছে। মিলনের বাপ আচমকা কেঁপে ওঠে, তাদের উঠোনে একটা পুলিশের জিপ এসে দাঁড়াল। ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়িতে বিপ্লবীদের বোমা হামলার পর থেকে এই জিপটা তার পেছনে টিকটিকির মতো লেগে আছে। উনিশজন আসামির তালিকায় তার নাম পাঁচ নম্বরে।
জিপের আওয়াজ শুনে রহিমার ঘুম ভেঙে যায়। সে বিছানা ছেড়ে এসে বোন শেফালির কাছে গুটিসুটি মেরে বসে যায়। তারা দুজন বেড়ার ফাঁক দিয়ে জিপটির গতিবিধি লক্ষ করে। ভয়ে তাদের শিরা শুকিয়ে আসে। শেফালির সারা মুখ ফ্যাকাশে হয়। রক্ত সরে গিয়ে চেহারা নিরেট সাদা ঘাস হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। এমনি সময় মিলন খিলখিল করে হেসে ওঠে। শেফালি খুব জোরে মিলনের মুখ চেপে ধরে। হাসি থেমে যায়। মিলনের দুটি চোখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। শেফালি খাটে এসে বসে। তার পায়ের তলার মাটি সরে গেছে। মিলনকে সে কোল ছাড়িয়ে বিছানায় শোয়ায়। খাটে শুয়ে নিজে নিজে খেলা করে মিলন। ‘ভাইজান তো নাই, পুলিশ আইলো কিল্লাই বুবু?’ বলে রহিমা। শেফালির চোখ বড় বড় হয়ে যায়। ‘ওইহানে, ওইহানে তোর দুলাভাই মিলনের লাইগা কবর খুঁড়তাছে, হলবানের নিজের মওতের ডর নাই।’ বলে থুব করে মাটিতে সে বসে পড়ে। ডুলির বেড়ার ওপর নিজের স্থূল শরীরটাকে আছড়ে ছুঁড়ে মারে।
দুলাভাই আসল শুনে রহিমা খুশিতে নেচে উঠল। ঘরভোলা পাখির মতো সে আছড়ে পড়ে দরজা খুলে। দোরগোড়ার সমুখ থেকে দাঁড়িয়ে সে বেপারি বাড়ির সীমানার দিকে ছুটতে থাকে। হঠাৎ তার সংবিৎ ফিরে, আর সে দেখতে পায় তাদের সমস্ত বাড়ি ঘিরে রেখেছে উর্দি পরা পুলিশেরা। বেপারি বাড়ির সীমানা থেকে একটা ছায়া বেরিয়ে খুব জোরে পালাতে থাকে খেতের আইল ধরে। রহিমা দ্বিধায় পড়ে যায়, ওটা কি মিলনের বাপ? কয়েকটা পুলিশ এসে রহিমাকে জাপটে ধরে ফেলল।
ওসি সাহেব শেফালির ঘরে ঢুকলো। শেফালি অসহায় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ওসি সাহেব পিঠে হাত দিয়ে হাঁটছেন। তার সাথে দুজন কনস্টেবল। তারা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে দরজার দুপাশে। আর কয়েকজন ঘর তল্লাশিতে লেগে পড়েছে। ওসি লোকটা ধূরন্ধর ইংরেজ। মাথায় একগাছা ধবল সাদা চুল। স্লিম শরীর। চোখের ভেতর সরু একটা ভয়ঙ্কর চাহনি। কোমরের হোলেস্টরে ভারি হ্যান্ডগান। এক খিলি পান খেতে চাইলে শেফালি উঠে পান সাজিয়ে দিল। ওসি সাহেব নাক কুঁচকে কিছু একটার গন্ধ নেয়। আর নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বিড়বিড় করে বলে ওঠেন, ‘এ ঘরে কিছুক্ষণ আগে একটা মার্ডার হয়েছে।’ খাটে এসে বসে ধুরন্ধর লোকটা। টিস্যু দিয়ে ঘামালো নাক মুছে সে। তার পাশে খাটের উপর পড়ে আছে একটা লাশ। মিলনের লাশ। ওসি সাহেব অট্টহাসি করে মিলনের নার্ভ চেক করেন। নার্ভ ঠান্ডা বরফ। মিলনের গলায় পাঁচ আঙ্গুলের দাগ।বাইরে দুজন পুলিশের শক্ত বন্ধনে দাঁড়িয়ে থাকা রহিমা পলায়মান মিলনের বাপের দিকে তাকিয়ে অভিসম্পাত করে যাচ্ছে। মিলনের বাপের পেছন পেছন কয়েকজন পুলিশ দৌড়ছে। রহিমা ডুকরে ওঠে, ‘আমারে লইয়া যা মিলনের বাপ! আমগো দুইজনের এককান ম্যালা সুন্দর সংসার অউক। ও মিলনের বাপ।’ রহিমা পুলিশ দুজনের বন্ধনীতে তড়পাতে থাকে। মিলনের বাপকে নিজের করে পাওয়ার জন্য সেও তার সাথে ঘর পালাতে চায়। মিলনকে গলা টিপে মারতে রহিমার হাত বিন্দুমাত্র কাঁপেনি। কারণ সে মিলনকে ঘৃণা করে। মিলনকে দেখামাত্রই তার গা জ্বলে। সবকিছুর প্ল্যান সুন্দর মতো সাজিয়েছিল মিলনের বাপের সাথে যুক্তি করে। আচমকা পুলিশ আসাতে সব ভেস্তে গেল। রহিমাকে হ্যান্ডকাপ পরানো হলো। ধস্তাধস্তি করে তাকে জিপের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শেফালি চোখ মুছতে মুছতে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে তার প্রস্থান দেখে যায় নির্লিপ্তভাবে। পুলিশদের বন্ধনে রহিমা হাতপা আছড়াতে থাকে। চুলভরতি মাথা ঝাঁকিয়ে কাঁদতে থাকে। মিলনের বাপের নাম ধরে সে উজাড় করে ডাকাডাকি করে। ওসি সাহেব মিলনের লাশ সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে কোলে নিয়ে পোস্টমর্টেমের জন্য বেরিয়ে যায় ঘর থেকে!