‘ডরিস?’ ডাক্তার তাকে ডাকলেন।
‘জি?’
‘ডরিস, তুমি কোথায় আছ, বলতে পার?’
‘জি, পারব,’ ডরিস জবাব দিল। ‘আমি হাসপাতালে আছি।’
‘এইতো। কী হয়েছিল, তোমার মনে আছে?’
ডরিস ভ্রু কুঁচকাল সামান্য। ‘সব না, না… আমার মনে হয় কোথাও বিস্ফোরণ ঘটেছিল।’
‘হ্যাঁ, তুমি মনে করতে পারছ তাহলে। তুমি খুব ভাগ্যবান, ডরিস। তোমার বাবার পুরো রান্নাঘর বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু অলৌকিকভাবে তুমি সামান্য পুড়ে বেঁচে গেছো।’
‘আমারও তাই মনে হয়,’ ডরিস হাসল খানিক।
‘তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ?’
‘আপনি কি আমার ডাক্তার?’ ডরিস অনুমান করল।
‘হ্যাঁ, আমি ডাক্তার মিশেল।’
ডরিস বিনয়ের সাথে বলল, ‘আপনাকে দেখে ভালো লাগছে, ডাক্তার।’
‘আসলে… আমাদের এর আগেও কয়েকবার দেখা হয়েছে। তুমি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চিকিৎসা নিচ্ছো। তোমার স্মৃতিগুলো এখন খানিকটা এলোমেলো।’
‘ওহ, আচ্ছা’ ডরিস বলল। ‘এটা কি খারাপ কিছু?’
‘তুমি শারীরিকভাবে ভালো আছো, ডরিস। চিন্তার কিছু নেই। শুধু একটু বিভ্রান্ত তুমি। মানসিক আঘাত পেয়েছিলে। আচ্ছা, বিস্ফোরণের পর থেকে কিছু মনে আছে তোমার?’
‘আ… না। মানে পুরোপুরি না… সাইরেনের শব্দ মনে পড়ছে, কারা যেন আমাকে ওপরে তুলছিলো। আ… আমার মনে হয়, গার্নিতে তুলছিল। আর তারপর সব ঝাপসা হয়ে যায়।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। ধীরে ধীরে মনে পড়বে। বিস্ফোরণের ঠিক আগে কী হয়েছিল তা মনে করতে পারবে?’
‘হুম,’ ডরিস বলল। ‘বাবার কাছে ছিলাম সেটা মনে আছে। অনেকদিন পর্যন্ত তার কাছে যাওয়া হয়নি। তো, বাবাকে একবার দেখে আসার জন্য গিয়েছিলাম। বিস্তারিত মনে পড়ছে না, তবে আমার মনে আছে বাবা চেয়েছিলেন আমি গিয়ে তার জন্য রান্না করি। ও, আমি একজন পেশাদার শেফ।’
‘একজন শেফ!’ ডাক্তার গম্ভীরভাবে বললেন।
‘হ্যাঁ, শেফ-ই। আমি সবসময়ই রান্নায় পটু ছিলাম। একদম ছোটবেলা থেকেই।’
‘আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি। তারপর বলো।’
‘নিজের জন্য কখনো মনমতো কাউকে পাইনি আমি,’ ডরিস বলতে থাকে, ‘যদিও এই আধুনিক যুগে কোনো নারীর পরিপূর্ণতা পুরুষের ওপর নির্ভর করে না, যাইহোক। আমাকে নিজের পথ নিজেরই খুঁজে নিতে হয়েছিল। আর রান্নাই একমাত্র কাজ, যেটাতে আমি দক্ষ ছিলাম।’
‘আচ্ছা, এটা বলতে পারবে—তুমি কবে থেকে রান্না করতে শুরু করেছিলে?’
ডরিস সামান্য ভাবল। ‘আমার মনে হয় সবকিছু শুরু হয়েছিল আমার মা মারা যাওয়ার সময় থেকেই। মা চলে যাওয়ার পর থেকে বাবা জোরাজোরি করতেন, রান্নাটা যেন আমি করি। তিনি বলতেন যে, তিনি সংসারের জন্য উপার্জন করছেন তাই আমাকেও সংসারের কিছু ভার নিতে হবে।’
‘তখন তোমার বয়স কত ছিল?’
‘এগারো।’
‘এগারো?’ ডাক্তার বললেন। ‘এত ছোট বয়সে?’
ডরিস কাঁধ ঝাঁকাল। ‘বয়স এগারো হোক আর পঁয়ত্রিশ—জীবন তো সবসময় একই রকম। তখন ছোট ছিলাম, কিছু কিছু জিনিস কঠিন লাগত। কিন্তু অভিজ্ঞতায় কমতি ছিলো না।’
‘বাবার জন্য তোমাকে কখন কখন রান্না করতে হতো?’
‘প্রায় প্রতি সন্ধ্যায়ই। সপ্তাহান্তে, তিনি দুপুরের খাবারও চাইতেন। মাঝে মাঝে সকালের নাস্তাও, কিন্তু সেটা কম।’
‘এই রান্নাবান্নার দায়িত্ব কি তোমার অপছন্দের ছিল?’
ডরিস ডাক্তারের দিকে ফিরে তাকাল। ‘হাস্যকর। আপনি জিজ্ঞেসও করছেন? আমি কখনোই এরকম কিছু করতে চাইনি। এগুলো আমার কাজ হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য করাটা আমার কখনোই ভালো লাগেনি। ঘৃণা হতো খুব।’
‘এরপর তুমি কী করলে?’ ডাক্তার প্রশ্ন করলেন।
‘আঠারোয় পা দিতেই বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে যাই। নিজের পথ নিজেই তৈরি করে নিতে বাইরের পৃথিবীতে পা দিয়েছিলাম। তা প্রায় ২০ বছর আগের কথা। পরিহাসের বিষয় হলো, যে কাজ থেকে আমি পালিয়ে যেতে চেয়েছি, দেখা গেল সেটাই আমার একমাত্র দক্ষতা। শেষমেশ আমি একজন শেফই হয়েছি।’
‘ব্যাপারটা তোমার জন্য কেমন ছিল?’
‘প্রথম দিকে, ভালো ছিল না,’ ডরিসের সরল স্বীকারওক্তি। ‘আমি কাজ করতাম জঘন্য একটা জায়গায়; সেখানে কেউ পেশাদারিত্ব বা পরিবেশনের তোয়াক্কা করত না। তাদের শুধু দ্রুত খাবারের পর নিজের পৃথিবীতে ফিরবার তাড়া থাকত। আমার ঘৃণা হতো। কিন্তু কাজ চালিয়ে গেলাম।’
ডরিস বলতে থাকল, ‘তারপর আমি নিজেকে উপস্থাপন করতে শিখলাম। ধীরে ধীরে কোথায় বিজ্ঞাপন দেয়া যায় আর কোথায় যোগাযোগ করা যায় সবকিছু ঠিকঠাক খুঁজে পেলাম। এরপর থেকে রান্নার জগতে একটু একটু করে ওপরে উঠতে শুরু করলাম। একটা ব্যাপার কী, জানেন? কোনকিছুরই সংক্ষিপ্ত কোনো উপায় নেই। নিজের পেশায় দক্ষ ও অভিজ্ঞ হয়ে উঠতে হলে, তা শেফ হোক বা ডাক্তার, প্রচুর পরিশ্রমের প্রয়োজন।’
‘একটু একটু করে আমার খ্যাতি বাড়ল। পণ্যের মতো হয়ে গেলাম। তবে মানুষের দ্বারে দ্বারে উপস্থিত হওয়ার পরিবর্তে আমার কাছে চাকরীর প্রস্তাব আসতে শুরু করল। আমি ক্রমেই চওড়া দর হাঁকাতে শুরু করলাম আর লোকেরাও খরচ করতে আপত্তি করত না।
আমি নিজ বাড়িতে প্রাইভেট পার্টির আয়োজন করতাম। এমনকি প্রিমিয়ার ক্লায়েন্ট এবং তাদের বন্ধুদের জন্য বাড়িতে তাদের পছন্দমতো খাবারের আয়োজনও করতাম। মোটকথা, তারা আমাকে যতটুকু লাভবান করত, তা একটা সন্ধ্যা তাদেরকে সমর্পণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল।
‘এবং এই পুরো সময়টাতে,’ ডাক্তার প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কখনোই তোমার বাবার কাছে যাওনি?’
‘না,’ ডরিস বলল। ‘আমার মনে হয়, আমি তখনও তাকে অপছন্দ করতাম।’ ডরিস বলতে থাকলো, ‘আমি জানি ব্যাপারটা অযৌক্তিক, কিন্তু আবেগ তো আর যুক্তির ধার ধারে না।’
‘তাহলে বিস্ফোরণের দিন তুমি কীভাবে তোমার বাবার কাছে গিয়েছিলে?’
‘আমি আসলে সবকিছু ভুলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম’ ডরিস ব্যাখ্যা করতে লাগল। ‘একটা ক্ষোভ তো আর সারাজীবন পুষে রাখতে পারি না। বিশটা বছর কেটে গিয়েছে। পেছনের দিনগুলোতে কোনোকিছুই ভালো যায়নি কিন্তু এখন তো আমি প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষ। আর ভাবলাম, অন্তত এক-দুবার তো তার সাথে আমার দেখা করা উচিৎ। শত হোক, আমাকে তিনি বড় করেছেন।’
‘তারপর?’
‘বললাম না, এত বছর পরেও তিনি প্রথমেই চেয়েছেন, আমি যেন তার জন্য খাবার রান্না করি। সত্যি বলতে কী, এটা শুনে আমার খুব রাগ হয়েছে। বিশ বছর পরেও, তিনি একটুও বদলাননি। সামান্যও না। ব্যাপারটা নিতে পারিনি।’
‘তো তুমি কী করলে?’
‘আমি রান্নাঘরে গেলাম,’ ডরিস বলল। ‘আর কী করব? তিনি আমার পিছুপিছু এলেন। আমি তার জন্য রান্নার প্রস্তুতি নিতে নিতে আমরা কিছুক্ষণ গল্প করলাম। সম্ভবত বাবার সাথে কথা বলার সময়ই অসাবধানতাবশত গ্যাসের চুলাটি চালু করে ফেলেছিলাম। কথায় কথায় সেটা ভুলে গিয়েছিলাম। তারপর আমি অন্য চুলায় আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করছিলাম। সর্বশেষ ঘটনা এটাই মনে আছে।’
ডাক্তার মিশেল তার চেয়ারের গায়ে হেলান দিয়ে বসলেন। ‘ডরিস, আমি কি তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি যেটা একটু অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হতে পারে?’
ডরিস কাঁধ তুলে বলল, ‘আপনার ইচ্ছা।’
তিনি একটি গভীর শ্বাস নিলেন, তারপর অস্বস্তিকরভাবে ছেড়ে দিলেন। ডরিসের চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘চা চামচ আর টেবিল চামচের মধ্যে পার্থক্য কী?’
‘কী?’ ডরিস অবাক হয়ে বলল।
‘একটা চা চামচ এবং একটা টেবিল চামচ? এদের পার্থক্য কী?’
‘চা চামচ হলো চা নাড়তে যেটা ব্যবহার করে,’ ডরিস বোঝাল, ‘আর যেটা অন্য খাবারের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, যেমন স্যুপ, কাস্টার্ড ও ডেজার্ট—সেটা টেবিল চামচ।’
ডাক্তার মিশেল তার কপাল চুলকে নিয়ে বললেন ‘না, ডরিস। চা চামচ এবং টেবিল চামচ দুটোই পরিমাপের একক যা সারা বিশ্বের শেফরা ব্যবহার করে। যে কোন পেশাদার শেফ মাত্রই তা জানে। এমনকি সাধারণত যারা নিজে বাড়িতে রান্না করে, তারাও জানে। তুমি কোনো শেফ না ডরিস। কখনও ছিলেও না।’
ডরিস নাক টানল, ‘কী হাস্যকর কথাবার্তা! অবশ্যই আমি একজন শেফ। আমি সারাজীবন এই কাজটাই করে এসেছি!’
‘না, তুমি তা করোনি।’ ডাক্তার মিচেল বললেন। ‘আমার কাছে তোমার ক্রাইম রেকর্ড আছে। গত বিশ বছরে সাতবার তোমাকে পতিতাবৃত্তির জন্য গ্রেফতার করা হয়েছে।’
‘প-তি…?’ ডরিস স্তব্ধ হয়ে গেল।
‘কী যা তা বলছেন? আপনি নিশ্চয়ই আমার ফাইল অন্য কারও সাথে গুলিয়ে ফেলেছেন। এটা কী ধরনের হাসপাতাল, হ্যাঁ!’
‘এটি একটি মানসিক হাসপাতাল, ডরিস। তুমি সেই বিস্ফোরণে তোমার বাবাকে হত্যা করেছিলে এবং নিজেও আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিলে।’
‘না!’ ডরিস চিৎকার করে উঠল। তাকে আসলে ধৈর্য পরীক্ষা দিতে হচ্ছিলো। ‘এটা সত্যি না! আমি একজন শেফ!’
‘তুমি রান্নার সাথে যৌনতা অদল-বদল করে নিয়েছ। সেই এগারো বছর বয়স থেকেই। এই অদল-বদলই তোমার একমাত্র রাস্তা আর শক্তি হয়ে তোমাকে টিকিয়ে রেখেছে।
‘না!’ ডরিস চিৎকার করে উঠল।
‘কিন্তু তুমি স্ট্রং ছিলে।’ ডাক্তার মিশেল বললেন, ‘যতটা ও ভেবেছিল, তুমি তার চেয়েও কঠিন ছিলে। পালিয়ে যাওয়ার মতো যথেষ্ট দৃঢ়তা তোমার ছিল, নিজেকে বিক্রি করে বেঁচে থাকার জন্য এবং ফিরে এসে ও তোমার সাথে যা করেছে তার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য যথেষ্ট দৃঢ় তুমি ছিলে ডরিস!’
‘ন…ন…গ….!’ ডরিস আর্তনাদ করে উঠল।
‘লোকটা মারা গেছে।’, ডাক্তার মিশেল বললেন, ‘আর কখনো সে তোমাকে আঘাত করতে পারবে না। তুমি ওকে হত্যা করেছ। তুমি প্রতিশোধ নিয়েছ। তুমি জিতে গেছো, ডরিস!’
ডরিসের তীব্র চিৎকারে চিরতরে কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা করেন ডাক্তার মিশেল। দ্রুত সুঁই বের করে তাকে ইনজেকশন দিলেন। ডরিস জ্ঞান হারিয়ে ফেলার পর ডাক্তার বসে তার কেইস লগে নোট লিখলেন।
‘আমরা তোমাকে এই যন্ত্রণা থেকে বের করে আনব।’ অচেতন ডরিসকে লক্ষ্য করে ডাক্তার মিশেল বললেন। ‘তুমি এমন একটা পথ অতিক্রম করে এসেছ যেখানে সাধারণত অন্য কেউ হলে ভেঙে চুরচুর হয়ে যেত। কথা দিচ্ছি, আমি তোমাকে বাকি পথটাও পার করে নিয়ে আসব।’
ডাক্তার তার নোটগুলো চেক করলেন। দুই দিন আগে বিস্ফোরণের কথা তার কিছুই মনে ছিল না। গতকাল, তার বিস্ফোরণের কথা মনে ছিল তবে সেটা যে তার বাবার বাড়িতেই হয়েছে—তা মনে করতে পারেনি। আগামীকাল আরেকটু বেশি মনে করতে পারবে। ডাক্তার সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন।
রুম থেকে বের হয়ে দরজা বন্ধ করে দিতে দিতে ডাক্তার আরো একবার বললেন, ‘এ আমার ওয়াদা…’
লেখকের নোট : এখন পুরো গল্প আবার পড়ুন।