মুকাদ্দাস (দ্বিতীয় কিস্তি)

পূর্ব প্রকাশের পর…

যেভাবে জোরে জোরে দরজা ধাক্কানো হচ্ছে, প্রথমে আমার মনে এলো⏤পুলিশ হয়তো আমাদের অ্যাপার্টমেন্টেও হানা দিয়েছে। কিন্তু আমার নিজের চেয়ে বেশি চিন্তা হচ্ছে বাসসামের জন্য। নিউজ চ্যানেলে একটু আগেই ওকে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হতে দেখেছি। কয়েক মুহূর্ত ভেবে, এক ঝটকায় দরজা খুলে দিলাম আমি। 

বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন ফ্রাঙ্কলিন!

আমরা তাঁকে আদর করে ফ্রাঙ্কি আঙ্কেল ডাকি। তিনি আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট ইউনিয়নের সভাপতি। বিশেষ করে আমার আর বাসসামের প্রতি বাড়তি খেয়াল তাঁর।

‘হেই আয়ান! মাত্র‌ই নিউজ দেখেছ তুমি? ক্যাফে পানোলি এরিয়ায় সমস্ত ছোট ছোট রেস্টুরেন্টে রেইড করেছে পুলিশ। বহু মুসলমানকে গ্রেপ্তার করেছে তারা। আর আল্লাহর ওয়াস্তে, তোমরা তোমাদের এই কলিং বেলটা ঠিক করাও! কতক্ষণ ধরে দরজা পেটাচ্ছি তো পেটাচ্ছিই!’

ফ্রাঙ্কি হয়তো বাসসামকে গ্রেপ্তার হতে দেখেননি, তাই সেটার কথা বলেননি। তাকে এই বাড়তি সংবাদটা জানিয়ে চিন্তায় ফেলতে চাচ্ছি না। তাই চেপে গেলাম বিষয়টা। জলদি জ্যাকেট পরে নিলাম, ‘হ্যাঁ, আমি ওদিকেই যাচ্ছি। দোয়া করুন যাতে সব ঠিক হয়ে যায়।’ 

ফ্রাঙ্কি আঙ্কেল হয়তো রেগে আছেন। ‘দেশটা সার্কাস বানিয়ে ফেলছে পুলিশগুলো! আমরা আমেরিকানরা তো কখনো এমন ছিলাম না!’ ফোঁস ফোঁস করতে করতে মন্তব্য ছুঁড়লেন।

আঙ্কেল ফ্রাঙ্কি যে সোনালি যুগের কথা বলছেন, তা এখন কেবল ব‌ইপত্রেই খুঁজে পাওয়া যায়।

তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে মিলবেরি স্ট্রিটের একটা ট্যাক্সি ধরলাম আমি। ড্রাইভারকে থানায় যেতে বললাম। আমি ওখানে যাওয়ার আগেই বেশ ভিড় জমে গেছে। তার বেশিরভাগই মুসলমান আর এশিয়ান ছাত্রদের আত্মীয়-স্বজন।

দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর বাসসামের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেলাম আমি। আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরল সে। মা-বাবার আদুরে সন্তান হওয়ায়, ভেতর থেকে যথেষ্ট নাজুক ও নরম দিলের মানুষ সে। আমি জোরে জোরে তার পিঠ চাপড়ে দিলাম, ‘হিম্মত রাখো ইয়ার! মূলত ঘটনাটা কী?’ 

বাসসাম কান্নাভেজা মুখ করে জবাব দিল, ‘জানি না। নিউ ইয়র্ক পুলিশ আজ কোনো এক পাকিস্তানি ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছে। শুনেছি টাইম স্কয়ারে নাকি কোন গাড়িতে বোমা পেতেছে সে। বোমা তো ফাটেনি, কিন্তু ফেটেছে আমাদের কপাল⏤যে আমরা সবাই এশীয় আর মুসলমান অপরাধে ধরা পড়েছি।’

আমি ঠা ঠা করে অদূরে অফিসারদের দিকে তাকালাম। চোখভরতি রাগ‌, ‘কিন্তু শুধু এশীয় বা মুসলমান হওয়ার অপরাধেই এরা বাকি নির্দোষদের কীভাবে ধরতে পারে? আমরা কি সব কিছুর দায় নিয়ে রেখেছি নাকি? আর তুমি কি ওদের বলনি যে, গত বিশ বছর ধরে তুমি আমেরিকান নাগরিক? তাহলে এরা তোমাকে এশীয় হওয়ার অভিযোগ কেন দিচ্ছে? এখন আমরাও তো ওদের মতোই আমেরিকান নাগরিক!’ 

দীর্ঘ শ্বাস নিল বাসসাম, ‘ভাই, এশীয় হওয়াটা এদের চোখে তত বড় অপরাধ নয়। আমাদের আসল অপরাধ তো হলো আমরা মুসলমান। এরা এখন প্রত্যেকটা মুসলমানকেই সন্দেহের চোখে দেখে, তা সে তাদের নিজের দেশেরই হোক না কেন।’

ইতিমধ্যে বাসসামের রেস্টুরেন্টের মালিক‌ও উকিল নিয়ে হাজতে চলে এসেছে। কিন্তু জানা গেল, এখন কারোর‌ই জামিন হ‌ওয়া সম্ভব নয়। যা হবার আগামীকাল সকালে আদালতেই হবে।  

বাসসামকে আমি একা ছাড়তে চাচ্ছি না। কিন্তু রাত বারোটার পর সবাইকে মূল হল খালি করার নির্দেশ দেয়া হলো। বাসসাম জোর করে আমাকে অ্যাপার্টমেন্টে পাঠিয়ে দিল। কারণ সে জানে, না হয় আমি সারা রাত পুলিশ স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দেব।

কিন্তু বাসায় ফিরেও এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তি পাচ্ছি না। বারবার আমার চোখ শুধু বাসসামের ফাঁকা রুম আর শূন্য বিছানার দিকে ছুটে যাচ্ছে।

অবাক লাগছে, বাসসাম বাসায় থাকলে নানান ছোটখাটো কথায় তার সঙ্গে ঝগড়া করতাম। আর এখন? এখন সে নেই। তার অনুপস্থিতিতে আমি একবিন্দুও স্বস্তি পাচ্ছি না। রক্তের সম্পর্কগুলো হয়তো এমনই⏤দূরে গেলে কিংবা ছেড়ে গেলেই তাদের মূল্য বুঝি আমরা। তাদের কথা মনে পড়ে। উদাসীনতায় ভুগি পলপল। 

বাবা-মার মৃত্যুর পর এই প্রথম আমি আর বাসসাম আলাদা হলাম। তাঁরা তাঁদের জীবনের শেষ পনেরো বছর আমেরিকার এই নিউ ইয়র্ক শহরেই কাটিয়েছেন। কিন্তু বাবার জীবনটা কেটেছে শুধু সংগ্রাম আর সংগ্রামেই।

তিনিও অনেক রঙিন স্বপ্ন বুকে করে এদেশে এসেছিলেন। কিন্তু নিউ ইয়র্কের দ্রুতগতির জীবন কখনো মানিয়ে নিতে পারেননি তিনি। আর এই দ্রুতগতির জীবনই একদিন প্রাণ কেড়ে নিল তাঁদের। 

আমার মনে আছে, আমি আর বাসসাম যখন ছোট, আমাদের স্কুলের বেতন দেওয়ার জন্য বাবাকে তিন তিনটি জায়গায় চাকরি করতে হতো। 

মা ছিলেন খুবই সাদাসিধে গৃহস্থালি নারী। এই নয়া দুনিয়ার কোনো অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। তিনি সবসময় আমাদেরকে দেশের গল্প শোনাতেন। ওগুলো সবসময় আমার কাছে পরিরদেশের গল্প মনে হতো⏤যেখানে পনেরো-বিশ জনের একটি পরিবার, এক ছাদের নিচে কাটিয়ে দেয়। যেখানে সন্ধ্যা নামলে দাদি-নানিরা এখনো চাঁদের বুড়ির গল্প শোনায়। 

বাবা তাঁর সমস্তটুকু দিয়েও এই ভাড়ার অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে এগোতে পারেননি। এটাতেই এখনো আমি আর বাসসাম থাকছি। তাঁর ইচ্ছা পূরণ করতেই আমি আর বাসসাম যেমন-তেমন করে পড়ালেখাটা চালিয়ে যাচ্ছি। আর নয়তো ইউনিভার্সিটির আকাশছোঁয়া বেতন আর অন্যান্য খরচাদি বহনের সেই সাধ্য ক‌ই! তাছাড়া বিনা-ফিতে ইউনিভার্সিটি‌ও আমাদেরকে কখনো আর এক সেমিস্টারও সামনে বাড়ার সুযোগ‌ও দিত না। 

কিন্তু বাসসাম বাবার শেষ ইচ্ছা ও ওসিয়ত পূরণ করার শপথ নিয়ে রেখেছে। আর এখন তো তার শেষ সেমিস্টার চলছে। আমার অবশ্য এখনো তিনটা সেমিস্টার বাকি। দেড় বছর পর অর্থনীতিতে আমার‌ও একটা ডিগ্রি মিলে যাবে। 

এসব আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে সারাটা রাত এপাশ-ওপাশ করেই কাটালাম।

সকাল হতেই আবার পুলিশ স্টেশনে ছুটলাম। কিন্তু ওখানে তাদের পেলাম না। গিয়ে দেখি এরিমধ্যে তাদেরকে আদালতে পাঠিয়ে দিয়েছে।‌

বাসসামের মালিকের উকিলকে আদালতের সিঁড়িতেই পেয়ে গেলাম। এখানে আরো বহু ভুক্তভোগীদের আত্মীয়-স্বজন‌ও এসে ভিড় করে রেখেছে।‌ উকিল আমাদেরকে আশ্বাস দিলেন, বেলা বারোটা নাগাদ সবার জামিন মঞ্জুর করিয়ে নেবেন।

কোর্টরুমে যাওয়ার কোনো অনুমতি পেলাম না আমরা। কারণ জজ তাঁর খাস কামরায় এই মামলার শুনানি করছেন। 

আমি ওখানেই আদালতের বাইরের মার্বেল পাথরের বরফ-জমা সিঁড়িতে বসে পড়লাম। ঠিক সাড়ে বারোটায় বাসসামকে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখলাম। তাকে দেখেই ভেতরটা মোচড়ে উঠল। মনে হলো না জানি কত কত বছর পর তাকে দেখছি! 

আমি ঝাঁপিয়েপড়ে তার দিকে ছুটে গেলাম।

‘কী হলো?’ 

বাসসামকে অনেক ক্লান্ত দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে রাতভর বেশ ধকল গেছে তার ওপর। 

‘আমার জামিন হয়ে গেছে, ইয়ার! কিন্তু কিছু ছেলেকে তারা সন্দেহবশত আটকে রেখেছে। বেশিরভাগ পাকিস্তানিই এই সন্দেহের শিকার। কারণ টাইম স্কয়ারে বোমা পাতানো ছেলেটা নাকি কোনো পাকিস্তানি ছাত্র‌ই।’ 

বাসসাম আরও কী কী বলে চলল। কিন্তু তার বেশিরভাগ কথাই আমার কানে ঢুকল না। আমার বে-কসুর ভাই খালাস পেয়েছে, এই-ই আমার জন্য যথেষ্ট। 

কিন্তু আমি হয়তো জানি না, এই অল্প সময়ের মুক্তি আমাদের জন্য কোনো লম্বা সময়ের আটকের শুরুও হতে পারে।

বাসসামের লাস্ট ক্লাসের সময় এখনো বাকি। তাই সে আমাকেও ইউনিভার্সিটিতে টেনে নিয়ে গেল। ভার্সিটিতেও এক‌ই আলোচনা চলছে। চারপাশে শুধু টাইম স্কয়ারের ঘটনারই গুঞ্জন।

ফরহাদ পেরেশান-চোখে আমার দিকে তাকাল, ‘একটা কথা আমার মাথায় ঢুকছে না, কিছু কাল ধরে ‘যত দোষ নন্দ ঘোষে’র মতো সব ঘটনার দায়ভার কেন পাকিস্তানিদের ওপর এসে পড়ে?!’ 

মুখ বাঁকাল এরিক, ‘কারণ পাকিস্তানের নাকি গোটা বিশ্বের খলিফা হওয়ার ভূত মাথায় চেপেছে!’ 

ফরহাদ তাকে ঝেরে উঠল, ‘বাজে বকো না। গতকাল‌ও ইরান নিয়ে এটাই ভাবতে তোমরা।’

এরিকের কথায় সায় দিল জিম, ‘এরিক ঠিকই বলছে। সব বিষয়ে পাকিস্তানিদের জড়ানোর কোনো কারণ তো হবে?’

জেনি গভীর চোখে আমার দিকে তাকাল, ‘তোমার দেশের পক্ষে তুমি কিছু বলবে না, আয়ান?’ 

বাসসামের চিন্তায় খানিক আনমনা হয়ে ছিলাম আমি। জেনির তাকানোতে টনক নড়ল আমার। ‘বাসসাম বলল, সমস্যাটা জাতি নিয়ে নয়; ধর্ম নিয়ে। মুসলমান হওয়ার শাস্তি দিচ্ছে আমাদেরকে। তবে পাকিস্তানি হওয়াটা যেন আগুনে ঘি,’ জবাবে বললাম আমি। 

এরিক আমেরিকান। জোরে জোরে মাথা দোলাতে দোলাতে সে বলল, ‘সব বক‌ওয়াস। মুসলমানদের সাথেই যদি এই ব্যবহার করার হতো, তাহলে সকল মুসলমানদের সাথেই করত। এখানে শত শত আরব, ফিলিস্তিনি, ইরানি, সুদানি আর মালয়েশীয় মুসলমানও তো পড়াশোনা করছে! এমনকি ইন্ডিয়ান মুসলিম ছাত্ররাও বেশ আরামে আমেরিকায় জীবন কাটাচ্ছে; তাই শুধু পাকিস্তানিদের দিকে শত্রুতার তীর তান করা ঢাহা ভুল।’ 

ফরহাদ ছাড়া বাকি সবাই এরিকের কথায় সম্মতি জানাল। আমি বিরক্ত হয়ে আলাপ শেষ করলাম, ‘আমি শুধু এতটুকু জানি, ‘বাঁচো এবং বাঁচতে দাও’-এই স্লোগানধারী নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা আমরা। অন্য কারও কর্মের সাজা আমাদের ওপর চাপালে, তা চরম অন্যায় হবে। আমরা চাইলেই নিজে নিজে কোনো দেশে জন্মাতে পারি না। এটা ওপর‌ওয়ালার মর্জি। হ্যাঁ, আমরা চাইলে কোনো দেশের নাগরিক হতে পারি। সেদিক থেকে আমি আর বাসসাম নিজেদের ইচ্ছায় আমেরিকার নাগরিক হয়েছি। সুতরাং এখন আমরা আমেরিকান। আমাদেরকে‌ও আমেরিকানদের মতোই মনে করা হোক, এবং আমাদের অধিকারের খেয়াল রাখা হোক, এটাই চাই।’

আমার বক্তৃতা শুনে ফরহাদ লম্বা করে মুখ বাঁকাল, ‘মিস্টার আয়ান! খুব জলদিই তোমার চোখ থেকে আমেরিকান অধিকারের এই রঙিন পর্দাও সরে যাবে। এখানে এখন কেবল সে-ই আমেরিকান⏤যে আব্রাহাম লিংকনের যুগে ছিল।’ 

ফরহাদের কথা শুনে আমরা সবাই হো হো হেসে উঠলাম।

খানিক বাদেই হালকা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। এরিক আর জেনি কোনো বাহানা বানিয়ে আমাদের থেকে বিদায় নিল। তারা ইউনিভার্সিটির ওই বিশাল হল ঘরটার দিকে যাচ্ছে। ওখানের মেঝেতে হলদে-আগুনরঙা পাতা পড়ে গালিচার মতো হয়ে থাকে।

এরিক আর জেনি প্রথম সেমিস্টার থেকেই একে অপরকে ভালোবাসে। ব্যাপারটা আমাদের কারোরই অজানা নয়।‌

কিন্তু আবহাওয়া এমন রোমান্টিক হলেই, ওই দুই বোকা আমাদেরকে নানান অজুহাত শুনিয়ে কেটে পড়ে। বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়তেই জেনির মনে পড়ে, ‘ওহ হো! আমি তো লাইব্রেরিতে আমার চশমা ভুলে এসেছি!’

এরিকও খানিক পর গাড়ির চাবি খোঁজা বা এমনই কোনো অত্যান্ত জরুরি কাজের ছুতোয় আড্ডা থেকে কেটে পড়ে।‌ আর তারপর তারা দুজন সন্ধ্যা অবধি সেই আগুনরঙা হলুদ পাতার গালিচায় শুয়ে থাকে‌। একজন আরেকজনের কোলে মাথা রেখে কীসব ফিসফিস করে বলে, আর ক্ষণে ক্ষণে হেসে ওঠে। 

এই ভালোবাসাটাও-না, যে কী! বেশ বুদ্ধিসুদ্ধির মানুষকেও বলদ বানিয়ে ফেলে। হাড় কাঁপানো শীত আর ঝরঝর বৃষ্টিতেও বাইরে বেরুতে বাধ্য করে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড লু হাওয়াতেও, গরমে অতিষ্ঠ চিপা বন্ধ কামরায় থুম মেরে বসে ফিসফাস করতে মজবুর করে। 

ভালোবাসায় সবকিছু উলটে যায়।‌ আর নয়তো সব প্রেমিক-প্রেমিকারাই যমিনে মাথা ঠেকিয়ে উলটো হয়ে জগতটাকে দেখে। 

সে যাই হোক, মূলত সত্যিটা হলো⏤আজ পর্যন্ত এই ভালোবাসার গোলকধাঁধাটাই বুঝতে পারিনি আমি। 

ফরহাদ বলে, ‘ভালোবাসা যারতার ওপর ভর করে না। এ খুব বুঝেশুনে ঠান্ডা মাথায় তার শিকার বাছাই করে। আর ভালোবাসার সবচেয়ে পছন্দের শিকার হলো সে, যন্ত্রণার চেয়ে তড়পায় বেশি যে।‌ যার প্রাণ ছটফট করতে করতে বের হয়, যে মরতে মরতে বাঁচে, আর বাঁচতে বাঁচতে মরে। এক ঝটকায় ঠান্ডা হয়ে যাওয়া শিকার, ভালোবাসার এই রাক্ষসের মনে ধরে না। 

ফরহাদের ভাষায়, ‘সে আবার কেমন প্রেম, যে নিজের রক্ত দিয়ে দেয়াল রাঙায় না!’

কিন্তু এই আবেগপ্রবণতা আমার একদম পছন্দ না।‌ কিংবা হয়তো ভালোবাসার গল্পগুলোই আমি ঘৃণা করি। কেন জানি আমার মনে হয়, ভালোবাসা মানুষের সমস্ত অহংকার, সমস্ত আমিত্ব ছিনিয়ে নিয়ে তাকে ভিখারি বানিয়ে দেয়। 

প্রেম পুরুষের থেকে তার গাম্ভীর্যতা আর নারীর থেকে তার নারীত্ব কেড়ে নেয়।

আমি তো ভাবতাম, এই ভালোবাসার রোগে নারীরা পুরুষের মতো, আর পুরুষরা নারীর মতো হয়ে যায়। ভালোবাসা হয়তো আমাদের থেকে আমাদের চিরচেনা পরিচয়টাই কেড়ে নেয়। তাই আমি সবসময় এই রোগ থেকে যোজন যোজন দূরে পালিয়ে বেড়াই।  

কিন্তু বাসসাম বোধহয় দুবছর আগেই প্রেমের দেব কিউপিডের সেই অদৃশ্য তীরের শিকার হয়েছে। ফলে ফাইন আর্টসের শেষ বর্ষের ইরানি বংশোদ্ভূত সানাম কাবীর তার বিশেষ মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু।‌ কিন্তু বাকি আরদশটা বোকা প্রেমিকের মতোই বাসসাম‌ও আমার থেকে এই বিষয়টা আড়াল করার মিছে চেষ্টা করে। মুখ পুছে অস্বীকার করে। বলে, ‘সানাম আমার নিছক ভালো বন্ধু।’ কেন জানি সব প্রেমিকরা এমন‌ই হয়! তারা মনে করে, সারা দুনিয়া ঘাস খায়, আর তারাই শুধু দানা খায়!

কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি ভারী হয়ে এলো। ক্লাসের উদ্দেশ্যে আমরা অ্যাকাডেমিক ব্লকের দিকে চললাম।

পরের দিন সকাল।

আজ গ্যারেজ থেকে বাইক আনার তারিখ। বাসসাম আদালতে হাজিরা দিবে। তাই আমি ওকে আদালত প্রাঙ্গণে নামিয়ে ডেভিডের গ্যারেজের দিকে চললাম। গ্যারেজটা সতেরোতম গলিতে। 

বাসসামের উকিল আজ তাদের সবাইকে জরুরি তলব করেছে, জামিন পাকা করার জন্য। ওখান থেকে ছুটলেই সোজা ইউনিভার্সিটিতে যাবে সে। কারণ কাল থেকেই ‘নিছকই তার একজন ভালো বন্ধু সানাম কাবীরের ডজন ডজন ফোন আসছে, জামিন পাকা হতেই বাসসাম যেন খবরটা সবার আগে তাকেই দেয়।

সকালে বাসা থেকে বের হবার সময় আমরা পথে বেশ কয়েক জায়গায় লোকজনকে সেই লেডি ডাক্তারের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ করতে দেখেছি। বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল নানান প্ল্যাকার্ড। ওসবের মধ্যে কয়েকটা ছবিতে ওই লেডি ডাক্তারের মেডিক্যাল ডিগ্রি পদক নিচ্ছে দেখলাম। দেখতে তো একদম রোগা-পাতলাই মনে হলো। তবুও কেন যে তাঁর ভয়ে গোটা আমেরিকার গায়ে জ্বর ধরে গেছে!

পথে আমরা আরো অনেক জায়গায় গত সন্ধ্যায় গ্রেফতার হওয়া পাকিস্তানি ছেলেটার বোম মেরে টাইম স্কয়ার উড়ানোর গল্প‌ও বিভিন্ন নিউজ স্টল আর হকারদের হাতে হুড়হুড় করে বিক্রি হতে দেখলাম। বাসসাম এমনিতেই আগে থেকেই এই জেলযাত্রা আর আদালতের চক্করে বিরক্ত হয়ে গেছে, এই সব দেখে সে রেগে গেল, ‘এই সব কিছুর মূলে ওই টাইম স্কয়ারের ছেলেটাই! ওর জন্যই কাল রাত থেকে এখন পর্যন্ত সাতাশ জন মুসলিম ছাত্র গ্রেফতার হয়েছে। বোম ফাটাবি তো একটা ঠিকঠাক বোমই সেট করতি! টাইম স্কয়ারে একটা পটকাও ফাটল না, খামোখা ডজনখানেক মুসলমানের জীবন তেজপাতা!’ 

বাসসামের এই খিটখিটে মেজাজ দেখে আমার হাসি পেল। বাসসাম এতে আরো চটে গেল, ‘তুমি হাসছো? এসব লোকের জন্যই আমাদের নামধাম আজ পালটে যাচ্ছে। যদিও আগে থেকেও ওটা খুব একটা ভালো ছিল না।’

বাসসামকে আদালতে নামিয়ে আমি ডেভিডের গ্যারেজে পৌঁছালাম। ডেভিড এখনো আমার বাইক নিয়েই পড়ে আছে। প্রায় দুঘণ্টা গুঁতাগুঁতি করার পর মেরামতে সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে বাইক নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিল, তবে সতর্কবাণীও শুনিয়ে দিল, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে ছেলে! এই এক সপ্তাহের মধ্যে অন্তত একশোর ওপরে একদম চালিও না। এবার যদি চেইন ভাঙে, তাহলে ভাঙারির দোকান ছাড়া আর কোনো কাজে আসবে না এটা।’

তাই ডেভিডের নির্দেশ মোতাবেক আমল করতে করতে একশোর ওপরে গতিতে ব্রুকলিন অ্যাভিনিউ ধরে আমার বাইকখানা উড়িয়ে উড়িয়ে ইউনিভার্সিটির লেনের দিকে মোড় নিলাম। নিউ ইয়র্কের এই চওড়া রাস্তাগুলোতে বাইক চালাতে সবসময়‌ই আমার বেশ লাগে! জীবনে গতি না থাকলে জীবন থেমে যায়। কিন্তু একেবারে থেমে যাওয়া মানেই তো মৃত্যু। তাই জীবিতদের কখনো থেমে থাকা উচিত নয়।

ইউনিভার্সিটির পার্কিং লটে বাইক থামিয়ে মাথা থেকে কালো হেলমেটটা খুললাম আমি। ঠিক তখনই সানাম কাবীরের উদয়। পেরেশান হয়ে এ দিকেই আসছে সে।

‘আয়ান! বাসসাম আজ তোমার সাথে আসেনি?’ 

অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম আমি, ‘কী? বাসসাম এখনো ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছায়নি? সে তো বলেছিল, আদালতে কেবল তার আধঘণ্টার শুনানি! তার তো দুঘণ্টা আগেই এখানে পৌঁছানোর কথা!’

আমিও চিন্তিত হয়ে পড়লাম। সঙ্গে সঙ্গে ফোন বের করে বাসসামের নম্বর ডায়াল করলাম। কিন্তু ফোন বন্ধ।

সানাম অস্থির হয়ে আমার দিকে তাকাল, ‘ফোন তো আমিও দুঘণ্টা ধরে করছি, কিন্তু কোনো উত্তর পাচ্ছি না!’ 

আমার মাথায় হঠাৎ নানান সংশয় উঁকিঝুঁকি দিতে লাগল, ‘বাসসামের জামিন আবার বাতিল হয়ে গেল না তো? অন্য কোনো বিপদ হলো না তো?’

এরিমধ্যে জেনি আমাকে আর সানামকে পার্কিং লট থেকে বেরুতে দেখে সাথে সাথে ডেকে উঠল, ‘আয়ান! কোথায় ছিলে তুমি? আমরা সবাই সেই কখন থেকে তোমাকে খুঁজছি!’ 

‘কেন, সব ঠিক আছে তো?’ 

জেনি কিছুটা ইতস্তত করল, ‘আসলে…বাসসাম আর বাবর ঝগড়া লেগেছিল। ব্যাপার বেশিদূর গড়ায়নি, কিন্তু বাসসামের ফোনটা ভেঙে গেছে। এরিক আর জিম তাকে নিয়ে হোস্টেলের দিকে গেছে।’

‘বাসসামের ঝগড়া ফিলিস্তিনি ছেলেটার সাথে?! কিন্তু কেন?!’ 

মুহূর্তেই আমার কানপট্টি গরম হয়ে গেল। হোস্টেলের দিকে ছুটলাম আমি। সানাম আর জেনিও আমার পেছনে ছুটল। জেনি হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটতে ছুটতেই আমাকে বলতে লাগল, ‘ভার্সিটিতে পৌঁছেই বাসসামের সাথে প্রথম ধাক্কাটাই লাগে বাবরের। বাবর তাকে দেখতেই কটাক্ষ ছুড়ে দেয়, ‘দুদিন আগে যদি তোমার ছোট ভাই মুসলিম ছাত্রদের সাথে নিউ ইয়র্ক পুলিশের অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে অস্বীকার না করত, তাহলে আজ পুরো গ্রুপ তোমাকে বাঁচাতে পথে নেমে আসত!’ 

বাসসাম আগে থেকেই তেতে আছে। এমন কথায় পুরো জ্বলে উঠল, ‘এসব মূলত ওইসব মুসলিম ছাত্রদের ‘খোদায়ি খিদমতগার‘ সাজার ফল। এদের জন্যই আজ পুরো নিউ ইয়র্কে ইসলাম ও মুসলমানকে নিয়ে উপহাস করা হচ্ছে।’

কথায় কথা বাড়ল এবং বাড়তেই থাকল। শেষ পর্যন্ত বিষয় হাতাহাতিতে গড়াল। তবে সাথে সাথেই মুসলিম কাউন্সিলর আমের এবং বাকি ছেলেরা ওখানে ছুটে গিয়ে ব্যাপারটা মিটমাট করে দিল। তবে তার আগেই বাসসামের পকেট থেকে সেল ফোনটি নিচে পড়ে দুটুকরো হয়ে গেছে। ওই ফোনটা সানামই তাকে তার গত জন্মদিনে গিফট করেছিল। আর আমি জানি, বাসসামের কাছে ওই ফোনটার গুরুত্ব কতখানি! 

হোস্টেলে ফরহাদের রুমে যাওয়া অবধি আমার চোখ তন্নতন্ন করে বাবরকে খুঁজে চলল। কিন্তু তার ভাগ্য ভালো, পথে কোথাও চোখে পড়ল না। নয়তো আজ দুজনের একজন‌ই কেবল নিজের পায়ে ফিরত।

এক ধাক্কায় ফরহাদের রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম আমি। দেখলাম, বাসসাম তার শার্টের ভাঙা বোতাম লাগাচ্ছে। গভীরভাবে তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত নজর বোলালাম।

‘ঠিক আছো তো তুমি? চলো আমার সঙ্গে, এখনই ওই ফিলিস্তিনিটার সাথে হিসাব বরাবর করব।’

ফরহাদ আমার হাত টেনে ধরল, ‘কাম অন আয়ান, শান্ত হও। সামান্য একটা ব্যাপার ছিল, মিটে গেছে। একে আর বাড়িয়ো না।’

জোরে চিৎকার করে উঠলাম আমি, ‘তোমাদের কাছে এটা সামান্য ব্যাপার? আমার ভাইয়ের কলার ধরেছে সে! তার অবস্থা খারাপ না করে আমি শান্তিতে বসব না! তোমরা আসতে না চাইলে, এসো না!’

আমি দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ঘুরলাম, কিন্তু বাসসাম দৌড়ে এসে আমার হাত ধরে ফেলল, ‘বাদ দাও ইয়ার! দোষ আমাদের দুজনেরই ছিল। সকাল থেকে আদালতের শুনানি নিয়ে আমি একটু বেশিই রেগে ছিলাম। আমের আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে। এসব এবার বাদ দাও।’ 

কিন্তু আমার ভেতরের ফুটন্ত লাভা এখনও জ্বলছে, ‘তোমার সাথে লাগতে আসার সাহস কী করে হলো ওর? তোমার ফোনটাও ভেঙে ফেলছে! একবার ওকে কোথাও পাই তো…’

এরিক, জিম আর ফরহাদ সবাই মিলে আমাকে জোর করে ওখানেই আটকে রাখল। সানাম কাবীর তো রীতিমতো কেঁদেই ফেলল। এই এশিয়ান মেয়েগুলাও না, কী পরিমাণ নাজুক! গলগলে মোম!

ফরহাদের রুমের বাইরে অন্যান্য ছাত্রদের ভিড় জমতে শুরু করল। বাধ্য হয়ে আমাদেরকে ফরহাদের ওখান থেকে বেরিয়ে ক্যাফের দিকে আসতে হলো। 

পুরোটা সময় বাসসাম আমার হাত ধরে রেখেছে। ছোটবেলায়‌ও এমনটাই করত ও, যাতে আমি কোনো অঘটন ঘটিয়ে না বসি। সানাম কাবীরকেও অনেক উৎকণ্ঠিত লাগছে। আমার কারণে সেও ঘাবড়ে আছে। অবশেষে আমাকে বলতেই হলো, ‘আমি কোথাও যাচ্ছি না। আগে তুমি তোমার এই ‘নিছক ভালো বন্ধুটিকে সামলাও।’

সানাম ইরানের তেহরানের এক বিত্তশালী, সম্ভ্রান্ত পাহলভী পরিবারের সন্তান। সেখানে তার বাবা⏤কাবীর পাহলভীর কাপড়ের বিশাল ব্যবসা। বংশগতভাবেই তাঁদের এই ব্যবসা। 

আবহাওয়া পালটাতে জেনি গরম কফি আর চিজ স্যান্ডউইচ অর্ডার করল। তার হাবভাব সানাম কাবীরের ঠিক উলটো। আমার বিশ্বাস⏤আমি যদি তখন তাণ্ডব বাঁধাতে বেরিয়ে পড়তাম, তাহলে সবার আগে থাকত সে।‌

আমরা সবাই কষ্টেসৃষ্টে নিজেদের মেজাজ পালটে এই নতুন আবহাওয়ায় মিশে যেতে চেষ্টা করছি, ঠিক তখনই আমেরের উপস্থিতি। সে তার পুরো গ্রুপ নিয়ে ক্যাফেতে ঢুকল।‌ পুরো পরিবেশ একেবারে থমথমে হয়ে গেল। কারণ ইতিমধ্যে ক্যাফের সবার কানে বাসসাম আর বাবরের হাতাহাতির খবর পৌঁছে গেছে। 

বাবর চুপচাপ তার দলের সঙ্গে এক কোণে পাতা একটা টেবিল গিয়ে বসে পড়ল। বাসসাম চোখে চোখে আমাকে ওকে এড়িয়ে যেতে ইশারা করছে। কিন্তু আমি আচানক ‘এক্সকিউজ মি!’ বলে উঠে দাঁড়ালাম। আমার সঙ্গের সবাই আমাকে ইশারা করতে থাকল। তবুও আমি সোজা আমেরের গ্রুপের টেবিলের কাছে চলে গেলাম। 

আমের স্বভাবসুলভ হাসিমুখে আমাকে সালাম দিল, ‘এসো আয়ান, তুমিও আমাদের সঙ্গে বসো।’

আমি বাবরের দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমেরকে জবাব দিলাম, ‘আমি এখানে বসতে আসিনি, তোমাদেরকে শুধু একটা কথা জানাতে এসেছি⏤এই পুরো দুনিয়ায় বাসসাম আমার একমাত্র ভাই এবং শেষ আত্মীয়। আমি আগেই সব হারিয়েছি, এখন নতুন করে আর কিছু হারাতে পারব না। তাই প্রথম এবং শেষবারের মতো তোমরা মাথায় ঢুকিয়ে নাও, বাসসামের গায়ে যদি একটা ফুলের টোকাও লাগে, মানবতার শেষ পাঠ‌ও ভুলে যাব আমি।’

আমের শান্তভাবে আমার কথাগুলো শুনল, ‘যা ঘটেছে, তার জন্য আমি আগেও বাবরের হয়ে বাসসামের কাছে ক্ষমা চেয়েছি। তুমিও তোমার মন থেকে সমস্ত ক্ষোভ ঝেড়ে ফেলো। চলো বাবর, উঠো, আয়ানের সাথে হাত মিলিয়ে শুরুটা করো তুমি।’

বাবর না চাইতেও উঠে এসে আমার সাথে হাত মেলাল। পুরো ক্যাফেটেরিয়ায় একটা হইচই পড়ে গেল। জেনি ওখানেই বসে কয়েক দফা শিস‌ও বাজিয়ে ফেলল। 

আমার চোখ পড়ে আছে আমের আর বাবরের দিকে‌, সমস্ত ধ্যান ওদিকেই। তাই আমেরের পাশে বসা মেয়েটিকে এতক্ষণ খেয়াল করিনি। মেয়েটি হঠাৎ উঠে তার কোমল হাতখানা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল, ‘হাই, আই অ্যাম পারওয়া। পারওয়া জমীর খান, ফ্রম ডেলি, ইন্ডিয়া।’

খানিক হকচকিয়ে গেলাম আমি। তবুও হাত মেলালাম।‌

পার‌ওয়া ঝলমলিয়ে হেসে বলল, ‘আশা করি এই বন্ধুত্ব আর টুটবে না।’ 

কিছুক্ষণ পর আমি আমার টেবিলে ফিরে এলাম। এরিক আর জিম বাকি সবার সাথে মিলে আমার জীবন তেজপাতা করে ফেলল। 

‘বাহ জনাব! এখান থেকে বেশ রাগে গজগজ করতে করতে গেলেন। আর ওখানে গিয়ে মেয়েদের সাথে হাত মিলিয়ে চলে এলেন। ভালো, খুব ভালো। আপনার কাছে এই প্রত্যাশা করিনি, মিস্টার আয়ান!’ 

‘ফালতু বকো না। আমি তো ওকে চিনিও না। হয়তো কোনো নতুন মুসলিম স্টুডেন্ট; আমেরের গ্রুপে যোগ দিয়েছে।’ 

ফরহাদ লম্বা করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘হ্যাঁ, আমি ওকে চিনি। এই তো দুদিন আগেই ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে জয়েন করেছে। শুনেছি, পারওয়া আসার পর থেকে ফিজিক্স লেকচার হলে নাকি প্রেমের বাতাস বইছে!’ 

চোখ পাকিয়ে ফরহাদের দিকে তাকালাম আমি, ‘তুমি কখনো ভালো হবে না! তোমার নামের মধ্যেই গোলমাল! ফরহাদ!’

যাই হোক, বিষয়টা এখানেই শেষ হয়ে গেল। কিন্তু আমি আর বাবর দুজনই হয়তো জানতাম যে, একদিন না একদিন আমাদের একটা হতাহতি হবেই।

হাজত থেকে বের হবার পর থেকেই বাসসাম বলছিল, শরীরটা বেশ ম্যাজম্যাজ করছে। কিন্তু সন্ধ্যা নাগাদ এই ‘ম্যাজম্যাজ’ রীতিমতো ঘোরতর জ্বরের রূপ নিল। মাঝরাতে কোনোভাবে অ্যাপার্টমেন্টের আবাসিক ডাক্তার স্যামকে নিয়ে এলাম। বাসসামের অবস্থা দেখেই তিনি তাকে কোনো হসপিটালে নেয়ার নির্দেশ দিলেন। ডাক্তারের মতে তাকে টাইফয়েডে জেঁকে ধরেছে।

পরদিন সকালে বাসসামকে আমি হসপিটালে যাওয়ার কথা বললাম। কিন্তু সে তাতে আপত্তি করল। তবুও আমি তাকে হসপিটালে ভর্তি করাতে নিয়ে গেলাম। বাসসাম লাগাতার ‘না, না‘ করতে থাকল।‌ সামনের মাসে আমাদের দুজনের‌ই সেমিস্টার-ফি জমা দিতে হবে, তাই চাকরি কামাই দেয়া যাবে না।‌ কিন্তু আমি ধমক দিয়ে তাকে চুপ করিয়ে দিলাম। ভেতরে ভেতরে যদিও ফি ও অন্যান্য খরচাদির চিন্তা আমিও করছি। 

বাসসামকে হসপিটালে রেখে, এসব নয়-ছয় ভাবতে ভাবতে ভার্সিটিতে পৌঁছালাম আমি‌। পার্কিং লটে ইহুদি ছেলেদের গ্রুপ যার যার বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। 

‘হেই আয়ান, শোনো! কী ভাবছ? কিছু টাকাপয়সা কামাবে? মাসে প্রায় এক হাজার ডলার,’ আমাকে লক্ষ করে প্রস্তাব করল মাইকেল।‌ আমি ওকে পাত্তা দিলাম না। অবজ্ঞার চোখে তার দিকে তাকালাম।

‘কেন, তোমরা কি কোনো খাযানা পেয়ে গেছ?’ 

এবার জবাব দিল স্যাম, ‘হ্যাঁ, মনে করো তাই। তুমি তো এমনিতেই টাকাপয়সা কামাতে বাজি ধরে ঘুরে বেড়াও‌। মনে করো আমরাও একটা বাজি দিলাম।’

‘আমার কাজটা কী?’

‘কাজটা তেমন বিশেষ কিছু না। তোমাকে শুধু মুসলিম কাউন্সিলর আমের বিন হাবিবের গ্রুপটা ভাঙতে হবে। গ্রুপ ভাঙার আগ পর্যন্ত তুমি তাদের গ্রুপে মিশে থাকবে, আমাদের কাছে খবরাখবর পাচার করবে⏤তারা কখন কী করে? মিটিংয়ে কী কী সিদ্ধান্ত নেয়?⏤এইসব‌‌। 

তাছাড়া তোমার তো এমনিতেই ওই গ্রুপের বাবর সাইয়্যেদির সাথে দাও-কুমড়ার সম্পর্ক! আমাদের কাজটা করলে তুমি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে পারবে। 

কথা দিচ্ছি, সময় এলে বাবরের বিরুদ্ধে আমরা তোমাকে সবরকম সাহায্য করব। বলো, আমাদের প্রস্তাবে রাজি?’ 

আমি মাইকেলের বাড়ানো বন্ধুত্বের হাতটির দিকে গভীরভাবে তাকালাম। ভাবলাম, ‘কুদরত হয়তো আমার সমস্যার সমাধান খুঁজে দিয়েছে!’

চলবে…

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *