ক্ষমতার অমোঘ চক্র এবং সেইসব পুরাতন প্রশ্ন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় ‘সিংহাসনের মনস্তত্ত্ব’ নিয়ে গবেষণা হয়েছে কি না জানি না। যে-ই এই মসনদের লঙ্কায় যায়, সে-ই রাবন হয়ে ওঠে—এটি আমাদের শাসনতান্ত্রিক ব্যর্থতার এক দীর্ঘশ্বাস। লোকে বলে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল একজন শাসকের বিদায় নিশ্চিত করেনি, বরং তা দীর্ঘদিনের স্থবির রাষ্ট্রকাঠামোকে এক সজোর ধাক্কা দিয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই যে রাজাদের আসা-যাওয়ার মিছিল, সেখানে রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রের কোনো পরিবর্তন কি আদৌ ঘটে? না কি কেবল নামফলক বদলের উৎসবে আমরা আসল সংস্কারের কথা ভুলে যাই?

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, ক্ষমতা কখনো শূন্যস্থান পছন্দ করে না। যখনই কোনো প্রবল প্রতাপশালী ‘রাজা’ বা শাসক জনরোষের মুখে বিদায় নেন, তখন সেই শূন্যস্থান পূরণে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। আমাদের সমকালীন প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই শূন্যতা পূরণের এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব কাঁধে নেয়।

সঙ্গে সঙ্গে একটা দার্শনিক সংকট দেখা দেয়। তা হলো, দীর্ঘকাল ধরে আমরা এমন এক শাসনব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, যেখানে শাসক নিজেকে জনগণের সেবক নয়, বরং ‘রাজা’ হিসেবে কল্পনা করতে পছন্দ করেন। এই ‘রাজকীয় মনস্তত্ত্ব’ যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষ কেবল প্রজা হিসেবে গণ্য হয়—তেমন বলা ভুল, বরং প্রজা হতে পছন্দ করে। এবারের অভ্যুত্থান কি সেই প্রজাসুলভ মানসিকতা থেকে আমাদের মুক্তি দিতে পেরেছে? আমার মনে হয় না। বরং আমাদের এ এক রাজকীয় উত্তরাধিকার।

বাদ দিন। আমরা গোড়া থেকে কড় গুণে গুণে কয়েকটা প্রশ্ন করি।

কে এই পরিবর্তন এনেছে?

উত্তর স্পষ্ট : এ দেশের অকুতোভয় ছাত্র-জনতা।

কী চেয়েছে তারা?

কেবল এক ব্যক্তির বিদায় নয়, বরং কাঠামোগত সংস্কার।

কখন এই আকাঙ্ক্ষা তীব্র হলো?

যখন নিয়মিত চলে আসা জুলুম আর লুটতরাজের সঙ্গে ভোটাধিকার হরণ এবং মতপ্রকাশের পরাধীনতা যুক্ত হলো।

কোথায় এর প্রতিফলন দেখা গেল?

রাজপথ থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিটি কোণায়।

কেন এই গণবিস্ফোরণ?

কারণ, মানুষ আর ‘রাজা-প্রজা’ সম্পর্কের শৃঙ্খলে থাকতে চায়নি।

এবং কীভাবে এই নতুন পথচলা শুরু হলো?

একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার মাধ্যমে, যা রাষ্ট্রকে মেরামত করার ম্যান্ডেট পেয়েছে।

***

এটা সবাই জানে, এই চক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন ‘ইনস্টিটিউশনাল রিফর্ম’ বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। দর্শন বলে, ব্যক্তি নশ্বর কিন্তু প্রতিষ্ঠান অমর। যদি আমরা স্বাধীন বিচার বিভাগ, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন এবং পেশাদার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গড়ে তুলতে না পারি, তবে ক্ষমতার এই পালাবদল কেবল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ছাড়া আর কিছুই হবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই সময়টা ছিল তাই কেবল তদারকি শাসনের নয়, বরং রাষ্ট্রের ডিএনএ পরিবর্তনের সময়।

একটি রাষ্ট্র যখন দীর্ঘ সময় ধরে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনে বন্দি থাকে, তখন তার প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ে। গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, ক্ষমতার পালাবদল মানে কেবল এক দলের পরিবর্তে অন্য দলের আধিপত্য।

কিন্তু ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান একটি মৌলিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে : আমরা কি কেবল ‘রাজা’ বদলাতে চেয়েছি, নাকি ‘রাজতন্ত্রের’ প্রেতাত্মা থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে চেয়েছি? অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বর্তমান সময়টি ছিল মূলত সেই সন্ধিক্ষণ, যেখানে দাঁড়িয়ে আমাদের নির্ধারণ করার কথা—আমাদের বাংলাদেশ কি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর, নাকি তার প্রকৃত মালিক সাধারণ নাগরিক।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের ভাষায়, রাজনৈতিক উন্নয়নের প্রধান শর্ত হলো প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি। অথচ আমাদের দেশে দীর্ঘকাল ধরে প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির অনুগত করার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলেছে। যখন বিচার বিভাগ, প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো নির্দিষ্ট ‘রাজার’ ইচ্ছাপূরণের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটে।

গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সংস্কার কমিশনগুলো গঠন করেছে, তা এই প্রাতিষ্ঠানিক পচন রোধের একটি তাত্ত্বিক প্রচেষ্টা ছিল মাত্র। কিন্তু এই সংস্কার কি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা রাষ্ট্রের ডিএনএ-তে পরিবর্তন আনতে পারবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। নির্বাচন পরবর্তী বর্তমান সরকারের সময়ে এসে আমরা কী পরিবর্তনের কোনো আলামত দেখছি?

তাহলে আসুন, আবার একটু হিসাব করে দেখি :

কেন এই সংস্কার অপরিহার্য?

কারণ, অতীতের বিভীষিকা আমাদের শিখিয়েছে যে, ক্ষমতার ভারসাম্য (চেক অ্যান্ড ব্যালান্স) না থাকলে যেকোনো নির্বাচিত সরকারই স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে।

কী ধরনের সংস্কার আমরা চাই?

এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে।

কীভাবে তা সম্ভব?

সংবিধানের আমূল পরিবর্তন কিংবা দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ বা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে।

কার মাধ্যমে এই পরিবর্তন আসবে?

কেবল সরকার নয়, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা এবং জনগণের অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকার মাধ্যমে।

কোথায় এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে?

সচিবালয় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে।

এবং কখন এর সঠিক সময়?

এখনই, কারণ ইতিহাসের এই মাহেন্দ্রক্ষণ বারবার আসে না।

***

ফরাসি দার্শনিক জঁ-জাক রুশো ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ বা সামাজিক চুক্তির কথা বলেছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের নতুন একটি সামাজিক চুক্তিতে উপনীত হওয়া প্রয়োজন। যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং নাগরিক তার মৌলিক অধিকারের বিনিময়ে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকবে।

কিন্তু যখন রাষ্ট্র নিজেই নাগরিকের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই চুক্তির অবসান ঘটে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সেই ছিঁড়ে যাওয়া চুক্তিটি পুনরায় মেরামত করা। তারা পারেননি, তাতে করে চ্যালেঞ্জটা বর্তমান সরকারের ওপর এসে পড়েছে। বা বলা যায়, নাগরিক হিসেবে আমাদের ওপর রয়েই গেছে।

অনেকের প্রশ্ন হলো, পেটের দায় সারব নাকি রাষ্ট্রসংস্কারে মনোযোগ দেব?

একটি রাষ্ট্র যখন দীর্ঘ সময় ধরে কেবল গুটিকয়েক ‘রাজন্যবর্গে’র খামখেয়ালিতে পরিচালিত হয়, তখন তার অর্থনীতি ক্রমে মুষ্টিমেয় মানুষের লুণ্ঠনক্ষেত্রে পরিণত হয়। ইতিহাসের অমোঘ সত্য হলো—সিংহাসনের রদবদল যত দ্রুত ঘটে, সাধারণ মানুষের বাজারের ব্যাগের দৃশ্যপট তত দ্রুত বদলায় না।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো : রাষ্ট্র সংস্কারের উচ্চমার্গীয় আলোচনার পাশাপাশি যখন সাধারণ নাগরিকের ডাল-ভাতের সংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন ‘সংস্কার’ কথাটা এক নিষ্ঠুর বিদ্রূপের মতো শোনায়।

অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের ভাষায়, দুর্ভিক্ষ বা সংকট কেবল সম্পদের অভাব নয়, বরং বণ্টনের অসাম্যের ফল। গত এক দশকে বাংলাদেশে যে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা স্বজনতোষী পুঁজিবাদ জেঁকে বসেছিল, তার শিকড় উপড়ে ফেলা ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। তারা একটু-আধটু চেষ্টা করলেও সিরিয়াস ঝুঁকি নিতে রাজি হননি।

যখন ব্যাংকগুলো রিক্ত হয় এবং অর্থপাচারের মহোৎসব চলে, তখন সেই ক্ষত মেরামত করা কেবল প্রশাসনিক আদেশের বিষয় নয়, বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দর্শনের দাবি রাখে।

নতুন ক্ষমতার এই শুরুলগ্নেই যদি সিন্ডিকেট আর মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বাধা না পড়ে, তবে মানুষের মনে এই ধারণা জন্মানোটাই স্বাভাবিক যে—কেবল ‘রাজা’ বদলেছে, কিন্তু শোষণের রাজত্ব রয়ে গেছে আগের মতোই।

যেকোনো সংস্কারের আগে অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দিতে হবে জনসাধারণকে। এই নিশ্চয়তাই একটা সংস্কার। অর্থনৈতিক সংস্কার সামনে রেখে প্রশ্ন করি :

কেন অর্থনৈতিক সংস্কার জরুরি?

কারণ, পেটের ক্ষুধা মেটাতে না পারলে কোনো রাজনৈতিক সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

কী ধরনের পরিবর্তন প্রত্যাশিত?

বাজার তদারকি থেকে শুরু করে ব্যাংকিং খাতের আমূল সংস্কার।

কীভাবে তা সম্ভব?

জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং শ্বেতপত্র প্রকাশের মাধ্যমে লুণ্ঠনের প্রকৃত চিত্র উন্মোচন করে।

কার ওপর এই দায়িত্ব?

বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর পেশাদারিত্বের ওপর।

কোথায় এর প্রতিফলন দরকার?

সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়, টিসিবির ট্রাকের সামনে কিংবা কাঁচাবাজারের মূল্য তালিকায়।

কখন এর সমাধান প্রয়োজন?

কালক্ষেপণ না করে এখনই, কারণ জনআকাঙ্ক্ষার ধৈর্য অসীম নয়।

***

জন লকের রাজনৈতিক দর্শনে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার এবং জীবনের নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যখন রাষ্ট্র নিজেই নাগরিকের আয়ের ওপর অন্যায় করের বোঝা চাপায় কিংবা মুদ্রাস্ফীতির জাঁতাকলে সাধারণকে পিষ্ট হতে দেয়, তখন সেই রাষ্ট্র তার নৈতিক ভিত্তি হারায়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এমন এক অর্থনৈতিক মডেল দাঁড় করানো, যেখানে উন্নয়নের নামে কেবল পরিসংখ্যানের জাদুকরী দেখানো হবে না, বরং প্রতিটি নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতা ও মর্যাদা সুরক্ষিত থাকবে। রাজা বদলের উৎসবে যদি দরিদ্র আরও দরিদ্র হয়, তবে সেই পরিবর্তন কেবল প্রসাধন হিসেবেই গণ্য হবে।

তারা কি তা পেরেছে? চেষ্টা খানিক করেছে। কিন্তু পারেনি। সুতরাং এই দায় রয়ে গেছে বর্তমান সরকারের ওপর এবং নাগরিক হিসেবে আমাদের ওপর।

ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় দেখা গেছে, কোনো গণঅভ্যুত্থানই কেবল ক্ষণস্থায়ী আবেগের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে না। চব্বিশের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মূল নির্যাস ছিল—বৈষম্যহীনতা। তখন প্রচ্ছন্নভাবে এক ধরনের হতাশা কাজ করেছে যে, ক্ষমতার পালাবদল মানেই কেবল নতুন কোনো শোষকের আবির্ভাব কি না।

এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালটি আমাদের সামনে সেই বৃত্ত ভাঙার এক বিরল সুযোগ এনে দিয়েছিল। প্রশ্ন হলো, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা কি কেবল শাসনের নাম পরিবর্তন করেছি, নাকি শাসনের চরিত্র বদলাতে সক্ষম হয়েছি? এক কথায় বলা যায়, খানিকটা চেহারা বদল হয়ে পুরানো শাসনই চলেছে।

জন রলসের ‘ন্যায়বিচার তত্ত্ব’ অনুযায়ী, একটি সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থার ভিত্তি হতে হবে এমন এক কাঠামো, যেখানে সুযোগের সমতা নিশ্চিত থাকে। আমাদের দেশে দীর্ঘকাল ধরে যে ব্যবস্থার চর্চা হয়েছে, সেখানে রাষ্ট্র এক ধরনের ‘পুরস্কার’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বিজয়ীদের জন্য।

যে দল ক্ষমতায় আসে, রাষ্ট্রের প্রতিটি সম্পদ তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে ওঠে। এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসাই হলো বর্তমান সময়ের প্রধান দার্শনিক লড়াই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এমন এক আইনি এবং কাঠামোগত রক্ষাকবচ তৈরি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ‘রাজা’ চাইলেই পুনরায় একনায়কতন্ত্রের পথে হাঁটতে না পারেন।

এবার তাহলে শেষ প্রশ্নগুলো করি :

কেন এই পরিবর্তন স্থায়ী হওয়া প্রয়োজন?

কারণ বারবার রক্ত দিয়ে রাষ্ট্র মেরামতের বিলাসিতা করার সামর্থ্য আমাদের নেই।

কী আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য?

এমন এক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের কণ্ঠস্বর সমান গুরুত্ব পাবে।

কীভাবে তা অর্জন সম্ভব?

স্বাধীন কমিশনগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সুগম করে।

কার ওপর এই স্থিতিশীলতার ভার?

রাজনৈতিক দলগুলোর শুভবুদ্ধি এবং নাগরিক সমাজের অতন্দ্র প্রহরী হওয়ার সংকল্পের ওপর।

কোথায় এই সংস্কারের প্রতিফলন ঘটবে?

পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত প্রতিটি পরিসরে।

এবং কখন আমরা সফল হব?

যখন ক্ষমতার পরিবর্তন হবে শান্তিপূর্ণভাবে এবং রাষ্ট্রযন্ত্র কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার দাস হবে না।

***

ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্রের দর্শনে মানুষের ‘স্বাধীনতা’ ও ‘দায়বদ্ধতা’ হাত ধরাধরি করে চলে। বর্তমান বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক আজ সেই স্বাধীনতার স্বাদ যেমন পাচ্ছে, তেমনই তার ওপর বর্তেছে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের বিশাল দায়বদ্ধতা।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছিল কেবল একটি ট্রানজিশনাল পিরিয়ড বা রূপান্তরের সেতু। এই সেতু পার হওয়ার পর আমরা কোন বাংলাদেশে পদার্পণ করেছি, তা নির্ভর করছে আমাদের ধৈর্য এবং সংস্কারের প্রতি আমাদের অবিচল অঙ্গীকারের ওপর।

আমরা এমন কল্পনা আর কতদিন করব, যেখানে রাষ্ট্রের প্রধান কোনো অলঙ্ঘনীয় ‘রাজা’ হবেন না, বরং হবেন জনগণের কাছে দায়বদ্ধ একজন ট্রাস্টি বা আমানতদার। গণঅভ্যুত্থানের শহিদদের রক্ত আর সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস যেন ক্ষমতার নতুন খেলায় হারিয়ে না যায়।

‘রাজা যায় রাজা আসে’—এই চক্রের চিরস্থায়ী অবসান ঘটিয়ে আমরা যেন একটি প্রকৃত ‘প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি। সেটিই হবে এই সময়ের শ্রেষ্ঠ পর্যবেক্ষণ এবং সার্থকতা।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *