ভীষণ অসহায়বোধ আর ক্লান্ত দৃষ্টিপাতগুলো সুদূর পাহাড়ে গিয়ে শামুকের মতো লেগে থাকত। সে এক দুঃসহ, ক্লান্ত সময় ছিল সত্যি। যন্ত্রণা, ভয় আর কাতরতা হেঁচকি দিয়ে উঠত মুহূর্তে মুহূর্তে। কোথাও, কোনোখানে গিয়ে যে স্থির হব—সে সুযোগ ছিল না। অজানা আতঙ্ক গ্রাস করে নিয়েছিল পুরো সত্তা। ফলে কখনো মনে হতো একছুটে চলে যাই দেশে। সমুদ্র সাঁতরে গিয়ে ওপারে উঠি। ওখানে হয়তো আমার দেশ। আমার জন্মভূমি।
সত্যি যদি বলি, গেল বছর অভ্যুত্থান যখন শুরু হয়, তখন প্রথম ক’টা দিন নাওয়াখাওয়া ছেড়ে তো একদম স্থবির হয়ে পড়েছিলাম। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কমে এলো। আত্মীয়রা কে কোথায়, কেমন আছে?—খোঁজ পাচ্ছিলাম না ঠিকঠাক। বন্ধুদের অনেকেই তো রাজপথে, সংগ্রামে সম্মুখ সারির নেতৃত্বে ছিল—ওদের জন্য দুশ্চিন্তাটা ঠিক একটা পিণ্ডের অনুরূপ হয়ে গলায় আটকে ছিল। একদিন একেকজনের খবর পেতাম তো অন্যদিন আরেকজনের। এবং অতি অবশ্যই তা সুখকর ছিল না নিশ্চয়ই। ফলে বিকারগ্রস্তের মতো সমস্ত সময় ধরে একই দুশ্চিন্তাগুলো ঘুরেফিরে মগজটা অকেজো করে দিত।
সেসব স্মৃতির কথা আজ বছরখানেক পরে যদি লিখতে যাই, চোখদুটি ঝাপসা হয়ে আসে। নিজের অসহায়ত্বের কথা মনে পড়ে। কীভাবে দূরদেশে সেই সংকটকালে যে মানিয়ে নিয়েছিলাম—একমাত্র প্রভুই সে কথা জানেন, আর জানে আমার ব্যথিত হৃদয়। যখন মিছিলের স্লোগানগুলো কেবলই ধ্বনির মতো বেজে উঠত কল্পনায়। যখন পীড়িতের ক্রন্দনের শব্দ, কেবলই আর্তনাদ হয়ে বাজতে শ্রবণে। ইন্দ্রীয় এতটাই স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছিল—যেকোনো ছবি, বক্তব্য কিংবা সংঘর্ষের দৃশ্য দেখলে ভেতরে ঝড় উঠত। কখনো আক্রোশে শরীর কাঁপত, কখনো-বা যুদ্ধাক্ষম অসহায় সেনানীর মতো একটা হাহাকার বুকের ভেতর থেকে হুহু করে বেরিয়ে আসত।
হ্যাঁ, এ কথা বলতে দ্বিধা নেই—এই বিদেশবিভুঁইয়ে যখন আছি, তখন দেশের রাজনীতি নিয়ে অতটা মেতে থাকা বা ওই নিয়ে দিনমান ভাবনার ফুরসুত আমাদের নেই। কিন্তু যখনই একটা বিপ্লব ফুঁসে উঠেছে, যখনই কোনো আন্দোলন দানা বেঁধেছে, যখনই আমার মাতৃভূমি সার্বিকভাবে অশান্ত হয়েছে—তখনই এই হৃদয় বিদ্রোহে ফুঁসে উঠেছে। এই চোখ অজস্র অশ্রুপাত করেছে। এই জিহ্বা অসংখ্য মানুষের মাঝে দেশের প্রকৃত অবস্থার বর্ণনা দিয়েছে।
বহুদিন পরপর এসব কথা যখন ভাবি, তখন মনে হয় আমরা রাজপথে থাকতে পারিনি। আমরা মিছিলে স্লোগান আওড়াতে পারিনি। এতে আমাদের অকৃত্রিম যে বেদনাগুলো ক্রমাগত শিরা-উপশিরায়, রক্তকণিকায় বেদনার আগুন জ্বালে, এসবের পরিত্রাণ হলো আমাদের অব্যক্ত ক্রন্দনরত ভালোবাসা। প্রতিটি মুহূর্তে আমার দেশ আর সে দেশের মানুষের জন্য যে ভীষণ মায়া আমরা হৃদয়ে পুষি, যে মাটির গন্ধের জন্য বছরের পর বছর প্রতিটি দিন হাঁসফাঁস করি, সেই দেশ, মাটি ও মানুষ যেন ভালো থাকে, আমাদের বিপ্লবীরা যেন বেঁচে থাকে—আমাদের প্রার্থনা এটুকুই।
তারপর এই আরাধনা আর ভীষণ উত্তপ্ত হৃদয় ও বিপুল মগ্নতার মাঝে এতগুলো প্রাণ আর টকটকে রক্তবন্যার পর নতুন এক সূর্য উঠল বুঝি দেশে। নতুন স্বপ্ন, প্রত্যয় এবং নতুন এক দিশার দিকে আমাদের আহ্বান করে এলো অন্তর্বতর্তীকালীন সরকার। বিদেশে দেখলাম এ নিয়ে কয়েকটি পক্ষ হয়ে গেল হঠাৎ। কেউ সরকারের অগুনতি ত্রুটির উল্লেখ করল। কেউ খুলে বসল তার অতীত কর্মকাণ্ড। কেউবা সব নষ্টের দেশে তাকে মহৎপ্রাণ হিসেবেই বিবেচনা করল। ফলে ডক্টর ইউনুস কীভাবে যেন একটা মিথস্ক্রিয়া হয়ে উঠলেন প্রবাসে থাকা বাঙালি নাগরিকদের মাঝে। যদিও তার নানাবিধ কার্যক্রমে আমরা তুষ্ট নই, তবু কিছু আশ্বাস আর সদয় মানসিকতা তো তার ছিল। যা কিছু নতুনের পরিকল্পনা তৈরি ছিল, এর কিয়দাংশও যদি না ঘটে থাকে, তবু শাসকহীন এক দেশে সেই তিমির রাত্রির পর নাবিকের মতো তার মাস্তলধরা ছিল এক ইতিহাস। নইলে শাসকহীন একটি রাজ্য যে কী ভয়ংকর আর বিপর্যয়পূর্ণ হতে পারে—তা তো আমাদের সকলেরই অনুমেয়।
এসবের মাঝে বিদেশে একটা বিষয় খুব ভালোভাবেই লক্ষ্য করেছি, সেটি হলো মানুষের অস্থির মনোবাঞ্ছা। তথা দেশ ছেড়ে দূরে বসবাসরত মানুষগুলোর মনটা বড় চঞ্চল হয়ে থাকে সদা। দেশের জন্য এত এত প্রত্যশা তাদের—কখনো যা বাস্তবিক কেন্দ্রবিন্দু থেকে ছিটকে গিয়ে আবেগের দ্বারপ্রান্তে ঝুলে থাকে। এতে লাভক্ষতি তো কিছু নেই, তবে মাটির প্রতি এই মানুষগুলোর অপরিসীম মমতাবোধ আর দুশ্চিন্তা প্রকটভাবে ফুটে ওঠে। ফলে কখনো তারা প্রাণভরে ভর্ৎসনা দেয় দেশের পরিচালকদের, কখনো নিজের অদৃষ্টকে। সেসব ভর্ৎসনায় থাকে ভাষার মধুর মিতালি, আবেগের আতিশয্য। ফলে রূপকতার আশ্রয়হীন সেসব শব্দগুলো শ্রবণে কদর্য লাগলেও, অনুভূতিতে মৃদু আনন্দের স্পর্শ সন্তরণ করে যায়।
এসবের মাঝে তাদের ক্রমবর্ধমান প্রত্যশাও কখনো তুঙ্গ ছাড়িয়ে উচ্চাঙ্গে উঠে যায়। তাই তো যখন ইউনুস সাহেব ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন, অমনি তাকে বেমালুম ভুলে নির্বাচন পরবর্তী নির্বাচিত সরকারে তাদের যাবতীয় মনোযোগ নিবদ্ধ হলো। ফলে এখন তারা জনাব ইউনুসকে ছেড়ে বহুবিধ বিতর্কে লিপ্ত হয়। কখনো কর্মস্থল, কখনো-বা আবাসস্থল। যেখানেই এতটুকু ফুরসুত মেলে, রাজ্যের ঝুড়ি খুলে বসে সকলে। সেখানে পাকা ফসলের মতো ছড়িয়ে থাকে মুঠো মুঠো স্বপ্ন। অতীত আঘাতের চিহ্নগুলো তাদের কথায় বৃষ্টির মতো ঝরে ঝরে পড়ে। কত মানুষ কত কী হারিয়েছে, কত মানুষ কত কী পেয়েছে—এসবেরই এক মিশ্রিত কলরোল শোনা যায় যেকোনো সময়, যেকোনো দিন।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে এখন তাদের চোখদুটি আশায় জ্বলজ্বল করে। অনেক অনেক বেদনার রাত্রি আর করুণ দ্বিপ্রহরের পর এবার তারা একটু শান্তি চায়, বিরাম চায়। আমরা দেশে ফিরব। এমন শ্রীবৃদ্ধিসম্পন্ন ও উন্নত এক দেশে—যেখানে আমাদের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা ও পিতামাতাগণ থাকে। সেই দেশে আমাদের জন্ম। মৃত্যুও সেই দেশে। তবু কেন দুটি অন্নের আশায় সাতসমুদ্র পেরিয়ে এই বেদনার মাঝে পড়ে থাকতে হবে?
আমাদের মাতৃভূমিই হোক আমাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। প্রয়োজনে বিপ্লবে যাব। যুদ্ধের পর ক্ষত নিয়ে আমার মাটিতেই পড়ে রব। সেই মাটি থেকে উৎপন্ন হবে নতুন বিপ্লবের চারা। নতুন দেশের স্বপ্ন। আর নতুন ভোরের দেখা। তবু আমরা আমাদের মাতৃভূমিতেই প্রত্যাবর্তন করব এবার।