ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাম্রাজ্যবাদী ‍যাত্রা

অনুপ্রেরণা

খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের পড়ন্তবেলা। ইউরোপের বাজারে মশলার ব্যাপক চাহিদা। বাসি গোশতের শরীর থেকে দুর্গন্ধ দূর করতে মশলার প্রয়োজন। হররোজ তাজা গোশত কয়জনের নসিবে জুটে? ফলে মশলা ছাড়া গতি নেই। আবার অর্থবিত্তে যারা ধনী, তারাও তরকারিতে প্রচুর মশলা ব্যবহার করে। ফলে মশলা এক প্রকার স্ট্যাটাস সিম্বলও। তাই কি ধনী কি নির্ধন মশলা সবারই চাই। কিন্তু মশলার বাজার যে বেশ চড়া! ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে মশলা আসে আরব বণিকদের মাধ্যমে। ইউরোপের বাজারে সেই মশলা চড়া দামে বিকোয়। আরব বণিকদের সঙ্গে ভেনিসের ব্যবসায়ীদের পাকাপাকি চুক্তি। ওরাই মশলার একমাত্র ডিলার। একচ্ছত্র বাজার পেয়ে ওরা ইচ্ছেমতো দাম হাঁকায়। এভাবে অল্প সময়ে ভেনিস ফুলেফেঁপে ওঠে। পাশের দেশ স্পেন-পর্তুগালের তা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া যেন কিচ্ছুটি করার নেই। কারণ ইউরোপ থেকে মশলার দেশ ভারত বা ইন্দোনেশিয়া যেতে চেনাপথ দুটি : এক. মিশর হয়ে সমুদ্রপথ। দুই. সিরিয়া হয়ে স্থলপথ। উভয়টি উসমানীয় তুর্কিদের দখলে। তারা সেখানে ইউরোপীয়দের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে। মশলার দেশে যাওয়ার জন্য তাই একমাত্র উপায় নতুন সমুদ্রপথ খোঁজে বের করা।

মশলার বাজার দখলে নেওয়ার প্রয়োজন তাদের আরও একটি কারণে ছিল। ক্রুসেড যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে গেলেও ক্রুসেডের দুঃসহ স্মৃতি ইউরোপীয়রা আজও ভুলতে পারেনি। থিকথিকে ঘা এখনো সজীব, তাজা। কিন্তু মুসলমানদের সঙ্গে সম্মুখ সমরে লড়ার সাহস নেই। সহজ পথ হচ্ছে, তাদের ভাতে মারার ব্যবস্থা করা। মুসলমানদের উন্নতি ও সমৃদ্ধির গুপ্তধন বাগানোর চেষ্টা করা। ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আরব মুসলমান একচেটিয়া বাণিজ্য করছে। এই বাণিজ্যের নাটাই যদি হাতে নেওয়া যায়, তাহলে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে আসবে। এতে খ্রিষ্টধর্মের যেমন মহৎ সেবা করা যাবে, তেমনই ছোট্ট এই পর্তুগাল ইউরোপের নেতৃত্বের আসনে জায়গা করে নেবে। ভাবতেই যুবরাজ প্রিন্স হেনরি পুলকে শিহরিত হয়ে ওঠেন।

ভেবে ভেবে সময় নষ্ট না করে প্রিন্স হেনরি কাজে নেমে পড়েন। দুনিয়ার তাবৎ গাণিতিক, মানচিত্রকর, জ্যোতির্বিদ ও বণিকদের এনে জড়ো করেন লিসবনে। প্রতিষ্ঠা করেন নৌ-বিদ্যালয়। চলে জোর প্রস্তুতি। হেনরির শিষ্যরা সমুদ্রের উপকূল ধরে এগিয়ে যায় অজানা গন্তব্যের পথে। এভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র করে এক সময় গোটা আফ্রিকা মহাদেশটাই তারা আবিষ্কার করে ফেলে। স্থানীয়দের মেরে ভাগিয়ে দিয়ে তাদের মালামাল লুট করে নিয়ে আসে লিসবনে। কখনোবা জাহাজবোঝাই করে আফ্রিকানদের ধরে এনে বেচে দেয় দাসবাজারে। সংবাদ পেয়ে পোপ পঞ্চম নিকোলাস আশির্বাদ প্রেরণ করেন। ঘোষণা দেন, ভারতবর্ষ অবধি পর্তুগিজরা যা কিছু আবিষ্কার করবে, তার ওপর তাদের একচ্ছত্র অধিকার থাকবে। দুই বছর পর ১৪৫৬ সালে একই ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করেন পোপ তৃতীয় ক্যালিকেটাস। ১৪৬০ সালে হেনরি মরে গেলেও তার শুরু করে যাওয়া অভিযান থেমে যায়নি। ৮৭ সালে তারা আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ আবিষ্কার করে ফেলে। এবার ভারত সাগরের নিঃসীম জলরাশি চোখের সামনে ঝলসে ওঠে। দীর্ঘ প্রায় ৭৫ বছর ধরে যার সন্ধান চলছিল এবার বুঝি সেই গন্তব্য ধরা দিচ্ছে।

ভাস্কো দা গামার ভারত অভিযান

পর্তুগালের গ্রান্ড কাউন্সিলে বসে জরুরি পরামর্শসভা। আবিষ্কৃত নতুন পথ ধরে ভারতের সন্ধানে অভিযান পাঠানো হবে কি না, এই হচ্ছে আলোচ্য বিষয়। কেউ কেউ অজানা পথে নানা শঙ্কার কথা জানালেও রাজা ডোম ম্যানুয়েলের আগ্রহের সামনে সেসব ধোপে টেকে না। শুরু হয়ে যায় ভারত অভিযানের প্রস্তুতি। ১৪৯৭ সালের এক উৎসবমুখর দিনে যাত্রা শুরু হয় প্রথম পর্তুগিজ নৌবহরের। ভাস্কো দ্য গামার নেতৃত্বে চারটি সুসজ্জিত জাহাজ আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ঘেঁষে দক্ষিণ দিকে ঝড়-ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রম করে ভারত সাগরে এসে পড়ে। মুজাম্বিকের রাজার সঙ্গে তার সংঘর্ষ বাঁধলেও মিলিন্দির রাজা তাকে সাহায্য করে। একজন ভারতীয় বণিককে সঙ্গে দিয়ে দেয় পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ১৪৯৮-এর ২০ মে এই নৌবহর মালাবারের কালিকট বন্দরের ৮ মাইল উত্তরে একটি ছোট্ট বসতির কাছে এসে নোঙর করে।

পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, ভাস্কোর নামে কত বড় একটি মিথ্যে কথা এতদিন আমাদের গেলানো হয়েছে। উত্তমাশা অন্তরীপ আবিষ্কারে ভাস্কোর কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। ভারত সাগরে পথ খুঁজে পেতেও তার বিশেষ ভূমিকা নেই। কাজটা করে দিয়েছে এক ভারতীয় নাবিক। ভাস্কো দা গামার কৃতিত্ব এতটুকুই যে, সে প্রথম ভারতগামী পর্তুগিজ জাহাজের নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু সমুদ্রপথ আবিষ্কারে তার কোনোই ভূমিকা নেই।

মালাবার দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের একটি উপকূলীয় এলাকা। বর্তমান মানচিত্রের কেরল ও কর্নাটকজুড়ে ছিল এর বিস্তৃতি। অঞ্চলটি ছোট ছোট অনেকগুলো রাজ্য নিয়ে ঘটিত। যার অন্যতম কালিকট। ছোট হলেও রাজ্যটি অতি প্রাচীনকাল থেকেই বাণিজ্যিক অঞ্চল হিসেবে খ্যাত। প্রাচীন গ্রিস ও রোমের সঙ্গে এর বানিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। মধ্যযুগে সেই সম্পর্কে ভাটা পড়লে নতুন করে জুড়ে আরব বণিকরা। শত শত বছর ধরে আরবরা এখানে বাণিজ্য করছে। এখান থেকে চলে যাচ্ছে চীন ও ইন্দোনেশিয়ায়। কিংবা দেশের অভ্যন্তরে সিন্ধু, গুজরাট ও করোমণ্ডলে। অনেক আরব এখানে বসতিও গড়ে তুলেছে। বাণিজ্যিক সুবিধা দেখে স্থানীয় শাসকরাও তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়েছে। ধর্মকর্ম পালনের স্বাধীনতা দিয়েছে। এছাড়া হিন্দু ও গুজরাটি মুসলিম বণিকরাও মালাবারে বাণিজ্য করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। তবে এরা সকলেই ছিল নিরেট ব্যবসায়ী। যাদের জাহাজভরতি থাকত ব্যবসায়ের মালামাল। এই প্রথম এমন একদল বণিকের আবির্ভাব ঘটল, যাদের জাহাজভরতি মাল-সামানার সঙ্গে রয়েছে সুসজ্জিত কামান!

ভাস্কো দা গামা জাহাজ থেকে নেমে কলিকটের রাজা জেমোরিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসে। কিন্তু রীতি অনুযায়ী রাজার জন্য কোনো উপঢৌকন আনেনি। রাজা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি এখানে পাথরের সন্ধানে এসেছ না মানুষের? তবে মহানুভব রাজা তাদের ব্যবসার অনুমতি দিয়ে দেন। কিন্তু বাজারে পসরা সাজিয়ে বসার পর ভাস্কো দেখেন, তার মালামাল কেউ কিনছে না। এ দেশে আসার পর থেকে ভাস্কোর কিছুই ভালো যাচ্ছে না। ধারণা করেছিল ভারতের অধিবাসী সকলেই খ্রিষ্টান। এসে দেখে বেশিরভাগই হিন্দু। তার ওপরে আরব মুসলমানদের সঙ্গে তাদের রয়েছে সম্প্রীতির সম্পর্ক। এসব নিয়ে সে যখন দিশেহারা তখন তার জন্য নতুন দুঃসংবাদ হয়ে আসে, তার আমদানিকৃত পণ্যের বাজারহীনতা। এসব মানহীন জিনিস কেউ  ছুঁয়েও দেখছে না। ভাস্কো অপারগ হয়ে রাজার কাছে অভিযোগ দায়ের করে। রাজা পুনরায় মহানুভবতার পরিচয় দিয়ে তার মালামাল নিজেই কিনে নেন। এদিকে চতুর ভাস্কো এক তিউনিসিয় আরবের মাধ্যমে বাজারচাহিদা সম্পর্কে ধারণা নেয়। এরপর রাজার সঙ্গে ঝামেলা বাধিয়ে এবারের মতো স্বদেশে ফিরে যায়। প্রায় দুই বছরের ‘সফল’ এই অভিযান শেষে দেশে ফিরলে তাদের বিপুল আয়োজনের মাধ্যমে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

দ্বিতীয়বার আলভারেজ ক্যাব্রালের নেতৃত্বে ১৩টি জাহাজ বোঝাই ১৫০০ সৈন্যের আরেকটি জাহাজ পাঠানো হয়। মাঝপথে নানা কারণে জাহাজ কমতে কমতে শেষে ৬টি এসে কালিকট বন্দরে নোঙর করে। ক্যাব্রাল জামোরিনের কাছে ফেক্টরি তৈরির অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিয়ে দেন। কিন্তু শান্তিপ্রিয়তা ওদের স্বভাবে ছিল না। অল্পদিনে স্থানীয়দের সঙ্গে ঝামেলা বেঁধে যায়। ক্যাব্রাল কালিকটের ওপর গোলাবর্ষণ শুরু করে। রাজা ৮০টি জাহাজ তার মোকাবেলায় পাঠালে ক্যাব্রাল টিকতে না পেরে ভেগে যায়। পরেরবার ভাস্কো দা গামার নেতৃত্বে আরেকটি বহর আসে কালিকট বন্দরে। এটি ভাস্কোর দ্বিতীয় এবং পর্তুগিজদের তৃতীয় অভিযান। এই অভিযান ছিল অত্যন্ত নৃশংস। পথে যত আরব জাহাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় সবগুলোতে তারা লুণ্ঠন চালায়। এরপর গোলা মেরে উড়িয়ে দেয়। হজযাত্রীরাও তাদের থেকে রক্ষা পায়নি। জাহাজজুড়ে লুটপাট চালিয়ে তারা গোটা জাহাজ জ্বালিয়ে দেয়। কালিকটে এসে তারা রাজার কাছে আরব বণিকদের তাড়িয়ে দেওয়ার অদ্ভুত দাবি জানায়। রাজা সম্মত না হলে বাঁধে যুদ্ধ। এবার কালিকটে ব্যবসা করতে আসা হিন্দু-মুসলিম সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়ায়। কালিকটের নৌসেনাপতি কাশিমের রণনৈপুণ্যে ভাস্কো শোচনীয় পরাজয় বরণ করে এবং ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যায়। এরপর আর সে ওমুখো হওয়ার খায়েশ করেনি।

তবে পর্তুগিজদের খায়েশ কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। তারা কালিকটরাজের সঙ্গে একের পর যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ওসব যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত না হলেও কালিকট বন্দর তারা দখলে নিতে পারেনি, তবে সমুদ্রে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করে ফেলে। ১৫১০ সালে পর্তুগিজরা গোয়া থেকে নির্মম নির্যাতন করে মুসলমানদের হটিয়ে গোয়া দখল করে নেয় এবং উপনিবেশ স্থাপন করে। তাদের বিজয়ে খুশি হয়ে পার্শ্ববর্তী রাজ্য বিজয়নগরের রাজা কৃষ্ণদেব রায় নিজ রাজ্যের ভাটকালে তাদের কুঠি স্থাপনের অনুমতি দেয়। পর্তুগিজরা সমুদ্র-তীরবর্তী গোয়া অঞ্চলে বাণিজ্যিক ঘাঁটি তৈরি করে। কালে কালে এটিই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান বাণিজ্যঘাঁটি।

ইন্দোনেশিয়ায় বাণিজ্য বিস্তার

ভারতে ব্যবসা জমে ওঠার পর এবার তাদের দৃষ্টি পড়ে মশলার স্বর্গরাজ্য প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জের দিকে। যার আধুনিক নাম ইন্দোনেশিয়া। গুজরাটের মুসলমান ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষ ইসলাম সম্পর্কে জানতে পারে। বাণিজ্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সেখানে বিস্তার লাভ করে ইসলাম। ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপগুলো পরিণত হয়েছে মুসলিম রাজ্যে। ১৫১১ সালে পর্তুগিজরা ইন্দোনেশিয়ার মালাক্কা বন্দর দখল করে। আরব মুসলমানদের জাহাজগুলো পুড়িয়ে দিয়ে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে। স্থানীয় অধিবাসী, হিন্দু ও অন্যান্য ভারতীয় বণিকরা ছিল নীরব দর্শক। কারণ পর্তুগিজরা ঘোষণা দিয়েছিল, আমাদের দুশমনি শুধুই আরব মুসলমানদের সঙ্গে। ফলে অন্যরা কেউ তাদের বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। বরং একটি শক্ত ব্যবসায়ীক প্রতিপক্ষের পরাজয় দেখে খুশিই হয়েছিল। তারা বোঝেনি, নিরীহ প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে তারা স্বাগত জানাচ্ছে এক নির্মম নৃশংস শত্রুকে। যে কোনোরকম প্রতিদ্বন্দ্বিতাই চায় না, চায় একচেটিয়া দখলদারিত্ব। ধীরে ধীরে গোটা ইন্দোনেশিয়া ও ভারত কবজায় নিয়ে তারা একচেটিয়া মশলার বাণিজ্য চালিয়ে যায়। তাদের সপক্ষে ছিল রোমের পোপের ফরমান। যে ফরমান মতে, এসব অঞ্চলে অন্য কোনো ইউরোপিয়ান শক্তির বাগড়া দেওয়ার অধিকার নেই।

পুরো ষোড়শ শতাব্দী ধরে পর্তুগিজরা ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একচেটিয়া ব্যবসা করে। এর প্রভাব পড়ে কালিকটের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থায়। রাজনৈতিক প্রভাব ছিল নেতিবাচক। কালিকটের রাজা চাচ্ছিলেন মালাবারের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোকে একত্র করে একটি শক্তিশালী মালাবার রাজ্য গড়ে তুলবেন। পর্তুগিজদের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তবে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য মালাবারের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে। আরব বণিকদের ভায়া হয়ে ইউরোপে মশলা যেত বলে বাজারে এর দাম ছিল চড়া। পর্তুগিজরা সরাসরি বিক্রি শুরু করলে ইউরোপীয়রা কিছুটা কম দামে মশলা পেতে থাকে। ফলে বিক্রি বেড়ে যায় কয়েক গুণ। চাহিদা বৃদ্ধির কারণে জোগানও বাড়াতে হয়। মালাবারজুড়ে মশলা উৎপাদনের হিড়িক পড়ে যায়। সকল পতিত জমি আবাদ হয়ে ওঠে। পর্তুগিজদের অনেকে মালাবারে বসতি গড়ে তোলে। নতুন নতুন শহর প্রতিষ্ঠা হয়। সেখানে স্কুল-কলেজ স্থাপিত হয়। এসব বিদ্যায়তনে লাতিন ও পর্তুগিজ ভাষা শিক্ষা দেওয়া হতো। তাদের জীবনধারারও প্রভাব পড়ে স্থানীয়দের মধ্যে।

নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী ওলন্দাজ

খ্রিষ্টীয় ১৬ শতকে ইউরোপের ধর্মীয় অঙ্গনে এক বিপ্লব ঘটে যায়। মার্টিন লুথারের নেতৃত্বে পোপতন্ত্রের বিরুদ্ধে চালু হয় নতুন এক খ্রিষ্টীয় মতবাদ। ইতিহাস যাকে প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ নামে চেনে। তাদের কাছে রোমের পোপের কোনো মর্যাদা নেই। মূল্য নেই পোপের দেওয়া ফরমানেরও। এই নতুন মতবাদে বিশ্বাসী খ্রিষ্টান সম্প্রদায় এবার নিজেরাও ভারতে আসার পথ খুঁজতে শুরু করে। পর্তুগিজদের থেকে লুকিয়ে কিছুটা জোর করে তারা ভারতের সমুদ্রপথ উদ্ধার করে ফেলে। ষোড়শ শতকের শেষ এবং সপ্তদশ শতকের শুরুরদিকে ডাচ, ইংরেজ ও ফরাসিরাও ভাগ্য পরীক্ষার জন্য  ভারতীয় উপকূলে এসে ভিড় করে।

হল্যান্ড থেকে প্রথম বাণিজ্যজাহাজ ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করে ১৫৯৫ সালে। প্রথম যাত্রায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও মশলা বিক্রি করে তারা প্রচুর লাভবান হয়। পরে ১৬০২ সালে তারা ইউনাইটেড ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠন করে পুনরায় ইন্দোনেশিয়ায় আসে। সরকার থেকে এই কোম্পানিকে সন্ধি-মৈত্রী, বিভিন্ন অঞ্চল জয় ও দুর্গ তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়। সেই অনুমতির ভিত্তিতে তারা সম্রাট জামোরিনের সঙ্গে সন্ধি করে মালাবার ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে পর্তুগিজদের তাড়ানোর ব্যবস্থা করে। ইন্দোনেশিয়ায় পর্তুগিজদের অবস্থান এমনিতেই নড়বড়ে ছিল। সহজেই তাদের সেখান থেকে ভাগিয়ে দেয়। এরপর ধীরে ধীরে ভারতেও তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে থাকে।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

১৫৯৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। ব্রিটেনের টেমস নদীর তীরে ফাউন্ডার্স হলে বসেছেন লন্ডনের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। রাজনীতিবিদ আছেন, ব্যবসায়ী, জাহাজের ক্যাপ্টেন, নাবিক, সৈনিক এবং শ্রমিকরাও রয়েছেন। ভারত-ভ্রমণের পূর্ব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রালফ ফ্লিচ এবং ল্যাঙ্কাস্টার জেমসকেও দেখা যাচ্ছে। গুরুগম্ভীর এই সভার আলোচ্য বিষয় প্রাচ্যদেশে ব্যবসার জন্য কোম্পানি গঠন করা। আলোচনা-পর্যালোচনা, প্রস্তাব-প্রত্যাখ্যান ও তর্ক-বিতর্ক শেষে সকলে ঐকমত্যে পৌঁছেন। কোম্পানি গঠনের অনুমোদন ও সুযোগ-সুবিধা চেয়ে সকলের সাক্ষরসহ দরখাস্ত জমা পড়ে রানি এলিজাবেথের কাছে। এক বছর পর ১৬০০ সালের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর রানী একটি শাহি ফরমানের মাধ্যমে সেই আবেদন মঞ্জুরি দেন। অস্তিত্ব লাভ করে দি গভর্নর এন্ড কোম্পানি অফ মার্চেন্টস অফ লন্ডন ট্রেডিং ইন্টু দি ইস্ট ইন্ডিজ। ডাকনাম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।

শুধু অনুমোদন নয়, তাদের এমন কিছু সুযোগ-সুবিধাও প্রদান করা হয়—যার সব হয়তো আবেদনকারীদের কল্পনাতেও ছিল না। যেমন প্রথম ছয় দফা অভিযানে শুল্ক অব্যহতির প্রতিশ্রুতি, ১৫ বছরব্যাপী একচেটিয়া ব্যবসা করার অধিকার। অর্থাৎ এর ভেতরে ব্রিটেনের অন্য কোনো কোম্পানি প্রাচ্যে ব্যবসা করতে পারবে না। সেইসঙ্গে ব্যবসার স্বার্থে স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা লাভ, নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনী সঙ্গে রাখা এবং নিজস্ব আইন প্রতিষ্ঠার অধিকার। অর্থাৎ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যে ধীরে ধীরে বণিক থেকে সাম্রাজ্যের মালিক বনে গিয়েছিল, তার বীজ প্রোথিত ছিল তার মূল গঠন-কাঠামোতেই।

১৬০১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কোম্পানির প্রথম জাহাজবহর ক্যাপ্টেন ল্যাঙ্কাস্টারের নেতৃত্বে ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করে। ৪টি জাহাজ বোঝাই খাদ্যদ্রব্য, বিয়ার, অস্ত্র, কামান ও সোনা নিয়ে তারা ইংল্যান্ড ত্যাগ করে। পরের বছর ১৬০২ সালের জুনে তারা সুমাত্রার আচেহ অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছায়। স্থানীয় সুলতান তাদের যথেষ্ট আদর-আপ্যায়ন করেন। তাদের সম্মানে ভোজসভার আয়োজন করেন। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে আগমন তাতে খুব একটা সাফল্য পাওয়া যায়নি। বাজারে খোঁজাখুঁজি করে জানা গেল, বেশিরভাগ মশলা পর্তুগিজ ও ডাচদের বায়না দেওয়া। সামান্য যা পাওয়া গেল তারও দাম বেশ চড়া। শেষে মশলাবোঝাই একটি পর্তুগিজ জাহাজ লুট করে কিছুটা শোধবোদ হয়। ১৬০৩ এর মাঝামাঝিতে তারা দেশে ফিরে আসে। লুটের মশলা বিক্রি করে ব্যাপক লাভবান হয়।

পরবর্তী ১৫ বছরে ইন্দোনেশিয়ায় ১৫টি অভিযান পাঠানো হয়। এ সময় তারা অনুভব করে, জাহাজ মেরামত ও রসদ সংগ্রহের প্রয়োজনে ভারতের ভূখন্ডে একটি ঘাঁটি দরকার। তাছাড়া মশলা কেনার জন্য রুপোর পরিবর্তে বিকল্প মাধ্যম নিয়েও ভাবতে হবে। কারণ রুপো দিয়ে মশলা কিনতে গিয়ে ব্যবসা তো হচ্ছে, কিন্তু রুপো সব চলে যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়ায়। এ সময় তারা জানতে পারে, ভারতীয় সূতি কাপড়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে ইন্দোনেশিয়ায়। যদি ভারত থেকে সূতি কাপড় নিয়ে ইন্দোনেশিয়ায় বিক্রি করা যায়, তাহলে মশলার দাম নিয়ে আর ভাবতে হবে না। তবে সবকিছুর আগে প্রয়োজন ভারতে একটি বাণিজ্যঘাঁটি। সুরাট বন্দর এরজন্য সবদিক থেকে উপযোগী। বন্দরটি নিরাপদ ও যথেষ্ট বড়। জাহাজ মেরামতেরও ব্যবস্থা রয়েছে। তাছাড়া এ অঞ্চলের কাপড়ও বেশ বিখ্যাত। টাকা-পয়সার দামও কম। কিন্তু জায়গাটি মোগল শাসনের অধীন। তাদের অনুমতি ছাড়া কিছু করা সম্ভব নয়। সুতরাং ১৬০৮ সালে স্যার উইলিয়াম হকিন্সকে মোগল দরবারে পাঠানো হয় সুরাটে ফ্যাক্টোরি বানানোর অনুমতি সংগ্রহের জন্য। হকিন্স ১৬০৯ সালে আগ্রায় সম্রাট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন। জাহাঙ্গীর হকিন্সের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেন। তার দেওয়া হাদিয়া গ্রহণ করেন। তার সুন্দর চেহারার প্রশংসাও করেন। কিন্তু যে কাজে আসা তার কিছুই হয়নি। হকিন্সের এই দুতিয়ালি ব্যর্থ হয়।

ভারতে প্রত্যার্পন

ইন্দোনেশিয়ায় ব্রিটিশদের ১৫ বছরের অভিযান সাফল্যের বিবেচনায় ছিল মাঝারি আকারের। ডাচদের বিরুদ্ধে তারা তেমন সুবিধা করতে পারছিল না। ডাচ ইন্ডিয়া কোম্পানি যদিও গঠিত হয়েছে ব্রিটিশ কোম্পানির দুই বছর পরে, কিন্তু তারা পুঁজির সংখ্যাধিক্য এবং সেনাশক্তিতে ছিল এগিয়ে। ব্রিটিশরা তাদের সঙ্গে কোনোভাবেই কুলিয়ে উঠতে পারছিল না। ফলে তারা ইন্দোনেশিয়া থেকে ব্যবসা গুটিয়ে ভারতে স্থায়ী হওয়ার কথা ভাবতে শুরু করে। ভারতের সুতির কাপড়, নীল ও ছাপা কাপড়ের ব্যবসা তাদের কাছে অধিক আকর্ষণীয় মনে হয়। ১০১৫ সালে জেমস রো-কে পুনরায় পাঠানো হয় মোগল বাদশাহ জাহাঙ্গীরের কাছে, হকিন্সের অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার জন্য। রো জাহাঙ্গীরের জন্য বিপুল হাদিয়া-তোহফা নিয়ে আসে। যার মধ্যে ছিল বিশালাকৃতির ইংলিশ ও আইরিশ কুকুর, একটি ইংলিশ ঘোড়ার গাড়ি, রেনেসাঁ-পরবর্তী সময়ের কিছু তৈলচিত্র, পিয়ানোর মতো একটি ইংলিশ বাদ্যযন্ত্র এবং বেশ কিছু বাক্সভরতি লাল মদ, যে মদ জাহাঙ্গীর অত্যন্ত পছন্দ করতেন বলে শুনেছিলেন। এরপর ঝাড়া তিন বছর দরবারে অবস্থান করে নানা কূটনৈতিক কৌশল খাঁটিয়ে অবশেষে একটি ফ্যাক্টরি বানাবার অনুমতি পেয়েই যায়।

এই অনুমতির পেছনে অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে ১৫১১ ও ১৪ সালের দুটি যুদ্ধ। মোগলরা নানা কারণে পর্তুগিজদের প্রতি বিরক্ত ছিল। এর মধ্যে সুরাট বন্দরের নিকটে দুটি যুদ্ধে ইংরেজরা পর্তুগিজদের পরাজিত করে। মোগল সম্রাট তাদের সক্ষমতা দেখে আশ্বস্ত হন। পর্তুগিজদের বিকল্প হিসেবে তাদের প্রতিস্থাপন করার চিন্তা করেন এবং ফ্যাক্টরি গড়ার অনুমতি দিয়ে দেন। ১৫১৫ সালে তারা ইন্দোনেশিয়া থেকে ব্যবসা গুটিয়ে চলে আসে ভারতে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইন্দোনেশিয়া অধ্যায় এবং মশলার বাণিজ্যের এখানেই সমাপ্তি। তাদের পরবর্তী ইতিহাস আবর্তিত হয় ভারত উপমহাদেশকে কেন্দ্র করে।

বিভিন্ন স্থানে কুঠি নির্মাণ

জেমস রো যখন সম্রাট জাহাঙ্গীরকে মুগ্ধ করার কাজে ব্যস্ত, এসময় কোম্পানির আরেকজন দূত ক্যাপ্টেন হিপনকে পাঠানো হয় পূর্বমুখী করোমণ্ডল উপকূলে। উদ্দেশ্য বস্ত্রব্যবসা শুরু এবং মোগলদের প্রধানতম প্রতিদ্বন্দ্বী রাজ্য হীরক-সমৃদ্ধ গোলকুণ্ডার মসলিপতনমে একটি বাণিজ্যিক কুঠি তৈরি করা। এতে বেশ সাফল্য আসে। মসলিপতনমের রত্নপাথর ও ছাপা কাপড়ের ব্যবসা মশলার চেয়েও লাভজনক হয়ে ওঠে। ১৬২৬ সালে কোম্পানি করোমণ্ডল উপকূলের মধ্যবর্তী স্থান পালিকট এবং উত্তরে আরমাগনে তাদের প্রথম সুরক্ষিত ভারতীয় কুঠি নির্মাণ করে। ১২টি কামান স্থাপন করে তাকে শক্তিশালী করে তোলে। কিন্তু মাত্র ছয় বছর পর ১৬৩২ সালে তাদের কুঠিটি ত্যাগ করতে হয়।

মাদ্রাজ-বোম্বে-কলকাতা প্রতিষ্ঠা

মাদ্রাজ

এ সময় তারা দক্ষিণ ভারতের ক্ষয়িষ্ণু বিজয়নগর সাম্রাজ্যের অন্তর্গত মাদ্রাজিপতনমে ভূমি ইজারা নিয়ে সেখানে সেন্ট জর্জ দুর্গ তৈরি করে। দুর্গের চারপাশে উঁচু দেয়াল তুলে জায়গাটিকে আলাদা করে ফেলা হয়। স্থানীয় গভর্নর জায়গাটির বিকাশ ও সমৃদ্ধি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। ভেবেছিলেন কোম্পানির মাধ্যমে এটি আবাদ হবে। তাই তাদের দুর্গ তৈরি ও বিনা শুল্কে ব্যবসা করার অনুমতি দেন। স্থায়ীভাবে মুদ্রা চালু করার সুবিধাও দেন। কোম্পানি জায়গাটিকে জনবহুল করে তোলার জন্য একটি ঘোষণা জারি করে, যারাই এখানে থাকতে আসবে আগামী ৩০ বছর তাদের উৎপাদিত ফসলের কোনো শুল্ক দিতে হবে না। ধীরে ধীরে নানান জায়গা থেকে তাঁতি, কাপড় ব্যবসায়ী ও কারিগরেরা সেখানে আসতে শুরু করে। এর জনসংখ্যা গিয়ে পৌঁছে ৪০ হাজারে। কোম্পানি সেখানে বেসামরিক প্রশাসন গড়ে তোলে। এর নতুন নাম হয় মাদ্রাজ। ভারতে কোম্পানির প্রথম উপনিবেশ। সুরাট ও মুসলিপতনমে ইংরেজদের ছিল শুধু বাস করা ও ব্যবসা করার অধিকার। মাদ্রাজে তারাই জমির মালিক, তারাই রাজা! ১৬৪২ সালে মসলিপতনমের অফিস উঠে আসে মাদ্রাজে।

বোম্বে

ভারতে ব্যবসা করতে আসা ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মাঝে বাধাবাধি লেগেই থাকত। পর্তুগিজ, ডাচ, ইংরেজ ও ফরাসি প্রত্যেকেই ছিল পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রাণের শত্রু। তাদের মাঝে লড়াই প্রায়ই রক্তক্ষয়ি সংঘর্ষে রূপ নিত। ১৬৬১ সালে পর্তুগিজ ও ব্রিটিশদের মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি সফল প্রচেষ্টা সম্পন্ন হয়। ব্রিটিশ রাজা ২য় চার্লস বিয়ে করেন পর্তুগিজ রাজকন্যা ব্রেগানজার ক্যাথারিনকে। যৌতুক হিসেবে পর্তুগিজরা কোম্পানিকে বোম্বে দ্বীপ দিয়ে দেয়। অবশ্য দখল বুঝে পেতে আরও পাঁচ বছর লেগে যায় এবং ১৬৬৫ সালে তারা পাকাপাকিভাবে দ্বীপটির দখল পায়। অখ্যাত অনুন্নত এক গ্রামসদৃশ বোম্বে ধীরে ধীরে নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করতে শুরু করে। সুরাট বন্দরের গুরুত্ব কমে গিয়ে বোম্বে হয়ে ওঠে এশিয়ায় কোম্পানির সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দর এবং প্রধান নৌঘাঁটি। সুরাট থেকে ব্যবসার কেন্দ্র নিয়ে আসা হয় বোম্বেতে। ৩০ বছরের মধ্যে এর জনসংখ্যা ৬০ হাজারে পৌঁছে যায়। বাড়তে থাকে কুঠির সংখ্যা। গড়ে ওঠে নিজস্ব আইন আদালত, জমির মালিকানা সংক্রান্ত আইন ও করব্যবস্থা। স্থাপিত হয় ছোটখাটো একটি সেনানিবাসও।

কলকাতা

১৬৫৬ সালে সম্রাট শাহজাহান কোম্পানিকে বাংলায় ব্যবসা করার অনুমতি দেন। কথিত আছে, শাহজাহানকন্যা জাহানারার চিকিৎসার বিনিময়ে ব্রিটিশ চিকিৎসক গ্যাব্রিয়েল বাউটন এই অনুমোদন আদায় করে নিয়েছিল। প্রথমে হুগলি, পরে পাটনা, কাশিমবাজার প্রভৃতি স্থানে কোম্পানির বানিজ্যিক কুঠি গড়ে ওঠে। কিন্তু স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ইংরেজ ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের কারণে তাদের নানারকম হয়রানির শিকার হতে হয়। ফলে তারা মাদ্রাজ-বোম্বের অনুকরণে বাংলাতেও দুর্গ তৈরির পরিকল্পনা করে। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ান নবাব শায়েস্তা খান। কোম্পানির ডাইরেক্টর জোসিয়াহ চাইল্ড শায়েস্তা খানকে শায়েস্তা করতে ১৬৮৬ সালে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে। মোগলদের শক্তি সম্পর্কে অজ্ঞ জোসিয়ার এই পদক্ষেপ ছিল চরম নির্বুদ্ধিতার প্রকাশ। তখন মোগল সিংহাসনে ছিলেন বাদশাহ আওরঙ্গজেব। মোগলবাহিনী সদ্যই দক্ষিণ ভারতের শক্তিশালী দুটি সাম্রাজ্য বিজাপুর ও গোলাকুন্ডা বিজয় সম্পন্ন করেছে এবং মারাঠাদের পর্বতের দিকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে তারা এখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে ব্রিটিশবাহিনীকে তারা মাছি তাড়ানোর মতো করেই তাড়িয়ে দেয় এবং হুগলি, পাটনা, কাশিমবাজার ও মসলিমতনমের কুঠিগুলো দখল করে নেয়। সুরাট কুঠি বন্ধ করে দেয় এবং বোম্বে অবরোধ করে। জোসিয়াহ নিজের ভুল বুঝতে পেরে হাঁটু গেড়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করলে আওরঙ্গজেব তাদের ক্ষমা করে দেন। পরে জব চার্নক নামক আরেক কূটনীতিক অফিসার ১৬৯০ সালে বাদশা থেকে দক্ষিণ বাংলায় ফ্যাক্টরি নির্মানের অনুমতি লাভ করে। সুতানটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা নিয়ে গড়ে ওঠে কোম্পানির ক্ষমতার নতুন কেন্দ্র। শুরু হয় কলকাতা শহরের নির্মাণকাজ। পরে তাতে ফোর্ট ইউলিয়াম দুর্গ নির্মাণ করে সেই শক্তিকে কেন্দ্রীভূত করে।

বোম্বে-মাদ্রাজ-কলকাতা প্রতিষ্ঠার পর কোম্পানির ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে এই তিনটি শহর। সুরাট থেকে বোম্বে, মসলিপতনম থেকে মাদ্রাজ এবং হুগলি-পাটনা-কাশিমবাজার থেকে ব্যবসায়ীরা কলকাতায় উঠে আসে। এই তিনটি শহর পরিণত হয় কোম্পানির উপনিবেশে। এখানে কারখানার পাশাপাশি গড়ে তোলা হয় দুর্গ। চলে কোম্পানির নিজস্ব আইন-আদালত, প্রশাসনব্যবস্থা। উপনিবেশগুলোর সুশৃঙ্খল আইনি কাঠামো, বিশেষ করে চুক্তি আইন এবং সুরক্ষাব্যবস্থা দেখে দেশীয় তাঁতি, ব্যবসায়ী ও কারিগররা বিপুল আগ্রহী হয়। দলে দলে শহরগুলোতে এসে ভিড় জমায়। মোগলদের অলক্ষ্যে ভারতের ভেতরেই গড়ে ওঠে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছায়া সরকার।

চলবে…

তথ্যসূত্র

  • কোম্পানি কি হুকুমত, বারি আলিগড়ি
  • ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাস, তীর্থংকর রায়
  • দি এনার্কি, উইলিয়াম ড্যালরিম্পল, আনোয়ার ‍হোসেইন মঞ্জু অনূদিত
  • মসলার যুদ্ধ, সত্যেন সেন
  • পলাশির ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ, রজতকান্ত রায়
Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *