আমার কাছে শৈশব মানে ভাইবোনের খুনশুটি। আমি আর আমার বড় বোন পিঠাপিঠি বয়সের। একজন আরেকজনের সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে থাকতাম। স্কুল থেকে খেলার মাঠ, সবখানে ছিল আমাদের মানিকজোড় উপস্থিতি। সেই উড়ন্ত বয়সে, যখন আমি কেবল ক্লাস থ্রিতে পড়ি, একদিন আপু হুট করেই স্কুলের চারুকলা প্রতিযোগিতায় নাম লেখানোর কথা বলল। আমার মাথায় তখনো আঁকাআঁকির ভূত মাথায় চাপেনি, কিন্তু আপুর পাল্লায় পড়ে শেষমেশ নাম লিখিয়ে ফেললাম।

প্রতিযোগিতার দিন বুকটা দুরুদুরু করছিল। ছবির খাতা হাতে পেয়ে আমি আঁকলাম তিতুমীরের সেই ঐতিহাসিক বাঁশের কেল্লা, অন্যদিকে আপু আঁকল আয়াতুল কুরসি। তার হাতের অক্ষরগুলো ছিল দারুণ মায়াবী, ঠিক যেন মেহেদির নকশার মতো প্যাঁচানো আর সুনিপুণ। ফলাফল ঘোষণার আগে আমাদের সে কী উত্তেজনা! কিন্তু বিচারকরা যখন প্রথম স্থান হিসেবে আপুর নাম ঘোষণা করলেন, তখন আমার ছোট্ট মনটা কেমন কালো মেঘে ছেয়ে গেল। আপুর সঙ্গে সবখানে থেকেও আমি যেন কোথাও নেই! শিশুসুলভ অভিমান আর মনখারাপে সেদিন বুকটা ভারী হয়ে গিয়েছিল। এটা কোনোভাবেই মানতে পারছিলাম না!
তবে সেই হার মানার জেদটাই বোধহয় আমার শিল্পী হওয়ার প্রথম ইশারা ছিল। পরের বছর আমরা আবারও প্রতিযোগিতায় নাম লেখালাম। সেখানে দুজনেই কুরআনের সুরা দিয়ে ক্যালিগ্রাফি করলাম। এবার আপু প্রথম হলেও আমি হলাম দ্বিতীয়। সেই যে শুরু হলো রংতুলির সাথে আমার মিতালি, তারপর আর থামাথামি নেই। ক্যালেন্ডারের পাতা, পত্রিকার ইসলামি পেজের নকশা কিংবা বড় মসজিদের দেয়ালের টাইলস করা ক্যালিগ্রাফি—এসবই ছিল আমার প্রথম পাঠশালা। অপলক চেয়ে চেয়ে দেখতাম আর ভাবতাম, এই রেখাগুলোর ভেতরে কী গভীর এক স্তব্ধতা লুকিয়ে আছে!

স্কুল পেরিয়ে যখন মাদরাসায় পা রাখলাম, ক্যালিগ্রাফির জগৎটা আমার সামনে আরও বিশাল হয়ে ধরা দিল। বশির মিসবাহ সাহেবের সেই কুরআনিক প্রচ্ছদ—যেখানে ক্যালিগ্রাফি করা ছিল : ‘ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক’; এই আয়াতাংশটিকে মনে হতো অক্ষরের আঁচড়ে এক টুকরো স্বপ্ন। হিফজ বিভাগে পড়ার সময় শিল্পী আরিফুর রহমানের সেই চমৎকার বারো পাতার ক্যালেন্ডারটিও ছিল আমার মুগ্ধতার কেন্দ্রবিন্দু। আর কিতাব বিভাগে এসে পরিচয় হলো মোল্লা হানিফ ভাইয়ের সাথে। ব্যস, জীবনের গতিপথটাই আমূল বদলে গেল আমার। আমি বুঝলাম, ক্যালিগ্রাফি কেবল কাগজ-কালি নষ্ট করা নয়, এ এক আধ্যাত্মিক সাধনা।
মোল্লা হানিফ ভাইয়ের সাথে আমি চষে বেড়িয়েছি সারা দেশ। কোথাও তার থেকে কাজ শিখেছি, কোথাও অবাক চোখে তাঁর জাদুকরী হাতের কাজ দেখেছি। অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়ার পর একদিন তিনি আমার পিঠে হাত রেখে ভরসা দিয়ে বললেন—‘উসাইদ, এবার একলা চলো। ভয় নেই, আমি আছি।’ উস্তাদের সেই অভয়বাণী সম্বল করে শুরু হলো আমার একলা পথচলা। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

ছোটবেলা থেকে বই পড়ার প্রতি আমার দারুণ আগ্রহ ছিল। তকি উসমানি সাহেবের একটি বইয়ে পড়েছিলাম—‘জানতে হলে তোমাকে নিজস্ব গণ্ডি পেরোতে হবে।’ এ কথাটিই আমাকে ঘরছাড়া করেছে, টেনে নিয়ে এসেছে সুদূর কাতারের মাটিতে। এখানেও আমি এগিয়ে চলছি আমার স্বপ্নকে সঙ্গী করে।

আসলে ক্যালিগ্রাফি এখন আমার মগজে বসে গেছে। আজকাল অনেকেই ক্যালিগ্রাফি করেন, কিন্তু আমার কাছে এটা কেবল রংয়ের কারসাজি নয়; বরং এক ধরনের পাগলামিই মনে হয়। বিশ্বাস করি, শিল্পের পেছনে এই ঘোরলাগা পাগলামিটা না থাকলে বড় কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। কারণ আমি ক্যালিগ্রাফিকে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য হিসেবে দেখি না; এটাকে এক পবিত্র আমানত মনে করি।
আল্লাহর কালামের অক্ষরগুলো যখন রংতুলিতে ফুটিয়ে তুলি, তখন অজান্তেই হাত ঠান্ডা হয়ে আসে, মনটা ভিজে ওঠে। আমার কাজের লক্ষ্য একটাই—শুধু দেখতে সুন্দর হওয়া নয়, বরং আমার কাজ দেখে মানুষ যেন থমকে দাঁড়ায়। বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে যেন ভাবতে বাধ্য হয়। আর হরফের ভাঁজে ভাঁজে যে বেহেশতি নুর লুকিয়ে থাকে, তা যেন সরাসরি স্পর্শ করে মানুষের হৃদয়। এই নুর ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই আমার এই পথচলা। গুণিজনের দোয়া আর গুণগ্রাহীদের ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই বহুদূর!
