একজন নগণ্য শিল্পী হিসেবে আমার সবসময়ই মনে হয়—শিল্পীরা নিজেদের ভাবনার জগতে ডুবে থাকতেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। আসলে প্রতিটি মানুষই তো তার মনের বাগানের একেকজন মালী, স্বকীয় ঘরানার একেকজন শিল্পী। এর জন্য কেবল প্রয়োজন কিছুটা গভীর ভাবনা আর তা বাস্তবায়নের এক অদৃশ্য মৌন শক্তি।

ছোটবেলা থেকেই ঈদকার্ড আর কার্টুন আঁকা ছিল আমার ছবির জগতের প্রধান আকর্ষণ। ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে পড়ালেখার ফাঁকে লুকিয়ে লুকিয়ে কত যে ছবি এঁকেছি! আর সে অপরাধে বাবার হাতে কত যে মার খেয়েছি, তার কোনো হিসাব নেই।
আঁকাআঁকির জগতে আমার হাতেখড়ি হয়েছিল মায়ের হাত ধরে। স্কুলের ক্লাসের যাবতীয় ড্রয়িংয়ের হোমওয়ার্ক মা নিজেই পরম যত্নে করিয়ে দিতেন। বাকিটা আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত, যা আমি কেবল চর্চা করে গেছি। খোদাপ্রদত্ত মেধার সাথে যদি যোগ্য গুরুর সান্নিধ্য মেলে, তবে সেখানে চমৎকার কিছু সৃষ্টি হতে বাধ্য।

একটা সময়ে যখন জানতে পারলাম প্রাণীর ছবি আঁকা নিষেধ, তখন থেকেই জীবন্ত কিছুর মায়ায় জড়বস্তুর প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা শুরু করলাম। আমার পছন্দের তালিকার শীর্ষে জায়গা করে নিল মুসলিম উম্মাহর আবেগ ও ইবাদতের পবিত্র কেন্দ্র—বাইতুল্লাহ, মসজিদে নববি ও মসজিদে আকসা। এরই ধারাবাহিকতায় চলতে থাকে প্রকৃতির নানা রূপ আর বিমূর্ত (অ্যাবস্ট্রাক্ট) শিল্পের চর্চা; মাঝেমধ্যে হাত দিতাম ক্যালিগ্রাফির আঁচড়েও।

তবে ওস্তাদ ছাড়া যেকোনো কাজের মূল্যায়ন যেন কিছুটা অপূর্ণই থেকে যায়। ২০১৮ সালের কথা। তখন ঢাকা আরজাবাদ মাদরাসায় পড়ি। আমার বেশ কিছু সহপাঠী চমৎকার সব ক্যালিগ্রাফি করত। ওদের কাজ দেখে মনের ভেতর তীব্র আগ্রহ জেগে উঠল—আমিও তো পারব! কিন্তু কেন যেন অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে আমি পুরোপুরি ভরসা করতে পারতাম না। আবার সময়ের অভাবে সরাসরি কারও কাছে শেখার সুযোগও মিলছিল না। এভাবেই কেটে গেল তিনটি বছর। এই দিনগুলোয় আমার বড় বোন বুশরা আমাকে ভীষণ উৎসাহ দিত, দেখাত সঠিক পথ।

এই তিন বছরের মাথায় পৃথিবীর বুকে নেমে এলো করোনা মহামারির স্থবিরতা। অলস বসে আছি, কোনো কাজ নেই—চারিদিকে তখন হাজারো মানুষের একই করুণ দশা। ঠিক তখনই একদিন ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে নিউজফিডে ভেসে এল শ্রদ্ধেয় শিল্পী মাহবুব মোর্শেদ স্যারের ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিং কর্মশালার একটি বিজ্ঞপ্তি। আমার দুই বড় ভাই—কবি তানভীর এনায়েত এবং শিল্পী আবু উবায়দা ভাইয়ের সাথে স্যারের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা। তাঁদের মাধ্যমেই খুব সহজে পাড়ি জমালাম স্যারের কর্মশালায়। অঙ্কন শিল্পে তিনি হলেন আমার দ্বিতীয় ওস্তাদ।
আমার জেলা কিশোরগঞ্জ সদর পৌরসভায় তেমন কোনো শিল্পী না থাকায়, কোনো রকম সহযোগিতা কিংবা পরামর্শ ছাড়াই একা একা নিজের চর্চা চালিয়ে যেতে হয়েছে। কবিগুরু গেয়েছিলেন, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে…’ আমার বেলায় অবশ্য ডাক দেওয়ার মতোও কেউ ছিল না। আমার সৃষ্টির রাজ্যে আমি ছিলাম বড্ড একা। পরিবার, পড়াশোনা আর জীবনের নানা ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে অল্প অল্প করে নিজের সাধনা ধরে রেখেছি। কখনো ছবি বিক্রি করেছি, আবার কখনো কোর্স করিয়ে নিজে শিক্ষক হয়েছি। সফলতার আনন্দটুকু তাই একাই আস্বাদন করেছি। আমি একা যেমন শিখেছি, অন্যকে শিখিয়েও ঠিক তেমনেই নিজে সমৃদ্ধ হয়েছি।

এই একলা চলার পথেই একসময় সুযোগ আসে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ছাড়াও ইরান, নেপাল ও ভারতে আয়োজিত বেশ কিছু আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার। সেখান থেকে অর্জন করেছি নানা সম্মাননা ও সনদ।
আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমার পথকে অনেক সহজ করে দিয়েছেন। আজ সবার দোয়া, ভালোবাসা আর আল্লাহর অশেষ রহমতে শিল্পের আঙিনায় সম্মানজনক একটা অবস্থান তৈরি হয়েছে। নিজের শহরে এখন বেশ কিছু ছাত্র তৈরি করতে পেরেছি, যাদের বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় রয়েছে। একদিন এই অঙ্কন শিল্পকে সঙ্গী করেই আমরা পৌঁছাব সাফল্যের চূড়ায়, ইনশাআল্লাহ।
