সুফিবাদ ও জিহাদ : প্রচলিত বয়ান বনাম বাস্তবতা

সুফিবাদ নিয়ে নানা ধরনের প্রান্তিক বয়ান প্রচলিত আছে। সুফি ঘরানার বাইরে যেমন, তেমনই খোদ সুফি ঘরানার বিভিন্ন ধারা-উপধারায়ও এসব বয়ান-কেন্দ্রিক চর্চা জারি আছে। এসব প্রান্তিক বয়ানের মধ্যে একটা মোটাদাগের বয়ান হলো, সুফিবাদ ও জিহাদের বসবাস সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে। আরও খোলাসা করে বললে, সুফিবাদ কেবলই একটা ব্যক্তিপর্যায়ের আধ্যত্মিক চর্চার বিষয়। সংস্কার, বিপ্লব, সংগ্রাম ও জিহাদের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে আশ্চর্যভাবে লক্ষ্য করা যায়, সুফিবাদ-বিরোধী গোষ্ঠি যেমনভাবে এমন ধারণা বিশ্বাস করে ও প্রচার করে, তেমনই খোদ সুফিবাদের বেশকিছু ধারা-উপধারাও এমন চিন্তা-ভাবনা লালন করে। এই দুই দলই তাদের ভুল ও প্রান্তিক ধারণার প্রচারের মধ্য দিয়ে মূলত সুফিবাদের চর্চাকে সংকুচিত ও সীমাবদ্ধ করে রেখেছে।

সুফিবাদের হাকিকত, উৎস, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও সুফিদের জীবন ও ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, সুফিবাদ ও জিহাদ কেন্দ্রিক প্রচলিত বয়ান আসলে কতটা প্রান্তিক ও ভুল ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

জিহাদের হাকিকত

জিহাদ কী, জিহাদের পরিচয় কী, এ ব্যাপারে প্রাচীন ও সমসাময়িক ইসলামি স্কলারদের মতামতের খোলাসা হলো, ইলায়ে কালিমাতুল্লার জন্য শক্তি-সামর্থ্য ব্যয় করা। ইলায়ে কালিমাতুল্লাহ মানে আল্লাহর দ্বীনকে সকল কিছুর ওপর সমুন্নত রাখা। জিহাদের এই অ্যাকাডেমিক সংজ্ঞার আলোকে জিহাদের চূড়ান্ত ও প্রচলিত রূপ সশস্ত্র সংগ্রাম হলেও মূলত এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় জিহাদ। প্রকৃতপক্ষে ইসলামকে সমুন্নত রাখতে হলে শুধুমাত্র সামরিক প্রচেষ্টা ও বিজয় যথেষ্ট নয়। জ্ঞান, বুদ্ধিবৃত্তি, যুদ্ধ, ক্ষমতা, শাসন, অর্থনীতি, রাজনীতি, নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা, রাষ্ট্রব্যবস্থা, জীবনযাপন, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, প্রতিরক্ষা, সমাজব্যবস্থা, আকিদা-বিশ্বাস ও চিন্তার রক্ষণাবেক্ষণ সর্বক্ষেত্রেই ইসলামকে সমুন্নত ও বিজয়ী রাখার মধ্য দিয়েই জিহাদের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়। এই অর্থে ইসলামকে সর্বক্ষেত্রে সমুন্নত ও বিজয়ী রাখার সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টাকেই জিহাদ হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে। জিহাদের এই ব্যাপক ও বৃহৎ অর্থকে সামনে রেখেই আমাদের আজকের এই নিবন্ধ পাঠ করতে হবে।

আমরা আজকের এই নিবন্ধে দেখাব, সুফিবাদ ও জিহাদের সম্পর্ক কত গভীর ও নিবিড়। এক্ষেত্রে আমরা বেশ কয়েকজন বিখ্যাত সুফির জীবন থেকে তাঁদের সংস্কার, বিপ্লব, সংগ্রাম ও জিহাদ নিয়ে আলোকপাত করব। আশা করি এতেই আমাদের সামনে স্পষ্ট হবে, সুফিবাদের সঙ্গে জিহাদ কতটা অবিচ্ছেদ্যরূপে জড়িত।

ইমাম গাজালি রাহিমাহুল্লাহ

ইমাম আবু হামেদ মুহাম্মদ ইবনু মুহাম্মাদ আল-গাজালি (৪৫০-৫০৫ হিজরি/১০৫৮-১১১১খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন ফকিহ, উসুলবিদ, দার্শনিক ও সুফি। তাঁর সময়কালে ইসলামি বিশ্ব বহুমুখী দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নানা বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছিল গোটা ইসলামি বিশ্ব। গাজালি অবস্থান করতেন সেলজুক সাম্রাজ্যের অধীনে। তৎকালীন সেলজুক বংশধরদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই, বিদ্রোহের আগুন, বিশৃঙ্খলা ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। অপরদিকে ইসলামি বিশ্বের আরেক ঘাতক বাতেনি ফিতনার উত্থান ঘটেছিল তখন। তারা আলিম-উলামা ও সুলতানদের গুপ্ত হত্যা করে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল। আকিদাগত ফেতনাও পৌঁছেছিল চরম পর্যায়ে। তাছাড়া সেসময় চলছিল ক্রুসেড যুদ্ধ। এমন চতুর্মুখী বিশৃংখল ও যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই ইমাম গাজালি বেড়ে ওঠেন। তিনি অত্যন্ত গভীর দৃষ্টিতে সেসময়ের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।

ইমাম গাজালি একজন সুফি হলেও তিনি আত্মনিমগ্ন আধ্যাত্মিকতার চর্চা করতেন না। তিনি ছিলেন সময়, সমাজ ও রাজনীতি সচেতন একজন মনীষী। ফলে তিনি সুফিবাদ চর্চার নামে আত্মলীন হয়ে থাকতেন না। তাই আমরা দেখতে পাই, তিনি সমকালীন দার্শনিক ও আকিদাগত ফেতনার বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। লিখেছেন ইহয়াউ উলুমুদ্দিনতাহাফুতুল ফালাসিফার মতো কিতাব। বাতেনিদের মোকাবেলায় রচনা করেছেন একাধিক কিতাব। যার মধ্যে আলকিস্তাসুল মুস্তাকিম অন্যতম।

তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তাধারাও ছিল। তিনি ইসলাম এবং ক্ষমতাকে দুই জমজ মনে করতেন। একটিকে অপরটির পরিপূরক হিসেবে অভিহিত করতেন। গাজালি মনে করতেন, ন্যায় ও নিষ্ঠাপূর্ণ শাসন একটি মহান পেশা ও ইবাদত। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর শৃঙ্খলা এবং জানমালের নিরাপত্তা  নিশ্চিত করতে হলে একজন শক্তিধর সর্বজনমান্য শাসক অপরিহার্য। … তাইতো বলা হয়, দ্বীন এবং শাসন পরস্পর দুই জমজের মতো। আর‌ও বলা হয়, দ্বীন হলো ভিত্তি আর শাসক হলো রক্ষী। যার ভিত্তি নাই তা ভেঙে পড়ে। আর যার রক্ষী নেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’[1]

মোটকথা ইমাম গাজালি  কেবল একজন আত্মনিমগ্ন সুফী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সমাজ ও রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি। বাতিলের বিরুদ্ধে ছিলেন শক্তিশালী ও সোচ্চার।

শায়খ আবদুল কাদের জিলানি রাহিমাহুল্লাহ

শায়খ আবদুল কাদের জিলানি রাহিমাহুল্লাহ (৪৭০-৫৬১ হিজরি/১০৭৭-১১৬৫ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন একাধারে ফকিহ, আকিদা-শাস্ত্রজ্ঞ, সুফি ও সংগ্রামী সমাজ সংস্কারক। এই মহান মনীষীর শিক্ষাজীবন অতিবাহিত হয়েছিল বাগদাদে। তখন বাগদাদের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। রাজনীতি, চিন্তা, দ্বীন-ধর্ম-সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক অস্থিরতা ও নৈরাজ্যপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছিল।

মোঙ্গলদের আস্ফালন, ক্রুসেডারদের দৌরাত্ম চলছিল সেসময়। এক‌ইসাথে আকিদা ও ফিকহ কেন্দ্রিক মতাদর্শগুলোর মধ্যেও বিতর্ক ও বিবাদ ছিল তুঙ্গে। এছাড়াও নানান বাতিল ফিরকা ও ভ্রান্ত মতবাদের সয়লাব তো ছিল‌ই। সময়টা ছিল আব্বাসি খেলাফতের শাসনকাল। এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই তাঁর শিক্ষা জীবনের আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্তি হয়। তৎকালীন রাজনৈতিক, চিন্তাগত ও ধর্মীয়  অস্থিরতা তার মধ্যে প্রভাব ফেলেছে নিশ্চয়ই। তাই তিনি সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সংস্কার তৎপরতায় অবতীর্ণ হন।

তাঁর সংস্কার তৎপরতা ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে সমাজ ও দেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। একজন সুফি হিসেবে তিনি মানুষের অন্তরের চিকিৎসা যেমন করতেন, তেমনই সমাজ সংস্কারেও ভূমিকা রাখতেন। সপ্তাহে তিনদিন তিনি মানুষকে নসিহত করতেন। তাঁর এই নসিহতের মজলিসে সর্ব শ্রেণির মানুষ সমবেত হতো। ধনী-গরিব, সাধারণ জনতা, রাজা-বাদশাহ, এমনকি অমুসলিমরাও উপস্থিত হতো। তাঁর এই নসিহত অনেক মানুষের জীবন পারটে দিয়েছিল। বহু অত্যাচারী শাসক পরিণত হয়েছিলেন ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু শাসকে। চোর, ডাকাত, দস্যু ও ভয়াবহ রকমের অপরাধীও তাঁর নসিহত শুনে হেদায়েতের পথ অবলম্বন করত। ভ্রান্ত মতবাদে বিশ্বাসী অনেক মানুষ ফিরে আসত সঠিক পথে। হাজার হাজার ইহুদি-খ্রিষ্টান ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাঁর হৃদয়স্পর্শী নসিহতের প্রভাবে। বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদের বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন ক্ষুরধার‌। তাঁর দলিল প্রমাণসমৃদ্ধ ও বুদ্ধিভিত্তিক বিতর্কের সামনে বিভিন্ন বাতিল ফিরকা পর্যুদস্ত হয়ে যেত।

এক‌ইসঙ্গে তিনি বিপ্লবী ও জিহাদী চিন্তাও লালন করতেন। ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বাগদাদে ওয়াকফ-তহবিলের ভিত্তিতে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীরা ছুটে আসত। জ্ঞানচর্চার আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁরাও দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ত এবং একই আদলে মাদরাসা গড়ে তুলত। ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, এভাবে তাঁর মাধ্যমে এবং তার ছাত্রদের মাধ্যমে প্রায় ৪০০টি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামি বিশ্বে। এবং এই সকল মাদরাসার শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যোদ্ধাদল গড়ে উঠেছিল। তাঁদের সবার স্লোগান ছিল একটাই : আমাদের মধ্যে যতই ফিকহি মাজহাব ও চিন্তাগত ভিন্নতা থাকুক না কেন, আমাদের লক্ষ্য একটাই—ক্রুসেডারদের থেকে কুদস দখলমুক্ত করা।

কুদস বিজেতা সালাহউদ্দিন আইয়ুবি শায়খ আব্দুল কাদের জিলানির গড়ে তোলা এই বিপ্লবী প্রজন্মের সাহায্যে কুদস দখলমুক্ত করেছিলেন। মোটকথা, শায়খ আব্দুল কাদের জিলানি রাহিমাহুল্লাহ যেমন একজন সুফি ছিলেন, তেমনি ছিলেন একজন বিপ্লবী ও সংগ্রামী সমাজ সংস্কারক।[2]

মুজাদ্দিদে আলফে সানি রাহিমাহুল্লাহ

ইমামে রাব্বানি আহমদ সারহিন্দি মুজাদ্দিদে আলফে সানি (৯৭২-১০৩৩ হিজরি/১৫৬৪-১৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন মুঘল আমলের অন্যতম শীর্ষ আলেমে দীন। তিনি ছিলেন একাধারে ফকিহ, কালামবিদ ও সুফি। তিনি ছিলেন নকশবন্দিয়া সিলসিলার সুফি। তাঁর গোটা জীবনটাই ছিল সংগ্রামমুখর। প্রথমত তিনি খোদ সুফিবাদেরই সংস্কার সাধন করেন। শায়খে আকবর ইবনুল আরাবি রাহিমাহুল্লাহর ‘ওয়াহদাতুল উজুদের’ সংশোধন করে ‘ওয়াহদাতুশ শুহুদ’ ধারণার প্রবর্তন ঘটান। এর মধ্য দিয়ে সুফিবাদ বিভিন্ন চৈন্তিক ও দার্শনিক ভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়।

তিনি দর্শন ও ফালসাফাভিত্তিক সুফিবাদচর্চার প্রবণতার বিপরীতে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক বিশুদ্ধ সুফিবাদচর্চায় জোর দেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় সংগ্রাম হলো, মুঘল সম্রাট আকবর প্রবর্তিত দ্বীনে এলাহির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। এ ব্যাপারে বিশদ আলোচনা করা প্রয়োজন।

সম্রাট আকবর, দ্বীনে এলাহি ও মুজাদ্দিদে আলফে সানি

সম্রাট জালালুদ্দিন আকবর তাঁর শাসনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে একজন ধর্মপরায়ণ মুসলমান ছিলেন। তাঁর আকিদা-বিশ্বাস ছিল সহজাত ও বিশুদ্ধ। তবে তিনি নিরক্ষর ছিলেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ধারাবাহিক অভিবাসনের কারণে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এর ফলশ্রুতিতে, তাঁর চারপাশে অবস্থানকারী কিছু তথাকথিত আলেমের প্রভাবে তিনি ধীরে ধীরে ভ্রান্ত মতবাদ ও বিভ্রান্তিকর চিন্তাধারার দিকে ঝুঁকে পড়েন।

এই আলেমদের মূল উদ্দেশ্য ছিল পার্থিব স্বার্থ অর্জন। তাঁরা শাসকগোষ্ঠীর নৈকট্য লাভে সদা সচেষ্ট থাকতেন এবং নিজেদের নমনীয় ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করতেন। এর ফলে তাঁরা ইসলামের বিরুদ্ধে নানাবিধ সন্দেহ ও সংশয়ের জন্ম দিতেন এবং বিতর্কিত ও মতভেদপূর্ণ বিষয়কে সামনে এনে অভিজাতদের বিভ্রান্ত করতেন।

এর পরিণতিতে ধর্মীয় দৃঢ়তা হারিয়ে সম্রাট আকবর গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে অমুসলিমদের নিয়োগ দিতে শুরু করেন এবং হিন্দু নারীদের নিজ হারেমে অন্তর্ভুক্ত করেন। ঘনিষ্ঠ মহলের প্ররোচনায় তিনি ইসলাম ও হিন্দুধর্মের সমন্বয়ে তথাকথিত একটি নতুন ধর্ম প্রবর্তন করেন, যার নাম দেন ‘দীনে এলাহি’। এই প্রক্রিয়ায় কিছু স্থানে মসজিদ ধ্বংস করে তার পরিবর্তে হিন্দু মন্দির নির্মাণ করা হয়।

সম্রাট আকবর জনগণকে তাঁর সামনে সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে সিজদা করার নির্দেশ দেন। হিন্দুদের কাছে এটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না হলেও নিষ্ঠাবান মুসলমানদের কাছে এটি ছিল চরম আপত্তিকর। কিন্তু যারা দুনিয়াবি স্বার্থে মগ্ন ছিল এবং যারা রাজার অনুগ্রহ লাভে ব্যস্ত—এমন কিছু অসৎ আলেম এই সিজদাকে বৈধ ঘোষণা করে ফতোয়া দেন—এটি ইবাদতের উদ্দেশ্যে নয়, বরং সম্মান ও অভিবাদনের উদ্দেশ্যে।

এই প্রেক্ষাপটে ইমামে রাব্বানি শায়খ আহমদ সিরহিন্দি রাজধানী আগ্রা (আকবরাবাদ) গমন করেন এবং সম্রাটের নিকটবর্তী কিছু ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলেন—‘সম্রাট আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নাফরমানিতে লিপ্ত হয়েছেন। তাঁকে স্মরণ করিয়ে দাও—তাঁর রাজত্ব ও ক্ষমতা ভেঙে পড়বে। তিনি যেন তওবা করেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পথে ফিরে আসেন।’

যদিও রাষ্ট্রের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ইমামে রাব্বানির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং সম্রাটকে সঠিক পথে ফেরানোর চেষ্টা করেছিলেন, তবু আকবর নিজের প্রবর্তিত নতুন ধর্মে এতটাই নিমগ্ন ছিলেন যে, কোনো উপদেশই গ্রহণ করেননি।

এ সময় আকবরের জ্যোতিষীরা তাঁর শাসনের পতনের ভবিষ্যদ্বাণী করলে তিনি গভীরভাবে বিচলিত হন। একই সময়ে তিনি এক বিস্ময়কর স্বপ্নও দেখেন। এরপর তিনি ঘোষণা দেন—‘যে ইসলাম গ্রহণ করতে চায়, করুক; আর যে দ্বীনে এলাহি গ্রহণ করতে চায়, সেও করুক। কাউকে জোর করা হবে না।’

এক উৎসবে দ্বীনে এলাহির অনুসারীদের জন্য বিলাসবহুল তাঁবু স্থাপন করা হয়। দামি কাপড়, উৎকৃষ্ট খাবার ও ফলমূল দিয়ে সাজানো হয়। বিপরীতে মুসলমানদের তাঁবু ছিল সাধারণ। খাদ্য ও সামগ্রী ছিল অপ্রতুল, যা দারিদ্র্য ও বঞ্চনার চিহ্ন বহন করছিল।

ইমামে রাব্বানি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে মুসলমানদের তাঁবুতে অবস্থান নেন। এরপর তিনি এক মুঠো মাটি তুলে দ্বীনে এলাহির তাঁবুর দিকে নিক্ষেপ করেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রবল ঝড় ওঠে, যা সম্রাট আকবর ও তার অনুসারীদের চরম বিপদের মুখে ফেলে। অথচ মুসলমানদের তাঁবু সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে। এই সুস্পষ্ট ঐশী সতর্কবার্তার পর বহু রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ও সেনা কর্মকর্তা নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে ইমামে রাব্বানির মুরিদে পরিণত হন।

সম্রাট নুরুদ্দিন জাহাঙ্গীরের শাসনকালে

১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবর মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পুত্র নুরুদ্দিন জাহাঙ্গীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। এই পরিবর্তনে ইমামে রাব্বানি অত্যন্ত আনন্দিত হন। কারণ তিনি জাহাঙ্গীরকে ইসলামমুখী শাসক হিসেবে বিবেচনা করতেন।

ইমামে রাব্বানি বিভিন্ন অঞ্চলে দাওয়াত ও ইরশাদের জন্য অসংখ্য খলিফা প্রেরণ করেন। তাদের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ উপকৃত হয় এবং ইসলামের পথে ফিরে আসে। মানুষের সমাগম ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় সম্রাট জাহাঙ্গীর ইমামে রাব্বানিকে রাজধানীতে ডেকে পাঠান এবং তাঁর কিছু সুফি-পরিভাষাসম্পন্ন চিঠি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ইমামে রাব্বানির যুক্তিসংগত ব্যাখ্যায় তিনি সন্তুষ্ট হন।

তবে কিছু কুচক্রী দরবারি সম্রাটকে উসকানি দিয়ে বলে—‘এই শায়খ আপনাকে সিজদা করেন না। তাঁর বহু মুরিদ সেনাবাহিনীতে রয়েছে। তিনি বিদ্রোহ ঘটাতে পারেন।’

এর ফলশ্রুতিতে, ৫৫ বছর বয়সে ইমামে রাব্বানিকে গোয়ালিয়র দুর্গে বন্দি করা হয়। তাঁর বইপত্র, সম্পত্তি ও পরিবার বিচ্ছিন্ন করা হয়। কারাবাসের সময় তিনি বন্দিদের ইসলামের শিক্ষা দেন এবং অনেকেই তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করে। এই কষ্ট ও ত্যাগ তাঁকে আধ্যাত্মিকভাবে আরও উচ্চতর স্তরে পৌঁছে দেয়।

এক বছর পর জাহাঙ্গীর অনুতপ্ত হয়ে তাঁকে মুক্তি দেন এবং ধর্মীয় উপদেষ্টা হিসেবে পদ গ্রহণ করার প্রস্তাব দেন। ইমামে রাব্বানি কিছু শর্তে তা গ্রহণ করেন। যার মধ্যে ছিল, সিজদা প্রথা বাতিল, মসজিদ পুনর্নির্মাণ, ইসলামি আইন বাস্তবায়ন, বিদআত বিলোপ এবং ধর্মীয় কারণে বন্দিদের মুক্তি।

চার বছর তিনি সম্রাটের সঙ্গে থেকে ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজ শহর সেরহিন্দে ফিরে যান এবং সেখানেই জীবনের শেষ সময়গুলো অতিবাহিত করেন।

সাইয়িদ আহমদ বেরলবি

সাইয়িদ আহমদ বেরলবি (১২০১-১২৪৬ হিজরি/১৭৮৬-১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন একজন বিপ্লবী ও সংগ্রামী। একাধারে তিনি ছিলেন সুফি। শাহ ওয়লিউল্লাহ দেহলবি রাহিমাহুল্লাহর দুই পুত্র শাহ আবদুল কাদের দেহলবি ও শাহ আবদুল আজিজ দেহলবির সান্নিধ্যধন্য শিষ্য ছিলেন তিনি।

উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাংলা-সহ সমগ্র ভারতবর্ষকে এক সুসংগঠিত আজাদি আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল। এই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও উদ্যোক্তা ছিলেন সাইয়িদ আহমদ  বেরলবি। আর স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন শাহ আব্দুল আজিজ দেহলবি।

আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল বাংলা-ভারতে একটি অখন্ড ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তৎকালীন ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে শুরু করে মর্দান পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে তিনি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইসলামি শাসনব্যবস্থা চালু করেন। তিনি মুসলমানদের নিকট আমিরুল মুমেনিন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে অসীম সাহসের সঙ্গে লড়াই করেন তিনি।

১২৪৬ হিজরি/১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি শিখদের বিরুদ্ধে বালাকোটের ময়দানে যুদ্ধ করেন। ৭০০ সৈন্যের মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে ১০ হাজার শিখের বিরুদ্ধে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেন এবং কয়েকশত সৈন্য-সহ শাহাদাত বরণ করেন। সে যুদ্ধে শাহ ইসমাইল শহিদ‌ও শাহাদাত বরণ করেন।[3]

শাহ ইসমাইল শহিদ

শাহ ইসমাইল শহিদ রাহিমাহুল্লাহ (১১৯৩-১২৪৬ হিজরি/১৭৭৯-১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন ভারতবর্ষের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আলেম। তিনি ছিলেন সালাফি ঘরানার সুফি। তিনি সাইয়িদ আহমদ  বেরলবির হাতে বাইআত গ্রহণ করেন এবং তাঁর সঙ্গে বালাকোটের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন।

শাহ জালাল ইয়ামানি

শাহ জালাল ইয়ামানি রাহিমাহুল্লাহ (১২৭১-১৩৪১ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন তৎকালীন ভারত উপমহাদেশের বিখ্যাত সুফি। ঐতিহাসিকদের বিবরণ মতে, ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে অধুনা বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে আগমন করেন। উগ্র হিন্দুত্ববাদ-বিরোধী লড়াইয়ের অন্যতম প্রতীক মনে করা হয় তাঁকে। তৎকালীন শ্রীহট্টের (সিলেট) রাজা গৌর গোবিন্দ ছিল ভয়াবহ অত্যাচারী ও জালেম। বিশেষ করে সে অঞ্চলের মুসলিমদের প্রতি তাঁর অত্যাচার ও জুলুম ছিল ভয়াবহ পর্যায়ের। সে অঞ্চলের বুরহান উদ্দিন নামের এক মুসলিম তাঁর সন্তানের আকিকায় গরু জবেহ করলে গৌর গোবিন্দ তাঁকে অপরাধী সাব্যস্ত করে এবং এ অপরাধে তাঁর শিশু সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তৎকালীন দিল্লির সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজির কাছে পৌঁছে। সম্রাট তখন সৈয়দ নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে বিশাল বাহিনী প্রেরণের আদেশ দেন গৌর গোবিন্দকে শায়েস্তা করার জন্য। এ সময় শাহ জালাল‌ও তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে দিল্লিতে আসেন‌। এদিকে বুরহান উদ্দিন তখন দিল্লিতে অবস্থান করছিলেন‌। দিল্লিতে বুরহান উদ্দিনের সাথে শাহ জালালের সাক্ষাৎ হয়। বুরহানউদ্দিন এই নির্মম ও বেদনাদায়ক ঘটনা তাঁর কাছে বর্ণনা করেন।

শাহ জালাল দিল্লি থেকে বুরহানউদ্দিন-সহ ২৪০ জন সহচর নিয়ে সিলেটের উদ্দেশে রওনা হন। শাহ জালাল সাতগাঁও এসে ত্রিবেণীর নিকট দিল্লীর সম্রাট প্রেরিত অগ্রবাহিনী সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিনের সাথে মিলিত হন। সৈয়দ নাসির উদ্দিন শাহ জালাল সম্পর্কে অবগত হয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। পথে পথে শাহ জালালের শিষ্য বাড়তে থাকে। ত্রিবেণী থেকে বিহার প্রদেশে আসার পর আরও বেশ কয়েকজন যোদ্ধা সঙ্গী হয়। এরপর শাহজালাল তাঁর শিষ্যদের নিয়ে অলৌকিকভাবে সুরমা নদী পার হয়ে গৌরের রাজধানীতে আসেন। অত্যাচারী হিন্দুত্ববাদী রাজা গৌর গোবিন্দের বিরুদ্ধে অভিজান পরিচালনা করেন। গৌর গোবিন্দ শাহজালালের খবর পেয়ে পলায়ন করেন। এভাবে তাঁর হাতে সিলেট বিজয় হয় এবং সেখানে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

নুর কুতুবুল আলম

নূর কুতুব আলমের প্রকৃত নাম নুরুদ্দিন নুরুল হক (মৃত্যু : আনুমানিক ৮১৮ হিজরি/১৪১৫ খ্রিষ্টাব্দ)। তিনি ছিলেন মধ্যযুগের বাংলার একজন সুফি। পান্ডুয়ার পির-আউলিয়াদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশি মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তাঁর পিতা শেখ আলাউল হকও একজন পির ছিলেন। পিতার মতো নুর কুতুবুল আলম ছিলেন চিশতিয়া তরিকার পির।

তিনি সুফি হ‌ওয়ার পাশাপাশি একজন সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব‌ও ছিলেন। রাজা গণেশের ক্ষমতা দখলের পর বাংলার মুসলিমদের ওপর নির্যাতন শুরু হলে নুর কুতুবুল আলম জৌনপুরের সুলতান ইবরাহিম শর্কিকে বাংলা আক্রমণের অনুরোধ জানান। অনুরোধে সাড়া দিয়ে ইবরাহিম শর্কি বাংলার দিকে অগ্রসর হন। এর ফলে রাজা গণেশ তাঁকে অনুরোধ করেন, যাতে ইবরাহিম শর্কিকে ফিরে যেতে বলা হয়। নুর কুতুবুল আলম অমুসলিমের পক্ষে মুসলিম সুলতানকে অনুরোধে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং গণেশকে ইসলামগ্রহণের শর্ত দেন। তবে গণেশ ইসলাম গ্রহণ করেননি। তার বদলে তার পুত্র যদু ইসলাম গ্রহণ করে জালালউদ্দিন মুহাম্মদ নাম গ্রহণ করে মসনদে বসেন। এরপর ইবরাহিম শর্কি ফিরে যান। এভাবে তাঁর প্রচেষ্টায় সে অঞ্চলের মুসলিমরা জুলুম থেকে মুক্তি পায় এবং ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

দেওবন্দি ধারা

ভারত উপমহাদেশে কুর‌আন-সুন্নাহর ঐতিহ্য ও পরম্পরা ভিত্তিক বিশুদ্ধ চর্চায় সবচেয়ে অগ্রসর দেওবন্দি ধারা। ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের দিকে সম্পৃক্ত করে এই ধারাকে দেওবন্দি ধারা বলা হয়। ক‌ওমি মাদরাসা-পদ্ধতি নামেও পরিচিত এই ধারা। বর্তমানে দেওবন্দি ধারা ভারত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ধারায় কুর‌আন-হাদিসের টেক্সটভিত্তিক সুফিবাদের চর্চাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। মুজাদ্দিদে আলফে সানি ও শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি দ্বারা অনুপ্রাণিত এই ধারা।

ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানের অধিকাংশ আলেম, ফকিহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ইসলামি স্কলার ও সুফি দেওবন্দি সিলসিলায় শিক্ষা ও দীক্ষাপ্রাপ্ত। এই সিলসিলার প্রতিষ্ঠাকালীন মনীষীগণ ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—মাওলানা কাসেম নানুতুবি, রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি, শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দি, সাইয়িদ হুসাইন আহমদ মাদানি প্রমুখ। তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের প্রথম সারির ব্যক্তিত্ব। এখনো বিশ্বব্যাপী ইসলাম ও মুসলমানদের অধিকারের পক্ষে, জুলুম ও জালিমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশী সোচ্চার এই ধারার আলেমগণ। ইসলামকে নানাবিধ ভ্রান্তি, কুসংস্কার, গোমরাহি ও বিদ‌আত থেকে মুক্ত রাখতে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। সুফিবাদকে নানা দার্শনিক, চিন্তাগত, বিশ্বাসগত ও কর্মগত ভ্রান্তি, শিরক, বিদ‌আত ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত রেখে কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক বিশুদ্ধ সুফিবাদের চর্চা জারি রাখতে তাদের ভূমিকা ও প্রচেষ্টা অসামান্য।

শেষকথা

এখানে আমরা বেশ অল্পসংখ্যক সুফির জীবন আলোকপাত করেছি। বাস্তবে এই তালিকা অনেক দীর্ঘ। কিন্তু আমাদের বক্তব্য প্রমাণে এতটুকুই যথেষ্ট মনে করি।

মোটকথা, প্রকৃত সুফিবাদ কোনো আত্মকেন্দ্রিক আধ্যাত্মিকচর্চার নাম নয়। সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কার, বিপ্লব ও সংগ্রামের সঙ্গে সুফিবাদের কোনো দূরত্ব নেই। বরং একজন সুফি তার আধ্যাত্মিকচর্চার দাবি পূরণ করতেই সংস্কার, বিপ্লব ও সংগ্রামে যুক্ত হন। এর মাধ্যমে তিনি মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর দাসত্বে নিয়োজিত করেন। জিহাদের লক্ষ্য‌ ও সুফিবাদের লক্ষ্য এই জায়গায় এসে মিলে যায়।

তাই সুফিবাদ ইসলামকে কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক চর্চায় সীমাবদ্ধ করে না, বরং ইসলামকে সর্বক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক এবং প্রধান ভূমিকায় অবতীর্ণ করতে উৎসাহিত করে। সেকুলারিজম পছন্দ করা অনেক ব্যক্তি ইসলামকে কেবল ব্যক্তিগত চর্চায় সীমাবদ্ধ করার লক্ষ্যে সুফিবাদের চর্চাকে উৎসাহিত করেন। তারা মনে করেন, সুফিবাদ ইসলামের গণ্ডিকে সীমাবদ্ধ করে। অবশ্য তাদের এ ধারণার পেছনে দায়ী একদলের কুরআন-সুন্নাহ বহির্ভূত ভ্রান্ত সুফিবাদচর্চা। যেটা আদতে সুফিবাদ নয়, বরং সুফিবাদের খোলসে বৈরাগ্যবাদ। প্রকৃত সুফিবাদ সংস্কার, বিপ্লব ও সংগ্রামকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। ইসলামকে করে তোলে সর্বত্র প্রাসঙ্গিক ও প্রধান ভূমিকা পালনকারী।


[1] ইহয়াউ উলুমুদ্দিন, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা: ৪৬২; আল-ইকতিসাদ ফিল ইতিকাদ, পৃষ্ঠা : ১৪৮

[2] হাকাযা যাহারা জিলু সালাহুদ্দিন, মাজেদ কিলানি, পৃষ্ঠা : ২৫১

[3] এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন—সিরাতে সাইয়িদ আহমদ শহিদ, আবুল হাসান আলি নদবি; বালাকোট থেকে বাংলাদেশ : একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা; ইসলাম এন্ড রেজিস্ট্যান্স ইন আফগানিস্তান

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *