ফিকহুস সিরাত পরিচিতি
ফিকহুস সিরাত (فقه السيرة) মূলত দুটি শব্দবন্ধের মাধ্যমে গঠিত : ক. ফিকহ (فقه), খ. সিরাত (السيرة)। ফিকহুস সিরাত বুঝতে হলে আগে আমাদের এ দুটি শব্দের মর্ম বুঝতে হবে।
ফিকহের শাব্দিক অর্থ : সূক্ষ্ম বা গভীর উপলব্ধি, অনুধাবন ও আত্মস্থ করা। ফিকহের পারিভাষিক অর্থ এখানে প্রাসঙ্গিক নয়, তাই এড়িয়ে যাচ্ছি।
সিরাতের শাব্দিক অর্থ : পদ্ধতি, আচরণ, জীবনচরিত এবং মানহাজ বা পথ। সিরাতের পারিভাষিক অর্থ : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কথাবার্তা, কাজকর্ম, অনুমোদন এবং তাঁর শারীরিক ও চারিত্রিক গুণাবলী; নবুওয়াত প্রাপ্তির আগের হোক বা পরের—সমষ্টিকভাবে এ সবকিছুই সিরাত।
ফিকহুস সিরাতের পারিভাষিক সংজ্ঞা
সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা
فهم سيرة النبي صلى الله عليه وسلم فهما استيعابيا تفاعليا منتجا.
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সিরাত বা জীবনীকে সামগ্রিক, সক্রিয় এবং ফলপ্রসূভাবে অনুধাবন করাই হচ্ছে ফিকহুস সিরাত।
বিস্তারিত সংজ্ঞা
فهم سيرة الرسول صلى الله عليه وسلم كمنهج حياة، وبناء فرد، وتكوين أمة، وإقامة دولة، وتأسيس حضارة، ورسالة إنسانية، وفقه تعامل.
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সিরাতকে জীবনের পাথেয়, ব্যক্তি গঠন, উম্মাহ বিনির্মাণ, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, সভ্যতা গড়ে তোলা, মানবতার বার্তা এবং পারস্পরিক আচরণের নিয়মাবলি অনুধাবনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা।
ফিকহুস সিরাতের পরিচয়টা সুস্পষ্ট করার জন্য সংজ্ঞাটাকে আরেকটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
ফিকহুস সিরাতের মুক্তপাঠ
জীবনের পাথেয় (منهج حياة) অর্থ হলো, সিরাতকে আমাদের দৈনন্দিন জীবন যাপনের স্টাইল বা পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা। যেমন : পানাহারের আদব, ঘুমানোর সঠিক পদ্ধতি এবং নিত্যদিনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে সিরাতের আলোকে সম্পাদন করা।
ব্যক্তি গঠন (بناء فرد) : একজন ব্যক্তিকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। তাকে শিক্ষা দেওয়া। তার দক্ষতা বৃদ্ধি করা। তাকে চারিত্রিক উন্নতির ভেতর দিয়ে উচ্চতর নৈতিকতায় পৌঁছানো।
উম্মাহ বিনির্মাণ (تكوين أمة) : সঠিক ইসলামি পদ্ধতির ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী জাতি বা উম্মাহ গঠন। যাদের পারস্পরিক সম্পর্ক থাকবে বেশ মজবুত। ভালোবাসা হবে আল্লাহর জন্য। তারা দ্বীনের সকল বিধিবিধান যথাযথভাবে পালন করবে।
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা (إقامة دولة) : রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা, রাজনীতি, দণ্ডবিধি এবং নাগরিক দায়িত্বসমূহ সিরাতের আলোকে পরিচালনা।
সভ্যতা গড়ে তোলা (تأسيس حضارة) : কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে এমন একটি সভ্যতা গড়ে তোলা, যা সমগ্র মানবজাতির সুখ ও কল্যাণ বয়ে আনবে।
মানবতার বার্তা (رسالة إنسانية) : যার লক্ষ্য হলো, দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের মুক্তি এবং সুখ-শান্তি নিশ্চিত করা।
পারস্পরিক ব্যবহারের নিয়মাবলি (فقه التعامل) : সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সাথে তাদের উপযোগী আচরণ করা এবং মহান আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্কের গভীরতা ও নিয়মাবলি অনুধাবন।
এজন্যই ফিকহুস সিরাত শুধু কাহিনি বর্ণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং কাহিনির অন্তরালে নিহিত শিক্ষা ও গুরুত্বের প্রতি সবিশেষ নজর দেয়। সেগুলোকে ব্যক্তি ও জাতির কল্যাণে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে।
ফিকহুস সিরাতের উৎস
মৌলিক উৎসসমূহ
কুরআনুল কারিম : এটি হলো ইসলামের প্রধান এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস।
হাদিস শরিফ : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কথা, কাজ ও মৌন সম্মতি।
সিরাত গ্রন্থসমূহ : নবিজির জীবনীর ওপর রচিত বিশেষ গ্রন্থ।
মাগাজি : নবিজির যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান সম্পর্কিত বর্ণনা।
দালায়িল : নবিজির নবুওয়াতের প্রমাণ ও অলৌকিক ঘটনাবলি সম্পর্কিত গ্রন্থ।
শামায়িল : নবিজির শারীরিক গঠন, স্বভাব ও অনন্য গুণাবলি সম্পর্কিত গ্রন্থ।
অন্যান্য ইতিহাস গ্রন্থ : ইসলামি ইতিহাসের সাধারণ ও প্রামাণ্য বই।
সহায়ক উৎসসমূহ
ফিকহ শাস্ত্রের গ্রন্থসমূহ : ইসলামি আইন ও বিধিবিধান সম্পর্কিত বই।
আরবি সাহিত্য বিষয়ক গ্রন্থসমূহ : প্রাচীন আরবি সাহিত্যের বই।
কাব্য সংকলন : তৎকালীন কবিদের কবিতার সংকলন, যা ইতিহাসের অনেক তথ্য ধারণ করে।
বংশধারা (انساب) বিষয়ক গ্রন্থ : প্রাচীনকালের ব্যক্তি ও গোত্রের বংশধারা সম্পর্কিত বই।
ব্যক্তি জীবনী (تراجم) : বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জীবনী ও গুণাগুণ সংবলিত গ্রন্থ।
ভূগোল বিষয়ক গ্রন্থ : ঐতিহাসিক স্থান ও অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান জানার বই।
পূর্বসূরিদের কাছে ফিকহুস সিরাত
সিরাতের গ্রন্থগুলো নবিজীবনের বিভিন্ন ঘটনায় পরিপূর্ণ। কিন্তু পূর্বসূরি বা প্রাচীন সিরাত লেখকদের নিকট ফিকহুস সিরাতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা খুব একটা দেখা যায় না। প্রাচীন সিরাত লেখকদের লেখায় সংক্ষিপ্ত শিক্ষা ও উপদেশ এবং কোথাও কোথাও শারয়ি বিধান বের করার উল্লেখ পাওয়া গেলেও সিরাতকে বিশেষভাবে এমন ধাঁচে বর্ণনা করার রীতি ছিল না, যেখানে প্রতিটি ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা রহস্য উন্মোচিত হয়। নিয়মত্রান্ত্রিকভাবেও শিক্ষা বা শারয়ি বিধানের বর্ণনা পাওয়া যায় না।
তবে এতে কোনো ত্রুটি বা কমতি নেই। বরং এটি একটি স্বাভাবিক ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। পূর্বসূরিরা যদি শুরু থেকেই কেবল শিক্ষা, উপদেশ এবং বিধান খোঁজার পেছনে লেগে থাকতেন, তবে হয়তো সিরাত আজ আমাদের কাছে এমন নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য রূপে পৌঁছত না।
সেসময় পূর্বসূরিরা সিরাতের ঘটনাগুলোকে পূর্ণ স্পষ্টতা এবং সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য পদ্ধতিতে সংগ্রহের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এ উদ্দেশ্যে তারা প্রতিটি বর্ণনাকারী এবং বর্ণনাকে যাচাই-বাছাই করার পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন; যাতে পরবর্তীদের কাছে কোনো ভুল বা দুর্বল তথ্য না পৌঁছে। তারা তাদের সামর্থ্যের সবটুকু এই কাজে ব্যয় করেছিলেন। এটি তাদেরই কঠোর পরিশ্রমের ফসল; বর্তমান যুগের উলামায়ে কেরাম পূর্বসূরিদের তৈরি করা সেই শক্তিশালী ভিত্তির ওপর ফিকহুস সিরাতের ইমারত নির্মাণ করছেন।
বর্তমানে সিরাতের ঘটনাগুলোর বিস্তারিত বিবরণ আগে থেকেই বিদ্যমান থাকায় সেই ঘটনাগুলোকে এখন সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়। এখন ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়ার চেয়ে সিরাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা হচ্ছে এবং প্রতিটি দিকে লুকিয়ে থাকা অমূল্য রত্ন (শিক্ষা ও রহস্য) বের করে উম্মাহর বর্তমান সময়ের নতুন নতুন সমস্যার সমাধান খোঁজা হচ্ছে।
আধুনিক যুগে ফিকহুস সিরাতের ক্রমবিকাশ
ফিকহুস সিরাত পরিভাষাটি গত শতাব্দীর হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ ও ভাবধারা প্রতি যুগেই কোনো না কোনোভাবে বিদ্যমান ছিল। সিরাত লেখকদের এক দীর্ঘ তালিকা রয়েছে; যারা তাদের গ্রন্থসমূহে সিরাতের ঘটনাবলি থেকে ফিকহি বা আইনি সূক্ষ্ম বিষয়াদি বের করেছেন। তাদের ভেতর প্রাথমিক পর্যায়ে আছেন ‘জাওয়ামিউস সিরাতে’র লেখক ইমাম ইবনু হাজম (মৃত্যু : ৪৫৬ হিজরি) এবং ‘আদ-দুরার ফি ইখতিসারিল মাগাযি ওয়াস সিয়ারে’র লেখক ইমাম ইবনু আব্দিল বার (মৃত্যু : ৪৬৩ হিজরি)।
পরবর্তীতে ‘আর-রাওযুল উনুফে’র লেখক ইমাম সুহাইলি (মৃত্যু : ৫৭১ হিজরি) তার গ্রন্থে ফিকহুস সিরাতের পদ্ধতিকে বিধিবদ্ধভাবে গ্রহণ করেন। তবে আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (মৃত্যু : ৭৫১ হিজরি) হলেন সেই ধারার অগ্রজ, যিনি তার অমর গ্রন্থ ‘যাদুল মাআদ ফি হাদয়ি খাইরিল ইবাদে’ ফিকহুস সিরাহকে সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। তিনি সিরাত থেকে ফিকহি আহকাম, শিক্ষা ও প্রজ্ঞা নিংড়ে বের করে একে একটি স্বতন্ত্র শিল্পের মর্যাদা দিয়েছেন। তার এই ‘যাদুল মাআদ’ গ্রন্থটি পরবর্তী লেখকদের জন্য একটি আদর্শিক মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত। প্রায় সকল সিরাত গবেষকই এই বই থেকে উপকৃত হয়েছেন।
বিংশ শতাব্দীতে ইমাম মুহাম্মাদ আল-গাজালিই (মৃত্যু : ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ) প্রথম সিরাত লেখক হিসেবে ফিকহুস সিরাত পরিভাষাটি ব্যবহার করেন। এমনকি তার গ্রন্থের নামও রাখেন ফিকহুস সিরাত।
ডক্টর মাহমুদ আহমাদ গাজি ফিকহুস সিরাত প্রসঙ্গে বলেন—‘আজও, বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ফিকহুস সিরাত নামে সিরাত পাঠের এক নতুন ধারা সামনে এসেছে। এর উদ্দেশ্য কেবল সিরাতের ঘটনাবলি বর্ণনা বা কেবল ঐতিহাসিক খুঁটিনাটি বিষয় সংকলন করা নয়; বরং এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো সিরাতের সেই ঐতিহাসিক ঘটনা ও বিবরণের মাঝে যে শিক্ষা নিহিত রয়েছে, সেগুলোকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা। সিরাতের ঘটনাবলির ভেতরে যে দূরদর্শিতা ও হিকমত লুকিয়ে আছে, সেগুলো সবার সামনে তুলে ধরা। অনেক মনীষী এই প্রচেষ্টার নাম দিয়েছেন ফিকহুস সিরাত।’[1]
ফিকহুস সিরাতের ওপর রচিত গ্রন্থাবলি
সামগ্রিকভাবে ফিকহুস সিরাত নিয়ে আলোচনা করতে গেলে দেখা যায়, সেই সকল প্রাচীন, তৎপরবর্তী এবং বিশেষ করে আধুনিক সিরাত লেখকদের এক দীর্ঘ তালিকা রয়েছে; যারা সিরাত রচনায় ফিকহুস সিরাত পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। নিচে এমন কিছু গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হলো, যেগুলো সরাসরি ফিকহুস সিরাত শিরোনাম বা নামে রচিত—
ফিকহুস সিরাহ : ইমাম মুহাম্মাদ আল-গাজালির (মৃত্যু : ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ) রচনা।
ফিকহুস সিরাহ : ডক্টর মুহাম্মাদ সাঈদ রামাদান আল-বুতির (মৃত্যু : ২০১৩ খ্রি.) রচনা।
ওয়াকফাতুন তারবাবিয়াহ ফি ফিকহিস সিরাহ : ডক্টর মুহাম্মদ আল-আবদুহর রচনা।
ফিকহুস সিরাতিন নাবাবিয়া : ডক্টর মুয়াফফাক সালিম নুরির রচনা।
ফিকহুস সিরাহ : যাইদ ইবনু আব্দিল কারিম আয-যাইদের রচনা।
ফিকহুস সিরাতিন নাবাবিয়া : ডক্টর মুনির মুহাম্মদ গাযবানের রচনা।
দুরুসুন ফিস সিরাতিন নাবাবিয়া ওয়া ইবারুহা (তথা ফিকহুস সিরাত) : ডক্টর আহমাদ মুহাম্মাদ আল-আলিমির রচনা।
ফিকহুস সিরাত : ডক্টর আস-সাইয়িদ আল-জামিলির রচনা।
ফিকহুস সিরাত : ইমাদ যাকি আল-বারুদির রচনা।
আস-সিরাতুন নাবাবিয়া দুরুসুন ওয়া ইবারুন (তথা ফিকহুস সিরাহ) : ডক্টর মুস্তাফা আস-সিবায়ির রচনা।
আস-সিরাতুল মুসতানিরা (তথা ফিকহুস সিরাত) : ড. মুহাম্মাদ সাঈদ বাকরের রচনা।
ফিকহুস সিরাতিন নাবাবিয়া : ইকবাল মুহাম্মাদ বাসামাদের রচনা।
সিরাত ও ফিকহুস সিরাত অধ্যয়ন কেন করব?
নিশ্চয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সুবাসিত জীবনী অধ্যয়ন কেবল আমাদের হৃদয়ের খোরাক, আত্মার প্রশান্তি, পরম সৌভাগ্য, আনন্দ এবং চোখের শীতলতাই নয়; বরং এটি মহান আল্লাহর দ্বীনের একটি অংশ। সেই সাথে এমন এক ইবাদত, যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। কারণ আমাদের প্রিয় নবিজির জীবন ছিল দান, ত্যাগ, ধৈর্য, সহনশীলতা, চেষ্টা-প্রচেষ্টা এবং মহান আল্লাহর দাসত্ব অর্জন ও তাঁর দ্বীনের দিকে দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে নিরলস সাধনায় পরিপূর্ণ।
সিরাত অধ্যয়নের মধ্যে অত্যন্ত মহান উপকারিতা এবং বহুমুখী কল্যাণ রয়েছে। হিম্মত বা মনোবল বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং নবিজির সিরাতকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ও ধৈর্য ধরে নিয়মিত অধ্যয়নের রয়েছে বেশ কিছু উপকারিতা।
নবিজিকে বিশ্ববাসীর জন্য আদর্শ ও একমাত্র অনুসরণীয় ব্যক্তি হিসেবে জানা
আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আকিদা-বিশ্বাস, ইবাদত এবং আখলাকের ক্ষেত্রে বিশ্ববাসীর জন্য একমাত্র আদর্শ ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا
‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’[2]
আর এই আদর্শকে বাস্তব জীবনে গ্রহণ এবং তাঁর দেখানো পথে চলা তখনই সম্ভব, যখন তাঁর সিরাত ও মহান আদর্শ সম্পর্কে জানার পাশাপাশি যথাযথভাবে অনুধাবন করা যাবে।
আমল পরিমাপের মানদণ্ড
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সিরাত এবং তাঁর সুমহান আদর্শ হলো এমন এক মানদণ্ড, যার আলোকে সকল আমল বা কাজ পরিমাপ করা হয়। আমলসমূহের মধ্যে যা তাঁর আদর্শ ও আচরণের সাথে মিলবে, তা-ই কবুলযোগ্য। আর যা তাঁর আদর্শ ও আচরণের পরিপন্থি হবে, সেগুলো বর্জনীয়। এ অর্থেই সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রাহিমাহুল্লাহ বলেন—‘নিশ্চয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হলেন সবচেয়ে বড় মানদণ্ড। তাঁর চরিত্র, সিরাত এবং আদর্শের আলোকেই সকল বিষয় যাচাই করা হবে। যা এর সাথে মিলবে, তা-ই সত্য; আর যা এর বিপরীত হবে, সেগুলো বাতিল।’[3]
কুরআনের সহায়ক
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সিরাত অধ্যয়ন ও অনুধাবন মহান আল্লাহর কালাম বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক। কারণ তাঁর পুরো জীবনটাই ছিল কুরআনের বাস্তব প্রয়োগক্ষেত্র। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে নবিজির চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন—‘তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন।’[4]
আল্লাহ তায়ালা বলেন—
وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ
‘নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।’[5]
নবিজির প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সিরাত অধ্যয়ন ও অনুধাবনের মাধ্যমে তাঁর প্রতি ভালোবাসা গভীর হয়। নবিজি বলেন—‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত (পরিপূর্ণ) মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতামাতা, সন্তান এবং সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।’[6]
হৃদয়ে এই ভালোবাসাকে গভীর, সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করার জন্য মানুষের প্রয়োজন নবিজির সিরাত অধ্যয়ন করা। তাঁর সুবাসিত সংবাদ ও বরকতময় জীবন সম্পর্কে জানা ও অনুধাবন জরুরি। যাতে তাঁর প্রতি ভালোবাসা আরও বৃদ্ধি পায়। তাঁর জীবদ্দশায় এমন অনেক লোক আসতেন, যাদের কাছে জমিনের বুকে তাঁর চেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি আর কেউ ছিল না! কিন্তু যখনই তারা তাঁকে দেখতেন, তাঁর সিরাত, আদর্শ ও আচরণ প্রত্যক্ষ করতেন; হুট করেই যেন তাদের কাছে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় মানুষে পরিণত হয়ে যেতেন।
ঈমানের দৃঢ়তা ও বৃদ্ধি
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সিরাত অধ্যয়ন ও অনুধাবনের অন্যতম উপকারিতা হলো, এটি ঈমান বৃদ্ধি ও দৃঢ় করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের সহায়ক
সিরাত অধ্যয়ন ও অনুধাবন আকিদা, ইবাদত এবং চরিত্রসহ পুরো দ্বীনকে বুঝতে সাহায্য করে। কারণ তাঁর জীবন ছিল এই দ্বীনেরই বাস্তব আমল; যেখানে তিনি দ্বীন কায়েম করেছেন, দাওয়াত দিয়েছেন এবং এই আকিদার (যা দ্বীনের মূল ভিত্তি) বিজয়ে কুরবানি ও অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। তাঁর সিরাত লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তিনি তাঁর দাওয়াত আকিদা ও তাওহিদ দিয়ে শুরু করেছিলেন। জীবনের বহু বছর তিনি কেবল আকিদা ও তাওহিদের দিকেই আহ্বান করেছেন। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য ফরজ ও বিধানসমূহ এসেছে। সুতরাং সিরাত অধ্যয়ন ও যথাযথ অনুধাবনের মধ্যেই রয়েছে আকিদা শিক্ষা, শরিয়তের স্তরবিন্যাস এবং ইবাদতসমূহ ফরজ হওয়ার ইতিহাস জানা। সেইসাথে আকিদা, ইবাদত ও চরিত্রের ক্ষেত্রে আল্লাহর দ্বীনের বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা।
দূরদর্শী দাওয়াতের শিক্ষা
সিরাত অধ্যয়ন ও অনুধাবনের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি জানা যাবে। যারা প্রকৃত দায়ি, তারা নবিজির আদর্শ ও সিরাত সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي
‘(হে নবি আপনি) বলুন, এটিই আমার পথ। আল্লাহর দিকে বুঝেশুনে (দূরদর্শিতার সাথে) দাওয়াত দিই—আমি এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে, তারা।’[7]
তাই দূরদর্শিতার সাথে দাওয়াত দিতে হলে নবিজির দাওয়াতি হিকমত, দাওয়াতের সূচনা, তাঁর কর্মপদ্ধতি, ভাষা, শিষ্টাচার এবং মানুষের সাথে নম্রতা ও কোমলতা সম্পর্কে জানা অপরিহার্য।
নবুওয়াতের একটি বড় দলিল
নবিজির সিরাত নিজেই তাঁর নবুওয়াতের একটি মুজিযা এবং সত্যতার প্রমাণ। এটি তাঁর ওপর বিশ্বাস স্থাপনের সবচেয়ে বড় সহায়ক। কেউ যদি তাঁর জীবনী, তাঁর দাওয়াতের বিষয়বস্তু এবং মানুষের সাথে তাঁর আচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তবে সে সেখানে কেবল কল্যাণ, ত্যাগ, মহানুভবতা এবং চারিত্রিক পূর্ণতা খুঁজে পাবে। এমনকি তাঁর ঘোর শত্রুরাও তাঁর সিরাতের এই পূর্ণতা দেখে তাঁর সত্যতার সাক্ষ্য দিতে বাধ্য হয়েছিল।
সৌভাগ্যের এক মহাবিস্ময়কর দরজা
ইহ ও পরকালীন সৌভাগ্য নবিজির আদর্শ অনুসরণের ওপর নির্ভরশীল। ইমাম ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ তাঁর যাদুল মাআদ গ্রন্থে লিখেন—‘মানুষেরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে চেনা এবং তাঁর আনীত বিধান মেনে চলার প্রতি অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী। নবিজির দেখানো পথ ছাড়া ইহকাল ও পরকালে মুক্তি ও সাফল্যের কোনো পথ নেই। …যারাই নিজের কল্যাণ ও নাজাত চায়, তাদের জন্য নবিজির সিরাত ও আদর্শ সম্পর্কে জানা ওয়াজিব; যাতে সে মূর্খতা থেকে বেরিয়ে তাঁর প্রকৃত অনুসারীদের দলে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।’[8]
মুসলিমের পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান
নবিজির পবিত্র জীবনী ও শামায়েল (গুণাবলি) প্রতিটি মুসলিমের জন্য জীবন চলার পাথেয়। এর ওপরই সন্তানদের লালনপালন করা জরুরি। বর্তমান সময়ে অনেক তরুণ-তরুণী যখন আদর্শহীন ব্যক্তিদের জীবনী পড়ে পথভ্রষ্ট হচ্ছে, তখন তাদের এই পবিত্র সীরাতের উৎসে ফিরে আসা অত্যন্ত জরুরি।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেন—‘আল্লাহ তায়ালা দুই জগতের সৌভাগ্য নবিজির অনুসরণের সাথে গেঁথে দিয়েছেন। তার বিরোধিতা করাকে বানিয়েছেন দুই জগতের দুর্ভাগ্যের কারণ। যারা তাঁর অনুসরণ করবে, তাদের জন্য রয়েছে হিদায়াত, নিরাপত্তা, সম্মান ও সাহায্য। আর বিরোধিতাকারীদের জন্য লাঞ্ছনা ও অপমান।’[9]
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদের তাঁর নবির সিরাত যথাযথভাবে অধ্যয়ন ও অনুধাবন করার তাওফিক দান করেন। আমৃত্যু যেন তাঁর সুন্নাহর ওপর অটল থাকতে পারি। আমিন!
[1] মুহাজারাতে সিরাত, মাহমুদ আহমাদ, পৃষ্ঠা : ৫৩২
[2] সুরা আহযাব, আয়াত : ২১
[3] আল-জামি লি আখলাকির রাবি ওয়া আদাবিস সামি, খতিব বাগদাদি, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৭৯
[4] মুসনাদু আহমাদ : ২৫৩০২; বর্ণনাটির সনদ সহিহ।
[5] সুরা কলম, আয়াত : ৪
[6] সহিহুল বুখারি : ১৫
[7] সুরা ইউসুফ, আয়াত : ১০৮
[8] যাদুল মাআদ, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৬৮
[9] যাদুল মাআদ, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৩৬