আরবি আত্মজৈবনিক-সাহিত্য: হাজার বছরের পরম্পরা (প্রথম পর্ব)

ভূমিকা

আত্মজীবনী এমন একটা সাহিত্যঘরানা, যা কোনো লেখকের মানবীয়, বৌদ্ধিক ও নৈতিক বিকাশকে বুঝতে অত্যন্ত কার্যকর মাপকাঠি হিসেবে কাজ করে। এর মাধ্যমে আমরা শুধু তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই জানতে পারি না, বরং তার চিন্তাশীল মানসপটের ভেতর প্রবেশ করে দেখতে পাই, তিনি কীভাবে নিজস্ব পরিবেশ, সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে নিজের বোধশক্তি, দৃষ্টিভঙ্গি ও আত্মসচেতনতার পরিধি নির্মাণ করেছেন। পাশাপাশি একজন লেখককে জীবনের নির্দিষ্ট সময়ে কোন কোন ধরনের সামাজিক প্রবণতা, বুদ্ধিবৃত্তিক টানাপোড়েন বা রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সাথে সমন্বয় করতে হয়েছে, সেসবও আত্মজীবনীতে অন্তিম স্বীকারোক্তির মতো উঠে আসে এখানে। ফলে আত্মজীবনী কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়; এটা ইতিহাসের অন্তরঙ্গ পাঠ, সমাজ-মনস্তত্ত্ব বোঝার অনন্য উপায় এবং নির্দিষ্ট যুগের চিন্তাধারার যথাযথ প্রতিফলন।

প্রাচীন আরবরা এ ক্ষেত্রে আমাদের জন্য বিপুল সাহিত্য-ঐতিহ্য রেখে গেছেন। তাদের রেখে যাওয়া জীবনীগ্রন্থ এবং আত্মজৈবনিক-গ্রন্থগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইতিহাসচর্চার বিরল এক উদাহরণ। তারা মানুষের জীবনকে ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখতেন। কোনো ব্যক্তি কী ছিলেন, কীভাবে বেড়ে উঠলেন, কেমনভাবে জ্ঞান অর্জন করলেন, যুগ-সমাজ তাকে কীভাবে প্রভাবিত করল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তারা ব্যক্তির জীবনবৃত্তান্ত অত্যন্ত যত্ন সহকারে লিপিবদ্ধ করতেন। সময়ের প্রবাহে এই ধারা আরও সমৃদ্ধ হয়ে ‘আদাবুত-তারাজিম ওয়াত তাবাকাত’ নামে পূর্ণাঙ্গ ও সুসংগঠিত একটা সাহিত্যধারায় পরিণত হয়। তৈরি হয় অজস্র জীবনীগ্রন্থ যেখানে বিদ্বান, ভাবুক, চিন্তক, কবি, শাসক ও সাধক সবাই তাদের জ্ঞান, চরিত্র, নৈতিকতা ও কাজের ভিত্তিতে স্থান পেয়েছেন।

অন্যদিকে এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের পাশাপাশি আরও একটা ধারা গড়ে ওঠে, যেখানে লেখকেরা নিজেদের জীবনকাহিনি নিয়েই পূর্ণ একটি গ্রন্থ, রিসালা বা স্বল্পদৈর্ঘ্যের পত্র-প্রবন্ধ রচনা করেছেন। এগুলো অনেকটাই ব্যক্তিস্বীকারোক্তিমূলক আত্মজীবনী; যেখানে লেখক তার অন্তর্দ্বন্দ্ব, বর্ণিল স্মৃতিচারণ, নৈঃসঙ্গের অনুভূতি, আধ্যাত্মিক তোলপাড়, প্রেম-ঘৃণা, আশা-নিরাশা, নিজ যুগের অশান্তি এবং রাষ্ট্র-সমাজের বিচ্ছিন্নতা ও অস্থিরতা সম্পর্কে আন্তরিকভাবে কথা বলেছেন।

এসব রচনায় লেখকের ব্যক্তিজীবনকে শুধু তথ্যগতভাবেই জানা যায় না, বরং আত্ম-অভিব্যক্তির গভীরতম আকাঙ্ক্ষায় তার অন্তর্জগতের বাঙ্ময় ও স্পন্দিত বয়ানও উঠে আসে আমাদের সামনে। ব্যক্তি-অভিজ্ঞতার ক্ষুদ্রতম স্পর্শ, লুকোনো কোনো স্মৃতি, আনন্দ–বেদনার ঘাত-প্রতিঘাত—সবই আত্মজীবনীতে এমনভাবে জায়গা পায়, পাঠক যেন লেখকের জীবনযাত্রার সহযাত্রী হয়ে ওঠেন। কখনো কখনো এসব লেখায় লেখকের বেদনাভারাক্রান্ত উপলব্ধি ভবিষ্যৎ পাঠকের জন্য নীরব সতর্কবাণী হিসেবে কাজ করে; আবার কখনো তা প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা হয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পেশ করে উপদেশ ও  দিকনির্দেশ।

প্রাক-ইসলামি যুগ থেকে ইসলামি যুগ

জাহেলি যুগ থেকেই আরবদের মধ্যে গোত্র অহমিকা ছিল প্রবল। প্রতিটি গোত্র নিজেকে অন্য গোত্র থেকে বিজয়ী দেখাতে তৎপর ছিল। ফলে তারা নিজেদের বংশপরিচয়, আভিজাত্য ও গৌরবগাথা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করত। তখনকার গোত্রগুলোর মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকত। যে গোত্র জয়ী হতো, সেই গোত্রের কবিরা তৎক্ষণিকভাবে গর্বোদ্দীপক কবিতা লিখে সেই জয়ের মাহাত্ম্য ঘোষণা করতেন। এই উদ্দেশ্যে কবি নিজের ও নিজের গোত্রের সাথে এমন সব গৌরবময় বর্ণনা জুড়ে দিতেন, যা আদৌ তাদের ছিল না। গোত্রপতি, বীর যোদ্ধা ও সাধারণ সদস্যরাও এই জয়ের কথা বলতে  তৎপর ছিল।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আরব মানুষ নিজের গোত্রের প্রশংসাকে নিজের ব্যক্তিগত প্রশংসা এবং গোত্রের নিন্দাকে নিজের নিন্দা মনে করত। তাই সে গোত্রের জন্য জান কুরবান করত, তার রক্ষণাবেক্ষণে সর্বশক্তি নিয়োগ করত। কারণ গোত্রই তাকে নিরাপত্তা ও সম্মানজনক জীবন দিত, যতক্ষণ না সে শত্রুদের ওপর বিজয়ী ও শক্তিশালী থাকত।

আরবরা গোত্রের সিদ্ধান্ত অকাট্যভাবে মেনে চলত, চাই সেটা সঠিক হোক বা ভুল। জাহেলি যুগের বিখ্যাত কবি দুরাইদ ইবনুস সিম্মাহ এই মনোভাব খুব সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন—

গাযিয়া যদি পথভ্রষ্ট হয়, তবে আমিও পথভ্রষ্ট,

তারা যদি সঠিক থাকে, আমিও সঠিক

আর আমি তো গাযিয়া গোত্রেরই একজন,

তারা ভুল করলে আমিও ভুল করি

জার্মান পণ্ডিত কার্ল ব্রোকেলম্যান সহ আরও অনেকের মতে, আরবি আত্মজৈবনিক-সাহিত্য জাহেলি আরবদের থেকেই শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘জাহেলি আরবরা তাদের পূর্বপুরুষদের কীর্তি, দিবসযাপন ও বংশপরিচয় নিয়ে গর্ব করত। রাতের আসরে এইসব দিনের কাহিনি বর্ণনাই ছিল প্রধান বিষয়।’ জাহেলি যুগে গদ্য আকারে লিখিত কোনো আত্মকাহিনি আমাদের হাতে না আসার কারণ হলো, সে যুগে লেখার প্রচলন ছিল অত্যন্ত কম। কিন্তু আমরা এই আত্মজৈবনিক তৎপরতার নজির দেখি জাহেলি কবিতায়। কবিরা নিজেদের সম্পর্কে, নিজেদের অনুভূতি নিয়ে এবং নিজের গোত্রের গৌরব নিয়ে বিস্তারিত বলেছেন। কবিতা মুখে মুখে বর্ণিত হয় এবং একে অন্যের কাছে খুব সহজেই বর্ণনা করত পারে। জাহেলি কবিতার বড় একটা অংশ এ ধারাতেই আমাদের কাছে এসেছে। এর বিপরীতে গদ্য সংরক্ষিত হয়নি, আর এটাই ছিল স্বাভাবিক।

ইসলামি যুগে আত্মজৈবনিক লেখার প্রথম যে নমুনা আজ আমাদের হাতে হাতে আছে, তা হচ্ছে সালমান আল-ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহুর (মৃত্যু : ৩৬ হিজরি/৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দ) নিজের বর্ণনা।  উদ্ধৃত করেছেন ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে। এখানে সালমান নিজের বংশপরিচয়, পিতার স্নেহ এবং সন্তানকে নিয়ে তাঁর অতিরিক্ত ভয়ের কথা বলেছেন। একইসাথে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, কীভাবে তিনি মজুসি ধর্ম থেকে দূরে সরে গিয়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর খ্রিষ্টান এক ধর্মযাজক ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, নতুন নবির আবির্ভাবের সময় ঘনিয়ে এসেছে; সেই নবির যে বৈশিষ্ট্যগুলো পাদরি বলেছিলেন, সেগুলো তিনি হুবহু খুঁজে পেয়েছিলেন আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মধ্যে।

সালমানের আত্মজৈবনিক এই বর্ণনা পাঠ করলে সহজেই আমরা বুঝতে পারি, সত্যধর্মের সন্ধানে তিনি কতখানি দুঃসহ যাত্রাপথ অতিক্রম করেছিলেন। সুদূর পারস্য থেকে সিরিয়া হয়ে জাযিরাতুল আরব পর্যন্ত সফর করছেন, কোনো ক্লান্তি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। শৈশবে পিতার অগাধ স্নেহে লালিত হওয়া সালমান ছিলেন সম্পূর্ণ স্বাধীন ও আরামপ্রিয় পরিবেশে বড় হওয়া একজন তরুণ। কিন্তু সত্যের পথে এগোতে গিয়ে সেই পরিচিত নিরাপদ বৃত্ত ভেঙে তাঁকে দাসত্বের শিকলও পরতে হয়েছিল।

আরবি আত্মজৈবনিক রচনায় প্রথম দিককার ধারা

হিজরি প্রথম শতকে সালমান আল-ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনাতে আমরা এই আত্মজৈবনিক ধারা দেখতে পাই। পরবর্তী সময়ে আমরা আরও কিছু বিচ্ছিন্ন আত্মজৈবনিক-রচনা দেখতে পাই আবুল ফারাজ ইসফাহানির আল-আগানি গ্রন্থের সূত্র ধরে। সেখানে বিভিন্ন ব্যাক্তিবর্গের আত্মজৈবনিক-বর্ণনার সন্নিবেশ ঘটানো হয়েছে। এ ধারায় আমরা সেখানে উমাইয়া কবি নুসাইব, বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ ইবরাহিম মুসেলি, তার ছেলে ইসহাক ইবনে ইবরাহিম মুসেলি-সহ আরও অনেকের আত্মজৈবনিক-বর্ণনা সীমিত পরিসরে দেখতে পাই। একইভাবে ইবনে আবি উসাইবিয়ার উয়নুল আনবা ফি তাবাকাতিল অতিব্বা গ্রন্থে হুনাইন বিন ইসহাক, ইবনে হাইসাম, ইবনে সিনার মতো অনেক আত্মজৈবনিক-বর্ণনার উল্লেখ পাওয়া যায়।

এগুলোকে যদিও পূর্ণমাত্রায় আত্মজীবনী বলা যাবে না, তথাপি আরবি আত্মজৈবনিক-সাহিত্য-ধারায় এগুলো উর্বর বীজ হিসেবে কাজ করেছে। এর মধ্যে কতকগুলির ভাষা এতটাই জীবন্ত এবং এতটাই সাহিত্যরসসিক্ত যে, পাঠকের হৃদয়ে তা সহজেই গেঁথে যায়। বিশেষত ইস্পাহানি আল-আগানি গ্রন্থে ইবরাহিম আল-মাওসিলির যে জীবনী বর্ণনা করেছেন, তাতে তাঁর আত্মচেতনার তীব্র আলোকচ্ছটা দেখতে পাই আমরা। নিজেকে তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। অন্যের সামনেও তিনি নিজেকে অকপটে মূল্যায়ন করতেন, কোনো আড়ম্বর ছাড়াই। পরবর্তীকালে সেইসব বর্ণনা যথাযথভাবে সংগৃহীত হয়েছে; আর সেইসব কথার আড়ালেই ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে তাঁর মনের গঠন, শিল্পী-সত্তার গভীরতা।

স্বতন্ত্র গ্রন্থ আকারে আত্মজীবনী

এরপর এই আত্মজৈবনিক-ধারা আরও সমৃদ্ধ হয়। সময়ের সাথে সাথে লেখকগণ এই ধারায় বিভিন্ন ছোট-বড় কলেবরে বই-পুস্তিকা লিখতে শুরু করেন এবং এতে প্রত্যক্ষভাবে নিজেদের জীবন, অভিজ্ঞতা এবং আত্মপরিচয় নিয়ে আলোকপাত করেন। এভাবেই আরবি সাহিত্য-ঐতিহ্যে আত্মজৈবনিক-ধারা ক্রমাগত শৈল্পিক রূপ ধারণ করতে শুরু করে।

এই ধারায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা রচনা হচ্ছে মুহাম্মদ ইবনে যাকরিয়া আল–রাজির (মৃত্যু : ৩১৩ হিজরি) লেখা একটা বই। আল–রাজি জালিনুস দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। জালিনুস নিজের জীবন, চরিত্র ও দার্শনিক কার্যক্রমকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, আল–রাজি তাঁর এই রীতির উত্তরাধিকার গ্রহণ করেন। খুব সম্ভব তিনি এই গ্রন্থটি লিখেছিলেন দীর্ঘ সময়ের মানসিক টানাপোড়েনের পর, বিশেষত সমাজের একদল মানুষের সাথে তার চলমান বিরোধের প্রেক্ষাপট থেকে।

আবু হাইয়ান আত–তাওহিদির আস–সাদাকা ওয়াস সাদিক

এরপর আসে আবু হাইয়ান আত–তাওহিদির (মৃত্যু : ৪১৪ হিজরি) বিখ্যাত রচনা আস–সাদাকা ওয়াস সাদিক। এখানে লেখক তাঁর মানসিক অবস্থার বর্ণনা বহুস্তরীয় বিবরণ পেশ করেন। নিজের নিঃঙ্গতাকে তুলে ধরেন বহুবর্ণিল সাজে। তিনি সমাজে একা। তাঁর বন্ধুবান্ধব নেই, সান্ত্বনা দানকারী কেউ নেই। নিঃসঙ্গতাই তাঁর একমাত্র আশ্রয়। সঙ্গীর অভাবে তিনি একাকীত্বকেই আপন করে নেন, যেখানে নীরবতা তাঁর স্বভাব, সংশয় তাঁর চিরসঙ্গী, আর জীবন নিয়ে শেষ আশাটুকুও হারিয়ে ফেলতে বসেছেন।

এর মাধ্যমে আবু হাইয়ানের যে ব্যক্তিত্ব আমাদের সামনে ভেসে ওঠে, তা গভীরভাবে নৈরাশ্যপূর্ণ। এতে আলোর খোঁজ পাওয়া দুষ্কর। শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়ায়, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে তিনি মৃত্যুর প্রতীক্ষা ও প্রত্যাশায় থাকতেন। মৃত্যু ছাড়া নিজের মানসিক সংকটের কোনো সমাধান দেখতে পেতেন না। তিনি বিস্মিত হতেন এই ভেবে যে, এত যন্ত্রণা ও হতাশার মাঝেও তিনি কীভাবে লিখে যেতে পারছেন। তাঁর ভাষায়—‘অদ্ভুত তো এটাই এবং বিস্ময়করও বটে—আমার মনে যে দহন, আক্ষেপ, হাহাকার, ক্ষোভ, বেদনা আর অন্তর্দাহ, সবকিছুর মধ্যেও আমি কীভাবে এই অক্ষরগুলো লিখে চলেছি!’

আবু হাইয়ানের আল-সাদাকা ওয়াস সাদিক গ্রন্থটি লেখার প্রেরণা মূলত আবেগীয় ও মানসিক। তিনি মানসিক ও বস্তুগত সংকটের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর চারপাশে থাকা বন্ধুরা কেউই তাকে সেই সংকট অতিক্রমে সাহায্য করতে পারেনি। আবু হাইয়ান এখানে পরোক্ষভাবে প্রমাণ করতে চেয়েছেন, বন্ধুত্ব মহৎ একটা সম্পর্ক, কিন্তু মানুষের মধ্যে তার প্রকৃত স্বরূপ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

ইবনুল জাওজির লাফতাতুল কাবাদ

এই ধারায় আমরা আরও খুঁজে পাই ইবনুল জাওজির (৫৯৭ হিজরি) লেখা লাফতাতুল কাবাদ ইলা নাসিহাতিল ওয়ালাদ।  ইবনুল জাওজি এখানে উপদেশ দেওয়ার ভঙ্গিতে নিজের কথা বলেছেন। তাঁর এই আত্মবয়ান শিক্ষাগত উদ্দেশ্যে, যাতে তিনি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাকে সন্তানের জন্য সুন্দর আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন। তিনি বলেন, ‘আমি তোমার কাছে আমার কতিপয় অবস্থার কথা উল্লেখ করছি। হয়তো তুমি আমার সাধনার দিকে তাকাবে এবং আমাকে যিনি সফলতার পথে পরিচালিত করেছেন, তাঁর কাছে আমার জন্য দোয়া করবে। কারণ আল্লাহ যেসব অনুগ্রহ আমার ওপর বর্ষণ করেছেন, তার অধিকাংশই আমার ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং স্নেহপরায়ণ ও সূক্ষ্ম পরিকল্পনাকারী আল্লাহর বিশেষ তত্ত্বাবধান।’

ইবনে হাযম আল–আন্দালুসির তাওকুল হামামা

আত্মজৈবনিক-ধারায় যেসব প্রাচীন গ্রন্থ আছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ইবনে হাযম আল–আন্দালুসির (মৃত্যু: ৪৫৬ হিজরি) তাওকুল হামামা ফিল উলফা ওয়াল উল্লাফ। এই গ্রন্থটি প্রেম ও মানসিক আকর্ষণ নিয়ে রচিত। ধর্মীয় বিষয়ে কঠোর ও অনমনীয় স্বভাবের হওয়া সত্ত্বেও ইবনে হাযম এখানে নারী, তাদের স্বভাব এবং নিজের প্রেমানুভূতির কথা অকপটে বলেছেন। এখানে আমরা তাঁর স্পষ্টবাদী একটা চরিত্র দেখি। ইহসান আব্বাস এ বিষয়ে বলেন, ‘ইবনে হাযম আল–আন্দালুসি তাঁর তাওকুল হামামা গ্রন্থে আত্মস্বীকারোক্তিমূলক যে কথাগুলো বলেছেন, তাতে তিনি ছিলেন অনন্য।’

শাওকি দাইফ মনে করেন, এই স্বীকারোক্তিই তাওকুল হামামাকে এক অসাধারণ রচনায় পরিণত করেছে; তবে তিনি একে পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী বলতে নারাজ। কারণ বইটিতে লেখক তাঁর জীবনের একটা মাত্র দিক তথা প্রেম নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইহসান আব্বাসের মতে, ইবনে হাযম এখানে নিজের সংকোচের পরিচয় দিয়েছেন অনেক জায়গায়। অনেক ঘটনায় তিনি নিজের নাম সরাসরি যুক্ত করেননি, অনেক জায়গায় ইঙ্গিতেই থেমে গেছেন এবং সমসাময়িক মানুষদের মানসম্মান রক্ষার্থে নাম-পরিচয় গোপন করেছেন।

ইবনে হাযম এখানে যেসব স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এক স্বর্ণকেশী তরুণীর প্রতি তাঁর কিশোর বয়সের প্রেম। তিনি লিখেছেন, ‘আমি আমার কৈশোরে স্বর্ণকেশী এক দাসীকে ভালোবেসেছিলাম। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত কালো চুলের নারীদের সুন্দর বলে মনে হয়নি, যদিও তারা সূর্যের মতো দীপ্তিমান হোক বা সৌন্দর্যের বড় কোনো প্রতিমূর্তি। এরপর অন্য কোনো নারীর প্রতি নিজেকে মায়েল সমর্পণ পারিনি, অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারিনি।’

তিনি স্বীকার করেন, তিনি নারীদের কোলে-পিঠে বড় হয়েছেন (তিনি ছিলেন আন্দালুসিয়ার এক উজিরের সন্তান এবং স্বভাবতই তাঁর বেড়ে ওঠা এমন একটা পরিবেশে ছিল, যেখানে নারীদের আনাগোনা বেশি) এবং তাদের অনেক ব্যক্তিগত গোপন কথা জেনেছেন—যা অন্য কেউ সচরাচর জানতে পারে না। তিনি বলেন, ‘আমি নারীদের পর্যবেক্ষণ করেছি এবং তাদের এমনসব গোপন স্বভাব জেনেছি, যা অন্য কেউ জানে না। কারণ আমি তাদের কোলে বড় হয়েছি, তাদের হাতেই মানুষ হয়েছি, আর পুরুষদের সঙ্গ পেয়েছি কেবল তখন, যখন আমি যুবক বয়সে উপনীত এবং সমাজে মিশতে শুরু করেছি।’

তাওকুল হামামার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, ইবনে হাযম বহু ক্ষেত্রে নিজের অন্তর্দশা ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে অত্যন্ত প্রাণবন্তভাবে তুলে ধরেছেন। এর একটি উদাহরণ হলো তাঁর এই বক্তব্য—‘শোনো, আমি কখনোই মিলনের পানীয় দিয়ে তৃষ্ণা মেটাতে পারিনি; যতই পেয়েছি, ততই তৃষ্ণা বেড়েছে। যাকে ভালোবেসেছি, তার এমন নৈকট্য গিয়েছি, যেখানে মানুষের আর কোনো আকাঙ্ক্ষা অবশিষ্ট থাকে না। তবু দেখেছি, আমার চাওয়া আরও বাড়ছে। দীর্ঘ সময় ধরে আমার এমন অবস্থা ছিল। আমি কোনো ক্লান্তি অনুভব করিনি, আবার আনন্দও পুরোপুরি পাইনি।’

ইহসান আব্বাসের মতে, তাওকুল হামামায় এ ধরনের বর্ণনা গভীর মনস্তাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি ধারণ করে। তিনি বলেন, ‘প্রেম বিষয়ে ইবনে হাযম আল–আন্দালুসির মতো আর কেউ এমন লেখেননি। এখানে তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ, স্বীকারোক্তি এবং মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ যোগ করেছেন। এই বইয়ের সমালোচনার জায়গা হচ্ছে, তিনি এখানে অধিক পরিমাণে কবিতা উদ্ধৃত করেছেন এবং নিজের তৈরি কিছু বিভাজন উল্লেখ করেছেন। এগুলো না থাকলে তাঁর এই গ্রন্থটি আরও প্রাণবন্ত হতো এবং তাঁর উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ সফল হতো।’

আবদুল্লাহ ইবনে বুলুক্কিনের আত-তিবয়ান

আরবি সাহিত্যে রাজনৈতিক-আত্মজীবনী লেখার ধারাও পরিলক্ষিত হয়। এর শুরু বলা যায় আমির আবদুল্লাহ ইবনে বুলুক্কিনের হাত ধরে। আমির আবদুল্লাহ ইবনে বুলুক্কিন ছিলেন সনহাজি বংশের শেষ শাসক, যিনি ৪৬৫ থেকে ৪৮৩ হিজরি (১০৭৪–১০৯১ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত গ্রানাডার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর আত্মজীবনী আত-তিবয়ান আরবি সাহিত্যে রাজনৈতিক-আত্মজীবনী প্রণয়নের অনন্য নজির রেখে গেছে। এই গ্রন্থে তিনি শুধু তাঁর পরিবারের উত্থান-পতনের ইতিহাসই তুলে ধরেননি, বরং নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক পরিপক্বতার ধাপ এবং শেষ পর্যন্ত নিজের পতনের নেপথ্যের ঘটনাগুলোও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

বইটি রচনার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, নিজের চরিত্র ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের খণ্ডন। ইবনুল খতিবের মতো অনেক ঐতিহাসিক তাকে কাপুরুষ, সমঝোতাবাদী বা অস্থিরমনা বলে চিত্রিত করেছিলেন। তিনি নিজের আত্মজীবনীতে এসব অভিযোগকে খণ্ডন করতে চেয়েছেন, যদিও কিছু অভিযোগের সত্যতা তিনি আংশিকভাবে স্বীকারও করেন। 

গ্রন্থের সূচনাতেই তিনি তাঁর রাজত্বের বৈধতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি উল্লেখ করেন এবং এর মাধ্যমে সমকালীন তায়েফি শাসকদের থেকে নিজের ভিন্ন একটা অবস্থান তৈরি করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উমাইয়া খিলাফতের পতনের পরে যখন আল-মানসুরের সেনাপতিরা বিভক্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন গ্রানাডার নিকটবর্তী এলবিরার অধিবাসীরা নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে এবং তাঁর দাদা জাওয়ি ইবনে জিরিকে আহ্বান জানায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য। সেখানকার অধিবাসীরা ছিল দুর্বল ও ভীত; তাই তারা এমন একজন শক্তিশালী নেতাকে তাদের শাসক হিসেবে চেয়েছিল, যিনি তাদের রক্ষা করতে পারবেন। ইবনে বুলুক্কিন এখান থেকে প্রমাণ করতে চান, রাজত্ব কখনো কখনো নিজের কর্তৃত্ব প্রদর্শনের খায়েশে নয়, বরং সময়ের চাহিদা থেকে জন্ম নেয়।

এখানে তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। রাজত্ব স্থিতিশীল থাকলে শাসক প্রশংসিত হন, চাই তিনি ন্যায়পরায়ণ হোন বা না হোন; আর পতন ঘটলে শাসকের কঠোর সমালোচনা করা হয়, যদিও তিনি ন্যায়ের পথে থেকে থাকেন। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি নিজের আত্মজীবনী লেখেন, যাতে শত্রুদের রটনা ভবিষ্যৎ ইতিহাসকে বিভ্রান্ত না করে।

এরপর তিনি নিজের বেড়ে ওঠা এবং কিভাবে তিনি ২০ বছর বয়সেই ক্ষমতার ভার গ্রহণ করেন, সে প্রেক্ষাপট নিয়ে বলেন। কৈশোরে তিনি প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত হন। এসব বিষয়ে বুত্পত্তি অর্জনের পর এক সময় তাঁর দাদা তাকে বলেন,  ‘কুরআন এবং ধর্মীয় বিষয়ে তুমি যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করেছ। এখন শাসন করার কাজ শিখতে হবে। সময় খুব অশান্ত আর রাজপুত্রদের সবকিছু শেখার সুযোগ থাকে না। মানুষের মতামত শোনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করা—একজন শাসকের পক্ষে এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

এরপর তিনি তার রাজত্বকালীন সময়ের বিস্তর বিবরণ দেন। তার সময়ে পরপর ঘটে যাওয়া সাতটি বিদ্রোহ, ইহুদি মন্ত্রীদের আর্থিক দুর্নীতি, নিজ ভাই তামিমের বৈরিতা, সেনাপতিদের বিশ্বাসঘাতকতা, খ্রিষ্টান রাজা ষষ্ঠ আলফনসোর সাথে যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বলেন এবং এসব পরিস্থিতিতে তার সিদ্ধান্তগুলো কেন যৌক্তিক ছিল, তার ব্যাখ্যা দেন। যেমন তিনি ফ্রান্সের আলফনসোকে কর প্রদান করেন, মুসলমানদের সামগ্রিক নিরাপত্তা রক্ষার কৌশল হিসেবে দেখেছেন। বিদ্রোহীদের ক্ষমা করে শাস্তি লঘু করার মধ্যে তিনি শাসকের উদারতার উদাহরণ দেখিয়েছেন।

ইবনে বুলুক্কিন তাঁর এই আত্মজীবনীতে নিজের মানসিক অবস্থাকে অকপটে তুলে ধরেন। তিনি স্বীকার করেন, মুরাবিতিন শাসক ইউসুফ বিন তাশফিনের সামনে তিনি যথেষ্ট দ্বিধাগ্রস্থ ছিলেন। সে সময় তায়েফি সুলতানদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, ইউসুফ বিন তাশফিনকে আন্দালুসেই থাকতে হতো।

গ্রানাডা অবরোধের সময় তিনি নিজের অন্তর্দ্বন্দ্বের বর্ণনা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন। জনগণের প্রতি বিশ্বাস হারিয়েছিলেন অনেক আগে, তাই সার্বিক পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারছিলেন না। এদিকে খ্রিষ্টান রাজা তাঁকে হাত মেলানোর প্রস্তাব দেন। তখন ধর্মের বিপক্ষে না যাওয়ার তাড়না যেমন তিনি অনুভব করছিলেন, মুরাবিতিনদের ক্রোধকেও ভয় করছিলেন। এই দিনগুলোকে তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে দুঃসহ সময় হিসেবে উল্লেখ করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি রক্তপাত ছাড়াই আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেন।

জালাকা যুদ্ধের স্মৃতি (৪৭৯ হিজরি/১০৮৬ খ্রিষ্টাব্দে সংগঠিত) তাঁর কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মুরাবিতিনদের নেতৃত্বে মুসলিম জিহাদি চেতনার যে বিস্ফোরণ তিনি দেখেছিলেন, তাকে তিনি আন্তরিক শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। তখন মুসলমানরা বিজয়ী হয়। কিন্তু বিজয়ের অল্প সময় পরই ফিরে আসে সেই বিভেদ। শেষ পর্যন্ত তাকে ইউসুফ বিন তাশফিনের হাতে গ্রানাডার ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হয়। এ সময় তিনি নিজের মানসিক অবস্থার কথা বিস্তরভাবে বর্ণনা করেন। ইউসুফ উত্তরাধিকারী হিসেবে তাঁকে মনোনীত না করায় তিনি গভীরভাবে বিচলিত হন এবং প্রথমবারের মতো দুর্ভাগ্যের কষাঘাত অনুভব করেন। তাঁর প্রতি এ অভিযোগ তোলা হয়, তিনি খ্রিষ্টানদের সাথে আঁতাত করেছিলেন। আত্মজীবনীতে তিনি এই অভিযোগ তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।

গ্রানাডা থেকে তাঁর পরিবারের বিতাড়নের বর্ণনা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তাঁর প্রাসাদে লুটপাট চালানো হয়। পরিবারের সদস্যদের দেহ তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন করা হয়। তাঁর মা কিছু ধন সম্পদ লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হলেও তিনি ভয়ের কারণে কিছুই করতে পারেননি। জীবনধারণের জন্য তিনি তাঁদের হাতে থাকা সামান্য জিনিসপত্র বিক্রি করেন শেষ পর্যন্ত। ইবনে বুলুক্কিন লক্ষ করেন, তাঁর এই পতন যেন ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। তিনি যেন  গ্রানাডার শেষ মুসলিম রাজা আবু আবদুল্লাহর পতনও প্রত্যক্ষ করছেন এখানে এসে।

ইউসুফ বিন তাশফিন তাঁকে মরক্কোয় নির্বাসন করেন। তখন তাঁর অবস্থার পরিবর্তন হয় কিছুটা। ইউসুফ তাঁর সাথে সৌজন্যপূর্ণ ব্যবহার করেন। এখানে এসে তাঁর সাথে পরিচয় ঘটে সেভিলের নির্বাসিত আমির মুতামিদ ইবনে আব্বাদের সাথে। তাঁদের দুজনের ভাগ্যই যেন এক সুতোয় গাঁথা।

জীবনের শেষ দিকে এসে তিনি উপলব্ধি করতে থাকেন, অতীত নিয়ে পড়ে থাকা তাঁর জন্য দুঃশ্চিন্তা আর কিছুই ফিরিয়ে আনে না। উপরন্তু সেটা তাকে শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলবে এবং নিজের  বোধ-বুদ্ধিকে নিস্তেজ করে দিবে অনেকাংশে। তখন তিনি নিজের জন্য নতুন একটা গন্তব্য নির্ধারণ করেন। জ্ঞানমূলক বিষয়ে মনোনিবেশ করেন। দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা ও চিকিৎসাশাস্ত্র ছিল তাঁর পছন্দের। নিজের মতো করে তিনি এ সব বিষয়ে অধ্যয়ন শুরু করেন। তিনি মদ্যপান থেকে তওবা করেছেন, যা তিনি আগে নিয়মিতই করতেন।

গবেষক ইয়াহিয়া ইবনে ইবরাহিমের মতে, এই আত্মজীবনীতে তাঁর চরিত্রের বহুস্তরীয় দিক উন্মোচিত হয়েছে; পরিবেশ-পরিস্থিতি তাকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে, অকপটে তিনি তাঁর বর্ণনা দিয়েছেন। পাশাপাশি এখানে তিনি যে ধরনের সুনিয়ন্ত্রিত সংলাপরীতি ব্যবহার করেছেন, পাঠকদের জন্য  তা যথেষ্ট চিত্তাকর্ষক।   

ইমাম গাজালির আল-মুনকিয

আমরা যদি আরবি আত্মজীবনীর মৌলিক গ্রন্থসমূহ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কালানুক্রমিক অগ্রগতির পথ অনুসরণ করি, তবে ইমাম গাজালির (মৃত্যু : ৫০৫ হিজরি/১১১১ খ্রিষ্টাব্দ) আল-মুনকিয মিনাদ দালাল-এর কাছে এসে থামতে বাধ্য হব। ইমাম আবু হামিদ আল-গাজালি তাঁর আত্মজীবনী রচনা করেছিলেন এই উদ্দেশ্যে—অনুসন্ধানী ছাত্রদের কাছে তিনি তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রার বাঁকবদল এবং কীভাবে তিনি সত্যের পথে ক্রমাগত অগ্রসর হয়েছেন, সংক্ষেপে তার বর্ণনা দেবেন। সৌদি গবেষক যাকি আল-মিলাদ মধ্যযুগে ইসলামি চিন্তা : গাজালি থেকে ইবন তাইমিয়া শীর্ষক বইয়ে ইমাম গাজালির আল-মুনকিযকে ‘ইসলামি সংস্কৃতির ইতিহাসে প্রথম বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মজীবনী’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

গাজালির মধ্যে ছিল এক অবিরাম জিজ্ঞাসু মন। তিনি প্রত্যেকটা মতবাদের অন্তর্সত্য জানতে তৎপর ছিলেন। কোনো বাতিনি-শিয়াকে দেখলে তিনি জানার চেষ্টা করতেন, তার বাতেনি মতবাদের আসল সত্য কী? কোনো জাহিরিকে দেখলে তার বক্তব্যের মূল গোড়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতেন; কোনো দার্শনিক হলে তার দর্শনের কেন্দ্র কোথায়, তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করতেন; কালামবিদ হলে তার যুক্তি ও প্রমাণের অন্তিমসীমায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতেন; সুফি হলে তার আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার আড়ালের রহস্য জানতে আকুল ছিলেন; ইবাদতকারী হলে তার ইবাদতের প্রকৃত ফলাফল কী, তা বোঝার চেষ্টা করতেন; এমনকি নাস্তিক বা মুলহিদকে দেখলেও তার অবাধ্যতার উৎস কোথায়, তা জানার কৌতূহল দমন করতে পারতেন না। তাঁর মনে ছিল অজুত অজুত প্রশ্ন, অনুসন্ধানের উদ্বেলতা, আর সত্যকে জানার অদম্য উদ্যোগ।

এখানে আবু হামিদ এমন এক মনোজগতের বর্ণনা দেন, যার গভীরে আছে জ্ঞান–অন্বেষণের অনিঃশেষ তৃষ্ণা। আর এর একমাত্র লক্ষ্য ইয়াকিন তথা নিশ্চয়তা লাভ। তার আত্মজীবনী পাঠ করলে স্পষ্ট হয়, তিনি বস্তুর সত্য-মর্ম অনুধাবনের জন্য উন্মুখ ছিলেন; আর সেই সত্যের দিকে এগোতে গিয়ে তিনি সময়ের নানা জ্ঞানপদ্ধতি একে একে পরীক্ষা করেন। 

গাজালির ছিল চরম সন্দেহবাতিক। তিনি নিজের সন্দেহ সম্পর্কে বলেন—‘সত্যের তৃষ্ণা আমাকে কখনো স্থির থাকতে দেয়নি। আমি খুঁজতে চেয়েছিলাম সেই প্রকৃত জ্ঞান, যা মানুষের সহজাত প্রকৃতি থেকে উৎসারিত হয় এবং যা সামাজিক, ধর্মীয় বা কিংবা মনস্তাত্ত্বিক পারিপার্শ্বিকতার দ্বারা প্রভাবিত নয়। আমি চেয়েছিলাম এমন নির্ভুল সত্য, যেখানে সন্দেহের কোনো স্থান নেই এবং যার ওপর নিশ্চিন্তে বিশ্বাস করা যেতে পারে। আমি যখন আমার জ্ঞানের প্রতিটি শাখা পরীক্ষা করলাম, তখন দেখলাম কেবল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও বৌদ্ধিক জ্ঞানই আপাতদৃষ্টিতে নির্ভরযোগ্য। তারপর যখন আমি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়গুলোর দিকে তাকালাম, তখন দেখলাম সেগুলো আসলে প্রবঞ্চনাপূর্ণ। দৃষ্টিশক্তি আমাদেরকে বিভ্রান্ত করতে পারে। আমরা স্থির ছায়াকে অচল মনে করি, অথচ তা সচল; আমরা নক্ষত্রকে ক্ষুদ্র ভাবি, অথচ তা পৃথিবীর চেয়েও বৃহৎ। আর কে আমাদের এই বিভ্রান্তির কথা বলল? বুদ্ধি!’

যখন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উপলব্ধির প্রতি তাঁর বিশ্বাস ভঙ্গ হলো, তখন তাঁর সামনে ছিল নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়গুলো। তিনি এর প্রতিও সন্দেহ জাগানোর চেষ্টা করলেন। আগে তিনি ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধিতে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু পরে বুদ্ধি এসে সেই ইন্দ্রিয়কে মিথ্যা প্রমাণ করল। যদি বুদ্ধি না থাকত, তবে সে ইন্দ্রিয়ের কথাই সত্য বলে মেনে নিত। সুতরাং হতে পারে বুদ্ধির উপরও আরেকজন বিচারক আছেন, যা বুদ্ধিকেও মিথ্যা প্রমাণ করতে পারে!

তাঁর এই সংশয় আরও গভীর হলো। তিনি স্বপ্নের বিষয়টি খেয়াল করলেন। স্বপ্নের মধ্যে মানুষ যা দেখে, তা সম্পূর্ণ বাস্তব বলে মনে হয়, অথচ জেগে উঠলে বুঝতে পারে, সবই ছিল বিভ্রম। তাহলে একজন মানুষ কীভাবে নিশ্চিত হবে, এই জাগ্রত অবস্থাও এক ধরনের বিভ্রম নয়? তিনি দুই মাস ধরে এই গভীর সংশয়ের মধ্যে ছিলেন। মাঝামাঝি সময় তাঁর অবস্থা ছিল সোফিস্টদের মতো।  

অবশেষে গভীর চিন্তার পর তিনি উপলব্ধি করলেন, এই সংশয়ের সমাধান কেবলই প্রমাণের ভিত্তিতে সম্ভব। এ সময় তিনি এমন কিছু উদ্ঘাটন করলেন, যা তার ৬০০ বছর পর ইমানুয়েল কান্ট উদ্ঘাটন করতে পেরেছিলেন। তিনি উদ্ঘাটন করলেন, মানুষের বুদ্ধিতে সহজাত কিছু ধারণা থাকে, যা সমস্ত যৌক্তিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি এবং যার ওপর দাঁড়িয়ে সব যুক্তি গঠিত হয়। তিনি বুঝতে পারলেন, এই মৌলিক সত্যগুলো এমনই স্পষ্ট ও অপরিবর্তনীয়, এগুলোর জন্য কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই। 

গাজালির এই গভীর আত্মিক-তৎপরতা শুধু তাঁর নিজস্ব মানসজগৎকেই আলোকিত করেনি, পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় দার্শনিক ঐতিহ্যেও এর প্রতিধ্বনি শোনা গেছে। এ বিষয়ে একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য আমাদের জানিয়ে গেছেন তিউনিসীয় ইতিহাসবিদ উসমান আল-কাআ’আক। জাতীয় গ্রন্থাগারের প্রথম মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একবার তিনি বলেন, তিনি একসময় দেকার্তের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে পৌঁছাতে সক্ষম হন এবং সেখানে আল-মুনকিয মিনা দালাল-এর লাতিন অনুবাদের কপি দেখতে পান। বিস্ময়ের বিষয়, সেই অনুবাদের পাতায় ছিল দেকার্তের নিজের হাতে দাগানো দাগ–চিহ্ন এবং প্রান্তটীকায় লেখা ছিল—‘একে আমাদের পদ্ধতিতে রূপান্তর করতে হবে।’

শুধু তাই নয়, অনেক গবেষকের মতে দেকার্তের Discours de la méthode গ্রন্থের বিষয়বস্তু ও আত্মকথনধর্মী দর্শনচর্চার ধারাও গাজালির মুনকিয থেকে অনুপ্রাণিত।

চলবে…

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *