মাঝেমাঝে মনে হয়, আমি যতটা না কারও স্ত্রী বা কারও পুত্রবধূ, তারচেয়ে বেশি আমি তিনটা উচ্ছ্বল শিশুর ছোট কাকি। ওদের নিদারুণ বন্দি শৈশবে আমার উপস্থিতি যেন একটা ডোরেমনের পকেট পেয়ে যাওয়া। ছোট কাকির কাছে যা খুশি তাই আবদার নিয়ে হাজির হওয়ার এই অপার সুযোগ পেয়ে শুধু ওরাই লাভবান হয়নি। লাভের গুড় অনেকখানি জুটেছে ছোট কাকি হিসেবে আমার ভাগেও।
কারণ নিজের একটা সংসার হবে এই স্বপ্ন আমার চোখে কোনোদিন পিঁড়ি পেতে বসেনি। আমার ছিল এক প্রাচীন যাযাবরী মন। ক্রমশ জট পাকিয়ে যাওয়া ক্যাসেটের ফিতার মতো অগোছালো আর জরাজীর্ণতাই যেন ছিল জীবনের সবটুকু…
তবু কী করে যেন একদিন চোখে জোড়া লেগে গেল একটা সাজানো গোছানো ঘরের ছবি। মনে হলো, সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা কোনো ঘর নেহাত মন্দ কিছু নিশ্চয়ই হবে না?
কিন্তু আমার তো পরিপাট্যের পাঠ নেওয়া হয়নি কখনো। রুচিশীলতার সাথেও ছিল না ঘরোয়া বিষয়ের সেরকম কোনো সম্পর্ক। আমার রুচির ছাপ মিলত বইয়ের তাকে, ডায়েরির কাগজ আর জোড়াতালি ক্রাফটিংয়ে। আর ঘরের বেলায়? খাপছাড়া খাপছাড়া হয়ে থাকত সব। কাজ, পড়া, ঘর, জীবন। সব।
তবু নানা কথায় যন্ত্রণা পেয়ে, নিজেকে ভীষণ কুঁড়ে মেয়ে ভেবে কত রকমে কসরত করতাম নিজেকে ঘরকন্যা বানানোর। আলতো কাজল রেখা আঁকলে, সে কালি লেপ্টে যেত অলখে। কাঁচের চুড়ির ঝনঝন শব্দে মেতে ওঠার আগেই, টুপটুপ করে ভেঙে কেটে যেত হাত।
অবসর পেলে বিছানার সাদা-গোলাপি চাদরটা যত্ন নিয়ে টানটান করে গুছিয়ে রাখতাম কোনো কোনো দিন। তবু কীভাবে যেন দুয়েকটা বই-খাতা, হেডফোন, ইনহেলার বা কফির কাপের আল্টিমেট ডেস্টিনেশন হতো ওই বিছানাই। টেবিলটা এই গুছিয়েছি তো এই আবার সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেত এমনভাবে যেন দিনরাত কেউ শুধু টেবিলটাই ব্যবহার করে। রুমের এমাথা ওমাথা বাঁধা দড়িতে আধোয়া কাপড়। মেশিনে ধুয়ে ছাদে দিয়ে এলে সেখানেই থেকে যেত দিনের পর দিন। নামিয়ে আনলে, আবারও জায়গা হতো সেই দড়িতেই। কখনো কখনো ওয়ারড্রোব খুলে বসে পড়া—সব গুছাব ভেবে। গোছাতে গোছাতে গুনগুন করা, কিছু কাপড় ভাঁজ করে আর কিছু দলা পাকিয়েই রেখে দেওয়া ড্রয়ারে।
যদি জীবনও এভাবে দলা পাকিয়ে ফেলে দেওয়া যেত এমন কোনো আধো-আঁধারিয়া কোণে—সে ভাবনাই আমাকে কখনো সংসারের স্বপ্ন দেখতে দিত না। কারণ আমি জানতাম, এই জীবন আলোর স্পর্শ পেলেই মন বলবে, চল ছুটে চলি উদ্ভ্রান্তের মতো পথে পথে। তখন কেবলই মনে হতো, এমন যাযাবরী মন আমাকে কোথায় যে নিয়ে যাবে শেষে…
শেষ কি এসেছে এখনো? সেই অগোছালো, উদ্ভ্রান্ত, চঞ্চল মেয়েটা কি আসলে কোনোদিন সংসারী হতে পারবে? সে তো সাজিয়েছে নিজ হাতে একটা আস্ত ঘর। দিনের পর দিন মাথা খাটিয়েছে কীভাবে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলা যায় বিশাল দুনিয়া। বিস্তর ঘাঁটাঘাঁটি শেষে এঁকেছে দুটো দেয়াল। লোক ডেকে মালয়েশিয়ান উডে ডুকো পেইন্ট দিয়ে দাঁড় করিয়েছে নিজের চেয়ে তিনগুন উঁচু বুকশেলফ। হইহই রইরই করে সে বসায় হরেক পদের আয়োজন। বাইরের মানুষ এসে পুত্রবধূর নাম্বারিং করে যায়। শাশুড়ি মা কপালে চুমু খেয়ে বলে—সংসার সাজিয়েছ, তাড়াতাড়ি চলে এসো।
অথচ আমার কেবলই পালাই পালাই মন। বোদলেয়ারের মতো—
আমি ভালোবাসি মেঘ, চলিষ্ণু মেঘ…
উঁচুতে… ঐ উঁচুতে…
আমি ভালোবাসি আশ্চর্য মেঘদল।
কী অদ্ভুত এক পিকিং আমার। যে বয়সে সবাই স্বপ্ন দেখেছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হবে, আমি তখন আওড়ে যেতাম—
ইহার চেয়ে হতেম যদি
আরব বেদুয়িন!
চরণতলে বিশাল মরু
দিগন্তে বিলীন।
তখন থেকেই আমি নিজেকে ডিফাইন করি ‘মরুঝঞ্ঝার বেদুঈন’ হিসেবে। অথচ আজকাল আমার নিজেকে মনে হয় রূপকথার সেই দুখু মেয়েটা। যে বাতাসের পিছু নিতে নিতে পৌঁছে গেছে সমস্ত সাংসারিক ঐশ্বর্যের কাছে।
আগাগোড়া আত্মনির্ভর, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মাত্রায় স্বাধীনচেতা একটা মেয়ে কী করে যে ওই ঐশ্বর্যকে আপন করে নিয়েছে, তা প্রথম প্রথম আশ্চর্যই লাগত। আত্মনির্ভরতা বিসর্জন দেওয়া অত সহজ কথা না। তবু বোধহয় তিনটা উচ্ছ্বল শিশুর ছোট কাকি হওয়াতেই, ওদের নির্ভরতা অর্জনেই তা সহজ হয়ে গেছে। ওদের ছোট কাকির ভেতরে আমি যতটা নিজেকে খুঁজে পেয়েছি, স্ত্রী বা পুত্রবধূর চরিত্রে সেটা পাওয়া কখনো সম্ভব হতো না বোধহয়। ওদেরও তো সেই রুদ্ধতার শৈশব, যে শৈশব আমাকে দিয়েছিল চড়ুইয়ের দিন দেখার সাধ।
ওই অপূর্ণ সাধগুলো আমার শিশুমনটাকে আমার ভেতরে কোথাও আটকে রেখে দিয়েছে। খুব দ্রুত খেলাটেলা ছেড়ে আমি ঢুকে পড়ি ভাবনার জগতে। একা একা ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগত, একা বসে থাকতে অথবা বারান্দায়, জানালায় দাঁড়িয়ে থাকতেও ভালো লাগত। ভালো লাগত সাদা রং, সাদা কবুতর, সাদা মেঘ, সাদা চাঁদ, মেঠো পথে বৃষ্টি আর বিষণ্ণতা।
প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা শুরু করিনি, অথবা কেবলই শুরু হয়েছে এরকম ছোট বয়সে আমার একা একা বৃষ্টিতে ভেজার স্মৃতি মনে পড়ে। বাড়ির মেটে উঠান পেরিয়ে আমি কংক্রিটের রাস্তায় দাঁড়িয়ে একা ভিজছিলাম বৃষ্টিতে। সে কী ঝমঝম বৃষ্টি! কোথাও কেউ না থাকার সে কী আনন্দ! ওই অত ছোট বয়সে কী করে যে সে আনন্দ পেয়ে গেলাম, আর আটকে ফেললাম শিশুমনটাকে—জানি না।
সেই মনটা এমন এক অদ্ভুত জায়গায় আটকে গেছে, যাকে আমি চাইলেই যে কারও সামনে হাজির করতে পারি না। অথচ হুটহাট সে প্রকাশিত হয়ে পড়ত—খোলা কোনো প্রান্তরে দাঁড়ালে, ছায়াঘেরা পথ ধরে হেঁটে গেলে, বহুপথ হেঁটে হেঁটে নদীর স্রোত দেখতে পেলে অথবা কখনো স্রেফ এক টুকরো সফেদ মেঘ চোখে পড়লেও সেই শিশুমনটা লাফ দিয়ে বের হয়ে আসত। শুধু মানুষের সামনে আসত না। এই মনটাকে একেবারে উলটে দিল ওই উচ্ছ্বল তিনশিশু। একজনের ছোট কাকি, আরেকজনের নতুন কাকি আর সবচেয়ে পাকা বুড়িটার দুষ্টু কাকি।
সেই পাকাবুড়ি একদিন বলে বসল, ‘এই দুষ্টু ছোট কাকি, তুমি যখন বড় হবা, তখন কি আমরা তোমাকে বড় কাকি ডাকব?’
আমার শিশুমন আবিষ্কার করে ওরা ভাবে আমি ওদেরই বয়সি। আমিও বলে বসি, আমার ভাগের চিপস কই? আমার আটকে পড়া শৈশব এখন বেরিয়ে আসে সবখানে।
ওদের সাথে একটা সবুজ মাঠ পেলে আমার দৌড়ে বেড়াতে ইচ্ছা করে। ছায়াঘেরা পথে তিনজনকে হাতে ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের একসাথে ডিগবাজি খেতে ইচ্ছা করে। আকাশে তারা দেখলে, ভরা পূর্ণিমা অথবা নতুন চাঁদ দেখলে আমার সবাইকে ডেকে দেখাতে ইচ্ছা করে৷ একদিন জানালা খুলে দেখালাম ওদেরকে—দেখো কী গোলগাল চাঁদ, একদম এই পাকা বুড়িটার মতো। তিনজোড়া চোখ যেন ওই-ই প্রথম পূর্ণিমা দেখল। ওদেরকে আর জানালা থেকে সরানো যায় না। উঁচু উঁচু দালানের আড়াল থেকে চাঁদটাকে আরও উঁচুতে উঠতে দেখে চোয়াল ঝুলে যায় ওদের। ‘এ কী করে সম্ভব! চাঁদ কি আমাদের দিকে আসতেসে ছোট কাকি?’
আরেক পূর্ণিমায় চলে গেলাম আমরা রিকশায় চড়ে শনিআখড়ায়। ওদের ঘোর আর কাটে না। ‘এটা কীভাবে সম্ভব? এটা কীভাবে সম্ভব? আমরা যেখানে যাই, চাঁদও কীভাবে যাইতেসে? বলো না ছোট কাকি, চাঁদ কীভাবে নড়তেসে?’
চাঁদ কীভাবে নড়ে তা ব্যাখা করে দিলে এই বিস্ময়টা কি আর থাকবে? বড় হলে তো জানবেই। আজ না হয় বিস্ময়টাই থাকুক। শৈশবে সব জেনেশুনে আমিই বা কী করেছি? সেই তো ঢুকে পড়েছিলাম এক অনন্ত বিষাদের জগতে। যে জগৎ মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে রুখে দিয়েছিল মখমলি আনন্দের আসা-যাওয়া। সংসারের বাঁধনে জড়াতে না চাওয়া আমার মন কখনো কি ভেবেছিল, আমাকে তুলে নিয়ে আসবে সেই বিষাদের অতল থেকে তিনটা উচ্ছ্বল শিশুর এই ডাক—ছোট কাকিইইই!
চমৎকার। আপনাকে দিয়ে শুরু করলাম কেয়ারির স্বাগত সংখ্যা