কবিতার জরিদার খোয়াব

দাদার ট্রাংক

আমার জন্মেরও বহু আগে, যমুনা নদীর থেকে বেশ দূরের সরলিয়া গ্রামে আমাদের বনেদি বাড়ি ছিল। পুরা সরকার গোষ্ঠী একসাথে বসত করত। সে বাড়ির শান-শওকতের চাইতেও সবার একত্রে বসত করাই ছিল কিসসার মতো ঘটনা। সেই কিসসার মধ্যে একটা বিষয় আমার খুব মনে ধরত। আমার দাদার ট্রাংক। আমাদের সেই পুরানা বাড়িতে ডাকাত পড়েছিল আমার এক বড় দাদার লাইসেন্স করা বন্দুক জমা দেওয়ার পরপরই। শুনেছি, ডাকাতেরা ছিল চিনপরিচিত। প্রচুর কাঁসার থালাবাসন, বড় দাদার কলের গান, গ্রামোফোন রেকড, সোনাগয়নাসব অনেক জিনিসই। সাথে আমার দাদার একটা ট্রাংক। ট্রাংকভরা ছিল দেশি-বিদেশি বইয়ে।

আমি যখন নাইনে পড়ি, আমার সাহিত্য পড়ার ঝোঁক দেখে দাদা আমাকে আনা কারেনিনা আর ব্রাদার কারমাজভ পড়তে বলছিলেন। তখনই আমার মনে হইত নিশ্চয়ই ডাকাতি হওয়া ওই ট্রাংকের ভিতর এমন কোনো খাজানা ছিল যা আমার খোয়াবের দরজা খুইলা দিত। আমি কতদিন ভাবছি যে কী কী বই থাকতে পারে ট্রাংকের ভিতর! দাদা ছিলেন ইংরেজির টিচার। বগুড়া থেইকা আসামের একটা হাইস্কুলে ইংরেজি পড়াইতে গেছিলেন। দাদিসহ এক নৌকায় পাড়ি দিছিলেন আসামে। আমার বড় ফুপুর জন্মও আসামে।

দাদা আমারে এমন এমন বইয়ের কথা কইতেন যে আমি খালি ভাবতাম তাইলে ট্রাংকগুলার ভিতরে না জানি কী কী বই ছিল! নাইন-টেনে আমার চিন্তার খোয়াবরে বারবার নিয়া যাইত টিনের ওই বস্তুটার কাছে। আমার দাদার যে জমিজমা ছিল সবই যমুনায় ভাইঙ্গা গেছে। আমি নিজের চোখে সেই জাইগা ওঠা চর দেখিনি আজতক। ওয়ারিসসূত্রে কিছুই পাইনি আমি দাদার কাছ থেইকা খালি ডাকাতি হওয়া ওই ট্রাংকের স্মৃতি ছাড়া।

আমি এখনো খোয়াবে দেখি—গভীর রাত, মুখঢাকা একদল পরিচিত মানুষের কয়েকজন ধরাধরি করে চেনা আন্ধারের মধ্যে দিয়া একটা ট্রাংক নিয়া যাইতেছে যমুনা নদীতে বান্ধা বড় নাওয়ের কাছে। ট্রাংকভরা আমার কবিতার খোয়াব, আমার বাংলা বাক্যের সিন্ট্যাক্স, আমার পাণ্ডুলিপির পাতার পর পাতা ঘুমায়া আছে একটা জবরদস্ত ট্রাংকের ভিতর, কারা যেন নদীপার হয়া সমস্ত বইয়ের পাতা ডাকাতি কইরা নিয়া গেল আর ওয়ারিশসূত্রে আমার জন্য রাইখা গেল বাংলা কবিতার জরিদার খোয়াব।

একটা মামুলি আলমারি

আমার জীবনে পয়লাবার আমি লাইব্রেরি দেখছিলাম মাদরাসায়। তখন আমি ইবতেদায়ি রাবের তালেবে এলেম। মানে ক্লাস ফোর আর কি! দুই তলায় আমাদের ক্লাস রুমের পাশেই ছিল সেই লাইব্রেরি। বিরাট রুম। একটা বাঁশপাতা পড়ার নৈঃশব্দ্যও টের পাওয়া যাবে এমন সুমসাম নীরবতা ছিল লাইব্রেরিতে। স্টিলের আলমারির পর আলমারি সার ধইরা সাজানো। শত শত কিতাব। শুধু আরবি আর আরবি। সেইসব বইয়ের পাতা, বাঁধাই, কভারের সৌন্দর্য তো বাদশাহি ব্যাপার স্যাপার ছিল।

আমার ছিল ব্যাপক বাংলা বই পড়ার খায়েশ। কিন্তু আমি ভাবতাম এখানে বাংলা বই কই পাব! কিন্তু একদিন তালাশ করতে করতে খুব শাদামাটা, পুরানা হয়ে যাওয়া কাঠের একটা আলমারির খোঁজ পাইলাম। রং উঠে গেছে, ভাঙা কাচ, এলোমেলো বই। কেউই এই আলামারিটার কাছে যায় না। কারও আশলে দরকাই হয় না এই আলমারির।

ওই আলমারিতেই আমি তালাশ পাই বঙ্কিমের সমস্ত বইয়ের; রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা, গীতবিতান, বেশ কয়েকটা উপন্যাস, গদ্যের বই, গল্পগুচ্ছ। নজরুলের সঞ্চিতা, আলাদা আলাদা কয়েকটা একক কবিতার বই। উপন্যাস। ফররুখ আহমদের কবিতা, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা। তবে আমি সবচাইতে বেশি পড়তাম সুলভ শরৎ সমগ্র নামে ছোট ছোট হরফের দুইটা খণ্ড। শরতের প্রায় সব উপন্যাসই আমি পইড়া ফেলছিলাম তখন। কবিতা পড়তাম নজরুল , জসীমউদ্দীন আর রূপসী বাংলা। নজরুল আর নকশিকাঁথার মাঠ এত এত পড়ছি যে এই দুই কবির স্টাইল নকল করে ইবতেদায়ি সাদেসে প্রায় একটা লম্বা সফরের কাহিনিকবিতাও লিখে ফেলছিলাম।

আমার বয়স তখন ১২/১৩ হবে হয়তো। কিন্তু মাদরাসার ওই আজিব আলমারিটা আমারে সারাদিন টানত। ওখানে বসেই আসরের পর থেইকা এশার আগ পর্যন্ত বই পড়া যাইত। কতদিন যে বাতায়ন পাশের গুবাক তরুর সারির লাইন আওড়াতাম! সেই যে শেষের লাইনগুলো! রুপাই সাজুর জগৎ আর রূপসী বাংলার সেই রূপসার ঘোলা জলের কিশোর আমার মধ্যে কবিতার রুহ ছড়ায়া দিছিল তার জন্য সারাজীবন আমি ওই আলমারিটার কাছে শুকরিয়া বোধ করি। আশলে আল্লাহ আমারে ওই আলমারিটার কাছে নিয়ে গেছিলেন বলেই হয়তো আমি কবিতা লিখতে পারি! মাদরাসার একটা অতিমামুলি কাঠের পুরানা আলমারির বইয়ের পাতায় পাতায় খোদা আমার কবিতার তকদির লিখে রাখছিলেন। যেন আমার এই সফরের নাড়ি পোঁতা আছে একটা মাদরাসার লম্বা ঘরের শান্ত নীরবতায় ঢাকা ঘুনে খাওয়া, ভাঙা কাচের এক ধূসর আলমারিতে।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *