যুদ্ধ এবং হারিয়ে যাওয়া ভাই

রিয়াজ

অন্ধকারের পর্দায় ঢাকা পড়ে গেছে রাতের মুখ। নৈঃশব্দ হেঁটে বেড়াচ্ছে নিস্তব্ধ নিশুতি রাতের বুক মাড়িয়ে। বাতাস বয়ে যাচ্ছে, পাতা ঝরে পড়ছে, জোনাকিরা জ্বলছে, আর দূরে, অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর ডেকে উঠছে শিয়াল, ক্ষণে ক্ষণে কিচির-মিচির করে উঠছে রাতজাগা পাখিরাও। পাঞ্জাবের সীমান্তগ্রাম গুরনালার বুকের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে যে নদী, চপলা কিশোরীর মতো নাচতে নাচতে, তার মুখের ওপর ঝুলে আছে কুয়াশার রহস্যময় পর্দা। নদীর ওপারেই ভারত। মাঝখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাঁটাতারের বেড়া।

তরুণ সেনাঅফিসার রিয়াজ আহমেদ দাঁড়িয়ে আছে সীমান্তচৌকিতে। ঘুমজড়ানো চোখ, ক্লান্ত শরীর, কাঁধে বন্দুক। চোখের সামনে একটিই দৃশ্য—ওপারের আলো-আঁধারে ঘেরা ভারতীয় সেনাচৌকি, যেখানে দাঁড়িয়ে আছে ভারতীয় সেনারা, কাঁধে ভারী অস্ত্র নিয়ে অবিরাম দিয়ে যাচ্ছে পাহারা।

আকাশে মাঝে মাঝে আলো ঝলকায়, বিজলি চমকায়, কখনোবা বজ্র ধমকায়, আর রিয়াজ আহমেদের ভয়ে তখন হৃদয় থমকায়। দূর থেকে শোনা যায় রেডিওর ক্ষীণ শব্দ, সেই শব্দ তাকে জব্দ করে একেবারে স্তব্ধ করে রাখে, ভয়ে সে তখন তব্দা খেয়ে যায়।

মাঝে মাঝে মন যখন খুব খারাপ হয়, রিয়াজের চোখে ভেসে ওঠে তার মায়ের ছবি। সবুজ-সজীব যে গ্রামের মাটির ঘরে যমজ ভাইয়ের সাথে তার জন্ম, সেখানেই চুপচাপ বয়ে যাচ্ছে তার মায়ের জীবন। হারিয়ে যাওয়া যমজ সন্তান সিরাজের কথা ভেবে, রিয়াজের জীবন আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চেয়ে চেয়ে মায়ের জীবন বয়ে যাচ্ছে নদীর মতো, ক্ষয়ে যাচ্ছে পলিমাটির মতো।

রিয়াজ জানে, তার মা প্রতিদিন দুটো দোয়া করেন। একটি দোয়ায় থাকে তার হারিয়ে যাওয়া সন্তান সিরাজকে ফিরে পাওয়ার আকুতি। আর অন্য দোয়ায় থাকে রিয়াজের জন্য পরম ব্যকুলতা। মুনাজাতে তিনি সবসময় বলেন, ‘আল্লাহ আমার রিয়াজ যেন বেঁচে ফিরে আসে। আমার সিরাজ যেন বুকে ফিরে আসে।’

অরিন্দম

ওপারের সেনাচৌকিতে দাঁড়িয়ে আছে ক্যাপ্টেন অরিন্দম। কলকাতার ছেলে। কিন্তু তার জন্ম কোথায়, সে নিজেও জানে না। শুধু জানে, এক ব্রাহ্মণ তাকে কুড়িয়ে পেয়েছিল দেশভাগের সময়। এখন সীমান্তেই তার ঘরবসতি, যুদ্ধই তার নিয়তি, অস্ত্রচালনাই তার জীবন। রিয়াজের মতো সেও তরুণ, কিন্তু তার চোখে শুধু হতাশার ছায়া, পরিবার হারানোর বেদনা, এবং যুদ্ধের ক্লান্তি।

তার রেডিওতে খবর আসছে, পাকিস্তানের দিক থেকে অস্বাভাবিক নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে। তবে কি যুদ্ধ অত্যাসন্ন? যুদ্ধ মানেই মৃত্যু আর ধ্বংসের সঙ্গীত। তাই সে যুদ্ধ চায় না।

রাত যখন দুটো বাজল, হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ল আগুন, গর্জে উঠল কামান, সীমান্তের নিস্তব্ধতা হয়ে গেল ছিন্নভিন্ন, গোলার আওয়াজে থেমে গেল নদীর স্রোত।

রিয়াজ ও অরিন্দম—দুজনই নিজেদের দেশ রক্ষায় দলবল নিয়ে টিপে যাচ্ছে ট্রিগার, দাগিয়ে যাচ্ছে কামান, ছুড়ে চলেছে বিধ্বংসী বোমা। ওরা কেউ কারও মুখ চেনে না, ওদের মধ্যে ব্যক্তিগত কোনো বিরোধও নেই, কিন্তু দেশপ্রেম ওদেরকে পরস্পরের শত্রু বানিয়ে দিয়েছে।

রাত যখন শেষ হয়ে আসছে, ভোর যখন উঁকি মারছে, পাকিস্তানি এক সোলজারের গুলি এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয় অরিন্দমের কাঁধ। আহত অরিন্দম গড়িয়ে পড়ে যায় নদীতে, ভাসতে ভাসতে তার দেহ চলে আসে সীমান্তের এপারে, পাকিস্তানি সেনাচৌকির কাছে। পাকিস্তানি সেনারা তাকে উদ্ধার করে, তারপর নিয়ে যায় হাসপাতালে।

রিয়াজ নিজেই যায় তাকে দেখতে। যখন তার ওপর চোখ পড়ে, সময় যেন থেমে যায়। যেন সে নিজেকেই দেখতে পায় অরিন্দমের চেহারায়। অবিকল তার মতোই চোখ অরিন্দমের। রিয়াজের মতো তারও নাকে তিল, চোখের ওপর জন্মদাগ, চওড়া কপালে আঁচিল। রিয়াজের বুকের ভেতর হৃদয় যেন থমকে থাকে। অরিন্দমকে সে বলে, ‘আমাকে কি তোমার চেনা চেনা লাগছে না?’

অরিন্দম অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে রিয়াজের দিকে। সে ফিসফিস করে বলে, ‘কে তুমি? তোমার চেহারায় যেন আমি আমাকেই দেখতে পাচ্ছি।’

রিয়াজ কেঁদে ফেলে। ‘আমি আমার হারানো যমজ ভাইকে খুঁজে ফিরছি পঁচিশ বছর ধরে। সে দেখতে ছিল অবিকল আমার মতোই। মা বলেছিল, আমার যমজ ভাই সিরাজের রানে কাটা দাগ আছে। ছোটবেলায় কেটে গিয়েছিল চাকু দিয়ে।’

এবার অরিন্দমের চোখে অশ্রুর বান ডাকে। সে তার রানে হাত দেয়। কাটা দাগটাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করে। আলতো হাতে সে জড়িয়ে ধরে রিয়াজকে। বলে, ‘আমিই তোমার হারিয়ে যাওয়া ভাই।’

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *