শ্যাডো অব হ্যাপিনেস

বিষণ্নতার মিহিন শ্যাওলার চাদরে জড়ানো সেই আমিটাকে ভীষণ মনে পড়ে। এখন শীতের বিকেলের কমলা রঙা রোদের মতো সুন্দর জীবন। অথচ এইসব দিনের প্রতীক্ষায় কতদিন সংসার করে গেছি কবিতার সাথে। ভবঘুরে, আত্মভোলা হয়ে।

শ্যাডো অব হ্যাপিনেস লিখতে বসে নামটা নিয়ে ভেবেছি বেশ কতটা সময়। সুখের কী কখনো ছায়া হয়? ছায়া তো হতে পারে দুঃখের। পরক্ষণেই মনে এলো, রোদের মতো উজ্জ্বল সুখেরও তো থাকে অন্ধকার দিক। সুখী জীবন আমাকে বিষণ্নতা আর একাকিত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছে বটে, সেইসাথে হারিয়ে ফেলেছি আমার আমিকে—যার কিনা দুঃখবিলাসই ছিল প্রকৃত সুখ।

এখন জীবন এমন—ঘুম ভাঙে এক দেবশিশুর কলহাস্যে। বারান্দায় রোজ সকালে ফুটে থাকে মসরোজ, এরোমেটিক জুঁই আর নীল অপরাজিতার দল। শীত সকালে রোজ শিউলি কুড়োতে পারি কোঁচড়ভরে। অথচ মনে পড়ে এই শিউলি কুড়োব বলে কী ভীষণ এক্সাইটমেন্টে জেগেছিলাম সমস্ত রাত! ভোরবেলায় হাইস্কুলের গাছের শিউলি ছুঁয়ে দেখার পর মনে হলো—যেন আমপাতার ফাঁকফোকর গলে রোদে ভিজে যাচ্ছে উঠোনের মাটি আর আমি তার ওমে চোখ বুঁজে আছি তুমুল আনন্দে।

এইসব দিনের আগে দুঃখ ছিল সোনামুখি সুঁই হারিয়ে যাওয়ার মতো তুচ্ছ ব্যাপারেও। কেন যে অত দুঃখ ছিল! ক্ষণে ক্ষণে অকারণ মনখারাপ আর কবিতার কাছে ফিরে ফিরে যাওয়া। যেন মায়ের আঁচলে চোখ মুছছি। শালিকের মতো সুখী সংসার চেয়ে যে আমিটা কাতর হয়ে থাকতাম দিনমান, পেয়ে যাওয়ার পর কবিতার বিরহে ছটফট করি।

জগতে আমাকে ভালোবাসবার মতন লোকের অভাব দেখিনি কখনোই। আমি ভালোবাসব এমন কাউকে পেতে পেতে কেটে গেছে দীর্ঘ একটা সময়!

এই যে এখন সবই হাতের কাছে, তবুও মনে হয় কী এক শোকে স্তব্ধ হয়ে থাকি, বিরহে নীল হয়ে যাই অকারণেই। আসলে কবিতা জানা লোকের জীবন পারফেক্ট হতে নেই। দুঃখ, শোক, মানুষ হারানোর বেদনা—এসবেই মূলত আনন্দ। নীরবে বয়ে চলা রোদ্দুরকে এখন ধরতে পারি। ভাসা ভাসা দিনের দিকে শূন্য মাথা নিয়ে তাকিয়ে থাকবার ফুরসত মিলে না। সরাইখানার ব্যস্ত মালিকের মতো সংসারধর্মে দিন চলে যাওয়ার মতো সময় চেয়েছি অফুরান অবসরে। চিলতে বারান্দার দুয়ারে বসে রোদের ওমে উৎপল কুমারের সমগ্রে ডুব দেওয়ার দিনগুলো এসব সময়ে অলৌকিক কোনো স্বপ্নের মতো।

এতসব সব প্রাপ্তির ভিড়েও একটা অন্যরকম জীবনের চাওয়া আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকে। কখনো কখনো মন চায়, মেরুন রঙা শাল জড়িয়ে ডিসেম্বরের কোনো সকালে নরম রোদ আর কুয়াশা গায়ে মেখে গলির মুখে হেঁটে যাই। টং দোকানের যে মামাটা ঘন করে চমৎকার দুধ চা বানায়, তার দোকানে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে দেখি—রোদ্দুর কড়া হতে থাকলে কেমন করে কুয়াশারা পালিয়ে যায়।

মূল সড়কের ফুটপাতে একটা সবজিওয়ালা ভ্যান নিয়ে সকালটা কাটায়। সেখান থেকে নানান রঙের সবজি বেছে নিই। মিষ্টি কুমড়ো, গাজর, শিম, টকটকে লাল টমেটো আর কিছুটা গোলাপি রঙে মাখানো নতুন আলু। বাড়ি ফিরে শোল মাছের ঝোলে খোসা ছাড়ানো নতুন আলু রান্না শেষে ধনেপাতা ছড়িয়ে দিই পাতিলে। তখন বছর শেষের সেদ্ধ জলপাই রঙা কোমল রোদ রান্নাঘরের জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকছে।

বাসার গেটে কার যেন একটা লাল সাইকেল থামানো। ছাদের কার্নিশ ঘিরে ওড়াউড়ি করছে একদল শাদা পায়রা। আমি কেমন ঘোরগ্রস্তের মতো এসবে জড়িয়ে যেতে যেতে দেখি—আকাশজুড়ে হালকা ছাইরঙা মেঘের মতো উড়ে যাচ্ছে আমার কবিতা, বিরহ ভুলে যাওয়ার দিন। নরকের মতো যে সংসারটা আমি একটা সময়ে চেয়েছিলাম, তার কথাও কী মনে পড়ে না! বিছানার পাশের ছোট্ট টেবিলে রাখা গ্রামোফোনে তখন হয়তো বাজছে রবিবাবুর কথাগুলো।

করুণ সুরে কে যেন গেয়ে যাচ্ছে—তুই ফেলে এসেছিস কারে মন মনরে আমার…

মন্তব্য লিখুন (1)

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *