নরসিংদীর বাবুরহাট-শেখের বাজার নেমে মাইলের পর মাইল ছাড়িয়ে কোন এক গ্রাম, রাত তিনটায় অটো রিকশা থেকে নেমে এলাম আমরা সাতজন, ভাবনগরের বাঁশনির্মিত দরোজায়। গ্রামের মেঠোপথের যেখানে শেষ, যার ডান দিকে বাঁদিকে পেছন দিকে শুধু দিগন্তে বিস্তারিত ধানক্ষেত, এমন একটি রাস্তার শেষবিন্দু, বা ধরে নেওয়া যায় শুরুবিন্দুই, তিন হাত মাটি ফেলে উঁচু করা পনেরো কাঠা ভূমির ওপর এই আখড়া। আটচালা টিন ও কাঠ নির্মিত একটা বড় ঘর, মেঝে পাকা, কংক্রিটের খিলান, ঘরের দেয়াল থেকে দুই গজ ছেড়ে মেঝের ওপর দুই ইট উঁচু করে আরও একটি মেঝে, টাইলসে মোড়া, তাতে ঢালাও বিছানা পাতা। খিলানগুলোতে ঠেস দেওয়ার জন্য বালিশ পাতা। আমরা চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশরত হতেই তায় অবস্থানরত সাধু গুরুগণ আমাদের জয় গুরু জয় গুরু বলে দুই হাত ঊর্ধ্বে জোড় করে আন্তরিক হাসি মিশ্রিত স্বাগত জানালেন, রাত তিনটায়।
ঘরের বাইরে দুটো পাকা বাথরুম। টিনের রান্নাঘর, ভেতরে কাঠ মরা পাতা লাকড়ির জোগাড়, মাটির চুলায় রান্নাবান্নার ব্যবস্থা। ঘরের বাইরে পুরো আখড়ার বাউন্ডারি জুড়ে নানাবিধ ফুল গাছ, জবা, বকুল, সজনে, আম গাছ, কাঁঠাল, একপাশে সবজি খেত। আম মুকুল স্তর পেরিয়েছে অনেক আগে, এখন ভরা বোশেখ, পাকবার আগের কচি সবুজ কষে ভরন্ত, নুইয়ে পড়েছে দুগ্ধবতী গাভীর ওলানের মতো। বেশিরভাগ আমগাছ আমাদের মুখ সমান শূন্যে ফল দোলাচ্ছে, এক ফুট উচু গাছেও আম ধরে আমাদের হাঁটুরও নিচে ঝুলছে। গাছের নিবিড় ছায়া ও শান্তি সর্বক্ষণ, ঘরের প্রবেশদ্বারের দুইপাশে দুই মিষ্টি গন্ধবতী গুল্ম। কেবল শহরের ইটকাঠ ধোঁয়া ছাড়িয়ে আসা আমাদের কাছে এইটাই মনে হলো তপোবন।
কয়েকটা ছোট নির্দেশনা চোখে পড়ল লেমিনেটেড করে ঝোলানো। গানের সময় কথা বলা নিষেধ। ঘরের ভেতর সিগারেট খাওয়া নিষেধ। একটা খুঁটির মাথায় ঝোলানো বড়ো ফটোফ্রেম। তার বর্ডারের ভেতর শাদা উত্তরীয় পরে, রবীন্দ্রনাথের মতো দাড়ি গোফ; তারচেয়েও বেশি ঘন গাঢ়, কাঁচাপাকা শ্মশ্রুমণ্ডিত এক আকুল দরবেশ বসে আছেন হাতজোড় ধ্যানের নত ভঙ্গিতে, চক্ষুদ্বয় গভীর ভাবে বন্ধ নিমীলিত, ফরসা হাতে দুর্লভ পাথরের আংটি তার অভিজাত রুচির সূক্ষ্ম স্বাক্ষর। ছবির নিচে লেখা—বীর মুক্তিযোদ্ধা সাধু হুমায়ুন কবির। অপরপাশের দেয়ালেই হোম থিয়েটারের বিগস্ক্রিন টিভির মতো সাইজের এক ছবি, এখানেও ফটোফ্রেমের লোকটি ভক্তবেষ্টিত হয়ে বসা। কিছুটা চিন্তিত ভাবাবিষ্ট এলানো বসে থাকা। বামপাশে কেতাদুরস্ত শার্ট প্যান্ট পরা হাস্যোজ্জ্বল, হয়ত কোন সরকারি আমলা, ডানপাশে দোতারা হাতে এক গামছা কাঁধে তরুণ, হাতে ছবির ক্যাটালগ নিয়ে দেখছে। ছবিতে থাকা ঘরটার মধ্যখানে বিভিন্ন জিনিসপাতি জমা করা। আজমির শরিফের একটা মিনিয়েচার ভাস্কর্য। মাটির মালসার ওপর গলে জমাট মোমের স্তুপ একটা মিনারের মতো উঠে গেছে। চূড়ায় আগের রাতে জ্বলা কোনো মোমের অবশিষ্ট বেকার এক তৃতীয়াংশ। লেক্সাস বিস্কুটের প্যাকেট। বইপত্র ইতস্তত ছড়িয়ে। হারমোনিয়াম ঢোল তবলা একতারা সারেঙ্গি—নানারকম দেশজ সঙ্গীত সরঞ্জাম রাখা। ছবির নিচে বড় করে লেখা, ভক্তবেষ্টিত হুমায়ুন সাধু (১৯৫৮-২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ)
আমাদের প্রবেশ করা আজকের ঘরটাও প্রায় সেরকম। মাঝে শুধু আজমির শরিফের মিনিয়েচারটা নেই। আখড়ার ঘরে সোনাকান্দা দারুণ উলুম কওমি মাদ্রাসার ক্যালেন্ডার, লালনের ছবি, রবীন্দ্রনাথ আছেন, নজরুল। আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা মো: মোমিনুল সাধুর ছবি। ভাবপ্রধান এক গ্রাম, দশ লোকের যৌথ উদ্দোগে গড়া। সারাদিন কোনো না কোনো সাধুগুর, ফকির, বাউল বাউন্ডুলে গানওয়ালারা থাকেই। সন্ধ্যায় কাজকর্ম ফুরালে গ্রামের অনেকেই আসে, ভাবসঙ্গ করে। চলে গভীর রাত অব্ধি। প্রশান্তিরও হৃদমন্দিরে এসো হে দয়াল… বলে যখন সাধক অবরোহ টান ধরেন, ডায়িং কারখানায় সারাদিনের খটাখট কাজে মলিন লোকগুলোর অন্তরের ক্লেদ সব কালো জলের মতো বাতাসের নালা ধরে মেঘনার দিকে ভেসে যায়। এই রাতে, বাবুরহাটের বিখ্যাত গামছা ফ্যাক্টরিগুলোর নীল বিষাক্ত পানিও মরা বিল ধরে কোনো এক শাখা নদীতে গিয়ে পড়তে থাকে।
খাওয়া ও খাদ্য : অন্নসেবা
নারায়ণগঞ্জের আন্ডার কনস্ট্রাকশন হাইওয়ের তিন ঘণ্টা ফজর-ডাকানো প্রতীক্ষার মত জ্যাম ছুটিয়ে ভাবনগর পৌঁছাতে অনেক রাত। বাবুরহাট বাসস্ট্যান্ডে নেমে এক জমজমাট রাতের হোটেলে ঢুকেছিলাম সবাই। তখন চিশতি ফোন করে বললেন, তারা আমাদের জন্য রাতের খাবার তুলে বসে আছেন। রাত তিনটা পেরোল, হাত মুখ ধুয়ে সকলে গোল সারিবদ্ধ বসতে বসতে। দুইজন তরুণ সাধু সিলভারের প্লেটে খাবার সাজাচ্ছে। সাদা ভাত, খেতের আলুভর্তা কাচা মরিচ দিয়ে, আর আস্ত রসুন দিয়ে আলু ভুনা, শুঁটকির মতো লালচে শুকনো ঝোল, কিন্তু শুঁটকি নয়। সম্পূর্ণ নিরামিষ। সাধুগুরুগণের আশ্রমে খাদ্যগ্রহনকে বলে সেবাগ্রহণ। এ ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একরকম আধ্যাত্মিক আচার। পরিবেশনকারী তরুণ প্লেট নিয়ে প্রতিজনের সামনে এনে রাখছেন, করজোড়ে জয় গুরু বলে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন, যার সামনে খাদ্যটা রাখা হলো, তিনিও ফিরতি করজোড়ে বিনয়ে ঝুঁকে জয় গুরু বলে উত্তর দিচ্ছেন। বাউল বৈষ্ণব ধারায় মানুষ মাত্রই এমন পূজনীয়, মাননীয়। প্রচণ্ড ক্ষুধাবশত, ২২ বছর বয়সী রিশাদ পাত পেয়েই সাদা ভাত ভেঙে মাখাতে শুরু করেছিলেন। খাওয়ার আসরে মধ্যমণি যিনি থাকেন, সাধু সঙ্গের গান বা তত্ত্বকথার প্রধান, সেদিন ছিলেন রনি বাউল, একটু স্মিত হেসে হাতে অনুনয়ের মুদ্রা তুলে বললেন, আম্মাজি, একটা মিনিট পরে শুরু করেন…
একজন মলিন ফতুয়াপরা অল্পবয়সী সাধু সবার সামনে বালতি ও বোতল নিয়ে এলেন। প্রত্যেকের হাত ধোয়ানো হলো যত্নে। প্রতিটা ব্যক্তিকে এখানে খুবই ইন্ডিভিজুয়াল জায়গা থেকেই অ্যাড্রেস করা হয়। যে এখনো অচেতন, চৈতন্যে স্বতন্ত্র ব্যক্তিরূপের উদ্ভাসন ঘটে নি, যেন তার মগ্ন নিলীমার ভেতর ঘুমন্ত সে মনের মানুষটাকেই র্চনায়, উচ্চারণে, আচরণে সুচেতনার আলো দেখাবার চেষ্টা। রূপনারানের কূলে যদি জাগে সে কোনো দিন…
হাত ধোয়া শেষ হলে খাদ্য পরিবেশনকারী ঊর্ধ্বে টাঙানো বাবা হুমায়ুন সাধুর পুষ্পমাল্য জড়ানো ছবির নিম্ন-চারপাশে একবার আগরবাতির ধুপ ছড়ালেন। এরপর জনে জনে সবার সামনে দিয়ে সুগন্ধ ধোয়া টেনে নেওয়া হলো। খাদ্যগ্রহণ বা সেবাগ্রহণও যেহেতু এখানে ইবাদত, ব্যক্তির হাত ও মন দুটোই শুদ্ধ করে নেয়াটা তার প্রাক-প্রস্তুতি বলেই মনে হলো। রনি বাউলসহ বাকি সাধুগুরুরা, আমাদের সাতজনের যারা আগেও সঙ্গ করেছেন তারা তিনবার মাটি ছুয়ে আল্লা আলেক বললেন, বাদশা তার দরবারে প্রবেশের পূর্বে রাজঘোষক যেমন দরাজ গলায় প্রভুর নামোচ্চারণ করে…কিন্তু তখনো খাওয়া শুরু হলো না।
খাদ্য বণ্টন যিনি করছিলেন, অনুরোধের স্বরে বললেন, সেবা গ্রহণ করেন গো সাধু গুরুরা… ঝিঝির অনবরত ডাক আর ধান ক্ষেত ছুয়ে আসা বাতাসে রাত থমথম, গম্ভীর ভক্তিপূর্ণ ভঙ্গিতে আহার শুরু হলো।
আমরা যারা ঘোর সংসারি, বস্তুবাদী, স্বার্থপর, ভোগী—তারাও এক রাতের জন্য এ আশ্রমে আশ্রয় নিয়ে সাধুগুরুর মর্যাদা পেলাম। এভাবেই এখানে প্রতিটা মানুষ সমমর্যাদার হলো… দুইরাত সেখানে অবস্থান করেও কার কী নাম কার কী ধর্ম আমরা জানার প্রয়োজন বা পরিবেশ কোনটাই বোধ করিনি। লালন বলে জাতের ফাতা ডুবিয়েছি সাধবাজারে…
খাওয়া শেষেও সেইরূপে হাত ধুইয়ে গেল। জানি না, প্রতিবেলাতেই এতগুলো অপরিচিত মানুষকে বিনামূল্যে বিনা কৃতজ্ঞতায় কেন এ মানুষগুলো দরদি সেবা দিয়ে গেল? মানুষরূপে গুরুপূজা ছাড়া আর কী প্রকারেই তার ব্যাখা হয়!
পরদিন দুপুরে সেবায় যুক্ত হলো সামান্য মাছ। ডাল। কয়েক প্রকার শাকের এক রসনা কনসার্ট। দুর্বাঘাস, শিব-শাকও নাকি ছিল। জীবনের প্রথম খেলাম। খুব স্বাদ হলো, কিন্তু বিচিত্র স্বাদটাকে ঠিক একমাত্রিক বর্ণনায় স্পষ্ট করা যায় না। কথায় কথায় আমান সাধু বললেন, পাহাড়ি এক সাধুসঙ্গের স্মৃতি। এমন আশপাশে যা পাওয়া যেতো তুলে এনে তারা অমৃত রান্না করতেন।
খোকন চিশতির বাড়ি কিশোরগঞ্জ। ভাটি অঞ্চলের লোক। যুবক বয়স। গান ও ভাব নিয়ে বাড়ি ছেড়েছেন বহুদিন। মাজারে আখড়ায় সঙ্গে পরে থাকেন। দশ বারো প্রকার যন্ত্র, কিছু বই নিয়ে তার সংসার। কত যে গান শোনালেন দরদি। পরদিন সন্ধ্যাবেলায় দেখলাম এক ভক্ত আশ্রমে এসে চিশতির কাছে বসে ব্যাগ খুলে কিছু তরিতরকারির নজরানা পেশ করলেন। বললেন, ভালো শুঁটকি এনেছি। এভাবেই চলে, নিজেরা খান, দুনিয়ার যে কেউ আসুক, তার জন্য উদার সেবা প্রস্তুত। ফকির ও ফকিরের মেহমানের থালা আল্লা পাক কোনো না কোনোভাবে পূর্ণ করেই রাখেন। ভান্ডারের মালিক।
খাওয়া প্রসঙ্গে এক সাধু বললেন ফরিদপুরের এক পাগলের আস্তানার কথা। নদীর মধ্যে একটা আদিম যুগের চর, বর্তমান যুগের কোনো মানুষ সেখানে থাকে না। শুধু ওই সাধক আর তার প্রকৃতির বাসস্থান, খোলামেলা ছাপড়া। বাতাসে ঘরের আসবাবপত্র উড়ে যায়। যেমন সাপ এসে ঢুকে পড়ছে, কাচা মাছ মুখে তুলে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। কুল মাখলুকাতের অবাধ আনা যানা। যার যা ইচ্ছা নদী থেকে তুলে, জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করে এনে বসিয়ে দিচ্ছে চুলায়। রনি বাউল ১০ কেজি ওজনের এক ইয়া বড় কাতল ধরে খাওয়ার গল্পটা বললেন খাওয়ার মাঝে। সে কী আনন্দের থাকা, প্রাকৃত বাঁচা ও ভোজ…
গান : ভাবসঙ্গ
পুরোটা সময় যেন সুরের ভাবের সরোবরে মন্থন করেই কাটল। অনেক রাত, রনি বাউল সদালাপি কৌতুকপ্রিয় রসবান ব্যক্তি—বেশ কিছু গান করলেন। আরও অনেকেই গভীর রাত অব্ধি আমাদের জন্য অপেক্ষা করে বাড়ি ফিরে গেছেন। গান চয়নে চমৎকার একটা ব্যাপার ঘটল। নানা রকমের নানা মতের বিশ্বাসের এই নতুন সাতটা মানুষ যেন বিন্দুমাত্র দূরত্ব অনুভব না করেন, একাত্ম হয়ে যেতে পারেন সমভাবে, সম্ভবত তা ভেবেই রনি বাউল খুব পরিচিত, জনপ্রিয়, সিরিয়াস বাউলভাব তত্ত্ব গানের তুলনায় যা কিছুটা লঘু বলেই বাজারে প্রচলিত, ইউটিউবে মিলিয়ন ভিউজ, তেমন গানগুলো ধরলেন। চঞ্চলও মন আমার শোনে না কথা, অথবা ইঞ্জিনেরই আগুনের কল গাড়ির কত বল, কিংবা ধনধান্যে পুষ্পে ভরা… সবাই তালে তাল প্রাণে প্রাণ মেলাতে পারল।
এই গানসঙ্গেরও কত যে বিচিত্র নিয়ম, ব্যাখা, উদ্দেশ্য, ব্যাপার ও বিশ্লেষণ আছে! বলে যে, সবারই কিছু না কিছু বাজাতে পারা উচিত। হোক সারেঙ্গি, হারমোনিয়াম, ঢোল বা সামান্য মন্দিরা বা করতাল। গান মূলত ঐক্য। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় গায়ক গাচ্ছে, একেকজন একেক যন্ত্র বাজাচ্ছে, হুলুস্থুল বিচ্ছিন্ন ব্যাপার। কিন্তু এই কর্মযজ্ঞের ভেতরেই খুব সূক্ষ একটা ছন্দ আছে, একটা জ্যামিতি, সারগম নিয়ম ধরেই যেহেতু আগায়, একতাবদ্ধ হওয়া আছে, পরস্পরনির্ভরশীলতা আছে, স্পেস দেওয়া আছে, দায় নেওয়া আছে, দরদ আছে। নতুন চাঁদের মত বাকা সারিধরে একের পর এক পাশাপাশি বসা জোয়ানবুড়ো বিভিন্ন বয়সী বিভিন্ন ধরণের পোষাকের সাত আটজন—জেনারেশন, রুচি, ভঙ্গি সব আলাদা, কিন্তু একটা গানের মিল সবাইকে একটা কবিতার নানা মাত্রার ছন্দে ক্রিয়াশীল করে দিয়েছে—এদের সকলের হাতে কোনো না কোনো যন্ত্র, সবাই বাজাচ্ছে, দৃশ্যটার ভেতর কী যে এক ছান্দসিক যৌথতা, কমিউনিস্ট মুড অফ সুর প্রোডাকশন! কোন সুরই গৌন নয়। একটু মন দিয়ে শুনলেই প্রতিটা যন্ত্রের আলাদা করে বাজা, যন্ত্রীর শ্রম ও দম টের পাওয়া যায়।
শুধু একতাই নয়, শেখায় বিনয়, বোঝায় আমি বলে সংসারে কিছু নয়… দশজনে মিলে যখন একটা গান করে, দশজনের দশ রকম প্রতিভার অপরিমিত মাত্রার স্ফুরণ ঘটতে থাকে, যার ফলে কোনো একজনের প্রতিভা মুখ্য হয়ে ওঠবার সুযোগটা ঢাকা পড়ে যায়। গরিমা জন্মায় না। বিপুল সুর কোলাহলের সমুদ্রে নিজেকে একফোঁটা জলের অধিকারী বলে মনে হয়।
একজনের উদাহরণ দিলেন আমান সাধু। সঙ্গে আসার আগে বাউলধারার গান টান করত, সাধুসঙ্গে যাওয়া আসা শুরুর পর গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। বুঝেছে, শুধু সুরের কারিশমা দিয়ে হয় না, ভাবটাই আসল, বাকি সব ফাঁকি। সুরটা দরকারও পরে না। কেবল সুরচর্চায় যশোপ্রার্থী যারা, সাধনা তাদের কাছে একসময় পানসে হয়ে ওঠে। কোন সময়ে কোন ধরনের গান, কোন প্রকারের ভাব ও রাগ—তাও সামষ্টিক চেতনায় অলিখিত কিন্তু সুনির্ধারিত। ফাঁকির কোন সুযোগ নেই। সে ভবনদী বাইতেই ব্যয় হয়ে যায় বছর বছরকার সর্বত্যাগী সাধনা—প্রকৃত সারস বাউলের….
ভোরের আলো ফুটলো গানে গানে। আমরা আশ্রম থেকে বের হলাম ঘুমের আগের প্রাতভ্রমণে। এরপর আর কোনো গ্রাম নেই ঘর নেই বাজার নেই দোকান নেই ইলেকট্রনিক খুঁটি নেই। চারিদিকে শুধু সবুজ ধান ক্ষেত। শুধু দৃশ্যকে বিব্রত করলে খেতের আইলের চারপাশে দড়িতে ঝোলানো কিছু বেমানান পলিথিনের খণ্ড। একপাশে বনের মতো ঘন গাছপালা, উঁচু জমি। মনে হয় নিয়ান্ডারথালদের যুগ থেকে এইটুকু বন বেদখল পরে আছে এই পৃথিবীতে।
এমন বোশেখেও খেতে চায়ের কাপের মতো ঘন কুয়াশার আস্তর। সেই কুয়াশা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভেদ করলে দেখা যায় দূর হাইওয়েতে সাঁই সাঁই ছুটে যাচ্ছে ভোরের শিশির মাখা ট্রাক বাস প্রাইভেট কার। অচিনপুরের কোনো মসজিদের মাইক থেকে ঘুমমাখা কণ্ঠে কোনো মরহুমার মৃত্যু সংবাদ ঘোষণা করলেন মুয়াজ্জিন, ইথারে ইথারে ছড়িয়ে পড়ল তা। সমস্ত ভোরের ধানখেত কেমন ছমছম করে উঠল। আমরা কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম গোষ্ঠ গানের মরমের ভেতর মাথা রেখে। এখানে সারারাত অ অনবরত ডেকে উঠেছে কে এক আকুল বউ কথা কও পাখি….
উঠতে উঠতে দুপুর। টিনের ঘরের ভেতর হাসফাস বোশেখ। তবুও রাজ্যের ঘুম আর প্রশান্তির মনপ্যাগোডা। শহুরে আরামে প্রসাধন-চর্চিত চামড়া একপর্যায়ে অবাধ্য হলো। গোসলে গেলাম। ডিপ টিউবওয়েলের ঠান্ডা প্রাণ জুড়ানো জল আবে হায়াতের মতো চামড়ার সমস্ত পিপাসার্ত শুষ্ক কোষকে যেন নতুন প্রাণে আহ্লাদিত করে তুলল।
দুপুরের অন্নসেবা হলো, চাতালে বসে সাধুগুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে বিকেল গড়িয়ে এলো। রোদের তেজ কমল।
খোকন চিশতি
পূব দিকের দরোজাটা খুলতেই ঘরের দুয়ারে অবারিত ধানক্ষেত প্রকাশিত হয়ে পরে। ধানকাটা মাঠে ফুটবল নিয়ে খেলছে অজপাড়াগাঁর ইয়রোপিয়ান ক্লাবের জার্সিপরা একদল শিশু। একটা মরা গাছের ডালে উদাস অলস দুপুরকে গায়ে মেখে বসে আছে লম্বা লেজ অলা এক ফিঙে। আমরা গোল হয়ে বসেছি ছোট ভাতঘুম শেষে। চিশতির গান ও আলাপ শুরু হলো। প্রতিটা গানের শেষেই সমস্বরে জয় গুরু বলে গায়ককে অভিবাদন জানিয়ে গানের দুয়েকটা তত্ত্বকথা, কখনো এমনিই সহজ দুটো ভাবের কথা আলাপ হয়। কখনো গান হয় না, শুধু সারেঙ্গি বাজতে থাকে একা, কোন গানের সুরকে অনুসরণ করে।
চিশতিকে সারাদেশ প্রথম দেখেছে ২০২২ সালে, এক সাধুসঙ্গের আশ্রম ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। কয়েকটা গানের যন্ত্র ভেঙে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ভেতরে থাকা সাধুগুরুদের প্রতি নির্যাতন শুরু হলে যে যেদিকে পারে ছুটে আশ্রয় নেয়। খোকন চিশতি পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। সে ছবিটা পত্রিকাওয়ালারা তুলে রেখেছে।
এখন দৃশ্যটা হাস্যকর মনে হলেও, ঘটনাটির ঘটমান সময়ের হাড়হিম নৃশংসতা, সাধকের, দরদি মনগুলোর অসহায়তা, অপমান, বিহ্বল প্রাণভয় বুঝতে পেরে মনটা খারাপ হলো। এক বাউল আফসোস করে বলেছিলেন, ওই সময়ে একটা আশ্রম আর কয়েকটা যন্ত্র ভাঙাটাই বিশ্বমিডিয়ায় আলোচিত বিষয় হয়েছিল। দেশে বিদেশে হাজার হাজার লোকের প্রতিবাদ সভা, নিন্দা বিবৃতি। আর আজ বাউলের কবর থেকে লাশ তুলে পোড়ায়ে দেয়, জ্যন্ত সাধককে পিটিয়ে হত্যা করে, কারও কোনো রা নেই, দেশে আরও কত বড় বড় ইস্যু। এমন এক কিংকর্তব্যবিমূঢ় দুঃখ—যার সমবেদনার সমকক্ষ কোনো শব্দ আমি খুঁজে পাই না।
বাউলের অতল বিনয় ও আকুতি, সম্মান ও প্রণতির ব্যাপারে সমাজ নিরেট অজ্ঞ। সাধারণত কী দেখি, গান চলাকালীন আজান হলে লোকে গান বন্ধ করে, আজান শেষ হলেই আবার চালু। বাউলরা আজানের সময় তো বটেই, নামাজ শেষ হওয়ার সময় অব্ধি অপেক্ষা করেন। যেন দূর থেকেও শেষ নামাজির ধ্যানে বিঘ্ন না ঘটায় তাদের শব্দ।
অবশ্য এগুলো নিয়ে তাদের বিষণ্নতা দেখলাম না। জগতে কী করলেন? জিজ্ঞেস করলে উত্তর আসে, কিছুই করলাম না, প্রেম করলাম। সাধুগুরুদের পারস্পরিক আলাপ, ভাবসঙ্গই তো বড় প্রেম।
তবুও মধ্যরাতের গানের মাঝে কোথাও একটা অনিরাপদ শঙ্কা মনে হামাগুড়ি তো দিয়েছেই। কে জানে, ধানখেতের আড়াল থেকে মশাল হাতে পায়ে পায়ে বেরিয়ে আসছে কিনা অন্ধকার ছায়ার দল…
বাউল মানে খুব গোছানো জীবনও। আখড়ায় খোকন চিশতির একান্ত পরিচ্ছন্ন কোণটার কথাই ধরা যাক। মাথার দিকে দেয়ালে তার একটা হাতে আঁকা জলরং পোর্ট্রেট, কেউ একে দিয়েছে উপহার, হাতে বিখ্যাত বেহালা তার। লালন সাঁইজি ও নজরুলের কাঠের খোদাই ম্যুরাল—দারুশিল্প।
কোণায়, ঘরের একটা খুঁটিতে নীল রঙে লেখা—সাধে কি মজেছে রাধে… বাক্যের শুরুতে এক কেশবতী কন্যার মুখ।
আরেক খুঁটিতে লেখা—সে কি অন্য তত্ত্ব মানে? মানুষ তত্ত্ব যার সত্য হয় মনে…
এখানে কারও মুখ আঁকা নেই। লাল কালিতে লেখা লালন সাঁই—আজকের পোস্ট মডার্নিজমের সানডে মানডে আলাপ আরও দেড়শ বছর আগেই ক্লোজ করে দিয়েছিলেন যিনি।
একগুচ্ছ বই রাখা একটা তাকে। হুমায়ুন আহমেদের অয়োময় আছে। সেটা পড়লাম সঙ্গের ফাঁকে ফাঁকে। চিশতি জানালেন, তাদের গ্রামের পাঠাগারে হাজারের মতো বই আছে। সেখান থেকে ভালো ভালো দুয়েকটা বই উনি নিজের কাছে রেখে পড়েন, তাদেরই গড়ে তোলা পাঠাগার কিশোরগঞ্জে। যেকোনো তবকার আর্ট, শিল্প বা ভাবধারায় যুক্ত মানুষদেরই—আমি দেখেছি, একটা বইবাহিক পটভূমি তাদের পাওয়া যায়। আরও আছে ফ্রয়েডের মনোসমীক্ষণের ওপর লেখা বই। বাউল সাধনার সঙ্গে ফ্রয়েডের লিবিডো তত্ত্ব যুক্ত। এটা চিশতি জানেন কিনা সে বিষয়ে আলাপ হয়নি, কেনইবা এই বই পড়েন জানি না। তবে আমার মনে একটা হাইপোথিসিস দাঁড়াল। এইরকম—ফ্রয়েড বলেন, মানুষ যখন যৌনরিপু অবদমন করে রাখে, সে উত্তেজনার যে শক্তি, তা যৌনতায় ব্যয় না হলে অন্যান্য সৃজনশীল কাজ বা ধ্যানের মাধ্যমে বেরিয়ে এসে বিকিরিত হয়। বাউল মতে, বীর্যস্খলিত হওয়া মানে আধ্যাত্মিক মৃত্যু। দেহরসকে তারা নিম্নাভিমুখি পতন থেকে বাঁচিয়ে মস্তিষ্ক অব্ধি বীর্যারোহণ ঘটান। সেই অব্যবহৃত লিবিডো তারা ধ্যানে-গানে-ভাবে ব্যবহার করেন। তাকে আরও উকিল মুন্সি, জালাল খাঁ, শাহ আব্দুল করিমের গানের বই তো আছেই। হুমায়ুনের খাদক গল্পটা পড়ে তার ওপর কিছু কথা বললাম গরীবের শ্রেণিসংগ্রামের দৃষ্টিকোণ থেকে। মার্কসবাদী এনালাইসিসে গল্পটার দারুণ ম্যাটারিয়ালিস্টিক উপযোগিতা যখন আলাপ করছি, চিশতি খুব মন দিয়ে শোনলেন, মাথা নাড়ালেন। এ পথের সাধকদের আলাভোলা, মূর্খ, জগতবিচ্ছিন্ন ভাবাটা সংসারী লোকদের একরকম আত্মপ্রতারণাই।
চিশতি সারিন্দায় জাত গেল জাত গেল বলে এ কী আজব কারখানা—গানটার তাল ও সুর তুলছিলেন। আমি পরের অন্তরা থেকে গানটার ভোকাল ধরলাম। পরে একজন শ্রোতা জানিয়েছিলেন, আমার ভেতর ভাব চলে এসেছিল গানটার—পরিবেশের প্রভাবই সম্ভবত। একটা লাইন আছে, গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়, তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়… চিশতি বললেন, তার এক গুরুস্থানীয় বাউল এখানে একটা নোকতা দিয়েছিলেন। তার মতে, লালনের মতো মানুষ কখনো বেশ্যা এই গালি উচ্চারণ করতে পারেন না। লাইনটা হবে—গোপনে যে বে-হিস্যার ভাত খায়… মানে অন্যের অংশ…
তত্ত্বের বাউল আর আদি ভাবের বাউল নিয়ে আফসোস করলেন চিশতি। তত্ত্বের বাউল, তাদের অনেক কথা, অনেক কথাই শুধু। টিভি টকশো তে মেকি এস্থেটিক, আদি ভাবের ভড়ং চারদিকে। এমন কালে কিছুটা অভিনয়, নিজেকে কিছুটা কমপ্রোমাইজ করে জড়িয়ে থাকা লাগছে এ ধারায়। খোকন চিশতি তার সারিন্দায় কোমল ভঙ্গিতে ছড় টানতে টানতে বিচ্ছেদি মরমে গাইছেন—সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন….
চরাচরজুড়ে, ধানখেতের ওপর, আমের পাতার গা ছুঁয়ে নামা সন্ধ্যা পুরো পরিবেশটাই কেমন বিষণ্ণ তন্ময় করে তুলল।
আচার
আশ্রমের দেয়ালে দুইস্থানে বোর্ড ঝুলানো—রুমের ভেতর সিগারেট খাওয়া নিষেধ। একজনের প্রশ্ন, সিগারেট খাওয়া নিয়ে এত কড়া আদেশ, কেন তামাকপাতা, গাঁজা সেবন নিয়ে কিছু লেখা নাই? গাজা খাওয়ার জন্যই কি লোকে আখড়ায় আসে? আমান সাধু বললেন, গাঁজাসঙ্গের জন্য এলেও ভাবের পাকচক্রে বাঁধা পড়েছি। গাঁজা কামচিন্তাকে নিষ্ক্রিয়, দেহযমুনায় বিলীন করে দেয়। বীর্যস্খলন মানে সাধকের আত্মহত্যা। বীর্যকে নিম্নমুখী প্রবাহকে ঠেকিয়ে মস্তিষ্কের দিকে আরোহী করে এনে জন্মবিন্দুকে আমৃত্যু শরীরে রক্ষা। এ বড় সহজ কর্ম নয়।
পর্নগ্রাফি, সোশ্যাল মিডিয়ার সূত্রে যথেচ্ছা যৌনতার এই ধাবমান মহাসড়কে মন মহাজন, একটু থেমে দাঁড়িয়ে, দেহরত্নকে যত্ন করতে ইচ্ছা করে না কি তোমার?
সন্ধ্যার আগ দিয়ে গ্রামের লোকজন কিছু, তাঁত ব্যবসায়ীই তারা, এটি তাঁত ইন্ড্রাস্ট্রির গ্রাম, এলো আশ্রমে। আশ্রমের প্রধান সেবকও এলেন সাদা লুঙ্গি সাদা ফতুয়ায়, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। সারাদেশেই এই অঞ্চলের লুঙ্গি গামছা বিখ্যাত—বাবুরহাট। গোল হয়ে কথাবার্তা বলতে লাগলেন তারা। মগরেবের আজানের কিছু আগ মুহূর্ত থেকে সবাই কেমন নিশ্চুপ গম্ভীর হয়ে এলেন। একটা আধ্যাত্মিক আবহ ঘনিয়ে এলো। যদিও ইলেকট্রিক আলো আছে, একজন জ্বালিয়ে দিল স্বচ্ছ আগুনের মোম। আগরবাতির ধোয়া দেওয়া হলো। একজন এসে চক্রের সবার হাতে দুই-তিনটে চাল দিয়ে গেলেন। আমাদের কেউ কেউ নিল না। সেদিকে তাকিয়ে একজন বয়স্ক মুরুব্বি বললেন, আচার যার ইচ্ছা মানবে, যার ইচ্ছা মানবে না, কোনো সমস্যা নাই। আজান পরতেই সবাই চাল মুখে দিলেন, পানি পান করলেন। প্রতীকী ইফতার মনে হলো। এরপর আল্লা আলেক সাঁই বলে তিনবার জমিনে মাথা ছোঁয়ালেন। এটাকে তারা বলেন তাজিমি সিজদা। প্রথম সিজদাটা নিরাকার সকল শক্তির উৎস আল্লার উদ্দেশ্যে, দ্বিতীয় সিজদা নিজ নিজ মুর্শিদ, ভাবগুরুর উদ্দেশ্যে। তৃতীয় সিজদা সঙ্গে উপবিষ্ট সকলের উদ্দেশ্যে—যেহেতু মানুষের ভেতইরই ঈশ্বরের বাস। সুফিধারায় ইবনে আরাবির বিখ্যাত সেই ওয়াজিবুল উজুদ তত্ত্ব। জগতের সকল কিছুই আল্লার শক্তিমান অস্তিত্বের এক্সটেনশন। সবকিছুতেই আল্লা। মুমিনের কলবে আল্লার বাস, সুতরাং মনের মানুষই আল্লা। সেই মনের মানুষের দর্শন পাওয়াতেই সাধনা। মানবপ্রেম। জাত পাত শ্রেণিবৈষম্যের বিলোপ। এইখানে এসে লালন আর মার্ক্স তেলে জলে মিশে থাকেন একসাথে। প্রধান গুরু গান শুরু করলেন—মোদেরই এই শিকল পরা ছল… দেশব্যাপী মাজারবিরোধী সহিংসতা ও সুশীল সমাজের নীরবতায় তারা ব্যথিত, ক্ষুব্ধ, একের পর এক বিদ্রোহী গান ধরা সম্ভবত তাই ইঙ্গিত করল। গানই কথাহীনের কথা।
তারা বাতেনি বা গুপ্ত শরিয়তে বিশ্বাস করেন। অর্থাৎ সমাজে প্রচলিত যে শরিয়ত, তা খুব প্রকাশ্য, স্থূল। সাধারণের জন্য, যারা সংসারে ব্যস্ত। গোরুর পালকে বেঁধে রাখার রশি। কিন্তু সাধকের শরিয়ত ভাবরসে নিমজ্জিত। তারা প্রকাশ্য আচারের চেয়ে প্রকাশ্য আচারকে প্রতীকায়ন করে আচারের মূল ভাবটিকে চর্চা করেন—আত্মসমর্পণ। গান চলছিলই, এবারে শুরু হলো—
শোনো মওলানা, মসজিদ ঘরে আল্লা থাকে না,
কলবে মুমিন আরশে আল্লা এই তো আল্লার ঠিকানা…
সন্ধ্যা নেমেছে আবার। দূরে কোথাও শিয়াল ডাকল। হাজার বছরের পুরনো রাত নামার মতো, শরিয়ত ও মারেফতের এই সমান্তরাল দ্বন্দ্ব মিলেমিশে আছে আবহমান বাঙলায়, পৃথিবীতে। এই বিচিত্র ভূগোলের ওপর শিশির ঝরে টুপটাপ; সমস্ত রজনী—আর অন্ধ বাউল গান গাইতে থাকে কোনো বৃষ্টিমগ্ন পুরোনো রেলস্টেশনে।