শহর ছেড়ে গ্রামে এসেছি। মনে দুঃখ দুঃখ অনুভূতি হওয়ার কথা। কিন্তু হচ্ছে না। যা দেখছি তাই ভালো লাগছে। হঠাৎ জানালার ওপাশে কোকিল ডেকে উঠলে ভালো লাগছে, ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকলে ভালো লাগছে, প্রবল বাতাসে শুকনো পাতায় শন শন শব্দ হলে ভালো লাগছে। চারপাশে শুধু ভালো লাগার তীব্র উথাল-পাথাল।
গ্রামের ছেলে হলেও আমার জীবনের বেশি ভাগ সময় কেটেছে শহরে। তাই ইট-পাথরের দেয়ালের বাইরেও যে জীবনের অফুরন্ত প্রসার আছে তা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম। এখানে এসে সবকিছুর মধ্যে প্রাণের স্পন্দন অনুভব করছি। একটা ছোট্ট ঘাসের মধ্যে প্রাণ আছে, ঘাসের ডগায় বসে থাকা প্রজাপতিটাতে প্রাণ আছে, মাটির সোঁদা গন্ধে প্রাণ আছে, আর বাতাস উঠলে মনে হয় পৃথিবীর সর্বত্র যেন হঠাৎ প্রাণের কল্লোল ওঠেছে।
অথচ জীবনের বেশি ভাগ সময় কাটিয়ে দিলাম যে শহরে সেখানে গতি ও প্রগতি থাকলেও নরম-কোমল প্রাণের ছোঁয়া পাওয়া যায় না। ইটের দেয়ালে প্রাণ নেই, পিচঢালা রাস্তায় প্রাণ নেই, কোথাও পাখি ডাকে না। এমনকি মানুষের চোখের দিকে তাকালে মনে হয় ফেরাউনের মমি, ভেতরে প্রাণ নেই।
আমি যে বাসাটা নিয়েছি সেটা তিনতলার ওপরে। বেশ সুন্দর টাইলস করা। ভেবেছিলাম বসবাসটা শহরের মতো হবে, আর জীবনটা হবে গ্রামের মতো। কিন্তু ক’দিন পরে মনে হল, নাহ, গ্রামে এসে পরিপূর্ণভাবে গ্রামকেই বরণ করে নেওয়া শ্রেয়। এক তলা একটি বাড়ি থাকবে, সামনে খোলা উঠোন, উঠোনে বাচ্চারা খেলা করবে। বাড়ির পেছনে ছোট্ট একটা পুকুর। পুকুর পাড়ে হাঁস-মুরগির খোঁয়াড় থাকবে। খোঁয়াড়ের দরজা খুলে দিলে হাঁসগুলো প্যাক প্যাক করে বাড়িময় হেঁটে বেড়াবে। এই না হলে জীবন?
জীবনের সব ইচ্ছে পূরণ হয় না। এটাও হচ্ছে না। সংসারে তো আমি একা নই। আরও মানুষ আছে। তাদের নিজস্ব স্বপ্ন আছে। সংসার বাঁচিয়ে রাখতে সবার স্বপ্নের কিছু কিছু অংশ বাদ দিতে হয়। তা-ই বাদ দিয়ে তিনতলায় দিব্যি ভালো আছি।
একরাতে ঘুম ভেঙে গেলে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। জানতাম না আজকে পূর্ণিমা। চতুর্দশীর চাঁদ জোছনার আলোয় চরাচর প্লাবিত করে ফেলেছিল। আমার ব্যালকনির পেছনে বাঁশঝাড়। সেখান থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছিল। প্রকৃতির এই রহস্যময় চোখ ধাঁধানো তীব্র সৌন্দর্যে আমি বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। বেলকনিতে ধপাস করে বসে পড়লাম। চাঁদের আলোয় যতদূর চোখ যায় মনে হয় শুধু রহস্য আর রহস্য ফেনায়িত হয়ে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। ভয় পেতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু প্রকৃতির এই পাগল করা তীব্র সৌন্দর্য থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখা যায় না। সেদিন রাতে মনে হয়েছিল ইট-পাথরের দালানে ঘেরা শহরের মানুষ এই সৌন্দর্যের কথা কি জানে?
দুই.
মানুষের মনের চেয়ে রহস্যময় কিছু নেই পৃথিবীতে। মন যাকে একটু আগে ভালোবেসেছে, তাকে এখন ভুলে যেতে চায়। এখন যার সৌন্দর্যে বিভোর, একটু পরে তাকে বড়ই সাদামাটা মনে হয়।
এই যে প্রাণপূর্ণ গ্রামীণ জীবন, এক সময় তাকে খুব সাধারণ মনে হতে লাগল।
কচুর পাতায় পানি জমেছে? তাতে আমার কী?
ঘাসের ডগায় ফড়িং বসেছে? তাতে আমার কী?
মাঠজুড়ে দুপুরের তীব্র রোদের ঝলকানি দেখে ভুলেই গিয়েছিলাম যে, সন্ধ্যায় এই মাঠ দোয়েল শালিক ও চড়ুই পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে।
একদিন মাদরাসায় যাওয়ার পথে একটা হলদে পাখির সাথে দেখা হলো। আমগাছের ডালে পুচ্ছ ঝুলিয়ে বসে আছে। এই পাখি আমার নানাবাড়িতে অনেক দেখেছি। সেই অবুঝ শৈশবে। নানাবাড়ির পেছনে একটা বিশাল বাগান ছিল। দিনের বেলায়ও সেখানে যেতে গা ছমছম করত। দেশ-গেরামের পরিচিত হেন কোনো পাখি ছিল না, যা সেই বাগানে দেখিনি।
সেখানে একটা বিশাল আমগাছ ছিল। একেকটা আমের ওজন আধা কেজির কম হবে না। একবার ঝড় হলে এক এক-দুই মণ আম পড়ত। পুরো আষাঢ়-শ্রাবণ জুড়ে নানীবাড়ির বারান্দাটা বাগানের আমে ভরে থাকত।
বিশাল যে আম গাছটার কথা বলছি তার একটুখানি ডানদিকে ছিল আরও বিশাল একটা শিমুল গাছ। ফাল্গুন মাসে সেই গাছের শিমুল ফেটে গিয়ে বাতাসে তুলো উড়ত।
ওই গাছটাতেই…
বছরে হঠাৎ একদিন রাজ্যের সব শকুন এসে বসত। সারা গ্রামজুড়ে উৎকণ্ঠা! বাচ্চারা ঘর থেকে বের হতে পারত না, শকুন যদি উড়ে এসে চোখ তুলে নেয়!
পরে ঢোল বাদকদের ভাড়া করে এনে ঢোল পিটিয়ে শকুন তাড়ানো হতো।
ওই বাগানটাতেই হলদে পাখি দেখেছি।
আজ মাদরাসায় যাওয়ার পথে হলদে পাখি দেখে মন কেমন করে উঠল। শৈশব মনে পড়ছে। শহরে ইট-পাথরের ভেতরে থেকে থেকে শৈশব একদম ভুলে গিয়েছিলাম। কতকাল মনে পড়েনি।
উন্মনা মন নিয়ে মাদরাসার পাশের ইউক্যালিপটাস বনের কাছে বসে ছিলাম। হঠাৎ বিপুল বাতাসে পাতা ঝরতে শুরু করল। তখন আবার মনে পড়ে গেল, আমি ছোটবেলায় এই পাতা ঝরার শব্দ শুনেছি। বাতাসের এই বিপুল শব্দের সাথে মেহগনি গাছের পাতা ঘূর্ণির মতো ঘুরতে ঘুরতে নিচে নেমে আসতে দেখেছি। এই শব্দ আমি কতকাল শুনি নাই? আজকের আগে কতকাল?
আমাদের উদয়পুর গ্রাম গাছপালা দিয়ে ঠাসা। শৈশবে মনে হত একটা বড় বাগানের মধ্যে বোধহয় আমাদের গ্রাম। গ্রামে অগণিত মেহগনি আর দেবদারু গাছ ছিল। রাস্তা-ঘাট গাছের পাতায় ঢেকে থাকত।
কিছু অল্প বয়সী ছেলেমেয়ে পাতা কুড়াত। সেই পাতা কোথাও কোথাও স্তূপ করে রাখা হতো। আমার মনে পড়ে, প্রায়ই সেই পাতার স্তূপের মধ্যে ঢুকে দাঁড়িয়ে থাকতাম। শুধু গলাটা বাইরে থাকত। কেউ আমাকে খুঁজতে এলে গলাটাও শুকনো পাতার গভীরে লুকিয়ে ফেলতাম।
যে শিশুরা পাতা কুড়াত তাদেরকে গ্রামে পাতাকুড়ানি বলত। এখন কি গ্রামে পাতাকুড়ানিরা থাকে? কতকাল ধরে শুকনো পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আমার শৈশবের স্মৃতি ভুলে ছিলাম। আজকে পাতা পড়ার শব্দে যেন ঘোর ভেঙেছে।
এই যে গ্রামের সাথে আমার শৈশবের একটা স্মৃতির বন্ধন আবিষ্কার করে ফেললাম, তখন থেকে আবার গ্রাম ভালো লাগতে শুরু করল।
আমের গাছে মুকুল এসেছে। আহা ঘ্রাণ! ভালো লাগে।
কৃষ্ণচূড়ার ডালে ফুল ফুটেছে। আহা সৌন্দর্য! ভালো লাগে।
আবার সবকিছু ভালো লাগতে শুরু করল।
তিন.
আমি যে গ্রামটাতে থাকি তার নাম মিঠাপুর। ঢাকার পাশেই। কেরানীগঞ্জে। আর যে মাদরাসায় পড়াই তার নাম জামিয়াতুত তারবিয়াহ আলইসলামিয়া। মাদরাসার কোল ঘেঁষে ধলেশ্বরী নদী বয়ে গেছে। নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ালে মনে হয় এটা আমাদের গ্রামের মধুমতি নদী। যেখানে সাঁতার কেটে কেটে আমার শৈশব কৈশোরে ভিড়েছে।
যখন গ্রামের সবকিছুর সাথে শৈশবের যোগসূত্র আবিষ্কার করে ফেললাম এবং আবারও যখন সবকিছু ভীষণ ভালো লাগতে শুরু করল তখনই বাস্তবতা পৈশাচিক চেহারা নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
গ্রামে বিদ্যুৎ যেতে শুরু করেছে দৈনিক অন্তত পনের ঘণ্টা। গরমে হা হা করছে প্রকৃতি। গত এক যুগের শহর জীবনে লোডশেডিং কী তা ভুলে গিয়েছিলাম। বিদ্যুৎ যদি-বা যেত, ফিরে আসতে মুহূর্ত দেরি করত না। এখানে বিদ্যুৎ যায়, কিন্তু পলাতক আসামীর মতো সে আর ফিরে আসে না। শুধু কষ্ট, অস্থিরতা, হা-হুতাশ!
আমি তো সয়ে নিলাম। কিন্তু আমার দুটো বাচ্চা গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ল। জ্বর-হাম। সারা রাত আমাদের ঘুম হয় না, বিদ্যুৎ আসে না, বাতাস হয় না। সে কি বিভীষিকা!
গ্রামের মধ্যে হাসপাতাল নেই। ভালো ডাক্তার নেই। আশেপাশে দোকান-পাট নেই। চাইলেই দৌড়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসটা কিনে আনার সুযোগ নেই। পানিতে আয়রন। বিদ্যুৎ থাকে না বলে বাসায় পানিও থাকে না। হাজারটা সমস্যা মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে সামনে এসে দাঁড়াল।
ঠিক সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারলাম, গ্রামে এত এত সৌন্দর্য থাকতে মানুষ কেন শহরে বাস করে? গ্রামের সৌন্দর্য মানুষকে বিনোদিত করতে পারে, কিন্তু মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করতে পারে শহর।
কিন্তু কেন? গ্রামে বিদ্যুৎ থাকবে না কেন? গ্রামে ভালো ডাক্তার থাকতে দোষ কোথায়? গ্রামে ওয়াসার পানি আসতে সমস্যা কী? যাবতীয় সুবিধা কেন শহরের জন্যই পুঞ্জীভূত হবে?
অনেক প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক খায়। আমি হতবিহ্বল বোবা মানুষের মতো হেঁটে হেঁটে মাদরাসায় যাই। পথের দুইপাশে ফুলপাখি খেলা করে, ঘাসের ডগায় শিশির জমে, শিউলি ফুলের মতো ঝরে পড়ে কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি। তাদের সৌন্দর্য আমাকে আকর্ষিত করে না। বাসায় দুটো শিশু অসুখে কষ্ট পাচ্ছে। সেখানে বিদ্যুৎ নেই। জরাক্রান্ত মেয়েটার বুকে ঘাম জমে জমে নিউমোনিয়া হয়ে গেছে।
খুব রাগ হয়, সব বিদ্যুৎ কেন শহরেই যেতে হবে? সব নাগরিক সুবিধা কেন শহরবাসীকেই দিতে হবে? আল্লাহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য গ্রামে দিয়েছেন। নাগরিক মানুষেরা গ্রামকে সুবিধা বঞ্চিত রেখে তারই প্রতিশোধ নেয়?
ভাবি শহরে কত সুখ, সেখানে পানিটা ওয়াসা থেকে আসে। বিদ্যুৎ থাকে সবসময়। হাতের নাগালে দোকানপাট, গাড়িঘোড়া, শপিংমল, বিনোদনকেন্দ্র—কী নেই?
সেখানে ঘাসের ডগায় শিশির নাই বা জমল!
হলদে পাখি গাছের ডালে নাই বা বসল!
সান্ধ্য-হাওয়ায় শিউলি ফুল নাই বা ঝরল!
জীবন তো প্রযুক্তির আবহে বিপুল কলরোল তুলে বয়ে চলেছে সেখানে।
দিনে দিনে আমার বাচ্চারা সুস্থ্য হলে একদিন শহরের মানুষের সুখ দেখতে গেলাম। মেট্রোরেলে চড়ে বসলাম। সবগুলো মানুষের চেহারা পাঠ করে দেখেছি। সেখানে ক্লান্তি ছাড়া আর কিছু নেই। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, দোকান-পাট, শপিংমল, বিনোদনকেন্দ্র—কিছুই তাদের চেহারায় সুখের ছাপ এঁকে দিতে পারেনি। সবার কী যেন তাড়া, কী যেন খুঁজছে, কিসের জন্য যেন মরিয়া।
গ্রামে ফিরে এসে আবারও মানুষের চেহারা পাঠ করতে শুরু করলাম। মধ্য বয়সী এক লোক লুঙ্গির কোনা উঁচিয়ে ধরে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে যাচ্ছে। তাকে দেখলে মনে হয় শাহেনশাহে বাঙাল। দুটো মক্তবের ছেলে মসজিদে যাওয়ার পথে খুনসুটি করছে। চায়ের দোকানে গল্পের ঝড় ওঠেছে। মন খুলে এমন ঝোড়ো গল্প শহরের মানুষ করতে পারে না।
আমি জামিয়াতুত তারবিয়াহর গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। একটা মরা খালের ওপর কাঠের পুল। সেখানে পা ছড়িয়ে বসলাম। দূরে ধান খেতের পাশে সাদা বক দাঁড়িয়ে আছে। পাশে রেইনট্রি গাছে পাখিদের কলরোল। কোনো বিষয়ে ওদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধেছে বোধহয়। সামনে যে খাল, সেখানে একটা দুটো মাছ হঠাৎ হঠাৎ পানিতে ঘাই মারছে। সেসব দেখতে দেখতে চোখ পড়ল ঘাসের ডগায় বসে থাকা একটি ফড়িঙের দিকে। মাঝে মাঝে মাথা দোলাচ্ছে। মনে হল সে যেন দূর্বাঘাসের কানে কানে বলছে, দেখো এই লোকটা কত বোকা! সে শহরে গিয়েছিল সুখ দেখতে!