আমার প্রাণোচ্ছ্বল জীবনের দশদিগন্ত ছাপিয়ে সাহিত্য যে কখন হৃদয়-কাননের আরাধ্য হয়ে উঠল—ঠিক বলতে পারব না। বিপুল জ্যোৎস্নাময় চিত্তহরি আপ্ত বাক্য, নানা ফুলের সৌরভ জড়ানো কোমল মখমল শব্দ, ধ্যানী চিত্রকরের বিম্বিত অকুণ্ঠ যত্মে লালিত উজ্জ্বল চিত্রকল্প, অভিজ্ঞতাদীপ্ত ঋদ্ধ চিন্তকের প্রায় ভবিষ্যত-দেখানো চিন্তার উৎকর্ষ, জীবন ও জগতের নিরবচ্ছিন্ন কর্মচাঞ্চল্য এবং অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের ধারাভাষ্য—কখন যে আমার পল্লবিত সজীব হৃদয়োদ্যানে বসন্তের নরোম সমীরণ হয়ে বইতে লাগল, প্রভাতের মিষ্টিরোদে সূর্যমুখী বাগানের কিচিরমিচির হয়ে ওঠল—পষ্ট জানাতে পারব না।
মনে পড়ে যখন উর্দু প্রথম বিভাগে পড়ি, দুই হাজার আট কি নয়ে, বন্ধুদের কাছ থেকে কীভাবে যেন জেনে, আদিব-হুজুরের আল-কলম পুষ্প-এর প্রথম প্রকাশনা আব্বুকে সংগ্রহ করে দিতে বলি। তিনি সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন। লেখা-শেখার অভিপ্রায়ে এটিই প্রথম সচেতন পদক্ষেপ। প্রতি শুক্রবার আব্বু আমাদের তিন ভাইয়ের জন্য বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসতেন। সারা সপ্তাহে শুক্রবার ছিল পরম প্রতীক্ষিত। জুমাবারের ময়াময় অপেক্ষায় সপ্তাহের প্রহরগুলো যেন কাটতে চাইত না। তখন মাদানীনগর মাদরাসায় পড়ি। শাহেদ হেফজখানায়, আর আমি তাওহিদ কিতাবখানায়।
নিয়মতান্ত্রিক দরসের বাইরে কখনো সময়-সমরে আল-কলম নিয়ে বসা হতো। যতটুকু না পড়তাম, তার চেয়ে বেশি তাকিয়ে থাকতাম—কী বলতে চাইছেন লেখক সেদিকে। আর হৃদয়ের তপ্ত মণিকোঠায় একেবারে অন্তস্থলে কিছু কিছু শব্দ-বাক্য আলোতে উপস্থাপিত হওয়ার বাসনায় ছলাৎ করে উঠতো। যেন-বা পতঙ্গ প্রদীপের পদপ্রান্তে সর্বস্ব বিলাতে উদ্যত। প্রচণ্ড উদ্বেগাকুল নয়নে কলম হাতে বসে আছি। কিন্তু জন্ম নিত না একটি শব্দও। পরিষ্কার হয়ে আসত না একটি শীর্ণ বাক্যও।
আজ এতকাল পরে পুরোনো সেই দিনের কথা মনে পড়লে, কত না হাসির উদ্রেক হয়। পরক্ষণেই আবার আঁখিদ্বয়ে নোনতা অশ্রু টলটল করে। যেই আমি কিছুই ছিলাম না, তাকে মহান আল্লাহ কতকিছু দান করেছেন। এখনো ভাবি, এই এখানো কলম হাতে নিয়ে চাইলেই তরতর করে লেখা হয়ে ওঠে না। উপযুক্ত সময়, প্রাণান্ত উদ্দীপনা আর হৃদয়াবেগের শাণিত উচ্ছ্বসেই কেবল লেখামালা কাগজের স্বর্ণপ্রসবা ভূমিতে ভূমিষ্ট হয়। জানি একজন সত্তাজাত লেখকের এত কিছুর প্রয়োজন হয় না। তার ফুটন্ত হৃদয়ে কথামালা নিয়মিত খৈয়ের মতো ফুটতে থাকে। জীবন-জগতের নানা কিছু তার অভ্রভেদী সুদীপ্ত পর্যবেক্ষণে বিশ্লেষিত হতে থাকে। আমি তো এখনো নগণ্য একজন। অনুপোযুক্ত সময়ে একটি ভুলবাক্যও যার হৃদয়তন্ত্রিতে জন্মলাভ করে না। প্রেমের সকল পরীক্ষা দিয়ে দিলেও দিলরুবার মতো কোনো চিন্তা একান্ত হয়ে ধরা দেয় না। ভাবি, আজও কী প্রথম দিনের শিশু আমি!
দুই.
চোখমেলেই যেন বাসায় পড়ার পরিবেশ দেখেছি। আজও আব্বু-আম্মু নিয়মিত বাদ ফজর ও মাগরিব কুরআন তিলাওয়াত করেন। সকালের নাশতার পর সংবাদপত্র। আর মাসিক আল-জামিয়া, আত-তাওহিদ, আদর্শ নারী থাকতো সবসময়। কদাচিৎ মাসিক মদিনাও ঘুরে যেতো। এখন তো আল-কাউসার ও আল-কলমসহ অগণিত বই-পুস্তক পরিবারের সদস্য। পষ্ট মনে পড়ে, রাতে খাবারের আগে নিয়ম করে প্রতিদিন ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান অনূদিত মুফতি শফি রহ.-এর মারিফুল কুরআন ৮ খণ্ড সম্পূর্ণ তালিম করে শেষ করা হয়েছিল। একদিন আম্মু না-হলে আব্বু পড়তেন। ফাজায়েলে আমল, সাদাকাত, বেহেশতি যেওর, কতবার যে শেষ হয়েছে ইয়ত্তা নেই। থানবি রহ.-এর কসদুস সাবিল ও মুসলামানের হাসির প্রচ্ছদ আজও চোখে ভেসে আছে। একদিন শেষ করব বলে সেই তখনই সৌদি সরকারের ছাপা একখণ্ড মারিফুল কুরআন বুকে জড়িয়ে অবোধ বসে থাকতাম। আমার বাল্যশিক্ষক রশিদ-হুজুর একদিন মওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোছাইন, ও ড. এ এইচ এম মুজতবা হোছাইনের রচিত হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স) সমকালীন পরিবেশ ও জীবন গ্রন্থটি নিয়ে এলেন। সেই গ্রন্থের পৃষ্ঠা আর ছবি দেখেই যেন শৈশব কেটে গেছে।
কোনো একটি অধ্যায়ে মিনজানিকের ছবি দেওয়া ছিল। এখনো চোখে ভাসে। ভাবতাম—আমি কি এমন মিনজানিক বানাতে পারব! হজরত সালমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর কী দারুণ বুদ্ধি! তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিনজানিক বানানোর কৌশল দেখিয়ে দিলেন। যেন কাফিরদের প্রতিহত করা যায়! ছবির দিকে চেয়ে এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে কৈশোর পেরিয়ে গেল—টের পেলাম না!
২০০১ সালে যখন আফগানে ইঙ্গ-মার্কিন হামলা শুরু হয়, আব্বু নিয়ে গেলেন জামিয়া রাহমানিয়ার বার্ষিক মাহফিলে। বয়ান আর নসিহত কতটুকুই বুঝতাম তখন! দীর্ঘ সময় বসে থেকে শরিফ মামাকে বললাম, ‘বাইরে যাব!’ তিনি মাহফিল সংলগ্ন মেলায় নিয়ে গেলেন। এই সুযোগে জরুরতও সেরে নেওয়া হলো। ফেরার পথে কোনো ঝনঝন খেলনা কিবা মুখরোচক কোনো খাবার আমায় আকৃষ্ট করল। শুধু এক জায়গায় একজন হুজুর টেবিলে সাদা চাদর বিছিয়ে কিছু বই বিক্রি করছিলেন। সেদিকাই মন লেপ্টে গেল। মামাকে নিয়ে সেখানটাই দাঁড়ালাম। নানা বইপত্তর নেড়েচেড়ে দুইটি পছন্দ হলো। মামাকে ইশারা দিলে তিনি বললেন, ‘তোমার আব্বুর কাছে চলো!’ ফিরে এসে পছন্দের বই দুটির কথা জানালে আব্বু শরিফ মামাকে টাকা দিয়ে বললেন, ‘ওকে দুইটা বই নিয়ে দাও!’ সে দুটো বই ছিল, ফজলুদ্দীন শিবলীর রক্তাক্ত আফগানিস্তান ও মুফতি মীযানুর রহমান কাসেমীর হালাল-হারাম। সেদিন এত্ত আনন্দ লেগেছিল—মনে হয়েছিল দূর আকাশের দুটো নক্ষত্র সঙ্গী করে নিয়ে এসেছি। বাসায় আনন্দ দেখে কে! একে দেখায়, ওকে বলি! সারাদিন শুধু বইদুটো নাড়াচাড়া করি।
একদিন রশিদ-হুজুর আমাদের মন খারাপ করে দিয়ে রক্তাক্ত আফগানিস্তান বইটা নিয়ে গেলেন। বললেন, ‘ছোটোদের এই বই পড়তে হয় না!’ তখন ভেবেছি, বড় হলে হয়তো পড়তে পারব। হুজুরের ছেলে সাআদকে কতবার বললাম, ‘দেখো তো তোমার আব্বু বইটা কোথায় রেখেছেন?’ সে কিছু করতে পারল না। সাআদের আম্মুকে বললাম, ‘আন্টি বইটা কোথায়?’ তিনিও কোনো আশা জাগাতে পারলেন না। এভাবে দিন যায়, মাস গড়ায়। এক সময় বছরের শেষ দিন বিদেয় জানাতে উদ্যত হয়। আমি বড় হওয়ার অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে পড়ি! আহা, কবে যে বড় হয়ে বইটা পাবো! কিন্তু আমার আর ‘বড়’ হওয়া হলো না এবং বইটাও দেখা মিলল না। সে যেন চিরদিনের তরে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে! কোথায় আছে কেমন আছে কিচ্ছুটি জানি না! তার বিয়োগব্যথায় এখনো কুঁকড়ে উঠি!
তিন.
মকতবের বারান্দা পেরিয়ে যখন হেফজখানায় এলাম, কুরআন শরিফ ছাড়া অন্য কোনো বই পড়ার বিশেষ মওকা হলো না। সেসময় পড়তাম উত্তরার দারুল উলুম ঢাকায়। জানপ্রাণ দিয়ে বিশেষ কসরত চালিয়ে আল্লাহর কালাম অন্তরে বসাচ্ছি। অন্য কিছুতে মন দেওয়া অনুচিত। কিন্তু প্রিয় শিক্ষকগণ অবসর সময়ে মাদরাসার মাকতাবা থেকে ভালো ভালো বই এনে পড়তে বলতেন। মাওলানা তারিক জামিলের বয়ানের অনুবাদ কে সে জন বিশেষভাবে পড়তে বলেছিলেন। খেলাধুলায় যেন সবটা অবকাশ শেষ করে না ফেলি সেদিকেও তাগিদ দিতেন। মাদরাসা যখন উত্তরা দশ নম্বর সেক্টরে ছিল, তখন গ্রন্থগারিক মাওলানা সাঈদ সাহেবের কাছ থেকে আলি মিয়া নাদাওয়ি রহ.-এর মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো গ্রন্থটি নিয়ে এলাম। জানা কথায় বইটার একটা লাইনও বুঝি নি তখন। কিন্তু কী যেন অদ্ভূত আকর্ষণ বলে বইটি নেড়েচেড়ে দেখি। ভেতরের কিছু কিছু জায়গা হাতরেপাতরেও দেখি। না, করোটিতে মধ্যে বিশেষ কোনো তরঙ্গ সৃষ্টি হচ্ছে না। কারণ, বুঝি না। আমার বয়সের বই না। ফেরত দিয়ে এলাম।
তারপর জামিয়া রহমানিয়ার মাওলানা নোমান আহমদের মুমিনের রক্তে রঞ্জিত বিশ্ব নিয়ে এলাম। টানা শেষ করি। চোখের পানি আটকে রাখা যায় না। হজরত মাওলানা মুফতি রফি ওসমানি সাহেবের আল্লাহর পথের মুজাহিদ নাড়াচাড়া করলাম। অজানা কারণে পড়া হলো না। জহুরীর প্রেস্টিজ কনসার্ণড ও জাম্বিলও নিয়েছিলাম। ছোপ ছোপ কিছু অংশ দেখাও হয়েছিল। বিশেষ টানল না বইগুলো। সেসময় কোনো এক ছাত্র ভাই থেকে শয়তান ও জিন জাতির ইতিহাস নামে একটি বই নিয়ে পড়েছিলাম। সেটা ভালো লেগেছিল। সেখানের কিছু কিছু বর্ণনা ইসরাইলি ও জাল; পরবর্তীকালে মাওযু বিষয়ক মুতালাআর সময় ধরা বুঝতে পেরেছিলাম।
একদিন প্রিয় শিক্ষক হাফেজ মাওলানা কাউসার সাহেবের সংগ্রহশালা থেকে মাইকেল এইচ হার্টের বিশ্বের শ্রেষ্ট ১০০ মনীষী বইখানা নিলাম। অজানা আকর্ষণে বইটি টেনে রেখেছিল। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষদের জীবনী জানার পর এমন অপার্থিব আনন্দ লেগেছিল, যা বলে শেষ করতে পারব না। অবচেতন মনে কেবল ভেসে উঠছিল—আমিও তাদের মতো হব! সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছিল, সবার আগে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী ছিল। তারপর হজরত ইসা আলাইহিস সালামের জীবনী। পরবর্তীকালে বইটি সম্পর্কে আরও কত কাহিনি জানি।
এক সময় হেফজখানার দিনগুলো শেষ হয়ে আসে। রমজান চলছিল। রাতে তারাবি পড়ানো আর দুপুর বেলা কিতাবখানার প্রস্তুতিস্বরূপ আরবি, উর্দু ও ইংরেজি পড়ানো হতো; আমরা যারা ফারেগিন তাদের। কার্যত হেফজ শেষ করেছি। শুধু রমজানে ইয়াদখানা তাজা করে শাওয়ালে কিতাবখানায় প্রবেশ করার অপেক্ষায়। তখন মেহেদি জামিল ভাইয়ের কাছ থেকে ঈমানদীপ্ত দাস্তানের প্রথম খণ্ড নিয়ে পড়া শুরু করলাম। ষোল-সতের রোজা। বিশ রোজায় ছুটি। বিরতির আমেজ বিরাজ করছে সর্বত্র। সকলে এটা সেটা কেনে। কিন্তু আমি ডুবে গেলাম দাস্তানের মহাপ্রাণে। সেই ডুব-সাঁতারে সময়গুলো কীভাবে কেটে গেল বলতে পারব না। মাথা তুলে দেখি রাসেল মামা এসেছেন আমাদের নিতে—বিশ রমজান।
চার.
কেবল পাঠ করে যাওয়াতেই যে ব্যাপক মুখর আনন্দ আছে, অধিকাংশ মানুষই জানেন না। তারা ভাবেন এত পড়ে কী হবে? আসলে যারা বৌদ্ধিক বিকাশের নিম্ন স্তরে রয়ে গেছেন—তাদেরকে বোঝানো সত্যিই জটিল। পাঠের আনন্দ কেবল ইন্ট্রোভার্ট বা অন্তর্মুখী মানুষেরই একমাত্র অনিবার্যতা নয়—এটা তাদের বোঝাতে পারবেন না। অবশ্য তখন এও মনে হয় ওয়ান-ডাইমেনশনের (একপ্রস্তী) জগতে বাসকারীদের কী-করে থ্রি-ডাইমেনশনের (তিন-প্রস্তী তথা দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা) হাকিকত বোঝানো যাবে! সে-তো সব কিছুই ওয়ান-ডাইমেনশনের দৃষ্টিতে বিচার করে! বুদ্ধিবিকাশহীন নাবালকের সাথে কথা বলেও তো বিপদ। সে নিজেও বুঝবে না যে, সে কী বুঝছে না! আইকিউ বা বুদ্ধ্যঙ্ক কমতি মানুষের জন্য সমব্যথী হওয়া ছাড়া আর কীই-বা জ্ঞাপন করা যায়!
যে মানুষের পাঠের পরিধি বিস্তৃত, তার আইকিউ বা বুদ্ধ্যঙ্কও অগণিত। তার স্মৃতিতে শব্দভান্ডারও অজস্র। সঞ্চিত শব্দভান্ডার থেকে ছড়ানো অর্থ-দ্যোতনাও অসংখ্য। তার মস্তিষ্কে চিত্রকল্পও হিসাবছাড়া। মগজের ধারণ-ক্ষমতা ও বেহিসেবি। তিনি যেকোনো এবস্ট্রাক বা বিমূর্ত ধারণাকে কেবল মুখে বলেই বোঝাতে সক্ষম। মানবজাতির আচরণশৈলী তিনি অনেকের চেয়ে পরিষ্কার বুঝতে পারবেন। কোন অঞ্চলের মানুষ কোন বৈশিষ্ট্য-প্রধান অল্পতেই ধরতে পারবেন। জলবায়ু ও মাটির উপাদান বুঝে নৃ-তাত্ত্বিক বিষয়গুলো সহজে ব্যক্ত করতে সক্ষম হবেন। আত্মসচেতন হলে, তার যোগাযোগ দক্ষতা বাড়বে। ইন্টেলিজেন্সি বৃদ্ধি পাবে। সোশ্যাল মেমোরি বেশি হবে। কালেক্টিভ মেমোরিও কমতি থাকবে না। জাতির পালস দ্রুত উপলব্ধি করতে পারবেন। নিখুঁতভাবে অনেক কিছু বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হবেন। ক্ষমতাকে এনকাউন্টার করার দক্ষতাও বেশি থাকবে। মনোযোগ দিলে ফাঁকিবাজি ও ঘাপলা সহজে ধরে ফেলতে পারবেন। মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার ক্ষমতা বেশি থাকবে। উপযুক্ত মাত্রায় ক্ষতির সীমানা না মাড়িয়ে সাইকোপ্যাথ হতে পারবেন। ভিন্ন প্রাণীর দুঃখ-যাতনা সহজে অনুভব করতে পারবেন। তাদের সমব্যথী হতে পারবেন। একটি আইডিয়াকে একাধিক এঙ্গেল থেকে ভাবতে পারবেন। জটিলতম সমস্যাকে ভাগ ভাগ করে সমাধানের পথ আবিষ্কার করতে পারবেন। পৃথিবীর নানা শাস্ত্রে ছড়ানো জ্ঞান-বিজ্ঞানের গর্বিত সহযাত্রী হতে পারবেন। অগণিত মানুষের জীবনাভিজ্ঞতা ও জীবনাচার সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হবেন। জ্ঞানরাজ্যের বিস্তৃতি সমকালে কোন দাগ অতিক্রম করছে, এবং অদূর ভবিষ্যতে কোন কোন সীমারেখা পেরিয়ে যাবে, সেটিও পরখ করতে পারবেন। যে-কোনো পরিবেশে উপযুক্ত আচরণ করতে পারবেন। নিজের ভালোবাসা ও ঘৃণা, কাম ও জিঘাংসা কাবু রাখতে পারবেন। সহসাই উত্তেজিত হবেন না। রুচিবান স্মার্ট হবেন। আন-কম্ফোর্ট জোনে মিনিমাম ড্যামেজ করে এক্সিট পয়েন্ট বের করতে পারবেন। লিডারশীপের দক্ষতা বেড়ে যাবে। এগুলো সবগুলোই ব্যক্তির নানামত্রিক পাঠের ভেতর দিয়ে অবচেতন মনের সঞ্চিত গুণাবলি ও দক্ষতা। রবীন্দ্রনাথের ঐকতান কবিতার কয়েকটি লাইন এমন—
বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি
দেশে দেশে কত না নগর রাজধানী—
মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু,
কত না অজানা জীব, কত না অপরিচিত তরু
রয়ে গেল অগোচরে। বিশাল বিশ্বের আয়োজন;
মন মোর জুড়ে থাকে অতি ক্ষুদ্র তারি এক কোণ।
সেই ক্ষোভে পড়ি গ্রন্থ ভ্রমণবৃত্তান্ত আছে যাহে
অক্ষয় উৎসাহে—
যেথা পাই চিত্রময়ী বর্ণনার বাণী
কুড়াই আনি।
জ্ঞানের দীনতা এই আপনার মনে
পূরণ করিয়া লই যত পানি ভিক্ষালব্ধ ধনে।
বলাবাহুল্য, এসবকিছু পাঠবিমুখ মানুষের অর্জন হতে জীবনের বৃহৎ সময় পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তারপরও এতকিছু সে পাবে কি না যথেষ্ট সন্দেহ করার মতো!
এখন ভাবি, ছোটোকালে পড়ার জন্য কেউ আমাকে সেভাবে বাধ্য করেননি। অগণিত বর্ণিল অভিজ্ঞানসমূহের পাঠের ভেতর দিয়েই যেন জগতের পর জগৎ, দিগন্তের পর দিগন্ত উঁকি দিয়ে উন্মোচন করেছি। ইকবালের ভাষায়, ‘সেতারোঁ সে আগে জাঁহা আওর ভি হ্যয়’-এর মতো আরও সামনে যেতে চেয়েছি! হ্যাঁ, কয়েকজন প্রিয় ব্যক্তি ও কতিপয় গ্রন্থের কথা চিরজীবনই মনে থাকবে। তাঁদের ঋণস্বীকার করতে কোনোরূপ কার্পণ্য নেই। পর্যায়ক্রমে বলছি তাদের কাব্য-কাহিনি।
পাঁচ.
এক খণ্ড পড়েই দাস্তানের স্বাদে মজে গেলাম। মাদানীনগরে কিতাবখানায় আসার পর এমন কারও সন্ধানে ছিলাম, যিনি দাস্তান-পড়ুয়া। পেয়ে গেলাম বরিশালের আমিন ভাইকে। তার কাছ থেকে দাস্তানের বাইরেও আঁধার রাতের বন্দিনীর সন্ধান পেলাম। এগুলো এমন বই যাতে সাহিত্যের ‘স’-ও নাই। গল্পের মজা দিয়েই পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠা কেবল।
সন্দেহ নেই, সেখানের বর্ণিত ইতিহাসেও যথেষ্ট সন্দেহ ও বিতর্ক আছে। তাও উপন্যাস তো উপন্যাসই। তাতে আর সততা খোঁজে কে? কিন্তু সমস্যা হলো, আলতামাশ সাহেব বর্ণনার ফাঁকে এমন সিরিয়াস ভাব নেন, যেন ঐতিহাসিক সবকিছু ঘেঁটে তারপর সত্য সত্য বলছেন সব। গল্পটা নিজের হলেও ঐতিহাসিক সবকিছু যেন সত্য।
কিন্তু মাওলানা ইসমাইল রেহান সেগুলো যাচাই করে পরিষ্কার প্রমাণ করলেন, আলতামাশ সাহেব সততার আশ্রয় নেননি। যদি তিনি বলে দিতেন এগুলো নিছক গল্প-কল্পনা, তাহলে ব্যাপারটা জটিল হতো না। উপন্যাসে তো গল্প থাকবেই, এ-ই তো স্বাভাবিক। অন্য আট-দশটা উপন্যাসের মতোই তার মর্যাদা। কিন্তু আলতামাশ সাহেবের অসত্য বক্তব্যের কারণেই অনেক না-জানা পাঠক, উপন্যাসের বর্ণিত গল্পকেই সত্যিকারের ইতিহাস বলে ঠাহর করে নেন। তা ছাড়া মুজাহিদদের সাথে পিরিতির এমন গল্প ফেঁদেছেন—যা পড়ে মনে হবে, মুজাহিদ হলে পিরিতি ফ্রি! পড়ার সময় তো গল্পগুলো টেনে রেখেছিল। কিন্তু এখন মনে হয়, সেগুলো থেকে কেবল পাঠের অভ্যাস গড়ার উপকারটাই বিশেষ। অন্য যা-কিছু আছে সবগুলো ব্যাখ্যাসাপেক্ষ ও তর্কপ্রবণ। অবশ্য ইসলামি অঙ্গনের চারুপাঠ কিসিমের বইপত্তের অপ্রতুলতার কথাও অস্বীকার করছি না।
সুদীর্ঘ কালব্যাপী বাঙালি মুসলিম সমাজে বাংলা ভাষা তো অপাঙক্তেয় ছিল। বঙ্গের এ-অঞ্চলের অধিকাংশ প্রতিনিধিত্বশীল সম্মানিত দীনী-দায়িত্বশীল মহোদয়বৃন্দের হৃদয়ের অপ্রশস্ততা, দূরদর্শীতার অপ্রতুলতা, বুকের অজানা দুরু শঙ্কা, নতুন কিছুকে বরণ ও মোকাবিলার করার সমর্থহীনতা ও পূর্বসূরীদের পরম্পরায় বহন করা অভিমান ও স্মৃতির জাবরকাটা ইত্যাদির অনিবার্য ফলগ্রহণ করে, এবং দীনী-শিক্ষার বাইরে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা না-থাকার অভাবে, বাংলা ভাষা বাঙালি মুসলমানের নিজের ভাষা হয়ে ওঠার এখনো চূড়ান্ত স্তর পার করতে পারে নাই। সন্দেহ নেই, দীনরক্ষার ব্যাপারে তাঁদের অসামান্য কুরবানি ও অনন্য মেহনতের কোনোরূপ কমতি ছিল না। তাঁদের নিয়ত ও ইখলাসেও কোনো ধরনের খাটতি ছিল বললে সীমাহীন জুলুম হবে, এবং এমন কথা বলতেও চাই না। তবে সময়ের বিবর্তন, আল্লাহ তাআলার সুনানে কাওনিয়্যার গঠন ও গণমানুষের ভাষা বুঝবার ক্ষেত্রে তাদের অনেক কমতি হয়ে গেছে। ক্ষমতায় প্রভাবশালী সমাজের গতি-প্রকৃতি বুঝতে দেরি করে ফেলেছেন। জগত-মোড়লদের ধাপ্পাবাজী বুঝে দীর্ঘমেয়াদী প্রতাপশালী পদক্ষেপ-গ্রহণে পিছপা হয়ে পড়েছিলেন। ফলে দিন দিন শুধু ঘরের সীমানায় আবদ্ধ হয়ে গেছেন। এক সময় চেনা গলিও অপরিচিত হয়ে যেতে বাধ্য হয়ে গেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারেননি। তবে কেউ কেউ ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিলেন। ভবিষ্যতেও থাকবেন ইনশাআল্লাহ। কিন্তু ব্যতিক্রম তো দৃষ্টান্ত নয়। মেজোরিটি বা অধিকাংশই সর্বদা ধর্তব্য হিসেবে মান্য হয় সবখানে।
অবশ্য এও সত্য, রূপ-অলংকারের বিচারে বাংলা ভাষা এতটা অপ্সরী ছিল না, যতটা না আরবি-ফারসি ও উর্দুর রূপসজ্জা আছে। তৎকালীন আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ, না-দেখার ভান করার জো নাই; এবং তাঁদের রাজনৈতিকভাবে নিগৃহীত ও অবহেলিত হওয়ার ব্যাপারটিকেও অস্বীকার করা যায় না।
মোটকথা যৌক্তিক ও অযৌক্তিক, সামাজিক ও আর্থিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নানা সংকটের গ্যাঁড়াকলে তাঁদেরও অতটা সুযোগ ছিল না বাংলা ভাষার দিকে বাৎসল্যপূর্ণ নজর দেওয়ার। কিন্তু দায় ও দায়িত্ব তো এড়ানো যায় না। সদিচ্ছার অভাব ছিল, সেটা অস্বীকারও করা যায় না। সমাজের চক্রবৃদ্ধিহারে দ্রুত বর্ধনশীল বিবর্তন ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের অন্তর্নিহিত কার্যকারণ না-বোঝার কমতি ও তাদের পরম্পরায় পাওয়া ক্ষমতা ও প্রতাপ ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার অনুভূতিহীনতা—এক সময় যে তাদের ভোগাবে—সেটি তারা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে পারেন নাই। দরকার ছিল নবীন-প্রবীণ সংযুক্ত থাকার সূত্র। তবেই তো নবীনের কর্মস্পৃহা ও প্রবীণের জীবনদক্ষতার সমন্বয়ে গঠিত হতো আগামীর ইশতিহার।
ছয়.
আঁধার রাতের বন্দিনী পড়তে পড়তে আরও অনেক কিছু পড়ে ফেললাম। দেখা গেল আলতামাশ ও নসিম হিজাজির কোনো বইই বাদ পড়ল না। ওদিকে আল-কলম পুষ্প তো পড়ছিই। সেই সময় সাহিত্যকলি নামে একটি পত্রিকা বের হত। সেটিরও সংখ্যা দুয়েক পড়া হয়ে গেল। আমাদের মাদানীনগর থেকে মাসিক দারুল উলুম বের হত। সেটিও বাদ পড়ল না। সময় ঘুরে একদিন যে দারুল উলুমের দায়িত্ব নিতে হবে, তা কি কখনো জানতাম!
সেসময় অপারেশনই মাজারই শরিফের কথাও মনে পড়ে। দুহাতে ঝলমলে রোদ্দুরের মতো চারিধারে যা-পেয়েছি, অবিরত পড়তে থেকেছি। মুহতারাম মাওলানা যাইনুল আবিদীন সাহেবের সাহিত্যের ক্লাস ছিল আরেক প্রাণভোমরা। পৃষ্ঠা উলটাতাম আর স্বপ্নগুলো ডানামেলার তাড়নায় দীপিত হতে থাকত।
মাদানীনগরের উর্দু প্রথম বিভাগে থাকতেই জীবনের সর্বপ্রথম রোজনামচা লেখলাম। ভাঙা ভাঙা হাতে লিখেছিলাম, নতুন বই সংগ্রহের বাসনা। লেখাগুলো পড়ে স্মৃতিকাতর হই। আবার সেসব দিনের কথাও মনে পড়ে।