আমি সাহিত্য করব—এই ভাবনা হুট করেই মনে উদয় হয়নি। আবার লেখালেখি করব—এই সিদ্ধান্তও খুব একটা ভেবেচিন্তে নিইনি। সাহিত্যের বোধ বলি কিংবা সৃজনের প্রেরণা, এটা আমি জন্মগতভাবে পেয়েছি। এর পেছনে উজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে ভাটিয়াল জনজীবন আর হাওড়ের নিসর্গ। ভাটিবাংলার আপাতসরল অথচ নানা জটিলতায় ভরপুর সমাজে এক গেরস্ত পরিবারে আমার জন্ম। সেই সমাজের মাটির মানুষ যারা, সময়ের পরতে পরতে তারা যে কত নিরীহ আর নির্মম হতে পারে—তা নিজের চোখে দেখা। হাওড়পাড়ের নমিত নিসর্গের কোলে কেটেছে আমার বেড়ে ওঠার দিনগুলো। ফসলের তাজা ঘ্রাণে খুঁজে পাওয়া জীবনের মানে, গাংধোয়া বাতাসের ঝাপটায় লুফে নেওয়া যাপনের আনন্দ—এসবই আমার মননের ঐশ্বর্য।
আমার বুঝপাখি যখন ডানা মেলতে শুরু করেছে, সেই উড়ু-উড়ু সময়ে আমি পেয়েছিলাম একটি আশ্চর্য পড়ুয়া মন। তখন নিজের মতো করে জীবন ও জগৎটাকে চিনতে শুরু করেছি। গ্রামের পাশ দিয়ে কুলকুল সুরে মহুয়ার পালা গেয়ে বয়ে গেছে ধনু নদী। বাড়ির পেছনে দাঁড়ালে দেখা যেত গাঙেয় নিসর্গ। এপারে একচিলতে পাড়াগাঁ, ওপারে দিগন্তজোড়া মাঠ, মাঝখানে রুপোর ফিতের মতো টলটলে নাব্য গাং। তার ঢেউখেলানো বুকে পাক খেয়ে বয়ে চলছে খরস্রোত। চোখের তারায় বিস্ময়চিহ্ন নিয়ে তাকিয়ে দেখতাম। মাটির ডেলা তুলে ঢিল ছুড়ে মারতাম স্রোতের পাকে। পানির ঘূর্ণি ঠিকই চলত, অতলে হারিয়ে যেত আমার ঢিল। সময় ও নদীর স্রোত কারও জন্য থামে না—এ কথাটির মানে এভাবেই বুঝতে পেরেছি।
বর্ষায় বিশাল মাঠের বুক ফুঁড়ে জেগে উঠত হাওড়। ভিটেবাড়ির চারদিকে থইথই করত বানের জল। শুরু হতো পানিবন্দি দিনযাপন। স্রোতের পাকে নানা জলজ উদ্ভিদের ঝাড় ভেসে আসত। এর ভেতরে লুকিয়ে থাকত লাল শাড়ি পরা পুঁটি মাছের ঝাঁক। ওই ঝাড়েই থাকত পানিকোলা—আমরা বলতাম কেওড়ালি। লাল পুঁটি ধরা আর কচি কেওড়ালি খাওয়ার লোভে দিনমান পানিতে পড়ে থাকতাম। কলার ভেলায় বাইচালি বাইতে বাইতে করতাম জলকেলি। এই আনন্দ হারিয়ে যেত আফালের দিনে। শান্ত হাওড় হঠাৎই কেমন উত্তাল হয়ে উঠত। তখনই ঘটত নৌকাডুবির মতো দুর্ঘটনা। বাড়ির ঘাটে ভিড়ত শিশু বা নারীর জলডোবা দেহ। জীবনের সৌন্দর্য উপভোগ্য আর মৃত্যুর যন্ত্রণা ভয়াবহ—এর থেকেই আঁচ করতে পেরেছি।
বয়স যত বাড়ছিল, আমাকে ততই মুগ্ধ করছিল চেনা পৃথিবীর নিসর্গ। বাড়ির পেছনে তেলাকুচা, বিকাশলতার ঝাড়; এর সাথে দ্রোণফুল, পানিছিটকির ঝোপ। তার পরে আড়াজুড়ে ঢোলকলমির বন। বাতাসে সারাক্ষণ ম-ম করত বুনো মৌতাত। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে একটি হাঁটাপথ। এ পথ ধরে নদীতে গেলে পা জড়িয়ে ধরত স্বর্ণলতা। মাথার ওপর আঁকিবুঁকি কাটত চপলা প্রজাপতি। এই বনালি মোহন কাটিয়ে যখন ঘাটে যেতাম, তখন গিয়ে পড়তাম মুগ্ধতার অথইয়ে। দুপুরের হলুদ রোদে পাড়ে চিকচিক করত রাংতা বালু। সেই বালুতে গর্ত খোঁড়া খেলত সমবয়সিরা। আমি মরা ঝিনুকের খোলে থরেথরে সাজিয়ে রাখতাম শুকনো শামুক। পানিতে পা ভিজিয়ে চুপচাপ বসে ভাবতাম—কতখানি ডুব দিলে দেখা যাবে গাঙের গহন!
এসব দেখাদেখি লেখালেখির রূপ পেয়েছে মাদরাসাজীবনে। মাদরাসার ‘নেজামুল আওকাতের’ বাইরে আমার ব্যক্তিগত একটি রুটিন ছিল। এ সময়ে চলত নিবিড় সাহিত্য শীলন। ক্লাসরুমে যেখানে বসতাম, বেঞ্চের নিচে থাকত ঝুড়িবোঝাই বিচিত্র বইয়ের সমাহার। ছাত্রাবাসে যেখানে থাকতাম, শিথানের পাশে থাকত তোরঙ্গভরতি নানাধর্মী বইয়ের সংগ্রহ। এ দুই জায়গায় বইপত্রের সঙ্গে রেখে দিতাম লেখাজোখার খাতা, দিনলিপির ডায়েরি। যখন যে অনুভূতি মনে আসত, লিখে রাখতাম সব। ছুটিছাটায় বাড়িতে গেলে ব্যাগ ভরে নিয়ে যেতাম আধপড়া না-পড়া বই, লেখার খসড়া খাতা। যে কদিন থাকতাম, ঘরে-বাইরে সবখানে চলত আমার পড়ালেখা। বই পড়ায় বুঁদ হয়ে, লেখালেখিতে মগ্ন থেকে যাপন করতাম ছুটির দিনগুলো।
আমার লেখালেখির একটি বিশেষ ব্যাপার ছিল, নিয়মিত দিনলিপি লেখা। প্রাথমিক শেষ করে যখন মাধ্যমিকে উঠি, তখন থেকে মননে-চেতনে এ বোধটি বসিয়ে নিই : কাগজের ক্যানভাসে কলমের তুলিতে রাঙিয়ে তুলব আমার দিনযাপন। এর থেকেই দিনলিপির ডায়েরিটি হয়ে যায় ফটোগ্রাফের অ্যালবাম, সেখানে জমাতে থাকি জীবন ও জগতের সামগ্রিক দৃশ্যপট। শুধু আপনকথা নয়, নিজের চোখে দেখা এবং খবরে পাওয়া চারপাশের নানা ঘটনাপুঞ্জ বিভিন্ন আঙ্গিকে লিখতে থাকি। এভাবে সচল হয়ে ওঠে আমার কলম, মনের অজান্তে পাকা হতে থাকে লেখার হাত। সাহিত্য সমাজের আয়না, নিজেকে দেখার আতশকাচ। সাহিত্য করতে গিয়ে আমি এই আয়নায় দেখতে পাই জগৎকে। এই আতশকাচ দিয়ে বুঝতে পারি জীবনের মরম।
আহা, সুখপাঠ্য! অপেক্ষার মধুর ফল।
অসম্ভব সুন্দর অভিব্যক্তি।
অসম্ভব সুন্দর অভিব্যক্তি।