ইয়ামান… আমার ছোট্টটি। স্মৃতি বলতে আমার করোটিতে তুমি ছাড়া আর কেউ নেই। ফলকাটা যাইতুন গাছের মতো শূন্য এখন আমার আঙিনা। তুমি নেই, ভাবলেই আমার পৃথিবী এলিয়ে পড়ে মুমূর্ষু কোনো রুগীর মতো। তুমি নেই, ভাবলেই হতাশার ধারালো তলোয়ার আমাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। তোমার চিরাচরিত সেই হাসির শব্দ আমার কানে এলে আমি দৃষ্টিহীন মানুষের অনুভূতির মতো হাতড়ে খুঁজি তোমাকে। বিছানায়, চাতালে। কিন্তু তুমি নেই!
ইয়ামান! খুব বিস্ময় লাগে, যখন ভাবি তোমাকে ছাড়া আমি কীভাবে যেন বেঁচে আছি। দিব্যি শ্বাস ফেলছি। হাঁটছি, ফিরছি। আসলেই কি বেঁচে আছি?
তোমার বয়স খুব বেশি ছিল না। তবু আমার কাছে তোমার উপস্থিতিই ছিল সবচেয়ে বড় পূর্ণতা। তোমার চোখে ছিল প্রখর আর বিস্ময়াভিভূত এমন এক দৃষ্টি, যেখানে সবসময় বিবিধ প্রশ্নেরা জেগে থাকত। তোমার চোখ ছিল পৃথিবীর দিকে একটি বিস্তৃত খোলা জানালার মতো। যে জানালা কখনো বন্ধ হতো না।
তুমি সারাক্ষণ আমাকে এমন সব প্রশ্নে ডুবিয়ে রাখতে, যা তোমার বয়সের কোনো শিশুর মুখে কল্পনাও করা যায় না। আমরা কেন ঘুমাই? পাখির মতো আমাদের ডানা নেই কেন? আমরা কেন শুরু থেকেই জান্নাতে থাকি না? আল্লাহ কি আমাদের সবাইকে দেখেন? এমন সব অদ্ভুত এবং বয়সোচিত প্রশ্নের সামনে আমি ছিলাম ঠিক বিপন্ন।
আমার যাপিত সময়গুলোর ভেতর দিয়ে তুমি হেঁটে যেতে ছোট ছোট পায়ে। তোমার পায়ের সে কোমল পদচিহ্ন এবং মধুর পদধ্বনি আমার হৃদয়ে যেন বিরহীর বাঁশির মতো বাজে, আজও এবং সবসময়ই। এ বাঁশির শব্দ কোনোদিন থামবে না।
আমি তোমাকে ডাকতাম ‘আমার ছোট্ট দার্শনিক’ বলে। দর্শন পড়েছ বলে নয়, বই পড়েছ বলেও নয়। বরং তুমি জীবনকে প্রশ্ন করতে এমন এক বিস্ময় নিয়ে, যা আমি বহু আগেই হারিয়ে ফেলেছি। তুমি ছিলে আমার শিক্ষকের মতো। আর আমি, তোমার মা, তোমার সামনে জ্ঞানী সাজার ভান করতাম। সব মায়েরাই এমন করে। কিন্তু তুমি সবার মতো ছিলে না।
আমি তোমাকে বুকে জড়িয়ে ধরতাম। আর এই ভেবে নিশ্চিত থাকতাম—তুমি তোমার বয়সের চেয়ে অনেক বড়। যেন সময়ের গতি এবং অভ্যাসকে অস্বীকার করে তুমি আগেই বড় হয়ে গেছো। আমার মনে হতো, আল্লাহ আমাকে তোমার মাধ্যমে এমন কিছু দান করেছেন, যা আর কখনো ফিরে আসে না, আসবে না। কোলাহলমুখর এই পৃথিবী নামক বইয়ের পাতায় তুমি ছিলে একটি সুন্দর কবিতা।
আজ তোমার কথা ভাবলে মনে হয়, আল্লাহ তোমাকে পাঠিয়েছেন আমাকে একটি সংক্ষিপ্ত অথচ সম্পূর্ণ পাঠ শেখাতে—নিষ্কলুষতা প্রজ্ঞার চেয়েও গভীর, আর শৈশব কখনো কখনো যেকোনো দর্শনের চেয়েও বেশি অর্থবহ, বেশি সত্য।
তুমি এমনভাবে হাঁটতে, যেন ছোট্ট এটুকুন শরীরের ভেতর দিয়েই বহু বয়স পার করে এসেছ। তোমার আগ্রহ সমবয়সীদের মতো ছিল না। তোমার আগ্রহ ছিল প্রাণিজগতের তথ্যচিত্রে, সমুদ্রের গভীর রহস্যে, আর বিস্তৃত বিশাল মহাকাশে—যেখানে দূর থেকে তারাগুলো পরিচয়হীন চোখের মতো ঝিলমিল করে। তুমি এসবে ডুবে থাকতে।
আর যখন তুমি আমার পাশে এসে বসতে, তখন তোমার চিরচেনা সে ডাক আমার পিছু ছাড়ত না—‘মা, চলো কথা বলি।’ তারপর যেন প্রশ্নের বৃষ্টি নামত, ‘বরফ কি সত্যিই আছে, নাকি কল্পনার তৈরি? নবি আদম গাছের ফল না খেলে কি আমরা জান্নাতেই থেকে যেতাম? তারাগুলো আকাশ থেকে পড়ে যায় না কেন? আল্লাহ কি ওদের সবারও ওপরে আছেন?’
নিষ্পাপ দৃষ্টি আর প্রখর চাহনিতে এমন সব প্রশ্ন ছুড়ে দিতে, আমার মনে হতো বয়সে তুমি আমার থেকেও বড়। আমি বিস্ময়ে থ হয়ে থাকতাম।
একবার, তখন তোমার বয়স পাঁচও পেরোয়নি, শিশুসুলভ কণ্ঠে তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে—‘প্রাণীরা কেন একে অন্যকে খায়? সবাই কি শুধু ঘাস খেয়ে বাঁচতে পারে না?
তখন আমি তোমাকে বলিনি, মানুষ কখনো মানুষকেই হত্যা করে, ক্ষুধার জন্য নয়; বরং এমন এক নৃশংসতার বশে, যা যেকোনো জঙ্গলের হিংস্রতার চেয়েও আরও পাশবিক, আরও নিষ্ঠুর। আমি পৃথিবীর এই কুৎসিত মুখটা তার কাছ থেকে আড়াল করে রাখতে চেয়েছিলাম, অপাপবিদ্ধ আর মাসুম একটি চাদরে আমি তাকে ঢেকে রাখতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু আমি জানতাম না—যে উত্তরটা আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম, মানুষের নিষ্ঠুরতাই একদিন সেটা উচ্চারণ করবে। আর সে নিজেই হয়ে উঠবে সেই সত্যের সাক্ষী ও শিকার। যে সত্য বলে, মানুষের হিংস্রতা পশুর হিংস্রতাকেও ছাড়িয়ে যায়।
ইয়ামান, তুমি ছিলে আমার সবচেয়ে খাঁটি স্বপ্ন। কল্পনার খেরোখাতায় স্বপ্নের কালি দিয়ে আমি তোমার জন্য পুরো জীবনই এঁকে রেখেছিলাম। তোমার অসংখ্য জন্মদিন, তোমার ক্রমবিস্তৃত হাসি। কল্পনা করেছি তোমাকে স্নাতকের পোশাকে আর তোমার প্রতিটি অর্জনে আমার করতালির শব্দে। কিন্তু আজ, তুমি নেই। আমার কল্পনারা পরিযায়ী পাখির মতো কোথায় যে হারিয়ে গেছে। স্মৃতির সেসব ধারালো চাবুকের শাঁ শাঁ শব্দে এখন আমার দিন কাটে।
শৈশবে আকাশের নক্ষত্ররাজির সাথে ছিল তোমার বন্ধুত্ব। এদের মতো তুমিও ছিলে নাক্ষত্রিক সৌন্দর্যে বিমোহিত। নক্ষত্র নিয়ে তুমি প্রশ্ন করতে; খাতায় লিখে রাখতে তোমার স্বপ্ন। খাতার এটুকু পাতায় তুমি আকাশকে আঁকতে চাইতে।
তোমাকে আমার মনে পড়ে ইয়ামান। মনে পড়ে দগ্ধ স্মৃতির মতো। ফলকাটা যাইতুন গাছের খাঁ খাঁ শূন্যতার মতো। তুমি মনে করতে, আমি তোমাকে সবকিছু থেকে রক্ষা করব। মাতৃত্বের দেয়ালকে তুমি ভাবতে সবচেয়ে দুর্ভেদ্য ও অলঙ্ঘ্য। কিন্তু এ দেয়াল তোমাকে রক্ষা করতে পারেনি।
জানি, জান্নাতে তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করছ। আমাদের আবার দেখা হবে। জান্নাতের সবুজাভ বাগানে সেদিন আমি তোমার সব প্রশ্নের উত্তর দেব।
[গাজায় দখলদার ইসরায়েলের হামলায় ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি ইয়ামান শহিদ হয়। বয়স ছিল সাড়ে সাত বছর। এটা তার মায়ের লিখিত একটা স্মৃতিকথা অবলম্বন করে লেখা। ইয়ামান ছিল তার মায়ের প্রথম সন্তান।]