এমনই একটা আন্ধার-কোনা বিকাল, যখন মাগরিবের আজান আকাশে কান্দনের মতন ছড়ায়া পড়ত, আর আমার মনে বাজতে থাকত একটা অজানা শোর; আমার বাচপন—যারে কেবল কোনো খেলার মাঠ বা ইশকুলের মতন লাগে না আমার, একটা মখমল ঢাকা সময়ের মতন লাগে, যার ভাঁজে ভাঁজে লুকায়া আছে পুরানা দিনের ঘ্রাণ; যেইখানে মইরা গিয়াও জিন্দা হয়া আছেন আমার দাদু, যার নাম নিলেই বুকের ভিতর দোয়ার মতন শান্ত শিহরণ জাইগা ওঠে; বিকালটায় তিনি বারান্দার আরামকেদারায় হেলান দিয়া বসতেন, তার হাতের আঙুলে লাইগা থাকত তামাকের মৃদু গন্ধ, আর পায়ের কাছে, মেঝেতে, ছড়ায়া থাকত শতচ্ছিন্ন পুরানা কাপড় ও রেশমের সুতা।
সেগুলা দিয়া নাকি নকশি কাঁথা হইব। আমি অবাক হয়া দেখতাম দাদুরে। তিনি কোনো শিল্পী ছিলেন না, একজন সাধারণ গ্রামীণ মানুষ ছিলেন। কিন্তু ওই কাপড়ের টুকরাগুলা তার হাতে পড়তেই এক একটা শানদার কিচ্ছা হয়া উঠত। নকশা আঁকার জন্য তিনি কখনও কোনো ছক ধরতেন না, তার হাতের হুনারই ছিল এমন স্বতঃস্ফূর্ত। প্রতিটা সাজরে মনে হইত তার স্মৃতি থেইকা টাইনা বাইর করা এক একটা আফসোসের নিশানা; স্মৃতি, দুঃখের চিত্রলিপি; আমার কাছে নকশি কাঁথা ছিল না, ছিল দাদুর কোলে শুইয়া শোনা হাজারো কাহিনির সেলাই।
দাদু কাঁথা সেলাই করতেন না, তিনি ছিলেন পুরুষ, ভারী পুরুষ। তদুপরি তিনি কাঁথার সবচেয়ে বড় কদরদান ছিলেন। মা যখন সেলাইয়ের জন্য পুরানা শাড়িগুলা কাটতেন, আর নতুন সুতায় রং চড়াইতেন, দাদু তখন আমগো সামনে নকশি কাঁথার ইতিহাস কইতে কইতে নকশা আঁকতেন। তিনি কইতেন, কাঁথা হইলো নারীগো তাজমহল। তাজমহল মাশুকের পিরিতের লগে পাথর, মার্বেল দিয়া তৈয়ার হইসে, আর কাঁথা তৈয়ার হয় নারীর দিলের লগে সবরের পিরিত মিশাইয়া।
তিনি কইতেন, একটা নকশি কাঁথা তৈয়ারে সাতখান স্তর থাকে—যেন মাইনষের সাত জন্মের হাকিকত । প্রথম স্তর হইল জন্ম, শেষ স্তর হইল পরকাল, আর মাঝের স্তরগুলা মহব্বত, বিচ্ছেদ, শোক, কোশেশ আর নতুন দিনের উম্মিদ। আমি দাদুরে জিগাইসিলাম, ‘দাদু, তাইলে এই কাঁথা সেলাইয়ের লাইগা পুরানা কাপড় লাগে ক্যান?’
দাদু হাইসা উত্তর দিসিলেন, ‘বেটি! নতুন কাপড়ে তো শুধু শরীর ঢাকে, পুরান কাপড়ে ঢাইকা থাকে স্মৃতি, স্নেহ, ভালোবাসা।’
এই কথা আজও আমার মনের ভিতর বাইজা ফিরে। তার এই মর্মবাহী জওয়াব জীবনবোধের নয়া তারানা হইয়া উঠে প্রায়ই। আসলে নকশি কাঁথা মূলত পুরানা শাড়ি, লুঙ্গি, ধুতি বা ওড়নার মতন জিনিশপাতিরে স্তরে স্তরে ফেইলা তৈয়ার করা হয়, যারে বলা হয় ‘চট’। এই চটরে আবার বিশেষ একটা সেলাই দিয়া সেলাই করা হয়, যার নাম ‘ফোঁড়’। ফোঁড়ের আবার কয়েকটা কিসিম। তবে প্রধান দুইটা ফোঁড়ের নাম—পাটি ফোঁড় আর কাইত্যা ফোঁড়। ফোঁড়গুলা কাঁথাশিল্পীর হাতে লেখা কোনো দিলপসন্দ কবিতার মতোই কাঁথারে সাজায়া তোলে। সেইসব ফোঁড় আর স্তররেই দাদু জীবনক্রমের সাথে মিলাইতেন।
দাদুর কথায় নকশি কাঁথা ছিল একটা লোকজ ম্যায়খাঁনা, যেইখানে রং আর নকশার নেশায় মানুষ হয়া থাকত বুঁদ। তিনি তথ্য দিয়া কইতেন, এই শিল্পের প্রচলন কেবল বাংলায় না, এইটা ভালোবাসা পাইসে ভারতের বিহারে, উড়িষ্যায় এবং ত্রিপুরার কিছু অংশেও। তবে এর মূল মাকান ছিল বৃহত্তর বাংলার পল্লী মুলুকই।
নকশি কাঁথার প্রাচীনত্বের প্রমাণ মিলে প্রায় পঞ্চদশ শতকে রচিত বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবত বইয়ে, যেইখানে ‘কাঁথা’ শব্দের পয়লা উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে আধুনিক নকশি কাঁথার যে শিল্পরূপ, তার মূলত বিকাশ ঘটে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে। কাঁথারে জায়গাভেদে খেতা, কেন্থাও কওয়া হয়।
এই শিল্পের আধুনিক পরিচিতি আইনা দেন কবি যশোদাকুমার নন্দী, এবং বিশেষ কইরা পল্লী কবি জসীমউদ্দীন, তাঁর বিখ্যাত কাব্যকিতাব নকশি কাঁথার মাঠ (১৯২৯) এই শিল্পরে বাংলা সাহিত্যের একটা কামেল ভূমিকা দিসে। জসীমউদ্দীন এই শিল্প নিয়া বিশদ গবেষণা করসিলেন। গুরুসদয় দত্ত, যিনি লোকশিল্প পুনরুদ্ধারে বিশেষ ভূমিকা রাখসিলেন, তার সংগ্রহেও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাচীন নকশি কাঁথার কথা আছে।
নকশি কাঁথার আঞ্চলিক কিসিমও আছে। দাদু কইতেন, প্রতিটা অঞ্চলের কাঁথার নকশা নাকি ভিন্ন ভিন্ন ইশারা দেয়। অঞ্চলভেদে এর সাজও বহুরকম হয়। দাদু আরও কইতেন, নকশি কাঁথার আলাদা একটা জবান আছে; নকশি কাঁথার নকশাগুলা কোনো সাধারণ ডিজাইন না, প্রতিটা নকশার একটা গভীর মতলব, পয়গাম আছে।
তখন আমার বয়স মাইরা কাইটা সাত কি আট। শরতের শেষ, বাতাসে হেমন্তের বিরান গন্ধ। দাদু তখন নয়া একখান কাঁথা তৈরির সাজ আরম্ভ করসেন। কাঁথাখান তৈরি হইতেসে তারই বাচপনের এক দোস্তের জন্য, যিনি জীবনের শেষ মনজিলের দিকে আগাইতেসেন।
যখন তিনি কাঁথার মাঝখানে বড় একটা পদ্মফুল আঁকলেন, যেইটা একটু বাঁকা, একটু ঝুইলা পড়া। ‘দাদু, পদ্মফুলটা এমন বদসুরত ক্যান?’—আমি মুখ ফসকাইয়া বইলা ফেললাম। দাদু একটা দীর্ঘ দম নিলেন। তার কণ্ঠে গুরুগম্ভীর আওয়াজ, আমার মনের ভিতর তা বজ্রের লাহান আঘাত করত—
বোকা বেটি! এই পদ্মফুল বদসুরত না। এইটা হইল বড়াই। দ্যাখ, কাঁথার চারিধারে সেলাই করা লতানো গাছগুলা কেমন সতেজ, কী খুশনুমা চেহরা তাগো; সেগুলা তোর মতন ছোটবেলার প্রতীক। আর মাঝের এই পদ্মটা, এইটা তোর দাদিজানের চোখে দেখা বার্ধক্যের মতন। জীবন যখন মাঝখানে আসে, তখন সেইটা আর নিখুঁত থাকে না, তার মধ্যে ক্লান্তির, দুঃখের, বিচ্ছেদের, আর আফসোসের বেহদ প্যাঁচ পইড়া যায়। তবুও মানুষ থাইমা থাকে না। তামাম ক্লান্তি উপেক্ষা কইরা আগায়া যায়। এই বাঁকা পদ্মফুলটা তার বদন দিয়া জীবনের সকল চড়াই-উৎরাই ইনকার না কইরা বরং তারেই সাদরে মোবারকবাদের কথা কইতেসে।’
দাদুর এইসব ব্যাখ্যা শুইনা আমি নীরব হয়া যাইতাম। আমার মনে হইত, দাদুর প্রতিটা কথা যেন রেশমের সুতাই, যেইগুলা আমার নাদান দিলমগজ সেলাই কইরা দিতেছে।
তিনি আরও কইতেন—‘কাঁথার চারধারে যে মোটা সেলাই দেওয়া হয়, তারে বলে ‘পাড়’। নকশি কাঁথায় বহুত নামের পাড় হয়। এই পাড়টা হইল আমগো হালতের বাঁধ বা নিয়মের প্রতীক। জীবন এর বাইরে গেলেও, এই পাড়ের ভিতরেই, নিয়মের কোঠরেই তার ফিরা আসতে হয়। জীবনের তামাম আশীর্বাদ এর ভিতরেই পলায়া থাকে।’
দাদুর এইসব তর্জমা শুইনা আমার চোখ কাঁথার সেলাইয়ের মধ্যে আর নকশা দেখত না, দেখত জীবনবিধির আস্ত কিতাব। প্রতিটা সেলাইরে মনে হইত এক একটা আদত, এক একটা স্মৃতি।
এমন কইরা একটা সোনারঙা বাচপনে, দাদুর সান্নিধ্যে, নকশি কাঁথা আমার কাছে নিছক গ্রামীণ শিল্পকর্মের ফিকির থেইকা বাহির হয়া পরিণত হইসিলো একটা ঐতিহাসিক মহাফেজখানায়। আমি দেখসিলাম, সুতা আর কাপড়ের ভাঁজে মানুষের ইহজীবন কেমনে রচিত হয়, শিখসিলাম স্রেফ কয়টা পুরানা কাপড়ের মজমায়, চোখ লাগানো নকশায় কেমনে মরণতক প্রতিটা ধাপ অঙ্কিত হয়।