আজর রাতের খাবার শেষ করে আলখাল্লাটি গায়ে দিয়ে দাঁড়াল। তার অল্পবয়সী স্ত্রী ইমতালি অবাক হয়ে বলল, ‘এত রাতে আপনি বাইরে যাচ্ছেন প্রিয় স্বামী!?’ আজর মুচকি হেসে বলল, ‘হ্যাঁ! আর পূর্ব দিগন্তে আমাদের প্রভু- আলোর দেবতা ‘শাম্মাশ’ উদিত হওয়ার আগে ফিরব না।’
কুরআনে বর্ণিত হাজার হাজার বছর আগে ইবরাহিম আলায়হিস সালামের পিতা আজরের সময় থেকে নিয়ে ইতিহাসের নানা বাঁকবদল করে এভাবেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সুদীর্ঘ জীবনচরিত রচনায় পথযাত্রা করেছেন আরবি ভাষার বিখ্যাত সাহিত্যিক আবদুল হামিদ জাওদা সাহহার। ‘সাহহার’ অর্থ জাদুকর। জাদুকরি ভাষায় বর্ণনার মোহন মেখে সাহহার রচনা করেছেন ২০ খণ্ডের সিরাতের অসামান্য গল্পভাষ্য— ‘মুহাম্মাদ রসুলুল্লাহ ওয়াল্লাযিনা মাআহু’।
সিরাতের গ্রন্থাকাররা প্রায়শই নবিজির জন্ম মুবারক থেকে আলোচনা শুরু করেন। কেউ সূচনা করেন জাহেলি যুগের বর্ণনা দিয়ে। কেউবা কাছাকাছি অন্য কোনো প্রেক্ষাপট কেন্দ্র করে। ব্যতিক্রম সাহহার। তিনি সিরাতের আলোচনা শুরু করেছেন কয়েক হাজার বছর আগে; হজরত ইব্রাহিম আলায়হিস সালামের সময় থেকে— এমনকি তাঁর পিতার আলোচনা দিয়ে।
এখানে একটি তাৎপর্য রয়েছে। নবি ইব্রাহিম মুসলিম জাতির জনক। মিল্লাতে হানাফিয়্যার গোড়াপত্তনকারী। শেষনবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম যে স্বচ্ছ তাওহিদের বাণী নিয়ে আগমন করেছেন, সেই তাওহিদের সুরই রণিত হয়েছে আবুল আম্বিয়া ইবরাহিমের কণ্ঠে। লেখক হয়তো এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন— সিরাত পাঠের মজা তখনই পাওয়া যাবে, যখন পাঠের আগে রসনায় মেখে নেয়া যাবে ইবরাহিমি ধর্মের মধু।
সাহহার রচিত এই সিরিজ সিরাতের রত্ন-আকর ঘেঁটে অঞ্জলি ভরে তুলে আনা নান্দনিক আখ্যান। ক্রমান্বয়ে সিরিজের খণ্ডগুলো হচ্ছে—

নবিদের জনক ইবরাহিম
এই খণ্ডে সাহহার মানবজাতির প্রাচীন নবি হজরত ইবরাহিম আলায়হিস সালামের জীবন এবং আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার বর্ণনা দিয়েছেন। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর জীবনে নেমে আসা পরীক্ষা এবং তাতে উত্তীর্ণ হওয়ার কথাও তুলে ধরেছেন দিলকাশ বর্ণনায়। তুলে ধরেছেন নবি ইবরাহিমের হিজরত এবং আরব জাতির বংশগত ভিত্তির আলোচনা। শেষ অংশে এনেছেন নবি ইসমাইলের মাধ্যমে আরব জাতির ইতিহাস সূচিত হওয়ার আখ্যান।
আরবদের জননী হাজেরা
নবি ইবরাহিমের সহধর্মিণী এবং নবি ইসমাইলের মা হাজেরার জীবন, মক্কার শূন্য উপত্যকায় তাঁর বসতি স্থাপন ও জমজমের কূপ আবিষ্কারের কথা এসেছে এই খণ্ডে। এসেছে মা-ছেলের সংগ্রাম এবং মক্কাকে ভবিষ্যৎ ইসলামের নগরী হিসেবে আল্লাহকর্তৃক নির্ধারণের কথা।
বনি ইসমাইল
এই খণ্ডে আলোচনা করা হয়েছে ইসমাইলি আরবদের জীবন ও বিভিন্ন গোত্রগঠনের কথা। মরু আরব্য সমাজের নৈতিকতা ও সংস্কৃতি এবং ইসলামপূর্ব আরবের সামাজিক ভিত্তিগুলোর আলোচনাও এসেছে এখানে।
আদনানিদের ইতিহাস
আদনানি বংশের বিস্তার, আরব গোত্রগুলোর রাজনৈতিক কাঠামো, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস এবং তাদের মধ্যে কুরাইশের শীর্ষ অবস্থান এই খণ্ডের প্রধান বিষয়।
কুরাইশ
কুরাইশ বংশের ইতিহাস, কাবাঘর রক্ষণাবেক্ষণ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, গোত্রীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার আখ্যান বিশদভাবে উঠে এসেছে এখানে। এসেছে মক্কার ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশেরও কিছু আলোচনা।
নবিজির জন্ম
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের জন্ম, শৈশব, হালিমা সাদিয়ার কাছে লালন-পালনের বর্ণনা এসেছে এই খণ্ডে। কুরাইশি সমাজে নবিজির প্রাথমিক জীবন, সততা ও আমানতদারিতার পরিচয় দেওয়া হয়েছে জীবন্ত ও সাহিত্যিক বর্ণনায়।
খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ
উম্মুল মুমিনিন খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার চরিত্র, তাঁর ব্যবসায়িক জীবন, নবিজির সাথে তাঁর পরিচয় ও বিবাহের আকর্ষণীয় বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এই খণ্ডে। ইসলামপূর্ব সমাজে তাঁদের মর্যাদা ও জীবনদর্শন—এসবের আলোচনাও রয়েছে এখানে।
শোকের বছর
এই খণ্ডে উম্মুল মুমিনিন খাদিজা ও নবিজির চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর করুণ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এসেছে কুরাইশের শত্রুতা বৃদ্ধি ও তায়েফে নবিজির প্রতি জুলুমের মর্মস্পর্শী ঘটনা।
হিজরত
মদিনাকে ইসলামের কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত করা ও বাইয়াতে আকাবার কথা এসেছে এই খণ্ডে। সাহাবিদের হিজরত, নবিজির মক্কা ত্যাগ, গারে সাওরে অবস্থান ও মদিনায় প্রবেশের হৃদয়ছোঁয়া বর্ণনা রয়েছে খণ্ডটিতে।
বদর যুদ্ধ
বদর যুদ্ধের প্রেক্ষাপট এবং সংখ্যালঘু হয়েও মুসলিম বাহিনীর অলৌকিক বিজয়ের দাস্তান এসেছে এই খণ্ডে। এসেছে কুরাইশের নির্মম পরাজয়ের কথা। বদরের পর ইসলামের রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত হওয়ার বিষয়টিও তুলে আনা হয়েছে খণ্ডের শেষ দিকে।
উহুদ যুদ্ধ/খন্দক যুদ্ধ/হুদাইবিয়া সন্ধি/মক্কা বিজয়/তাবুক যুদ্ধ
এই পাঁচটি খণ্ডে ইসলামের প্রসিদ্ধ কয়েকটি যুদ্ধ ও প্রেক্ষাপটের বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে। সিরাতের পাঠকের কাছে এখানে নতুন কোনো তথ্যের প্রাপ্তি না ঘটলেও লেখকের নিপুণ চিত্রায়নগুলো পাঠককে অবশ্যই বিমোহিত করবে।
দূত প্রেরণের বছর
আরবের বিভিন্ন গোত্রের মদীনায় আগমন ও ইসলামগ্রহণের আলোচনা, রাষ্ট্রীয় কাঠামো নির্মাণ ও নবিজির রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার বর্ণনা দিয়ে সাজানো হয়েছে এই খণ্ডটি।
বিদায় হজ
বিদায় হজ ও আরাফার ঐতিহাসিক ভাষণ এমনভাবে চিত্রিত হয়েছে এই খণ্ডে, পাঠকের মনে হবে—তিনি স্বশরীরে সেই হজ কাফেলায় উপস্থিত আছেন এবং নিজ কানে আরাফার ঐতিহাসিক ভাষণ শ্রবণ করছেন।
নবিজির ইন্তেকাল
নবিজির ওফাতপূর্ব অসুস্থতার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এখানে। সাহাবিদের প্রতি নবিজির শেষ মুহূর্তের উপদেশ, কুরআন-সুন্নার দায়িত্ব অর্পণ; অতপর তাঁর ওফাতের মুহূর্তগুলো লেখক তুলে এনেছেন হৃদয়গ্রাহী বর্ণনায়। একইসঙ্গে আলোচনা করেছেন ইসলামি যুগের নতুন অধ্যায়ের সূচনা নিয়ে।
সাহহারের গল্প বলার ঢঙ আকর্ষণীয়। প্রাচীন ও আধুনিক গদ্যের মিশেলে তিনি নির্মাণ করেছেন সিরিজের বর্ণনাশৈলী। তাঁর আরবি শক্তিশালী, অথচ সহজ। যুথবদ্ধ বাক্যকাঠামোতে সাহহার ব্যবহার করেছেন সহজ ও পরিচিত শব্দ। ফলে পাঠক এখানে খুঁজে পাবেন ভাষার ঋজুতা, নিতে পারবেন বলিষ্ঠ গদ্যের স্বাদ; একইসঙ্গে বয়ানের দীর্ঘতা পাঠককে ক্লান্ত বা বিরক্ত করবে না। মধ্যম স্তরের পাঠকও অনায়াসে পড়ে ফেলতে পারবেন সিরাতের এই সিরিজটি।
গদ্যের ভেতর রয়েছে সংলাপ। ঘটনার চিত্রায়নে লেখক সুষম সংলাপের অবতারণা করেছেন জায়গায় জায়গায়। সিরাতের গল্পভাষ্যে দক্ষতার সঙ্গে সংলাপের ব্যবহার অল্পসংখ্যক যে কজন লেখক করতে পেরেছেন, সাহহার তাদের মধ্যে অন্যতম।
সাহহারের রচনার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তিনি লেখায় বিশ্লেষণ তুলে ধরেন কম, ঘটনার বর্ণনা দেন বেশি; এবং এই বর্ণনার ভেতরই প্রচ্ছন্নভাবে ঘটনার বিশ্লেষণ ফুটে ওঠে। পাঠক অবলীলায় মিশে যান লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে এবং আত্মস্থ করে ফেলেন লেখার ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে দেওয়া বার্তাকে।
এই সিরিজে সাহহারের বড় একটি সাফল্য এ-ও, তিনি ঘটনার ভেতর দিয়ে নবিজি ও সাহাবিদের জীবনের মানবিক দিকগুলো স্পষ্ট চিত্রপটে তুলে আনতে পেরেছেন। সিরাত যে শুধুই ‘ঘটনার তালিকা’ নয়; বরং এটি একটি সুদীর্ঘ মানবিক যাত্রা—এই দৃষ্টিভঙ্গি সিরিজটিকে অনন্যতা দান করেছে।
তাঁর লেখায় সূত্রের উল্লেখ কম এবং আখ্যানলেখকরা ঘটনার শরীরে গল্পের পোশাক পরানোর জন্য বর্ণনার যেটুক স্বাধীনতা গ্রহণ করেন, এখানেও তা ঘটেছে বইকি। তবে সূত্রের উল্লেখ না থাকলেও সাহহার উৎস হিসেবে সিরাতের মৌলিক গ্রন্থগুলোকেই সামনে রেখেছেন। ফলে তাঁর বর্ণনা সাধারণত মূলধারার সিরাত ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইতিহাসের কাঠামো ও উপন্যাসের রিদমকে তিনি একীভূত করেছেন এই সিরিজে। এখানে তথ্য ও সাহিত্য মিলেছে অপূর্ব ভারসাম্যে। আবদুল হামিদ জাওদাহ সাহহার রচিত ২০ খণ্ডের এই সুদীর্ঘ আখ্যানকে তাই বলা যায় ‘সেরা উপন্যাসধর্মী সিরাত’।