ইসলামি আইনে বহুত্ববাদ ও শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবির ‘আল ইনসাফ’

মানবস্বভাব ও ধর্ম

প্রতিহিংসা ও যুদ্ধপ্রবণতা মানুষের স্বভাবজাত গুণ। এডওয়ার্ড উইলসন—যাকে বলা হয় সামাজিক জীববিজ্ঞান-বিষয়ক গবেষণার পথিকৃৎ—এক জায়গায় বলেন : ‘যুদ্ধ আমাদের স্বভাব ও প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে প্রোথিত।’ একই রকম কথা বলেন নৃতত্ত্ব ও মনুষ্য আচরণবিষয়ক অন্যান্য ক্ষেত্রের গবেষকগণও।[1] এর সন্দেহাতীত প্রমাণ পাই কুরআনে বর্ণিত এই ঘটনা থেকে, যখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ফেরেশতাদের মজমায় এরশাদ করেছিলেন—‘আমি পৃথিবীতে খলিফা পাঠাতে চাই।’ ফেরেশতাগণ তখন মানবস্বভাবের এই মৌলিক দিক উল্লেখ করে বলেন— ‘আপনি কি এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে ও রক্তপাত ঘটাবে?’[2]

কিন্তু আল্লাহ পাক জানেন মানুষকে কীভাবে নিয়ন্ত্রিত করা সম্ভব। মানবস্বভাবে তিনি এমন এক বৈশিষ্ট্য যোগ করেন—যা মানুষকে না পুরোপুরি শৃঙ্খলাবদ্ধ বানায়, আর না শতভাগ উচ্ছৃঙ্খল বানায়। না পরিপূর্ণ ভালো বানায়, আর না একেবারে খারাপ বানায়। তাকে তিনি সেই এখতিয়ার দেন[3], যার বদৌলতে চাইলেই সে নিজের মন্দপ্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, নিজের ভালো গুণ বিকশিত করে মানবিকতাবোধসম্পন্ন হতে পারবে, এবং নিজেকে শৃঙ্খলিত রাখতে পারবে। আবার ঠিক এর বিপরীত কাজগুলোও সে করতে পারবে, নিজেকে বানাতে পারবে অমানবিক ও উচ্ছৃঙ্খল। এর সবটাই নির্ভর করে সে নিজের জন্য ভালোত্ব এখতিয়ার করছে, না মন্দত্ব—তার ওপর।

আল্লাহ পাক মানুষকে শুধু দ্বৈত গুণ আর এখতিয়ার দিয়েই ছেড়ে দেননি, বরং তার ভেতরের যেই প্রতিহিংসা ও যুদ্ধপ্রবণতা আছে—যা তাকে প্রতিনিয়ত ফেতনা-ফাসাদ ও রক্তপাতের উস্কানি দেয়—সেই দুর্বিনীত স্বভাবকে শৃঙ্খলায় আনার জন্য তিনি যুগে যুগে নবি–রসুল প্রেরণ করেন। তাদের দায়িত্ব ছিল মানুষকে মন্দপ্রবৃত্তি থেকে সতর্ক করা এবং এক আল্লাহর এবাদতে দাওয়াত দেওয়া—যেন এর মাধ্যমে বিচ্ছিন্নতা কমিয়ে এনে সমাজসংহতি নির্মাণ সম্ভব হয়, একই সাথে সামাজিক ইনসাফ নিশ্চিত করা যায়।

নবি-রসুলগণের দাওয়াতি কাজের যে ফলাফল—অর্থাৎ একটি পারস্পারিক সহযোগিতামূলক ইনসাফপূর্ণ সমাজ নির্মাণ, এটাকে পরিভাষায় বলা হয় ‘ইরতিফাকাত’ বা সমাজসংহতির বিবর্তন। এর তত্ত্বায়ন করেছেন শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি (রহ.)। তার মতে হজরত আদম (আ.) থেকে হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত মানবজাতির মাঝে চারটি ইরতিফাক ঘটে :

  • প্রথম ইরতিফাকে সামাজিকতার সূচনা হয়। এই সময় মানবিয় সমাজে সর্বজনীন কল্যাণ, পারিপাট্য ও সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ এবং উদ্ভাবন ও বংশপরম্পরায় জ্ঞানবিস্তারের ধারণা প্রতিষ্ঠা পায়। মানবসৃষ্টির শুরু থেকে হজরত ইদরিস (আ.)-এর আগ পর্যন্ত এর স্থায়ীকাল ছিল।
  • দ্বিতীয় ইরতিফাকে নগর-সভ্যতার শুরু হয়। এই সময় মানুষ হেকমতে মাআশিয়া (জীবিকা-সংক্রান্ত জ্ঞান), হেকমতে ইকতিসাবিয়া (উপার্জনবিষয়ক প্রজ্ঞা), হেকমতে মানজিলিয়া (গৃহস্থালি নীতি), হেকমতে তাআমুলিয়া (সামাজিক লেনদেনের জ্ঞান) ও হেকমতে তাআউনিয়া (পারস্পরিক সহায়তার নীতি) অর্জন করে। এর স্থায়ীকাল ছিল হজরত মুসা (আ.)-এর আগ পর্যন্ত।
  • তৃতীয় ইরতিফাকে শাসনব্যবস্থা ও রাজ্যের ধারণা তৈরি হয়। এই সময় মানুষ রাজ্যপরিচালনার নীতি ও আইনকানুন রপ্ত করে। হজরত ঈসা (আ) পর্যন্ত এর স্থায়ীকাল ছিল।
  • চতুর্থ ইরতিফাকে আল্লাহ তায়ালা আখেরি নবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে মানবজাতিকে ‘আন্তর্জাতিক’ পর্যায়ে নিয়ে যান। সংহতিভিত্তিক মানবিক বিকাশের এটাই চূড়ান্ত ধাপ। এই পর্যায়ে মানুষ ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্মিলনে, দুনিয়া ও আখেরাত দুটোকেই কেন্দ্র বানিয়ে সমাজ ও সভ্যতা নির্মাণের ধারণা পায়।[4]

যেহেতু সর্বশেষ নবির ওপর এই দায়িত্ব ছিল তিনি আলাদা আলাদা জাতির মাঝে সংহতি স্থাপন করবেন, তাই তার প্রতি নাজিলকৃত কিতাবে আল্লাহ তায়ালা এই নির্দেশ দেন :

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَطِیۡعُوا اللّٰهَ وَ اَطِیۡعُوا الرَّسُوۡلَ وَ اُولِی الۡاَمۡرِ مِنۡكُمۡ ۚ فَاِنۡ تَنَازَعۡتُمۡ فِیۡ شَیۡءٍ فَرُدُّوۡهُ اِلَی اللّٰهِ وَ الرَّسُوۡلِ اِنۡ كُنۡتُمۡ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰهِ وَ الۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ ذٰلِكَ خَیۡرٌ وَّ اَحۡسَنُ تَاۡوِیۡلًا

“হে ঈমাদারগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রসুল ও উলুল আমরের আনুগত্য করো, এরপর কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতপার্থক্য ঘটলে তা আল্লাহ ও রসুলের কাছে দিকে প্রত্যার্পণ করো, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান এনে থাক। এটিই কল্যাণকর ও পরিণামে প্রকৃষ্টতর।”[5]

এর মানে মতপার্থক্য থাকবেই, তার পুরোপুরি অবসান ঘটানো একদমই অসম্ভব। তবে চিন্তাগত বৈচিত্র্যের মাঝেও আল্লাহর নাজিল করা কুরআন ও নবির রেখে যাওয়া সুন্নতের অনুসরণ করতে হবে, একই সাথে উলুল আমর বা ইসলামি আইনের রক্ষকদের মান্য করতে হবে। আর এর মাধ্যমেই নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে।

কুরআনের আরেকটি আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন :

وَ اعۡتَصِمُوۡا بِحَبۡلِ اللّٰهِ جَمِیۡعًا وَّ لَا تَفَرَّقُوۡا ۪ وَ اذۡكُرُوۡا نِعۡمَتَ اللّٰهِ عَلَیۡكُمۡ اِذۡ كُنۡتُمۡ اَعۡدَآءً فَاَلَّفَ بَیۡنَ قُلُوۡبِكُمۡ فَاَصۡبَحۡتُمۡ بِنِعۡمَتِهٖۤ اِخۡوَانًا ۚ وَ كُنۡتُمۡ عَلٰی شَفَا حُفۡرَۃٍ مِّنَ النَّارِ فَاَنۡقَذَكُمۡ مِّنۡهَا ؕ كَذٰلِكَ یُبَیِّنُ اللّٰهُ لَكُمۡ اٰیٰتِهٖ لَعَلَّكُمۡ تَهۡتَدُوۡنَ

“আর তোমরা একযোগে আল্লাহর রজ্জু সুদৃঢ় রূপে ধারণ করো ও বিভক্ত হয়ে যেয়ো না, এবং তোমাদের প্রতি আল্লাহর যে দান রয়েছে তা স্মরণ করো। যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে তখন তিনিই তোমাদের অন্তরে প্রীতি স্থাপন করেছিলেন, অতঃপর তোমরা তাঁর অনুগ্রহে ভ্রাতৃত্বে আবদ্ধ হলে এবং তোমরা অগ্নিগহ্বরের ধারে ছিলে, এরপর তিনিই তোমাদেরকে তা হতে উদ্ধার করেছেন; এরূপে আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় নিদর্শনাবলি ব্যক্ত করেন, যেন তোমরা সুপথপ্রাপ্ত হও।”[6]

এরপর সাবধান করে দিয়ে বলেন :

وَ لَا تَكُوۡنُوۡا كَالَّذِیۡنَ تَفَرَّقُوۡا وَ اخۡتَلَفُوۡا مِنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَهُمُ الۡبَیِّنٰتُ ؕ وَ اُولٰٓئِكَ لَهُمۡ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ

“আর তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণ আসার পরও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে ও পরস্পর মতভেদে লিপ্ত হয়েছে। তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।”[7]

রসুলে পাক (সা.) মুসলমানদের ‘ভাই ভাই’ হয়ে যেতে বলেন[8], আসাবিয়াত বা স্বাজাত্যবোধ ত্যাগ করতে নির্দেশ দেন[9], এবং এইভাবে সতর্ক করেন :

لَا تَخْتَلِفُوا، فإنَّ مَن كانَ قَبْلَكُمُ اخْتَلَفُوا فَهَلَكُوا

“তোমরা মতভেদে জড়িয়ো না; কারণ তোমাদের আগের লোকেরা মতভেদে লিপ্ত হয়েছিল, ফলে তারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।”[10]

কিন্তু আদমসন্তানের পক্ষে কি তার মৌলিক স্বভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত হওয়া সম্ভব? কখনোই না। তাই দেখা যায় ইসলাম মুসলমানদের অভিন্ন দলে পরিণত করলেও তারা আবার নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যে কুরআন–সুন্নাহ ঐক্য ও সংহতির উৎস, তাকেই বানিয়ে ফেলা হয় দ্বন্দ্ব ও বিভক্তির উপাদান। অবশ্য মতপার্থক্যেরও দুটো ধরন আছে, একটি উপকারী আর অন্যটি ক্ষতিকর, একটি বৈচিত্র্যকে ধারণ করে আর অপরটি অস্বীকার করে। দুর্ভাগ্য হলো, মুসলমানদের বড় অংশই ক্ষতিকর মতপার্থক্যের দিকে ঝুঁকে পড়ল এবং পরস্পরের শত্রু হয়ে গেল।

সাংস্কৃতিক স্বভাব ও শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি

আলেমগণ ইসলামি আইনের মতপার্থক্যকে রহমত ও বিকল্প গ্রহণের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতেন। কারণ তারা জানতেন—স্থান, কাল ও সমঝদারির ভিন্নতার ফলে মানুষে মানুষে পার্থক্য থাকবেই, আর এর বদৌলতে মানুষের জন্য অনুকূল মত গ্রহণ করেও ইসলামের গণ্ডিতে থাকা সম্ভব হবে। কিন্তু সীমালঙ্ঘনকারী, বাতিলপন্থি ও জাহেলরা একে মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে হানাহানির কারণ বানিয়ে তোলে। তখন এর সমাধানে আবার নবির ওয়ারিস আলেমগণই এগিয়ে আসেন। তারা মানুষের ভেতরে ঐক্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। পরস্পরের দ্বন্দ্বকে কমিয়ে আনতে, ধর্মকে আবার সংহতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করেন। এভাবেই আল্লাহর রসুল (সা.)-এর এই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়িত হয়—

يَحْمِلُ هَذَا الْعِلْمَ مِنْ كُلِّ خَلَفٍ عُدُولُهُ يَنْفُونَ عَنْهُ تَحْرِيفَ الْغَالِينَ وَانْتِحَالَ الْمُبْطِلِينَ وَتَأْوِيلَ الْجَاهِلين

“এই এলেমকে ধারণ করবে প্রত্যেক উত্তর প্রজন্মের আস্থাভাজন শ্রেণি। তারা একে মুক্ত রাখবে সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি থেকে, বাতিলপন্থিদের মিথ্যাচার থেকে এবং জাহেলদের অপব্যাখ্যা থেকে।” (মেশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস : ২৪৮)

উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আলেমদেরই একজন হলেন ইমাম শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি (রহ.), যিনি ছিলেন হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর বংশধর ও মুজাদ্দিদে আলফে সানি (রহ.)-এর যোগ্য উত্তরসূরি। সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগিরের রাজত্বকালে জন্ম নেওয়া এই বহুমাত্রিক প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব প্রথমে ভারতীয় সমাজব্যবস্থাকে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে সেই বৈশিষ্ট্য দেখেছিলেন, যা আবু রায়হান আলবেরুনি প্রায় এক সহস্র বছর আগে নির্ণয় করেছিলেন। ‘ভারততত্ত্বের’ প্রথম অধ্যায়ে আলবেরুনি লিখেন—‘ভারতীয়রা নিজেদের আচরিত নিয়মকেই শ্রেষ্ঠ মনে করে; এক্ষেত্রে তাদের অবস্থান গোঁড়ামিপূর্ণ।’ আরও বলেন, ‘…বলতে গেলে কুৎসার মতো শোনাবে কিন্তু তা আসলে ওদের (ভারতবর্ষীয়দের) জাতীয় চরিত্রের একটি সর্বজনবিদিত বৈশিষ্ট্য; আর নির্বুদ্ধিতা এমন রোগ যার কোনো ঔষধ নাই। এ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে : এরা বিশ্বাস করে যে পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র তাদের দেশই শ্রেষ্ঠ, মানবজাতির মধ্যে একমাত্র তারাই সর্বোত্তম, রাজাদের মধ্যে একমাত্র তাদের রাজারাই সর্বশ্রেষ্ঠ, ধর্মের মধ্যে একমাত্র তাদের ধর্মই শ্রেষ্ঠ এবং তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানই একমাত্র জ্ঞান। … ওদের বিশ্বাস, ওদের দেশ ছাড়া পৃথিবীতে আর কোনো দেশ নাই; ওরা ছাড়া আর কোনো মনুষ্য জাতি নাই এবং সৃষ্টিজীবদের মধ্যে ওরা ছাড়া আর কারোরই কোনো জ্ঞান-বিজ্ঞান নাই। ফলে, যদি খোরাসান বা পারস্যের কোনো পণ্ডিত ব্যক্তি বিজ্ঞানের কথা ওদের বলে তাহলে ওরা তার কথায় বিশ্বাস করে না, নিজ অহমিকার বশে ওরা তাকে মিথ্যা মনে করে।’

তৎকালে ভারতে যে ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজব্যবস্থা ছিল, তা ছিল খুবই কঠোর নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ। কোনো ব্রাহ্মণের গায়ে যদি অচ্ছুতের স্পর্শ লাগত, এতটুকু ‘অঘটনই’ তার জাত যাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। সে এর কারণে ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ থেকে খারিজ হয়ে যেত। শুধু উচ্চবর্ণের হিন্দুরা নয়, শূদ্র ও নমশূদ্ররাও নিজেদের মধ্যে পার্থক্য রক্ষা করত। পান থেকে চুন খসার মতো ছোট্ট কারণেও সমাজ থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটত। এতটাই অনুদার ও রক্ষণশীল ছিল তারা। এমনকি ইসলামগ্রহণের পরও তাদের থেকে চরিত্র পুরাপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি। কারণ এই অঞ্চলে আগত ইসলামের প্রচারকগণ নতুন মুসলমানদের ‘জরুরিয়্যাতে দীন’ শিক্ষাতেই বেশি সময় দিয়েছিলেন। তাদের আখলাক পরিবর্তনেও নিশ্চয় সময় দিয়েছিলেন, সেটা বাস্তব ফলাফল দেয়নি। এর কারণ সম্ভবত সাংস্কৃতিক স্বভাব। সমাজ দীর্ঘ সময় ধরে মানুষকে যেভাবে গড়ে তোলে, তার ফলে নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া, পছন্দ, আচরণ, ভাবনার ধরন প্রতিষ্ঠিত হয়।

সব অঞ্চলের মানুষের মধ্যেই এক ধরনের সাংস্কৃতিক স্বভাব থাকে, যাকে পরিবর্তন করা সহজ নয়। নির্দিষ্ট পরিকল্পনায় দীর্ঘ সময় নিয়ে অনেক বেশি মেহনত করলে হয়তো কয়েক প্রজন্ম পরে পরিবর্তন হতে পারে। যেকোনো কারণেই হোক, ভারতীয় অঞ্চলে এই নিয়ম খাটেনি। এখানকার মানুষের যে সাংস্কৃতিক স্বভাব—অর্থাৎ অনুদার হওয়া ও নিজেদের বাইরে কাউকে স্বীকার না করা—কুরআন-সুন্নাহর এলেম হাসিলের পরও এতে পরিবর্তন আসেনি। এই জন্য দেখা যায়—যেখানে চার মাজহাবের মধ্যে হানাফি মাজহাবের অবস্থান সবচেয়ে উদার, এবং নসের (টেক্সট) চেয়ে আকলকে (মস্তিষ্কজাত সিদ্ধান্ত) বেশি গুরুত্ব দেয় বলে ইখতেলাফি বিষয়ে যাদের উদারতার সুযোগ বেশি, সেখানে ভারতীয় সমাজে সেই মাজহাবই হয়ে পড়েছে সবচেয়ে অনুদার প্রকৃতির। তুরস্ক ও মাওয়ারাউন-নাহর অঞ্চলেও হানাফি মাজহাবের প্রচলন আছে, কিন্তু কোথাও এতটা অনুদার ও নিবর্তনমূলক নয়।

শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি (রহ,) এই সাংস্কৃতিক স্বভাবে পরিবর্তন আনার কথা ভাবলেন। তিনি দেখলেন ভারতবাসীর কাছে তাকলিদের[11] ধারণা খুবই বাড়াবাড়িমূলক, ‘আমাদের ইমাম যা বলেছেন, সেটাই শেষ কথা’—তাদের মনমানসিকতা এই রকমের; অন্যদিকে ইজতেহাদ[12] প্রশ্নে তাদের অবস্থান একদমই ছাড়াছাড়িমূলক! অথচ ইজতেহাদই যে তাকলিদের মূল কারণ, অর্থাৎ যেখানে ইজতেহাদের সুযোগ আছে কেবল সেখানেই কোনো ইমামকে তাকলিদ করতে হয়—এই বিষয়ে তাদের খবর নাই।[13] তাই তিনি চাইলেন ইখতেলাফকে ‘ওয়াসাআত’ বা বিকল্প গ্রহণের সুযোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে, একই সাথে তাকলিদ ও ইজতেহাদের প্রয়োজনীয়তা উপস্থাপন করতে, যেন এর মাধ্যমে এই অঞ্চলের আলেমদের সামনে পুরো চিত্র উপস্থাপন করা সম্ভব হয়। কারণ তাকলিদ আবশ্যক করা মানে ইজতেহাদ লাজেম করা, আর ইজতেহাদ থাকা মানে ভিন্ন মত গ্রহণের সুযোগ থাকা। প্রতিটি জিনিসই একে অপরকে আবশ্যক করে।

কেউ যদি বলে আমি তাকলিদ মানি, কিন্তু ইজতেহাদ মানি না, এটা খুবই মূর্খতাপ্রসূত কথা হবে। কেননা মুজতাহিদ ফকিহ ছাড়া কারও তাকলিদ জায়েজ নাই। আবার কেউ যদি বলে, পূর্বসূরি আলেমগণ সব লিখে গেছেন, এই যুগে ইজতেহাদের প্রয়োজন নাই—এটাও অজ্ঞতাপ্রসূত কথা হবে। কারণ এই একুশ শতকেও এমন অনেক সমস্যা উপস্থিত হয়েছে, যার প্রেক্ষিতে ফকিহগণ ইজতেহাদ করতে বাধ্য হয়েছেন। তাছাড়া কিতাবের সাথে রিজাল থাকার অর্থই হলো নতুন নতুন সমস্যা আসবে, আর তিনি সমাধান দিবেন। কেবল কিতাবের কালো কালো হরফ পড়তে জানা কাউকে আলেম বানায় না। যেমন ইবনু কাইয়িমিল জাওযিয়া বলেন—

من أفتى الناس بمجرد المنقول في الكتب على اختلاف عرفهم و عوائدهم و أزمنتهم وأمكنتهم وأحوالهم وقرائن أحوالهم فقد ضل و أضل

‘যে ব্যক্তি লোকদের প্রচলন, রীতিনীতি, স্থান, কাল, অবস্থা ও পারিপার্শ্বিকতার পরিবর্তন সত্ত্বেও কেবল ফিকহের কিতাবে বর্ণিত মত অনুসারে তাদের ফতোয়া দিল, সে নিজে পথভ্রষ্ট হলো এবং তাদেরকেও পথভ্রষ্ট করল।’[14]

তাই ইজতেহাদের দরোজা কখনো বন্ধ হওয়া সম্ভব না। প্রত্যেক যুগেই মুজতাহিদ থাকবে, ‘মুজতাহিদ মুতলাক’ না হোক, নিদেনপক্ষে ‘মুজতাহিদ ফিল মাজহাব’[15] বৈশিষ্ট্যের ফকিহ থাকবে, যিনি তার যুগে তৈরি হওয়া সমস্যার সমাধান দেবেন। এভাবেই আল্লাহর রসুল (সা.)-এর হাদিস সত্য প্রমাণিত হবে; মুজতাহিদ ফকিহগণ এই দীনকে সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি, বাতিলপন্থিদের মিথ্যাচার এবং জাহেলদের অপব্যাখ্যা থেকে মুক্ত রাখবেন।

মতপার্থক্যের কারণ নির্ণয়

এক্ষেত্রে শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি (রহ.)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ‘আল ইনসাফ ফি বয়ানি আসবাবিল ইখতিলাফ’। এই কিতাবে তিনি সবার আগে মুসলমানদের মধ্যে মতপার্থক্যের কারণ নির্ণয় করেছেন, তার দৃষ্টিতে এই ইখতেলাফ কখনোই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। কেননা যেখানে সাহাবিগণ এই কারণগুলোর ভিত্তিতে ইখতেলাফ করেছেন, তাই পরবর্তীদের জন্য তো আরও আগেই ঐক্যে পৌঁছা সম্ভব নয়। তাই চিন্তার এই বৈচিত্র্য স্বীকার করে নেওয়া প্রত্যেক মুসলমানের অত্যাবশ্যক।

সেই কারণগুলো হলো এই :

১. হাদিস না পৌঁছা কিংবা পৌঁছলেও তা দলিলযোগ্য না হওয়া : কোনো সাহাবি রসুলুল্লাহ (সা.) হতে কোনো মাসআলা বা ফতওয়ার হুকুম শুনেছেন অপর একজন সাহাবি তা শুনেননি, ফলে যিনি শুনেননি তিনি নিজস্ব চিন্তাধারায় ইজতেহাদ করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আবার কোনো অবস্থায় হাদিস পেলেও তা দলিলযোগ্য না হওয়ায় ইজতেহাদ করেছেন। এক্ষেত্রেও কয়েকটি পর্যায় রয়েছে :

(ক) হাদিস না পেয়ে সাহাবি ইজতেহাদ করেছেন, পরবর্তীতে জানতে পারেন খোদ রসুল (সা.) একই রকম নির্দেশ দিয়ে গেছেন।

(খ) সাহাবি ইজতেহাদ করেছেন, পরবর্তীতে জানতে পারেন রসুল (সা.) থেকে ভিন্নরকম হাদিস আছে।

(গ) কোনো একজন সাহাবির কাছ থেকে হাদিস এসেছে, কিন্তু অন্যেরা এর বিপক্ষে মত দিয়েছেন, তার বক্তব্যকে ‘দলিলযোগ্য’ হিসেবে স্বীকার করেননি। তাই সেখানে ইজতেহাদ করতে হয়েছে।

(ঘ) সাহাবির কাছে কখনোই হাদিস পৌঁছেনি, তাই ইজতেহাদ করেছেন।

২. রসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো কাজ দেখে তার হুকুম বোঝায় ভিন্নতা : একইকাজকে কেউ মুস্তাহাব মনে করেছেন, আবার কেউ জায়েজ মনে করেছেন। যেমন : হজের সময় রমল করাটাকে অনেক সুন্নত বলেন, কিন্তু ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন—এটি সুন্নত নয়, বরং মুশরিকদের শক্তিমত্তা দেখানোর জন্য রসুল (সা.) করেছেন।

৩. উপলব্ধি ও খেয়ালের ভিন্নতা : রসুল (সা.)-কে হজ করতে সবাই দেখেছেন, কিন্তু কেউ বলেছেন তিনি ‘তামাত্তু’ করেছেন, কেউ বলেছেন ‘কিরান’, আবার কেউ বলেছেন ‘ইফরাদ’। একাধিক মুহূর্তে ইহরাম তোলার কারণে ভিন্ন বর্ণনা সৃষ্টি হয়।

৪. ভুলে যাওয়া : ইবনে উমর (রা.) বলেন—রসুল (সা.) রজব মাসে ওমরা করেছেন। আয়েশা (রা.) বলেন— ইবনে উমর (রা.) নবিজির (সা.) সাথেই ছিলেন কিন্তু ভুলে গেছেন। নবিজি (সা.) রজব মাসে ওমরা করেন নাই।

৫. হাদিস গ্রহণের পদ্ধতির ভিন্নতা : ইবনে ওমর (রা.) বলেন—‘মৃত ব্যক্তি তার আত্মীয়দের কান্নায় শাস্তি পায়।’ আয়েশা (রা.) এর সংশোধন করে বলেন—নবিজি (সা.) এক ইহুদি নারীর শেষকৃত্যের সময় বলেছিলেন, ‘তারা কাঁদছে, অথচ সে তার আমলের কারণে শাস্তি পাচ্ছে।’ নবিজি (সা.) এই কথা বলেছিলেন সেই নারীর ইহুদি ও বদদীন হওয়ার ভিত্তিতে। কিন্তু ইবনে ওমর (রা.) ধারণা করেছিলেন—সেই নারী তার আত্মীয়দের কান্নার কারণে শাস্তি পাচ্ছে।

৬. হুকুমের ইল্লত (কারণ) ভিন্নভাবে বোঝা : একবার এক ইহুদির লাশ যাচ্ছিল। নবিজি (সা.) তা দেখে দাঁড়িয়ে যান। কিন্তু কেন দাঁড়িয়েছিলেন এর কারণ নির্ণয়ে সাহাবগণ মতবিরোধ করেছেন। কেউ বলেছেন ফেরেশতাদের সম্মানে তিনি দাঁড়িয়েছেন, যা মুসলিম-কাফির উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কেউ বলেছেন মৃত্যুর ভয়াবহতা স্মরণ করে। আবার কেউ বলেছেন সেই ইহুদির লাশ মাথার ওপর দিয়ে নেওয়া নবিজি (সা.) অপছন্দ করেছিলেন, এই জন্য তিনি দাঁড়িয়ে যান।

৭. বিপরীতধর্মী হাদিসের সমন্বয়ে মতভিন্নতা : নবিজি (সা.) মুতআ বিয়ে হারাম ঘোষণা করেছিলেন। আওতাস যুদ্ধের পর এর অনুমোদন দেন। এরপর আবার হারাম ঘোষণা করেন। এই হাদিস থেকে ইবনে আব্বাস (রা.) এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন : মুতআ বিয়েটা প্রয়োজনের তাগিদে জায়েজ করা হয়েছিল, এরকম আবার যদি প্রয়োজন দেখা দেয় তবে জায়েজ হবে। অন্যদিকে জমহুর আলেমগণ বলেন, শেষবার নিষিদ্ধের মাধ্যমে চিরকালের জন্য মুতআ বিয়ে হারাম হয়ে গেছে।[16]

উপরে যে ৭টি কারণ বলা হলো, এর প্রত্যেকটিই অনস্বীকার্য ও এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। হালআমলের ড. বিলাল ফিলিপস কিংবা অন্যান্য যারা বলেন—‘সহিহ হাদিস না পাওয়ার কারণে এত এত মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, বর্তমানে যেহেতু প্রায় সব হাদিসের তাখরিজ হয়ে গেছে, তাই এখন অভিন্ন একটি মাজহাব প্রতিষ্ঠা সম্ভব’—আদতে এই ধারণার কোনো বাস্তবতা নাই। সাহাবায়ে কেরামের মাঝে যে ইখতেলাফ হয়েছিল, তা হয়েছিল মানুষে মানুষে চিন্তা ও বোধের পার্থক্যের কারণেই। সব জমানায় সব জায়গায় মোটাদাগে দুই ধরনের মানুষের উপস্থিতি পাওয়া যায় : একদল চিন্তাশীল ও গবেষণামুখী, যারা বুঝে-সমঝে সিদ্ধান্ত নেয়; আরেক দল অনুসরণপ্রিয়, যারা গভীরভাবে ভাবতে পারে না। সাহাবাগণের মাঝেও এমন দুটো ধরন ছিল। কুরআনে আছে ‘কালো সুতা থেকে সাদা সুতার পার্থক্য হওয়া পর্যন্ত খাও’, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত সেহরি খাওয়া, কিন্তু সাহাবি আদি ইবনে হাতেম (রা.) ভেবেছিলেন আক্ষরিকভাবে সাদা সুতা ও কালো সুতার কথা বলা হচ্ছে। তিনি বালিশের নীচে দুই ধরনের সুতার দিকে বারবার তাকিয়ে দুটোর পার্থক্য বোঝার চেষ্টা করতেন। পরবর্তীতে আল্লাহর রসুল (সা.)-এর সামনে বিষয়টি উপস্থাপন করলে তিনি তাকে বুঝিয়ে দেন।[17] এই ঘটনায় দেখা যাচ্ছে আরবিভাষী হয়েও আদি ইবনে হাতেম (রা.) অলংকারিক ভাষা ও মেটাফর ধরতে পারেননি। এটা খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়, হাদিস থেকেও এর সাক্ষ্য পাওয়া যায় :

نضَّرَ اللهُ امرأً سمِعَ مِنَّا حديثًا فحفِظَهُ حتى يُبَلِّغَه غيرَهُ ، فرُبَّ حامِلِ فقْهٍ إلى من هو أفقَهُ منه ، وربَّ حامِلِ فقهٍ ليس بفقيهٍ

আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে সুন্দর ও সতেজ রাখুন—যে আমার হাদিস শুনে, এরপর তা মুখস্থ করে অন্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। কারণ অনেক সময় এমন হয়—একজন ফিকহ (গভীর জ্ঞান) বহন করছে, কিন্তু সে নিজে তার গভীরতা বোঝে না; আবার এমনও হয়—একজন ফিকহ (গভীর জ্ঞান) বহন করে এমন ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেয়, যে তার চেয়েও বেশি সমঝদার। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৬৫৬)

শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি (রহ.) ভারতীয় অঞ্চলের মানুষের অনুদার স্বভাব পরিবর্তন করতে সর্বপ্রথম এটিই স্পষ্ট করেন—ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা স্বাভাবিক। দুনিয়ার কোথাও এমন নাই যেখানে সবাই একইভাবে চিন্তা করে, একইভাবে সবকিছু বোঝে। যেই কারণে সাহাবায়ে কেরাম ইখতেলাফ করেছেন, একই কারণ পরবর্তীতে ফকিহগণ ইখতেলাফ করেছেন, এবং এখনো ইখতেলাফের ক্ষেত্রগুলো বহাল আছে। তাই নিজেদের চিন্তার বাইরে অন্যকে খারিজ করার সুযোগ নাই—যতক্ষণ তা ফিকহের মূলনীতি অনুসারে হচ্ছে।

বহুত্ববাদ ও শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি

বিশ্বায়নের কারণে বর্তমানে ‘বহুত্ববাদ’ শব্দটি খুবই জনপ্রিয়। শব্দটি ইংরেজি Pluralism-এর অনুবাদ। পাশ্চাত্যে কয়েক শতক আগেও এই শব্দের ব্যবহার ছিল না, তাদের আইনে এই ধারণারও অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু মুসলমানরা এই শব্দ ব্যবহার না করলেও ইসলামি আইনে এটি ছিল। যদি একে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তাহলে এমন হবে :

ইসলামি আইনে বহুত্ববাদ বলতে এমন এক নীতিকে বোঝায়, যেখানে (১) ভিন্ন মাজহাবের মতের প্রতি পারস্পরিক সহনশীলতা, (২) ফিকহি মতপার্থক্য সত্ত্বেও পরস্পরের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, এবং (৩) ভিন্ন মাজহাবের ইজতেহাদি সিদ্ধান্তগুলোকে তাদের মূলনীতি অনুযায়ী সঠিক বলে স্বীকৃতি—এই তিনটি নীতিকে ভিত্তি বানিয়ে শরিয়তের ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন মতকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে মানা হয়।

ইসলামি আইন যে ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাকে স্বীকার করে, বহুত্ববাদকে ধারণ করে, এটি বোঝার সবচেয়ে সহজ পথ হলো ইখতেলাফের ইতিহাসে ফিরে যাওয়া। আমরা তো ইতোমধ্যে সাহাবায়ে কেরামের ইখতেলাফ সম্পর্কে ধারণা পেয়েছি। এই বিষয়ে আলোচনার পর কিতাবের দ্বিতীয় অধ্যায়ে শাহ সাহেব ফকিহগণের মাজহাবের ভিন্নতার কারণ বর্ণনা করেন। সেখানে তিনি মতপার্থক্য আরও বিস্তৃত হওয়ার নতুন কয়েকটি কারণ দেখান :

১. ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও নিজ অঞ্চলের ফকিহের প্রতি আস্থা। তৎকালে প্রত্যেক অঞ্চলের ফকিহগণ নিজ অঞ্চলের সাহাবিদের রায় বেশি গ্রহণ করতেন—কারণ স্থান-কাল-পাত্রের বিবেচনায় সেটাই ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত।

২. একই সাহাবির বা তাবেয়ির একাধিক মত থাকা।

৩. দ্বিতীয় যুগের ফকিহদের কাছে অনেক সহিহ হাদিস পৌঁছায়নি। তাই তারা ইজতেহাদ করে রায় দিয়েছিলেন।

৪. মুরসাল ও দুর্বল সনদের হাদিস গ্রহণে আলাদা আলাদা মূলনীতি মানা।

৫. কিয়াস ও রায় ব্যবহারে আলেমদের পদ্ধতিগত পার্থক্য থাকা।

এক পর্যায়ে মুজতাহিদ ফকিহগণ তাদের হাদিস গ্রহণের পদ্ধতি ও ইজতেহাদের ওপর নীতিমালা তৈরি করতে শুরু করলেন। এভাবে দেখা গেল মতপার্থক্য কমে এসে সর্বশেষ হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি—চার মাযহাবে সীমিত হয়ে পড়ল।

কিতাবের তৃতীয় অধ্যায়ে শাহ সাহেব ফকিহদের ‘আহলুল হাদিস’ ও ‘আসহাবুর রায়’—এই দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার বিষয়টি বিশ্লেষণ করেন :

আহলুল হাদিস: এই শ্রেণির ফকিহগণ রায় বা সিদ্ধান্তের ওপরে সরাসরি হাদিস বর্ণনাকে প্রাধান্য দিতেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সায়িদ ইবনে মুসাইয়িব, সুফিয়ান সাওরি, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)। ফিকহচর্চায় তাদের মূলনীতি ছিল এমন :

১. কোনো মাসআলার বিষয়ে যদি স্পষ্ট কুরআনের আয়াত থাকে, সেখান থেকে সরার অধিকার নেই।

২. কুরআনের আয়াত একাধিক অর্থের সম্ভাবনা রাখলে তখন হাদিসই তার চূড়ান্ত সমাধান হবে।

৩. কোনো মাসআলায় সহিহ বা মাকবুল হাদিস পেলে, তার বিপরীত সাহাবি বা তাবেয়িদের আসার কিংবা কোনো মুজতাহিদের রায় অনুসরণ করা বৈধ নয়।

৪. রসুল (সা.) থেকে কোনো হাদিস পাওয়া গেলে তা অঞ্চলে বসবাসকারী সাহাবি থেকে এসেছে, কজন আমল করেছে—এসব বিবেচনা করা হবে না, বরং হাদিসটি বর্ণনাসূত্রে সহিহ হলেই গ্রহণযোগ্য হবে।

৫. যথাসাধ্য খোঁজার পরও যদি হাদিস না পাওয়া যায়, তখন সাহাবা–তাবেয়ি ও মুজতাহিদদের রায় গ্রহণ করা যাবে। এক্ষেত্রেও কোনো নির্দিষ্ট শহর বা নির্দিষ্ট ইমাম বিবেচ্য হবে না।

৬. যদি বেশির ভাগ খলিফা ও ফকিহ কোনো বিষয়ে একমত হন, সেটাই উম্মতের অনুসরণীয় হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।

৭. যদি দালিলিক ও বর্ণনার প্রশ্নে সমান ওজনদার ও শক্তিশালী দুটো মত পাওয়া যায়, তবে দুটোই গ্রহণ করা হবে। জোর করে একটাকে বাতিল করা হবে না।

৮. সব চেষ্টা সত্ত্বেও সরাসরি নস বা স্পষ্ট বক্তব্য না পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে কুরআন–সুন্নাহর সাধারণ নীতি, ইঙ্গিত, উদ্দেশ্য ও সাদৃশ্য দেখে সবচেয়ে কাছাকাছি হুকুম নির্ধারণ করা। এক্ষেত্রে জটিল উসুলি তর্ক-বিতর্কে না গিয়ে, বরং এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া—যেটা সমঝদারিতে সঠিক মনে হয় এবং অন্তরে প্রশান্তি সৃষ্টি করে।

আসহাবুর রায়: এই শ্রেণির ফকিহগণ বলতেন—দীনের ভিত্তি ফিকহের (গবেষণালব্ধ জ্ঞান) ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই ফিকহকে অবশ্যই প্রচার-প্রসার করতে হবে। তারা হাদিস বর্ণনা করতে ভয় পেতেন, যদি তাতে মিথ্যা যুক্ত হয়ে যায় তবে জাহান্নাম অনিবার্য। এ কারণে তারা সাহাবি বা তাবেয়ি ফকিহগণের রায় সরাসরি বর্ণনা করতেন। এই দলের মধ্যে ছিলেন ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তার অনুসারীগণ। ফিকহচর্চায় তাদের মূলনীতি ছিল এমন :

১. ইমামের বক্তব্য ও রচনাই প্রধান ভিত্তি। যেকোনো মাসআলায় সবার আগে দেখতে হবে ইমাম বা তার শিষ্যদের কোনো বক্তব্য আছে কিনা, থাকলে তার ভিত্তিতেই হুকুম দেওয়া হবে।

২. স্পষ্ট বক্তব্য না থাকলে ইমাম যে সাধারণ নীতি, নিয়ম, যুক্তি ব্যবহার করেছেন—তা নতুন মাসআলায় প্রয়োগ করা।

৩. ইমামের কথার উমুম, ইশারাত ও ইকতিযা থেকে হুকুম বের করা।

৪. নজির প্রয়োগ করা। অর্থাৎ ইমামের মাযহাবে একই রকম কোনো মাসআলা থাকলে সেই হুকুম নতুন মাসআলায় প্রয়োগ করা।

৫. ইমামের ব্যবহৃত ইল্লত (কারণ) নির্ধারণ করে নতুন মাসআলায় প্রয়োগ করা।

৬. ইমামের দুটি বক্তব্য একত্র করে যদি নতুন রায় দেওয়া সম্ভব হয়, তবে তা-ই করা।

৭. শব্দার্থ, ভাষা, উরফ ও ফকিহগণের ব্যবহার বোঝা। ইমামের বক্তব্য কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তা বুঝে তাখরিজ করা।

৮. দুটো সম্ভাবনা থাকলে মাযহাবি উসুল অনুযায়ী দৃঢ়তর মত গ্রহণ করা।

৯. ইমামের আমল, ইমামের শহরের রীতি—এগুলোকেও দলিল হিসেবে ব্যবহার করা।

১০. ইমামের উসুল থেকে বের করা রায় সহিহ হাদিসের বিপরীত হলে হাদিসই অগ্রগণ্য হবে।

আহলুল হাদিস বনাম আসহাবুর রায় : দুই শ্রেণির মূলনীতিগত পার্থক্য এতটাই প্রকট যে, এর মধ্যে কোনো মীমাংসা টানা সম্ভব নয়। তবে আরেকবারের মতো সংক্ষেপে পার্থক্যটা বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব :

  • আহলুল হাদিস (মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলিগণ) যৎপরোনাস্তি নসের অনুসরণ করে। তারা সরাসরি কুরআন, সুন্নাহ ও আসারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেওয়ার পক্ষপাতী। অন্যদিকে আসহাবুর রায় (হানাফিগণ) ইমামের উসুল, নজির ও ইশারার ওপর ভিত্তিতে কুরআন, সুন্নাহ ও আসার থেকে হুকুম দেয়। তারা নস থেকে আকলের ভিত্তিতে হুকুম গ্রহণ করে।
  • আহলুল হাদিস শ্রেণির ফকিহগণ হাদিস পেলে তার বিপরীতে কোনো মত বা রায় গ্রহণযোগ্য মনে করে না। অন্যদিকে আসহাবুর রায় ইমামের উসুল ও বক্তব্য আগে দেখে, তার মেথড ধরে হাদিস থেকে হুকুম গ্রহণ করে।
  • অগ্রাধিকার ধারাবাহিকতায় আহলুল হাদিস যথাক্রমে নস→ আসার→ ইজমা→ সাধারণ কিয়াসকে গ্রহণ করে। অন্যদিকে আসহাবুর রায় যথাক্রমে নস → ইমামের সরাসরি বক্তব্য → ইমামের উসুল → ইমামের তাখরিজ → ইমামের ফতোয়ার নজিরকে গ্রহণ করে।

এত এত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ফকিহগণ এই বিষয়ে একমত যে, কোনো মুজতাহিদ ফকিহই বিভ্রান্ত নয়, প্রত্যেকেই সঠিক। শুধু তা-ই নয়, তারা একে অপরকে যারপরনাই সম্মান করতেন।

ইমাম মালেক (রহ.)-কে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ওই লোকের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি যদি এই স্তম্ভকে স্বর্ণ প্রমাণ করতে চান, তবে এর সপক্ষে দলিল দাঁড় করাতে পারবেন।’[18]

ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মতে ফজরের নামাজে কুনুত পড়া দায়েমি সুন্নত, সংকট থাকুক বা না থাকুক, সব সময় পড়তে হবে। কিন্তু ইমাম শাফেয়ি (রহ.) একবার হজরত আবু হানিফা (রহ.)-এর কবরের কাছাকাছি এক জায়গায় ফজর নামাজ পড়েন, সেদিন কুনুত পড়েননি। নামাজ শেষে তিনি বলেন, ‘অনেক সময় আমরা ইরাকবাসীর মাজহাবের (হানাফি) ওপর আমল করি।’[19] অর্থাৎ, তিনি সেদিন হানাফিদের ইখতেলাফকে সম্মান জানিয়ে নিজ মতের ওপর আমল করেননি।

ইমাম মালেক (রহ.)-এর মাযহাবে রক্ত বের হলে ওজু ভাঙে না। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তিনি এই মতের অনুসারী কোনো ইমামের পেছনে নামাজ পড়বেন কিনা। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘কীভাবে আমি ইমাম মালেক ও সায়িদ ইবনে মুসাইয়িবের মতো ব্যক্তিদের পেছনে নামাজ না পড়ে থাকতে পারি?’[20]

ইবনে তাইমিয়া (রহ.) লিখেন, একবার ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর কাছে এক লোক বলেন, ‘আমি কিতাবুল ইখতিলাফ নামে একটি বই লিখেছি। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) বলেন, ‘তুমি বইয়ের নাম পরিবর্তন করে কিতাবুস সুন্নাহ রাখো।’ [আরেক বর্ণনায় আছে—কিতাবুস সাআহ রাখো, যার অর্থ হলো প্রশস্ততার কিতাব।] … এই কারণেই আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার বিষয়ে যারা গ্রন্থ রচনা করেছেন—শাফেয়ি মাজহাবের আলেম হোন বা অন্যরা—তারা বলেছেন: এ ধরনের ইজতেহাদি বিষয়গুলোতে হাতে ধরে বাধা দেওয়া যাবে না। আর এসব বিষয়ে কাউকে নিজের মত অনুসরণে বাধ্য করাও কারও জন্য বৈধ নয়। বরং এখানে করণীয় হলো—ইলমি দলিল-প্রমাণ দিয়ে আলোচনা করা। যার কাছে যে মতটি সহিহ বলে প্রতীয়মান হবে, সে সেটি অনুসরণ করবে। আর যে ব্যক্তি অন্য মতের অনুসারীদের তাকলিদ করবে—তার ওপর কোনো আপত্তি করা যাবে না।[21]

ব্রাহ্মণ্যবাদের উত্তরাধিকার

ওমর বিন আবদুল আজিজ (রহ.) অনেকটা এভাবে বলেছিলেন, ‘সাহাবায়ে কেরামের মাঝে ইখতেলাফ হওয়াটা আনন্দের। কারণ তাদের ইখতেলাফ না হলে আমাদের সামনে কোনো বিকল্প থাকত না, তাই সেখানে মতপার্থক্য হলে বিভ্রান্তিতে পড়তে হতো। কিন্তু তাদের ইখতেলাফ আমাদের বিকল্প সুযোগ গ্রহণের পথ তৈরি করে দিয়েছে।’[22]

তিনি এই কথা এই জন্যেই বলেছিলেন, কারণ মানবস্বভাবে আল্লাহ তায়ালা  যে ‘এখতিয়ারের’ বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন, তার প্রভাবে মানুষ নিজেকে ভিন্ন প্রকাশ করবেই। রুশ ঔপন্যাসিক ফিওদর দস্তইয়েফস্কি, যাকে বলা হয় মানবস্বভাবের নিখুঁত চিত্রকার, তিনি এই বিষয়টি এভাবে চিত্রায়িত করেন—

মানুষ যে যন্ত্র নয়, সে যে বেহালার ছড় নয়, তাকে বাজালেই সে যে বাজবে না—এই সত্যটুকু প্রমাণের জন্য সে ওই অসম্ভবের পায়ে মাথা কুটবে। এখানেই শেষ নয়। সে যদি যন্ত্রও হত, যদি বিজ্ঞান আর গণিত তা প্রমাণও করত, তবু সে কেবল অকৃতজ্ঞতার বশেই যুক্তিহীন আচরণ করত; এমন সব কাজে লিপ্ত হত যা স্বাভাবিক নিয়মের ব্যতিক্রম। … সে যে-কোনো মূল্যে প্রমাণ করতে চেষ্টা করে, তার সাধ-আকাঙ্ক্ষা হিসেবের ছকে মেলানো যায় না। সে জীবন দিতে তৈরি; হয়তো সে মানুষ হয়ে মানুষের মাংস ছিঁড়ে খাবে—তবু প্রমাণ করবে, সে কারুর নাচের পুতুল নয়, সে মানুষ। …[23]

মানুষের এই এখতিয়ার যদিও নবুওয়তকে স্বীকার করে ‘মুসলিম’ হওয়ার প্রধান অনুঘটক, তবু একে যেহেতু পুরোপুরি অবদমন সম্ভব নয়, তাই খোদ রসুল (সা.)-ও কিছু মৌলিক ক্ষেত্র ছাড়া সবই উম্মতের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। উম্মত ইখতেলাফের মাধ্যমে নিজস্ব বোধ-বুদ্ধি ও রুচি-প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে যেকোনো একটি মত বেছে নিয়েছে। এর ফলে ইসলাম পালন সহজ হয়ে উঠেছে। আর যদি এর বিপরীত হতো, কোনো ভিন্নমত গ্রহণের সুযোগ না থাকত, তাহলে উম্মতের একটি বড় অংশই সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর বিরুদ্ধে চলে যেত।

তবু ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশে, কেন তাকলিদকে জোরালো সমর্থন করা হয় কিন্তু ইখতেলাফকে ভালো চোখে দেখা হয় না? এর জওয়াবে আমরা ইতোপূর্বে ‘সাংস্কৃতিক স্বভাবের’ কথা বলে এসেছি, তবে এক্ষণে আমরা একটি আধ্যাত্মিক কারণও উল্লেখ করব :

ওস্তাদ বদিউজ্জামান সাইদ নুরসি (রহ.) তার ‘হিজমেত রেহবেরি’ গ্রন্থে বলেন, মানুষের ভেতর যে নফসে আম্মারা আছে, যে সব ধরনের পাপকাজে মানুষকে উদ্দীপনা জোগায়, কেউ যদি সেই নফসকে পুরোপুরি অবদমন করে, তাহলে ‘দ্বিতীয় নফসে আম্মারার’ জন্ম হয়, এবং সে আরও খতরনাক হয়ে সামনে আসে। যদি সহজ বাংলায় এর ব্যাখ্যা করি, তাহলে ব্যাপারটা এমন—নফস আমাদের যৌনকাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। এমনকি বিয়ের পরেও অন্য নারীর দিকে আমাদের চোখ টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু আমরা যদি এর কোনো বৈধ সমাধান না খুঁজি, যদি নিজের স্ত্রীর কাছে না যাই কিংবা বিয়েই না করি, এবং একে প্রবলভাবে অবদমন করি, তাহলে ‘দ্বিতীয় নফসে আম্মারা’ আমাদের সমকামিতার দিকে টেনে নিয়ে যাবে! এই জন্য যারা তাসাওউফের চর্চা করে, তাদের সবচেয়ে বড় ভয় হলো ‘দাড়ি ছাড়া বালক’। কারণ তারা ইতোমধ্যে নারী থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত করে নফসকে পরাজিত করে ফেলেছেন, তাই নফস নতুন অস্ত্র দিয়ে তাদের ঘায়েল করে।

একইভাবে, মানুষের ভেতরে ফাসাদ ও রক্তপাতের যে গুণ আছে, ইসলামের সাহায্যে মানুষ যখন তাকে নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু ইখতেলাফ ও চিন্তার ভিন্নতাকে নিরঙ্কুশ সমর্থন না জানায়, তখন সেই খুনে স্বভাব ‘জালালি তবিয়তের রূপ ধরে’ মানুষে মানুষে বিভাজন তৈরি করে। পাশাপাশি ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রভাবে যেই সাংস্কৃতিক স্বভাব ভারতীয় অঞ্চলের মাটিতে মিশে আছে, যেখানে ছোটখাটো কারণ পাওয়া গেলেই একজনকে সমাজ থেকে খারিজ করা হয়—এর মিথস্ক্রিয়াতেই দেখা যায় বিভিন্ন অজুহাত দাঁড় করিয়ে ব্যক্তিকে ‘নির্দিষ্ট আলেম সমাজ’ থেকে খারিজ করে দেওয়া হচ্ছে। বড় ধরনের মতপার্থক্য তো দূর কি বাত, কুরআন-সুন্নাহর সাথে বিন্দুমাত্র সম্পর্ক রাখে না এমন বিষয় সামনে এনে, এমনকি পাঁচকল্লি টুপি কিংবা কল্লিদার পাঞ্জাবি না পরার মতো বিষয়ের দোহাই দিয়েও ‘কাফেরের’ মতো আচরণ করা হয়। এটি একই সাথে দ্বিতীয় নফসে আম্মারা ও ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতিক স্বভাবের কারণে ঘটে থাকে, কিন্তু একে বিভিন্ন নাম দিয়ে জায়েজীকরণ করা হয়।

ইসলাম যেহেতু জামাআতবদ্ধ থাকার নির্দেশ দেয়, তাই এখানে কাউকে খারিজকরণ দেশ বা ভাষাগোষ্ঠীর সদস্যপদ থেকে খারিজ করার মতো না। আমরা যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাউকে ভারতপন্থি বা পাকিস্তানপন্থি বলি, এর কারণে কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র বাতিল হয় না। সে এই দেশেই থাকে। অর্থাৎ এখানে খারিজকরণটা যেহেতু স্থানগত, চোখে দেখা যায়, তাই এতে বড় ধরনের সমস্যা হয় না। কিন্তু কাউকে যদি কওমি সমাজ থেকে খারিজ কিংবা সরাসরি তাকফির করা হয়, তাহলে সে মুসলমানদের জামাআত থেকে খারিজ হয়ে যায়। এই বিষয়টি মনস্তাত্ত্বিক। এর প্রভাব অনেক বেশি। আর এটি ইসলামে অন্তর্গত বহুত্ববাদী ধারণাকেও নাকচ করে। এর ফলে উম্মাহভিত্তিক সমষ্টিগত সমাজ হুমকির মুখে পড়ে, এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ জোরালো হয়। আর তার ফাঁকফোকড়েই গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জেন্ডার ডাইভির্সিটির মতো মতবাদগুলোর আমদানির পথ তৈরি হয়। তাই এখানে ইজতেহাদ ও ইখতেলাফকে মেনে না নেওয়া কেবল মূর্খতাসূলভ সিদ্ধান্ত নয়, বরং দুশমনকে চোখ আঙুল দিয়ে নিজেদের সবচেয়ে দুর্বল দিক দেখিয়ে দেওয়া।

শাহ সাহেব এই বিষয়গুলো ধরতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে ফিকহ চর্চা করতে হলে ইখতেলাফকে স্বাগত জানাতে হবে। তাই তিনি তার কিতাবে একদিকে যেমন ইসলামি আইনের বহুত্ববাদের ধারণা স্পষ্ট করেছেন, আরেকদিকে ইখতেলাফ হওয়ার প্রতিটি কারণ এবং মানুষে মানুষে চিন্তার ধরনে পার্থক্যের বিষয়টিও পরিষ্কার করেন। এটি কেবল আগেকার আমলের মানুষের মানুষের ইখতেলাফ বুঝানোর জন্য নয়, এখনকার যুগেও যে ইখতেলাফ স্বাভাবিক—এটি প্রমাণের জন্য। তার এই কিতাব ভারতীয় অঞ্চলের মানুষের সাংস্কৃতিক স্বভাব পরিবর্তনে যেমন জরুরি, একইভাবে মুসলিম উম্মাহর মাঝে ঐক্য তৈরি করারও তাত্ত্বিক ইশতেহার। আমরা চাই এই কিতাব আরও পঠিত হোক, আরও নতুন নতুন আঙ্গিকে বিস্তৃত পর্যালোচনায় হাজির হোক।


[1] আহমেদ, সারফুদ্দিন। যুদ্ধপ্রবণতা কি মানুষের স্বভাবজাত? প্রথম আলো, ৮ আগস্ট ২০১৩।

[2] সুরা বাকারা, আয়াত ৩০

[3] সুরা দাহর, আয়াত ৩

[4] মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি, শুউর ও আগাহি, পৃষ্ঠা : ১৮৯-২১৩, প্রকাশনী : রহিমিয়ামাতবুআত, ২০২২

[5] সুরা নিসা, আয়াত : ৫৯

[6] সুরা আলে-ইমরান, আয়াত : ১০৩

[7] সুরা আলে-ইমরান, আয়াত : ১০৫

[8] সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০৬৫

[9] সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৮৪৮

[10] সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৪৭৬

[11] তাকলিদ শব্দের অর্থ গলায় দড়ি বাঁধা বা নিঃশর্ত অনুসরণ করা। আল্লামা ইবনুল হুমাম তাকলিদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন—‘যার কথা শরিয়তের মূল দলিলগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়, তার মতামতকে আলাদা কোনো দলিল যাচাই ছাড়া মেনে নেওয়াই হচ্ছে তাকলিদ।’

[12] ইজতেহাদ হলো—ইস্তিম্বাতের (দলিল উদ্ঘাটন) মাধ্যমে কোনো বাস্তব শরয়ি হুকুমে পৌঁছানোর জন্য সাধ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।

[13] মূলত তাকলিদ ও ইজতেহাদ একই মুদ্রার দুই পিঠ। কোনো বিষয়ে স্পষ্ট দলিল না থাকলে মুজতাহিদ ফকিহ অন্যান্য দলিল থেকে নির্দিষ্ট মূলনীতির আলোকে সিদ্ধান্ত দেন, একে বলে ইজতেহাদ; আর সাধারণ মানুষ তার সে সিদ্ধান্তকে মুজতাহিদ হওয়ার ভিত্তিতে গ্রহণ করে—একে বলে তাকলিদ।

[14] ইবনু কাইয়িমিল জাওযিয়া, ই’লামুল মুওয়াক্কিয়িন আন রব্বিল আলামিন, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৬৬, প্রকাশনী : দার আল কুতুব আল ইলমিইয়াহ, বৈরুত।

[15] মুজতাহিদ ফিল মাযহাব বলতে সেই ফকিহ ও আলেমকে বোঝায়, যিনি নিজ মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমামের নির্ধারিত উসুল ও কাওয়াইদ অনুসরণ করে কুরআন–সুন্নাহ থেকে নতুন বা বিতর্কিত মাসআলায় ইজতেহাদ করতে সক্ষম হন; তবে তিনি উসুলের ক্ষেত্রে ইমাম থেকে স্বাধীন নন।

[16] এর সাথে আরও একটি কারণ যুক্ত করা যায়, আর তা হলো ‘অবস্থার পরিবর্তনের কারণে ফতোয়া পরিবর্তন করা’। যেমন হজরত আয়েশা (রা.) নারীদের মসজিদে না যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন, কারণ তার কাছে মনে হয়েছে রসুল (স) নারীদের বর্তমান অবস্থা দেখলে মসজিদে যেতে দিতেন না। অন্যদিকে ইবনে ওমর (রা.) নারীদের মসজিদে যেতে দেওয়ার পক্ষে খুবই কঠোর ছিলেন।

[17] সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯১৬

[18] যাহাবি, মানাকিবুল ইমাম আবি হানিফা, পৃষ্ঠা ৩১, লাজনাতু ইহইয়াইল মাআরিফ আন-নুমানিয়া, হিন্দ

[19] শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি, আল ইনসাফ ফি বয়ানি আসবাবিল ইখতিলাফ, পৃষ্ঠা ১১০, দারুন নাফাইস, বৈরুত

[20] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১০৯-১১০

[21] ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩০, পৃষ্ঠা ৭৯-৮০, মাজমাউল মালিক ফাহাদ, সৌদি আরব

[22] প্রাগুক্ত, খণ্ড ৩০, পৃষ্ঠা ৮০

[23] দস্তয়ভস্কি, অজ্ঞাতবাসের পত্র, অনুবাদ : খন্দকার মজহারুল করিম, পৃষ্ঠা ২৭-২৮, পিপ ট্রাস্ট।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *