একে তো শীতের মাঝামাঝি সময়, আবার মহান পবিত্র বৃহস্পতিবার। বঙ্গদেশে ঘোরাঘুরির এই মোক্ষম সময়ে কোথাও যেতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে এক অলস বিকেলে যখন চা পান আর মশা তাড়িয়ে সময় পার করছি, ঠিক তখনই কেউ কল করেছে বলে ফোনটা চেঁচাতে শুরু করে। স্ক্রিনে চোখ রাখতেই দেখি, জরুরি ফোন। রিসিভ না করে উপায় নেই। বন্ধু এক্স কখনো জরুরি ব্যাপার ছাড়া ফোন দেন না। কলটা রিসিভ করতেই বললেন, দ্রুত আব্দুল্লাপুর চলে আসেন; খানিক বাদেই গাড়ি!
পকেট ঝাড়লে ধুলো ছাড়া আর কিছুই বেরোবে না, এই মোটামুটি অবস্থা; তখন এমন সফরের দাওয়াত যেন চৈত্রের মাঠফাটা আগুনঝরা দুপুরে চাতক চাহনিতে অপেক্ষারত আকাশ কোণে মেঘ দেখা কৃষকের মুখের হাসি। হনহন হেঁটে বাসায় পৌঁছে সাতপাঁচ না ভেবেই মাত্র কয়েক মিনিটে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ি। সম্বল? ওই কী কাজে তোশকের নিচে চালান করা একটা একশো টাকার নোট; আর পকেট ঝেড়ে সাকূল্যে পাওয়া একশো কুড়ি টাকা।
চিন্তা হয়ে দাঁড়াল এই নন্দিপাড়া থেকে আব্দুল্লাহপুরের পথটুকু। ঢাকার রাস্তায় এ পথে কোথাও সময়মতো যাওয়া জুয়ায় জিতে ঘরে সদাই নিয়ে ফেরার মতোই অনিশ্চিত। পকেট সায় দিলে অবশ্য ঢাকার ট্রাডিশনাল জ্যাম এড়াতে আধুনিক ঘোড়া শেয়ারই অধিক পছন্দ। নতুবা এসব পথে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে আপনি কেবল মধ্যরাত থেকে ভোর অবধি স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারবেন। তবে সেটা অপারগ হয়ে লোকাল বাজারের চাট্টিখানা ব্যাবহারের মতোই ঘটনা! আশা করি মগের মুল্লুকের এই দেশও একদিন সভ্য হবে, সবকিছু হবে সহজ, সুন্দর এবং পরিচ্ছন্ন; যদিও গরিবের আশা আর শীতকালীন বৃষ্টির মাঝে তফাত কিছু নেই!
ষাট টাকা খরচ করে সড়কপথে বিমানের ছোঁয়া নিয়ে বাংলার টেসলা চড়ে পৌঁছলাম কমলাপুর রেলস্টেশন। সেখান থেকে এক্সপ্রেসে বিমান বন্দর; তারপর আরও দশ টাকায় আজমপুর রেলগেট—শেষ তিরিশ টাকায় রিক্সা করে শর্টকার্টে মাত্র এক ঘণ্টায় আব্দুল্লাহপুর। তবুও দেরি হওয়ায় বিখ্যাত হানিফে (সুপারভাইজারকে পটিয়ে কম ভাড়ায়) যাওয়ার সুযোগ হারানোর কিছুটা দায় আমার ওপর এসে পড়ল বইকি! অনেক কাউন্টার ঘুরে বহু দর কষাকষি করে যে বাস পেলাম, তার আগমনী সময় রাত ১২ টা। এই দেশে পাবলিক বাহন আর অফিসের বসদের যথাসময়ে আসার মধ্যে মিল থাকার যে আশ্চর্য বিস্ময়, তা কী আর বলার অপেক্ষা রাখে!
ঢাকার সৌন্দর্যবর্ধক পাওডার গায়ে মেখে এদিক-ওদিক হাঁটাহাঁটি আর চা-বিড়ির ধোঁয়া ও সুড়ুৎ-সাড়ুৎ শব্দ মাড়াতে মাড়াতে দেখছিলাম, কটা পয়সা ধরতে এসে কীভাবে আধুনিক দাস হওয়া মানুষেরা সাপ্তাহিক একটা দিনের ছুটিনামক তাচ্ছিল্যকে বরণ করতে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলছে দুতিনশো কিলো পথ…!
মহান পবিত্র বৃহস্পতিবারের এসব সৌন্দর্য যখন উপভোগ্য করে তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে, ঠিক তখনই পুরোনো দিনের সরকারি অফিসের ঘুষখোর যে বয়স্ক স্যার আর কটা দিন বাদে রিটায়ারমেন্টে যাবেন; সময়ের তোয়াক্কা না করে পান চিবোনো মুখে মিচকে হাসির সাথে চোখ টিপটিপে ভাব নিয়ে কাছাকাছি আসতেই যেন একটা ধমকের সুরে থামলেন—আমাদের আজকের বাহন একতা মহাশয়। অপেক্ষমান যাত্রীদের সাথে কাঁচঘেরা কাউন্টারের দরজা ঠেলে ভুঁড়ি মোটা অফিসারগোছের লোকটি বেরিয়ে এসে ‘এ্যাঁই! পাঁচশো বারো’ বলে হাঁক দিতেই কণ্ঠে তার সদরঘাটের দালালের পরিচয় ফুটে উঠল।
ঢাকার নিরবিচ্ছিন্ন ভায়োলিনের শব্দ উপভোগ করতে করতে কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল; বন্ধ করে রাখা জানালার ফাঁক গলে শীতের ফিনফিনে বাতাস যখন চামড়ায় সূচ হয়ে বিঁধে, তখন টের পাই। রাত গড়িয়েছে অনেকটা। ফ্রন্ট উইন্ডশিল্ড কিংবা লুকিং গ্লাস কোথাও কিছু দেখা না গেলেও চালক দক্ষতার পরিচয় দিতে হাইওয়ের চকচকে পাকা পথে এগিয়ে চলেছে একশো বিশ কিলো বেগে; এ যেন অন্ধের নিয়মিত বাড়ি ফেরার পথ।
আমাদের প্রথম গন্তব্যের কাছাকাছি আসতেই নির্দিষ্ট স্টপেজের আগে তাদের বাড়ি ফিরবার সুবিধার্থে কোথাও কোথাও যাত্রীরা নেমে যাচ্ছে। কোথাও দূর থেকে বেসুরো কিন্তু বড্ড দরদমাখা কোন মৃত্যু পথযাত্রী বুড়োর গলায় ভেসে আসা আজানের ধ্বনি অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে কর্ণকুহরে প্রবেশ করতে চাইছে। গ্রামীণ মৌলভিদের সামাজিক শ্রেণিভেদ ও যাপিত তীব্র দুঃখের ভারে ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে সে সুর। হঠাৎ বুঝতে পারি, নামবার সময় হয়ে এসেছে। পা রাখি উত্তরের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী জেলা নওগাঁ শহরে।
তখনো আলো ফোটেনি। ফজরের জামাত-ফেরা মানুষেরা গোবর লাঠি আর তুষ-কয়লার আগুনে শীত নিবারণে দাঁড়িয়েছে। শুরু হয়ে গেছে চা দোকানের ব্যস্ততা। কুয়াশার চাদর বলে বাস্তবে যদি কিছু থেকে থাকে, তবে এই বুঝি তার সাক্ষাৎ দর্শন। মাত্র দুচার হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিও অদৃশ্য। যেন-বা কোনো গিঁটবিহীন তুলোর বুননে আসমান থেকে ঝুলে পড়া পর্দা; আবার ধরতে গেলেই নাই!
কুশয়ার অন্ধকার থাকতেই আমরা দ্বিতীয় বাহনে চড়ে রওনা করি। আমাদের মূল গন্তব্য সীমান্তবর্তী অঞ্চল পোরশার ইসলামপুর। ধীরে ধীরে সূর্যের নরম আলোয় পরিষ্কার হচ্ছে চারপাশের গ্রামীণ সৌন্দর্য। দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ চিরে চলে গেছে পাকা রাস্তা। বর্ডারের দুপাশে তখন নবান্ন। ধান কাটা ব্যস্ততায় যোগ দিয়েছে স্থানীয় জোন এবং বর্গা চাষীদের সাথে কিছু হিন্দু সম্প্রদায়ের গৃহিণীরাও। আঁটি বেঁধে স্তুপ করে রাখা সোনালি ধানের ওপর উষ্ণ রোদ যেন ঢেউখেলানো কৃষকের হাসিই ছড়িয়ে দিচ্ছে। কোথাও জাম্পার বা মাফলার পরে গৃহকর্তার সাথে ছানাপোনা নিয়ে মাসকালাই তুলতে ব্যস্ত গৃহকত্রী। কেউ-বা ব্যস্ত ফুরিয়ে আসা বিলের পানি ছেঁচে দেশি মাছ ধরতে।
পথের দুপাশ ধরে প্রাচীন বাংলার অন্যতম বাহন গরু গাড়িগুলো ধীরে ধীরে মাঠে আসছে। অপেক্ষমান স্তুপ থেকে মাড়াই ও পরবর্তী কাজের জন্য ধানগুলো বাড়িতে নিয়ে যাবে। আগাম ফসলের অধিক মূল্যের আশায় যে সরষে বোনা হয়েছে, তারই সৌন্দর্য মাথা দুলিয়ে জানাচ্ছে হলুদ সালাম। যেন-বা বিশেষ অতিথিকে জানানো রাজ দরবারের প্রবেশপথের দুপাশে সজ্জা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সিপাহীদের কুর্নিশ।
আমরা আবারও বাহন পাল্টে স্থানীয় ভ্যানে উঠে বসি। যদিও হাঁটাপথের দূরত্ব সামান্য। কিন্তু মেজবানের আবদার এবং এসব ঐতিহ্যের সৌন্দর্য উপভোগ থেকে বঞ্চিত না হতে চাওয়া মনের আবেদন রাখতে হলো। এটা কি ঠিক ভ্যান নাকি শিল্প-ঐতিহ্যের ধারক, তার বিচারে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। কী নেই এতে? গাছ, তরুলতা ও গ্রামীণ বাংলার চেনা-অচেনা নানান ফল ও ফুলের যে সযত্ন কারুকাজ, তা যেন বিখ্যাত শিল্পীদেরও হার মানায়।
সকাল আটটা নাগাদ বন্ধু এনামের বাড়ি পৌঁছি। হালকা বিশ্রাম ও মর্নিং শাওয়ার নিয়ে দশটায় প্রাতরাশ! খাবারের আয়োজনে ছিল বাঙালি আতিথেয়তার প্রমাণ। দিলে জেগে ওঠে শকুনের থাবায় বাংলার হারিয়ে যাওয়া পুরোনো মুর্শিদাবাদের ব্যথা। যে ব্যথা মৃত্যু অবধি লালন করছেন বাঙালির পরম বন্ধু মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী।
কোয়েল পাখির সুস্বাদু সেদ্ধ ডিম, গরম দুধ থেকে শুরু করে স্থানীয় পিঠা, ঘিয়ে ভাজা পরোটা, তুলতুলে নরম চালের রুটি, দুধের ভাপে সেদ্ধ পোলাও, ফ্রিজবিহীন প্রাকৃতিকভাবে চর্বিতে সংরক্ষিত গরুর গোশত, গুড়ের পায়েস, কয়েকপদ আচার; সেরা স্বাদ ও পরম মমতাজড়ানো এসব খাবারে চির অকৃতজ্ঞও কৃতজ্ঞ হতে বাধ্য!
দুপুর ও রাতেও ছিল রাজকীয় ভোজের আয়োজন। সেসব বলে আমার প্রিয় পাঠককের জিভে জল আনার বাড়তি অপরাধ আর নাই-বা করলাম। পরদিন খাব না খাব না করেও যখন স্থানীয় ঐতিহ্য কালাই রুটি আর হাঁসের মাংসের সালুন সামনে আসে, নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। কয়েকবারই বসতে হয়েছে দস্তরখানে।
আমাদের এবারের গন্তব্য ১৯২৭ সালে স্থাপিত প্রাচীন মুর্শিদাবাদের পোরশার অন্যতম হাই স্কুল কাম মাদরাসা। প্রধান সড়কের পাশে পাঁচিলঘেরা বিশাল জায়গা নিয়ে শিম ফুলের রংমাখা দালানের গায়ে মেঘ-সাদা দাগ টানা কাঠের সিঁড়ি আর প্রাচীন নকশায় করা নানান কারুকার্য নিয়ে একটা দোতলা জমিদার বাড়ির মতো আটানব্বই বয়েসি ইশকুল; যার নান্দনিকতা ও স্থাপত্য সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবে।
একটু এগোতেই পোরশা বাজার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ৩১৭ বছর বয়েসি এই দারুণ স্থাপনাটি আড়ম্বরপূর্ণ সাজসজ্জা ও চারদিকে চারটি মিনারের মধ্যখানে একটি উঁচু গম্বুজ নিয়ে আপনাকে স্বাগত জানাবে। আরও চমকে দেবে বাইরে থেকে দেখা অতি সাধারণ ভাড়া দোকানগুলোর জীর্ণশীর্ণ ভাব। দেখে পোড়া মনে হলেও যথেষ্ট মজবুত কাঠামোর ওপর পুরোনো দিনের বনেদি বাড়ির আদলে গড়া একটি দোতলা ভবন। এটি শুধুমাত্র একটি কাঠামো বা চুন সুড়কির দালান নয়। বরং আমাদের হারিয়ে ফেলা মুসলিম বঙ্গের স্মৃতি বুকে নিয়ে টিকে থাকা ১১৭ বছরের ঐতিহাসিক সাক্ষী একমাত্র ঐতিহ্যবাহী সরাইখানা। নাম পোরশা মুসাফিরখানা; পাশে সিমেন্টের অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে—সন ১৯০৮।
ঢুকতেই চোখে পড়বে অন্দরমহলে প্রবেশপথের সামনের প্রশস্ত করিডর। সোজা গিয়ে মিশেছে বিশাল দিঘির ঘাটলায়। একসময় এই দিঘিই আগত অতিথিদের অজু-গোসল ও পানির সবটুকু জোগান দিলেও এখন অবহেলিত। ঘাটলার অপরিচ্ছন্নতায়ই যার স্পষ্ট ছাপ। হয়তো আগ্রহী মুরুব্বিদের অজুর বরকতে মাছ চাষের ভেতর দিয়ে হলেও এখনো টিকে আছে!
অন্দরমহলে প্রবেশ করলে বুঝতে পারবেন, এখনো কী পরম যত্নে আগলে রেখেছেন। নিয়মিত আগত মেহমানদের একলা হাতে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। ঐতিহ্যকে লালন ও ভেতরের যত্নে যে কোথাও এই বয়োবৃদ্ধ খাদেম সাহেবের বয়সের ছাপ নেই, তার আন্তরিকতা ও আলাপে তা আরও স্পষ্ট হবে। মানুষ বুড়ো হয়েও যে চিরতরুণ রয়ে যান, ইনিই তার জলন্ত প্রমাণ।
চারদিক ঘিরে দোতলা ভবন। মাঝে উঠোন। নিচতলায় রান্নাঘর। খাদেম সাহেবের কামরা। আরও আছে শীত ও গরমের সকল সুবিধা নিয়ে ছোট ছোট মেহমান ঘর। ওপরতলায় বড় বড় কামরা। পাশাপাশি বিশেষ মেহমানদের জন্য ছোট্ট, সুন্দর ও গোছানো ছিমছাম কক্ষ। অনুষ্ঠানের জন্য আলাদা আদলের বিরাট হলরুম। মোজাইক পাথরের নান্দনিক ডিজাইনের ফ্লোর। সিঁড়ি ও বারান্দার কাঠের রেলিংয়ের ওপর শানদার নকশা।
সবখানেই কেবল ঐতিহ্যের ছড়াছড়ি। এসব দেখতে দেখতে আপনার সময় কীভাবে যে হাওয়ায় মিঠাইয়ের মতো নাই হয়ে যাবে; টেরও পাবেন না। আমাদেরও ব্যতিক্রম হয়নি। চড়ুইপাখির মতো ফুড়ুৎ করে উড়ে গেছে সময়৷
সৃষ্টির মৌলিকতা থেকেই হয়তো-বা মাটির জিনিসপত্রের সৌন্দর্য বরাবরই আমাকে টানে। খোঁজ নিয়ে জানলাম, এখানেই আছে বংশ পরম্পরায় চলে আসা শৈল্পিক সৌন্দর্যের ভাণ্ডার মৃৎশিল্পের কারবার। হাতি-ঘোড়া, আম-কাঁঠালের ব্যাংক থেকে শুরু করে খানদানি কাপপিচ ও ঘর সাজানো সরঞ্জাম-সহ নানান আসবাবপত্রের যে সমাহার দেখেছি, তা আধুনিক বাংলায় শহুরে সাহেবদের ঘরোয়া সৌন্দর্যবর্ধক দোকান ছাড়া কোথাও মেলা ভার।
প্রতিটি ঘর একেকটা মৃৎশিল্পের কারখানা। যেখানে আপনি পাবেন প্রাচীন পদ্ধতির মৃৎভাটা। উঠোনজুড়ে ছড়িয়ে আছে সদ্য প্রস্তুত করে শুকোতে দেওয়া কলসি৷ জগ-মগ ছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। অত্যন্ত দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় নানান কারুকার্যে এগুলো তৈরি।
পাড়া ছেড়ে এগোতেই সীমান্তবর্তী নদী পুনর্ভবা। ওপারে সামান্য দূরত্বে কাঁটাতারের বেড়া। অস্তগামী সূর্যের সোনালি রেখায় ঝকমকিয়ে ওঠা শান্ত নদীর জলে সাঁতার কাটতে থাকা হাঁসের দলের মিছিল ও ফরফর শব্দে ঝাঁক বেঁধে নীড়ে ফেরা শেষ বেলার পাখিদের ভেতর আমরা হারিয়ে যাই।
আন্তঃসীমান্ত পুর্নভবা বড় কোনো নদী থেকে উৎপত্তি না হলেও আত্রাইয়ে গিয়ে যাত্রা শেষ করেছে। একসময় এখানে পাওয়া যেত দারুণ সব দেশীয় মাছ। দিন বদলেছে। এখন আত্রাই যেন বেলা শেষে ভেঙে যাওয়া হাট। তবে এখনো দুএকজনকে মাছ ধরার নৌকা নিয়ে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়।
সবুজ ঘেসো-কার্পেটে মোড়া পাড়টা বেশ উঁচু থেকে ঢালু হতে হতে নদীতে গিয়ে মিশেছে। যেন-বা আধুনিক সময়ের যত্নে মোড়ানো নিয়মিত জল ছেটানো কোনো স্টেডিয়ামের বুকের নরম ঘাস-গালিচা। চারপাশটা আরও মনোরম করে তুলেছে খুঁটে খাওয়া পাখির দল, ছাগল ছানা, গরু-বাছুরের দৌড় ঝাঁপ আর ইট ভাটার পাশ দিয়ে চুলের শিথির মতো সবুজের বুক চিরে ঘর ফেরা শিশুদের হৈ-হুল্লোড়।
পরিপাটি কোনো পর্যটন স্পটই আমার ভালো লাগে না। আমাকে প্রবলভাবে টানে বাংলার নাম না জানা কোনো বিস্তৃত ফসলের মাঠ। চুলের শিথির মতো চিকন আইল ধরে সোনালি ধানের বোঝা মাথায় হেলেদুলে পথচলা কৃষক; যার কণ্ঠে বেজে ওঠে ভাটিয়ালি সুর—কারও ঠোঁটে আকিজ বিড়ির ধোঁয়া। অদূরে ভ্রুক্ষেপহীন স্যালো মেশিন; ব্যারেলের দুপাশে বসে বেণী দুলিয়ে খেলায় মগ্ন দুই সখী। বুকের গহিনে ঢেউ তুলে জুম চাষে ব্যস্ত সেই কৃষাণী, যার হাঁটু গেড়ে গেছে ঢ্যালঢেলে নরম কাঁদায়; অথচ পিঠের ঝোলায় ঐশ্বরিক হাসিমাখা এক নিষ্পাপ শিশু।
উত্তরের তীব্র শীতেও সদ্য আলোফোটা সোনালি রোদে মুক্তোর মতো নিহারমাখা সরিষা ফুলের হাসি আমার বড্ড ভালো লাগে৷ ভালো লাগে মেঠোপথে ধুলো উড়িয়ে কোমলমতিদের মক্তবফেরা হাসিমুখ। জীবনকে ছুটি দিয়ে এসব দেখতেই আমি বেড়িয়ে পড়ি। আমি দুস্থ মুসাফির; পরিয়ায়ীর পাখাই আমার মনের বাহন।