আল মাহমুদের আত্মবয়ানে চিন্তার বিবর্তন থেকে ইসলামে প্রত্যাবর্তন

আল মাহমুদ (১৯৩৬–২০১৯) বাংলা কবিতার অন্যতম শক্তিশালী আধুনিক স্বর, যার সাহিত্যিক জীবন ও বৌদ্ধিক যাত্রা বহুস্তরীয় বিকাশ ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। সময়ের অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক ভাঙ্গা-গড়া, ব্যক্তিগত পাঠ-অন্বেষা, সমাজবাস্তবতার অভিঘাত এবং জন্মসূত্রে প্রাপ্ত ঐতিহ্যিক পরিচয়ের গভীর টান— সব মিলিয়ে তাঁর কবিসত্তা এক অনন্য-সাধারণ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। এই রূপান্তর তাঁকে অবশেষে ইসলামি বিশ্বাস ও মুসলিম পরিচয়ের পুনরাবিষ্কারের পথে পরিচালিত করে। তাঁর এই বিবর্তন, বিশেষ করে ইসলামের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যভিত্তিক বোধকে নতুনভাবে অনুধাবন—শুধু তাঁর জীবনানুভব ও ব্যক্তিক অভিজ্ঞতারই অংশ নয়; বরং তা বৃহত্তর মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ, বাংলাদেশের সমাজ-ইতিহাস এবং সাহিত্য-রাজনীতির রূপান্তরেরও প্রতিফলন। এই রচনা আল মাহমুদের রচনাসমগ্র থেকে তাঁর নিজস্ব বয়ানের আলোকেই তাঁর এই দার্শনিক সঞ্চরণ ও আত্মিক প্রত্যাবর্তনের পথরেখায় আলোকপাত করার একটি আন্তরিক প্রয়াস; কীভাবে তিনি সময়, সমাজ ও ইতিহাসের সঙ্গে এবং নিজের গভীরতম সত্তার সঙ্গে এক অন্তরঙ্গ সংলাপ চালাতে চালাতে এক পর্যায়ে তাঁর কাব্যিক ও বৌদ্ধিক সত্তাকে ইসলামের নতুন দিগন্তে প্রতিষ্ঠা করেছেন, তারই সার্বিক পরিসর তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা থেকে এই বিস্তৃত অবতারণা। প্রত্যাশা এই, পাঠক এ বিষয়ে একটি সত্যিকারের আয়তগভীর ধারণা লাভ করতে পারবেন।

এক.

সৃজন-যাত্রার প্রথমদিকে আল মাহমুদের কবিতায় প্রধান হয়ে ওঠে প্রকৃতি, গ্রামজীবন, মানবিক অনুভূতি, প্রেম, শরীরবোধ এবং লোকজ চেতনা। নদী, চর, শস্য-ক্ষেত, কৃষকের শ্রম-সংগ্রাম, মাটি ও মানবপ্রেম—এসব উপাদান তাঁর কাছে শুধুমাত্র কবিতার বিষয় ছিল না; এগুলো ছিল তাঁর শৈশব-কৈশোরের গভীরতম অনুভূতি এবং তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অস্তিত্বের সহজাত উৎস। বাংলার লোকজ অভিজ্ঞতাকে আধুনিক শিল্পভাষায় রূপান্তর করার মধ্য দিয়ে তিনি গ্রামবাংলার জীবন ও মানবতাকে কবিতায় নতুন এবং নান্দনিক মহিমা দান করেন। নিজের এই সৃষ্টি-ধারা সম্পর্কে তিনি স্পষ্টভাবেই বলেন— ‘আমি আমার কবিতায় প্রথম থেকেই গ্রামকে উত্থাপন করতে চেয়েছি। ভেঙে পড়া গ্রাম। চরের উত্থান-পতন। গ্রামের মানুষের প্রেম ও প্রতিহিংসা। নদী ও নারীর বহমান লোকজ জীবন ও প্রকৃতি। মাটিতে চাপা পড়া ইতিহাস ও আদিম বাঙালিদের প্রত্ন সম্পদ। লোকগাঁথায় উল্লিখিত তাদের শৌর্যবীর্যের কাহিনি থেকে আমি আমার কবিতার বিষয় আহরণ করেছি। আমি গ্রামকেই প্রাধান্য দিয়েছি কারণ যাকে বলে ধনতান্ত্রিক নাগরিক জীবন যা ইয়োরোপ আমেরিকা তখন পাশ্চাত্যের লেখক শিল্পীকে অহরহ নৈঃসঙ্গ্যের বেদনায় যন্ত্রণাকাতর করে আমি তেমন পরিবেশে বেড়ে উঠিনি। আমি জন্মেছি গ্রামে। আমার চতুর্দিকে যতদূর চোখ যায় শুধু গ্রাম আর গ্রাম। আর শস্যের মাঠ। মাঠের গাঁ ঘেঁষে নদী। নারীর শাড়ির মতো নকশাকাটা তার দুপার। আমার মনে হয়েছে নদী থেকেই বাংলার আদি পোশাকের অর্থাৎ শাড়ির উদ্ভাবন হয়েছে মেয়েদেরই হাতে, কৃষির উদ্ভাবনের মতো। আমি মাছ আর ধানের গন্ধে ভরপুর মানুষ। ধনতান্ত্রিক নাগরিক জীবনের বিচ্ছিন্নতাবোধ ও যন্ত্রণাকাতর আর্তি শত দুঃখের মধ্যেও আমাকে ঠিকমত স্পর্শ করেনি।’[1]

এই গ্রামীণ অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয় সময়ের রূঢ় ইতিহাসের অভিঘাত। আল মাহমুদের জন্ম ১৯৩৬-এ, মানে ব্রিটিশ আমলের শেষদিকে। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আন্দোলন, দেশ ভাগ, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ থেকে বাংলাদেশের উদ্ভব পর্যন্ত যে সময়টা তিনি কাটিয়েছেন, সে এক দীর্ঘ রূঢ় ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভেতর তাঁর প্রারম্ভিক সৃজনপর্ব বিকশিত হয়েছে। তিনি নিজেই বলেন- আমাদের ওপর দিয়ে গেছে বিশেষ করে পঞ্চাশ দশকের যারা কবি তাদের ওপর দিয়ে একটা দুর্বহ সময় বয়ে গেছে। তারা দেখেছে দাঙ্গা, ভাতৃহত্যা, দেশ ভাগ, একটা স্বাধীনতা যুদ্ধ। এই যে কতগুলো ঘটনার মধ্য দিয়ে তারা এসেছে, এতে তাদের মধ্যে একটা জিনিস তৈরি হয়েছে, সেটা কী? পঞ্চাশ দশকের কবিতার মধ্যে যাকে বলে স্বপ্ন, স্বপ্ন কম। রূঢ় বাস্তবতার কবিতা। পঞ্চাশের কবিরা, আসলে এক রূঢ় বাস্তবতা পার হয়ে আমরা এসেছি। আল মাহমুদও বাস্তবতারই এক কাহিনি। এই হলো আমাদের সময়। আমাদের সময়ের মধ্যে নিশ্বাস ফেলার কোনো সুযোগ নেই। যেটুকু কাজ আমরা করেছি এক অসহনীয় সময় আমাদের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। এটা ছিল আমার সময়। আমাদের একটা আশা ছিল। আমাদের কবিতায় একটা আশা আমরা ব্যক্ত করেছিলাম। একটা সুখী সমৃদ্ধশালী জীবন, দেশ আমরা কল্পনা করতাম। খুবই কল্পনা সেটা, কিন্তু করতাম।’[2]

ফলত, তাঁর কবিতার প্রথম পর্যায়ে যে জগৎটি নির্মিত হয়, তা মানবিক, রোমান্টিক ও সংগ্রামী এক লোকজ বাস্তবতার ভুবন; যেখানে মানুষের দুঃখ, সামাজিক বৈষম্য, প্রতিবাদ, শ্রম, অভাব এবং মুক্তির আকুতি প্রধান হয়ে ওঠে। এই সময়ে ধর্মীয় অনুষঙ্গ বা ইসলামি বিশ্বাসের প্রতিফলন তেমনভাবে দেখা যায় না; বরং তাঁর বরং, তাঁর আত্মজৈবনিক বয়ান থেকেই জানা যায়, তরুণ বয়সে তিনি সংশয়, প্রকৃতিবাদী নাস্তিকতা এবং সমাজের সব অসাম্য দূর করার বাসনায় মার্কসীয় ভাবধারার দিকে ঝুঁকে পড়েন। কমিউনিজমকে তিনি জগতের সকল সমস্যার সমাধান হিসেবে ভাবতে শুরু করেন। মার্কসবাদ অধ্যয়ন তাঁকে এমন ধারণায় পৌঁছে দেয় যে, মানবমুক্তির চূড়ান্ত পথ বুঝি এই বৈপ্লবিক সমাজব্যবস্থাতেই নিহিত। তাঁর আত্মবয়ান- আমার বয়স তখন এত কম ছিল যে, আমি জানতামই না কবিকেও শেষ পর্যন্ত একজন দ্রষ্টা হতে হয়। আমি প্রকৃতি ও নারীর চারপাশে বিচরণ করে এসবের মধ্যেই কবির সমস্ত গ্রাহ্য উপাদানকে মৌমাছির মতো অনুসন্ধানে ব্যাপৃত ছিলাম। তখন কবি হিসেবে আমার কোনো পরিণামই আমি চিন্তা করতে অভ্যন্ত ছিলাম না। প্রকৃতিবাদীরা স্বভাবতই যেমন নাস্তিকতার গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খেতে থাকে, আমারও ছিল সেই দশা। এর মধ্যে অল্প বয়েসের দরুন, যে বয়স বা সময়টাকে তোমরা তারুণ্য বলো, সেই বয়েসে অন্যান্য শিল্পী মানুষের মতো আমিও ভাবতাম সমাজের সর্বপ্রকার অসাম্যকে দূর করার আমারও একটা দায় রয়েছে। সেই দায়ভাগ বহনের কোনো ক্ষমতা আমার থাক বা না থাক আমি ভাবতে শুরু করেছিলাম কবি হিসেবে সমাজের কাছে আমার যে অলিখিত প্রতিশ্রুতি রয়েছে আমি তা পূরণ করব। এ সময় কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির সাথে আমার মেলামেশা ঘটে যারা মার্কসীয় আদর্শে আমাকে উজ্জীবিত করে তোলেন। তাদের অনুপ্রেরণায় আমি মার্কসবাদের আদিঅন্ত জানা ও বোঝার জন্য অবিশ্রান্ত অধ্যায়ন শুরু করি। অস্বীকার করব না, মার্কসীয় দর্শনের মধ্যেই তখন আমি বাস্তব ও বস্তু জগতের সমস্ত প্রশ্নের সমাধান আছে বলে উত্তেজনায় কাঁপতে থাকি এবং রাজনৈতিকভাবে কমিউনিজমকে স্বীকার করি।[3]

এভাবে তিনি দিন দিন আরও সংগ্রামমুখী ও উত্তেজক সমাজবাদী চিন্তা ও কর্তব্যের মধ্যে ডুবে যান। তিনি বলেন, আমাদের এই দ্বীপদেশের কত উত্তেজক রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্যে আমার জীবন ও কাব্যচর্চা এগিয়ে এসেছে। এর মধ্যে স্বাধীনতা যুদ্ধের কথাই ধর। এই যুদ্ধে আমি এমন উন্মুল উদ্বাস্তু হয়ে যাই যে, জীবনের আর অর্থ খুঁজে না পেয়ে একটি সংবাদপত্রের সম্পাদনার মধ্যে লিপ্ত হয়ে সমাজ পরিবর্তনের তীব্র সংঘর্ষকে আবাহন করতে থাকি। যদিও মার্কসীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার শ্বাসরুদ্ধকর স্থাণু অবস্থার কথা তখন আমার জানা হয়ে গেছে। আজ সোভিয়েত রাশিয়ায় মার্কসবাদের যে চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে প্রকঠিত হয়েছে, বিশ্বাস করো, শাহরিয়ার তা শুধু আমার গভীর অনুসন্ধানী অধ্যয়নের দ্বারা আজ থেকে ১৮ বছর আগে আমি উপলব্ধি করে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম।[4]

দুই.

১৯৭২ সালে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের অনুসারী একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী দৈনিক সংগ্রাম অফিস দখল করে দৈনিক গণকণ্ঠ প্রকাশ শুরু করলে আল মাহমুদ সেখানে সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। সরকারবিরোধী অবস্থানের কারণে গণকণ্ঠ দ্রুত ক্ষমতাসীনদের রোষানলে পড়ে, এবং একটা র‌্যাডিক্যাল সংবাদপত্র সম্পাদনা করতে গেলে যা হয়, আল মাহমুদ এর ভাগ্যেও তাই ঘটল। আল মাহমুদ কারারুদ্ধ হলেন। আর এই কারাবাসের সময়ই ঘটে তাঁর চিন্তার মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা। যে অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বিবরণ তিনি পরবর্তীতে তাঁর ‘দিনযাপন’ গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। নিজের মানসিক ও দার্শনিক রূপান্তরের কথা উল্লেখ করে আল মাহমুদ লেখেন— ‘একবার বেশ দীর্ঘ সময় আমাকে জেলখানায় কাটাতে হয়েছিল। জেলে যাবার আগে আমি বিশ্ব জগতের সৃজন রহস্যের কোনো কূলকিনারা ধরতে না পেরে দ্বিধার সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। তখন আমার অধ্যয়নের বিষয় ছিল কেবল মানবজাতির প্রগতির ধারাবাহিক বস্তুতান্ত্রিক ইতিহাস। আমি আমার দেশের দরিদ্র মানুষের সামাজিক অসাম্য ও পীড়নের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ভেবে নিয়েছিলাম যে, এর প্রতিকার বুঝি মানব নির্দেশিত শ্রেণি-সাম্যের গ্রন্থাদিতেই আছে। ঠিক ঐ সময়ে পবিত্র কুরআন অনেকটা আকস্মিকভাবে আমার হাতে আসে। আমি দারুণ কৌতূহল নিয়ে এই পবিত্র গ্রন্থখানি পাঠ করতে গিয়ে দেখি যে, বিশ্ব প্রকৃতি ও সৌরজগতের গতিময় শৃঙ্খলার দিকে আমার সম্পূর্ণ অনাস্বাদিত এই পবিত্র গ্রন্থটি এমনভাবে অদৃশ্য অঙ্গুলি নির্দেশ করছে, যা ভাষায় বর্ণনা করাও আমার মতো সামান্য কবির সাধ্যের বাইরে। আশ্চর্য যেখানে আমার মতো কবির বিভ্রান্ত হয়ে পৃথিবীর উপত্যকায় ঘুরে বেড়ানোর জ্বালাময় জীবনের কথাও লিপিবদ্ধ আছে দেখে আমি আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারছিলাম না। এই প্রথম আমার মনে হলো আমি যে বিজ্ঞানময় গ্রন্থ আমার সামনে খুলে বসে আছি তা কিছুতেই মানুষের রচিত পঙক্তিমালার আকর নয়। এর প্রতিটি বর্ণ ও বাক্যই অলৌকিক উৎস থেকে নির্গত হয়েছে এবং আমার অন্তরের নাস্তিক্যের দোদুল্যমান অসুস্থতার নিরাময়ের জন্যই উচ্চারিত হয়েছে।’[5]

এর পরের দিন সকালের পরিচ্ছন্ন আলোয় সেলের বাইরে এসে আল মাহমুদ দেখেন, বন্দিশালার সিঁড়ির পাশে একগুচ্ছ হলুদ ডালিয়া শীতের সূর্যের দিকে একটু কাত হয়ে এমনভাবে ফুটে আছে যা তার হৃদয়ে এই প্রশ্ন না জাগিয়ে পারেনি যে, অচেতন জড় প্রকৃতির কি ক্ষমতা আছে সবুজ গাছের তির্যক ডগায় এই বর্ণের অপরূপ বিভার আনন্দকে গুঞ্জরিত করার? ফলে তিনি কিছুক্ষণ বিস্মিত কবিহৃদয় নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেই পবিত্র গ্রন্থের সেই সব ইঙ্গিতকে স্মরণ করেন, যাতে বিশ্ব প্রকৃতির সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে এর এক মহামহিম সৃজনকর্তার দেওয়া অপরিসীম গুণের জয়গান করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর এভাবেই তার গোলযোগ ভরা বুকের দুলুনি আস্তে আস্তে সুস্থির হতে থাকে। তিনি তখন একটা সিজদার জায়গা খুঁজতে সেলের ভেতর ফিরে আসেন। ‘কবিতার জন্য বহুদূর’ বইতে ভোরবেলার পরিচ্ছন্ন আলোয় ফুটন্ত ডালিয়া ফুল দেখে তাঁর হৃদয়ে যে আধ্যাত্মিক আলোড়ন জাগে, সে কথা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘জেলখানায় খুব ভোরে সেলের তালা খুলে দেয়া মাত্রই বাইরে এসে দেখি আমার বারান্দার সামনে সিঁড়ির দুপাশে বেশ বড় ডালিয়া ফুল ফুটে আছে। একটি গাঢ় লাল। অন্যটি প্রগাঢ় হলুদ। উদ্ভিদ বিজ্ঞান সম্বন্ধে আমার যৎসামান্য ধারণা থাকায় আমি একেবারে অভিভূত হয়ে যাই। আমার কেন জানি মনে হলো নির্বোধ প্রকৃতির সাধ্যের সীমানা থেকে অনেক দূরের কোনো অসামান্য ইঙ্গিত ছাড়া এমন অন্তরভেদী প্রস্ফুটন এক অসম্ভব ব্যাপার।’ আল মাহমুদ বলেন, ‘আমি আমার এই ছেলেমানুষী চিন্তার কথা আমার সহবন্দি খ্যাতনামা রাজনৈতিক নেতা জনাব মশিহুর রহমানকে বলি। তিনি আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটু গম্ভীর হয়ে বলেন, ‘সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক তত্ত্বালোচনা ছেড়ে তুমি ধর্মগ্রন্থগুলো একবার পড়ে দেখতে পারো। আমি তার মুখে ধর্মের কথা শুনে একেবারে বোকা বনে যাই। এভাবেই আমার বুকের ভেতর ধর্মের কল বাতাসে নড়ে ওঠে। পরের দিনই আমি আমার স্ত্রী সৈয়দা নাদিরাকে সবগুলো ধর্মগ্রন্থ আমাকে জেলখানায় পৌঁছে দিতে বলি এবং পৃথিবীর সবগুলো ধর্মগ্রন্থের এক তুলনামূলক পড়াশোনায় আত্মনিয়োগ করি।’[6]

তিনি প্রকৃতি, নিসর্গ ও জীবনের সূক্ষ্ম গতিশীলতার মধ্যেও নতুন দার্শনিক প্রশ্নের জাগরণ অনুভব করেন- আমি নিসর্গরাজি অর্থাৎ প্রকৃতির মধ্যে এমন একটা সংগুপ্ত প্রেমের মঙ্গলময় ষড়যন্ত্র দেখতে পাই যা আমাকে জগৎ রহস্যের কার্যকারণের কথা ভাবায়। একঝাঁক পাখি যখন গাছ থেকে গাছে লাফিয়ে বেড়ায়, মাটি ফুঁড়ে বেড়িয়ে আসে পতঙ্গ ও পিঁপড়ের সারি, আর মৌমাছিরা ফুল থেকে ফুলে মধু শুষে ফিরতে থাকে আমি তখন শুধু এই আয়োজনকে সুন্দরই বলি না বরং অন্তরালবর্তী এক গভীর প্রেমময় রমণ ও প্রজননক্রিয়ার নিঃশব্দ উত্তেজনা দেখে পুলকে শিহরিত হই।… আমার মনে আদিম মানুষের মতো অতিশয় প্রাথমিক এক দার্শনিক জিজ্ঞাসা জাগে-কে তুমি আয়োজক? তুমিও কবি? না কবিরও নির্মাতা? তবে তুমি যে অনিঃশেষ সুন্দর আমি তা সাক্ষ্য দিচ্ছি। আমার সাক্ষ্য গ্রহণ করো প্রভু। এ ভাবেই আমি ধর্মে এবং ধর্মের সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ বীজমন্ত্র পবিত্র কুরআনে এসে উপনীত হয়েছি।’[7] পবিত্র কুরআনের কাছে আমি যা পেয়েছি তা মানুষের পার্থিব জীবনের পরবর্তী অন্য এক উত্থানের নিশ্চিত ধারণা। এ ধারণাই আমাকে দিয়েছে মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে বিচরণ করার এক নতুন ও চিরন্তন অর্থ।[8]

তিন.

এই পর্যায়ে আল মাহমুদের পরিষ্কার প্রত্যয় হলো, নাস্তিক মানবতন্ত্রের ভিত ভঙ্গুর। স্রষ্টাবিমুখ মানবতাবাদের দার্শনিক কাঠামো নৈতিক ভিত্তিশূন্য, আর মানুষ শুধু অর্থনৈতিক-ভৌত কাঠামোর প্রাণী নয়; তার নৈতিকতা, ন্যায়বোধ, মূল্যবোধ—এসবের শিকড় রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক বোধে। নাস্তিকতা যখন এই ভিত্তি অস্বীকার করে, তখন মানবতন্ত্রও মূল্যনিরপেক্ষ হয়ে পড়ে। অতএব, তাঁর পরিস্কার ঘোষণা— ‘কোনকালে নাস্তিকতার ওপর মানবতন্ত্র দাঁড়াতে পারে না। আমি বিশুদ্ধ নাস্তিকতার ওপর মানবতন্ত্রের সৌধ নির্মিত হতে পারে এমন তত্ত্বকথায় ঘোর অবিশ্বাসী।’[9] আর এই প্রত্যয়িত অবস্থানই তাঁকে বামপন্থি বৌদ্ধিক জগতের সঙ্গে একটি মৌলিক মতপার্থক্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। এ প্রেক্ষাপটে তাঁর সঙ্গে মতবিনিময় হয় প্রখ্যাত মানবতন্ত্রী প্রফেসর শিবনারায়ণ রায়ের সঙ্গে। রায় তাঁর কবিতার অনুরাগী হলেও আল মাহমুদের ঈশ্বরবিশ্বাসকে মানতে পারেননি। অন্যদিকে আল মাহমুদও দৃঢ় প্রত্যয়ে জানান ঈশ্বরবিহীন মানবতন্ত্র স্থায়ী নৈতিক কাঠামো নির্মাণে ব্যর্থ। নিছক নাস্তিকতার ভিত্তিতে একটি টেকসই মানবতন্ত্র গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। যদি তা সম্ভব হতো, তবে ভারতীয় বিপ্লবী দার্শনিক মানবেন্দ্রনাথ রায় নিশ্চয়ই তা প্রমাণ করতে পারতেন। কিন্তু বাস্তবতা তার বিপরীত সাক্ষ্য হয়ে নাস্তিক মানবতন্ত্রের ভঙ্গুরতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল মাহমুদ বলেন- ‘এবার এ নিয়েই প্রখ্যাত মানবতন্ত্রী প্রফেসর শিবনারায়ণ রায়ের সাথে আমার বনল না। তিনি আমার কবিতার অনুরাগী পাঠক হওয়া সত্ত্বেও আমার আস্তিকতাকে মানতে পারেন না। আমিও বিশুদ্ধ নাস্তিকতার ওপর মানবতন্ত্রের সৌধ নির্মিত হতে পারে এমন তত্ত্বকথায় ঘোর অবিশ্বাসী। তাই যদি হতো তবে তো ভারতবর্ষে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের মতো বিশ্ববিচরণশীল বিপ্লবী দার্শনিক দৈত্যই তা পারতেন। অন্য কোনো রায়কে আর ব্যর্থতার দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়াতে হতো না। কিংবা নাতির বয়েসী পুঁচকে বাঙালি ছোকড়াদের কমিউনিস্টদের খপ্পর থেকে বাঁচতে গিয়ে কার্ল মার্কসের বর্তমানে অকার্যকর কিছু তাত্ত্বিক দলিলের খুঁটিনাটি আলোচনায় অযথা কালক্ষেপ করতে হতো না। কারণ, সাম্প্রতিক কালের সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিচারে মার্কসবাদ পৃথিবীতে কোথাও এখন বিপ্লবী শক্তি নয়। অন্তত কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর নেতৃত্বে কোনো দেশে আর বিপ্লব হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং কমিউনিজম এখন পুরনো দাগি সাম্রাজ্যবাদীদের মতোই পারমাণবিক মারণাস্ত্র সজ্জিত এক আগ্রাসী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। যে শক্তি ইচ্ছে করলে আফগানিস্তানের মতো পাকিস্তান এবং পরে ভারতবর্ষকেও দখল করে নিতে পারে। আর এই যজ্ঞে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর একটাই ভূমিকা থাকবে। সে ভূমিকা হলো দালালের ভূমিকা। সাম্রাজ্যবাদকে ডেকে আনার ভূমিকা। এসব কথা কমবেশি বাংলাদেশের অল্প বয়স্ক উঠতি কবি সাহিত্যিকেরাও বোঝে। বুঝতে শুরু করেছে। অন্তত ঘটা করে বোঝাতে হয় না।[10]

বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিমণ্ডল একসময় গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ ও মার্কসবাদী রোম্যান্টিসিজমের দ্বারা। পাকিস্তান আমলে ‘লেখক শিবির’-এর মতো সংগঠনগুলো এই মতাদর্শিক উত্থানের জোয়ারে ভর করেই সৃজনশীলদের এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সেই প্রচেষ্টার ভিত ছিল দুর্বল, মতাদর্শিক অঙ্গীকার ছিল শিথিল, আর লেখকদের মধ্যে কোনো সামষ্টিক বিশ্বাস বা দৃঢ় আস্থা গড়ে ওঠেনি। কারণ তখনকার প্রগতিবাদী চিন্তার কেন্দ্র ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, আর লেখক শিবিরের ভরসা ছিল সীমিত এক চীনা বিপ্লবী রেখায়; ফলে দুই মেরুর এই অমিল সৃজনশীল কাঠামোয় স্থায়িত্ব আনতে পারেনি। পরে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়, তার গোপন ভেতরকার নিষ্ঠুরতা—মানবাধিকার লঙ্ঘন, শিল্পী-কবি-সাহিত্যিকদের নিপীড়ন, সাইবেরীয় গুলাগ—সবই হঠাৎ প্রকাশিত হয়ে পড়ল। মানবতার নামে প্রতিষ্ঠিত এক ব্যবস্থার নিষ্ঠুর মুখোশ উন্মোচিত হলে প্রগতিবাদী লেখক-শিল্পীদের দীর্ঘদিনের নৈতিক অবস্থানও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আল মাহমুদ লেখেন-

পাকিস্তান আমলে লেখক শিবির দেশের সকল লেখকদের সংঘবদ্ধ করতে পারেননি। কারণ চীনের বিপ্লবী মতাদর্শের ওপর খুব কমই ভরসা ছিল শিবিরের সাম্প্রতিক মিছিল মিটিংয়ে অংশগ্রহণকারী লেখকদের। তখন তো সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল। আর সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল এদেশের এবং তৃতীয় বিশ্বের প্রগতিবাদী লেখকদের স্বর্গ। সে স্বর্গ বেশিদিন হয়নি ভেঙে পড়েছে। এখন রাশিয়া বলে যে দেশটি আছে সে দেশটিকে কোনো প্রগতিবাদী লেখকই আর স্বর্গ বলে ভাবেন না। ঐ দেশের নামটাই এখন প্রগতিবাদী লেখকদের কানে বিষের মতো লাগে। মনে হয় বিশ্বগোলকে ঐ দেশটির অস্তিত্ব না থাকলেই এখানকার প্রগতিবাদী মার্কসীয় লেখকগণ সবচেয়ে খুশি হতেন। কোনো কিছু ভেঙে গেলে কিংবা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলে এর নাড়িভুড়িও বেরিয়ে পড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নের নাড়িভুড়ি সহসা বেরিয়ে এসেছিল বলে আমরা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দুর্গন্ধময় ভেতরটা দেখতে পেয়েছি। আমরা কি দেখেছি? আমরা দেখেছি নরকের চেয়েও ভয়াবহ এক মানবতা বিধ্বংসী কারাগার। লক্ষ লক্ষ নরনারীর মৃত মুখের মিছিল। শিল্পী-বিজ্ঞানী-সাহিত্যিক-কবিদের জ্যান্ত ফ্রিজ করে রাখার জন্য সাইবেরীয় নির্বাসন ব্যবস্থা। পৃথিবীতে কখনো কোনো নিপীড়ক ব্যবস্থাই সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো এত বেশি কবি হত্যা করেনি। অথচ এ ব্যবস্থাকে তখন সমর্থন করে চলেছেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মার্কসবাদী কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক গোষ্ঠী। এরা সকলেই ছিলেন মানবতার দুশমন যোসেফ স্ট্যালিনের সমর্থক। তুরস্কের কবি নাজিম হিকমত, চিলির কবি পাবলো নেরুদা, ভারতের কবি সুভাস মুখোপাধ্যায়, পাকিস্তানের ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, স্পেনের পারী প্রবাসী শিল্পী পাবলো পিকাসো, আমেরিকান নিগ্রো গায়ক পল রবসন এবং ঔপন্যাসিক হাওয়ার্ড ফাস্ট এরা ছিলেন সোভিয়েত ব্যবস্থা এবং স্টালিনবাদের অন্ধ ভক্ত। এই সমস্ত লেখক শিল্পীগণ এখন আর পৃথিবীতে বেঁচে না থাকলেও এরাই ছিলেন সারা পৃথিবীতে মার্কসীয় সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েত কম্যুনিস্ট পার্টির শতাব্দীব্যাপী মানব সংহারযজ্ঞের আন্তর্জাতিকভাবে নৈতিক সমর্থনদাতা। আর তাদের দেখাদেখি উন্নয়নশীল দেশগুলোর অসংখ্য প্রগতিবাদী লেখক-শিল্পী, যাদের বলা হত আফ্রো-এশীয় লেখক গোষ্ঠী, এরা সকলেই ছিলেন ঐ সংহারযজ্ঞেরই সমর্থক। তাদের প্রতিটি কবিতা, গল্পে, উপন্যাসে তারা সোভিয়েত ধরনের সমাজতন্ত্রেরই নির্লজ্জ পক্ষপাত করে মানবতা ও সাম্যের নামে কমিউনিস্ট কসাইবৃত্তিরই জয়গান করে গেছেন। আজ বিশ্বব্যাপী এদের সাহিত্য প্রকৃতপক্ষে পরিত্যক্ত। পূর্বে ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর গণতান্ত্রিক বিপ্লব মুহূর্তের ঘটনাধারা যারা প্রত্যক্ষ করেছেন তারা জানেন ঐ সব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কি ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে মার্কসবাদী লিটারেচার পাঠাগার থেকে ময়দানে স্তূপীকৃত জ্বালিয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ মার্কসবাদী কবিতার সংগৃহীত পাণ্ডুলিপি ড্রেনের ময়লা পানির স্রোতে ভাসিয়ে দিচ্ছেন এমন ঘটনাও আমরা কেসেটে দেখেছি।[11]

আল মাহমুদ বলেন- তথাকথিত মার্কসবাদী লেখক বলে কোনো সৃজনশীল লেখক বা কবি এখন পাশ্চাত্যে বিরল। তবে ল্যাটিন আমেরিকায় এবং আমাদের দেশে লেখক শিবির জাতীয় কিছু প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়ায় নৈতিকভাবে পরাজিত কিছু মার্কসবাদী লেখক-শিল্পী গণতন্ত্রের ধ্বজার নিচে সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছেন। এরা তৃতীয় বিশ্বের প্রতিটি দেশেই একটু দিশেহারা অবস্থায় কালযাপন করছেন। এদের তত্ত্বগত ব্যর্থতা, বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সুযোগ গ্রহণের চেষ্টা এবং ভগ্নহৃদয়ের প্রলেপ হলো, মার্কসীয় তত্ত্ব এক বৈপ্লবিক সমাজ বিবর্তনের বস্তুতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা। এ সত্য হলো বৈজ্ঞানিক সত্য। পুঁজিবাদীদের ষড়যন্ত্রে আপাত অঘটনে এ ব্যবস্থা পর্যুদস্ত হলেও সমাজতন্ত্র অপরাজিত। আবার ফিরে আসবে। তবে ফিরিয়ে আনার জন্য লেখক শিবিরের ছত্রছায়ায় সম্মিলিত লেখক-বুদ্ধিজীবীগণ কিসের ওপর জোর দিচ্ছেন তা অবশ্য বোঝার উপায় নেই। তিনি বলেন- সমাজতান্ত্রিক শিবির, তাদের চিন্তাধারাকে তারা বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা বলে প্রচার করে থাকেন। কিন্তু তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তই হলো কাল্পনিক, তারা জনগণের ধর্মকে যতটা ভয় পান, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-লুণ্ঠনকে তেমন কিছু একটা মর্মান্তিক বিষয় হিসেবে উপলব্ধি করেন না। অথচ তাদের ঘোষিত যুদ্ধটা নাকি পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদেরই বিরুদ্ধে। যেন ঘোষণাই বড় কথা। লড়াই নয়। তাদের মধ্যেও ঐক্য নেই। তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রুপে বিভক্ত। আত্মতৃপ্তিতে ভরপুর। তারা বিপ্লব ডেকে আনার চেয়ে বিশ্রামের আলাপচারিতায় বেশি সুখ পান।[12] তাদের সদস্যগণের সৃজনশীল কর্ম সম্প্রতি প্রায় নিঃশেষিত। আর যারা এখনো সক্রিয়, মানে একটি দুটি রচনা যাদের পত্র-পত্রিকায় আমরা দেখতে পাই, সেখানে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের গন্ধ দূরে থাক পুঁজিবাদের উপাসনাই বেশি। নাকি তথাকথিত প্রগতিবাদী লেখকদের এখন পুঁজিবাদই অন্তিম আদর্শ হয়ে উঠেছে? কম্যুনিস্ট পার্টির দ্বারা যে কোনো দেশের আর বিপ্লব সম্ভব নয়, এটা লেখক শিবিরভুক্ত লেখক ও ভবিষ্যৎদ্রষ্টাগণ কমবেশি বোঝেন বলেই ধারণা করি।[13]

‘পুঁজিবাদের বিনাশের পর সমাজতন্ত্র আসবেই’- এ ধরনের আত্মপ্রসাদে ভোগা বাংলাদেশের মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবীদের স্বপ্ন-বিলাসের সমালোচনা করেন আল মাহমুদ। এর অসারতা ও অসাম্ভব্যতা জাহির করেন এই বাস্তবতার নিরিখে যে, এরা এখন সাম্রাজ্যবাদী বিচরণশীল পুঁজি এবং এনজিওনির্ভর। অথচ এসব এনজিওকেই একসময় তারা সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ট আখ্যা দিতেন। এখন পরিস্থিতি এতদূর যে, যেমন আল মাহমুদ জানান- ‘আমাদের দেশের সর্বশ্রেণির মার্কসিস্ট বুদ্ধিজীবীরাই এখন সাম্রাজ্যবাদী বিচরণশীল পুঁজির পদানত। এ দেশের লেখক শিবিরের ছত্রছায়ায় মিছিল মিটিংকারীদেরও কেউ কেউ তাদের রুজি-রোজগারের, আহার-বিহার আদর্শের কেন্দ্র এখন এনজিওসমূহ। অথচ লেখক শিবিরের তাত্ত্বিক নেতৃবৃন্দের নিশ্চয় জানা আছে এই এনজিওগুলোকে কিছুদিন আগেও তথাকথিত প্রগতিবাদী বাগাড়ম্বরকুশলী প্রাক্সিসপন্থীরা সাম্রাজ্যবাদীদের এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এখন এমনকি ঘটল যাতে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের অনুচরদের ঘাঁটিগুলোতে মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবীরাও চাকরবাকরের কাজ করতে পারলে তাদের মানবজন্মকে সার্থক ভাবছে? আর ঐসব সাম্রাজ্যবাদী অনুচরদের কেন্দ্রগুলো অর্থাৎ পাশ্চাত্য এনজিওগুলো এখন প্রাক্তন কমিউনিস্ট কর্মী, মার্কসবাদী অধ্যাপক, লেখক-শিল্পী-সাহিত্যিক এবং এককালের আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টিকর্মী, নেতা ও তাত্ত্বিকদের ছাড়া চাকরি দিতে চায় না! আত্মবিক্রয়কারী গোলামির কদর পুঁজিবাদীরাও কম বোঝে না।’[14]

এই পর্যায়ে আল মাহমুদ স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘প্রগতিবাদীদের একটি বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা উচিত যে, যে পুঁজিবাদ ধ্বংস করে একদিন সমাজবাদের উত্থান হবে বলে তাদের অন্তরে এবং মস্তিষ্কের গোপন কোঠরে অলীক স্বপ্ন লুক্কায়িত রেখেছেন, সেই পুঁজিবাদীরাই এখন আর মার্কসবাদীদের ধনতন্ত্রের পথের কাঁটা বা মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রতিবন্ধক মনে করে না। বরং মনে করে যতক্ষণ এরা বস্তুবাদ তথা নাস্তিক্য ইউটোপিয়াসমূহের বৈপ্লবিক চর্চাকারী থাকবে, ততক্ষণ এদের দিক থেকে কোনো বিপদ আসার সম্ভাবনা পৃথিবীর কোথাও নেই।’ এর বিপরীতে, পুঁজিবাদের বিপদ হিসেবে আল মাহমুদ ইসলামের বৈপ্লবিক সম্ভাবনার কথা ব্যক্ত করেন- তার মতে, ‘এই বিপদ আনতে পারে বৈপ্লবিক আস্তিকতা, সুষম বণ্টন, বর্ণভেদ সংহার এবং নারীকে যৌনপণ্য হিসেবে প্রচারে বাধাদানকারী কোনো ধর্ম। আর পুঁজিবাদীরা উত্তমরূপে জানে সে ধর্মের নামই ইসলাম। কেবল ইসলামই পারে ধনতন্ত্রের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিয়ে বিশ্বে এক কল্যাণময় অখণ্ড মানববসতির প্রবর্তন করতে।[15]

অর্থাৎ আল মাহমুদ বলতে চান, পুঁজিবাদের প্রকৃত প্রতিপক্ষ আজ মার্কসবাদ নয়; বরং ইসলামি বিশ্বদর্শন। কেন নয়, পুঁজিবাদের বিপরীতে ইসলামই মুক্তবাজারের অমানবিক দারিদ্র্য-বিনির্মাণ প্রকল্পকে চ্যালেঞ্জ করে, নারীর পণ্যায়নকে অস্বীকার করে এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার নৈতিক-আধ্যাত্মিক শক্তি ধারণ করে। যদিও, ‘এদেশে রাজনৈতিক বিপ্লবী শক্তি হিসেবে ইসলামের যে উত্থান সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে সে সম্ভাবনাকে প্রতিরোধ করার জন্যই এদেশের রাজনৈতিকভাবে দেউলে এবং সামাজিকভাবে কর্মহীন বেকার কমিউনিস্টদের পুঁজি করে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী ইহুদীবাদী এবং ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীরা নীলনকশা ফেঁদেছে।’ কিন্তু, এ নীলনকশা নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন বিধায় ব্যর্থ হতে বাধ্য, যেমন আল মাহমুদ জানান- ‘তাদের কাছে প্রথম প্রতিবন্ধক হলো ইসলামি রাজনীতি। দ্বিতীয় প্রতিবন্ধক মুসলমানদের বিপুল সংখ্যাশক্তি এবং তৃতীয় প্রতিবন্ধক হলো আলেম সমাজের চৌদ্দশত বছরের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা ও জনগণের ওপর বিপুল প্রভাব।’[16] আল মাহমুদ বলেন- বাংলাদেশের উদ্ভব ও প্রতিষ্ঠা কারো দয়ার দান নয়। আল্লাহর মহা অনুগ্রহে এবং এদেশের মানুষের ব্যাপক রক্ততর্পণ ও আত্মত্যাগের পুরস্কার হলো আমাদের এ বাংলাদেশ। এর অনিষ্ট সাধনের জন্য যত ষড়যন্ত্রই হোক তা সফল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আমি দেখি না। এর প্রধান কারণ হলো ১৫ কোটি মানুষকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো অস্ত্রশক্তি, পরাশক্তি পরাভব মানাতে পারবে না।[17] আল মাহমুদের বিবেচনায় এদেশের জনগণের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যই তাদের সর্বপ্রকার আধিপত্যের জুলুম থেকে আলাদা থাকার প্রেরণা যোগাচ্ছে। যেভাবেই দেখা হোক ইসলাম হলো এদেশের সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি। এদেশে যেসব লেখক ইসলামি আন্দোলনকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য নানা আক্রমণাত্মক কারসাজিতে মত্ত, তাদের একটা কথা উপলব্ধি করতে বলি। পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের চালের নিচে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ প্রক্রিয়াকে প্রতিহত করার মতো ইসলাম ছাড়া সম্প্রতিকালে আর কোনো মানবিক আদর্শ আছে কি? যখন অবশিষ্ট সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো নিজেদের জনগণের অর্থনৈতিক দুরবস্থা মোচনের জন্য খোলাখুলিভাবেই পুঁজিবাদের খোলা বাজারনীতি গ্রহণ করেছে। তাছাড়া এ লক্ষণ এখন স্পষ্ট যে, যেসব দেশের সংখ্যাগুরু অংশই মুসলমান এবং ইসলামি সামাজিক ও পারিবারিক আবহাওয়ায় লালিত, সেসব দেশে আগামী শতাব্দীতেই ইসলামি রাষ্ট্র শাসন ব্যবস্থা গোড়াপত্তন হবে।’[18]

আল মাহমুদ বলেন- বাংলাদেশে ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমে বহুবিধ প্রতিবন্ধকতার কথা আমরা অস্বীকার করি না। সবগুলো প্রতিবন্ধকতাই বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক। সামাজিক বাধা একেবারে নেই একথা হয়তো সত্য নয় তবে খুবই কম। সাধারণ মানুষ তাদের জন্য ইসলামি রাষ্ট্রেরই স্বপ্ন দেখে। যদিও তারা ভাবে এটা এক দূরতম স্বপ্ন। কিন্তু গত এক দশকের ইসলামি আন্দোলনের গতি প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয় না সময়টা অতি দীর্ঘ হবে। ত্যাগ তিতিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সঞ্চয় নিয়ে বাংলাদেশের আন্দোলন এর গণতান্ত্রিক পর্যায়গুলো অতিক্রম করছে, তা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। কেবল একটা দিকেই ইসলামি আন্দোলন জনগণের চাহিদা অনুযায়ী যথাযথভাবে সংগঠিত হয়ে উঠতে পারেনি। আর সেটা হলো সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং সাহিত্য ক্ষেত্রে ইসলামি আদর্শের নব তরঙ্গ সৃষ্টি।[19]

আমরা জানি, বাংলাদেশের সাহিত্য–সংস্কৃতির পরিসরে ইসলামি আদর্শকে প্রান্তিক করে রাখার প্রচেষ্টা নতুন নয়; বরং এর পেছনে দীর্ঘদিনের সংগঠিত বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক কৌশল কাজ করেছে। ইসলামের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ লেখক–শিল্পীদের ‘প্রতিক্রিয়াশীল’, ‘মৌলবাদী’, ‘সাম্প্রদায়িক’হিসেবে চিহ্নিত করা, এই কৌশলের প্রধান উপাদান। লক্ষ্য ইসলামি আদর্শ-কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক শক্তিকে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। এই বাস্তবতা তুলে ধরে আল মাহমুদ বলেন- বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি সমাজসেবা সর্বক্ষেত্রে ইসলামি আদর্শবাদিতাকে বিচ্ছিন্ন রাখার জন্য বৈরী শক্তি একটা কৌশল অবলম্বন করে থাকে। সেই কৌশলটা হলো ইসলামি আদর্শে সমর্পিত লেখক ও শিল্পীদের ‘মৌলবাদী’ ও সাম্প্রদায়িক বলে চিত্রিত ও চিহ্নিত করা। তথাকথিত প্রগতিশীলতার যুগে ইসলামি আদর্শের সৈনিকদের বলা হতো প্রতিক্রিয়াশীল। এখন যেহেতু প্রগতিশীলদের স্বর্গরাজ্যগুলো বিনা তুফানেই ভেঙে গেছে এবং প্রগতিবাদীরা বুর্জোয়া গণতন্ত্রের ভেক ধরেছে। এখন আর অন্যকে, বিশেষ করে ইসলামি সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে প্রতিক্রিয়াশীল বলে উল্লেখ করা চলছে না। কোথায় যেন এতে ওদের জন্য লজ্জার কিছু একটা আছে। ফলে এখন আমদানি করা হয়েছে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা শব্দ দুটি।[20] এভাবে তারা পুরোনো ভাষ্য ও বয়ান বদলে নতুন নতুন তকমা ও ট্যাগ চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার পুনর্গঠিত প্রচেষ্টা জারি রাখে।

আল মাহমুদ প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কৌশলগত অবস্থান ব্যাখ্যা করেন এভাবে- এ দেশের ছাত্র নির্ভর প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন সবসময়েই ইসলামি আন্দোলনের সাথে আদর্শগত সংঘাত এড়াবার জন্য কিংবা ইসলামি আন্দোলনের কর্মীদের থেকে ছাত্র ও যুবকদের দূরে রাখার জন্য অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করে এসেছে। এই সতর্কতার পেছনে আছে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি ও মার্কসবাদী কূটবুদ্ধি। যে যাই বলুক পাশ্চাত্য জীবনের মোহে আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণি ইসলামের প্রতি পোশাকে-আশাকে এক ধরনের অবজ্ঞার পরিচয় দিলেও অন্তর থেকে ইসলামকে মুছে ফেলার কোনো প্রকাশ্য চেষ্টা করেনি। বরং মুসলমানদের দুর্দিনে ও দুর্যোগ মুহূর্তে তারা ইসলামেরই পক্ষ অবলম্বন করেছে। এ কথা প্রগতিবাদী ইসলাম বৈরীদেরও অজানা নয়। এ জন্যই তারা তাদের দ্বারা মোহগ্রস্ত মুসলিম ছেলে-মেয়েদের ইসলামি আন্দোলনের নেতৃত্ব কর্মীবাহিনী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখার কৌশল অবলম্বন করে এসেছে। এখনো এ কৌশলই তাদের একমাত্র অবলম্বন।[21]

তবে তিনি ইসলামি দাওয়াহ আন্দোলনের ভেতরেও একটি দুর্বলতার দিক লক্ষ্য করেন। তিনি বর্হির্বিশ্বের সাথে তুলনা করে দেখান সেখানকার ইসলামি আন্দোলনের কর্মীরা প্রতিপক্ষ বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন দৃঢ় সাহস নিয়ে। এর ফলেই বহু নামকরা চিন্তক–শিল্পী ইসলাম গ্রহণ করেছেন। সরাসরি সংলাপ, মানবিক সংযোগ, আদর্শিক বিশ্বাসের যুক্তি-শক্ত উপস্থাপন, সাহসী ও অন্তর্মুখী দাওয়াহ চেষ্টা- বাংলাদেশে এই ধরনের দাওয়াতি চর্চা দুর্বল বা প্রায় অনুপস্থিত। ফলে ইসলামের সৌন্দর্য দেখার সুযোগ না পাওয়ায় অনেক সম্ভাবনাময় শিল্পী-বুদ্ধিজীবী ইসলাম থেকে দূরে রয়েছেন। তাঁর বয়ান- ‘এখানে ইসলামি আন্দোলনেরও খানিক দুর্বল দিকের উল্লেখ করতে হয়। তারা ইসলাম বৈরী সাংস্কৃতিক আবহাওয়া ও রাজনৈতিক শত্রুতা থেকে নিজেদের সযত্নে সরিয়ে রাখার জন্য সচেষ্ট থেকেছে। ফলে একটা দেয়াল সব সময় থেকেই গেছে। অথচ অন্যান্য দেশে ইসলামি আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মতৎপরতার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা সর্বদাই বৈরী বা প্রতিপক্ষকে ইসলামের দাওয়াত দিতে সর্বাধিক ত্যাগ স্বীকার করেছে এবং এমনসব নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবী ও কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীকে ইসলামের দিকে টেনে নিয়ে এসেছে, যা ছিল সকলের কাছেই অভাবনীয়। আজ যে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সুপরিচিত ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অনেক লেখক ও শিল্পী ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং ইসলামকেই তাদের ধ্যানজ্ঞানরূপে গ্রহণ করেছেন এই সাফল্যের সবটুকুই দুঃসাহসী দাওয়াতের পুরস্কার।’ তিনি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন- আমাদের দেশে আমরা এই দাওয়াতের পদ্ধতিটির উপযুক্ত প্রয়োগ নিয়ে মাথা ঘামাইনি বলেই ইসলাম বৈরী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের এবং তরুণ-তরুণীদের থেকে দূরে অবস্থান নিয়েছি। ইসলামের বিপক্ষ শক্তি বলে আমাদের মনে এদের প্রতি এক ধরনের বিশেষ সতর্কতা ও বিরূপতা আছে। ফলে দেয়াল ভেঙে অন্তরে প্রবেশের কোনো রাস্তা দেখা যাচ্ছে না। আমার মনে হয় আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মতৎপরতাও খানিকটা গা বাঁচিয়ে চলার নীতিই গ্রহণ করেছে। অথচ অন্যান্য পাশ্চাত্য দেশের মতো দাওয়াতের সুফল হয়তো আমরাও পেতাম। আমরা মনে করি আমরা মুসলমান আর সবই বাতিল। দোজখের লাকড়ি। অথচ বৈরী শক্তির কাছে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য আমরা তুলে ধরিনি। আকর্ষণ করিনি আল্লাহর নিয়ামত পবিত্র কুরআনের দিকে। রসুল (সা.)-এর কোনো মহৎ দৃষ্টান্তের কথা উল্লেখ করে আমরা কারোর হাত ধরে টানিনি। হয়তো তেমন দাওয়াত দিলে এদের অনেকেই ইসলামের দিকে ফিরে আসত। আমরা করিনি তাই আমরা সফলও হইনি। কে জানে হয়তো উপযুক্ত দাওয়াত পেলে এমন অনেক বুদ্ধিজীবীকে আমরা ইসলামি আন্দোলনের পুরোভাগে দেখতে পেতাম যাদের বিষয়ে আমাদের কঠোর অবজ্ঞা আছে।[22]

চার.

আশির দশক থেকে আল মাহমুদের চিন্তা ও সৃষ্টিতে এক সুস্পষ্ট রূপান্তর দেখা যায়। এ সময় দৃশ্যমান হয়ে ওঠে তার বৌদ্ধিক ও আত্মিক রূপান্তর। তাঁর সৃজন-সাধনা এক নতুন গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হয়, যেখানে ঈমান, আধ্যাত্মিকতা, মুসলিম পরিচয়, তাওহিদের দর্শন ও নৈতিকতা হয়ে ওঠে কাব্য-সাহিত্যের স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্য, যা তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং দীর্ঘ আত্মসংকট পেরিয়ে আসা এক পরিণত দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। এ প্রসঙ্গে ‘আমি, আমার সময় এবং আমার কবিতা’ শীর্ষক প্রবন্ধে কবি জানান- ‘আমার একটা বই আছে ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’, এখানে এসে আমার আগের বিশ্বাস দৃঢ়মূল হওয়ার চেষ্টা করেছে। মায়াবী পর্দায় এসে আমি গভীরভাবে ইসলামের প্রতি আমার বিশ্বাস ব্যক্ত করেছি। আমি যখন এই বইটা লিখি, তখনো অচিন্তনীয় ছিল যে সোভিয়েত রাশিয়া তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে যাবে। আমি মনে করি যে, আগামী পৃথিবী যেদিকে যাচ্ছে তাতে মুসলমানদের আলাদা একটা পৃথিবী তৈরি হতে যাচ্ছে। একটা স্বতন্ত্র সভ্যতা। আগেও যেমন ছিল মুসলমানদের স্বতন্ত্র সভ্যতা কিন্তু এখন একটা আন্তর্জাতিক রূপ নিয়ে। মুসলমানরা পৃথিবীর অন্যান্য মানুষ থেকে আলাদা একটা জীবন বিধান নিয়ে স্বতন্ত্র হয়ে যাবে। যতই মৌলবাদী বলে স্বতন্ত্র হয়ে যাওয়াটাকে ঠেকানোর চেষ্টা করা হোক, এটা সম্ভবপর হবে না। খ্রিষ্টীয় জগৎ বা ইহুদিদের জগৎ কিংবা আধুনিক নাস্তিকতায় অনুপ্রাণিত যে জগৎ তার থেকে স্বতন্ত্র একটি জগৎ রচনা করবে ইসলাম।[23]

তিনি বলেন- পৃথিবীর একশো বিশ কোটি মানুষ যদি মনে করে যে তারা একটি জাতি, তারা এটা হতে যাচ্ছে বলে আমার মনে হয়। স্বতন্ত্র থাকবে ইসলাম। তবে তারাই বিশ্ব জয় করে নেবে এটা আমি বলতে চাই না, কিন্তু মুসলমান মুসলমানদের মতো থাকার জন্য পৃথিবীটাকে আলাদা করে ফেলেছে। যেমন ধরুন মুসলমান মেয়েদের কথা বলছি। মুসলমান মেয়েরা কেমন? পাশ্চাত্য চিন্তাধারা নারীর স্বাধীনতা, নারীর ক্ষমতা ইত্যাদি নিয়ে চিন্তা করছে। কিন্তু একটা কথা কেন ভাবে না মুসলমানরা যে একশো বিশ কোটি রয়েছে তাদের মেয়েরা একটু অন্যরকম, তারা তাদের জীবন ধারণ প্রণালি তাদের স্বাধীনতা, তাদের চলাফেরার ভঙ্গি, তাদের নিজকে আচ্ছাদিত করার পদ্ধতি এগুলো এসেছে বিশ্বাস থেকে। স্বতন্ত্র সভ্যতার একটি বিষয়রূপে। কেউ কাউকে জোর জবরদস্তির কিছু নেই এখানে, একটি গ্রন্থের দ্বারা তারা পরিচালিত হয়, পবিত্র কুরআনের দ্বারা। রসুল (সা.) এর হাদিস, নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদির মাধ্যমে এরা জীবন প্রণালি গঠন করে। পৃথিবীর একশো কোটি মানুষের মধ্যে কোনো না কোনো ভাবে কুরআন বা রসুল (সা.) এর নির্দেশের প্রভাব রয়ে গেছে। প্রত্যেকদিন বা প্রতি মুহূর্তে তারা তা মেনে চলে, জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে। এই যে স্বতন্ত্র জগৎ তারা রচনা করবে এটা অনেকেই বলেছেন। পাশ্চাত্যের এক পণ্ডিতের গবেষণায় পড়েছি যে, কমিউনিজমের পরে ইসলাম পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধে এগিয়ে যাচ্ছে বা সাংঘর্ষিক। আমি এটা মনে করি না, পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে সংঘর্ষে ইসলাম কোনো রকমেই যেতে চায় না, কারণ পাশ্চাত্য সভ্যতাকে সে তো প্রথম থেকেই মানেনি। এ জীবন ধারাকেই মুসলিমরা স্বীকার করেনি কখনো। সংঘর্ষ বেধেছে যদি বেধে থাকে সেটা অনেক আগেই। এটার আর প্রকাশ্য রূপের কোনো প্রয়োজন নেই। আর পৃথিবীটা আজ সেদিকেও না। আমার মনে হয় যে মৌলবাদী বলে মুসলমানদের ঠেকানোর চেষ্টা করা বুদ্ধিমানের কাজ না। মুসলমানরা একটা স্বতন্ত্র পৃথিবী রচনা করতে যাচ্ছে। একজন মুসলমান তিনি যদি ইয়োরোপেও থাকেন তবুও তিনি স্বতন্ত্র পৃথিবীর অন্তর্ভুক্ত থাকবেন মানসিকভাবে। এই যে আলাদা একটা পৃথিবী তৈরি করতে যাচ্ছে মুসলমানরা এর জন্য তো সাংস্কৃতিক Background তৈরি হতে যাচ্ছে, তাদের কবিতা তাদের Modernity এগুলো আমি মনে করি যে সেই স্বতন্ত্র পৃথিবীর প্রস্তুতি পর্বের কবিরা মুসলমানদের মধ্যে জন্ম নিয়েছে। আমি হয়তো তাদের দলভুক্ত হব। যারা বিচার করবেন তারা হয়তো সেভাবে অন্তর্ভুক্ত করবেন। এটিই আমার আদর্শ এটিই আমার বিশ্বাস যে, আলাদা পৃথিবী গড়ে নেবে মুসলমানরা, এটাকে বলা হবে ইসলামিক ওয়ার্ল্ড। সারা পৃথিবীতে মানসিকভাবে এটা তৈরি হবে, অর্থনৈতিকভাবে এটা তৈরি হবে, সামাজিকভাবেও এটা তৈরি হতে যাচ্ছে।[24]

কিছুদূর অগ্রসর হয়ে আল মাহমুদ বলেন- এই যে Post modernism- এর কথা বলা হচ্ছে, এটা হলো আধুনিকতার বিরুদ্ধে আধুনিক দর্শনের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে, মার্ক্সবাদের বিরুদ্ধে, পুঁজিবাদী ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, একটা প্রতিশোধার্থক আওয়াজ। আমরা প্রতিশোধমূলক হয়ে থাকতে চাই না। আমরা আমাদের একটা জগতের, একটা দর্শনের, একটা বিশ্বাসের ভিত্তিমূল খুঁজে পেয়েছি। সেখানে আমরা পৌঁছাতে চাই। এটাও Post modernism এবং এটাও আবার নতুন করে চিন্তা করলে একটা নতুন সভ্যতার নতুন দর্শনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমি মনে করি সেদিকে আমাদের কবিতা অগ্রসর হচ্ছে এবং আমাদের যে সময় অতিবাহিত হয়েছে সে সময়ের একটা বিকশিত সত্য তরুণদের মধ্যে এসে হয়তো ঠাঁই করে নেবে। যেমন খুব দ্রুত বদলে গেছে এখানকার পটভূমিও। কিছুদিন আগেও জগতের অধিকাংশ তরুণ কবি ছিল মার্ক্সবাদী। মার্ক্সবাদী না হলে যেন একজন মানুষ কবি বা সাহিত্যিক বা শিল্পী হতে পারে না এরকম একটা ধারণা ছিল। এখন এই ধারণা নেই কেন? এই ধারণা এখন বদলে গেছে। তাহলে এরকম হঠাৎ একদিন বদলে যাবে, আমি মনে করি যে এখনকার কবিরা তখন নিজের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে। নিজেদের ঐতিহ্যের প্রতি, নিজের ধর্মের প্রতি, নিজের ঐতিহ্য, পুরাণ, গাথা ইত্যাদির প্রতি সংস্কৃতির প্রতি বিশ্বাস ফিরে পাবে। তরুণ কবিদের ব্যাপারে আমার বিশ্বাস, একদা কুরআনকে তারা আঁকড়ে ধরবে বাঁচার জন্য এবং কুরআনকেই তারা প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে।[25]

বিশ্বরাজনীতির বৃহত্তর অঙ্গনে ইসলামবিরোধী নানা ষড়যন্ত্র আজো সক্রিয় হলেও, ইসলামকে এদেশে নানা অভিজ্ঞাতে তালগোল পাকিয়ে ফেলা হলেও, আল মাহমুদ বিশ্বাস করেন, এই বিরোধিতা আগের মতো কার্যকর নয়, এই ষড়যন্ত্র সফল হবার নয়। কারণ, ‘ইসলাম পাশ্চত্যে ও বিশ্ব শাসকদের আবির্ভাব ক্ষেত্রগুলোতে এখন আর আগের মতো আত্মরক্ষার লড়াইয়ে লিপ্ত নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে লিপ্ত। সেখানে মানুষের জ্ঞান এবং অনুসন্ধিৎসা ক্রমাগত ইসলামকে জানতে ব্যাকুল হয়ে পড়েছে। ইসলামকে ধ্বংস করার প্রয়াসের পাশাপাশি ইসলামকে জানার যে আকাঙ্ক্ষা বুদ্ধিমান নর-নারীকে আকৃষ্ট করছে, সেটাই আমার বিচারে প্রকৃত জিহাদ। লড়াই যখন জ্ঞানের লড়াইয়ে পর্যবসিত হয়, তখন সব মারণাস্ত্রই একটু একটু করে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে এটাই আমার ধারণা। বিশ্বের সামনে মানুষের জীবনের জন্য ইসলামের বিকল্প নেই তা বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে একদিন নির্ভুলভাবে প্রমাণিত হবে। সব পর্যায়ই মুসলমানদের অতিক্রম করে আসতে হয়েছে। ইমানদার মানুষকে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। তাদের দেহ শেয়াল আর শকুনের খাদ্যে পরিণত করা হয়েছে। কিন্তু সবকিছু ইসলামের অনুসারীরা অতিক্রম করে এমন এক জায়গায় উঠে আসতে সক্ষম হয়েছে, যখন আর পেশিশক্তির করণীয় কিছু নেই। বারুদ এবং গন্ধক জ্বালিয়ে পুড়িয়ে এখন স্তব্ধতায় পর্যবসিত। মানুষের বিবেক এবং মস্তক ছাড়া যখন আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না তখন এ বাণী সত্য হয় যে ‘ইসলাম জিন্দা হোতা হেয়-হর কারবালা কি বাদ।’[26]

আল মাহমুদ তাঁর নিরীক্ষায় দেখান যে বাংলাদেশের অস্তিত্বের মূলে রয়েছে ধর্ম, এবং এ কেবল ইতিহাস বা সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা নয়, বরং জাতির আত্মপরিচয়ের গভীরে প্রোথিত এক বাস্তবতা। তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে এই ধর্মনির্ভরতা আরও দৃঢ় হবে এবং জাতির সামগ্রিক চিন্তা, সংস্কৃতি ও সামাজিক গতিশীলতার একটি কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ শঙ্কার কথাও উল্লেখ করেন। ধর্মীয় নেতৃত্বে প্রয়োজনীয় বিবর্তন না ঘটলে এই ধর্মনির্ভরতা মাঝপথে থমকে যেতে পারে। অর্থাৎ ধর্ম জনমানসে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা জাতিকে বিপথে নেয়ার আশঙ্কা রাখে। তাঁর বয়ান- বাংলাদেশের অস্তিত্ব ধর্মনির্ভর। এই নির্ভরতা সামনের দিনগুলোতে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকবে। তবে ধর্মীয় নেতৃত্বে কোনো বিবর্তন না ঘটলে সেটা মাঝপথে ঝুলে থাকতে পারে। এখানকার ধর্মীয় নেতৃত্বের একটা বড় অংশ কখনো প্রসন্নচিত্ত বলে আমার মনে হয়নি। কেবল ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণচেতা জাতিকে পথ দেখাতে পারে না। অতঃপর বিবেচনাহীন ধর্মীয় নেতৃত্ব একটার পর একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিতে থাকে। অথচ ভ্রান্তি ধরা পড়ে গেলে সামান্যতম লজ্জাবোধও তাদের মধ্যে দেখা যায় না। আজ পর্যন্ত কোনো বড় দিলখোলা ধর্মীয় পুরুষের সংস্পর্শে আসিনি। হয়েতো তারা আছেন। নিশ্চয় আছেন। কিন্তু ততদূর পর্যন্ত পৌঁছানোর সৌভাগ্য অর্জন করিনি। তবে সদা সর্বদা আমার প্রভুর কাছে প্রার্থনা করি, তেমন মানুষের সঙ্গে যেন আমার সহসা সাক্ষাৎ ঘটে যায়। আমার একটা দিক তো অন্তত আছে। যেটা এ দেশের সবার কাছে কমবেশি গ্রাহ্য হয়েছে। সেটা হলো সাহিত্যের দিক। আমি এই আশায় বেঁচে থাকি যে, সাহিত্যের পথ ধরেই একদিন আমি প্রকৃত আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের সংস্পর্শে আসতে পারব। হতাশা আমাকে কখনো মুহ্যমান করে না। … আমি সামগ্রিক অর্থে আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের মুখাপেক্ষী। সব সময় আশা করি, ভুল-ত্রুটি অতিক্রম করে আমাদের মহান নেতৃত্ব এই জাতিকে মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছে দেবেন। তার জন্য সব সময় হাত তুলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। তার জন্য কবিতা লিখি। তার আবির্ভাব দেখার জন্য অন্ধ চোখে জ্যোতি প্রার্থনা করি। তার আহ্বান শোনার জন্য কালা হয়ে যাওয়া কান দুটোকে শশকের মতো উৎকর্ণ করে রাখি।[27]

পাঁচ.

কবির এই রূপান্তর শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক ছিল না, ব্যক্তিজীবনেও এর স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। ‘কবির আত্মবিশ্বাস’ গ্রন্থের সূচনায় তিনি কলকাতা ভ্রমণের একটি অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন, যা তাঁর পরিচয়-রূপান্তরের সামাজিক প্রতিক্রিয়াও তুলে ধরে। আল মাহমুদ লেখেন— এবার কলকাতায় বেড়াতে গিয়ে আমি আমার ধর্মবিশ্বাস নিয়ে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলাম। আমার দুএকজন অতি অন্তরঙ্গ বন্ধু-বান্ধবী ছাড়া অনেকেই আমাকে ঠিকমত চিনতে পারছিলেন না। যেন ঠিকমত ঠাহর করতে অনেকেরই অসুবিধে হচ্ছিল। ভাবটা এমন, আরে মাহমুদ ভাই না? আপনাকে তো একদম চেনাই যায় না। চেহারায় বয়সের ছাপ পড়েছে কি না। তাছাড়া আজকাল নাকি মদ্যপানও ছেড়ে দিয়েছেন? আচ্ছা, এটা কীভাবে হলো? ডাক্তারের নিষেধ না অন্যকিছু?’

বন্ধুদের বিস্ময় তাঁকে বুঝতে সাহায্য করে যে তাঁর ধর্মবিশ্বাস তাঁর পরিচয়কে নতুনভাবে দৃঢ় করেছে। তিনি অকপটে জানান—

এসব প্রশ্ন থেকে আমি বুঝলাম, আমার ধর্মবিশ্বাস আমার জন্য এক প্রকার আত্মবিশ্বাসও বটে। আমি অকপটে এদের জানিয়েছি আমার মদ্যপান ত্যাগ করার পিছনে কোনো ডাক্তারি বিধিনিষেধ বা শারীরিক অসুবিধে নেই। আমি কৃশকায় হলেও মোটামুটি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। ডায়াবেটিস বা চিনির অসুখ হয়নি। পরিপাক যন্ত্রটিও সহসা কোনরূপ গোলযোগ বাধায় না। হজম ভালো। সুখাদ্যের প্রতি ছেলে মানুষের মতো লোভ আছে। সুন্দরী মেয়েরা গায়ে পড়ে আলাপ করতে এলে আমি অপ্রতিভ বোধ করি না বা লজ্জা পেয়ে আড়াল খুঁজি না। যতটা শালীনতা বজায় রেখে কথোপকথন চালানো যায় আমি ততটাই পায়চারি করি। তবে মদ্যপান বাদ দিয়েছি ধর্মীয় কারণে। যেহেতু পবিত্র কুরআন মদ্যপান হারাম ঘোষণা করেছে এবং মানব সমাজকে এর অপকারিতা সম্বন্ধে সতর্ক করে বলেছে, মদ উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করে। সে কারণেই জিন বা হুইস্কির জন্য মাঝে মধ্যে হৃদয়ে অস্ত্রসা অনুভব করলেও ওদিকে হাত বাড়াই না।’ এ ধরনের রাখঢাকহীন সরল জবাবের মধ্যে যেহেতু আত্মরক্ষার বা চালাকির কোনো পর্দা থাকে না, তাই, যেমনটা আল মাহমুদ জানান, প্রশ্নকারীরা প্রকৃতপক্ষে নিজেরাই একটু লজ্জিত হয়ে পড়েন। আমি যে সত্যিই মুসলমান হয়ে গেছি এতে কারো কারো আক্ষেপ থাকলেও সন্দেহ থাকে না।[28] কবির এই অকপট স্বীকারোক্তি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশীলনের বিবরণ নয়; বরং তাঁর সমগ্র বৌদ্ধিক যাত্রার এক প্রতীকী উপসংহার। এখানে তাঁর আত্মবিশ্বাস জাগে ঈমান থেকে, এবং শিল্পী-সত্তাও খুঁজে পায় নতুন নৈতিক দৃঢ়তা।

নিজের এই বৌদ্ধিক সংগ্রাম এবং বিশ্বাসী সত্তার সরবতার কারণে সমাজে যে বিরোধিতা ও দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হতে হয়েছে কবিকে, তার আরেকটি দৃষ্টান্ত দেখতে পাই তারই এক প্রগতিবাদী বাল্যবন্ধুর অন্তরঙ্গ কথোপকথনে। আল মাহমুদ বলেন, একবার এক প্রগতিবাদী বন্ধু এবং বাল্যের সখা আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমার এই ধর্মভাব নিজের মধ্যে নিজের তৃপ্তির জন্য ধরে রাখো। বাইরে এত প্রকটিত করার দরকার কী?’

আমি যখন প্রশ্ন করলাম আমি যা, তা অপ্রকাশিত থাকলে তাতে আমার লাভ কী? তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘দেখো তোমাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজের লোক ভাবতে পারি না। কিন্তু তুমি এমন কিছু বিষয় সাম্প্রতিককালের গল্প-উপন্যাসে উত্থাপন করেছ, যা সবারই ভাবুক মনকে নাড়া দিচ্ছে। তোমার সঙ্গে বৈপরীত্য থাকা সত্ত্বেও তোমার রচনা সম্প্রীতি তৈরি করে দিতে পারছে। এটা অসাধারণ সৃজনশীলতার একটা দৃষ্টান্ত। তুমি এমন কিছু কর না যাতে মানুষ তোমার এই গুণকে বিস্মৃত হয়ে তোমার আদর্শের জন্য তোমাকে নিন্দা করে।’ এর জবাবে আল মাহমুদ বলেন, প্রকৃতপক্ষে এসব কথার কোনো জবাব নেই। আমি কোনো জবাব দিতেও চাই না। আমি শুধু এইটুকু বলব, আমার বিশ্বাসই আমার শক্তি। আমার নির্ভরতাই আমার প্রতিভা। হয়তো আমি আমার বন্ধুদের মতো হতে চাইলে কিছুই হতাম না। এই বিশ্বাস আমাকে যেখানে স্থাপন করতে চায়, আমি সেখানেই থাকব। আমার আগে যারা এই পথে ছিলেন, তারা আমার চেয়ে বেশি অত্যাচারিত হয়েও পরাভব স্বীকার করেননি। আমার অবস্থাটা অন্যরকম হলেও আমাকে খেলতে হচ্ছে একই সঙ্গে অগ্নির দাহন এবং বরফের শীতলতার সঙ্গে। আমার তো পরাভব মানার প্রশ্নই আসে না। আল্লাহ ছাড়া আমার কোনো সাহায্যকারী নেই। দেশ-বিদেশ থেকে অনেক কবি-সাহিত্যিক এবং তরুণ ধর্মপ্রবণ বুদ্ধিজীবী আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আমার বৈঠকখানায় আসেন। আজও এসেছিলেন। তাদের একটাই প্রশ্ন- আমার মতো প্রায়ান্ধ কবি আস্থার কথা বলে কতদূর যেতে পারে? আমি হেসে জবাব দিয়েছি, আপনি তো এতদূর এসেছেন একথা জেনে যে আমি একজন বিশ্বাসী কবিমাত্র। আর কিছু নই। তবু এতদূর এসেছেন এটা কি সামান্য ব্যাপার? জবাবে নিঃশব্দ থেকে তারা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কেবল থাকেন। আমার যেটা ব্যর্থতা সেটা হলো আমার শত্রু পক্ষ আমাকে সব সময় সমীহ করে চলেছে। আর আমার মিত্রপক্ষ চেয়েছে আমার সর্বনাশ। হয়তো তারা একটি সামান্য সাহিত্যিক ত্রুটি অনুসন্ধান করে আমাকে একেবারে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছে। আমার প্রভু আমাকে রক্ষা না করলে আমার দুর্গতির সীমা থাকত না। এই যে আত্মপর বিবেচনাহীন ক্ষতিসাধনের চেষ্টা, সেটা আমি সবচেয়ে বেশি প্রত্যক্ষ করেছি নিজের লোকদের মধ্যে। এই আক্ষেপ নিয়ে হয়তো আমার জীবনাবসান হবে। একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, আমি এ দেশে ধর্মপ্রবণ বিধিনিষেধের মধ্যেও মানবিক মননশীলতার লড়াই চালিয়ে গেছি। এখন পথ প্রশস্ত হয়েছে। এই পথে অনেক বিশ্বাসী কবির অকুতোভয় আগমন ঘটবে। এই প্রশান্তি নিয়ে আমার অবসান ঘটলে ক্ষতি কী?[29]

ছয়.

না, আল মাহমুদ কোনো গতানুগতিক বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিশ্বাসের মুসলমান নন। বরং আধুনিক নানা মতবাদ, দর্শন এবং প্রাচ্যের–পাশ্চাত্যের প্রধান ধর্মসমূহ তিনি গভীর মনোযোগ ও বৌদ্ধিক সততায় অধ্যয়ন করেছেন। এই বিস্তৃত বৈশ্বিক পাঠ-অভিজ্ঞতা তাঁকে এমন এক তুলনামূলক বিচারদৃষ্টি দিয়েছে, যার আলোকে তিনি ঐশী গ্রন্থ আল-কুরআনের সত্য-মহিমা অনায়াসে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। এমনকি নিজেকে তিনি একজন নও মুসলিম হিসেবেও স্বীকার করেন।[30] এভাবে তাঁর বয়ানে এই সত্য বরাবরই স্পষ্ট হয় যে, তাঁর ইসলামে প্রত্যাবর্তন কোনো অন্ধবিশ্বাস বা ক্ষণিক আবেগনির্ভর সিদ্ধান্ত নয়; বরং মুক্ত বুদ্ধির চর্চা, স্বাধীন অনুসন্ধান এবং সত্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ মানসিকতার স্বাভাবিক ও যৌক্তিক পরিণতি। তাই তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ইসলামকে সত্যধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং এর নৈতিক–আধ্যাত্মিক শক্তিকেই নিজের অস্তিত্ব, চিন্তা ও সৃজনধারার ভিত্তি করে তুলেছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের শিল্পী, সাহিত্যিকদের মধ্যে বর্তমানে চিন্তার ও মানবিক দিকদর্শনের যে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন নৈরাজ্য বিরাজ করছে- আল মাহমুদ তা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেন। তিনি বলেন- এদের কারো সামনে ভবিষ্যতের কোনো সুস্পষ্ট চিত্র নেই। ধর্মের প্রতি যেমন তাদের সন্দেহ তেমনি ধর্মহীনতার সাম্প্রতিক অনাচার দেখে তারা দারুণভাবে আতঙ্কগ্রস্ত। তরুণদের বিশেষ করে ছাত্র-ছাত্রীদের নৈতিক অধঃপতনেও তারা সমান দিশেহারা। এ অবস্থায় কোনো দেশেই যাকে বলে সত্যিকার জ্ঞানের চর্চা তা চলতে পারে না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমানে শিক্ষক সমাজের উদ্দেশ্যহীন চিন্তাচর্চার শূন্যগর্ভ ইমারতে পরিণত হয়েছে। কিছুদিন আগেও এসব ক্ষেত্রে তথাকথিত প্রগতিশীল মতবাদ মার্কসবাদ, অস্তিত্ববাদ ও মানবতাবাদের বাগাড়ম্বর শোনা যেত। বর্তমানে এসব মতবাদও এক দুর্বোধ্য হতাশায় নিমজ্জিত। এসব মতবাদের পরস্পর বিরোধী ঘাত-প্রতিঘাতে আমাদের শিক্ষক সমাজ যেমন ক্লান্ত, তেমনি ছাত্র সমাজও দেশের মাটি ও মানুষের সাথে সম্পর্কহীন। মানবরচিত নীতিসমূহের বিশ্বব্যাপী ব্যর্থতায় হতাশ। এমতাবস্থায় দেহগত আনন্দ, নগ্নতা ও অশ্লীলতায় তরুণমন পরিতৃপ্তি খুঁজবে এতে আর সন্দেহ কি? ফলে আমাদের সর্বপ্রকার মৌলিক নির্মাণ বা রচনার ক্ষেত্রে এখন নর-নারীর দেহগত সম্পর্ক এক প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। চিত্রকলা, কাব্যকলা বা সাহিত্যে এখন এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, যা কেবল কামসুখ তথা নিকৃষ্ট রসেরই যোগানদার। আল মাহমুদের দৃষ্টিতে, এ ধরনের সাংস্কৃতিক পূর্বাভাস হলো একটা জাতির সাংস্কৃতিক দেউলিয়াপনার ও অন্তসারশূন্য চিন্তা-চেতনার লক্ষণাক্রান্ত।’[31]

এই প্রেক্ষাপট বর্ণনার পর আল মাহমুদ বাংলাদেশের এক তরুণ লেখক এবং তার সমমনস্ক সঙ্গিনীর সঙ্গে একটি আলাপচারিতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাদের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিক মূল্যবোধ যেন সমকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক নৈরাজ্যের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিচিত্র। আল মাহমুদের বয়ান- কয়েকদিন আগে একজন তরুণ লেখক ও তার নিত্যসঙ্গী (স্ত্রী নয়) তরুণীর সাথে কথা হলো। তারা সামাজিক বা ধর্মীয় কোনা কু-প্রথা (?) মানেন না। আবার ঠিক নাস্তিকও তাদের বলা যাবে না। কারণ, আল্লাহ সম্বন্ধে এদের ধারণা হলো একজন সৃষ্টিকর্তা তো নিশ্চয়ই আছেন, ইত্যাদি। তবে ইসলাম সম্বন্ধে তাদের বিরূপতার অন্ত নেই। পর্দা প্রথা ও নারীদের অধিকার ইত্যাদি প্রসঙ্গে তারা ইসলামি নীতিমালাকে বস্তাপচা ও প্রতিক্রিয়াশীল নীতিমালা বলে মনে করেন। যত অনাচারই ঘটুক না কেন পাশ্চাত্য জীবনপদ্ধতিই তাদের কাছে বেশি কাম্য। তারা সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রসঙ্গ উঠলে শ্রীল-অশ্লীলতার সীমা মানতে চান না। মহিলাদের ব্যক্তিগত আবরণ, মাতৃত্বের দায়িত্ব ও পারিবারিক রক্ষণশীলতার কথা তো তাদের কাছে তোলাই গেল না। এসব প্রসঙ্গকে নিতান্ত হাসির ব্যাপার বলে হো হো করে উড়িয়ে দিলেন। তারপর একের পর এক পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারীর অবস্থান সম্পর্কে কয়েকটি মূল্যবান উদাহরণ দিতে থাকলেন।

আল মাহমুদ ঠিকই বুঝতে পারেন, ইসলামি জীবনব্যবস্থার অনুসারী জেনেই তারা তাঁকে হাস্যকর অবস্থায় ফেলার জন্য ঐসব উদাহরণ জড়ো করছিলেন। কিন্তু তিনি অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে এই তরুণ লেখক ও তার প্রগতিশীল সঙ্গিনীর দৃষ্টান্তসমূহ শুনেন। তারা যে সব যুক্তি দিলেন তা সহজে অগ্রাহ্য করা যায় না, তবে এসব যুক্তিও যে বহু পুরানো এবং আজকাল বস্তাপচা তা তিনি কথার ফাঁকে একবার উল্লেখ করতে ছাড়েননি। তাদের সেসব যুক্তির সারকথায় শুধু এটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে, পাশ্চাত্যের নারীরা আজ অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতার এমন এক স্তরে আছে যেখানে পুরুষের পীড়ন তাদের স্পর্শ করতে পারে না। আল মাহমুদ এর উত্তরে ইয়োরোপীয় নগরজীবনে নারীর অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে যৌন অনাচারের কয়েকটি গ্রন্থবদ্ধ দৃষ্টান্ত দিলে তরুণ লেখক ও তার অত্যাধুনিক সঙ্গিনী একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। আল মাহমুদ জানান- আমি জ্যাঁ পল সাত্রের আজীবন সঙ্গিনী (বিবাহিত স্ত্রী নন) মাদাম সিমন দ্য বোভোয়ারের মেমর্স অফ এ ডিউটিফুল ডটার থেকে লেখিকা হিসেবে রাতের পারী নগরীতে তার অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করলাম। অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের মারাত্মক পরিণতি অর্থাৎ কয়েকজন যৌনকাতর পুরুষের হাত থেকে তিনি শেষ পর্যন্ত কীভাবে আত্মরক্ষা করলেন সেই বর্ণনা দিয়ে আমি ইয়োরোপীয় মানসিকতায় নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির আসল তথ্যের আঘাতে তাদের যুক্তিকে খণ্ডন করলাম।’ এভাবে তিনি পাশ্চাত্যের নারীমুক্তি ধারণার অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। এতে তরুণ লেখক ও তার প্রগতিশীল সঙ্গিনী স্পষ্টতই হতভম্ব হয়ে যান।

আল মাহমুদ বলেন- ‘আমি তখন অতিথিদের জন্য চায়ের অর্ডার দিলাম। আমার ধারণা ছিল তারা আমার আপ্যায়ন প্রত্যাখ্যান করে উঠে পড়বেন। কিন্তু আশ্চর্য তারা চা এলে আগ্রহের সাথে চায়ে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইসলামে নারীর অধিকার সম্বন্ধে পর্দা ও অন্যান্য পারিবারিক বিষয় সম্বন্ধে কী কী কথা আছে? আমি যখন জানলাম এই তরুণ-তরুণী জীবনের কোনো অবসরেই একবারের জন্যও ভালো করে পবিত্র কোরান পাঠ করেননি, তখন আমার বিস্ময়ের অবধি রইল না। আমি তাদের আল্লাহর কিতাব অন্তত একবার অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ পাঠ করে দেখার অনুরোধ জানালাম এবং সাথে সাথে প্রায় সবগুলো হাদিসগ্রন্থ একটু চেখে দেখতে পরামর্শ দিলাম। তারা আনন্দিত মনেই উঠে গেলেন। জানি না, আমার পরামর্শ তাদের কোনো কাজে লাগবে কিনা। তবে সুপরামর্শ দিতে পেরে আমি নিজে অত্যন্ত আনন্দবোধ করলাম।

তো এই হলো আমাদের দেশে যেসব তরুণ বুদ্ধিজীবী ইসলামের বিরোধিতা করেন, তাদের অবস্থা। আল মাহমুদ বলেন-  এসব তরুণ বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই জীবনে অন্তত একটি বারের জন্যও নিজেদেরই ঘরে রাখা আল্লাহর কিতাব পাঠ পর্যন্ত করেননি। অথচ অবিরাম এর বিরোধিতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় তার কোনো কসুর করেন না। তিনি বলেন, আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক নৈরাজ্যের আর একটি প্রধান কারণ হলো স্রোতের টানে অজ্ঞের মতো ভেসে যাওয়া। সবাই বলছে আমিও বলি-ভাবটা এরকম। সব দেখে আমার এ বিশ্বাস দৃঢ় হচ্ছে যে, যারা আমাদের দেশে ইসলামের বিরোধিতা করেন তাদের একটা বৃহত্তর অংশ ইসলাম সম্বন্ধে প্রকৃত তথ্য না জেনেই এর বিরোধিতা করেন।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের অধিকাংশ তরুণ কবি-সাহিত্যিকই বিশ্বসাহিত্য ও বিভিন্ন জাতির প্রাচীন পুরাণ ও ইতিহাস পাঠ করতে আগ্রহী। হাতের কাছে পেলে তারা সেসব আস্বাদনও করে থাকেন। তারা ভাবেন এই জানাটা তাদের মৌলিক রচনায় মাঝে মধ্যে উপমা হিসেবে আসতে পারে। আসেও। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এদেশের অধিকাংশ তরুণ কবিই নিজের ধর্মগ্রন্থ ও ইসলামের প্রকৃত ইতিহাস সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকেন। তারা ইসলামের বিরোধিতা করেন অথচ পবিত্র কুরআন হাদিস হাতের কাছে থাকা সত্ত্বেও তা পাঠ করে দেখতে অগ্রসর হন না।[32] বরং এর বিপরীতে, ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা বলতে তাদের অনেকেই কিছু স্থির ও গৎবাঁধা ভুল ধারণাকেই আঁকড়ে ধরে বসে থাকেন। ইতিবাচক ও মুক্ত মন নিয়ে অনুসন্ধান বা পুনর্বিবেচনায় তারা অনিচ্ছুক। ইসলাম ছাড়া জগতের প্রায় সবকিছু তারা উদারভাবে গ্রহণে প্রস্তুত; কিন্তু ইসলামের ক্ষেত্রে নিজেদের ধারণা সংশোধন করা তো দূরের কথা, সামান্য পুনর্বিবেচনা করতেও তারা রাজি নন!

সাত.

আল মাহমুদের ধর্মে প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি অপপ্রচার প্রচলিত ছিল, তিনি নাকি ‘পেট্রোডলার’ এর বিনিময়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। কিন্তু নিজের আত্মজৈবনিক রচনায় কবি এই গুজবকে দৃঢ়ভাবে খণ্ডন করেন। তিনি স্পষ্ট জানান, ইসলামে প্রত্যাবর্তন তাঁর কাছে কোনো অর্থনৈতিক প্রণোদনার ফল নয়; বরং দীর্ঘ বৌদ্ধিক অনুসন্ধান, আত্মিক তৃষ্ণা ও অস্তিত্বগত যাত্রার স্বাভাবিক পরিণতি। আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি, মার্কসবাদ, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, মানব-ইতিহাস ও শ্রেণিবিশ্লেষণ বিষয়ে তাঁর দীর্ঘ অধ্যয়নই একসময় তাঁকে কুরআনের বাণীর গভীরতা অনুধাবনে সহায়তা করেছে। মার্কসীয় প্রকল্পের মানবমুক্তি-সংক্রান্ত ব্যর্থতা, আদর্শে-বীতশ্রদ্ধতা এবং নিজের অন্তর্দর্শনের পথ ধরে ধীরে ধীরে ইসলামের সত্যে পৌঁছে যান তিনি। ফলে ধর্মে প্রত্যাবর্তন ছিল না কোনো তাৎক্ষণিক লাভের সিদ্ধান্ত; বরং বহুদিনের চিন্তা, আত্মজিজ্ঞাসা ও সত্যের অনুসন্ধানের অনিবার্য ফসল।‘পেট্রোডলার’ গুজব প্রসঙ্গে তিনি জানান, ইসলাম গ্রহণ করে লাভ তো দূরের কথা, নও-মুসলিমদের জীবন প্রায়ই অনটন ও সংকটে ভরা; তাঁর নিজের জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু তাঁর ধর্মান্তরকে অর্থের ঘটনারূপে তুলে ধরার পেছনে ছিল রাজনৈতিক বিদ্বেষ, আন্তর্জাতিক সংকোচ ও নও-মুসলিমদের সম্মানহানি ছড়ানোর উদ্দেশ্য। পড়ুন তার জবানি-

‘আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি জীবনের একটি অলৌকিক কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়ম হিসেবে। মার্কসবাদ সম্বন্ধে বীতশ্রদ্ধ হয়ে। আমার এই অগ্রগতির জন্য কোনরূপ পেট্রোডলার পাইনি। কোথায় পাব? কে আমাকে এমন মহার্ঘ বৈদেশিক মুদ্রা শুধু ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্যই দেবে? আমি মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব, মানবজাতির শ্রম ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের বিস্ময়কর ব্যাখ্যা, শ্রেণিদ্বন্দ্ব ও পুঁজিগঠনের দুঃসাহসিক বর্ণনার সাথে সাথে উদ্বৃত্ত পুঁজির কেন্দ্রীভূত হওয়ার গূঢ় কারণসমূহের পঠনপাঠন একদা গভীর অভিনিবেশ সহকারে করেছিলাম বলেই পবিত্র কুরআন হৃদয়ঙ্গম করা সহজ হয়েছে। তা না হলে আমার কৈশোরে বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট পার্টিগুলো নির্যাতিত মানুষের পক্ষে যে বৈপ্লবিক ভূমিকা গ্রহণ করেছিল তাতে একজন কমিউনিস্ট হওয়ার মধ্যে যেটুকু গৌরব অপ্রাপ্ত বয়স্ক একজন কিশোর তার বার্ধক্য পর্যন্ত ধরে রাখতে চায়, আমিও সেই গৌরবেরই অংশীদার হতে চাইতাম। এতে অবশ্য এই যুগে খানিকটা লাভ হলে হতেও পারত। কারণ এদেশে আমার মতো সামান্য মানুষের অকিঞ্চিৎকর কবিখ্যাতিকেও রাজনৈতিক কাজে লাগানোর দৃষ্টান্ত অহরহই চোখে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলো মাথাই যে রকম একযোগে আন্তর্জাতিকভাবে হস্তান্তরযোগ্য পণ্যে পরিণত হয়। তাতে কে না মার্কসবাদী হতে চাইবে? মার্কসবাদ আমাদের দেশের মতো আধা সামন্ততান্ত্রিক, আধা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক সমাজকাঠামোর অতি অনুন্নত দেশে তখনো যেমন বিপ্লবকর্মীদের মাসোহারা দিত। আজো কি আর দেয় না? … সে তুলনায় ইসলাম গ্রহণ করে বুঝেছি আমি বৈষয়িক দিক দিয়ে খুব বেশি বুদ্ধিমানের মতো কাজ করিনি। কারণ পেট্রোডলার দূরে থাক, আমার মতো নও মুসলিমদের এ তল্লাটে পেটে পাথর বাঁধার মতো অবস্থা প্রায় সবারই। পবিত্র কুরআন বিশ্বের সকল মানুষের পারিবারিক ব্যবস্থার যে সুরাহা দেয় ব্যক্তির পরিবারকে এর চেয়ে আলাদা করে দেখার কোনো পন্থার ওপর তেমন জোর দেয়নি। তবে একজন মুসলমানের সীমাহীন দারিদ্র্যকে ইসলাম স্বীকার করে না। তেমন ভয়াবহ দারিদ্র্যকে আমার ধর্ম কুফরের সাথে তুলনা করেছে। এদিক দিয়ে বিচার করলে, শুধু ইসলাম গ্রহণের জন্য কোনো ধনী মুসলিম দেশ বা ব্যক্তি যদি কাউকে কিছু আর্থিক সাহায্য দেয় তবে তা না নেওয়ার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশ তো নিচ্ছে। তবে যারা আমার ইসলাম গ্রহণকে পেট্রোডলারের কারসাজি বলে প্রচার করে এক ধরনের আন্তর্জাতিক বিরূপতা সৃষ্টির প্রয়াস পাচ্ছেন তাদের জানিয়ে রাখি, আমার ভাগ্যে এখনো কোনরূপ সিকে ছিঁড়েনি।[33]

প্রসঙ্গত ভারতের প্রখ্যাত সাহিত্য-পত্রিকা ‘জিজ্ঞাসা’র সম্পাদক শিবনারায়ণ রায়ের মন্তব্যটি অতিশয় প্রণিধানযোগ্য; যাতে আল মাহমুদের কবিসত্তার অনন্যতা স্বীকার করার পাশাপাশি তাঁর প্রতি সমাজের প্রতিক্রিয়া ও ভুল বোঝাবুঝির বাস্তবতাকেও নির্মোহভাবে তুলে ধরা হয়। যাতে আল মাহমুদের শিল্পমূল্যের স্বীকৃতির পাশাপাশি তাঁর মতাদর্শগত অবস্থানের ভয়াবহ সামাজিক মূল্য— দুটিই উন্মোচিত হয়। শিবনারায়ণ রায় বলেন- পঁচাত্তর সালে আল মাহমুদের সঙ্গে প্রথম চাক্ষুস পরিচয় হবার আগে থেকেই আমি তাঁর কবিতার একজন মুগ্ধ পাঠক। সমকালীন যে দুজন বাঙালী কবির দুর্দান্ত মৌলিকতা ও বহমানতা আমাকে বার বার আকৃষ্ট করেছে তাঁদের একজন বাংলাদেশের আল মাহমুদ, অন্যজন পশ্চিমবঙ্গের শক্তি চট্টোপাধ্যায়। ‘জিজ্ঞাসা’ প্রথম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যায় আল মাহমুদের একগুচ্ছ কবিতা আগ্রহী হয়ে প্রকাশ করি। আমার মনে হয়েছে যে, বাংলা কবিতায় তিনি নতুন সম্ভাবনা এনে দিয়েছেন। পশ্চিম বাংলার কবিরা যা পারেননি তিনি সেই অসাধ্য সাধন করেছেন; আঞ্চলিক ভাষা, অভিজ্ঞতা, রূপাবলীকে তিনি নাগরিক চেতনায় সন্নিবিষ্ট করে প্রাকৃত অথচ ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ এক কাব্য-জগৎ গড়ে তুলেছেন। জসীমউদ্দীন এবং জীবনানন্দ উভয়ের থেকেই তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির কবি। আল মাহমুদের গুচ্ছ কবিতা প্রকাশের পর অনেক বাংলাদেশী পাঠক পত্র লিখে জানান যে, আল মাহমুদ বর্তমানে ইসলামপন্থী প্রচারক হয়ে উঠেছেন যে, তিনি সরকারের সমর্থক ও প্রগতিবিরোধী, যে সেই কারণে তাঁর প্রতি আমার মত র‍্যাডিক্যাল মানবতন্ত্রীর অনুরাগ অযৌক্তিক ও অসঙ্গত। উত্তরে আমি আল মাহমুদের আরেক গুচ্ছ কবিতা ‘জিজ্ঞাসা’ তৃতীয় বর্ষ চতুর্থ সংখ্যায় প্রকাশ করি এবং পাঠক-পাঠিকাদের জানাই যে, কবির ব্যক্তিগত বিশ্বাসের অংশ ভাগ অথবা তার বিবিধ ক্রিয়াকলাপের সমর্থক না হয়েও তাঁর কবিতা উপভোগ করা সম্ভব। অনুভবের সততায়, কল্পনার মৌলিকতা, শব্দ ব্যবহারে দক্ষতা, উপমা ও ব্যঞ্জিত বাকপ্রতিমা উদ্ভাবন শক্তি যার কবিতায় প্রত্যক্ষ তার বিশ্বাস ও ব্যবহার যাই হোক না কেন তাঁর কবিতায় সাড়া দেয়া কাব্যানুরাগীর পক্ষে স্বাভাবিক। ঢাকায় পৌঁছার পর বিভিন্ন ছোটখাট আলোচনায় আল মাহমুদ সম্পর্কে বিরূপ কথা শুনি। যাঁরা বলেন, তাঁরা অধিকাংশই তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বা অধ্যাপক; কেউ কেউ কবি ও সাংবাদিক। তিনি যে একজন বড় কবি একথা অবশ্য তাঁরা অনেকেই মানেন। কিন্তু তাঁদের আশংকা যে ইসলামী গোঁড়ামি, পশ্চিম এশিয়ার পেট্রো-ডলার এবং সামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা এই তিনে মিলে বাংলাদেশের সমূহ ক্ষতি করতে পারে এবং কোন শিল্পী তিনি যত শক্তিশালীই হোন না কেন, যখন ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সামরিক সরকারকে সমর্থন করেন তখন তাঁকে আর শ্রদ্ধা করা চলে না। তাঁদের কথা থেকে এটুকু বুঝতে পারি যে, শিক্ষিতদের মধ্যে অনেকেই আল মাহমুদের বিরোধী এবং ঢাকায় বর্তমানে সম্ভবত তিনি নিঃসঙ্গ এবং প্রবহমান প্রধান ভাবধারা থেকে বিচ্ছিন্ন।’[34]

১৯৭৮ সালে আল মাহমুদ হজ পালন করেন। তখন তিনি শিল্পকলা একাডেমিতে চাকরি করছেন। হজ থেকে ফেরার পরবর্তী অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আল মাহমুদ বলেন- হজ থেকে ফিরে এসে শিল্পকলায় নিজের কাজে যোগদান করার সঙ্গে সঙ্গে আমার সহকর্মীবৃন্দ ও শিল্পীরা আমাকে একটু অন্য চোখে দেখতে শুরু করল এবং প্রগতিবাদীরা আমাকে পাকাপোক্তভাবে ‘মৌলবাদী’ কবি হিসেবে আখ্যায়িত করা শুরু করল। আমার রচনার প্রতি একটু তুচ্ছতাচ্ছিল্য ভাব দেখাতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু তাতে তারা সফল হয়নি। কারণ উদ্ভাবনশীল লেখক হিসেবে আমার ভাবনা বহুভাবে বিস্তৃত ছিল। আমার লেখা পড়ত আমার বিরুদ্ধবাদীরাই বেশি। আমি স্বীকার করি তারাই আমার মূল্যায়ন করত বেশি। সম্ভবত এই সময় আমার ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ প্রকাশিত হয়। শিল্পী হামিদুল ইসলামের অসাধারণ প্রচ্ছদে বইটি বাজারে বের হলে কিছুদিনের মধ্যেই এর প্রথম প্রকাশ শেষ হয়। আমি কলকাতায় গেলে কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘পরিচয়’-এর সম্পাদক অমিতাভ দাশগুপ্তের হাতে বইটি দিই। তিনি আমার তরুণ বয়সের বন্ধু ও সুহৃদ ছিলেন। বইটি পেয়ে তিনি খুবই খুশি হয়েছিলেন এবং পরে আমাকে জানিয়েছিলেন বইটির ওপর তার কিছু লেখার ইচ্ছা আছে। তার ধারণা, বইটি একটু আধুনিক কবিতার ঐতিহ্যবাহী সংকলন। অথচ এই বইটি মৌলবাদী হিসেবে আমার নতুন সুখ্যাতিকে আরো প্রতিষ্ঠিত করল। এভাবে আমার ‘মৌলবাদী’ খেতাবটি আরো পাকাপোক্ত হয়ে গেল। অবশ্য এর পাশাপাশি একটি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াও আল মাহমুদ লক্ষ্য করেন। তিনি জানান- এর মধ্যে আমাদের সাহিত্যের অঙ্গনে একটি নতুন তরঙ্গের সূচনা হয়েছিল বলে মনে হয়। বেশকিছু মুসলিম তরুণ যাদের প্রায় সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তথাকথিত প্রগতিবাদের প্রলোভন এবং মুক্তির সারবত্তা অস্বীকার করে আত্মবিশ্বাসী ঐতিহ্যবাদী সর্বোপরি ইমানদার কবির কাতারে এসে যোগ দেয়। অন্যদিকে ঢাকায় সাহিত্য সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা বৃদ্ধি পায়। ওইসব প্রতিষ্ঠানে প্রায়ই আমাকে সভাপতি করে সভা-সমিতির আয়োজন হতে থাকে। এ অবস্থায় আমি বিশ্বাসী কবিদের এক অলিখিত নিঃশর্ত নেতৃত্বের আসনে এসে উপনীত হই। শুরু হয় আমার প্রবল বিরুদ্ধাচারী প্রতিঘাত। অনেক পত্রিকা আমার লেখা ছাপা বন্ধ করে দেয়। যারা আমার একটি কবিতার জন্য আমার বৈঠকখানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত, তারাই আমার কবিতাকে সমালোচনার মুখে ঠেলে দেয়।[35]

প্রায়ই লেখালেখির সূত্রে ভিন্ন সম্প্রদায়ের অনেক তরুণ-তরুণীও আল মাহমুদের বৈঠকখানায় এসে হাজির হত। তিনি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতেন। কিন্তু তারা কবির কাছে আসত একটা পূর্ব ধারণা নিয়ে। ধারণাটি হলো, কবির ভাষায়- ‘আমি মন্দ লোক না হলেও মৌলবাদী। তারা এক ধরনের মানবিক দূরত্ব বজায় রেখে আমার কাছে উপস্থিত হয়। আমি বহু চেষ্টা করেও এই দূরত্ব কমিয়ে আনতে পারিনি। তারা এটাও জানে যে, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা আমাকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করতে পারে না। এর কারণ যে আমার ধর্ম বিশ্বাস, একথা বলা বাহুল্য।’ এরপর আল মাহমুদ বলেন- আমি সাম্প্রদায়িক নই। কখনো ছিলাম না। কিন্তু আমার ধর্ম বিশ্বাস এতটাই আমার জাতির মধ্যে বিজ্ঞাপিত হয়ে আছে যে, আমি কবি ও মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও একজন মৌলবাদী হিসেবে আখ্যায়িত হয়ে আছি। এখন আমিও আর চাই না এর থেকে বেরিয়ে আসতে। কারণ, আমার মৌল বিশ্বাসকে তো আমি উপেক্ষা করে অন্য কিছু হতে চাই না। এখন কথা হলো, আমাদের সাহিত্য শিল্পের অনেক বিষয়ের প্রথম উদগাতা হলাম আমি নিজে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর স্বীকৃতিও আছে। কিন্তু সামগ্রিক অর্থে ধর্মের শত্রুরা আমাকে এক সংকীর্ণ পরিধির মধ্যে বেঁধে রাখতে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। আমি মনে করি, পরিত্রাণ হলো মহান আল্লাহর হাতে। আমার যতটুকু খ্যাতি-প্রতিপত্তি জাতির মধ্যে বিকশিত হয়েছে, তা এক রহস্যজনক সাফল্য হিসেবে গণ্য করি। কীভাবে হলো? এই প্রশ্নের কথা বিবেচনা করলে আমার শির আপনা থেকে অবনত হয়ে পড়ে। আমি বিবেচনা করি, আমি যা সেটাই মানুষ আস্থার সঙ্গে গ্রহণ করে আমাকে প্রতিদান যা দেয়ার, তা দিচ্ছে। আমি স্বীকার করি, প্রতিদান অসামান্য। এতে আমার তুষ্ট থাকা উচিত।[36]

আট.

যেমন করে কবি নজরুলকেও তাঁর ইসলামি আদর্শ ও ঐতিহ্য চেতনার কারণে নিঃসঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন করে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু তিনি তাঁর প্রতিভার সাত রঙা ঔজ্জ্বল্যে সকল বিদ্বেষ প্রচারণাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেন। অনুরূপ একই কারণে ফররুখ আহমদকেও একঘরে করার চেষ্টা হয়। নজরুলের মত তিনি প্রতিবাদী ছিলেন না কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থন বা আত্মপ্রচারণায় তিনি অভ্যস্ত ছিলেন না। আল্লাহর উপর দৃঢ় ঈমানে বলীয়ান ফররুখকে তাই, নীরবে-অভিমানে, অনাহার-বিনা চিকিৎসায় অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে বাঙলা সাহিত্যের এক অসাধারণ প্রতিভাকে অকালে ঝরে পড়তে হয়। আল মাহমুদকেও হয়ত একই ভাগ্যবরণে বাধ্য করার চেষ্টা চলে। উপরোক্ত উদ্ধৃতিগুলোয় তার প্রমাণ মেলে। কিন্তু আল মাহমুদ কিছুটা ভিন্ন ধাঁচের। তাই নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন- আধুনিক কবির কোন বন্ধু হয় না।… যূথবদ্ধভাবে রাজনীতি, ছিনতাই বা অন্যকিছু চলতে পারে। কিন্তু কবি হবে নিঃসঙ্গ। কবির অনুরাগী কিংবা অনুরাগিনী দুএকজন থাকতে পারে। অবস্থার বিপাকে এক-আধজন প্রেমিকও। কিন্তু কবির সাথে অন্য কবির দিবস-যামিনী সৌহার্দ্য রক্ষা কবিতা নির্মাণে দারুণ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।[37]

অতএব, নিঃসঙ্গতা কবিকে মনঃক্ষুণ্ণ করেনি, বরং কবির কাব্য-চর্চার ক্ষেত্রে নিঃসঙ্গতা বা অন্যের উপেক্ষা অনেকটা শাপে বর হয়েই দেখা দিয়েছে। এটা যে কোন অভিমানের কথা নয়, তা তাঁর ব্যাপক সৃষ্টি-বৈচিত্র্য থেকে সহজেই ধারণা করা চলে। কবির আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় থেকেই যে এরূপ ঘটেছে তা নিম্নোক্ত উদ্ধৃতি থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফররুখ আহমদ প্রসঙ্গে আল মাহমুদ বলেন- ‘ফররুখ আহমদকে একঘরে করে রাখা, তার সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও সাহিত্যিক পরিণাম জানা থাকা সত্ত্বেও আমি ইসলামকেই আমার ধর্ম, ইহকাল ও পারলৌকিক শান্তি বলে গ্রহণ করেছি। আমি মনে করি একটি পারমাণবিক বিশ্ববিনাশ যদি ঘটেই যায়, আর দৈবক্রমে মানবজাতির যদি কিছু অবশেষ ও চিহ্নমাত্র অবশিষ্ট থাকে তবে ইসলামই হবে তাদের একমাত্র আচরণীয় ধর্ম। এই ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্যই আমার কবি স্বভাবকে আমি উৎসর্গ করেছি। আর যদি সৌভাগ্যক্রমে তেমন দুর্ঘটনা নাও ঘটে, তবুও মানুষের দীর্ঘশ্বাসের কুঞ্ঝটিকায় আচ্ছন্ন আমাদের এই দীন পৃথিবীতে মানুষের রচিত কোনো নীতিমালায় কমিউনিজম বা শান্তির রাজ্যে পৌঁছা যাবে না। আল্লাহ প্রদত্ত কোনো নিয়ম-নীতিই কেবল মানবজাতিকে শান্তি ও সাম্যের মধ্যে পৃথিবীতে বসবাসের সুযোগ দিতে পারে। আমার ধারণা পবিত্র কুরআনেই সেই নীতিমালা সুরক্ষিত হয়েছে। এই হলো আমার বিশ্বাস। আমি এই ধারারই একজন অতি নগণ্য কবি।[38]

কবি তাঁর জীবনের অন্তিম পর্বের কোনো এক জন্মদিনে নিজের উপলব্ধির কথা জানিয়ে বলেন- কবি হিসেবে সারাজীবন আমি সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরোধিতা করে এসেছি। যখন যে রাজনৈতিক বিশ্বাসে আবর্তিত হয়েছি এবং আপ্লুত হয়েছি, সব অবস্থানে দাঁড়িয়েই আমি নিপীড়ক, শোষক এবং ঔপনিবেশিক আচরণের প্রতিবাদ করেছি। এখন আমার অবস্থান ইসলামের পক্ষে। আমার ধারণা ইসলাম আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী শক্তির একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। কোনো প্রস্তুতি না থাকলেও পুঁজিবাদ নিরস্ত্র ইসলামের ওপর তার সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এর পরিণাম যাই হোক না কেন, বর্তমান বিশ্বে পুঁজিবাদী পরাশক্তির সামনে দাঁড়ানোর আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইচ্ছা থাকলেও তা অপ্রকাশ্য। ইসলামকে আক্রমণ করার এই লড়াই আক্রমণকারীরা আর গুটিয়ে নিতে পারবে না। দিন দিন তা নানা আকার ও আকৃতি নিয়ে চলতেই থাকবে। কবি হিসেবে দ্রষ্টা হিসেবে আমার কাজ শুধু দেখে যাওয়া নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে জগৎবাসীর সামনে সাক্ষ্য দেওয়া। প্রকৃতপক্ষে আমি আল্লাহর অহির সংকলন, পবিত্র কুরআনের পক্ষে দাঁড়িয়েছি। এতে আমি কোনো প্রকার দ্বিধান্বিত নই। এটাই হলো আমার এবারের জন্মদিনের উপলব্ধি।[39]

নয়.

বস্তুত, প্রত্যেক মানুষেরই একটা নিজস্ব বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। সৃষ্টিশীল প্রতিভার ক্ষেত্রে এটা আরও স্পষ্ট। তাঁরা তাঁদের স্ব-স্ব জীবনদৃষ্টির দ্বারা আমাদের নিকট পরিচিত। অনেক সময় ভাল লাগা, মন্দ লাগার মাপকাঠিও তৈরি হয় এর ভিত্তিতে। নিজস্ব বর্ণ-সুষমা, সুরভি-সৌকর্যে যেমন ফুলের পরিচয়, কবির পরিচয়ও তেমনি তাঁর কাব্যে। আর এ পরিচয়ের ভিত্তি হলো তাঁর রচিত কাব্যে প্রতিফলিত বিশ্বাস, বিষয়-বৈভব, ভাবৈশ্বর্য, বাক-বিন্যাস, কলা-নৈপুণ্য, ছন্দ, প্রতীক, উপমা, রূপক ইত্যাদির ব্যবহারে। বিশ্ববিখ্যাত অমর কবি হোমার, মিল্টন, হাফিজ, রুমী, জামী, ফেরদৌসী, শেখ সাদী, ইকবাল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ফররুখ এঁরা সকলেই তাঁদের স্বকীয় জীবনদৃষ্টির প্রতিফলন ঘটিয়েছেন তাঁদের কাব্য-সাহিত্যে। এ বিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয় ব্যতীত বলিষ্ঠ উজ্জ্বল কাব্য-কবিতা রচনা করা অসম্ভব। বিশ্বাসের দীপ্তি প্রত্যেক কবির কাব্য-ভুবনে চন্দ্রালোকের উজ্জ্বল কিরণ-প্রভা বিকিরণ করে। আল মাহমুদও বিশ্বাসের বৃত্তে আবর্তমান। তবে তাঁর বিশ্বাস কোন একটি নির্দিষ্ট বৃত্তে স্থিত থাকেনি, নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ক্রমান্বয়ে লাভ করেছে এক স্থায়ী, উজ্জ্বল রূপ।[40] এ প্রসঙ্গে কবির এই আত্মবয়ানটি প্রনিধানযোগ্য-

কবি যা দেখে তাতে দ্রষ্টব্যের বহিরঙ্গের সৌন্দর্যে কবি মুগ্ধ থাকে। এই দৃষ্টি আমি ত্যাগ করেছি এখন। আমি সুন্দর কিছু দেখলেই এটাকে সুন্দর বলে স্বীকার করি। কিন্তু আমি এর ভেতরটাও দেখতে চাই। এক সময় প্রকৃতির ভিতরে মিলেমিশে থাকতে আমার খুব পছন্দ হতো। গাছ-পালা, পাখি, নাও, নদী, মানুষ এগুলোর মধ্যে থাকতে আমার ভালো লাগত। এর মধ্যে থেকে শব্দ চয়ন করে আমি কবিতা নির্মাণ করার চেষ্টা করেছি। নৈঃশব্দ্যেরও একটা শব্দ আছে, একটা বিষয় আছে। এখন সেখানে পৌঁছুতে চাই যেখানে আর কোনো শব্দ নেই। হ্যাঁ, শব্দহীনতার মধ্যে সৌন্দর্য বিকাশের দৃশ্য রয়েছে। এরকম একটা জায়গায় পৌছুতে চাই, সেই প্রান্তরে গিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকি সেখানে। হয়তো গেলাম সেখানে বসলাম দেখলাম, সূর্যাস্তের পরে সব নীরব হয়ে গেল। সবাই চলে যাচ্ছে যার যার ঘরে। আমি কিন্তু আর যাই না। সেখানে অনেকক্ষণ বসে থাকি। বসে থেকে সবাই চলে যাওয়ার পর যে নৈঃশব্দ্য, যে নিস্তবদ্ধতা, সেটা উপলব্ধি করতে চাই এবং কবিতায় আনতে চাই।… আমি যে থাকব না এ বিশ্বাস তো আমার মধ্যে দৃঢ়মূল। কতদিন মানুষ বেঁচে থাকে? ধরে নিলাম আরো দশ। আরো বিশ বছরই না হয় বাঁচলাম। এর বেশি তো আশা করি না। এই যে চেতনায় আমি আমাকে ‘আমি’ বলি, আমি মনে করি এই চেতনা থেকে আমি কখনো লুপ্ত হব না। এটা থাকবে আমার ভেতর। তার আধার পরিবর্তিত হবে কিন্তু এ ব্যাপারে আমার নিশ্চিত বিশ্বাস আছে যাকে ইমান বলা হয়, যে আমার একটা পরকাল আছে। সে কালের মধ্যে আমি প্রবেশ করব সে কাল সম্পর্কে ধর্ম গ্রন্থাদিতে নবিগণ ও রসুল (সা.) বলেছেন। তার উপর দৃঢ় আস্থা রেখেই আমি এতদিন চলে এসেছি। আমি মনে করি যে সেদিকেই এখন আমার যাত্রা। যাওয়ার আগে কিছু প্রস্তুতি আছে, যাওয়ার আগেও কিছু কবিতা থাকে। আমি সে কবিতা এখন লেখার চেষ্টা করছি। আমার মন থেকে বিদ্বেষ দূর করে দিয়েছি। এক সময় নানা বিষয়ে তর্ক করেছি, সব সময় জিতে থাকার জন্য চেষ্টা করেছি। ভিন্ন মতকে পরাস্ত করার জন্য নিজেকে সজ্জিত রেখেছি। এখন আমি অবশ্য সেরকম আর চেষ্টা করি না। কারণ আমার মত দৃঢ় হয়েছে। আমার বিশ্বাস আমার ইমান সব মিলে আমাকে এমন দৃঢ় করে দিয়েছে যে আমি কারো সাথে কোনো তর্কের প্রয়োজন বোধ করি না। আমার যারা বিরুদ্ধমতাবলম্বী, আমি লক্ষ করেছি, তাদের বিদ্বেষভাব অনেক কমে গেছে। কেন কমে গেছে সেটা অবশ্য একটা আশ্চর্যের ব্যাপার। কালের পরিবর্তনে অনেক কিছুই বদলে যায়, তাদের হয়তো তেজ কমে গেছে, আদর্শের তেজ কমে গেছে। তারা স্থির জায়গায় থাকতে পারেননি। আমি তো পরিবর্তিত হয়ে হয়েই এসেছি। কিন্তু আমি যেখানে এসেছি সেটা একটি চিরন্তন অবস্থান। অনেকেই সেই অবস্থান নিয়েছেন, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিরা, যাবার সময় এই অবস্থানে অনেকেই দৃঢ় ছিলেন। আমি এই অবস্থানে এসে পৌছুতে পারব তা কখনো কল্পনা করিনি। আমি মনে করি আমি সেই অবস্থানে এসে পৌঁছে গেছি যে অবস্থানে আর কিছুই এসে যায় না।[41]

দশ.

আল মাহমুদের এই পরিবর্তন ও ধর্মে প্রত্যাবর্তন কোনো আকস্মিক আবেগগত সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং এটি ছিল দীর্ঘ চিন্তা, পর্যবেক্ষণ, রাজনৈতিক-সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং বৌদ্ধিক অন্বেষার বাস্তব ও অনিবার্য পরিণতি। তাঁর জীবনের নানা অভিঘাত— রাজনৈতিক বাস্তবতার সংঘাত, সমাজ-সাংস্কৃতিক পরিবেশের অস্থিরতা, সাহিত্যিক পরিসরের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, এবং ব্যক্তিগত অন্তর্দর্শনের ক্রমোন্মোচন— এ সবই তাঁকে এমনতরো অবস্থানে উন্নীত করে। উপরের আলোকপাত থেকে যেমনটা প্রতীয়মান হয়, তাঁর এই প্রত্যাবর্তন কোনোভাবেই দুর্বলতার প্রকাশ নয়; বরং রাজনৈতিক বিভ্রান্তি, মতাদর্শিক হতাশা, আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান, অস্তিত্বগত শূন্যতার মুখোমুখিতা এবং আধ্যাত্মিক জাগরণের সমন্বয়ে গঠিত এক পরিপক্ক বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্ত।

অধিকন্তু এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত আখ্যান মাত্র নয়; এটি বাংলাদেশের সমকালীন সাহিত্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে এক গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশকও বটে। তাঁর প্রত্যাবর্তন যেমন তাঁর নিজের জীবনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, তেমনি বাংলা সাহিত্য-ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করেছে। ধর্মীয় বিশ্বাস বা ঈমান আধুনিক সাহিত্যবোধকে সংকুচিত করে না; বরং তা শিল্পের অন্তরস্থ মানবিকতা, প্রেম, ন্যায়বোধ ও সত্যসন্ধানের শক্তিকে আরও তীক্ষ্ণ ও গভীর করে তোলে, সে সত্য আল মাহমুদ প্রতিষ্ঠা করে দেখিয়েছেন। এভাবে, বাংলা কবিতায় তিনি যে আধ্যাত্মিক আধুনিকতার পরিসর নির্মাণ করেছেন, তা শুধু একটি নন্দনতাত্ত্বিক রূপান্তর নয়; বরং সমকালীন মুসলিম সমাজ ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে নতুন এক চেতনার জন্ম দিয়েছে। তাঁর রচনায় ভাষা, ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা, লোকধর্ম, ইসলামী ঐতিহ্য এবং আধুনিক মানবিক প্রশ্ন সবকিছুই এক অপূর্ব সুন্দর সমন্বয়ে মিলিত হয়েছে। তাঁর এই রূপান্তর তাই ব্যক্তির ঈমানি প্রত্যাবর্তনের পাশাপাশি বাংলা কাব্য-সাহিত্যের পরিমণ্ডলে এক নতুন নন্দনতাত্ত্বিক ধারা প্রতিষ্ঠারও সূত্রপাত।

উত্তরপ্রজন্মের কবি-সাহিত্যিকদের কাছে আল মাহমুদের জীবন ও সাহিত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশ; যেখানে কাব্য ও ঈমান, ঐতিহ্য ও আধুনিকতা, আত্মিক অন্বেষা ও বৌদ্ধিক সততা একই স্রোতে প্রবাহিত হতে পারে। তাঁর সৃষ্টিবিশ্ব প্রমাণ করে, সত্যিকারের সৃষ্টিশীলতা কখনোই বিশ্বাসের বিরোধী নয়; বরং সত্যনিষ্ঠা, নীতিবোধ ও অন্তর্দর্শনের ওপর দাঁড়ানো সৃষ্টিসম্ভারই সময়কে অতিক্রম করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পথরেখা তৈরি করতে সক্ষম।

কবির একটি বিখ্যাত কবিতাংশ দিয়ে আমরা এই রচনার সমাপ্তি টানছি-

উদিত নক্ষত্র আমি। শূন্যতার বিরুদ্ধগামী, পূর্ণ করে তুলেছি বিস্তার।

আমি আলো, দীপ্ত করে তুলেছি পৃথিবী।

আমি তাল মাত্রা বাদ্যযন্ত্র ছাপিয়ে ওঠা আত্মার ক্বেরাত।

আরম্ভ ও অন্তিমের মাঝখানে স্বপ্ন দেখি সূর্যের সিজদারত নিঃশেষিত

আগুনের বিনীত গোলক।

নবি ইব্রাহিমের মত অস্তগামীদের থেকে আমি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি।

আমিও জেনে গেছি কে তুমি কখনো অস্ত যাও না। কে তুমি চির বিরাজমান!

তোমাকে সালাম। তোমার প্রতি মাথা ঝুঁকিয়ে দিয়েছি। এই আমার রুকু,

এই আমার সিজদা।’[42]


[1] আল মাহমুদ-রচনাবলি, ঐতিহ্য, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ৩৮৫, বই, কবিতার জন্য বহুদুর ১৯৯৭।

[2] আল মাহমুদ-রচনাবলি, সপ্তম খণ্ড, পৃ. ৩৪২, বই: কবির সৃজনবেদনা ২০০৫।

[3] আল মাহমুদ-রচনাবলি, তৃতীয় খণ্ড, পৃ. ১৫৬-১৫৭, বই: কবির আত্মবিশ্বাস ১৯৯১।

[4] প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৭।

[5] আল মাহমুদ-রচনাবলি, খ. ২, পৃ. ২২-২৩, বই: দিনযাপন ১৯৯০।

[6] আল মাহমুদ-রচনাবলি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ৩৮৭-৩৮৮, বই: কবিতার জন্য বহুদুর ১৯৯৭।

[7] প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৭।

[8] আল মাহমুদ-রচনাবলি, খ. ৩, পৃ. ৯০, বই: কবির আত্মবিশ্বাস ১৯৯১।

[9] প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৫।

[10] প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৬।

[11] আল মাহমুদ-রচনাবলি, পঞ্চম খণ্ড, পৃ. ৩৩-৩৪।

[12] আল মাহমুদ-রচনাবলি, ত্রয়োদশ খণ্ড, পৃ. ১২৫, বই: দশ দিগন্তে উড়াল ২০১০ ।

[13] আল মাহমুদ-রচনাবলি, পঞ্চম খণ্ড, পৃ. ৩৪।

[14] আল মাহমুদ-রচনাবলি, পঞ্চম খণ্ড, পৃ. ৩৫-৩৬।

[15] প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫।

[16] প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫-৩৬।

[17] আল মাহমুদ-রচনাবলি, ত্রয়োদশ খণ্ড, পৃ. ৫৮, বই: দশ দিগন্তে উড়াল ২০১০।

[18] আল মাহমুদ-রচনাবলি সপ্তম খণ্ড, পৃ. ৩৪৭-৪৮, বই: কবির সৃজনবেদনা ২০০৫।

[19] প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪৮, বই: কবির সৃজনবেদনা ২০০৫।

[20] আল মাহমুদ-রচনাবলি, দ্বাদশ খণ্ড, পৃ. ৪৪, বই: সময়ের সাক্ষী, ২০০৫।

[21] প্রাগুক্ত।

[22] প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫।

[23] প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩৬-৩৩৭।

[24] প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩৭-৩৩৮।

[25] প্রাগুক্ত, পৃ. পৃ. ৩৪৪।

[26] আল মাহমুদ-রচনাবলি-১৩ খ. পৃ. ৫৭, বই: দশ দিগন্তে উড়াল ২০১০।

[27] আল মাহমুদ-রচনাবলি-১৩ খ. পৃ. ১২৭, বই: দশ দিগন্তে উড়াল ২০১০।

[28] আল মাহমুদ-রচনাবলি তৃতীয় খণ্ড, পৃ. ৮৮, বই: কবির আত্মবিশ্বাস, ১৯৯১।

[29] আল মাহমুদ-রচনাবলি, ত্রয়োদশ খণ্ড, পৃ. ২২৭-৮, বই: দশ দিগন্তে উড়াল ২০১০।

[30] আল মাহমুদ-রচনাবলি, দশম খণ্ড, পৃ. ১৫০, বই: বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ ২০০৭।

[31] আল মাহমুদ-রচনাবলি চতুর্থ খণ্ড, পৃ. ৪১, বই: নারী নিগ্রহ ১৯৯৭।

[32] আল মাহমুদ-রচনাবলি, চতুর্থ খণ্ড, পৃ. ৪১-৪৩, বই: নারী নিগ্রহ ১৯৯৭।

[33] আল মাহমুদ-রচনাবলি তৃতীয় খণ্ড, পৃ. ৮৯, বই: কবির আত্মবিশ্বাস ১৯৯১।

[34] বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য, মতিউর রহমান, পৃ. ২০০, ইসলামিক সেন্টার, ঢাকা। দ্র. উপমা/আল মাহমুদ সংখ্যা, ১৯৯৪, পৃ. ২৫-২৬।

[35] আল মাহমুদ-রচনাবলি, দশম খণ্ড, পৃ. ২৫২-২৫৩, বই: বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ ২০০৭।

[36] আল মাহমুদ-রচনাবলি, ত্রয়োদশ খণ্ড, পৃ. ২২৭, বই: দশ দিগন্তে উড়াল ২০১০।

[37] বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০০।

[38] আল মাহমুদ-রচনাবলি দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ৩৮৮, বই: কবিতার জন্য বহুদূর ১৯৯৭।

[39] প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৬৯।

[40] বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য, প্রাগুক্ত, পৃ. ২১১।

[41] আল মাহমুদ-রচনাবলি, সপ্তম খণ্ড, পৃ. ৩৩২-৩৪, বই: কবির সৃজনবেদনা ২০০৫।

[42] আল মাহমুদ-রচনাবলি, খন্ড ১১, পৃ. ৮৪-৮৫, (কবিতা ‘হে আমার আরম্ভ ও শেষ’), বই: দোয়েল ও দয়িতা ১৯৯৭।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *