খ্রিষ্টীয় সতেরো শতকের ফ্রান্সের কথা বলতে গিয়ে সভ্যতার ইতিহাসকার উইল ডুরান্ট তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য স্টোরি অফ সিভিলাইজেশন’-এ এক নিচ্ছিদ্র অন্ধকারের বর্ণনা দিয়েছেন। সেই সময়ে ফ্রান্সের শহরগুলো রাতে ডুবে থাকত আদিম কালিমায়। সেই শহরগুলোতে তখনো রাতের আলো জ্বলতে শেখেনি। এমনকি রাজধানী প্যারিসও ছিল আলোহীন। ইতালির দৃশ্যপটও আলাদা কিছু ছিল না। সেখানকার প্রধান সড়কগুলোতেও রাতে বাতি জ্বলত খুব কম। অথচ একই সময়ে পূর্ব আর পশ্চিমের মুসলিম জনপদগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় ভিন্ন ছবি। ডুরান্টের নিজের সাক্ষ্যেই উঠে এসেছে—সেই শহরগুলো রাতে ছিল আলোকোজ্জ্বল, আর দিনের তপ্ত দ্বিপ্রহরে পথচারীদের জন্য ছিল ছায়াঘেরা সুশীতল রাস্তার বন্দোবস্ত।
একজন কালভ্রমণকারী যদি ইতিহাসের পাতায় ঘুরে বেড়ান, তবে মুসলিম নগরায়নের এই রূপ দেখে তিনি গভীরভাবে বিস্মিত না হয়ে পারবেন না। মুসলিমরা শহর বা নগরায়নের ধারণাটি আত্মস্থ করেছিল অনেক আগেই, সেই হিজরতের সময় থেকেই। তারা বুঝেছিল, একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য নগরই হলো মূল ভিত্তি। নাগরিক সভ্যতা ও নগরায়নের গভীর ভিত্তি ছাড়া কোনো সভ্যতা বা রাষ্ট্র এত অবিশ্বাস্য গতিতে বিকশিত হতে পারত না।
শুরু থেকেই মরুজীবন ত্যাগ করে ‘মদিনা’ বা শহরের দিকে গমনের যে নববি নির্দেশনা আমরা দেখতে পেয়েছি, তা ছিল ইসলাম গ্রহণকারীদের জন্য একপ্রকার আবশ্যিক পরামর্শ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাঁর ‘কাসওয়া’ নামের উটনী থেকে অবতরণ করেছেন, তখন থেকেই নতুন নগরের পরিকল্পনা ও স্থাপত্যের মাঝে এক সচেতন নাগরিক বোধ কাজ করছিল। তাঁর মূল মনোযোগ ছিল মসজিদ আর বাজারের মধ্যে এক ধরনের যুগলবন্দী তৈরি করা। মুহাজির ও আনসারদের মাঝে তিনি কেবল ঈমানি ভ্রাতৃত্বই গড়েননি, তৈরি করেছিলেন এক অনন্য নাগরিক সহাবস্থান। যা তৎকালীন আরবের জনপদগুলোর কাছে ছিল একেবারেই অপরিচিত।
ইসলামি শহর আসলে এক মানবিক পরিসর। যেখানে মানুষ, স্থাপত্য আর শৈল্পিক নিষ্ঠা একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। সেখানে মসজিদ দাঁড়িয়ে থাকে এক আলোকবর্তিকা হয়ে, যার সুউচ্চ মিনারের নজরদারিতে থাকে পুরো শহর। শহরের রাস্তাগুলো সুবিন্যস্ত এবং চলাচলের জন্য মসৃণ। কারণ পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলাকে ইসলামে ঈমানের অঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সেইসাথে পানির সুব্যবস্থা, ঝরনা আর ভিস্তিওয়ালাদের কল্যাণে জনপদে বইতে থাকে নির্মল পানির ধারা।
বিজয় আর সামরিক অভিযানের প্রয়োজনে কুফা, বসরা কিংবা ফুসতাতের মতো অনেক শহরের জন্ম হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সামরিক দাপট সেখানে নাগরিক আত্মাকে কখনোই পরাজিত করতে পারেনি। জ্ঞানচর্চার হালাকা, চিন্তার মজলিস আর সাহিত্যের আড্ডাই ছিল সেখানকার প্রধান সুর। সেখানেই জন্ম নিয়েছে নানা শিল্পকলা, সংকলিত হয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আকরসমূহ, আর প্রতিটি শাখায় তৈরি হয়েছে কালজয়ী সব মনীষী ও ইমাম।
রাষ্ট্র যখন কৃষি থেকে বাণিজ্যের দিকে মোড় নেয়, তখন বাজার আর শিল্প-কারখানাগুলো হয়ে ওঠে নগরের স্তম্ভ। অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়, বিকাশ ঘটে নানা পেশা ও শিল্পের। সেখানে ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ পরস্পরের মুখোমুখি হয়, তৈরি হয় এক অসাধারণ সহাবস্থান। আর এই সবকিছুর প্রয়োজনে গড়ে ওঠে সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসালয় আর সেবাকেন্দ্রের এক অন্তহীন বিন্যাস।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা এই মুসলিম শহরগুলোর মাঝে প্রচুর বৈচিত্র্য ছিল, সভ্যতায় তাদের অবদানও ছিল ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু তাদের স্থাপত্যের দিকে গভীর নজরে তাকালে মনে হয়, এই সবকিছুর পেছনে কাজ করছে কোনো এক কেন্দ্রীয় প্রকৌশলী মস্তিষ্ক কিংবা কোনো এক দূরদর্শী স্বপ্নদ্রষ্টার কল্পনা। কারণ এই স্থাপত্যের জ্যামিতিক কোণ আর আয়তনে ভিন্নতা থাকলেও, এর ভেতরে এক ধরনের আত্মিক ঐক্য আর নান্দনিক সংহতি মিশে আছে।
আসল সত্যটি হলো, ইসলামি নগরায়নের এই যে সুশৃঙ্খল সামঞ্জস্য, তা কোনো আরোপিত বিষয় ছিল না; বরং তা ছিল স্থপতিদের সাংস্কৃতিক চেতনার এক স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ। স্থপতিরা ইসলামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে এতটাই নিমগ্ন ছিলেন, তাঁদের নির্মাণশৈলী আর শিল্পকলায় সেই দর্শনের ছাপ পড়াটাই ছিল স্বাভাবিক। এই নিবন্ধে আমরা সেই পুরোনো গল্পের ভেতরেই নতুন করে প্রবেশ করব, যার বিন্যাস এবং উপস্থাপনা দুটোই হবে স্বতন্ত্র।
একটি অনুপ্রেরণাদায়ী অভিজ্ঞতা
ইসলামি নগর পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল আসলে ভ্রাতৃত্ব আর সংহতিকে ইটের পাঁজরে গেঁথে দেওয়া। হিজরতের আগের মদিনার দিকে তাকালে এক বিচ্ছিন্ন জনপদ চোখে পড়ে। সেখানে ইহুদিদের দুর্গ, আউস গোত্রের বসতি আর খাজরাজদের এলাকাগুলো ছিল আলাদা আলাদা। ঐতিহাসিক ওয়াকিদি তাঁর ‘আল-মাগাজি’ গ্রন্থে লিখেছেন—‘নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যখন মদিনায় আগমন করেন, তখন সেখানকার অধিবাসীদের মাঝে ছিল এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। একদিকে ইসলামের আহ্বানে জড়ো হওয়া মুসলমান, অন্যদিকে অস্ত্রধারী ইহুদি সম্প্রদায়, আর তাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আউস ও খাজরাজ গোত্রের মিত্ররা। নবিজি চেয়েছিলেন এই বৈচিত্র্যময় জনপদের সবার মাঝে একটা সন্ধি আর সামাজিক সংস্কারের আবহ তৈরি করতে।’
ইবনে হিশামের বর্ণনা মতে—‘নবিজির প্রথম নির্মাণ কাজ ছিল তাঁর মসজিদ এবং এর চারপাশে তাঁর স্ত্রীদের জন্য আবাসস্থল গড়ে তোলা। এরপর তিনি মসজিদের চারপাশের খালি জায়গাগুলোতে মানুষকে বসতি স্থাপনের সুযোগ দেন। মসজিদটি হয়ে ওঠে সবার কেন্দ্রবিন্দু এবং ঐক্যের প্রতীক।’
ইয়াকুত হামাভি তাঁর ‘মুজামুল বুলদান’ গ্রন্থে বিষয়টি এভাবে তুলে ধরেছেন—‘মক্কা থেকে হিজরত করে আসার পর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের মধ্যে জমি বণ্টন করে দেন; ফলে প্রতিটি পাড়ায় নির্দিষ্ট গোত্র বা বংশের মানুষেরা নিজ নিজ ঘরবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস শুরু করে।’
এভাবেই নবুওয়তের যুগে ইসলামি নগর পরিকল্পনার রূপরেখাটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল স্থাপত্যের মাধ্যমে মানুষের আত্মীয়তার বন্ধনকে মজবুত করা এবং গোত্রগত বিভেদগুলোকে ধুয়ে মুছে দেওয়া। মসজিদ কেবল একটি উপাসনালয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে সেই জনপদের সামাজিক ও আত্মিক মিলনস্থান। যার চারপাশ ঘিরে থাকবে মানুষের ঘরবাড়ি ও পাড়া-মহলা। সেখানেই তাদের যাতায়াত, সেখানেই তাদের জমায়েত আর সেখানেই তাদের কাতার ও হৃদয়গুলো একসূত্রে মিলিত হবে।
নবিজি চেয়েছিলেন পুরো শহরের জন্য একটাই বাজার থাকবে। লক্ষ্য ছিল মদিনার ইহুদিদের অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে মুসলমানদের মুক্ত করা। মাকরিজি ‘ইমতাউল আসমা’ গ্রন্থে একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। একবার নবিজি একটি জায়গা দেখিয়ে বলেন, ‘এটাই তোমাদের বাজার।’ ইহুদি নেতা কাব বিন আশরাফ এসে রাগের মাথায় সেই বাজারের তাঁবুর রশিগুলো কেটে ফেলে। নবিজি তখন শান্তভাবে বলেন, ‘আমি এমন জায়গায় এই বাজার সরিয়ে নেব, যা তার জন্য আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক হবে।’ তিনি বাজারটি মদিনার বর্তমান জায়গায় সরিয়ে আনেন এবং ঘোষণা করেন, ‘এখানে কারও একচেটিয়া অধিকার থাকবে না, দিতে হবে না কোনো অতিরিক্ত কর।’
মদিনার ভৌগোলিক বিন্যাসে এমন সব রাস্তা বা গলি ছিল, যা বিভিন্ন পাড়াকে সরাসরি মসজিদে নববির সঙ্গে যুক্ত করত। ইমাম আহমাদের ‘মুসনাদ’-এ মদিনার গলিগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায়। ইবনু শাব্বার বর্ণনা অনুযায়ী, খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব প্রায়ই মদিনার এই গলিগুলোতে ঘুরে বেড়াতেন জনগণের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য।
শহরের প্রশাসনিক শৃঙ্খলার অংশ হিসেবে মেহমানদের জন্য আলাদা একটি থাকার জায়গা বা ‘দারুল যিয়াফাহ’ তৈরি করা হয়েছিল। আব্দুর রহমান বিন আউফের একটি বিশাল বাড়িতে এই অতিথিশালাটি ছিল, যেখানে নবিজির কাছে আসা দেশি-বিদেশি অভ্যাগতরা আশ্রয় নিতেন। এজন্য বাড়িটি দারুয যাইফান বা মেহমানখানা নামেই পরিচিতি লাভ করে।
নবিজি মদিনার পানির নিরাপত্তার দিকেও বিশেষ নজর দিয়েছিলেন। তিনি বিত্তবান সাহাবিদের উদ্বুদ্ধ করতেন কূপ কিনে তা সাধারণ মানুষের জন্য ওয়াকফ করে দিতে। খলিফা উসমানের সেই বিখ্যাত উক্তিটি এখানে স্মরণীয়। তাকে যখন বিদ্রোহীরা ঘেরাও করেছিল, তখন তিনি এই স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমরা কি জানো, আল্লাহর রাসুল যখন মদিনায় আসেন, তখন বিরে রুমা বা রুমা কূপ ছাড়া আর কোনো মিষ্টি পানির উৎস ছিল না? তিনি বলেছিলেন, কে এই কূপটি কিনে মুসলমানদের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে? বিনিময়ে জান্নাতে তার জন্য উত্তম কিছু থাকবে। তখন আমি নিজের সম্পদ দিয়ে সেটি কিনে নিয়েছিলাম।’
নতুন যুগ
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিকের শাসনামলের শেষ দিকে শুরু হয় ইসলামি বিজয়াভিযানের নতুন এক অধ্যায়। খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবের সময়ে সেই জয়যাত্রা ছড়িয়ে পড়ে ইরাক, পারস্য, সিরিয়া আর মিশরের সীমান্তে। এই বিশাল বিস্তৃতির ফলে তখন এমন কিছু শহরের প্রয়োজন দেখা দেয়, যা হবে মুসলিম বাহিনীর অগ্রবর্তী সামরিক ঘাঁটি।
দক্ষিণ ইরাকে কুফা আর বসরা শহর প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ‘ইসলামি শহর’ নির্মাণের সেই নতুন যুগের সূচনা হয়। ইমাম তাবারি বলছেন, ১৭ হিজরি নাগাদ এই শহর দুটির জন্ম। খলিফা উমরের নির্দেশে এই শহরগুলোর নকশা করা হয়েছিল মদিনার সেই আদি মডেল অনুসরণ করে। প্রথম হিজরি শতকের বাকি শহরগুলো—যেমন ফুসতাত (২১ হিজরি), কাইরাওয়ান (৫০ হিজরি) কিংবা ওয়াসিত (৭৫ হিজরি)—গড়ে উঠেছিল প্রায় একই ছাঁচে।
এমনকি পারস্য, খোরাসান, সিরিয়া বা মিসরের যেসব প্রাচীন শহর মুসলিমরা জয় করেছিলেন, সেখানেও তারা নববি স্থাপত্য-দর্শনের অনুসারী ছিলেন। স্থানীয়দের বসতিতে কোনো বিঘ্ন না ঘটিয়ে তারা পরিত্যক্ত বা উন্মুক্ত স্থানগুলোতে যোদ্ধাদের আবাসন ও নতুন খিত্তা বা মহল্লা গড়ে তুলেছিলেন। ঐতিহাসিক বালাজুরি তাঁর ‘ফুতুহুল বুলদান’ গ্রন্থে হিমস শহরের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘শহরটিকে মুসলিমদের মধ্যে বিভিন্ন খিত্তায় ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। তারা মূলত সেইসব জনশূন্য বা পরিত্যক্ত এলাকায় বসতি স্থাপন করেছিলেন, যেখানকার আদি বাসিন্দারা চলে গিয়েছিল।’
সময় গড়ায়। খেলাফতে রাশেদার পর নতুন মুসলমানের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। ফলে কুফা, বসরা আর ফুসতাতের মতো এককালের সেই সামরিক শহরগুলো ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ সভ্য নগরীর রূপ পরিগ্রহ করে। সেখানে নানা ধর্ম, নানা সংস্কৃতি আর নানা চিন্তার স্রোত এসে মিশ্রিত হয়। মসজিদের মিম্বর থেকে ছড়িয়ে পড়ে শরিয়ত আর সাহিত্যের পাঠ। বাজারে প্রাণ লাভ করে নানা কারুশিল্প।
কিন্তু রাজনীতির চোরাস্রোত আর ক্ষমতার নিরাপত্তা বলে একটা কথা আছে। ফলে প্রয়োজন দেখা দেয় এমন কিছু শহরের, যা হবে অনেকটা দুর্গের মতো—যেখানে ভিন্নমতাবলম্বী বা বিদ্রোহীদের হট্টগোল থাকবে না। এভাবে জন্ম নেয় বাগদাদ, কায়রো, মাহদিয়া কিংবা কর্ডোভার আজ-জাহরা ও আজ-জাহিরা। মরক্কোর ফাস, মারাকেশ আর রাবাতও এই তালিকায় পড়ে। আধুনিক যুগের আগ পর্যন্ত এই শহরগুলোই ছিল ‘রাজনৈতিক ইসলামি শহরের’ প্রতিচ্ছবি। এগুলো মূলত গড়ে উঠেছিল রাজকীয় শহর হিসেবে, যার দেয়ালের বাইরে সাধারণ মানুষের জন্য গড়ে উঠেছিল নানা উপশহর ও পাড়া। শহরের কেন্দ্রে থাকত শাসকগোষ্ঠীর প্রাসাদ ও দুর্গ। এর উদ্দেশ্য ছিল একটাই—পুরোনো রাজধানীর রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা।
সামরিক আর রাজনৈতিক এই শহরগুলোর সমান্তরালে নদী আর সমুদ্রের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলো। তবে এই বিশাল মানচিত্রের হৃদপিণ্ডে সবসময় সগৌরবে টিকে ছিল তিনটি পবিত্র নগরী—মক্কা, মদিনা আর আল-কুদস তথা জেরুজালেম। ইসলামের ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকেই মুসলমানদের আত্মিক জগতে এগুলোর স্থান ছিল সবার ওপরে। যদিও মক্কা আর জেরুজালেমের পবিত্রতা ইসলামের আগমনেরও বহু শতাব্দী আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিল।
এক ধ্রুপদী শৃঙ্খলা
শহরগুলোর কাজের ধরন ভিন্ন ছিল, রাজনৈতিক গুরুত্বের বিচারে তাদের আকার কিংবা সভ্যতায় অবদানের মাত্রাও ছিল আলাদা; তবুও তারা সবাই ছিল এক গভীর সাধারণ সূত্রে বাঁধা। তাদের স্থাপত্য আর নাগরিক অবয়ব দেখলে মনে হতো, তারা সবাই একই ধর্মীয় উৎস থেকে উৎসারিত এক সুসংহত জীবনবোধের অনুসারী। পরবর্তী অনুচ্ছেদগুলোতে আমরা দেখব, ভিন্ন ভিন্ন দেশ আর ভিন্ন ভিন্ন কাল হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে এক অভিন্ন মানদণ্ড এই শহরগুলোর পরিকল্পনা, প্রশাসন, নাগরিক সুবিধা আর জীবনদর্শনকে এক সুতোয় গেঁথেছিল।
উইল ডুরান্টের বর্ণনায় এই শহরগুলোর এক চমৎকার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি বলছেন, মুসলিম বিশ্বের নানা প্রান্তে এমন সব বড় বড় শহর গড়ে উঠেছিল, যেখানে ইসলামি সভ্যতা তার সৌন্দর্য, জ্ঞান আর সুখের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল। তাঁর মতে, রুচি, স্বাচ্ছন্দ্য, শিক্ষা আর রণকৌশল—সবদিক থেকেই এই সভ্যতা তৎকালীন খ্রিস্টীয় সভ্যতার চেয়ে অনেক বেশি মার্জিত আর উন্নত ছিল।
ইসলামের শুরুর যুগ থেকেই ধর্মীয়, সামাজিক বা স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত সকল জনকল্যাণমূলক কাজ শাসকগোষ্ঠীর প্রধান দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হতো। ইসলামি রাজনৈতিক দর্শনে যাকে বলা হয় ‘মাকাসিদুশ শরিয়া’ বা শরিয়তের উদ্দেশ্য। এর মূল লক্ষ্যই হলো মানুষের তিন স্তরের স্বার্থ রক্ষা করা—মৌলিক বা অপরিহার্য প্রয়োজন (Necessities), সাধারণ প্রয়োজন (Needs) এবং সৌন্দর্যবর্ধন বা বিলাসিতা (Refinements)।
ইবনুল ফকিহ আল-হামাদানি তাঁর ‘আল-বুলদান’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিক ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি মসজিদগুলোর সম্প্রসারণ ও নির্মাণে প্রভূত অবদান রেখেছিলেন। তিনি মসজিদে হারাম, মসজিদে নববি, মসজিদে কুবা এবং দামেস্কের জামে মসজিদের সংস্কার ও উন্নয়ন করেন। তিনিই প্রথম মক্কা থেকে সিরিয়া পর্যন্ত রাস্তার ধারে পানির কূপ খনন করেন এবং রোগীদের সেবার জন্য ‘বিমারিস্তান’ বা হাসপাতাল নির্মাণ করেন।’
শাসকদের এই দায়বদ্ধতা থেকেই প্রাচীন ও নতুন গড়ে ওঠা সকল মুসলিম শহরে নাগরিক সেবার এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। আর এই যাত্রার শুরুটি সবসময় হতো মসজিদের হাত ধরে, যেমনটি হয়েছিল নবিজির যুগে। প্রতিটি ইসলামি ভূখণ্ডের কর্তৃপক্ষ সবসময় সচেষ্ট থাকত যেন জামে মসজিদটি শহরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে স্থাপিত হয়।
আসলে ইসলামি সমাজে নগরায়নের মূল দর্শনটিই ছিল মসজিদকেন্দ্রিক। মসজিদ এখানে কেবল ইবাদতখানা নয়, বরং শরিয়তের সেই সর্বোচ্চ রেফারেন্স—যেখানে সবাই সমান। মসজিদকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতো মানুষের জীবন। এর চারপাশেই গড়ে উঠত ঘরবাড়ি, বাজার, প্রশাসনিক দপ্তর আর স্কুল বা হাসপাতালের মতো সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। লক্ষ্য ছিল মানুষের প্রাণ রক্ষা আর সম্পদের বিকাশ।
১৭ হিজরিতে যখন কুফা নগরীর পত্তন হয়, তখন সবার আগে মসজিদের সীমানা নির্ধারণ ও নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল। এরপর তৎকালীন গভর্নর সাহাবি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস মসজিদের পাশেই বাইতুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার স্থাপন করেন, যাতে তা সবার নজরদারিতে থাকে। তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী, কোষাগারের অবস্থান ছিল মসজিদ থেকে শুরু করে একেবারে ‘দারুল ইমারা’ বা প্রশাসনিক প্রাসাদের সীমানা পর্যন্ত।
আবার ১৪৯ হিজরিতে যখন বাগদাদ শহরের নির্মাণ শেষ হয়, তখনো দেখা যায় একই দৃশ্য। ঐতিহাসিক ইয়াকুবি বলছেন, শহরের কেন্দ্রস্থলে বিশাল চত্বরের মাঝখানে ছিল রাজপ্রাসাদ, আর তার ঠিক পাশেই মসজিদ। সেই প্রাসাদের চারপাশে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি দপ্তর আর একটি বড় ছাউনি ছাড়া অন্য কোনো ভবন ছিল না; যেখানে একদিকে থাকতেন পুলিশ প্রধান আর অন্যদিকে নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর প্রধান।
কেন্দ্রীয় অনুষঙ্গসমূহ
এই শহরগুলোর বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের একটি কেন্দ্রীয় চত্বর বা ময়দান। এই ময়দানকে ঘিরেই আবর্তিত হতো সমাজ, শাসন আর প্রশাসনের প্রধান স্তম্ভগুলো। সেখানে একদিকে যেমন থাকত বিশাল জামে মসজিদ আর শাসকের প্রাসাদ, তার পাশেই থাকত পাহারাদার আর কোতোয়ালদের আস্তানা। ঠিক তার সঙ্গেই থাকত সরকারি কোষাগার বা বায়তুল মাল। আর ছিল মুদ্রা তৈরির টাঁকশাল বা দারুজ জারব। আজকের দিনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর সেই টাঁকশালের মাঝে খুব একটা তফাত নেই।
দশম শতকের প্রখ্যাত বণিক ও পর্যটক ইবনু হাওকাল যখন দেশ বিদেশের শহরগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তিনি রাজধানী বাদে সাধারণ শহরগুলোর এক সূক্ষ্ম প্রশাসনিক চিত্র এঁকেছেন। তিনি বলছেন, সামানি সাম্রাজ্যের অধীনে খোরাসানের প্রতিটি শহরে অন্তত একজন করে কাজি বা বিচারক, একজন ডাক বিভাগের প্রধান বা সাহেবে বারিদ, একজন পাইকারি ব্যবসায়ী বা বুন্দার এবং একজন পুলিশ প্রধান থাকতেন। এছাড়া সেখানে থাকত একদল তথ্য সরবরাহকারী বা গোয়েন্দা, যারা এলাকার সব খবর নিয়মিত পৌঁছে দিতেন স্থানীয় প্রধানের কাছে। আর ছিল খাজনা ও রাজস্ব আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট রাজকর্মচারী।
নবম থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত পর্যটকদের ডায়েরিতে এই শহরগুলোর নাগরিক সুবিধার এক চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায়। পর্যটক-কুলপতি ইবনু বতুতা দীর্ঘ ৩০ বছর মুসলিম বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন। কোনো শহর দেখে যখন তাঁর খুব ভালো লেগে যেত, তখন তার বর্ণনা প্রায়ই এমন হতো—‘শহরটি নাগরিক সুবিধায় ঠাসা, অগণিত মাদরাসা আর মসজিদে ভরা, আর তার বাজারগুলো কী অপরূপ সুন্দর!’
মাকরিজি তাঁর ‘আল-মাওয়ায়িজ ওয়াল ইতিবার’ গ্রন্থে কায়রোর যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে সেখানকার ধর্মীয় আর বৈষয়িক চাহিদার এক অদ্ভুত সংহতি চোখে পড়ে। তিনি বলছেন, ‘সেখানে বাগান আর প্রমোদকেন্দ্রের পাশেই আছে রাজপ্রাসাদ আর সাধারণ ঘরবাড়ি। বড় বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র বা শপিং মলের পাশে আছে সারি সারি দোকান আর সরাইখানা। রাস্তার অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে আছে ছোট-বড় মসজিদ, সুফিদের খানকা, শিক্ষালয় আর বিশ্রামাগার। এমনকি মৃতদের জন্য কবরস্থানও ছিল এই সুশৃঙ্খল পরিকল্পনার অংশ।
তবে শহর টিকে থাকার প্রধান শর্ত ছিল পানি। তাই শহরগুলো গড়ে উঠত হয় কোনো বড় নদীর তীরে—যেমন দজলার পাশে বাগদাদ কিংবা নীল নদের কোলে কায়রো; অথবা কোনো ঝরনা বা কূপের কাছে—যেমন মক্কা, মদিনা কিংবা জেরুজালেম। নদীর পাড়ের শহরগুলোতে তাই সাক্কা বা ভিস্তিওয়ালাদের এক বিশাল কর্মতৎপরতা দেখা যেত। তারা নদী থেকে পানি বয়ে এনে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিত।
খলিফা আল-মানসুরের তৈরি সেই গোলাকার বাগদাদ শহরে আমরা সিক্কাতুস সাক্কায়িন বা ভিস্তিওয়ালাদের গলি নামে একটি রাস্তার সন্ধান পাই, যা দক্ষিণে বসরা গেট থেকে পূর্বের খোরাসান গেট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ধারণা করা হয়, এই গলির বাসিন্দারা পেশায় ছিলেন পানি সরবরাহকারী। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই যুগে বড় বড় আলেমদের অনেকে এই ভিস্তির পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। বাহর বিন কুনিজ ছিলেন তেমনই একজন প্রখ্যাত সাক্কা বা ভিস্তিওয়ালা।
আবার ইবনুল ফকিহ আল-হামাদানি যখন আব্বাসি খেলাফতের একসময়ের রাজধানী সামাররা শহরের বর্ণনা দিচ্ছেন, তখন উঠে আসছে এক রুক্ষ বাস্তবতার কথা। সামাররার মানুষ মূলত নদীর পানির ওপর নির্ভর করত। দহনকালে নদীর পানি কমে গেলে বা পানির কষ্ট বাড়লে এক এক মশক পানির দাম কয়েক গুণ বেড়ে যেত। অথচ বাগদাদের চিত্র ছিল ভিন্ন। নদীর পাশে হওয়া সত্ত্বেও বাগদাদের মানুষের ঘরে ঘরে নিজস্ব কূপ ছিল। সেই কূপের মিষ্টি পানি তাদের নদীর মুখাপেক্ষী হতে দিত না। তারা ছিল স্বাধীন, তৃষ্ণায় আর যন্ত্রণায়।
জলরেখা
পারস্যের পর্যটক নাসির খসরু তাঁর ‘সফরনামা’য় পঞ্চম হিজরি শতকের চল্লিশের দশকে ফাতেমি আমলের কায়রোর পানি সরবরাহ ব্যবস্থার কথা বলছেন। তাঁর বর্ণনায়— ‘নীল নদ থেকে উটের পিঠে করে পান করার পানি বয়ে আনত ভিস্তিওয়ালারা। নদীর তীরের কাছের কূপগুলোর পানি মিষ্টি, কিন্তু দূরে গেলেই তা নোনা হয়ে ওঠে।’
সময় গড়ানোর সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ফলে এই ভিস্তিওয়ালাদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। খসরু লোকমুখে শোনা এক বিশাল সংখ্যার কথা উদ্ধৃত করে লিখেছেন—‘কায়রো আর মিশরে তখন বাহান্ন হাজার উট কেবল পানি টানার কাজে নিয়োজিত ছিল। এ তো গেল উটের কথা, এর বাইরেও অসংখ্য মানুষ পিঠে করে তামার কলস বা চামড়ার মশকে পানি বইত। সেইসব সরু অলিগলি—যেখানে উট ঢুকতে পারে না—সেখানে এই মানুষগুলোই ছিল ভরসা।’
খসরুর সময়ের সেই বিশাল সংখ্যা পরবর্তীকালে হয়তো কিছুটা কমে এসেছিল। কিন্তু চতুর্দশ শতকে ইবনু বতুতা যখন কায়রোতে পা রাখলেন, তাঁর চোখেও সংখ্যাটা নেহাত কম ছিল না। তিনি লিখেছেন—‘তখনো ১২ হাজার ভিস্তিওয়ালা উটের পিঠে করে পানি বইত, আর ভারবাহী পশু ভাড়া দেওয়ার লোক ছিল প্রায় ৩০ হাজার।’
তবে চমকপ্রদ তথ্য হলো, কোনো কোনো মুসলিম শহরে তখন মাটির নিচ দিয়ে তৈরি হয়েছিল পানির এক উন্নত নেটওয়ার্ক। ইবনু খালদুন তাঁর ‘মুকাদ্দিমা’য় ব্যাখ্যা করেছেন—কীভাবে নদী বা উৎস থেকে পানি টেনে এনে ভূগর্ভস্থ নালীর মাধ্যমে মানুষের অন্দরমহলে পৌঁছে দেওয়া হতো।
ইবনুল ফকিহ আল-হামদানি বাগদাদের এই প্রকৌশল নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। তিনি একটি খালের কথা বলছেন যা শহরের ভেতর দিয়ে গিয়ে প্রতিটি মহল্লায় ছড়িয়ে পড়েছে। শীত কি গ্রীষ্ম—সব ঋতুতেই সেখানে পানি থাকত। নকশাটা ছিল এমন নিখুঁত যে, কখনোই পানির প্রবাহ থামত না। একইভাবে ইবনু হাওকাল খোরাসানের রাজধানী নিশাপুরের বর্ণনায় বলেছেন, সেখানেও মাটির নিচ দিয়ে বয়ে চলত শীতল জলের ধারা। গ্রীষ্মে সেই পানি থাকত বরফশীতল। শহরের বাইরে সেই পানি সেচ দিত আবাদি জমিতে, আর শহরের ভেতর তা মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে বেড়াত।
আন্দালুসের পর্যটক ইবনু জুবাইর যখন ১১৮৮ সালে আলেকজান্দ্রিয়া ভ্রমণ করেন, তিনি অবাক হয়ে দেখেন—নীল নদের পানি মাটির নিচের সুড়ঙ্গ দিয়ে শহরের প্রতিটি বাড়ি আর অলিগলিতে পৌঁছে যাচ্ছে। সেখানকার কূপগুলো একে অপরের সাথে যুক্ত ছিল, যেন এক অদৃশ্য জলপ্রবাহের জাল।
আবার আন্দালুসিয়ার যেসব শহর নদীর তীরে নয়, বরং উঁচু পাহাড়ে বা দুর্গের ভেতর ছিল, সেখানেও পানির অভাব ছিল না। যেমন ভূমধ্যসাগর তীরের মালাগাতে অসংখ্য কূপ ছিল এবং সাধারণ মানুষ সেই কূপের পানিই পান করত। এমনকি কর্ডোভা থেকে দেড়শ কিলোমিটার দূরের দুর্জয় বারবাস্ট্রো দুর্গেও অতি সামান্য শ্রমে কূপ খনন করে পানি পাওয়া যেত বলে ইবনু আবদিল মুনঈম আল-হিমইয়ারি তার বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন।
নিরাপত্তা সক্ষমতা
মানুষের জানমাল, ইজ্জত আর ব্যবসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল এই শহরগুলোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তাই শহর পত্তনের সময় থেকেই আইন-শৃঙ্খলার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। খেলাফতে রাশেদার আমল থেকেই যে পুলিশি ব্যবস্থার বীজ বপন করা হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে মুসলিম শহরগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মূল স্তম্ভ হয়ে দাঁড়ায়। নতুন শহর হোক বা পুরোনো বিজিত শহর—নিরাপত্তার এই কাঠামো ছিল সর্বত্রই সমান।
শহরগুলোর ভেতরে পুলিশের স্থায়ী কেন্দ্র বা ফাঁড়ি ছিল, যাকে বলা হতো মজলিসুশ শুরতাহ। ইয়াকুবির বর্ণনায় পাওয়া যায়—বাগদাদের বিশাল রাজপথের ধারেই ছিল এই পুলিশ কেন্দ্র এবং তার গা ঘেঁষেই বড় কারাগার। রাস্তার দুই পাশে মানুষের ঘরবাড়ি আর বাজারের হট্টগোল থাকলেও মাঝখানে এই নিরাপত্তা কেন্দ্রটি ছিল এক ধরনের অদৃশ্য পাহারা। এমনকি কিছু রাস্তার নামকরণও হতো পুলিশি দপ্তরের নাম অনুসারে। যেমন বাগদাদের সিক্কাতুশ শুরতাহ, যা বসরা গেট থেকে কুফা গেট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে দামেস্কে উমাইয়া খলিফা মুয়াবিয়ার বাড়ি ‘খাদরা মুয়াবিয়া’কে পুলিশ কার্যালয় এবং টাঁকশালে রূপান্তরিত করা হয়েছিল বলে হাসান আজিজি তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
সময় গড়ানোর সাথে চোর-ডাকাত ও অপরাধী চক্র দমনে এই বাহিনীর সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। আব্বাসীয় খলিফা আল-ওয়াসিকের আমলের একটি ঘটনা। জনৈক চোরের দল রাজপ্রাসাদের ভেতরের সরকারি কোষাগারে সিঁধ কেটে ৪২ হাজার দিরহাম নিয়ে চম্পট দিয়েছিল। কিন্তু রেহাই পায়নি তারা। পুলিশ প্রধান ইয়াজিদ আল-হালওয়ানি ছায়ার মতো পিছু নিয়ে তাদের পাকড়াও করেছিলেন।
পুলিশি ব্যবস্থার এই স্তরবিন্যাস বা চেইন অফ কমান্ড ছিল বেশ নিখুঁত। আব্বাসীয় আমির ইবরাহিম ইবনু মাহদির গ্রেফতার হওয়ার গল্পটি এখানে উদাহরণ হতে পারে। এই আমির এক সময় নিজেকে খলিফা ঘোষণা করে আত্মগোপন করেছিলেন। ইবনু আসির আর ইবনু খালদুনের বর্ণনায় দেখা যায়—শহরের অলিগলিতে টহলরত প্রহরীরা প্রথমে তাঁকে চিহ্নিত করে। এরপর তাঁকে হস্তান্তর করা হয় সাহিবুল মাসলাহা বা চেকপোস্টের দায়িত্বশীলের কাছে। সেখান থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আঞ্চলিক পুলিশ কেন্দ্রে বা মজলিসুশ শুরতাতে। সবশেষে বিষয়টি পৌঁছায় খলিফার কানে।
অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে এই বাহিনীর নামধামও পাল্টে যায়। এককালের সাহিবুশ শুরতাহ পরিচিতি লাভ করে শিহনাতুল মদিনা বা শহরের সর্বাধিনায়ক নামে। বাগদাদের ইতিহাসে তেমনই এক বিখ্যাত পুলিশ প্রধান ছিলেন ইমাদুদ্দিন জিনকি। ১১২৭ সালে তিনি যখন এই দায়িত্ব নেন, তখন থেকেই তাঁর বীরত্বের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে এই পদটিই ছিল মসুলে তার মহান জিনকি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ।
কর্মচঞ্চল বাজার
শহর নির্মাতারা জানতেন, বাজারই হলো নগরের হৃদস্পন্দন। তাই প্রতিটি নতুন শহরে ব্যবসা আর অর্থনীতির জন্য বরাদ্দ থাকত নির্দিষ্ট চত্বর। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই বাজারগুলো সাধারণত গড়ে উঠত বড় বড় মসজিদের কোল ঘেঁষে। এই বাজারগুলোর জন্য রাখা হতো বিশাল সব চত্বর বা ময়দান—যার কোনোটি ছিল ছাদযুক্ত, আবার কোনোটি খোলা। খলিফা উমর মনে করতেন, ‘বাজার হলো মসজিদেরই মতো; যে আগে এসে বসবে, বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বা কেনাবেচা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই স্থানের মালিকানা তারই।’ ইতিহাসবিদ তাবারি এই তথ্যই আমাদের জানাচ্ছেন।
কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে এই ব্যবস্থারও বিবর্তন হয়। বাজারগুলো হয়ে ওঠে আরও সুসংগঠিত। সেখানে গড়ে উঠল সুনির্দিষ্ট খিত্তা, গলি, আচ্ছাদিত বিপণিবিতান আর ব্যবসায়ীদের থাকার জন্য পান্থশালা। এই পরিকল্পনার দায়িত্ব নিতেন স্বয়ং খলিফা, গভর্নর কিংবা পদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা। ইয়াকুবি বর্ণনা করেন, খলিফা আল-মনসুর যখন বাগদাদ নির্মাণ করেন, তখন তিনি রাষ্ট্রের আমলাদের ডেকে প্রতিটি উপশহর বা পাড়ায় দোকান ও বাজারের জন্য তাঁর নির্ধারিত নকশা বুঝিয়ে দেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন প্রতিটি পাড়ায় একটি করে ‘সুক জামিয়া’ বা কেন্দ্রীয় বাজার থাকে, যেখানে সব ধরনের পণ্য পাওয়া যাবে।
আব্বাসীয় আমলে তিউনিসিয়াসহ সমগ্র পশ্চিম ইসলামি বিশ্বের গভর্নর হয়ে ইয়াজিদ বিন হাতিম আল-মুহাল্লাবি যখন ১৫৫ হিজরিতে কাইরাওয়ানে প্রবেশ করেন, তখন তিনি বাজারগুলোকে নতুন করে সাজান। ইতিহাসবিদ নাসারি সালাবি তার ‘আল-ইস্তিকসা’ গ্রন্থে লিখেছেন, ইয়াজিদ প্রতিটি পেশা বা শিল্পের জন্য আলাদা আলাদা জায়গা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন।
মরক্কোয় ইদ্রিসি বংশের প্রতিষ্ঠাতা আমির ইদ্রিস যখন ১৭২ হিজরিতে ফাস (Fez) নগরীর পত্তন করেন, তখন তিনি জামে মসজিদের পাশেই একটি ‘কায়সারিয়া’ বা বিশাল বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স গড়ে তুলেন এবং তাকে কেন্দ্র করেই বাজারগুলোকে বিন্যস্ত করেন।
শহরের বিস্তার আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যের গতিও বাড়ে এবং বিশেষায়িত নতুন নতুন বাজারের প্রয়োজন দেখা দেয়। এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলামের তথ্যমতে, অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে খেলাফত যখন কৃষি ও সামরিক নির্ভরতা কাটিয়ে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ও শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তখন বড় বড় শহরগুলোতে পুঁজি ও শ্রমের এক বিপুল সমাবেশ ঘটে। ফলে ইসলামি শহরগুলো সামরিক ঘাঁটি থেকে ধীরে ধীরে বিশাল বাজার আর ‘শেয়ার বাজার’-এ রূপান্তরিত হয়; যা কালক্রমে এক বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ নাগরিক সংস্কৃতির কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
বাণিজ্যের এই বিশালতার এক চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন মাকরিজি। তিনি তাঁর ‘আল-মাওয়ায়িজ’ গ্রন্থে লিখেছেন, কায়রো আর ফুসতাত শহরের উপকণ্ঠে এক সময় এত বেশি বাজার ছিল, যার অধিকাংশই পরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কায়রোর পশ্চিম দেয়ালের বাইরে একটি নির্দিষ্ট এলাকাতেই বাহান্নটি বাজার ছিল যা মাকরিজি নিজে আবাদ অবস্থায় দেখেছিলেন। সেই বাজারগুলোর প্রতিটি দোকানে গড়ে প্রায় ষাটজন করে দোকানদার বসত। অর্থাৎ কেবল ওই একটি এলাকাতেই দোকানের সংখ্যা ছিল প্রায় তিন হাজার। একটি মাত্র শহরের এক প্রান্তের যদি এই অবস্থা হয়, তবে পুরো শহরের বাণিজ্যিক ব্যাপ্তি কল্পনা করাও কঠিন।
একটি ইসলামি রাজধানীর এই বিপুল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক তথ্যগুলোর দিকে তাকালে মার্কিন ঐতিহাসিক উইল ডুরান্টের সেই মন্তব্যের যথার্থতা বোঝা যায়। তিনি তার ‘দ্য স্টোরি অব সিভিলাইজেশন’-এ লিখেছেন—নবম শতাব্দীতে বাগদাদ আর কর্ডোভা শিল্প ও বাণিজ্যের এমন কেন্দ্র ছিল, তাদের সেই কর্মতৎপরতা আর ব্যস্ততার উন্মাদনা বিংশ শতাব্দীর যেকোনো আধুনিক মহানগরীর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো ছিল। যেন এক হাজার বছর আগেই তারা চিনে ফেলেছিল আধুনিক অর্থনীতির সেই চঞ্চল গলিঘুঁজি।
জ্ঞানতাত্ত্বিক বিকাশ
নগরায়নের এই কর্মযজ্ঞ কেবল শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ত্রাণ কিংবা রাস্তাঘাটের মতো নাগরিক সেবায় সীমাবদ্ধ ছিল না; জ্ঞানতাত্ত্বিক বিকাশের প্রতিটি ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল এক প্রবল অনুরাগ। সেই প্রচেষ্টার অগ্রভাগে ছিল বিচিত্র সব উচ্চতর শিক্ষালয় বা মাদরাসা—যেখানে বিজ্ঞানের নানা শাখা আর ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের চর্চা হতো সমান্তরালে।
উইল ডুরান্ট বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়েছিলেন মুসলিম বিশ্বের এই শিক্ষা-বিপ্লবের দিকে। তিনি মুগ্ধতার সঙ্গে ইসলামি বিশ্বের এই শিক্ষা-বিপ্লবের বর্ণনা দিয়েছেন। তার মতে—কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া, জেরুজালেম, বালবিক, আলেপ্পো, দামেস্ক, মসুল, হিমস, তুস আর নিশাপুরের মতো শহরগুলো তাদের বিশাল সব মাদরাসা নিয়ে গর্ব করতে পারত। ১০৬৪ খ্রিষ্টাব্দে (৪৫৫ হিজরি) কেবল বাগদাদেই এই পর্যায়ের ৩০টি মাদরাসা ছিল। সেলজুক উজির নিজামুল মুলক সেখানে আরও একটি মাদরাসা যোগ করেন, যা বিশালত্ব আর নির্মাণশৈলীর আভিজাত্যে আগের সবগুলোকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। জনৈক পর্যটক একে সেই শহরের সবচেয়ে সুন্দর স্থাপত্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ডুরান্ট বাগদাদের এই ‘নিজামিয়া মাদরাসা’র (যা ১০৬৬ খ্রিষ্টাব্দের শেষদিকে চালু হয়) সুযোগ-সুবিধার বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন—সেখানে শরিয়তের চারটি মাজহাবের জন্য পৃথক চারটি বিভাগ ছিল। ছাত্ররা সেখানে নিখরচায় শিক্ষা, খাদ্য আর চিকিৎসাসেবা পেত। এর বাইরেও প্রত্যেকের হাতখরচের জন্য দেওয়া হতো একটি করে স্বর্ণমুদ্রা। মাদরাসার ভেতরেই ছিল নিজস্ব হাসপাতাল, স্নানাগার আর একটি বিশাল লাইব্রেরি, যা ছাত্র ও শিক্ষক সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল।
বস্তুত বাগদাদের নিজামিয়া ছিল উজির নিজামুল মুলকের গড়া সেই বিশাল শিক্ষাশৃঙ্খলের একটি অংশ মাত্র। প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রধান শহরগুলোতে তিনি শিক্ষার এক ঐতিহাসিক জোয়ার বইয়ে দিয়েছিলেন। ইতিহাসে এগুলো ‘নিজামিয়া মাদরাসা’ নামে খ্যাত, যার প্রধান শাখাগুলো ছিল বাগদাদ, বসরা, মসুল, নিশাপুর, ইসফাহান, মার্ভ, হেরাত আর বালখ শহরে।
জ্ঞানতাত্ত্বিক বিকাশের এই ধারায় পাবলিক লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগারগুলোর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। এগুলো কখনো মাদরাসার অংশ হিসেবে থাকত, কখনো বা মসজিদ কিংবা স্বতন্ত্র ভবনে গড়ে উঠত। তৎকালীন ইসলামি বিশ্বের ‘রাষ্ট্রীয়’ লাইব্রেরিগুলো ছিল প্রবাদপ্রতিম—যেমন বাগদাদে আব্বাসীয়দের ‘বাইতুল হিকমাহ’, ফাতেমি আমলে কায়রোর ‘দারুল ইলম’ আর আন্দালুসের উমাইয়া খেলাফতের রাজধানী কর্ডোভার ‘খিজানাতুল উলুম’।
এই লাইব্রেরিগুলো সাধারণ মানুষের জন্য পাঠাগারে বসে পড়া কিংবা বাড়িতে বই নিয়ে যাওয়ার (ইস্যু করা) সুযোগ করে দিত—এমনকি প্রত্যন্ত শহরগুলোতেও। ইবনুল জাওজি তাঁর ‘আল-মুনতাজাম’ গ্রন্থে লিখেছেন—বুয়াইহি উজির বাহরাম বিন মাফিনা ফিরোজাবাদ শহরে একটি গ্রন্থাগার স্থাপন করেছিলেন, যেখানে সাত হাজার খণ্ড বই ছিল।
উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে (১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দ) বাগদাদের মুফতি আল্লামা শিহাবুদ্দিন আলুসি যখন উসমানীয় খেলাফতের রাজধানী ইস্তাম্বুল সফরে যান, তখন তিনি তাঁর ‘গারায়িবুল ইগতিরাব’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন—সেসময় কেবল ওই একটি শহরেই ৫১৮টি মাদরাসা এবং ৩৫টি লাইব্রেরি সচল ছিল।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা
মুসলিম বিশ্বের পূর্ব আর পশ্চিমের বড় শহরগুলোতে যেসব জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যে চিকিৎসার আয়োজনগুলো ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। প্রাচীনরা এই হাসপাতালগুলোকে ডাকত ফারসি এক নামে—‘বিমারিস্তান’ বা ‘মারিস্তান’। কখনো কখনো এর আরবি করা হতো ‘দারুশ শিফা’ বা আরোগ্য নিকেতন, আবার কখনো স্রেফ ‘দারুল মারদা’ বা অসুস্থদের ঘর।
শাসকরা অত্যন্ত নিপুণ মমতায় এই স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে শারীরিক ও মানসিক সব ধরনের রোগের চিকিৎসা দেওয়া হতো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। রোগীর সামাজিক মর্যাদা বা পরিচয় যা-ই হোক না কেন, সেবার ক্ষেত্রে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। এই মানবিক ব্যবস্থাপনার কারণেই উইল ডুরান্টের মতো পশ্চিমা ঐতিহাসিক স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হাসপাতাল নির্মাণ এবং সেগুলোকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামে সজ্জিত করার ক্ষেত্রে একদা মুসলিম বিশ্বই পুরো পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিয়েছিল।
ইতিহাসবিদ মাকরিজি তাঁর ‘আলমাওয়াইজ’ গ্রন্থে মিশরের রাজধানীগুলোতে—সেই ফুসতাত থেকে কায়রো পর্যন্ত—চারশ বছর ধরে গড়ে ওঠা বড় বড় হাসপাতালের এক দীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই হাসপাতালগুলোর প্রতিটিই ছিল কোনো না কোনো আমির, সুলতান কিংবা উজিরের কীর্তি। সময়ের পরিক্রমায় মাকরিজির বর্ণনায় উঠে এসেছে ফাতহ বিন খাকানের মারিস্তান (হিজরি ২৪৭), ইবনু তুলুন মারিস্তান (হিজরি ২৭০), কাফুর ইখশিদি মারিস্তান (হিজরি ৩৫৭), সুলতান মনসুর কালাউনের মনসুরি মারিস্তান (হিজরি ৬৮৯) এবং সুলতান মুয়াইয়্যাদ শাইখের মুয়াইয়্যাদি মারিস্তান (হিজরি ৮২৪)।
উইল ডুরান্ট চারটি প্রধান ইসলামি রাজধানীতে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবার মান নিয়ে বিষদ আলোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রতিটি বড় শহরেই মানসিক রোগীদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল। দামেস্কে সুলতান নুরুদ্দিন জিনকির ১১৬০ খ্রিষ্টাব্দে (৫৫৫ হিজরি) প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটি টানা তিনশ বছর ধরে রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ সরবরাহ করেছে। ঐতিহাসিকদের মতে, রোগীদের পথ্য ও ওষুধ তৈরির জন্য সেই হাসপাতালের চুল্লির আগুন টানা ২৬৭ বছর এক মুহূর্তের জন্যও নেভেনি।
১১৮৪ সালে পর্যটক ইবনু জুবাইর যখন বাগদাদে পা রাখেন, তখন দজলা নদীর তীরে রাজপ্রাসাদের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল হাসপাতালটি দেখে তিনি রীতিমতো স্তম্ভিত হয়েছিলেন। সেখানেও সব চিকিৎসা ও ওষুধ ছিল অবৈতনিক। আর কায়রোতে ১২৮৫ খ্রিষ্টাব্দে (৬৮৪ হিজরি) সুলতান মনসুর কালাউন যে ‘মনসুরি বিমারিস্তান’ নির্মাণ শুরু করেন, তাকে ডুরান্ট মধ্যযুগের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ হাসপাতাল হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ডুরান্ট এর যে সুক্ষ্ণ বিবরণ দিয়েছেন, তা আজকেও অবিশ্বাস্য মনে হয়। সেখানে আলাদা আলাদা রোগের জন্য ছিল পৃথক বিভাগ, ছিল সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ কক্ষ। সেখানে ছিল প্যাথলজি ল্যাব, নিজস্ব ফার্মাসি, বহির্বিভাগ, এমনকি রান্নাঘর আর গোসলখানাও। শুধু তাই নয়, সেখানে ছিল এক সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, ইবাদতের জন্য মসজিদ আর জ্ঞানচর্চার জন্য লেকচার হল। এমনকি মানসিক রোগীদের জন্য এমন সব কক্ষের ব্যবস্থা ছিল যেখান থেকে মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা যেত।
সেখানে ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ কিংবা মুক্ত-দাস নির্বিশেষে সবাই সমান সেবা পেতেন। আরও চমৎকার ব্যাপার হলো, চিকিৎসা শেষে রোগী যখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরত, তাকে কিছু নগদ অর্থ উপহার দেওয়া হতো—যাতে ঘরে ফিরে অন্নের সংস্থানের জন্য তাকে তখনই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে না হয়। আর যাদের রাতে ঘুম হতো না, তাদের জন্য বাজানো হতো মৃদু প্রশান্তিদায়ক সংগীত, পেশাদার গল্পকাররা শোনাতেন অদ্ভুত সব কিসসা। কেউ চাইলে অলস সময় কাটাতে বা জ্ঞান অর্জনের জন্য পড়তে পারতেন ইতিহাসের বই।
[বাকি অংশ পড়বেন আগামী সংখ্যায়।]