গণ-ফেরেশ্তা

ক. উল্লামুড়ির চালের মাথায়

কুতুবুদ্দিন মাস্টার একা একটি ঘরের চকিতে শুয়ে আছেন। কারেন্ট নেই দুপুর থেকে। ঘামে সতর ঢাকা লুঙ্গিটা কোমর-হাঁটু তক ভিজে গেছে। উপরে চ্যাগর-চ্যাগর শব্দে ঘুরা আশির দশকের ফ্যান এখন থমকিয়ে চেয়ে আছে। স্থির পাখা তিনটিতে রাশভারী সংসারের সমস্ত ময়লা উবু হয়ে আঠার মতো লেপটে রয়েছে। আট মাস আগে ছোট পুতের বউ পাকঘরের ত্যানা দিয়ে সর্বশেষ মুছে দিয়েছিল। এরপর কেউ আর উপরে চেয়ে দেখার গরজ দেখালো না। চাল থেকে ঝুলে থাকা তারে দুইশ বোল্ডের লালরঙা বাল্বের ওপর সেঁটে আছে তাপে পোড়া তেলচেটে কালো দাগ। রাতে কখনও বাতি জ্বেলে দিলে কালচে হলুদের কাঁচা আলোয় ভূতুরে ঘর লাগে। এ ঘরের কোণাকাঞ্চিতে আর টিনের চালের নিচে ভাঙা কাঠের সিলিংয়ে মাকড়শার জাল ঘন ঘন বুনেছে। আঙ্গুলের দুই কড়ের সমান পোকামাকড় ঘুর ঘুর করে এতে। 

মাস্টারদার শীর্ণ দেহখানি শুকিয়ে বিছানার সাথে লেগে গেছে। বয়স হয়েছে অনেক। তাছাড়া খেতে পারেন না। ভাত মথে ঝাউ বানিয়ে দিলে খান। খান তো না ; স্রেফ গিলেন আরকি। চোখের কোটরি আর গালের ত্বক জুড়া জুড়া হয়ে গর্ত হয়ে গেছে। বড় বড় হলুদ দাঁতগুলো মাড়িশূন্য প্রায় আলগা হয়ে নিঃসহায় দাঁড়িয়ে আছে। শরীরের চামরা খসখসে শুষ্ক। ভাঁজ পড়ে হাড্ডির সাথে ঝুলে গেছে। উদাম গায় শুয়ে আছেন তিনি। সিনার হাড়গুলো হাতের কড় গোণার মতো টুকে টুকে গোণা যায় এমন দশা। ব্রেনস্টোক করছেন দুইবার। ডাক্তার তেমন দেখানো হয় না। কে তারে টানাহেঁচড়া করবে-এমন ফেরেশতা লোক অত্র গাঁয়ে নেই। ছেলে দুটোই মরে গেছে। নাতিনাতকুর দূরদূর করে।

ঘণ্টা চার ধরে বিদ্যুৎ নেই। পিঠের নিচের বিছানার চাদর ভিজে গেছে ঘামে। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছেন অচল ফ্যানটার গোল বিন্দুটার দিকে। হাত-পা তো নড়ে না তার ; নড়ে কেবল বুকের ভেতর ধুকপুক করা ৯৪ বছরের দুর্বল হার্টটা। ছানি পড়া চোখের পাপড়িহীন পাতাটাও একটু একটু করে নড়ে সঙ্গে সঙ্গে। সাত-আট মিনিট অন্তরায় হাই-হামি দেয় বড় হা করে। স্যন দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, করমর করে এক্ষুণি চোয়ালের দাঁতগুলো পড়ে যাবে৷ কী এক রোগে ভুগে মাথার চুল সব খালি হয়ে গেছে। চুলের গোড়ায় খাজলি হয়েছিল অবশ্য। এখনো আধো পঁচার চিহ্ন আছে।

দিনে দুই অক্তে মরা পুতের বউটা (বলা উত্তম-অন্যের মাইয়া), খালি ঢু মেরে যায়। প্রচুর ঘ্যানাইপ্যানাই করে বুড়া মাস্টারের মুখে দুমুঠো ভাত পুড়ে দেয়। প্যানপ্যান করতে করতে প্রায়ই বলে, ‘এইডায় মরেও না, মইরা গেলে দম ফালাইতে পারতাম। এই উটকো পঁচা ঘরডায়ও হ্যাঁসে সুইর্য নামতো। আমার গতর ফানা হইয়া যাইতাছে। ঢকও পুইড়া গেছে। এই বুইড়ার হাগামুতা পুঁছতে পুঁছতে জীবনডা অতিষ্ঠ হইয়া যাইতাছে। মর্ বুইড়া মর্’—বলে মুখের ভিতর ভাতের নলা জেতে দেয়। ইত্যকার ব্যস্ততার নাটক দেখে কুতুবউদ্দিন মাস্টারের মনে অনেক কথারই উদয় হয়। কিন্তু শব্দ করে কথা আর বলতে পারেন না। নিঃসহায় এক প্রাণ নিয়ে গত ১৫টি বছর অতিবাহিত হয়ে গেল। এই রুটিনের অন্যথা তেমন একটি হয়নি। মাস দুই-তিন অন্তরায় কেউ এলে খানিকটা পুরান গীতা পাঠের মতো হুতাশ করে ফিরে যায়। দিনে দিনে মানুষই আসা বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রামবাসী বোধহয় তার কথা ভুলেই বসেছে যে মাস্টারদা বেঁচে আছেন!

বেলা পড়েছে। অস্বস্থির বিকালটাও আপন তালে নেচে গেল দুনিয়ায়। নতুন প্রাণের ছেলেরা যেমন খেলাচ্ছলে ঘরে ফেরে তেমনি ৩০-৪০ উর্ধ্বরা সহাস্যে শোরগোল ও আকিজ বিড়ি টেনে যাচ্ছে। অস্থির কেবল প্রায় শত ছুঁয়ে ফেলা নিশ্চল বৃদ্ধ মাস্টার। সন্ধ্যায় কেমন ঘোমট বাঁধে নিঃশ্বাস। প্রাণ নাশের অক্ত হয়েছে, কিন্তু আজান হচ্ছে না। আসমান যেন ঠুকরিয়ে পড়ছে উল্লামুড়ির চালের মাথায়। তিনি কাউকেই পাশে পাচ্ছেন না, শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ডাকছেন, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। চতুর চোখের মনি যে কাউকে খুঁজেই চলেছে, পাতা দ্রুত নড়ছে। তিনি দৌড়ে বেড়িয়ে যাবেন, কাকে যেন তার বলার একটিমাত্র অতি জরুরি কথা আছে। কিন্তু পা স্থির, হরকতটুকু আজ করছে না! চড়ুই পাখির ডাকের মতোন চিঁচিঁ চিঁচিঁ আওয়াজ হচ্ছে শুধু। অবসন্ন নীরবতার কাঁধে হেলে পড়া সন্ধ্যায় কে শুনবে এই মহাচিৎকার?

আজান হলো মাগরিবের। এলাকার ময়মুরুব্বি ও সরদার গোছের লোকেরা মসজিদে যাচ্ছে। রাস্তার পাশে কুতুবুদ্দিন বৃদ্ধের ঘর। তার চিঁ চিঁ আওয়াজ কারোই কানের ছিদ্রে পৌঁছাল না। তারা আল্লার দিকে ধাবমান হচ্ছে নাকি নামাজান্তের অবসরে মসজিদের ফান্ড নিয়ে ক্যাচাল করবার জন্য উদ্ধতমনে গমণ করছে, তা এক অন্তর্যামী ছাড়া কেউ জানে না এ কথা বলা ভার। কেননা প্রায় দিন মসজিদে তারা তর্কবিতর্ক ও একপর্যায় মারামারি করে বদনাম কুড়িয়েছে। একবার তাদের কাণ্ড-তামাশা শেষই হচ্ছিলোই না, পরে দুই গ্রামের মাতব্বর বসে সমাধান করেছিল। গলা দিয়ে ওগলিয়ে জীবনখানি বের হয়ে যাবে যাবে করে আবার ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। মাস্টারদার মনে তোলপাড় হবার জোগাড়। মসজিদে আগুন লাগিয়ে দেবার হোতা হতে পারলে এমুহূর্তে তারা বৃদ্ধের উঠানে জড়ো হতো নিশ্চিত। তার মনে এমন কিছুরই ভাবনা ফাল্গুনের ঝড়ের মতো বইছে। এই মরে যায় যায় করে ঘণ্টা দুই গড়িয়ে গেলে জগতের আর কারুর আগ্রহ তার খাতিরে কাঁদছে না দেখে অস্থিরতা নিস্তেজ হতে হতে চুপসে গেল। মাস্টার সাহেবের খ্যাতি মহল্লা জুড়ে তো আছেই যুগান্তরের পথে। এতে কি আর অসুস্ততার দাওয়াই মিলে? রাতের গতরে যেমন আলো ডুবে গেছে তেমনই নিঃশব্দে স্তমিত হলেন জনাব কুতুবুদ্দিন।

খ . হগল মানুষ

যে বউটা দুইবেলা ঢুঁ মারত তার মাথায় সেদিন বুড়া মানুষটার কথা প্রথম চিন্তায় এলো সকাল সাড়ে আটটায়। মাছ কুটতে বসছে। হাতে কাঁচা মাছের আঁশটে গন্ধ। তখন পর্যন্ত কোন কিছুই খেতে দেওয়া হয়নি— মনে পড়লে ছোট মেয়েকে ডাকল, ‘এ্যাই ছেমরি, যা তর দাদার মুহে ভিজা চিড়াডি ঢুকায় দিয়ায়, যাহ। আমার এদিকে দুইন্নাইলের কাম, আজাইর অইতে দেরি অইব।’ 

কথা শুনেও যেন শোনে নাই টুম্পা। খেলছে। আধা মিনিট পর আবার তর্জন হলো—‘কিরে, যাস্ না। দিয়ায়। কী কই, হুনস না?’ মোচড়ামুড়চি দিয়ে কোনোরকমে উঠল। মনে হবে, বয়স তার আট না, আশি উর্ধ্বের কোন কুঁজো বুড়ি। মনটা কালো হয়ে গেছে তার, মাটির ছোট হাঁড়িতে খেলার রান্না পুড়ে যাবে বলে কিনা নিশ্চিত বলা সহজ নয়। বিরক্তি তার চোখের ভাঁজে কিঞ্চিৎ নড়াচড়া করে গেলো। টিনের পুরানো ময়লা গাথালো বাটিতে ভিজিয়ে রাখা চিড়া নিয়ে দাদার ঘরের দরজা ধাক্কা দিয়ে ঢুকলো।

এই ঘরটার ভেতর যে নিস্তব্ধতা রাতভর বিরাজমান ছিল তা ফুরিয়ে যাচ্ছিল বারবার, তবু ভোর পোহায় না। মানুষ জানতে পারছে না—বিপুল শূন্যতারে ধারণ করে কীভাবে শীতের এই দীর্ঘতর রাত্রির অবসান হয়েও হচ্ছে না। চকির পাশে নিচের লেপা মাটিতে গত শতাব্দীর নথিপত্র প্রাণহীন দেহে উল্টিয়ে পড়ে আছে কতটা সময়, কেউ কি তা জানে?

পরক্ষণে উল্টা দৌড়ে ছুটে এলো টুম্পা। বিচলিত, ভয়চক্ষু, বুক কাঁপছে। চুপ, মুখে শব্দ আসছে না। দাদার ঘরটা মাথা নেড়ে ইশারা করলো। ‘দাদায় চকি থেইকা নিচে ঘাড় মটকিয়া পইড়া রইছে মা! হাঁটু পাও চকির উপর। নড়েও না, চড়েও না মা!’ বুঝ হবার পর সে কখনো মানুষের মৃত্যু দেখেনি।

আত্মায় পানি শুকিয়ে যাবার যোগান। চোখ বের করে বলল, ‘কস কী?’ মাছ কাটার ছাইভরা হাত খুব দ্রুত তার মাথায়—‘হায় আল্লাহ! কী…’ বলতে বলতে ছুটে গেল। পায়ে লেগে কুটে রাখা মাছের পাতিলটা উল্টে পড়ল শুকনো মাটিতে। আঁশতে ও রক্তের পানি গড়িয়ে যেতে লাগল। মৃতমুখ দেখার পর চোখের পানি ঢলঢল করতে লাগল, আর হায় হায় করে প্রথমে বুড়ো মাস্টারের লাশটা টেনেটুনে খাটে তুলে রাখল। হাত পা কিছুই সোজা হয় না। বরফের মতো ঠান্ড যেমন, লোহার চেয়েও শক্ত হয়ে গেছে হাড্ডি। টুম্পাকে বলল, ‘সোহেলের মারে গিয়া ক তর দাদায় মইরা গেছে রে।’ বলেই জোরে কাঁদতে লাগল। পড়শিরা আসতে লাগল। সোহেলের মা আসলে আগে সবাইকে খবর দিতে পাড়া বেড়াল। মসজিদের মাইকেও ঘোষণা হতে হতে ঘণ্টা গেল। অশ্রু গড়াচ্ছে টুম্পার মার চোখে। ‘আমার বিদ্বান শ্বশুর মইরা গেছে গো বইনা, মইরা গেছে! কত চেষ্টা কষ্ট করলাম উনার বইনগো শুশ্রষা হইল না। আমার এখন আর কেউ নাই গো। নিঃস্বজন হইয়া গেলাম।’

উঠান ভরে মানুষ জড়ো হয়েছে। সাত গাঁও দূরের মানুষজনও দেখতে আসছে। লোকে লোকারণ্য। টুম্পার মার ভাবনার বাইরে ছিল যে, এত মানুষ আসবে। বড়জোড় ২০-২৫ জন আসলে আসতে পারে স্বাভাবিক। তাই বলে শ’দুই মানুষ এসে বসবে? একজন মাস্টারের জন্য এত মানুষের দুঃখ হতে পারে, কল্পনাতীত ব্যাপারই ঠেকছে তার কাছে! সব এলাকার মহাশয় মান্যবরবৃন্দ এসে আসন পেতে বসেছেন আজ। পাড়ার মহিলারা একত্রে বসে মাতমগীত করে পোড়া হৃদয়কে সান্ত্বনা দিচ্ছে। যেন ঘনিষ্ঠ স্বজন হারানোর শোক টলমল করছে সকলের মণিকোঠরিতে।

একে একে সবাই স্মৃতিচারণ করে মাস্টার সাহেবের কীর্তি বর্ণনা করতে লাগল। মাইজদীপুরের সর্দার আতা মিয়া দাঁড়ালেন। দুই হাত প্রসারিত করে ভাষণ ছাড়লেন—‘অত্র এলাকায় আমাদের সকলের প্রাণ পুরোহিত কুতুবুদ্দিন মাস্টার জন্মাইছিলেন বইলাই আমরা সভ্য হইতে পারছি! উনার শিক্ষা-দীক্ষা ও আদর-সোহাগ পাইয়া আমরা মানুষ হইছি! আমাদের বাপ-দাদাদের লগে উনি ওঠবস করতেন। উনারে হারায়া পুরা গেরামবাসী এতিম হইয়া গেলাম। আমাদের মাথার ওপর থেইকা একমাত্র ভরসার ছায়া সইরা গেল।’ এই বলে দরদর করে কাঁদতে কাঁদতে তিনি চেয়ারে বসে গেলেন।

দাঁড়ালেন এবার রমিছ খাঁ। সর্দারকে সান্ত্বনা দিয়ে সকলের দোয়া নিয়ে বক্তৃতা শুরু করলেন, ‘আমার স্যার, আমার শিক্ষাগুরু, এই গেরামের মাথার মুকুট আছিলেন, তাজ আছিলেন, হু! উনার সুখ্যাতির কইল্যানে আমরা গৌরববোধ করতাম! তিনার টিচারি করানের ৫০ বছরে শিক্ষাদীক্ষার যুগ পাইছে। গেরাম ধইন্য হইছে। তিনি আছিলেন আমার আব্বার টিচার। আজ থিকা আরও পয়তাল্লিশ বছর পূর্বে আমারে পড়াইছিলেন। আমরা আমাদের মুরুব্বির মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত।’ 

সমবেত জনতা কাঁদতে কাঁদতে ঠিক ঠিক বলে আবার নীরব হয়ে গেল।

কৃষক শুকুর আলী দাঁড়িয়ে অল্প কথায় সারলেন, ‘আমাদের যহন খরা সময় অতিবাহিত হইতেছিল। অতিমারির কবলে পইড়া কষ্ট পাইতেছিলাম তহন খোদা তালার দয়ায় রহমত হইছিলেন মাস্টারদা কুতুবুদ্দিন সাব।’

সমবেত জনতা হায় হায় মাতম করে কতক্ষণ বলতে লাগল, ‘আমরা সাক্ষাৎ ফেরেশ্তাকে হারায়া ফেললাম!’

লুলা মতিন বাঁশের লাঠিতে টেক দিয়ে খাঁড়ালেন। গলা খাঁকারি দিয়ে উচ্চ আওয়াজে বলতে শুরু করলেন, ‘ভাইসব, আমরা যারা কর্মহীন ছিলাম এই গেরামের। তাদের জন্য তিনি সুতার মিল করে দিছিলেন। আমরা সেখানে কাজ করতাম। তিনি সেইসব পণ্য শহরে বেঁইচা আমাদের মাসে মাসে রোজগারের ব্যবস্থা কইরা দিছিলেন। এইভাবে আমরা স্বাবলম্বী হইছি আস্তে ধীরে। ফলে আমরা নিজেদের বালবাচ্চাদের পড়াইয়া বড়সড় মানুষ বানাইছি। আমাদের মেয়েদের আমরা সম্ভ্রান্ত ফ্যামিলিতে বিয়া দিতে পারছি। ইতিপূর্বে আমরার চরে-বনে-নিচুশ্রেণীর মানুষের লগে রিশতা করা ছাড়া উপায় আছিল না। এইসব কৃতিত্ব কেবল মাস্টার সাহেবের।’

সমবেত জনতা হ্যাঁ হ্যাঁ বলে সম্মতি জ্ঞাপন করতে লাগল।

কুতুবুদ্দিন মাস্টারের বয়স্ক ছোট ভাতিজা দাঁড়িয়ে কান্না জড়িত কণ্ঠে বলতে লাগল, ‘আমার আব্বার এবং আমাদের নাজেহাল পরিবারের করুণ দশা থেকে উত্তরণের সামগ্রিক সহায়তা কাকায় করছিল। তাঁর ঋণ আমরা কোনদিন শোধ করতে পারব না। তিনি বাঁইচা থাকতে প্রতিদিন আমরা সকালবিকাল খোঁজ-খবর রাখতাম। খোদাতালায় দেখছে আমরা মরিয়া হয়ে কীভাবে কাকার শুশ্রূষার জন্য দৌড়াদৌড়ি করলাম।’ 

তার বক্তব্য শুনে পুতের বউয়ের মন ও মুখ একসাথে কুচকুচে কালো হয়ে গেল। অস্থির হয়ে গোঁৎফোঁৎ করতে লাগল। কাঁদন রেখে তার কথা ভাঙ্গিয়ে দিতে প্রবল ইচ্ছে হলেও বিপরীত ও বাস্তব কথা বলতে পারছে না। মন তার ভিতরে ভিতরে কুড়কুড় করে কামড়ে ধরেছে। সহ্য করে নিতেও পারছে না। মাতমবিবিদের সাথে হু হু করে কাঁদতেই লাগল। সে জানে, আজ এটা ভাঙাতে না পারলে লোকসম্মুখে কখনোই আর বলতে পারবে না। বড়জোর গায় পড়ে কুটনামি করে বেরাতে হবে। এবং সেটা অতি অবশ্যই করবে। তাকে করতেই হবে। নয়তো বুড়ার মৃত্যুর পরও কষ্ট পেতে হবে। বদহজম একটি কথা সে শুনে ফেলেছে।

কায়েস দা আপ্লুত হয়ে স্মৃতিচারণ করল এইভাবে, ‘আইজ থেইক্কা পঞ্চাইশ বচ্ছর আগেই পোলাপান নিয়া পড়াইতে পড়াইতে এক ফাঁকে একটা চরম শিক্ষা দিছিলেন। আমার তা মনে আছে এখনো। সেদিন কী কইছিল জানেন আপনেরা?’

সম্মেলিত কণ্ঠে উত্তর এলো, ‘না, বলুন, বলুন! আমাদেরকে জানতে দিন।’ 

‘তিনি সেদিন কইতেছিলেন—সবসময় মৌলার কাছে দোয়া করবা, আল্লায় যেন শেষ বয়েসে মানুষের বোঝা না বানান। আল্লাহ আমাগোর হগলরে সে জীবনজীবিকা দান করুক —সমস্বরে রব উঠল—আমিন। আহ, শেষ বয়েস অব্দি তিনি আমাদের অভিভাবক হয়ে ছিলেন। তার কথা আমাদের শিরোধার্য। সর্বদা আমরা এশিক্ষা মাথায় তুলে রাখব।

‘ভাইসব, আপনারা দেখেছেন, আমরা কতটা আপন করে নিয়েছিলাম আমাদের মহান মাস্টারদা’কে। আপনারা দেখেছেন, জীবনের শেষ সময়গুলোতে স্যারকে কোলেকাঁখে তুলে রেখেছিলাম। আমরা হৃদয় দিয়ে স্যারের পাশে সর্বদা ছিলাম এবং তার পরিবারের সর্বদা পাশে থেকেছিলাম।’

ঘাড় ঘুরিয়ে পুতের বউ ঠকমকিয়ে চাইল। মনোকষ্টে তার শোকপালন আজ বৃথা হয়ে যাচ্ছে।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *