তখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে, পিঁপড়ের দীর্ঘ সারির মতো লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বাস-ট্রাকগুলো এগুতে থাকলে বুঝতে পারি ফেরি এসে ঠেকেছে ঘাটে। ইলিশভাজার ঘ্রাণ রাতের কোনো ফুলের চেয়েও মোহময় ভঙ্গিতে ভাসতে থাকে পদ্মার জলবাষ্পে। সে কী কোলাহল! বাস উঠছে ফেরিতে। এই এগোচ্ছে আবার পিছিয়ে যাচ্ছে, ছোটবড় আকস্মিক ঝাঁকুনি। এভাবে চলতে থাকলে একসময় সে তার জায়গাটি বুঝে নেয়। যাত্রীরা নেমে গেলে ফাঁকা বাসটা হাঁপ ছেড়ে বাঁচে, আমরাও একটু ফুরফুরে বাতাস খুঁজতে থাকি।
বিকট শব্দে যখন সাইরেন বাজে, যেন লাফিয়ে উঠতে চায় মন, ছুটির ঘণ্টা বাজল। এবার ছেড়ে যাব তোমাদের, এবার দীর্ঘ পদ্মায় খেলা করব, বিদায় বন্ধু, বিদায় চক-ডাস্টার, মাস্টার মশাই বিদায়, আবার দেখা হবে, এইসব বলে কয়ে ঘাট ছেড়ে এগিয়ে যায় ফেরি। দেখতে থাকি, সকল নিকট কীভাবে দূরে সরে যায়!
এসব কি বুঝেছি তখন, বুঝিনি তো, এতদিন পর লিখতে বসে এমনই লাগছে, বহুদূরের সেই ছোটবেলাকার সব দৃশ্য অর্থময়তায় ভরে উঠছে। হাতমুখ ধুয়ে এসে ঝালমুড়ির দোকানদারকে খুঁজতে ভালো লাগত। মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড, এ যাত্রায় তোমার অভাব বুঝি। পুরোনো মাংসের ঝোল, সরিষা, বেশি করে ঝাল দাও, দূরে যেও না, আবার তোমাকে খুঁজতে হবে, সেটা কি ভালো!
ঝালমুড়ি খেতে খেতে দেখি—কিছুই দেখা যায় না এতদূর চলে এসেছি ঘাট ছেড়ে, শুধু নদীর ঢেউয়ে চাঁদের ছায়া ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে, শুধু মনে হচ্ছে ওইটা কি চর? চাঁদের যে আলো এখন পর্যন্ত ছড়ায় তাতে চরের বুকে ঘন সবুজ প্রকট হয়, বাঁধা নৌকো, ছোট ঘর, কারা থাকে ওখানে? কারা দিনরাত ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শোনে! ভয় করে না? যদি ঘুম ভেঙে দেখে ভেসে চলে গেছে কোথাও! এমন নৈশব্দের কাছে দাঁড়িয়ে থাকি যে নদীর সাথে অন্তরঙ্গতা বাড়ে, বোধ করি রাত ও চাঁদের আলো তাকে অন্যমাত্রা দিতে চায়। শীত শীত করে।
এরপর ফিরে এসে বসে থাকি বাসে, জানি চোখ বুজলেই এখান থেকে নদীর ভেজা হাওয়া টের পাওয়া যাবে। একটু ঘুমিয়েই নিই তাহলে।
ঘুম ভাঙে আবার সেই কোলাহলে। ঘাটে ভিরেছে ফেরি, কে কার আগে নামবে, আগে-পিছু ঝাঁকুনি, কোনো রকমে পাড়ে উঠেই ভৌ-দৌড় দেয় গাড়িটা। আর কোনোদিকে তাকায় না সে। এবার যাত্রী নামা শুরু হবে। ভাঙ্গা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ আরও কতসব। ওরা নেমে যাবে! ওরা কি আমার সাথে যেতে পারে না, আমরা সবাই একজায়গায় নামব, কী ভালোই না হবে! দুইপাশে সারিবাঁধা শিরিষ গাছের ভেতর দিয়ে, মরণের পর সোজা হওয়া সাপের মতো রাস্তায়, আমাদের দীর্ঘ বাসটা এগুচ্ছে। ফোঁস ফোঁস শব্দে বেরিয়ে যায় অন্য বাসগুলো। আমি আর বসে থাকতে পারতাম না, সামনের সিটে থুতনি রেখে উইন্ডশিল্ড দিয়ে তাকিয়ে থাকতাম। এদিকে জাগ দেওয়া পাটের ঘ্রাণ মেখে চাঁদের আলো ঢুকে পড়তো জানালা দিয়ে। চাঁদটা যেন ঠিক আমার চোখ বরাবর উঠেছে, আমার সাথে সাথে চলছে, আমার আড়াল হবে না।
বাস থেকে নামার আগে আগে আমাকে সামনে গিয়ে বলে আসতে হতো—‘আঙ্কেল, মাঠে নামিয়ে দিবেন আমাদের।’ মাঠ মানে শেষ স্টপেজ, মাঠ মানে আনন্দ-বিষাদ, মাঠ মানে খোলা আকাশের নিচে ঘাসেদের কথোপকথন। মাঠে নেমে দেখতাম ছোটমামা ভ্যান নিয়ে বসে আছে। তিন চাকার এই আজব পদার্থ খুবই উদ্ভট লাগত তখন। ঢাকায় তো রিকশা দেখে অভ্যস্ত ছিলাম। চারপাশে খোলা এক পাটাতনে পা ঝুলিয়ে যাওয়া নিতান্ত ভয়ংকর ছিল তখন। এখন তো স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি ভ্যানের নাম শুনলেই। মনে চায় সহধর্মিণী আর মেয়েকে নিয়ে চলে যাই সেই অজগ্রামে—চাঁদের আলোর নিচে ভ্যানে চড়ে ঘুরি। মেয়ের স্মৃতির ভেতর বপন করে দিই অনুরূপ যন্ত্রণা বীজ।
চারদিকে রাত গভীর। ভ্যানে বসেই আগে আকাশের দিকে তাকাতাম, আসছে তো? আসছে। কী যে আনন্দ হতো! আমার সাথে নানুবাড়ি যাচ্ছে, আর কারও দিকে তো তাকায় না গোল চাঁদ। মাঠের মধ্য দিয়ে ভ্যান এগোতো যখন, শীত শীত লাগত, এত গাছ চারদিকে, কোত্থেকে যে অসংখ্য ঝিঁঝি ডেকে যেত পুরো পথ। বাড়িগুলো বাতি নিভিয়ে ঘুম। যখন দূর থেকে একটা বাড়িতে বাতি জ্বলতে দেখতাম, দেখতাম সুপারি পাতার বাদামি রঙের বেড়া, বুঝতাম ওইটাই নানু বাড়ি। ভ্যান থামত এসে, পাতাবাহারের সরু গলি বেয়ে আমি সবার আগে হাঁটতে থাকি, উঠোনে পাটি বিছিয়ে বসে আছে নানু। উঠে এসে কোলে নিয়ে বলত, ‘ও ভাডি, আছো ভালো?’ ভুরভুর করে পান-জর্দার মিষ্টি ঘ্রাণটা আসত। হায় মাবুদ! এই ডাক, এই ঘ্রাণ আর পাওয়া হবে না ভাবতেই চোখ ভিজে ওঠে। এত পছন্দের ছিল ওই ঘ্রাণ, আজও পেলে যেন গায়ে মেখে বসে থাকি।
আমাদের কথা শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে বড় খালা, বড় খালু আর রাবি আপু। বড় খালার মেয়ে রাবেয়া, আমরা আসব শুনে বাড়িঘর গুছিয়ে চলে আসত সবাই, কাছেই তো বাড়ি। নানুর কোল থেকে আমাকে নিয়ে রাবি আপু হাতমুখ ধুইয়ে আনত। কিছু কি বলত তখন? মনে পড়ে না যে। এই তো সেদিনের কথা, কেন তবু মনে নেই? আমার মনে চায় সব মনে করি বসে বসে, নতুন করে লিখি, তাকিয়ে থাকি, কেবলই দৃশ্যের জন্ম হবে। যা ছিল অগোচরে—প্রকট ও স্পষ্ট হবে। শান্তি পাব।
নানু ঘরে পাটি বিছিয়ে ভাত বাড়ত। লাল লাল গোটা গোটা ভাত, ভাপ উঠছে, পুঁটিমাছের ঝোল, পটলভাজা। খেতো, কী যে সুন্দর মসলার ঘ্রাণ হতো পটলভাজায়! কোথায় পাবো তারে? সেই আস্ত পুঁটির ঝোল, মাটির হাঁড়িতে লালভাত! আম্মুরা সেগুলো খেতো, তখনও যেটুকু বয়স আমিও সেসব খেতে পারি, তবু আমার জন্য করা থাকত আলাদা করে ডিমভাজা। স্টিলের প্লেটে আম্মু ভাত নিলে, বড় ডিমভাজাটা পাতে তুলে দেয় নানু, রাবি আপু বলে, ‘খালা, থালডা আমার কাছে দাও দিন, আমি খাইয়ে দিই, তোমরাও খায়ে ওঠো।’ আম্মু বলে, ‘তুইও বয় রাবি, কখন কী খায়ছিস, খেয়ে নে কয়টা।’ ‘না, আমি খাবো না আর, তোমরা খাও। মা বড় কাতলা মাছ রাধিছে, মাথাটা সজিবের জন্য রাখিছে, কে জানতি এত রাত হবে। বাড়ি যাতি যাতি ও ঘুমায় পড়বিনানে!’
ওই লাল ভাত আমার একদম পছন্দ ছিল না তখন, আর পছন্দ ছিল না পানি। কেমন নোনতা! মুখেই তুলতে পারতাম না। বলতাম নানু, ‘তোমরা কি কলে লবণ দিয়ে রাখো!’ নানু বলত, ‘কষ্ট করে খাইয়ে নাও ভাডি, আল্লাহ দিছে করব কি।’ কখনো তবু আমার শেষ বয়সি নানু দূউউউর কোনো ডিপকল থেকে কাখে করে কলসিতে মিঠা পানি নিয়ে আসত। আহারে দরদ! মানুষ কই হারায়া যায় মাবুদ।
পানি খেতে হতো স্টিলের বাটিতে, পানি খাওয়ার আলাদা বাটি ছিল, ওসব এখন আর দেখি না। ওই বাটিতে পানি খাওয়াও ছিল মহা মুশকিল। ঠোঁটের কিনারা বেয়ে পানি পড়ে যাবে। তখন নানা বলত, ‘ও ভাডি, খাতি পারো না? ওভাবে খাতি হয় না।’ বলতে বলতে কীভাবে খেতে হবে তাও দেখিয়ে দিত। রাবি আপু কপট রাগ করে বলত, ‘তোমারে কয়েছে দেখাতি? একটা গ্লাস নামায় রাখতি পারো না। ভাডি আমার ও বাটিতে পানি খাতি পারে!’
নানুদের বাড়িতে বেড়াল পুষত সবসময়, ওদিকে প্রায় সব বাড়িতেই পোষে। অত রাত তবু আমরা খেতে বসলে দেখি পাটির পাশে আসন পেতে বসে আছে দুইজন, কেউ কিছু দিচ্ছে না বলে হেঁটে হেঁটে মিউ মিউ করছে, এর ওর পাতের কাছে মুখ নিচ্ছে। মুখের দিকে তাকিয়ে কী করুণ সুরেই না বলত মিউ মিউ। বিরক্তই লাগত! নানু একটা প্লেটে ভাত মেখে দিলে পরে শান্তি। রাতেও ঘুমানো যেত না এদের যন্ত্রণায়। আর শীতকালে তো কথাই নেই, লেপের ভেতর ঢুকে শুয়ে থাকবে গা ঘেঁষে, আর হঠাৎ ঘুম ভেঙে টের পেলে আমাদের সে কি চিৎকার!
খাওয়া শেষ হলে খালাখালু চলে যাবে বাড়ি। রাবি আপু আমাকে কোলে নিয়ে বলবে, ‘খালা, সজিবকে নে’ গেলাম, তোমরা সকালে এসো বাড়ি।’ আমরা ঘেরের ফাঁড়ি (পাড় অর্থে) ধরে এগিয়ে যেতাম, নারকেল গাছের সারি, ঘন ঘাস, আর চাঁদের আলো। মাঝে মাঝে খালুর পাঁচব্যাটারি টর্চটা জ্বলে উঠত। কী যে নীরবতা সমগ্র চরাচরে, ভয় লেগে যেত, মুখ গুঁজে, চোখ বুজে ঘুমিয়েই কি পড়তাম! সে ঘুম ভাঙত খালাদের ছোটঘরের সামনে ঝোপের মতো বড় গন্ধরাজফুলের ঘ্রাণে। সাদা সাদা ফুলগুলো ফুটে থাকত তারার চেয়ে উজ্জ্বল হয়ে, খুটখুট শব্দে খালু তালা খুলতেন। এই বাড়িটা মানুষের বসতি থেকে অনেক দূরে। বাড়িতে ঢোকার পথের পাশে ঝোপালো সফেদা আর আমড়া গাছ, বড় উঠোন, একপাশে গোয়াল ঘরের সামনে খেজুরগাছ, রান্নাঘরের পাশে লাল পেয়ারা গাছ, বড়ঘরের সামনে পুরোটাজুড়ে গাঁদাফুল, ছোটঘরের পাশে জামরুল আর ঘেরের ফাঁড়িতে গুনতে পারি না এমন সুপারি নারকেল। তখনো বিদ্যুৎ সংযোগ হয়নি সেখানে (খালুদের বিচ্ছিন্ন নাড়িতে)। খালুর পাঁচব্যাটারির আলো আর ঘরের সামনে রাখা বড় কুঁপির কমলা আলোয় সব এত ভালো লাগত!
ঘরে ঢুকে হারিকেনের আলোয় বেড়ায় টাঙানো গাঁদা ফুলের মালা দেখতে পেতাম। আমি ঘুমাতাম ছোট ঘরের পেছনের বারান্দায়, রাবি আপুর ছোট্ট চৌকিতে। ওই পর্যন্ত আসতে আসতে ঘুম ভেঙে গেলেও ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকতে ভালো লাগত, পাশে শুয়ে, যেন সারারাত তালপাখা দিয়ে বাতাস করে যেত রাবি আপু, গুনগুন গুঞ্জনে ভরে উঠত হাওয়া, এমন আরামে ঘুমিয়ে পড়তাম নরোম অন্ধকারে।