আমের বউল হয়ে আমার বুকে আছেন আমার দুঃখের রাসুল
—আবিদ আজাদ
রান্নাঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় আমের মুকুলে ভরে আছে উঠোনের গাছটা। কী তুমুল ঘ্রাণে বাড়িটা মৌ মৌ করছে। দুপুরের তেজি রোদের মিইয়ে আসা দেখতে দেখতে মনে পড়ে আবিদ আজাদের এই কবিতাটা পড়ার জন্য পুরো বাতিঘর চষে বের করেছিলাম তার কবিতাসমগ্র। অদ্ভুত উন্মাদনায় সেই সমগ্রে ডুবে থাকতাম দিনমান। কী পাগলামির দিন তখন! উচ্ছল নদীর মতো মন। সেসব সময় মনে পড়লে আজনবি মুসাফিরের মতো মনে হয় নিজেকে। যেন অন্য কারোর জীবন, আমি কেবল সময়ের আয়নায় দেখে যাই। হায়াতের একটা অংশ পুড়ে গেছে বিরহের অনলে। সে সময়টার কথা ভাবি। কালবৈশাখি ঝড়ের উদ্দাম নৃত্য তখন জীবনে, মননে। অসহ্য সেসব সময়। কী করে যে তারপর সব দিঘির জলের মতো শান্ত হলো এখন আর ভেবে পাই না। স্বপ্নের শেষ অংশটুকু যেদিন ছিটকে গেল আমার পৃথিবী থেকে, এক লোনলি বিউগলের সুর বেজে উঠল মনের ভেতর।
ভেবেই নিলাম এই বুঝি সকল আয়োজনের অবসান ঘটল। এবার তবে কবরের নৈঃশব্দ্যে ফিরে যাবার পালা। তবু কোথাও আচমকা, হৃদয়ের অনতিদূরে কিছু দীঘল বেদনা, স্মৃতি—কতেক মুখাবয়বের স্মরণে বিরহে ঝলমল হয়ে রয় আমার আপন আঁধার। কী জানি কেন এত কথা মনে আসে, সুর তাল লয় হারানো গানের কথায় এই শূন্য চরাচরে।
বাইরে তুমুল ঝড়ের রাত্তির। জানালার কাচে আছড়ে পড়ে এলোমেলো হাওয়া। টিমটিমে মোমবাতির আলোয় দেখি সিথানে হচ্ছে ফুলের মৃত্যুর মতোন সুন্দরম অথচ বিষাদমাখা এক দৃশ্যের অবতারণা। হলুদ, খয়েরি মেরুন রঙা কয়েকটি গোলাপ জীবনের অবসান ঘটিয়ে ঝরে পড়ছে পাপড়িসমেত। অদ্ভুত অর্কিডের মতো আমার মন এসবের মধ্যেও নির্বিকার থাকাটা আয়ত্ত্ব করে নিয়েছে কবেই! ভাসাভাসা খুচরো গদ্যের এই জীবনকে কেন সন্তর্পনে, সতর্কতায় পাশ কাটিয়ে যাই জানি না।
হয়তো স্বপ্নভঙ্গের অপরাধে নিজেকে শাস্তি দিতে চেয়েছি নিজেই। আমার কান্নাভেজা কণ্ঠ, স্মিত কাঁপা ঠোঁট রক্তশূন্য ধূসর সন্ধ্যার কার্নিশে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে বারবার।
বলবার মতো নতুন কোন ভাষা নেই পৃথিবীতে। ঘুরেফিরে সেই একঘেয়ে কথাই যেন সম্বলটুকু। মিথ্যে প্রতিশ্রুতিতে সময়ের অপচয়। বড্ড অসহ্য ঠেকে আজকাল। কখনো ভাবি পাখির কণ্ঠনালী থেকে নতুন কোন কাব্যিক সুর তুলে আনি ধার চেয়ে। মুক্ত বাতাসে দুহাত মেলে লাফ দিই বহুতল ভবনের ছাদ থেকে। মৃতদের নিশানা পৃথিবী থেকে সবুজ ঘাসের চেয়েও দ্রুত মুছে যায় বলে সেই চেনা জগতেই ঘুরপাক খেতে থাকি না চাওয়া সত্ত্বেও।
নিজেকে ভালোবাসবার ফুরসত, ইচ্ছাশক্তি কেন যে হারিয়ে যায়! জানি এতে কেবল মৃত্যুই নিকটবর্তী হয় দ্রুত। সাপের মতো হিসহিসিয়ে ডাকতে থাকে। তবুও ঝড়ো হাওয়ায় বিধ্বস্ত ডানাভাঙা পাখির মতো এই জীবনকে ভালোবাসতে ইচ্ছা হয় না আর।
আমি গুহাবাসী সেই যুবকদের মতো ঘুমিয়ে থাকতে চাই তিনশো বছর। পেছনে পড়ে থাকুক স্বপ্নহীন, ধূসর জীবন। কবিতার খাতা। শখের বুকশেলফ, ধুলোজমা বইয়ের তাক। দুপুরের আমহলুদ রোদ্দুরে পুড়তে থাকা এলোমেলো সংসার। আধপড়া উপন্যাস, দিনলিপির খসড়া খেরোখাতা। বেলকনির গ্রিল বেয়ে বাড়তে থাকা অপরাজিতা আর কুঞ্জলতা। সব পিছু ফেলে আমি ঘুমোতে চাই। আমার এপিটাফে লেখা থাকুক অপ্রিয় জীবনানন্দ দাশের সেই পঙক্তিখানা—‘আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন…’