একটা নতুন মাস যখন আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে যুক্ত হয়, তখন আমরা স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিই—বছরটা মনে হয় নতুন মাস থেকেই শুরু হবে। সমাজ, রাষ্ট্র বা ব্যক্তিজীবন ঘুরতে থাকবে নতুন মাসের আশপাশে। এমন আশা মোটেও ইউটোপিয়ান না, কারণ অন্যান্য মাসের মতো এই মাস আরোপিত ছিল না, ছিল না ‘কাঁদো বাঙালি, কাঁদো’র মতো শাসকদলের চাপিয়ে দেওয়া কোনো বোঝা।
আমরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম—যতদিন না আমাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে, যতদিন না রক্তের ঋণ আদায় হবে.. ততদিন জুলাই চলবে। পৃথিবীর সকল মানুষ তাকিয়ে দেখল, ক্যালেন্ডারে নতুন একটি তারিখের সূচনা হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের রক্তের আঁচড়ে ইতিহাসের পাতায় খোদিত হচ্ছে নতুন তারিখ—৩২শে জুলাই। এই তারিখ রচনা করতে গিয়ে যারা শহিদ হচ্ছে, ঠিক পরদিন তাদের রক্ত দিয়েই আবার রচনা করা হচ্ছে ৩৩শে জুলাই। এক অবিশ্বাস্যরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছিল পৃথিবীর মানুষ। রক্তের স্রোত এতই বেশি হলো যে, ৩৬শে জুলাইতেই পালিয়ে যেতে বাধ্য হলো অন্ধ স্বৈরাচার। রচিত হলো নতুন ইতিহাস। কিন্তু এই লড়াই যদি দীর্ঘ হতো, তাহলে কি জুলাই চলমান থাকত না? অবশ্যই থাকত।
কিন্তু লড়াই কি শেষ হয়ে গেল? কেবল সরকার পরিবর্তনই কি আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল। উত্তরে অনেকেই অনেক কিছু বলবেন। বছর দুই না পেরোতেই পরিচিত সেই জুলাইকে আর চেনা যায় না। জুলাই এখন বিবর্ণ, ধুলায় ধূসর, কেবলই একটা সাদাকালো ছবি। যে ছবিটা সাক্ষ্য বহন করে ইতিহাসের কিন্তু কোনো গুরুত্ব না। ফ্যামিলি এ্যালবামের শেষদিকে রঙচটা ওই ছবিটার মতো—বছরে শখ করে কেউ একজন যে ছবি বের করে অনেক অবাক হওয়ার অভিনয় করে, তারপর আবার তুলে রাখে আলমারিতে। কখনো কখনো নতুন আত্মীয় এলে, যেমন পরিবারের ছোট ছেলেকে বিয়ে দিয়ে আনার পর পারিবারিক লিগ্যাসি বোঝানোর জন্য ছেলের বউকে দেখানো হয় ফ্যামিলি এ্যালবাম। পরিবারের মুরুব্বিরা অনেক সময় নিয়ে ব্যাখ্যা করেন সাদাকালো ছবিটা, কেউ কেউ স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। তবে, ওই অতটুকুই।
ক্যালেন্ডার চলতে থাকে পুরোনো নিয়মে। রাজা আসে রাজা যায়, জুলাই আরও ধূসর হয়। মুদ্রার আরেক পিঠও অবশ্য আছে। জুলাই নামক ছোট চারাগাছটিকে কেউ কেউ অনেক যত্ম করেছিলেন। সকাল-বিকাল পানি দেওয়া, কীট-পতঙ্গ থেকে দূরে রাখা, দ্রুত বেড়ে উঠতে সাহায্য করা। আমরা খুশি হয়েছিলাম, যাক কেউ কেউ তো খেয়াল রাখছে জুলাইর। শহিদ পরিবারগুলোতে গেলেই শুনছিলাম তাদের জয়গান। শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতায় চারা গাছটিও যেন কেমন কেমন নুয়ে যাচ্ছিল তাদের দিকেই। কিন্তু আমাদের ভ্রম ভাঙল সেদিন, যেদিন প্রথম ফল ধরল গাছটিতে। আর একক অংশীদার হিসেবে সেই ফল পুরোটাই তারা নিয়ে যেতে চাইল। মহল্লার বাকি বাসিন্দারা তখন নড়ে চড়ে বসলেন। হতে পারে তারা, গাছটির দেখভাল করতে পারেননি ঠিকঠাক। তবে উপড়ে তো ফেলেননি, সেই সুযোগ তো ছিল। প্রতিদিন বিকালে যখন গাছে পানি দেওয়া হতো, তখন তো সামনে না হোক পেছন থেকে তারা দাঁড়িয়ে দেখেছেন। মাঝরাতে চারাগাছটি উপড়ে ফেলতে তো চেয়েছিল অনেকেই, তাদেরকে তো সংবৃত করে রেখেছে পুরো মহল্লাবাসী মিলেই। তাদের হিসাব বরাবর, এই ফল সকলে মিলেই খাবে আর নাহয় কেউ খাবে না। দ্বন্দ্ব মেটাতে আয়োজন হলো গণভোট। ভোটেই স্পষ্ট হবে কারা পাবে গাছের মালিকানা।
এলাকায় কোনো দোকান ভালো চললে একই নামে আরও অসংখ্য দোকান হয়। আর প্রতিটি দোকানেই লেখা থাকে—‘আমাদের আর কোনো শাখা নেই’। যেমন কুমিল্লার মাতৃ ভাণ্ডার, নোয়াখালীর আমানিয়া, সাতক্ষীরার ঘোষ ডেয়ারি, ঢাকার নান্না অথবা হাজি কাচ্চি। জুলাই নিয়ে তাই হলো। তৈরি হলো অসংখ্য দোকান, আর প্রত্যেকেই দাবি করল—আমরাই আদি ও আসল জুলাই বিক্রেতা। শুরু হলো প্রতিযোগিতা—কে কতটা নিখুঁতভাবে জুলাইকে বিক্রি করতে পারে। ছোট থেকে বড়, প্রবীণ থেকে নবীন কেউই বাদ গেল না এই তালিকা থেকে। তবে এই বাজারের সব থেকে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে : বিকাল বেলা দোকান বন্ধ করে সবাই একসাথে, এক কাতারে, পায়ে পায়ে, কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে যোগ দেয় মর্সিয়া সঙ্গীতে। ‘হায় জুলাই, হায় জুলাই` ক্রন্দন স্বরে ভারী হয়ে ওঠে বাংলাদেশের আকাশ।
সুতরাং জুলাই যে একদমই নেই, সেই কথা বলা যাবে না। জুলাই আছে, তীব্রভাবেই আছে। বছর ঘুরে জুলাই তো আসবেই, তবে ধূসর হচ্ছে ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৫, ৩৬ জুলাই। ধূসর হচ্ছে সেইসব অকল্পনীয় চিন্তা—আমরা একটা নতুন ক্যালেন্ডার বানাতে চেয়েছিলাম। পুরোনো নিয়ম মেনে জুন মাসের পর যে জুলাই আসে, সে জুলাইর জন্য ১৪০০ মানুষের প্রাণ দিতে হয় না। পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় না ২০ হাজার মানুষের।
জুলাইকে বাঁচিয়ে রাখতে আজও যারা নির্ঘুম রাত কাটায়, আপনি তাদের একজন। সময় গড়ালে এটা হয়তো অনেকেই ভুলে যাবে।