লেখালেখিটা অনেকটা দেখাদেখি থেকে হয়ে থাকে। কিন্তু আমার জন্মটা এমন এক পরিবার ও এলাকায়, যেখানে সেই দেখাদেখির সুযোগটা ছিল না। পরিবারে অনেকেই শিক্ষিত থাকলেও কেউ লেখালেখি কিংবা শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। এমনকি যতদূর খোঁজ নিয়ে জেনেছি—আমার পূর্বপুরুষদের মধ্যেও কেউ লেখক ছিলেন না। অপর দিকে আমার জন্ম কিশোরগঞ্জের বিস্তৃত হাওরের বুকে ‘হাবুডুবু খাওয়া’ একটি গ্রামে। একদম অজপাড়া গাঁ যাকে বলে। এখন যাতায়াত ও যোগাযোগব্যবস্থা অনেক উন্নত হলেও আমার ছেলেবেলার সেই নব্বই দশকে গ্রামটি অনেকটা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। ফলে দেশে-বিদেশে আর কোথায় কী হচ্ছে, সেটা জানার বা বোঝার সুযোগও খুব একটা ছিল না। যদিও নিজ গ্রামে আমার স্থায়ীভাবে কাটানো সময়টা খুব বেশি না। স্কুলে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার সময়টাই গ্রামে থাকা হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণিতে ওঠার আগেই মাদরাসায় ভর্তির সিদ্ধান্ত হয় পারিবারিকভাবে। যেহেতু নিজ গ্রামে কোনো মাদরাসা ছিল না, এজন্য আমাকে দূর-দূরান্তে ছুটে বেড়াতে হয়েছে পড়াশোনার জন্য। প্রথম কয়েক বছর হাওড়েরই আরেকটি গ্রাম ভাটি ঘাগড়ায় পড়াশোনা করি। পরে চলে যাই হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে। এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তর গ্রাম হিসেবে পরিচিত। সেই গ্রামের দুটি মাদরাসায় কেটেছে ছয়টি বসন্ত। দুরন্ত, উচ্ছ্বল ও প্রাণবন্ত শৈশব বলতে যা বোঝায়, সেটার স্মৃতি জড়িয়ে আছে গ্রামটিতে। ছায়াঢাকা মায়াভরা সেই গ্রামের নির্মল প্রকৃতি এবং হৃদয় উজাড় করে ভালোবাসা দেওয়া মানুষগুলোই মূলত আমাকে লেখালেখিতে টেনে নিয়ে আসে।
‘আউট বই’ পড়ার একটা ঝোঁক সেই ছোটবেলা থেকেই ছিল। যখন তৃতীয় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি, তখনই বড় ভাইবোনদের স্কুলের বাংলা বই পুরোটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তাম। সেই অভ্যাস থেকেই পরবর্তী সময়ে মাদরাসায় এসে যখন দেখলাম আলাদা পাঠাগার আছে, সেটাকে অনেক বড় সুযোগ হিসেবে লুফে নিলাম। বানিয়াচংয়ে বাশিয়াপাড়া মাদরাসায় যখন পড়ি প্রতি সপ্তাহে পাঠাগার থেকে রেজিস্ট্রি করে একটি বই নেওয়া যেতো। কিন্তু একটি বইয়ে আমার পোষাতো না। এজন্য সহপাঠীদের কারও কারও নামেও বই সংগ্রহ করতাম। অনেক সময় ক্লাসের পড়া বাদ দিয়েও আউট বই পড়েছি। তবে নিজের ইচ্ছেমতো বই আনতে না পারার আক্ষেপ ছিল। মনে মনে ভাবতাম, আমি যদি পাঠাগার সম্পাদকের দায়িত্বটা পেতাম! সত্যি সত্যি মাদরাসায় মিজান জামাতে পড়ার সময়ই আমার ওপর সেই দায়িত্বটা চলে আসে। এটাকে আমি অনেক বড় সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। তখন আর সপ্তাহে একটা নয়, ইচ্ছেমতো বই নিয়ে পড়ার সুযোগ পাই। পাঠাগারটা তেমন সমৃদ্ধ ছিল না। তারপরও হাতের কাছে যা পেয়েছি, তাই গোগ্রাসে গিলেছি।
বানিয়াচংয়ের বড়বাজার দারুল কুরআন মাদরাসার পাঠাগারটা ছিল কিছুটা সমৃদ্ধ। তবে কথাসাহিত্যের বই যাকে বলে সেটা ছিল না। সবই ছিল দীনি বইপত্র। তখন অবশ্য বইয়ের ভালো-মন্দ বাছ-বিচারের সক্ষমতাও ছিল না। এখানে ভর্তি হওয়ার এক বছরের মাথায় আমি ছাত্র কাফেলার সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হই। এতে একদিকে পাঠাগার সামলানো, অন্যদিকে সাপ্তাহিক বক্তৃতা প্রশিক্ষণ আয়োজন এবং কয়েক মাস পরপর একটি দেয়াল পত্রিকা প্রকাশের দায়িত্ব আমার ওপর চলে আসে। অথচ এসবের কোনোটারই অভিজ্ঞতা আমার নেই। শিক্ষকদের নির্দেশ, উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। মূলত এই দায়িত্বগুলো পালন করতে গিয়েই বইপত্র ও পত্রপত্রিকার সঙ্গে জড়িয়ে যাই। ছাত্র কাফেলার আলাদা রুম ছিল, সেই রুমের চাবি আমার কাছেই থাকত। সেই রুমে নিভৃতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইয়ে মজে থাকতাম। একজন হুজুরের তত্ত্বাবধানে এটি পরিচালিত হতো। হুজুর আমাকে অন্যরকম মহব্বত করতেন। এজন্য সবকিছুরই একটা স্বাধীনতা আমাকে দিয়ে রেখেছিলেন। আমিই প্রথম ছাত্র কাফেলার পক্ষ থেকে সাপ্তাহিক মুসলিম জাহান, মাসিক মদীনা, মাসিক আদর্শ নারীসহ কিছু পত্রপত্রিকা নিয়মিত সংগ্রহ করা শুরু করি। নিয়ম করে প্রতি বছর বই কিনে পাঠাগারটিকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করি।
সেই সময়টি ছিল উচ্ছ্বল তারুণ্যে ভরা। উদ্যম ও উদ্দীপনায় কোনো ঘাটতি নেই। যা দেখতাম তাতেই প্রভাবিত হয়ে যেতাম। বেশ কয়েক বছর একটি ইসলামি ছাত্র সংগঠনও মনেপ্রাণে করেছি। মাঠে-ময়দানে দৌড়িয়েছি। এতে একাডেমিক পড়াশোনার কিছুটা ক্ষতি হলেও সংগঠন থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। বইপড়া এবং লেখালেখির প্রচুর প্রেরণা সেখান থেকে পেয়েছি। ইতোমধ্যে দেয়ালিকায় লেখা এবং তা সম্পাদনা করতে গিয়ে লেখালেখিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিয়মিত ডায়েরি লিখতাম। পত্রপত্রিকার চিঠিপত্র কলামে কিছু লেখা ছাপাও হয়ে গেছে। কোথাও রচনা প্রতিযোগিতার খবর পেলেই তাতে অংশ নিতাম। সবই নিজের ইচ্ছায়। কেউ তাড়া দেয়নি। কেউ দেখিয়ে দেওয়ার মতোও ছিল না। সম্পূর্ণ নতুন পথ, নিজেই সেই পথ মাড়িয়েছি। অনেকের সহযোগিতা হয়তো পেয়েছি, কিন্তু এমন কেউ ছিল না—যিনি এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ এবং কার্যকরী কিছু টিপস দেবেন।
এখন যেমন আমরা চাইলেই লেখকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারি, মোবাইলে যোগাযোগ করতে পারি, সামাজিক মাধ্যমে তাদের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারি; তখন সেই সুযোগটা ছিল না। লেখকের সংখ্যাই ছিল অত্যন্ত নগণ্য। যাতায়াত ও যোগাযোগব্যবস্থাও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। এজন্য ভালো কোনো লেখকের সান্নিধ্য কিংবা সংযোগ কোনোটার সৌভাগ্যই তখন হয়নি। এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, এখনকার তরুণ লেখকরা বড়দের থেকে যে সহযোগিতা পায়, সেটার সিকি ভাগও আমরা পেলে হয়তো আরেকটু বেশি পথ পাড়ি দিতে পারতাম।
দুই.
চলমান শতাব্দীর শূন্য দশকের শুরুর দিকে দুটি বছর কাটে কিশোরগঞ্জের জামিয়া ইমদাদিয়ায়। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত মাদরাসার পাশেই পাবলিক লাইব্রেরি। জামিয়ার পাঠপ্রিয় শিক্ষার্থীদের একটি প্রিয় জায়গা। কত বিকেল যে এখানে কাটিয়েছি, এর কোনো হিসাব নেই। আসরের নামাজের পর অন্যরা শহরে ঘুরতে বের হতো। আর আমি চলে যেতাম পাবলিক লাইব্রেরিতে। সেখানে ছাত্রদের প্রধান আকর্ষণ ছিল দৈনিক পত্রিকাগুলো। কয়েকটি দৈনিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ত জামিয়ার শিক্ষার্থীরা। তবে আমি দৈনিকের শিরোনামগুলোতে একটা নজর বুলিয়ে নতুন-পুরনো সাময়িকীগুলোতে মজে যেতাম। অনেক পুরনো মাসিক-ত্রৈমাসিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা এখানে পড়ার সুযোগ হয়েছে। নিচতলার বিশাল বইয়ের ভান্ডারেও কেটেছে অনেক বিকেল।
জামিয়া ইমদাদিয়ায় এসে লেখালেখিতে খুব একটা গতি না এলেও দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হয়। কারণ এটি জেলা শহর। দেশের নামকরা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। অনেক বড় বড় মানুষদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। এছাড়া পত্রপত্রিকা, বইপত্র সংগ্রহ অনেকটা সহজলভ্য হয়ে যায়। মাদরাসার পাশেই ছিল আল মদীনা লাইব্রেরি। সেখানে মাসিক মদীনা ও সাপ্তাহিক মুসলিম নিয়মিত আসত। আমি দুটি পত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক ছিলাম। তাছাড়া মদীনা পাবলিকেশন্সের সব বইপত্র এখানে আসত। পাশের আতহার লাইব্রেরি, আশরাফিয়া লাইব্রেরি, আলিমুদ্দীন লাইব্রেরিতেও কারণে-অকারণে ঢু মারতাম। এসব লাইব্রেরিতে বেশির ভাগ ইসলামি বইপত্র থাকত। তবে গৌরাঙ্গবাজারে এক-দুটি জেনারেল লাইব্রেরি ছিল। সেখানে কথাসাহিত্যের সব বই পাওয়া যেতো। সেই লাইব্রেরি থেকে কাসেম বিন আবুবাকার আর হুমায়ুন আহমেদের অসংখ্য উপন্যাস সংগ্রহ করেছি। ততদিনে নিজের ব্যক্তিগত একটি পাঠাগার হয়ে গেছে। প্রতি মাসে নিয়ম করে বই কিনি। এমনকি নাস্তার খরচ বাঁচিয়েও বই কিনতাম।
জামিয়া ইমদাদিয়ায় পড়ার সময়টাতে আমি লেখালেখিতে মোটামুটি নিয়মিত হয়ে গেছি। সাপ্তাহিক মুসলিম জাহান এবং মাসিক সংস্কার দুটি পত্রিকায় প্রায়ই লেখা আসত। লেখালেখির শুরুর সময়টায় আমার সবচেয়ে বেশি লেখা ছাপা হয়েছে মাসিক সংস্কারে। এমনকি কোনো সংখ্যায় আমার একাধিক লেখাও এসেছে। একটা পর্যায়ে মাসিক সংস্কার তাদের ইনার পেজে নিয়মিত লেখকদের তালিকায় আমার নামও যুক্ত করে দেয়। অথচ তখনো ঢাকা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাটির কারও সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা সম্পর্ক ছিল না।
পরবর্তী সময়ে ঢাকায় এসে ফকিরাপুলে মাসিক সংস্কার অফিসে যখন গিয়ে সম্পাদক ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি, তখন তিনি তো আমাকে দেখে হতবাক! কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না আমিই জহির উদ্দিন বাবর! তিনি বলছিলেন, আমি তো ভেবেছিলাম জহির উদ্দিন বাবর অনেক বয়স্ক কেউ হবে। এটা শুধু তিনি নন, আমাকে যারা ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না, লেখা পড়তেন; তাদের অনেকের ধারণা ছিল আমি হয়তো অনেক বয়স্ক কেউ। এর কারণ হলো, আমি শুরু থেকে গুরুগম্ভীর বিষয়েই বেশি লেখালেখি করেছি। আমার লেখার বিষয় বেশির ভাগ ছিল সিরিয়াস ও মুরব্বিয়ানা।
পত্রপত্রিকায় লেখা আসার কারণে জামিয়ায় থাকাকালে সহপাঠী ও অন্যরা আমাকে অন্যভাবে মূল্যায়ন করতেন। মাত্র দুই বছর পড়াশোনা করায় ব্যাপক পরিচিতি ছিল না। তবে ছাত্রদের একটা বড় অংশ আমাকে লেখক হিসেবে চিনত। এমনকি নিচের জামাতের আগ্রহী কেউ কেউ আসতেন লেখালেখি বিষয়ে পরামর্শ নিতে। যদিও তখন লেখালেখির মাত্র সূচনাকাল তবু বিষয়টি বেশ এনজয় করতাম। বড় ভাইদের মধ্যে নূর আহমদ কাসেম এবং শাম্মী ভাই ভালো লিখতেন। তারা মাদরাসার দেয়ালিকা সম্পাদনা করতেন। কীভাবে যেন তারাও আমার লেখালেখির খবর জেনে যান। তারা আমাকেও ছাত্র কাফেলায় যুক্ত করে নেন। দক্ষিণ দিকের ভবনের সিঁড়ির নিচের কামরায় ছিল ছাত্র কাফেলার অফিস। তবে কেন যেন ছাত্র কাফেলার কার্যক্রমে গতি ছিল না। বছরে এক দুটি দেয়াল পত্রিকা বের করাই ছিল মূল কাজ। সেই পত্রিকায় আমিও লিখতাম। শাম্মী ভাইয়েরা দাওরায়ে হাদিস পড়ার সময় ‘আল আতহার’ স্মরণিকা বের করেছিলেন। সেই পত্রিকায় আমার একটি কবিতা ছিল। তখন ছড়া-কবিতা লেখার চেষ্টাও করতাম। পুরনো ডায়েরিতে বেশ কিছু ছড়া-কবিতা এখনো সংরক্ষিত আছে। যদিও নিয়ম-কানুনের কিছুই জানতাম না। ভুল ধরিয়ে দেওয়ার মতোও কেউ ছিল না। মনে করতাম, শেষটা মিল থাকলেই বোধহয় ছড়া-কবিতা হয়ে যায়! পরবর্তী সময়ে সেই ভুল ভেঙেছে। তবে নিয়ম মেনে আর ছড়া-কবিতা লেখা হয়ে ওঠেনি।
জালালাইন ও মিশকাত দুই জামাত পড়ার পর দাওরায়ে হাদিস পড়তে চলে আসি ঢাকায়। ভর্তি হই শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত জামিয়া রাহমানিয়ায়। দাওরায়ে হাদিসের বছর ক্লাসের চাপেই চিড়ে-চ্যাপ্টা হওয়ার মতো অবস্থা। ফজরের পর ক্লাস শুরু হতো, সেটা মাঝখানে বিরতিসহ চলত রাত ১০টা পর্যন্ত। সুতরাং লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা তখন ছিল না। তবু ওই বছরটিও ছিল লেখালেখির জন্য টার্নিং পয়েন্ট। প্রথমবারের মতো রাজধানীতে এসেছি। শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ., মাওলানা সিদ্দিকুর রহমান রহ., মাওলানা নোমান আহমদ রহ., মুফতি হিফজুর রহমান, মাওলানা লিয়াকত আলী, মাওলানা মামুনুল হকসহ বেশ কয়েকজন লেখকের কাছে সরাসরি সবক পড়ার সুযোগ হয়। এর আগে বইয়ের লেখকের সরাসরি সান্নিধ্য সেভাবে পাইনি। ফলে এটা ছিল অনেক বড় প্রাপ্তি। বিশেষ করে বছরের শুরুতেই বহু গ্রন্থ প্রণেতা মাওলানা নোমান আহমদ রহ. মুসলিম শরিফের ক্লাস করাতে গিয়ে লেখালেখির গুরুত্বের ওপর দীর্ঘ আলোচনা করেন। সেই আলোচনা প্রায় পুরোটাই আমি অনুলিখন করি। নোমান সাহেব ও হিফজুর রহমান সাহেবদের লেখালেখিতে সারাক্ষণ মজে থাকতে দেখেছি দিনের পর দিন। এজন্য কর্মজীবনে যেখানেই থাকি, নিজের মধ্যে লেখার যে যোগ্যতাটুকু আছে সেটা কাজে লাগাবো— সেই প্রতিজ্ঞা তখনই করি।
ঢাকায় প্রথম আসার সুবাদে প্রতি বৃহস্পতি-শুক্রবারে নানা জায়গায় ছুটে যেতাম। বিশেষ করে প্রায়ই যেতাম বাংলাবাজারের বইয়ের রাজ্যে। বায়তুল মোকাররমের বই মার্কেট ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের লাইব্রেরিও ছিল প্রিয় জায়গা। পুরানা পল্টন ও নিউমার্কেটের ফুটপাতে যাওয়া হতো নিয়মিতই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় পুরনো বই নড়াচড়া করতাম। সেখান থেকে নিয়মিত বই সংগ্রহও করতাম। যেহেতু ঢাকায় নতুন, লেখক বন্ধুও সেভাবে জুটেনি, ফলে শিল্প-সাহিত্যকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানের খোঁজখবর খুব একটা পেতাম না। তবে কোথাও এ ধরনের কোনো অনুষ্ঠানের খবর পেলে ছুটে যেতাম। লেখা কম হলেও সেই বছরটি অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ করে।
তিন.
২০০৫ সালে ভর্তি হই মাদরাসা দারুর রাশাদে। সাহিত্য সাংবাদিকতা বিভাগে। দুই বছরের কোর্স। পুরোটাই লেখালেখিনির্ভর। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লেখালেখির তাগিদ দেওয়া হতো সকাল-বিকেল। মাদরাসা থেকে খাওয়া-থাকা সব ফ্রি। সঙ্গে পকেট খরচ হিসেবে মিলত স্টাইপেন্ট বা বৃত্তিও। খাওয়া-থাকা আর পকেট খরচ যোগাড় হয়ে যাওয়ায় আর কোনো টেনশনই ছিল না। কম্পিউটার ল্যাবও প্রস্তুত। শেখা এবং প্র্যাকটিস একসঙ্গে চলতে থাকে। লেখালেখিতে মজে যাওয়ার এর চেয়ে সুবর্ণ সুযোগ আর কী হতে পারে! সেই সুযোগটাই আমি কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। যেহেতু আমার আগে থেকেই লেখালেখির অভ্যাস আছে এজন্য সেটা ভালোমতো কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। আমরা দশজন ছিলাম। আমার চেয়ে অনেক মেধাবীরাও ছিলেন। তবে তাদের লেখালেখির অভ্যাস না থাকার কারণে পরবর্তী সময়ে আর এই অঙ্গনে টেকেননি। এমনকি আমার চেয়ে অনেক ভালো লিখতেন এমন কয়েকজনকেও হারিয়ে যেতে দেখেছি।
দারুর রাশাদে মাওলানা লিয়াকত আলীর মতো দক্ষ লেখক ও সাংবাদিকের সরাসরি তত্ত্বাবধান আমরা পেয়েছি। ছিলেন মাওলানা আইয়ুব বিন মঈনসহ একঝাঁক লেখক উস্তাদ। বাইরে থেকে ভিজিটিং লেকচারার হিসেবে আসতেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ড. আব্দুল জলিলসহ খ্যাতিমান লেখকরা। মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা মুহাম্মাদ সালমানের অনুপ্রেরণা, উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা ছিল একজন অলেখককেও লেখক বানিয়ে দেওয়ার মতো। সঙ্গে শিক্ষকদের তত্ত্বাবধান এবং অনুকূল পরিবেশ লেখালেখি চর্চার অবারিত সুযোগ এনে দেয়। আর আমাদের ব্যাচের সবাই ছিলেন মেধাবী। প্রতি মাসে কার কতটি লেখা পত্রপত্রিকায় ছাপা হচ্ছে সেটার একটা নীরব প্রতিযোগিতা চলত। এই প্রতিযোগিতা লেখার স্পৃহা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
দারুর রাশাদে দুই বছর পড়াশোনার পর সেখানেই আমার কর্মজীবন শুরু হয়। মাদরাসার প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাই। মাদরাসার মুখপত্র আর-রাশাদের নির্বাহী সম্পাদক নিযুক্ত হই। পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষকতার দায়িত্বও পাই। তাছাড়া আধুনিক ও ইসলামি শিক্ষার সমন্বিত বিভাগ জামেয়াতুর রাশাদেও আমার ক্লাস ছিল। সত্যিকার অর্থে আমার লেখক-জীবনের সবচেয়ে উচ্ছ্বল, গতিময় ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা সময় সেটাই ছিল। সেই সময় লেখার গতি ছিল অনেক বেশি। দুই হাতে লেখালেখি যাকে বলে সেটা তখন হয়েছে। মাসিক পত্রিকাগুলোর রমরমা অবস্থা ছিল তখন। বেশির ভাগ পত্রিকায় আমার লেখা আসত। কেউ লেখা চেয়েছে কিন্তু পায়নি— এমনটা আমার ক্ষেত্রে খুব কমই হয়েছে। এখনো শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও সেই অভ্যাসটা ধরে রাখার চেষ্টা করি। সেই সময় দৈনিক পত্রিকার ইসলাম পাতাগুলোতে ছিল আমার সরব উপস্থিতি। এমনও হয়েছে শুক্রবারে একসঙ্গে কয়েকটি পত্রিকায় লেখা এসেছে। প্রতিটি লেখারই বিল হতো। বাড়তি ইনকাম হিসেবেও মন্দ ছিল না। বইপত্রও ইতোমধ্যে প্রকাশ শুরু হয়ে গেছে। প্রকাশকদের কাছেও চাহিদা বাড়তে থাকে। বিশেষ করে নামে-বেনামে প্রচুর অনুবাদ তখন করেছি। মানের বিচারে সেই লেখাগুলো ততটা উত্তীর্ণ না হলেও পরিমাণে তা ছিল অনেকের জন্য ঈর্ষণীয়। কেউ কেউ বলছেন— এতো লেখা কীভাবে লেখেন!
আমার ধারণা, দারুর রাশাদের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণবন্ত ও আলোকিত সময় সেটাই ছিল। এখানকার লেখকদের লেখায় ঠাসা থাকত দৈনিক ও মাসিক পত্রিকার পাতাগুলো। একসঙ্গে অনেক লেখকের সম্মিলন ঘটেছিল সেই সময়টিতে। মাদরাসার শিক্ষকদের মধ্যে মাওলানা সালমান, মাওলানা লিয়াকত আলী, মাওলানা আইয়ুব বিন মঈন, মাওলানা আহমাদুল্লাহ (শায়খ আহমাদুল্লাহ) মাওলানা উমায়ের কোব্বাদী, মাওলানা মুহাম্মদ ফয়জুল্লাহ, মাওলানা শরীফ আনিসুর রহমানসহ একঝাঁক লেখক ছিলেন। আমাদের বোঝাপড়াটাও ছিল অন্যরকম। আমার রুমে নিয়মিত আড্ডা বসত। সেই আড্ডায় যোগ দিতেন আজকের জনপ্রিয় শায়খ আহমাদুল্লাহসহ অনেক তরুণ শিক্ষক। শিল্প-সাহিত্য, লেখালেখিসহ দেশ-জাতিকে নিয়ে নানা ভাবনা স্থান পেত সেই আড্ডায়। প্রতি মাসেই বসত সাহিত্যের আসর। আয়োজন করতো রাবেতা আদবে ইসলামি ঢাকা ব্যুরো। সেখানে রাজধানীর নামকরা লেখকরা আসতেন। কখনো কখনো অন্য কোনো মাদরাসায় গিয়েও সাহিত্য সভা করেছি। মাদরাসার অদূরে সাংবাদিক আবাসিক এলাকায় বাসা ছিল নন্দিত লেখক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদের। তাঁর আরেকটি ঠিকানা ছিল দারুর রাশাদ। নিয়মিতই আসতেন। বিশেষ করে আমাকে কেন্দ্র করেই দারুর রাশাদে তাঁর আনাগোনা ছিল। পরবর্তী সময়ে প্রত্যেকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমার পরপর দারুর রাশাদের সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করেন আলী হাসান তৈয়ব, গাজী মুহাম্মদ সানাউল্লাহ, হাসনাইন হাফিজ, আতাউর রহমান খসরু, রোকন রাইয়ান, ইলিয়াস জাবেরসহ তরুণদের কাছে পরিচিতমুখ বেশ কয়েকজন লেখক। তাদের কেন্দ্র করেও দারুর রাশাদের শিল্প-সাহিত্যের নানা গল্প আবর্তিত হয়।
দারুর রাশাদে পড়াশোনার সময়ই দুটি পত্রিকার সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার স্মৃতি আমার লেখক-জীবনের আলোকিত অধ্যায়। ২০০৫ সাল। দারুর রাশাদে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ি। মাওলানা শরীফ মুহাম্মদের সম্পাদনায় তখন একটি নতুন ধারার মাসিক পত্রিকা বাজারে আসে। মাসিক যমযম। নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার বশির মিসবাহ। বিশিষ্ট কথাশিল্পী মাওলানা ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভীসহ আরও অনেকেই যুক্ত ছিলেন। পুরানা পল্টনে ছিল পত্রিকাটির অফিস। তরুণদের মধ্যে প্রতিবেদক হিসেবে পত্রিকাটির ইনার পেজে দুজনের নাম যুক্ত হয়। আমি ও গাজী মুহাম্মদ সানাউল্লাহ। মূলত আমরা দুজনই মাওলানা শরীফ মুহাম্মদের স্নেহভাজন ছিলাম। দৈনিক আমার দেশে আমাদের প্রচুর লেখা তিনি ইতোমধ্যে ছাপিয়েছেন। সেই সুবাদে যমযমের কাজেও আমাদের যুক্ত করেন। যমযম ছিল গতানুগতিক ইসলামি পত্রিকাগুলো থেকে কিছুটা ভিন্ন। লেখাগুলো ছিল বেশ পরিকল্পিত ও পাঠকপ্রিয়। মেকাপ-গেটাপে আনা হয় আমূল পরিবর্তন। বাজারে এসেই ব্যাপক সাড়া ফেলে। বড়দের সান্নিধ্যে থেকে একটি পত্রিকা কীভাবে করতে হয় তা হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পাই। এটা ছিল জীবনের অনেক বড় প্রাপ্তি। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, পত্রিকাটি তিনটি সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর হোঁচট খায়। আমাদের অঙ্গনে সাধারণত যা হয়, এখানেও তাই হয়েছে। সমসাময়িক বেশ কয়েকজন বন্ধুবান্ধব ও শুভকাঙ্ক্ষী সম্মিলিতভাবে উদ্যোগটি নিয়েছিলেন। তবে কিছুদিন যেতে না যেতেই নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে শরীফ মুহাম্মদ সাহেব বেরিয়ে যান। কয়েক মাস বিরতি দিয়ে পত্রিকাটির আরও কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। তবে ছিল না প্রাণ। নিছক বের করার জন্য করা। আমরাও নিজেদের গুটিয়ে নিই যমযম থেকে।
এর পরপর আরেকটি পত্রিকার সঙ্গে জড়ানোর সুযোগ হয়— মাসিক কাবার পথে। তখন তুমুল জনপ্রিয় সাময়িকী এটি। ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন ঘরানায় একচেটিয়া প্রভাব। পত্রিকাটিতে নির্বাহী হিসেবে কাজ করতেন আমাদের দারুর রাশাদের বড় ভাই রায়হান মুহাম্মদ ইবরাহীম। মূলত তিনিই আমাকে সহযোগী সম্পাদক হিসেবে পত্রিকাটিতে নিয়োগ দেন। তখনও আমি দারুর রাশাদের ছাত্র। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের নেতা মাওলানা সাইফুদ্দীন ইয়াহইয়া। স্বল্পভাষী, অমায়িক রায়হান ভাইয়ের সঙ্গে মাসিক কাবার পথে কয়েক মাস কাজ করে নতুন এক অভিজ্ঞতা হয়। নিজে লেখার পাশাপাশি সম্পাদনার অভিজ্ঞতাটুকুও হাতে-কলমে অর্জিত হয়। তবে কয়েক মাস কাজ করার পরও ওয়াদা অনুযায়ী বেতন-ভাতা পরিশোধ না করায় এক সময় আমি নিজেই সরে পড়ি। এর বছরখানেকের মাথায় অবশ্য পত্রিকাটিই বন্ধ হয়ে যায়। সম্পাদক হজ ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। লোকজনের টাকা-পয়সাসহ হঠাৎ উধাও হয়ে যান। কোনো পাত্তাই পায়নি কেউ। এমনকি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন সেটাও জানতেন না আশপাশের মানুষেরা। কয়েক বছর আগে করোনা মহামারির প্রকোপের সময় খবর আসে মাওলানা সাইফুদ্দীন ইয়াহইয়া মারা গেছেন। দোয়া করি, আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করে দিন।
চার.
লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার এক পর্যায়ে মাথায় সাংবাদিকতার ভূত চেপে বসে। লেখালেখি ও সাংবাদিকতা—একটার সঙ্গে আরেকটার যোগসূত্রতা আছে। তবে আমাদের মতো মাদরাসাপড়ুয়াদের জন্য লেবাস-পোশাক ও অবয়ব ঠিক রেখে মূলধারার সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়াটা সহজ ছিল না। সেটা ২০১০ সালের কথা। দৈনিক নয়া দিগন্তে একদিন একটি বিজ্ঞাপন দেখলাম তিন মাসব্যাপী সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণের। পত্রিকাটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান এমআরটি এই কোর্সের আয়োজন করে। ভর্তির যে শর্ত দেওয়া হয় তাতে দেখলাম আমার সুযোগ আছে। কেননা দাওরায়ে হাদিসের পর দাখিল-আলিম পরীক্ষা দিয়ে ততদিনে ডিগ্রি পাস কোর্সে ভর্তি হয়ে গেছি। ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখলাম ঢাকা, জগন্নাথ, জাহাঙ্গীরনগরসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স করা লোকেরা এসেছেন। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে আমার মতো ‘মৌলভি সাহেবের’ পক্ষে ভর্তি হওয়া কঠিন বলেই ধরে নিলাম। তবে শেষ পর্যন্ত ভর্তি হতে পারলাম। একই কোর্সে আমাদের লেখক বন্ধু মাসউদুল কাদিরও ভর্তি হলেন। তিন মাসের কোর্স শেষ হতে প্রায় পাঁচ মাস লেগে যায়। সপ্তাহে তিন দিন ক্লাস। দেশের নামকরা সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদরা ক্লাস নেন। নতুন এক জগৎ সম্পর্কে ধারণা পাই। কোর্স শেষে পরীক্ষায় দেখা গেল ৩০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে আমি প্রথম হয়েছি। এটা ছিল আমার জীবনের অন্যতম আনন্দের মুহূর্ত। যারা শুরুতে মাদরাসাপড়ুয়া বলে নাক সিটকাতেন তারাই পরে সমীহ করা শুরু করেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রথম দশজনকে নয়া দিগন্তে ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ দেয়। আমি, মাসউদুল কাদিরসহ পাঁচজন সালাহউদ্দিন বাবরের তত্ত্বাবধানে ইন্টার্নশিপের সুযোগ পাই। তিনি তখন পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক। এখন তিনি নয়া দিগন্তের সম্পাদক। অত্যন্ত সজ্জন ও অমায়িক মানুষ। তিনি খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের হাতে-কলমে সাংবাদিকতা শিক্ষার বিষয়টি তত্ত্বাবধান করেন। সাংবাদিকতার শিক্ষক হিসেবে তিনি আজও আমাদের কাছে পরম শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে আছেন। সাংবাদিকতার বাইরেও ইতিহাস, রাজনীতি ও জীবনবোধ সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান তাঁর কাছ থেকে লাভ করেছি।
সাংবাদিকতা কোর্স এবং সেখানে ভালো ফলাফল করা সত্ত্বেও কোথাও কাজের সুযোগ হচ্ছিল না। তবু নতুন কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে—এটাই ছিল বড় প্রাপ্তি। কোর্স সম্পন্ন করার আরও বেশ কয়েক মাস পর আমাদের সেই কোর্সের অন্যতম জনপ্রিয় শিক্ষক সরদার ফরিদ আহমদের সম্পাদনায় নতুন একটি নিউজপোর্টাল বাজারে আসে। নাম বার্তা২৪ ডটনেট। মালিক সুপার স্টার গ্রুপ। ফরিদ ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও অনেক আগে। সেই মাসিক যমযম থেকে। তিনি মাসিক যমযমে ‘রাজনীতির পলিটিক্স’ নামে জনপ্রিয় একটি কলাম লিখতেন। বাড়ি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায়। শরীফ মুহাম্মদ সাহেবের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাওলানা লিয়াকত আলীর ক্লাসমেট। সে হিসেবে আমাকেও খুব স্নেহ করতেন। বার্তা২৪ ডটনেটের শুরু থেকেই শরীফ মুহাম্মদ সাহেব যুক্ত হন। তিনি তখন দৈনিক আমার দেশেও আছেন। মাসিক আলকাউসারেরও নির্বাহী সম্পাদক। তবে কম্পিউটার-ইন্টারনেটে এতোটা ফ্রেন্ডলি হয়ে না ওঠার কারণে তিনি এই চাকরিটা এনজয় করছিলেন না। তাছাড়া আরও দুটি চাকরি সামলে টাইম ধরে অফিস করার বিষয়টি তাঁর শরীরে কুলাচ্ছিল না। এক পর্যায়ে তিনি সেখান থেকে রিজাইন দেন। আমি তখন দারুর রাশাদে। সেই সুযোগটা লুফে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। একদিন সরদার ফরিদ ভাইকে ম্যাসেঞ্জারে নক দিলাম— আমি সাংবাদিকতা করতে চাই। সেই সুযোগটা তিনি যেন করে দেন। তিনি আমাকে দেখা করতে বললেন। তখন ২০১১ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি। ফরিদ ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। খুবই মিশুক ও আড্ডাপ্রিয় একজন মানুষ। নানা গল্প হলো তাঁর সঙ্গে। এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করলেন— তুমি কি সিরিয়াসভাবে কাজ করতে চাও? নাকি শখের বশে কয়েক দিন করে চলে যাবে? আমি বললাম, আপনি সুযোগ দিলে আমি সিরিয়াসভাবেই করতে চাই। তিনি বললেন, তাহলে ঠিক আছে। ভাঙা মাসেই জয়েন করতে বললেন। ১৬ জুলাই ২০১১, শুরু হলো পেশাদার সাংবাদিকতায় আমার যাত্রা। তখন অনলাইন নিউজপোর্টাল ছিল হাতেগোনা কয়েকটি। এর মধ্যে বেশ ভালো করছিল বার্তা২৪ ডটনেট।
আমার কম্পোজ ছিল মোটামুটি চালু। লেখালেখির কারণে সম্পাদনা জ্ঞানও ছিল চলনসই। আর ইন্টারনেট ব্যবহার আরও কয়েক বছর আগে থেকেই শুরু করেছি। ফলে কয়েক দিনেই আমি অনলাইনে বেশ ফ্রেন্ডলি হয়ে গেলাম। দ্রুত নিউজ লেখা ও সম্পাদনার ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে অনেকটা এগিয়েই থাকলাম। এমনকি শুরুতে যারা আমার নিউজগুলো দেখে আপলোডে দিতেন কয়েক দিনের মাথায় ঘটনা ঘটল উল্টো। তাদের কয়েকজনের নিউজ উল্টো আমাকে দেখে ছাড়তে হলো। কারণ সম্পাদকের নির্দেশ। এক মাসেরও কম মফস্বল ডেস্কে কাজ করার পর আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো সেন্ট্রাল ডেস্কে। আলহামদুলিল্লাহ, উত্তরোত্তর ভালো করতে লাগলাম এবং সম্পাদক ফরিদ ভাইয়ের অসম্ভব প্রিয় পাত্রে পরিণত হলাম। কওমি মাদরাসাপড়ুয়াদের সম্পর্কে ফরিদ ভাইয়ের ধারণাই পাল্টে গেল। সেটা তিনি নানা জায়গায় বলেছেনও। তবে আমি যোগ দেওয়ার এক বছর কয়েক মাসের মাথায় মালিকপক্ষের সঙ্গে ঝামেলার কারণে ফরিদ ভাই বার্তা২৪ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। নতুন বার্তা ডটকম নামে আরেকটি পোর্টাল করার প্রক্রিয়াও শুরু করে দিলেন। অনিবার্যভাবে আমিসহ বেশির ভাগ কর্মী ফরিদ ভাইয়ের সঙ্গে চলে গেলাম। বার্তা২৪ ডটনেটও কয়েক দিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেল। এদিকে নতুন বার্তার মালিকানায় নেপথ্যে কয়েকজন ব্যবসায়ী থাকলেও সামনে রইলেন ফরিদ ভাই। কারওয়ানবাজারে নেওয়া হলো অফিস। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে নতুন বার্তাও জনপ্রিয়তার শীর্ষে চলে গেল। ২০১২/১৩ সালের উত্তাল সেই দিনগুলোতে ইসলাম ও ডানপন্থীদের পক্ষে নতুন বার্তার ভূমিকা ছিল বেশ সাহসী। এজন্য পাঠকের কাছে পোর্টালটি ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়। নতুন বার্তায় আমি প্রথমে সিনিয়র সাব এডিটর, পরে শিফট ইনচার্জ হিসেবে দুই আড়াই বছরের মতো কাজ করি। অনেকটা নির্ভরতার প্রতীকে পরিণত হই। ফরিদ ভাই বলতেন— তুমি অফিসে থাকলে আমার আর অফিস নিয়ে টেনশন করতে হয় না। সাংবাদিকতার শুরুর সেই সময়টাতে কাজের গতিও ছিল অনেক বেশি। তাছাড়া সবসময় নিজেকে প্রমাণ করতে চাইতাম। টুপি-দাড়ির কারণে কেউ যেন করুণা কিংবা বাঁকা চোখে দেখার সুযোগ না পায়— সেই চেষ্টা করতাম।
বেতন-ভাতা অনিয়মিত হয়ে যাওয়া এবং অনেকটা ভাটার টান লক্ষ্য করে ২০১৫ সালের শুরুর দিকে আমি হাউজ পাল্টানোর সিদ্ধান্ত নিই। যোগ দিই ঢাকা টাইমসে। এটিও তখন বেশ জনপ্রিয় পোর্টাল। ইস্কাটন গার্ডেনে অফিস। সম্পাদক আরিফুর রহমান দোলন। তিনি প্রথম আলোর ডাকসাইটে রিপোর্টার ছিলেন। এছাড়াও বেশ কয়েকটি শীর্ষ গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। পরবর্তী সময়ে অবশ্য নিজেই প্রচুর অর্থকড়ির মালিক হন এবং ঢাকা টাইমস তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন। সাংবাদিকতা জীবনে আমি দোলন ভাইয়ের কাছেও ঋণী। অসম্ভব ভালোবাসা, স্নেহ ও প্রশ্রয় পেয়েছি। সবচেয়ে বড় হলো, সাংবাদিকতার অনেক কলাকৌশল তাঁর কাছ থেকে শেখার সুযোগ হয়েছে। নানা ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য, সমাজসেবা এবং একটা পর্যায়ে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হলেও তাঁর সাংবাদিতার দক্ষতায় বারবার মুগ্ধ হয়েছি। পুরোদস্তুর একজন নিউজম্যান এবং অসম্ভব রকমের আইডিয়াবাজ। ঢাকা টাইমসে সিনিয়র সাব এডিটর হিসেবে যোগ দিলেও প্রায় সাত বছরের কর্মজীবনে বারবার পদোন্নতি পেয়েছি। যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, সিনিয়র যুগ্ম বার্তা সম্পাদক এবং সবশেষ বার্তা সম্পাদক করা হয় আমাকে। সুযোগ-সুবিধার প্রশ্নেও কখনো নিজ থেকে কিছু বলতে হয়নি, সম্পাদক নিজ থেকেই তা বাড়িয়ে দিয়েছেন। এমনকি ঢাকা টাইমসের মসৃণ চলার জন্য হাতেগোনা যে দুই তিনজনকে অপরিহার্য মনে করা হতো, সেই তালিকায়ও আমি ছিলাম। সবমিলিয়েই আমার সাংবাদিকতা জীবনের অনেক বেশি প্রাপ্তি এবং বর্ণাঢ্য সময় অতিবাহিত হয়েছে ঢাকা টাইমসে।
২০২২ সালের শুরুতে দেশের শীর্ষ শিল্পগ্রুপ ইউএস-বাংলা ঢাকা মেইল ডটকম নামে একটি অনলাইন পোর্টাল বাজারে আনে। ঢাকা টাইমসে সাত বছরের চাকরি জীবনে অন্য কোথাও কখনো ট্রাইও করিনি। তবে এতো দীর্ঘ সময় একটি হাউজে থাকলে সেখান থেকে নতুন করে তেমন কিছু শেখার সুযোগ থাকে না। মূলত এ কারণেই হাউজ চেঞ্জ করার সিদ্ধান্ত নিই। ঢাকা টাইমস কর্তৃপক্ষ আমাকে আটকে রাখার সব ধরনের চেষ্টাই করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত আমার ইচ্ছার কাছে তাদের হার মানতে হয়েছে। আমি যোগ দিই ঢাকা মেইলে। ইতোমধ্যে এখানেও কেটে গেছে প্রায় চার বছর। দেশের অন্যতম শীর্ষ এই গণমাধ্যমটির বার্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এখানেও নতুন করে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে। সবচেয়ে বড় হলো, কর্তৃপক্ষের অসম্ভব রকমের মূল্যায়ন ও সম্মান দিন দিন প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিবিড় ও গাঢ় করছে। জানি না এখানে আল্লাহ এখানে রিজিক কতদিন রেখেছেন। তবে আমার সাংবাদিতা জীবনের আগের দুই তিনটি প্রতিষ্ঠানটির মতোই ঢাকা মেইলও হৃদয়ের মণিকোটায় জায়গা করে নিয়েছে।
লেখালেখি ও সাংবাদিকতা— আমার জীবনের অপরিহার্য অনুসঙ্গে পরিণত হয়েছে। জীবনের সঙ্গে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে যে, চাইলেও নিষ্কৃতি সম্ভব নয়। শুধু পেশা নয়, পরিণত হয়েছে নেশায়। প্রতিদিন কিছু না কিছু লিখলে দিনটাই মনে হয় বৃথা গেল। এক যুগের বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে নিউজরুম সামলাচ্ছি। আমার জানামতে দেশের দ্বিতীয় কোনো আলেম সাংবাদিকের এই রেকর্ড নেই। ফলে নিউজরুমই হয়ে গেছে প্রিয় প্রাঙ্গণ। আট ঘণ্টার অফিস টাইম কীভাবে যে পার হয়ে যায় সেটা টেরও পাই না। দিনশেষে আমি নিজেকে একজন লেখক ও সাংবাদিক হিসেবেই দেখতে চাই। একজন শব্দ-শ্রমিক হিসেবেই কাটিয়ে দিতে চাই বাকি জীবনটুকু। চিন্তা ও আদর্শের শক্ত পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে সেবা করে যেতে চাই দেশ, জাতি ও উম্মাহর। নিজের মেধা ও শ্রম মানুষের কল্যাণে যেন জীবনের শেষ সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যয় করতে পারি— সেটাই আমার জীবনের একান্ত চাওয়া।
সবটুকু লেখা পড়লাম উস্তাদ! আপনার পুরো জীবনটা এক পলক দেখে নিলাম।
আপনার অগ্রগতি আর উন্নতি দেখে ভালো লাগল, মুগ্ধ হলাম।
শেষ কথা, আপনি আমার বাংলা শেখার গুরু। ২০২১ সনের শেষ দিকে পল্টনে আওয়ার ইসলামের উদ্যোগে লেখক ফোরামের তত্বাবধানে আয়োজিত ‘ভাষা-সাহিত্য সাংবাদিকতা সার্টিফিকেট’ কোর্সটি আমি করার সৌভাগ্য লাভ করেছি। আপনাকে উস্তায হিসেবে পেয়েছি সেখানেই। আমার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়ও আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম।
জাযাকুমুল্লাহু খায়রান প্রিয় উস্তাদ ও লেখক!
বাবর ভাই কর্মতৎপর মানুষ। লেখালেখির যোগ্যতার পাশাপাশি যেটুকু নিবেদন দরকার, বাবর ভাইয়ের জীবনে তা উজ্জ্বল, প্রতিভাত। আলস্যে হারানো লেখকসত্তার জন্য তিনি অনুপ্রেরণা হয়ে উঠুন।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটানে পড়েছি। মনে হচ্ছে ওনার জীবন টা আমার চোখের সামনে ভাসছে। সফল হতে হলে একজন মানুষকে কিভাবে পরিশ্রম আর ধৈর্যের সাথে লেগে থাকতে হয়, কিভাবে প্রতিটি মুহূর্ত নিজের ফোকাস উন্নত করার জন্য কাজ করে যেতে হয়, সেটা ওনার লেখা থেকে খুব সুন্দর ভাবে অনুধাবন করা যায়।