শীত আমার কাছে বরাবরই এক দ্বিমুখী অনুভূতির নাম। একদিকে হাড়কাঁপানো ঠান্ডার ভয়, আর অন্যদিকে হিমেল কুয়াশায় জড়িয়ে থাকার একরাশ মায়া। আমি ছিলাম প্রচণ্ড শীতকাতুরে; শীত এলেই মনে হতো যদি কোনো জাদুর মন্ত্রে নিজেকে পিপীলিকার মতো গর্তে লুকিয়ে ফেলা যেত, কিংবা ভাল্লুকের মতো মধু খেয়ে দীর্ঘ শীতঘুমে কাটিয়ে দেওয়া যেত বিভীষিকাময় ঠান্ডার দিনগুলো!
মফস্বলে শীত আসত রাজকীয় দাপটে, ঢাকঢোল পিটিয়ে। কার্তিকের শেষ দিকেই হালকা শীতের আভাস পাওয়া যেত। অগ্রহায়ণে নতুন ধানের আগমনে তা আরও জাঁকিয়ে বসত। উঠোনে গরুর ধান মাড়াই, স্তূপ করে রাখা খড়ের গাদা থেকে ওঠা বাষ্প আর গাঁজানো ধানের গন্ধ শীতের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। ইটের পাঁজরে ঘেরা এই শহরে এখন শীতের জন্য হাপিত্যেশ করতে হয়। পৌষ পেরিয়ে গেলেও দেখা মেলে না সেই চেনা শীতের।
শহর আর গ্রামের শীতের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। ইট-কাঠের শহরে ক্যালেন্ডারের পাতায় শীত এলেও, তার আসল রূপটি বোধহয় আজও মফস্বল আর নিভৃত গ্রামগুলোতেই লুকিয়ে আছে। বর্তমানের যান্ত্রিক জীবন আর প্রযুক্তির ভিড়ে সেই সোনালি দিনগুলো ধূসর হয়ে এলেও, স্মৃতির দুয়ার ঠেলে দিলেই কানে বাজে টিনের চালে শিশির ঝরার শব্দ আর চোখে ভাসে দাদির হাতের গরম ভাপাপিঠার ধোঁয়া। শৈশবের সেই মায়াবী শীতের দিনগুলো আজ কেবলই মনের মণিকোঠায় যত্ন করে রাখা কিছু স্মৃতির অ্যালবাম। সেই অ্যালবামের পাতা ওলটালেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক চিরায়ত বাংলার রূপ, যার তুলনায় শহুরে শীত বড্ড অসহায় আর প্রাণহীন।
শীতে গ্রামাঞ্চলের প্রকৃতি-পরিবেশে এক ভিন্নমাত্রা যুক্ত হয়। ধান কাটা, ধান মাড়াই করা, পৌষ-পার্বণের পিঠা তৈরি, শীতের সবজি চাষ, বিয়ের ধুম, চড়ুইভাতি, যাত্রাপালাসহ আরও নানা কাজে মানুষ মেতে থাকে। মফস্বলে থাকার কারণে খুব গভীরে শীত উপভোগ করার সুযোগ হয়েছে। কত সুখের স্মৃতি জড়িয়ে আছে শৈশবের শীত ঘিরে। কাকডাকা ভোরে যখন গাছের পাতা বেয়ে শিশির টুপ টুপ করে টিনের চালে পড়ত; আমরা কচিকাঁচার দল বরফঠান্ডা পানিতে অজু করে, কাঁপতে কাঁপতে মক্তবে যেতাম। আমাদের শরীরের কাঁপুনি দাঁতকপাটিতে লেগে কিটকিট আওয়াজ তুলে মিলিয়ে যেত ভোরের নিস্তব্ধতায়।
মক্তব থেকে ফিরে, বেতে বোনা শের ভরে মুড়ি আর পাটালি খেজুরের গুড় নিয়ে টুল পেতে বসে যেতাম উঠানে। পিঠে রোদ লাগিয়ে মচমচ করে গুড়-মুড়ি খেতাম আর পাঠশালার পাঠ ঠোঁটস্থ করতাম। পাঠ ঠোঁটস্থ শেষে, গরম–গরম ভাতের সঙ্গে নানা পদের ভর্তা মেখে খেয়ে হেলেদুলে চলে যেতাম পাঠশালায়। শুক্রবারের সকাল ভিন্ন আঙ্গিকে শুরু হতো। আমরা কচিকাঁচার দল ঘুম থেকে উঠে, চোখ কচলাতে কচলাতে মল্লিকদের বাগানে জড়ো হতাম; জলপাই, বরই কুড়িয়ে—কে কত বড় জলপাই বা বরই কুড়িয়েছে, তা নিয়ে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠতাম। কখনো কখনো খোলা মাঠে ঘন হয়ে জমে থাকা কুয়াশার ভেতর লুকোচুরি খেলতাম। কুয়াশা এত ঘন হয়ে পড়ে থাকত যে, এক ফুট দূরে কী আছে তা দেখা যেত না। আমরা খুব সহজেই রূপকথার জাদুকরের মতো ‘অ্যাবরা–কা–ড্যাবরা’ বলে কুয়াশার বুকে হাওয়া হয়ে যেতাম। লুকোচুরি খেলা শেষে, স্যান্ডেলভরতি একগাদা শিশিরভেজা মাটি নিয়ে বাড়ি ফিরতাম।
আমাদের নিজস্ব সবজিবাগান ছিল। প্রায় সব ধরনের শীতকালীন সবজি চাষ হতো সেখানে। ইচ্ছেমতো তরতাজা সবজি তুলে চড়ুইভাতির আয়োজন করতাম। এক পাশে চড়ুইভাতি আর অন্য পাশে মল্লিকদের বাগান থেকে কুড়িয়ে আনা জলপাই ও বরইয়ের মিশেলে ভর্তা বানানোর আয়োজন চলত। খেত থেকে তুলে আনা তাজা ধনেপাতা দিয়ে মাখানো সেই ভর্তা অমৃতের স্বাদকেও হার মানাবে বলে বিশ্বাস করতাম। আমাদের প্রচুর গোল আলু হতো; খাওয়ার সুবিধার্থে সেগুলোকে বাছাই করে বড় থেকে ছোট কয়েকটি ভাগে আলাদা করে রাখা হতো। বড় আকারের আলুগুলোকে মাটির চুলায় পুড়িয়ে খেতাম। রাতের রান্না শেষে আলু পোড়াতে দিয়ে চুলার চারপাশে বসে আগুন পোহাতাম। আলু পোড়া হয়ে গেলে সুন্দর একটা গন্ধ বের হতো। পোড়া আলুগুলোকে গরম ছাই থেকে তুলে ফুঁ দিয়ে দিয়ে খেতাম।
শীতের সবচেয়ে মজার দিক ছিল পিঠাপুলি তৈরির উৎসব। প্রতিদিনই পাড়ায় কারও না কারও বাড়িতে পিঠার আয়োজন চলত। সকাল হতেই ইতিউতি থেকে আসা ঢেঁকির শব্দে পাড়াসুদ্ধ গমগম করত। শীতে আমাদের বাড়িতে যখন ফুফা-ফুফুরা আসতেন, তখন খুব ঘটা করে পিঠার আয়োজন হতো। দিনের শুরু থেকেই সবাই নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে যেতেন। বাজার করে আনা, ঢেঁকিতে চাল গুঁড়া করা, পিঠা তৈরির সরঞ্জাম গোছানোসহ আরও কত কী! বাড়িতে উৎসবের হাওয়া বইত। মাঝরাত অবধি চলত পিঠা তৈরির কাজ। সেদ্ধ-পুলি, দুধ-পুলি, দুধ-চিতই, মাংস-শিঙাড়াসহ আরও নানা পদের খাবার রান্না হতো। আব্বার ভয়ে আমরা পড়ার টেবিলে বসে বই-খাতা নাড়াচাড়া করতাম। পিঠাপুলির গন্ধ নাকে সুড়সুড়ি দিয়ে ডাকত; কিন্তু পাঠ মুখস্থ না করে যাওয়ার সাধ্য ছিল না। পাঠ মুখস্থ হলে, গলা অবধি খেয়ে ঘুমিয়ে যেতাম।
ভোরবেলা হাঁড়ি-পাতিলের টুংটাং শব্দে ঘুম ভাঙত; বিছানায় শুয়েই টের পেতাম ভাপাপিঠা বানানো হচ্ছে। লোভ সামলাতে না পেরে লেপের ওম ছেড়ে একঝটকায় উঠে পড়তাম; তারপর কলপাড়ে গিয়ে কোনো রকমে চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে সোজা চলে যেতাম পাকের ঘরে। দাদি প্লেটে গরম–গরম পিঠা তুলে দিতেন। আমরা দাদির পাশে পিঁড়ি পেতে বসে তুলতুলে নরম ভাপাপিঠা খেতাম। দাদির হাতে বানানো ভাপাপিঠার মতো পিঠা আর কোথাও খাইনি। পিঠা খাওয়া শেষে নতুন চালের ভুনা খিচুড়ির সঙ্গে ঝাল–ঝাল গরুর মাংস গাপুস-গুপুস পেটে চালান করে দিয়ে, উঠানের মিঠে রোদে পাটি পেতে শুয়ে থাকতাম।
দিনবদলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে সর্বত্র। আবহাওয়া পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিবর্তন এসেছে মানুষের জীবনযাত্রা, বাসস্থান, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদসহ আরও অনেক কিছুতে। এত এত পরিবর্তনের ভিড়ে স্মৃতিগুলোকে হাতড়ে বেড়াই। মানুষ স্মৃতিকাতর প্রাণী; তাই তো পরিবর্তনের মোড়কে মুড়িয়ে গেলেও ফেলে আসা সোনালি দিনগুলোর কাছেই ফিরে যেতে চায় বারবার।