মক্কা-মদিনার রোজনামচা : পুণ্য পথের পাপী যাত্রী

মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর, ২০২৫

জোহরান মামদানির মতো জীবনের খাতায় অনেক রেকর্ড লিখে মদিনায় এসে পৌঁছলাম। এর আগে কোনোদিন দেশের বাইরে আসি নাই। এমনকি এয়ারপোর্টের ভেতরেও ঢুকি নাই। প্লেনে তো উঠিই নাই। মাদানীনগর মাদরাসায় যখন পড়ি, দুই হাজার এক বা দুইয়ের দিকে হবে, ঢাকা-বরিশাল রুটে বিমান চালু হলো, নয়শ টাকা ভাড়া। আমার মাসিক খরচ তখন ষোলশ টাকা। এক হাজার টাকা বোর্ডিংয়ে থাকা–খাওয়া বাবদ, নাস্তার জন্য দেড়শ, আর বাকি সাড়ে চারশ হলো খাতা কলম থেকে নিয়ে হাতখরচ বলতে যা বোঝায় সেই খরচ।

তো একবার খরচের টাকা হাতে দেওয়ার সময় আম্মুকে বললাম, আরও কয়েকশ টাকা দিলে একবার বিমানে ঢাকা যাইতাম। আম্মু এমন চোখ গরম করে তাকালেন, আর কোনোদিন ভাবিও নাই বিমানে ওঠার কথা।

গত রাতে এসে দেখি মদিনায় ঠান্ডা পড়েছে। বিমানে বসেও বুঝি নাই আবহাওয়া এত বদলে যাবে।

সত্যি কথা বলতে বিমান জার্নি আমার তেমন ভালো লাগে নাই। ইমিগ্রেশনের মেয়েটাকে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার সময় অনুরোধ করে বলেছিলাম, আপা, ফার্স্ট ট্যুর তো, পারলে একটু জানালার পাশে সিট দিয়েন। ভাবি নাই যে সত্যি দেবেন। বসতে গিয়ে অবাক হলাম। মেয়েটার কাজকর্ম স্লো দেখে মেজাজ খারাপ হয়েছিল তখন, এমনকি এক শিশু ওয়াকার এন্ট্রি দেওয়ার সময় দেখি কোথায় ইমপুট দেবেন খুঁজেই পাচ্ছেন না। কিন্তু উইন্ডো সিট দেওয়ায় সেই খেদ ভুলে গেলাম।

জানালা দিয়ে দেখি বিরাট পাখা। পাখা মসৃণ কোনো স্টিল প্লেট না, বেইলি ব্রিজের মতো চৌকা চৌকা পাত জোড়া দিয়ে বানানো, কয়েক জায়গায় নতুন ঝালাই দেখা যাচ্ছে। ভাঁজের জায়গাটায় একটা পাত দেখি নড়ছে। ওপরে ওড়ার সময়ও দেখি মাঝেমধ্যে নড়ে উঠছে। ছুটে উড়ে যাবে নাকি?

জেমস বন্ড যে এমন উড়ন্ত বিমানে পাখার ওপর দাঁড়িয়ে হেঁটে হেঁটে বিমানে ঢোকে, এটা আসলে অসম্ভব না মনে হলো। কারণ উড়াল অবস্থায় বোঝাই যায় না, আসলে প্লেনটা চলছে কি না। যতক্ষণ মাটি দেখা যায়, ততক্ষণ জানালা দিয়ে তাকালে মনে হয় বাড়িঘর দূরে সরছে, ট্রেনের জানালা দিয়ে যেমন দেখা যায়। কিন্তু অসীম শূন্যতায় যখন ওঠে, তখন জাস্ট লঞ্চের কেবিনের জানালা আটকে বসে থাকলে যেমন লাগে, মানে চলে কি চলে না কিছুই বোঝা যায় না, তেমন। যেন এক ঝিম মারা দুপুর, কোথাও কিছু করার নাই।

সিটে বসে থাকতে থাকতে পিঠ ব্যথা হয়ে গেল। এত বড় বিমান, প্রায় চারশ লোক নিয়ে উড়ছে। কত টাকা এক ফ্লাইটে কামাই করছে ভাবছিলাম। একবার উঠে দাঁড়ালাম। একজন কেবিন ক্রু দেখে বললাম, একটু পানি দেবেন? আচ্ছা, এয়ার হোস্টেস এবং কেবিন ক্রুর মধ্যে পার্থক্য কী? কোনটার কী অর্থ, কার কী কাজ? নাকি দুটোই এক? আমার মনে হলো, পুরুষ হলে ক্রু আর নারী হলে হোস্টেস।

তিনি ‘কাম’ ‘কাম’ বলে ভেতরে নিয়ে গেলেন। বোতল থেকে পানি ঢেলে দিলেন। তারপর বাংলায় বললেন, বসেন, বসেন। ভাবলাম, বসে খেতে বলছেন। যেই বসে খেতে যাব, এক নারী এসে হা হা করো কী করো কী বলে ছুটে এলেন, ‘ইট’স নট দ্য বার, প্লিজ গো টু ইয়োর সিট’।

কারও কারও কাছে বিমানযাত্রা স্বাভাবিক। তারা চাইলেই ওঠে, বসে, হাঁটে, কারও কাছে গিয়ে সাক্ষাৎ করে। আমার কাছে তা না। আমি বরং খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকি সামনের সিট পকেটে কী আছে, কোনটার মানে কী। শুনেছিলাম, সিটের সামনে একটা মনিটর থাকে। এটায় তেমন কিছুই দেখলাম না। একটা কার্ড পেলাম, তাতে বিমান দুর্ঘটনা হলে, সিট উড়ে গেলে কীভাবে কোথায় শরীর মাথা রাখতে হবে, তার নমুনা দেওয়া। এমারজেন্সি ডোরের লোকেশন বলা আছে।

ফিলিস্তিন পরিচালক হানি আবু আস–সাদের একটা ছবি আছে, ‘মাউন্টেইন বিটুইন আস’, ওটার কথা মনে পড়ল। প্লেনের পেছনের দিকটা ভেঙে পড়েছে, বাতাস টেনে নিয়ে যাচ্ছে সিটসহ যাত্রীকে, কেউ কেউ শক্ত হয়ে বসে আছে পিছে তাকাচ্ছে না ভয়ে। তারপর এক তুষারবতী পাহাড়ে আছড়ে পড়ল বাকিটা। বেঁচে গেলেন এক পুরুষ, আর আহত এক নারী।

ওয়াশরুম আছে কাছে কোথাও। আসর হয়ে আসায় লোকজনের ভিড়। পারমিতা হিমের একটা ভিডিও দেখেছিলাম বিমানের ওয়াশরুম নিয়ে, কমোড পেপার নামে একটা ব্যাপার আছে প্রথম জানলাম। আরেকটা কথা হলো, অজু করতে না করে। কারণ পানি সীমিত। ওয়াশরুম বরাবর কি একটা লাইন হয়ে গেল? আল্লাহ। এক বৃদ্ধ নারীও আছেন। কেউ একজন বলে উঠল, ওয়াশরুমে পানি নাই, কয়েকজন সরে গেলেন। বৃদ্ধার কথা ভেবে আমার মনটা কেমন যেন করে উঠল।

পাশের সিটের ভদ্রলোক এবং তার পাশে তার বউ লাগাতার কথা বলছে। বউটির বয়স খুব বেশি হবে না, কিন্তু কণ্ঠটা রিনরিনে নয়, কেমন একটা চিনচিনে দাগ আছে গলায়। কথা বললে মনে হয়, দাগটা তার স্বর দুই ভাগ করে ফেলছে। তবু তার কথায় ক্ষান্তি নাই। পুরুষটাও বিরক্ত হচ্ছেন না। মেয়েটা খানিকটা ডমিনেটিং ক্যারেকটর হবে, জোর খাটাচ্ছে একটু বেশি, পুরুষটা মিইয়ে যাচ্ছে বারবার।

এত কথা কেমনে বলে, মাবুদ। মুজতবা আলীর শবনম বলেছিল, মেয়েরা কেন এক নাগাড়ে দীর্ঘক্ষণ চুমু খেতে পারে না জানো? কথা বলতে ইচ্ছে হয়।

***

মদিনায় নামার পর সিকিউরিটিদের হাবভাব ভালো লাগল না। কেন জানি না। আমার এখনো, এই যে গত রাত থেকে আজ সারাদিন একই রকম মনে হলো, যে, আসলে আমরা আসায়, মানে বাংলাদেশিরা আসায় মূলত মদিনায় লোকজন খুশি হয় না। একটা পবিত্র এলাকা তাদের আছে, যা তারা রেস্ট্রিকটেড করেও রাখতে পারবে না, লোকজন আসবেই, তো আসতে দিতেই হয় তাদের, সেই জন্য তাদের দেশের লোকেরা আমাদের ঢুকতে দেয় মাত্র।

অতিথি হিসেবে তো দূরের কথা, আমরা এসে যে তাদের দেশে খরচ করছি, তাদের তাদের দুই পয়সা রোজগার হচ্ছে, সেই বিষয়টাকেও তারা গুরুত্ব দেয় না। কেননা তারা এমনিই ধনী। মানে আমরা বিদেশিদের দেখলে যেমন সমীহ করি, তারা মোটেও তেমন নয়। গার্ড, সিকিউরিটি, কাস্টম, চেকিং, এমনকি দোকানি যারা স্থানীয় আরব সবার কারও চোখে আমি আতিথ্য দেখি নাই।

মদিনার পরিবেশ বেশ পরিচ্ছন্ন। ঢাকার মতো নোংরা না। পলিথিন পড়ে থাকতেও দেখা যায় না। এমনকি নির্মাণ কাজ যেখানে চলে, আমাদের দেশে সেই জায়গাটা ভাগাড় হয়ে থাকে, টিন দিয়ে ঘেরা থাকলে দেখা যায় বেড়ার গোড়ায় ময়লার স্তূপ। এখানে তেমনটা নাই। ভালোই পরিষ্কার। মিউনিসিপ্যালিটির লোকজন কখন পরিষ্কার করে জানি না। আমাদের হোটেল থেকে নবির মসজিদে যাওয়ার পথে একটা জায়গায় বেড়া দেওয়া, তার মধ্যখান থেকে রাস্তার মতো বের করা, সেখানে কোনাকাঞ্চিতে পলিথিন পড়ে থাকতে দেখলাম না। এমন না যে পলিব্যাগ ওখানে কম ব্যবহার করে, পলি ছাড়া তো উপায় নাই, চিপস–চকলেটও লোকে খায়, শিশুরা আছে, কিন্তু প্যাকেট পড়া নাই।

বেশিরভাগ দোকানের সাইন দেখে মনে হলো নামগুলোর লিপি কাছাকাছি ফন্টে করা। আর আমাদের দেশে যেমন প্রত্যেক দোকানের সাইনবোর্ডে বিজ্ঞাপন, বা সঙ্গে অন্তত এলাকা, ঠিকানা, বা দোকান নম্বর থাকে, তেমন কিছু নাই, জাস্ট দোকানের নামটা থাকে বোর্ডে।

রাতে শান্ত নবির মসজিদে, যদিও শহর জেগে আছে রাত বারোটার পরেও স্বাভাবিক, কোনো ভিড় নাই। বাবুস–সালামে গেলাম, এত কারুকাজ, এত ঝলমলে, এত প্রাচুর্য, আমার কেমন যেন অস্বস্তি লাগল। হতে পারে গরিব দেশের মানুষ হওয়ার কারণে। ধর্মীয় স্থাপনার সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রাখা জরুরি, কিন্তু সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য অর্থ খরচ কখনোই আমার পছন্দ না।

বারবার মনে হলো, মদিনার মসজিদের এই কারুকাজ, সোনালি ক্যালিগ্রাফি, এগুলো আমাদের গরিব দেশের মসজিদের কমিটিকেও প্রভোক করে। ফলে দেখা যায়, যেই গ্রামের মানুষ দুই বেলা খেতে পায় না ঠিকভাবে, তাদের মসজিদও হয় ঝলমলে। পৃথিবীর সকল ধর্মেই ধর্মীয় স্থাপনায় খরচ করার একটা প্রবণতা আছে। মন্দিরে, প্যাগোডায়, গির্জায় যেমন হয় হবে, মসজিদেও তেমন হবে, এটা আমার মানতে ভালো লাগে না।

তবে, একটা অনুভূতি এখানে হৃদয়কে আন্দোলিত করে রাখে। তা হলো, এইখানেই আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু অঅলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সহচর সাহাবিরা হেঁটেছেন, থেকেছেন, এরই কোথাও নিশ্চয় তাঁদের পা পড়েছে, যেখানে আমারও পা পড়ছে। এইটা যখন ভাবি, চোখের সামনে আর এখনকার মানুষ দেখি না, দেখি আগের মানুষ সব, সেই মদিনার মসজিদের শিশুরা যেন এখনো খেলছে।

প্রচুর নারীরা এখানে, পুরুষের সমান বলা যায়, সবাই স্বাধীনভাবে চলছেন। আমার একটা বিষয় বেশ ভালো লাগল, মেয়েদের মধ্যে কোনো উদগ্রতা নেই, পোশাক যেমনই হোক, কেমন শান্ত, সুন্দর। কিন্তু একটা কথা বলতে দ্বিধা নেই, আরব নারীদের চোখ কেমন আনন্দহীন, বিষণ্ন।

বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি কর্মীর সঙ্গে কথা হলো। এত উৎফুল্ল তারা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে চান।

যেহেতু অসুস্থতা থেকে কেবল উঠলাম, তাই কাল রাত থেকে পেট ভরে জমজমের পানি খেয়েছি। যতবার সামনে পাচ্ছি, টইটম্বুর করে খাচ্ছি। কোনো এক সাহাবির কথা শুনেছি, দীর্ঘ পনেরো দিন আর কোনো খাবার না খেয়ে শুধু জমজমের পানি খেয়ে থেকেছেন এবং খেয়ে মোটা হয়ে গেছেন। জমজম আমারও অসুস্থতার ক্লান্তি দূর করে দিয়েছে। এবং পরশু রাত থেকে এই পর্যন্ত, মানে গত দুই দিন দুই রাত মিলে ছয় ঘণ্টাও ঘুম হয় নাই, তবু কোনো দুর্বলতা লাগছে না। হাঁটছি, ঘুরছি, কথা বলছি, নামাজ পড়ছি, তেলাওয়াত করছি এবং আরও বেশি শক্ত হচ্ছি, আরও বেশি ফ্রেশ লাগছে।

আল্লাহ চাহেন তো আগামী শনিবার পর্যন্ত মদিনায় থাকব।

***

বলা যায়, একটা ঘটনাবহুল দিন পার করলাম। ম্যাট রিসের একটা বই পড়ছি, ‘দ্য বেথেলহেম মার্ডার’। বিমানেই শুরু করছিলাম, প্রথমে একটু একটু কেমন খটকা লাগছে। কয়েকবার মনোযোগ ছুটে গেল। ঘুমও আসছিল না, পড়তেও ভালো লাগছিল না। তারপর একটু একটু করে জট খোলা ধরছে। টানা তিন চ্যাপ্টার পড়া শেষে এখন খালি পড়তে ইচ্ছা করছে, কিন্তু যেই অভিনিবেশ নিয়ে পড়তে হবে, সেইটা পাচ্ছি না।

মদিনায় গতকালের দিনটাও ঠিক তা-ই। প্রথমে একটু কেমন কেমন সব আনকোরা, অচেনা, আজননি লাগছিল। এখন থ্রিল শুরু হয়েছে। অভিনব সব, কিন্তু ভেরি ইন্টারেস্টিং।

সকালের কথা বলি, দেখি, একটা চার-পাঁচ বছর বয়সি ছেলের কব্জি টেলিফোনের রিসিভার জড়ানো থাকে যে তারে, তেমন একটা বড় প্যাঁচানো তারের এক মাথা দিয়ে বেঁধে আরেক মাথা বাবা তার কব্জিতে লাগিয়ে টেনে টেনে নিচ্ছেন। তারপর জোরে জোরে তাকে কী সব আরবি শেখাচ্ছেন। ছেলেও শিখছে, আর রশির টান খেয়ে খেয়ে বাবার সঙ্গে হাঁটছে।

দেখেই কেমন ধাক্কা লাগল। কী নিষ্ঠুর। যদিও ছেলেটার মুখভঙ্গি দেখে মনে হলো না, সে কষ্ট পাচ্ছে। আনন্দেই তো যাচ্ছে। একবার ভাবলাম, ছেলেটা প্রতিবন্ধী হতে পারে। সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করলাম, ঘটনা কী? সে নির্বিকার। বলে, হারায়ে না যায়, এই জন্য বাইন্ধা নিছে।

বিকেলে দেখি সেই একই কাণ্ড। তবে এবার চিত্র ঠিক উল্টা। সবুজ গম্বুজের সামনের একটু চার কোনা আড়াল দেওয়া জায়গাটায় এমনই কোনো বাবা তার ছেলেকে তার দিয়ে কব্জি বেঁধে হাঁকিয়ে নিচ্ছিলেন। কিন্তু ছেলে দুই হাতে সেই তার পেঁচিয়ে বাবাকে ভিন্ন দিকে টানছে। বাবা টাল সামলাতে গিয়ে ‘বাবা, তাআল’, ‘বাবা, হুনাক’ বলে তাকে ফেরাবার চেষ্টা করছেন। কী যে মজা লাগল। শেষে আর না পেরে বাবা ছেলেকে কোলে তুলে নিলেন। ছেলে তারপরও বলছে, ‘লা, লা, ওল্লাহি, উরিদু বিকা’। আর আঙ্গুল দিয়ে আরেক দিকের কিছু একটা দেখাচ্ছে।

মদিনায় শিশুদের খেলতে দেখার আনন্দ চোখে পানি এনে দেয়। একটা ছেলেকে দেখি বহুক্ষণে ধরে শুধু কবুতরের ঝাঁকের পিছনে ছুটছে। ওরহানও এলে এইটাই করত। আমি বাসা থেকে বের হওয়া সময় ওরহান বুঝতে পারে নাই, চলে যাচ্ছে বাবা। পরে হোয়াটসঅ্যাপে কান্না রেকর্ড করে পাঠাইছে, ‘আমি প্লেনে উঠমু’। সন্ধ্যার পরে দেখি ছোট্ট দুই ভাইবোন, একজন আরেকজনকে তাড়া করছে। মেয়েটা খিল খিল করে হাসছে। অবিকল তানিশার মতো হাসি।

সন্ধ্যার নামাজ পড়লাম রওজার পেছনে। একটা শিশু কান্না করছে। দ্বিতীয় রাকাতে দাঁড়ানোর সময় মনে হলো দোল খেতে খেতে যেমন দমকে দমকে এসে কান্না ধরে আসে, তেমন করে কান্না বন্ধ হয়ে গেল। ইশায় এসে ঘটনা ধরতে পারলাম। ঠিক সামনের সারিতে খুঁটির সঙ্গে একটা শিশু বসে আছে। বাবা নামাজে। কান্না শুরু করেছে। একই কান্নার সুর। সেই শিশুটাই নাকি? চোখের কোণে ধরা পড়ল, বাবা শিশুটিকে কোলে নিয়ে নামাজের মধ্যেই দোলাচ্ছেন। একটু পরে কান্না থেমে গেল।

এ যেন হাসান-হোসাইনের সঙ্গে নবিজির আচরণের মতো দৃশ্য। একবার তাদের দুই ভাইকে আম্মা ফাতিমা বড় বড় জামা পরিয়ে দিয়েছেন। বড় জামা সামলাতে পারছিল না তারা। দুই ভাই মসজিদের পথে আসতে গিয়ে হোচট খেয়ে পড়ছিল। নবিজি তখন জুমার খুতবা দিচ্ছেন মিম্বরে দাঁড়িয়ে। দরজা বরাবর চোখ গেল তাঁর, দেখলেন এই কাণ্ড। খুতবা ছেড়ে দৌড়ে তাদের কোলে তুললেন। তারপর এসে আবার খুতবা শুরু করলেন।

আমাদের সঙ্গেও এক ভাই তার মেয়ে, মা, স্ত্রীকে সঙ্গে এনেছেন। বিমানে দেখলাম অনেক শিশু। আমার মন খারাপ লাগল। কত টাকা খরচ করতে পারছে তারা।

বিদেশে যাওয়ার মতো বিলাসী অর্থ বা হজ-ওমরা করার মতো সচ্ছলতা আমার কখনো ছিল না, এখনো নাই। কোনোদিন লেবারি করতে বিদেশ যাব, এর ঘোর বিরোধী ছিলাম। তবু সময়–অসময় মনে জাগত মদিনরা কথা। কেউ যদি বলত একবার, চলেন, মক্কা-মদিনা ঘুরে আসি। একবার ভাবলাম, কেউ যদি অর্ধেক খরচ দিত, বাকিটা জোগাড় করার চেষ্টা করতাম। এইবার কেমনে এলাম, সেটাও একটা মিরাকল। না, কারও দানের টাকায় এখানে নাই, তবে অবদান আছে, ঋণ আছে। সেটা আরেকদিন বলব নে।

***

আমাদের বাড়ির মহাজন ছিলেন আয়নালি হাওয়ালাদার। তিনি মহাসমারোহে হজে গেলেন। তখন আমি ক্লাস টু বা থ্রিতে। ফেরার পর তার ঘরে সারা বাড়ির মানুষ ভেঙে পড়ল। বিশেষত তার লাগেজ দেখতে, কার জন্য কী এনেছেন। বরযাত্রীর লাগেজ দেখার মতো আরকি। আমার ফুপা তখন সৌদিতে, শুনেছি, তিনিও হারাম শরিফের একজন কর্মী ছিলেন। মহাজন তাার সঙ্গে দেখা করেছেন এবং ফুপা তাতে কী কী দিয়েছেন, উপস্থিত সকলকে বললেন। তারপর তাকে ঘিরে থাকা সবাইকে কিছু কিছু দিলেন। কী কারণে জানি না, আমাকে কিছুই দিলেন না। অল্প বয়স, খারাপ লাগল। কিন্তু লজ্জায় কিছু বলতেও পারি নাই।

তার কয়েক বছর পরে আব্বু হজে গেলেন। চৌধুরীর হাঁট লঞ্চ ঘাট থেকে তাকে বিদায় দেওয়ার দৃশ্যটা এখনো চোখে ভাসে। আব্বু লঞ্চে ওঠার আগেই ইহরাম বেঁধে ফেললেন। তারপর বললেন, আল্লাহ, আপনার ঘর দেখার সুযোগ দিছেন, আমি শুধু ঘরই দেখব, আর কিছু না। আব্বু হজ থেকে কিছুই আনেন নাই বলা যায়। কয়েকটা খেজুর মাত্র, যা তিনি নিজেই আলমারিতে আটকে রাখতেন, একটু একটু করে খেতেন, আমাদের মাঝেমধ্যে দিতেন। জিমাম একবার সেই আলমারি খুলে দুই হাতে কোচড়ে খেজুর নিয়ে দৌড়। আব্বু পিছু পিছু তাকে ধাওয়া করছেন। আজওয়া খেজুর, অনেক দাম।

আব্বু এরপর আবারও হজে গেলেন। গত বছর পরপর দুইবার উমরার জন্য এলেন আম্মু-সহ। কিন্তু আমি আজ ভাবি, আব্বু একবারও বলেন নাই, চল, আমাদের সঙ্গে তুইও যাবি। আম্মুও না। আমার মনে হলো, তাদের সামর্থ্য আছে, তারা যাচ্ছেন, আমারও কখনো সামর্থ্য হলে নিজেই যাব। আমার সেই সামর্থ্য হয় নাই। তবুও কেমনে কেমনে এলাম। তাদের মতোই ওরহান-ওসমানকেও না বলে যে, চলো, তোমরাও যাবে।

আসর নামাজের আজান হয়েছে, আমি এক রকম দৌড়ে মসজিদে ঢুকতে যাচ্ছি। এখানে আজানের পরে নামাজ দাঁড়াতে বেশিক্ষণ দেরি হয় না। এক পাকিস্তানি এসে ধরল, ভাই সাব, জিয়ারত কে লিয়ে জু গাড়ি যাতি হ্যায় না, ও কাহাঁসে যাতি হেঁ? বললাম, মাই নেহিঁ জানতা। বলে কি একটু হাসলামও নাকি? লোকটাও দেখি হেসে দিল। বলল, আপনি এমনভাবে ‘জানি না’ বললেন, মনে হয় যে বলে খুব তৃপ্তি পাইলেন। আসলেই তো, জানি না বলার মধ্যে একটা স্বস্তি আছে, কখনো অনুভব করি নাই।

লোকটা আমার পাশেই দাঁড়ালেন নামাজে। তারপর তসবিহ পাঠে বসলেন। আমি উঠে যেতে চাইলে টেনে ধরলেন। তারপর দশ মিনিট ধরে শুধু তার পরিবারের গল্প করলেন। ছেলের নাম সুবহান। নয় বছর বয়স। আমার ওসমানের তা-ই। বললাম না, কারণ, যেই গল্প ধরেছেন, আমার এখন সময় নাই, কুরআন তেলাওয়াতে বসব।

মাগরিবের সময় খেয়াল হলো, এই মসজিদের অসামান্য কারুকাজ আর অসম্ভব খরুচে জৌলুস দেখে যেমন অস্বস্তি লাগছিল, ইমামের কুরআন তেলাওয়াত ততটাই সুন্দর। আমার ধারণা, মক্কা-মদিনার ইমামগণ সারা বিশ্বে সবচেয়ে বিশুদ্ধ উচ্চারণে কুরআন পড়েন। এবং একই সঙ্গে তাদের পাঠে দরদের মিশেল আছে।

মাগরিবে ইমাম যখন পড়লেন—রব্বানা লা তুআখিজনা ইন্না সিনা… তখন স্পষ্ট শুনলাম তার শ্বাস-প্রশ্বাস, এমনকি ভেজা কণ্ঠের কাঁপন। ইশার নামাজে ইমাম যখন পড়লেন—‘ইন্নাল মুনাফিকিনা ফিদ দারকিল আসফালি মিনান নার’ মানে মুনাফিকদের অবস্থান হবে নরকের পাতালে’, তখন ভাবনা হলো, নবিজিও নিশ্চয় কোনো নামাজে এই আয়াতটা পড়েছেন, হতে পারে সেই নামাজে তাঁর পিছনে মুনাফিকরাও কেউ না কেউ ছিল।

ইমাম যখন ‘দল্লিন’ বলেন, মানে সুরা ফাতিহা শেষ করেন, সকলে সমস্বরে ‘আমিন’ বলে। এবং কোরাস সঙ্গীতের মতো নিশ্চয় এই মুসল্লিদের ‘আমিন’ বলার প্র্যাক্টিস হয় নাই। কিন্তু সবার আওয়াজ একসঙ্গে শুরু হয়, এক সঙ্গে শেষ হয়। একই সুর সবার। এইটা কেমনে হলো, কে জানে।

নামাজের পরেই শুনি, একজন সঙ্গীর মা হারিয়ে গেছেন। হুইল চেয়ারে নিয়ে এক জায়গায় রেখেছিলেন। পরিচ্ছন্নতার সময়ে কেউ নিশ্চয় তাকে সরিয়ে দিয়েছে। তাঁর মেয়েও সঙ্গে ছিলেন, কিন্তু তিনিও কোনো কারণে মাকে হারিয়ে ফেলেছেন।

আমরা একবার শর্মা খেতে গেলাম, ‘টাক্সি’ ‘টাক্সি’ ডাকে বিরক্ত হলাম, দূরের উহুদ পাহাড়, আগে নাকি এইখানেও আবাস ছিল, মানে তাইয়েবা মার্কেটের কাছে, তা-ও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে শুনলাম, কিন্তু ভালো লাগছিল না। মিনারের দিকে তাকালাম, কেউ কেউ বলল, মিনারটার দিকে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছা করে। আসলেই কী! এই মিনারের শিল্পমূল্য নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু আধ্যাত্মিক মূল্য কি আছে? হজরত ওমর যে হাজরে আসওয়াদের ওই কালো পাথর দেখে বলেছিলেন, আমার কাছে তোমার কোনো মূল্য নাই, আল্লাহর রাসুলকে যদি তোমাকে চুম্বন করতে না দেখতাম, তাহলে কখনো আমি তোমাকে চুমু দিতাম না। ‘ইসলাম বিটুইন ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট’ বইতে আলিয়া ইজেত  বেগোভিচ এটাই বলেছিলেন, ভবনের কোনো মাহাত্ম্য নাই। একটা মসজিদ আর সেনাছাউনির পার্থক্যকে আপনি শুধু ইট-বালির ভবন দিয়ে অনুভব করতে পারবেন না।

যাইহোক, কথায় কথায় অনেক কথা বলে ফেললাম। আসার আগে কয়েকবার ভেবেছিলাম, ভেঙে পড়া শরীরে ধকল কুলাবে তো। যদিও কিছু হয়। গতকাল সকালে মসজিদে নববির সংলগ্ন একটা গোরস্তান দেখতে গেলাম। ‘জান্নাতুল বাকি’ বলে এই গোরস্তানকে। অনেক কবর। শুনেছি, এখানে দশ হাজারের মতো সাহাবির কবর। মদিনায় এসে যারা মারা যান, তাদেরও এখানে কবর দেওয়া হয়। এক মুহূর্তের জন্য কল্পনা করলাম, শরীর যদি না কুলায়, আর এই জায়গায় আমার তিন হাত জায়গা কি হবে?

প্রতি নামাজের পরে দেখি জানাজার নামাজ হয়, এক বা একাধিক মৃত মানুষের। জোহর নামাজে এবং আজ ফজরেও দেখি শিশুর মৃত্যুর কথাও বলা হলো। কী আশ্চর্য সেই শিশু, যে মদিনায় এসে, নবির মসজিদে হাসতে হাসতে খেলতে খেলতে কবরে চলে যাচ্ছে, যেই কবরের নামই ‘জান্নাত’!

***

আজ ভোরে আমার দায়িত্ব পড়ল নারীদের মসজিদে নিয়ে যাওয়া। এ এক অসম্ভব কাজ। বেশ কয়েকজন বৃদ্ধ বয়সি, একজন তো এমন যে, হাঁটতে গিয়ে তার কোমর ধরে যাচ্ছে। এদিকে সবার খুব তাড়া। যিনি হাঁটতে পারেন না, তারও। ঘড়িতে সোয়া চারটা বাজলে আজান দিল। এই নারী আরও ঘাবড়ে গেলেন, আহা, নামাজ তো পাব না। আমি বললাম, আস্তে যান, তাড়া নাই, এইটা তাহাজ্জুদ নামাজের আজান।

সমস্যা হলো, নারীদের এরিয়াতে পুরষদের ঢুকতে দেওয়া হয় না নামাজের সময়। অথচ আমি যদি সঠিকভাবে না দেখি তারা কোথায় বসেছে, তাহলে ফজরের নামাজের পরে যে আবার গিয়ে নিয়ে আসব, তা তো পারব না। তারা রাস্তা চেনেন না, মনে রাখতে পারেন না, কাছে গিয়ে নিয়ে আসতে হয়। হোটেলে বিশ কদম আগে ছেড়ে দিয়ে বলবেন, এইবার যান, তারা চল্লিশ কদম আগায়ে গিয়ে হায় হায় করবে। তারপর কেউ একজন বুদ্ধি করে কার্ড বের করবে, সেটা লোকেদের দেখিয়ে হোটেলে ফিরতে পারবেন। আজও তা-ই হলো, এক রিয়ালের ঘড়ি দেখতে গিয়ে তারা হারায়ে গেছেন।

ফিরতি পথে একটা মেয়ে, আমাদের দলেরই হবে, কাছে এসে বলল, আপনার পকেটে কি রিয়াল হবে, আমি একটা সিম কিনব। বললাম, হবে না। তাছাড়া শুধু রিয়াল হলেই তিনি সিমকার্ড কিনতে পারবেন না, পাসপোর্টের ছবি লাগবে, তার কাছে মোবাইল নাই। আমার কাছে আসলে রিয়াল-টিয়াল নাই বললেই চলে। ঝাড়া হাত-পা নিয়ে এসেছি। আসার আগের দিন রাতে আব্বু একশ সাড়ে বারো রিয়াল পাঠিয়ে দিছিলেন। ওইটা দিয়া ভাঙতি কাজ চালাচ্ছি। সিরাত মিউজিয়াম দেখতে সত্তুর রিয়াল লাগবে। আর জেদ্দা ইউনিভার্সিটি দেখতে যাওয়ার সময় আরও কিছু লাগবে। বাড়িতে যাওয়ার সময় পাঁচ রিয়ালের চকলেট যদি পারি নেব, না পারলে বাচ্চাদের বলব, মাফ করে দিতে। মুয়াল্লিমের কাছে অবশ্য কিছু রিয়াল আছে আমার, ফেরত আনব না ভাবছি। পুরো সফরটাই তো ঋণ, এখন পর্যন্ত নিয়ত হলো, ওই টাকায় কিছু ঋণ পরিশোধ করা।

মদিনায় কবুতর অনেক বেশি। শুধু হারামে মানে নবির মসজিদের আশেপাশে না, সব জায়গায়। গামামা মসজিদের গম্বুজে নকশি কাঁথার মতো লাইন ধরে বসে থাকে। কবুতরের মতো জীবন যদি হতো, টেনশন থাকত না।

সকালে যখন সূর্য উঠি উঠি করছে, দেখি এক নারী কবুতরের আদারি কুড়িয়ে নিচ্ছে। মাই গড। লোকে কবুতরকে খাবার দেয়, সে দেখি নেয়। কাছে গিয়ে দেখি, আমাদেরই দলের একজন। হেসে বললেন, তাদের এলাকার কেউ একজন কইছে তাকে যে, মদিনার কবুতরের আদারি নিয়া যাইতে। বললাম, এইটা কেমন কথা। বললেন, আপনি বুঝবেন না, এইটা কামে লাগে।

আরে মা, কী কামে লাগে, বলবেন না। একটা ফিলিস্তিনি গল্প আছে, মায়া আবুল হায়াতের লেখা, ‘বাদিয়ার জাদুর পানি’, ওইখানে দেখা যায়, লাশ গোসল করানোর পানি সংগ্রহ করে। এই পানির নাকি অনেক ক্ষমতা। তেমন কিছু নাকি?

সবাই যে মদিনায় পবিত্র মন নিয়ে আসে, তা না-ও হতে পারে। কিন্তু একটা কথা বলতে পারি, এইখানে ভালোবাসা অঢেল। সবাই সবাইকে ভালোবাসে, কেউ কাউকে বিরক্ত করে না। কেউ আপনাকে সরে একটু জায়গা করে দিতে বললেও আস্তে করে বলবে। সবকিছু কেমন যেন বিনীত, সুন্দর, পরিপাটি।

ভালোবাসার কয়েকটা নমুন আপনাদের বলি। নবির মসজিদকে অনেকটা উন্মুক্ত শিক্ষাঙ্গন বলা হয় জানেন কি না জানি না। এখানে মাগরিবের নামাজের পর বিভিন্ন স্থানে চক্রের মতো করে কুরআনের আসর বসে, হাদিসের পাঠদান হয়, ইসলামি আইনের বিতর্ক ওঠে এবং শিশুদের কুরআন মুখস্ত করারও একটা খোলা জায়গা আছে। তো কাল সন্ধ্যার নামাজের পর হাঁটতে বের হলাম, একা, পুরো কম্পাউন্ড ও আশপাশ একটু গুরে দেখব। শিশুদের কুরআন পাঠের জলসায় পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। দুই শিশু গল্প করছে, ফিসফাস, একেবারে আমাদের হেফজখানার মতো। শিক্ষকের কাছে এক ছাত্র সবক নিয়ে গেছেন, শিক্ষক তার কান মলে দিচ্ছেন। শিক্ষকের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, কানমলায় ভালোবাসা ঠিকরে পড়ছে। এক মুহূর্তে মনে হলো, একটা ছবি তুলে ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখি।

তাইয়েবা মার্কেট থেকে আরও সামনে গিয়ে ডানে বাঁক ঘুরলাম। এখানে লোকজন কম। এক মাঝবয়সি বাবা তার ষোড়শী মেয়েকে অজস্র উপদেশের বন্যায় বইয়ে দিচ্ছেন। মেয়ে মিটিমিটি হাসছে। বাবা জিজ্ঞেস করলেন, হাসছ কেন, কী দেখছ? মেয়ে বলছে, লা শাই, মানে কিছু না। উল্টা প্রশ্ন করল, তাইলে কি কানব? বাবা এইবার হাসলেন, বললেন, লা তাবকি, লা তাবকি (না না, কানবে না, কানবে না)।

আমার কেমন যে লাগল। ‘লা তাবকি’ শুনে নবিজির হজের একটা ঘটনা মনে পড়ল। মক্কা যাওয়ার পথে আম্মাজান সাফিয়ার উট মারা গেছে। নবিজি আম্মাজান জয়নাবকে বললেন সাফিয়াকে একটা উট দিতে। জয়নাব রাজি হলেন না, বললেন, আমি এক ইহুদিকে উট দেব? আম্মাজান সাফিয়া ছিলেন ইহুদি নেতার মেয়ে। সেদিকে ইঙ্গিত বুঝে তিনি রাগ করলেন জয়নারেব ওপর। কিন্তু সাফিয়া কেঁদেই চলেছেন, কেমনে বাকি পথ যাবেন। নবিজি তাকে বলছিলেন, লা তাবকি’ লা তাবকি’.. কান্না করো না, কান্না করো না। কিন্তু তার কান্না থামছেই না। ফলে তিনি দিলেন তাকে এক ধমক। সাফিয়া ভয় পেয়ে গেলেন। এমনকি ওই দিন নবিজির সঙ্গে তাঁর থাকার কথা ছিল, তিনি নবিজির তাঁবুর কাছেই গেলেন না, আম্মাজান আয়েশাকে বললেন, তুমি যাও, আজ দিনটা তোমাকে দিলাম। আয়েশা নবিজির তাঁবুর কাপড় সরিয়ে উঁকি দিলেন। ‘আয়েশা, তুমি?’ নবিজি বললেন বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন। আয়েশা জবাব দিলেন—‘জালিকা ফাদুলুল্লাহি ইউতিহি মাইয়াশা…’

জয়নাবের ওপর আল্লাহর নবি রেগে ছিলেন, জিলহজ গেল, মহররম গেল, সফর মাস গেল, রবিউল আউয়াল এলো, নবিজি দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে জয়নাবকে ক্ষমা করলেন তিনি।

এক যুগল প্রেম করছে। ছেলেটা দেখতে সাধারণ বাঙালি ছেলেদের মতোই হালকা পাতলা, দাড়ির রেখা পড়েছে কেবল। মেয়েটা পাথরের চাঁইতে বসা, পা দোলাচ্ছে জোরে জোরে, নির্বিকার, ছেলেটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকে মিনতি করেই যাচ্ছে। মেয়েটার মুখে মাস্ক পরা ছিল। খুলে ফেলল। এক ঝলক দেখলাম, চেহারা লাল হয়ে গেছে। এ যেন মদিনার গলিপথের আরেক বারিরা; যার স্বামীকে সে ছেড়ে দিয়েছে, আর স্বামী বেচারা মদিনার অলিতেগলিতে ঘুরছে আর কাঁদছে। নবিজি পর্যন্ত সুপারিশ করলেন, কিন্তু বারিরা স্পষ্ট বলে দিলেন, তাকে আমার কোনো প্রয়োজন নাই।

আজান হয়ে গেছে। মসজিদের দিকে যেতে যেতে দেখি স্বামী-স্ত্রী দুইজন দুই বাচ্চাকে হুইল ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। বউটা দুষ্টামি করছে, মানে একটু হাঁটে, আবার থামে, জামাই জিজ্ঞেস করছে, থামছ কেন? ‘এমনি’ বলে আবার একটু হাঁটে, আবার থামে। জামাইকে বলে, তুমি যাও। তারপর আবার একটু হাঁটে। আমি কাণ্ডটা দেখতে থাকলাম। লোকটা হুইলে যে ছেলেটা শুয়ে, সে শুধু ‘বাবা’ ‘বাবা’ করছে। আমি কাছে গিয়ে ‘ব্যাব্যা’ ‘ব্যাব্যা’ করে একটু মুখ ভেঙছি দিলাম। এইবার তো মনে হয় মৌচাকে ঢিল পড়ল। ছেলেটা চিৎকার করে ‘বাবা’ ‘বাবা’ বলছে, আর আমার আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছে। আমি তো দৌড়। পিছনে একবার দেখি জামাই-বউ দুইজনেই একসঙ্গে হাসছে আর ‘ব্যাব্যা’ ‘ব্যাব্যা’ করছে।

***

আজ অনেক কিছু লেখার ছিল, নোট করে রেখেছিলাম, মনে তো হয় না লিখতে পারব। কাল মক্কায় যাব জুমার পর, প্রস্তুতি নিতে হবে। শুধু একটা ঘটনা বলে শেষ করি।

আজ রিয়াজুল জান্নাতে গেলাম, মানে যেখানে নবিজির মিম্বার ও ঘরের মধ্যের স্থানটা, যেখানে গিয়ে সবাই দুই রাকাত নামাজ পড়ে। মাগরিবের কিছুক্ষণ আগে ঢুকতে পারায় পুরা নামাজের সময়টাতে ভেতরে থাকার সুযোগ হলো। বের হওয়ার সময় গার্ডরা যেমন করে আরকি, মানে খালি তাড়া দেয়, জলদি করো জলদি করো। আবার পিঠে এক গার্ড বারবার হাত দিয়ে হালকা করে চাপড় দিচ্ছে এবং একটু একটু করে ঠেলছে। সামনে মানুষের ভিড়, একটা কদম ফেলতে পারছি না। মেজাজ খারাপ হয়ে গেল, রেগেই বললাম, ভাই, সামনের লোকজন না গেলে কেমনে যাব?

গার্ড ছেলেটার বয়স অল্প। আমার চোখমুখ দেখে একেবারে কাছে টেনে নিল। তারপর বারবার বলল, ভাই, মনে করো ঠাট্টা করেছি। একবার জড়িয়ে ধরল, হাসানোরও চেষ্টা করল একাধিকবার, তারপর এক পাশে সরিয়ে আরও কিছুক্ষণ থাকতে বলল। আমি এই ফাঁকে আরও দুই রাকাত নামাজ পড়ে নিলাম। মনটা ভিজে গেল একেবারে।

এই তো ভালোবাসা। জানি না, মদিনা ছাড়া ভালোবাসার এমন বিচিত্র রূপ আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় কি না।

শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৫

একটা কথা বলতে দ্বিধা করতে চাই না, মদিনায় সালাম খুব কম, নাই বললেই চলে। এই কয়দিনে আমি একজনকেও সালাম দিতে শুনি নাই। আমি নিজে কয়েকজনকে দিলাম, দুয়েকজন মনে হলো অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছেন। সবাই নবিজির রওজায় সালাম দেওয়ার কথা বলে, নিজে কাউকে সালাম দেয় না। একমাত্র এইখানের একজন হাউসকিপার আজ সকালে হঠাৎ আমাকে সালাম দিয়ে বসল। পরে বুঝলাম, বাংলায় ভিডিও কলে কথা বলায় সে বুঝতে পেরেছে তার দেশি ভাই। কিছু পয়সাকড়িরও চাহিদা থাকতে পারে, সে আশা তো আমার কাছে পূরণ হবার নয়।

মদিনার যারা ক্লিনার (পোশাকে লেখা ‘হাউস কিপিং’), ধারণা করি, তাদের বেশিরভাগ বাঙালি, বাংলাদেশি বললেও অত্যুক্তি হবে না। টয়লেটের সামনে চাটগাঁয়া ভাষায় ঝগড়া করতে দেখলাম দুইজনকে। কেউ কেউ অজু করার সময় বিনীত ভঙ্গীতে টিস্যু এগিয়ে দেন। এমনিই দেন নাকি বিনিময় প্রত্যাশা করেন জানি না। আমার সঙ্গী একটু অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, টাকা-পয়সা কি দেওয়া লাগবে? কেউ যে একেবারে দেয় না, তা না। শুনলাম, এদের বেতন খুব কম, চারশ রিয়াল বা ছয়শ রিয়াল হবে কি হবে না। মানে পনেরো থেকে বিশ হাজার টাকা আর কি। এইটা কি কোনো বেতন হতে পারে, এমন ধনী দেশে?

এত ধন এই দেশে যে, মনে হয় উপচে পড়ছে সব। সব এখানে বড় বড়। যে ভবনই করা হোক, তার আয়াতন বিশাল। পার্ক বড়, বসার বেঞ্চি হয় অনেক চওড়া, সিটি কর্পোরেশনের সামনে পতাকা উড়ছে, তার সাইজও হবে দশ বাই পনেরো হাত; যারা পরিবার-সহ স্যুটকেস নিয়ে বের হয়, একেটা লাগেজে আমার মতো দুইজন মানুষ অনায়াসে ঢুকে যাবে; ফলফলাদি সব বড় বড়, ছোট কোনো কলা নাই, আনার নাই, গাবের মতো একটা ফল খাইলাম (পার্সিমন না জানি কী নাম), সেগুলোও বড়, শাম্মাম বড়; এদের শরীরও বিরাট বিরাট। ফলে কখনো কখনো নিজেরে মনে হয়, গালিভারের মতো, নিজেই লিলিপুট। অবশ্য আমার চেয়েও লিলিপুটের ভিড়ের মধ্যেও পড়েছি একাধিকবার।

সেই দেশের বিদেশি শ্রমিকদের বেতন এত ছোট, মানা মুশকিল। যদিও কেউই অভিযোগ করে না। শুনলাম, উল্টা এই রকম হাউস কিপার হওয়ার জন্য নাকি ঘুষও দেয় অনেকে। কারণ এইখানে ‘টিপস’ পাওয়া যায়। ওই যে টয়লেটের সামনে টিস্যু দেয়, এবং লোকেও তাদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে দুই-চার পয়সা দেয়। এর আগে আরিফের সঙ্গে কথা বলেছিলাম, ওয়ার্কার, তিন বছর হয়েছে আসছেন, এখনো বাড়ি যান নাই। জানতে চাইলাম, যে টাকা খরচ করে এসেছেন, তা তুলতে পেরেছেন? তিনি জানালেন, তা অনেক আগেই উঠেছে। আগামী বছর বাড়ি গিয়ে বিয়ে করবেন। বোঝা গেলো, আয় মন্দ না, কিন্তু পদ্ধতিটা সুন্দর না, নীচু ধরনের।

আমার একটু গায়ে লাগে, কেননা, আমার মনে হয়, খয়রাতটা আসলে ওই লোকটাকে না, বরং বাংলাদেশকে দেয় তারা। ফলে এই দেশে বাংলাদেশিদের ইমেজই দাঁড়িয়ে আছে ক্লিনার ইমেজ।

এইটা ঠিক যে, মদিনার টয়লেট এত পরিষ্কার, অবিশ্বাস্য। পাবলিক টয়লেট কেমনে পরিষ্কার ঝকঝকে রাখতে হয়, বাংলাদেশের মসজিদের কমিটি এবং মাদরাসার পলিচালকদের এনে প্রশিক্ষণ দিয়ে দেখানো দরকার। বিশেষ করে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি মহোদয় যদি একবার ধর্মউপদেষ্টাকে সঙ্গে করে আসেন এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন, তাহলে বায়তুল মোকাররম মসজিদ-সহ জাতীয় ধর্মী স্থাপনাগুলোর টয়লেটের দুগর্ন্ধ থেকে আমাদের মুক্তি পাওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে। আমাদের দেশের মসজিদ-মাদরাসা মানেই টয়লেটে ব্লিচিংয়ের উৎকট গন্ধ, এটা এক অনস্বীকার্য সত্য। এ থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় নিয়ে ধর্মীয় লোকজনের মধ্যে তেমন কোনো বিকারও নাই। কী বলব।

একই সঙ্গে আরেকটা কথা বলি, মদিনায় আসার পথে এবং এখনো অনেক হাজির মুখ থেকে আমি প্রচণ্ড দুর্গন্ধ পেয়েছি। বিমানে আমার পাশে এক ভদ্রলোক বসেছে, তার পাশেই তার স্ত্রী। কথা শুনে বুঝলাম, তিনি আলেম এবং এক মাদরাসায় পড়ান। তার মুখ থেকে এমন গন্ধ আসছিল যে, সহ্য করা মুশকিল ছিল। এক সিট সামনে ইমরান বসা। ওকে বললাম, তোমার ডান পাশের ছেলেটাকে বলো, আমার সঙ্গে সিট এক্সচেঞ্জ করবে কি না। যেহেতু তারটাও উইন্ডো সিট। ছেলেটা প্রথমে রাজি হলেও পরে না করল। ভাবলাম, কাজটা ঠিকই হয়েছে। ওই ছেলেটা এই সিটে এলে সে-ও দুর্গন্ধে কষ্ট পেত। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, এই লোকের স্ত্রী কেমনে তার কথা সহ্য করেন?

মদিনায় লিফটে ঢোকার সময়ও একই কাণ্ড হলো। এবারেরজন পাকিস্তানি। এবং আমি পরে সতর্ক হয়ে দেখলাম, এই সমস্যা যাদের, তারা বেশিরভাগ মধ্যবয়সি এবং একটু ধার্মিক শ্রেণির। এরা টুথ ব্রাশ ব্যবহার করেন না, মেসওয়াক দিয়ে দাঁত মাজেন। ফলে দাঁত মাজার প্রধান যে উদ্দেশ্য, মুখ পরিষ্কার করা, সেটা তাদের হয় না; শুধু গাছের ডাল ব্যবহারের সুন্নত আদায় হয়। মেসওয়াক ব্যবহারের ক্ষেত্রে উচিত প্রতিবার নতুন ডাল নেওয়া অথবা যেই মাথা দিয়ে মাজন করেছেন, সেটুকু কেটে ফেলে নতুন অংশ দিয়ে মাজা। সেটা তারা করেন না, শুধু সুন্নত করেন। এইটা এক ধরনের ধর্মীয় বোঝাপড়ার সংকট। টুথপেস্ট ও ব্রাশ ব্যবহারকে অনেকে মনে করেন সুন্নত পরিপন্থি। কিন্তু মুখের দুর্গন্ধ যে মানুষকে কষ্ট দেয়, সেটা কতটা অমানবিক এবং নবিজির আদর্শের খেলাফ, ওটা নিয়ে কোনো ভাবনা নাই।

আমি মদিনায় আসার পর, প্রতি বার মসজিদে যাওয়ার আগে ব্রাশ করা শুরু করলাম, যেন, এত বড় সমাবেশ, আল্লাহর নবির সামনে মুখের দুর্গন্ধ নিয়ে যাব, এটা লজ্জার। অন্তত চার বার ব্রাশ করছি। আর মাঝেমধ্যে মেসওয়াক করছি। আমরা যে ধরনের মসলাদার খাবার খাই, তাতে কোনো কারণে একটু দীর্ঘ সময় মুখ বন্ধ থাকলেই দুর্গন্ধ তৈরি হয় বলে আমার ধারণা।

আরও আছে, কেউ কেউ খুবই খারাপ এবং অসহ্য আতর ব্যবহার করেন। এটাও পরিহার করা উচিত।

***

মদিনায় আপনি এই মধ্যবয়সী, তরুণ, শিশু ও বৃদ্ধদের আমলের প্রতি আগ্রহকে আলাদা করে চাক্ষুস করতে পারবেন। শিশুদের কথা তো বলেছি। তরুণদের অবস্থা বলা যায় সবচেয়ে ভালো। তারা নামাজে শরিক হয় বেশি, তেলাওয়াত ও মসজিদের বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের আসরে অংশগ্রহণ করে আগ্রহভরে। এবং সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা মধ্যবয়স পেরিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর। তাদের বড় একটি অংশ ধর্মকর্ম সম্পর্কে জানেন কম। এলোমেলো আমল করেন। কেউ কেউ নামাজের পরে খাম্বার সঙ্গে হেলান দিয়ে বা চিৎ হয়ে শুয়ে পড়েন। অথবা সবুজ গম্বুজের সামনে বসে ‘ইয়া নবি সালামালাইকা’ বলে টান দেন।

আমাদের এক সঙ্গী বললেন, তিনি এমন জায়গায় নামাজ পড়তে চান, যেখান থেকে সবুজ গম্বুজ দেখা যায়। কী আশ্চর্য, চিন্তা করেন। গম্বুজের কী দাম আছে? গম্বুজের নিচে যেই ব্যক্তি শুয়ে আছেন, তিনি কীভাবে নামাজ পড়তে বলেছেন, সেটা নিয়ে তার কোনো ভাবনা নাই। আরেকদিন একই লোক বললেন, সামনের একটা লোক দেখলাম, সুন্নত নামাজ পড়ল না। বললাম, তাতে আপনার দরকার কী? এই লোক হতে পারে এখানে একমাস থাকবেন, প্রতি ওয়াক্তে পঞ্চাশ হাজার রাকাতের সওয়াব পাবেন, আর আপনি কাল চলে যাবেন। তো, কার বেশি অর্জন হলো?

তবে আমি এখানে ঈর্ষা করি বৃদ্ধদের। তাদের কষ্ট সহিষ্ণুতা অভাবনীয়। এক বৃদ্ধকে পর পর দুদিন দেখলাম আসরের নামাজের ঠিক আগে লাঠি ঠুক ঠুক করে আসছেন। অফ-হোয়াইট জুব্বা পরা। পিঠ তারা ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে গেছে। এক এক পা ফেলতে গিয়ে দশ সেকেন্ড লেগে যায়। তবু তিনি আসছেন প্রতি দিন।

আমাদের সঙ্গী এক নারী তাহাজ্জুদের নামাজে যান রোজ সাড়ে তিনটায়, আর ইশরাক ছাড়া কিছুতেই আসতে চান না। মানে সাতটার পরে মসজিদ থেকে বের হবেন। এদিকে একা একা হোটেল চেনেন না। কেউ তাকে নিয়ে আসতে হয়। অন্যরা তার জন্য অপেক্ষা করতে চান না।

মসজিদের কিনারে কিনারে দেখবেন, বৃদ্ধরা গভীর অভিনিবেশে কুরআন পড়ছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কারও পা কেবলার দিকে ছড়ানো, মানে যেদিকে ফিরে আমরা নামাজ পড়ি। এটা নিয়ে আমার একটু খটকা ছিল। পরে শাহাদাত ফয়সাল ভাইয়ের (আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন) একটা আর্টিকেল পড়লাম, আমাদের কেবলা বা পশ্চিম দিকে পা দেওয়া সম্পর্কে ইসলামে কোনো নিষেধাজ্ঞা নাই। শরিয়তের একটা মৌলিক নীতি হলো, নিষেধ কোন বিষয়ে তা স্পষ্ট বর্ণনা করা আছে, যা নিষেধ না, তা সবই বৈধ বা হালাল। একমাত্র কেউ যদি বেয়াদবির উদ্দেশ্যে পশ্চিম দিকে পা দিয়ে থাকে, সেটা পাপের হবে, না হলে কোনো অসুবিধা নাই।

তরুণদেরও অনেকে স্টাইল করে ছবি তোলে। এক ওয়েস্টার্ন নারীকে দেখলাম মসজিদের সোনালি দরজাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে ফ্যাশন শোর মডেলদের মতো করে ছবি তুলছে। আমাদের সঙ্গী একটি কম বয়সি মেয়ে আছে, মায়ের সঙ্গে এসেছেন, তারও ইচ্ছা হয় একটু ছবি তুলবার। কিন্তু তাকে বের হতে হয় সবসময় বয়স্ক নারীদের সঙ্গে। একবার দেখি, সেই নারীদেরই একজন তার ছবি তুলে দেবার কোশেশ করছেন, ছবি তোলার আগে কয়েক মিনিট ধরে মেয়েটাকে বোঝাতে হচ্ছে যে, কোন সুইচটাতে টিপ দিলে ছবি ওঠে।

তবে লোকে যেইভাবে বলে, এত বেশি মোবাইল ব্যবহার করতে আমি দেখি নাই। বাবুস সালামে, রওজায়, জান্নাতুল বাকিতে বা আজানের সময় কিছু মানুষ নিশ্চয় ভিডিও করে, কিন্তু সেটা শতকার একভাগও নয়। অন্তত আমাদের দেশে আহলে হাদিসদের মসজিদে কয়েক কাতারব্যাপী যেই পরিমাণ মোবাইল-ট্রাইপডের রাশ দেখা যায়, তা নবির মসজিদে কল্পনাই করা যায় না। কেউ তা করেও না।

***

মদিনার রাস্তাঘাটে ভাষার বৈচিত্র্য এত বেশি যে, কারও সঙ্গে কথা বললে কোন ভাষায় বলবেন, বা কে আপনাকে কোন ভাষায় জিজ্ঞেস করবে, বোঝা মুশকিল। তবে প্রধানত তিনটা ভাষা বেশি শোনা যায়: আরবি, উর্দু ও ইংরেজি। বাঙালি দেখলে কোনো কোনো পাকিস্তানি দোকানি ‘দেশি ভাই’ বলে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন বটে। দোকানিদের এবং বাস ড্রাইভারদের একটা বড় অংশ পাকিস্তানি। ভিড়বাট্টায় উর্দু কথা খানিকটা আরবরাও বলেন, বা বলার চেষ্টা করেন। তবে বাংলায় কথা বলতে চাইলে ‘হাউস কিপার’গণ হতে পারেন আপনার প্রথম ভরসা। যেকোনো হাউস কিপারকে বাংলায় বললে আশিভাগ ক্ষেত্রে আপনি বাংলায় উত্তর পাবেন।

আর পোশাকের রং হিসাব করলে আমাদের দেশের ঠিক উল্টা চিত্র চোখে পড়বে এখানে। আমাদের দেশে যেমন পোশাকের সাজ, রঙং, স্টাইল বলতেই নারীরা। পুরুষের পোশাকে বৈচিত্র কম। কিন্তু এখানে পোশাকের বৈচিত্র্য শুধু পুরুষদের, নারীদের রং একটা, কালো। পুরুষদের শুধু পোশাক দেখে আপনি ইয়েমেনি, তুর্কি, ইন্দোনেশিয়ান, পাকিস্তানি, ইউরোপীয়ান বা আরব চিহ্নিত করতে পারবেন। নারীদের বেলায় সেটা হওয়া কঠিন। খুব অল্প নারী কালো বোরকা ছাড়া অন্য কোনো পোশাকে রাস্তায় বের হন।

সকালে একটা মেয়ে খেজুর বিলাচ্ছেন, নয় নম্বর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। আম্বর। বেশ বড় বড় খেজুর। আমি একটা মুখে দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। ক্ষুধা ছিল পেটে। ভালো লাগছিল। ফিরে গিয়ে বললাম, আমি আরও কয়েকটা নিই? মেয়েটা ফিক করে হেসে দিল। নিকাব পরা। কিন্তু পাপী মন আমার, মনে হলো, তার হাসির সবটুকু রং আমার চোখে ঝলসে উঠল। নারীর হাসির সৌন্দর্য স্বর্গীয়, যা সহ্য করার চোখ আল্লাহ পুরুষকে দেননি। এই কারণেই পুরুষরা ঈর্ষাকাতর হয়, নারীকে প্রতিপক্ষ মনে করে তাদের ডমিনেট করতে চায়। আমি আস্তাগফিরুল্লাহ পড়তে পড়তে হোটেলের দিকে রওনা করলাম। আজ আবার ‘জিয়ারা’ আছে। সাতটার মধ্যে হোটেল থেকে বের হতে হবে, উহুদ যুদ্ধের ময়দানে যাব।

***

মানুষের সবচেয়ে বেশি কী দরকার জানেন? মানুষ। মানুষকেই মানুষ সবচেয়ে ভালোবাসে। এমনকি যারা আল্লাহকে ভালোবাসার কথা বলে, আল্লাহ তাদেরও বলেছেন, মানুষ নবিকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে সেই ভালোবাসার পরিচয় দিতে। মদিনায় প্রথম যেই মানুষটির সাক্ষাৎ আমাকে আনন্দ দিয়েছে, তার নাম আরিফ। এখানেই হাউজ কিপিংয়ের কাজ করে সে।

মদিনার সবখানে প্রায় একই ধরনের কুরআন পাওয়া যায়, যাকে আমাদের দেশে বলে ‘সৌদি কুরআন’। একটা কপি সংগ্রহ করার ইচ্ছা হলো আমার। বয়স যখন আমার অল্প, দশ কি এগারো হবে, তখন একদিন গৌরনদীর গির্জায় গেছিলাম। ভেতরে একটা টেবিলে বাইবেলের অনেকগুলো কপি রাখা। আমি ভয়ে ভয়ে একটা কপি তুললাম। একজন মাঝবয়সি নারী এসে চমকে দিলেন। বললেন, তুমি এক কপি চাও? নিতে পারো। আমি নিই নাই। ভয়ে।

এখানকার মসজিদেও তেমন অনেক অনেক সৌদি কুরআনের কপি রাখা। পিলারগুলো ডিজাইন এমন যে, মধ্যখানের খাঁজে কোরআন সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা যায়, তাতে পিলারের সৌন্দর্য আরও বাড়ে। কুরআনের কভারে গোল্ডেন শেইপ এমনভাবে নকশার সঙ্গে মিলে যায়, যেন পিলারেরই অংশ। প্রথম দেখায় আমার ধারণা হলো, গির্জার বাইবেলের মতো কুরআনও চাইলে যে কেউ একটা কপি নিতে পারবে।

তারপরও একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, এক কপি কুরআন নিতে পারব কি না। সে না করল, একই সঙ্গে আরেকটা জায়গা দেখিয়ে দিয়ে বলল, ওখানে পাওয়া যায়। ওইখানেই আরিফের সঙ্গে দেখা। আরিফ আমাকে দেখেই বলল, বাংলাদেশি? আনন্দে তার মুখ ভরে গেছে। সে নাকি অনেকদিন ধরে একজন সাংবাদিক খুঁজছে। আরিফ জানাল, কুরআন চাইলে হোটেলে নিয়ে পড়তে পারি, কিন্তু মক্কায় যাওয়ার দিন ফেরত দিয়ে যেতে হবে। জানি না, ফেরত না দিলে কী হবে, তারা কি ব্যাগ চেক করে কপিটা রেখে দেবে, বা আমাকে পানিশ করবে? শুধু বুঝতে পারলাম নেওয়া যাবে না। তবে জানতে পারলাম, এইখানে কোথাও ফ্রি কুরআন বিতরণ করা হয়।

ভোরে মসজিদে যাওয়ার পথে দেখি, সেই একই কুরআন ‘অকফ’ ‘অকফ’ বলে ডেকে ডেকে বিক্রি করছে পনেরো রিয়াল করে।

***

সকাল সকাল শহিদ ভাই এলেন আমাদের ‘মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে’ নিয়ে যাবেন, যাকে এখানে বলে জামিয়া ইসলামিয়া। শহিদ ভাই এম.ফিল. পেপার জমা দিয়েছেন। আশা করছেন পি.এইচ.ডি. করবেন। তার গাড়িতে চারজন যাওয়া যাবে। আমরা আটজন। তাই ট্যাক্সি খুঁজলাম। এবং পেলাম একটা কাভার্ড ভ্যান আর তার বয়োবৃদ্ধ চালক। দরজা খুলে ভেতরে শরীরটা সেঁধিয়ে দিতেই বুঝলাম, ভুল করেছি। ভেড়ার গন্ধ। বৃদ্ধর নিশ্চয় ভেড়া বা দুম্বা আছে অনেক এবং ভ্যানের পিছনে শুধু না, সংখ্যায় বেশি হলে মাঝেমধ্যে সেই ভেড়া ভেতরের সিটেও বসিয়ে দেন নিশ্চয়।

গাড়ি চালাতে চালাতে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। খাঁটি আরব। বেশিরভাগ কথাই বুঝি না তার। সামনে, তার পাশের সিটে বসেছেন যিনি, তিনি একটু ঘুমকাতুরে, তাতে বৃদ্ধ চালক খুবই অসুন্তুষ্ট, মাথা কাত করা মাত্র তিনি পিছনে আমাদের ডেকে বলেন, ওকে ডাকো, ও যেন না ঘুমায়। তারপর আবার দুর্বোধ্য আরবি আলাপ।

মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে এক কথায় মন্তব্য হলো, এইটা একটা আধুনিক কওমি মাদরাসা। নিশ্চয় পড়ালেখা ভালো, ভালো হওয়ারই কথা। পুরো কম্পাউন্ড ঘুরতে ঘুরতে বারবার মনে হলো, বাংলাদেশে এমন একটা মাদরাসা নাই। একজন শিক্ষার্থী বাইরে নাই, সবাই ক্লাসে। বেসিক্যালি, বাইরে কোনো জনমানুষই নাই, একেবারে নীরব নির্জন আবাস। একটা বিশ্ববিদ্যালয় কি এমন হয়, মানে আমি তো বাংলাদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয় গেছি, এমন তো দেখি নাই। প্লে গ্রাউন্ড খা খা করছে, অডিটরিয়ামের সামনে কেউ নাই, কেউ হেঁটে যে লেকচার শিট ফটোকপি করবে বা অন্তত রেজিস্টার ভবনে যাবে, এমন কাউকেও দেখলাম না। যেন-বা ক্যাম্পাস ছুটি। এমন না যে, প্রচণ্ড রোদ, উত্তাপ, মানে আরবের নাম শুনলে আমরা যেমন তাপমাত্রার কথা শুনি আর কি, তার কিছু নাই, বরং মিঠা রোদ ভালো লাগছে। আমরা রাস্তার ডিভাইডারে লাগানো সবুজ ঘাসে বসলাম। জানলাম, এখানকার শিক্ষার্থীদের নাকি ক্লাস মিস হয় না বললেই চলে।

না, কষ্ট পাবেন না, মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে আয়তনে বড় বা সুন্দর, তা আমার মনে হয় নাই। ইচ্ছা ছিল, কোনো একটা ফ্যাকাল্টি ভবনে গিয়ে ক্লাসরুম দেখব। সময় কম বলে লাইব্রেরিতে গেলাম। বড় লাইব্রেরি। প্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা আছে। শাস্ত্রীয়, মানে ইসলাম ধর্মীয় বই-পুস্তকই বেশি। ইতিহাস, সংস্কৃতির বইও আছে বেশ। সবই বলা যায় আরবি। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিষয়ক এক-দুইটা বিভাগ নাকি নতুন খুলেছে এখানে। কিন্তু ইংরেজি ভাষার বই-পুস্তক খুবই কম লাইব্রেরিতে, যা আছে, তা শুধু কারিগরি শিক্ষার্থীদের খানিকটা গাইড বইয়ের অভাব পূরণ করবে বলে আমার ধারণা। অন্য কোনো ভাষার বই চোখে পড়ে নাই।

দুইটা মেয়েকে দেখলাম ভেতরে, একজনের কোলে শিশু। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ছাত্রী নাই, অনলি ফর মেন, সেখানে নারী কীভাবে এলো জানি না। শুনলাম, লাইব্রেরি নাকি ছেলে-মেয়ে সবার জন্য উন্মুক্ত। মেয়েদের জন্য ‘তায়্যিবা’ নামে আলাদা বিদ্যানিকেতন আছে। প্রশ্ন হলো, তারা কি ‘মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়’ পড়ুয়া ছেলেদের মতো সমান ক্রেডিট পায়?

একইভাবে ভারতের বিখ্যাত দেওবন্দ মাদরাসায়ও নারীদের শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নাই। আমি একবার প্রশ্ন রেখেছিলাম, দেওবন্দের শিক্ষকগণ তাদের মেয়েদের কোথায় পড়ান? নিশ্চয় দেওবন্দে নয়, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু সেই মেয়েরা কি নিজেদের ‘দেওবন্দ’ পড়ুয়া বলতে পারে, যেমন ছেলেরা গর্ব করতে পারে?

তবে মিসরের আল-আজহারে কিন্তু মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা আছে এবং সে-কারণে প্রচুর সমালোচনাও আছে, বিশেষ করে পর্দা রক্ষার বিষয়টি নিয়ে।

মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার জন্য একসময় আমার মধ্যে প্রবল তাড়না ছিল। কথাটা এইভাবে বললে ভালো, বিদেশি কোনো একটা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় পড়তে চেয়েছিলাম খুব। লিবিয়ার ইসলামিক কল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির জন্য কাগজপত্র জমা দিয়েছি। যুদ্ধ সেটা খেয়ে দিছে। পরে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়েও। তা-ও হয় নাই। আজ যখন এই বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরছি, তখন একবারের জন্যও আফসোস হয় নাই, এইখানে কেন পড়লাম না। আফসোস হতে পারত, যদি মদিনায় একেবারে থেকে যাওয়ার কোনো চান্স থাকত। এমনকি আমাদের সঙ্গে আসা এক ব্যাংকার বন্ধু বলছিলেন, ইচ্ছা হয়, এখানকার হাউসকিপার হয়ে মাসে পাঁচশ রিয়াল বেতনে জীবন চালিয়ে দিতে।

কিন্তু তা তো হবার নয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি শিক্ষার্থীদেরও এখানে শিক্ষক হওয়ার সুযোগ নেই। শাস্ত্রীয় বিষয়-আশয়ের বাইরে যে বিভাগগুলো খোলা হয়েছে, তাতে যোগ্য শিক্ষক না পাওয়ায় চুক্তিভিত্তিক অনারব শিক্ষক নেওয়া হয় বলে শুনলাম। কিন্তু ইসলামি বিষয়ে কেবল আরব বা আরও বিশেষ করে বললে সৌদিরাই থাকে।

এখানকার একজন পিএইচডি শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি ডিগ্রি নিয়ে শেষে কী করবেন? আমার দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ বলে, এই ডিগ্রি দিয়ে বাংলাদেশেও এখন ভালো জব খুঁজে পাওয়া কঠিন। বর্তমানে এখানে তিনশ’র বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আছে, পূর্বেও এমন আরও হাজারো শিক্ষার্থী ডিগ্রি নিয়ে বের হয়েছেন, কিন্তু দিন শেষে তারা দেশে গিয়ে নিজেরা নতুন একটা মাদরাসা করার মধ্যেই জড়িয়ে পড়েছেন। হাতেগোনা কয়েকজন ব্যাংকে শরিয়া সুপারভাইজর হয়েছেন। কেউ কেউ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ পড়াচ্ছেন। একটা সময় কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে বা ঢাকা আলিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানে এর সনদকে মূল্যায়ন করা হতো, এখন নাকি তেমন কিছু আর নাই। আরও নানান ধরনের কাজ নিশ্চয় তারা খুঁজে নিচ্ছেন, কিন্তু সত্যি কথা হলো, বাংলাদেশে এই ডিগ্রির তেমন মানসম্মত জবমার্কেট নাই। যারা কওমি থেকে সেখানে যান, তাদের পরিস্থিতি আরও শোচনীয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স করা থাকলে মদিনার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি একটা কোয়ালিটি যোগ করে মাত্র, কিন্তু শুধু মদিনার ডিগ্রি মনে হয় না কোথাও এখন আর অ্যালাউ করা হয়।

কেউ কেউ অবশ্য এখানে পড়ালেখার পাশাপাশি ব্যবসা করে সাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন। সেটা গোপনেই। কেননা, এখানে সবার একশভাগ স্কলারশিপ। থাকা সম্পূর্ণ ফ্রি। খাওয়ার টাকা স্কলারশিপে প্রাপ্ত টাকা থেকে দিতে হয়। ফলে পড়ালেখার পাশাপাশি কাজ করার তেমন সুযোগ নাই বললেই চলে।

আমি যে বছর হাজিপাড়া মাদরাসায় ‘জালালাইন’ পড়ি, তখন মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স করেছেন এমন একজন শিক্ষার্থী সেখানে ‘মেশকাত’ ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলেন। কওমি মাদরাসায় ‘জালাইন’ ও ‘মেশকাত’ শ্রেণিকে অনার্স সমান বিবেচনা করা হয়। মাদরাসার ফাইনাল পরীক্ষায় কিন্তু ওই শিক্ষার্থীর রেজাল্ট খুব একটা আশানুরূপ হয় নাই। বিষয়টা তখন আমাদের মাদরাসায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় যে, মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার মান কি তাহলে আমাদের কওমি মাদরাসার চেয়ে খারাপ!

লিখতে গিয়ে কোত্থেকে কোথায় চলে গেলাম। ‘জিয়ারা’ নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম, হলো না তো।

***

‘জিয়ারা’ শুনে যতটা আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল, নবির দেশের জায়গা-জমিন দেখব, মানে যতটা ঢাক পিটিয়ে গর্জাল, ততটা বর্ষাল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এরিয়াতে ইদানীং এক ধরনের গাড়ি দেখা যায়, ইজিবাইকের মতো, কিন্তু অনেক লম্বা, তাতে দশ-বারোজন বসা যায়, মদিনায় দেখলাম তেমন অনেক গাড়ি। সকালে নামাজ পড়ে বের হলে ডাক শুনি ‘জিয়ারা’, ‘জিয়ারা’। কেউ কেউ জিজ্ঞেস করেন, ভাইসাব কুবা পে জাওঁগে কেয়া? এই গাড়ি বোধ করি, সারা রাতই চলে। তাহাজ্জুদের সময়ও দেখলাম আমাদের হোটেলের সামনে দিয়ে যাচ্ছে। কোনো শব্দ নাই। হর্নও দেয় না। লোকজনের ভিড়ের মধ্য থেকে জায়গা করে নিচ্ছে। একান্ত হর্ন দেওয়ার দরকার হলে স্টিয়ারিংয়ের ওপরের হাত দিয়ে ঠক ঠক বাড়ি দেয়।

স্কেটিং আর ছোট ছোট সাইকেল (বাচ্চাদের সাইকেলের মতো, নাম কী জানি না) এখানে ভালোই জনপ্রিয়। নিঃশব্দে এড়া লোকজনের গা বাঁচিয়ে ফুস করে চলে যেতে পারে। একবার মনে হয়, এই লাগল বলে, পরে দেখি না, কিছুই হয় না। মুজতবা আলী ‘দেশে-বিদেশে’ বইতে পাঠানদের ঘোড়ার গাড়ি হাঁকানোর কথা লিখেছেন, লোকে সেখানে সড়ক ধরে হাঁটে, গাড়িকে সাইড দেয় না, বরং গাড়ি এঁকেবেঁকে পথ করে নেয়। এখানেও মনে হলো তেমন অবস্থা। আরেক ধরনের বাহন দেখলাম শুধু দুই চাকার ওপর দাঁড়িয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে যাওয়া যায়। ল্যুভর মিউজিয়ামের একটা ডকুমিন্টারিতে এই রকম বাহন দেখেছিলাম।

কুবা মসজিদে প্রথমে যাওয়ার কথা থাকলেও গিয়ে দেখি এত ভিড় যে বাস রাখার পার্কিংয়ে ঠাঁই নাই। রাস্তার পাশে একটু ব্রেক কষতেই পুলিশ চলে আসে। ফলে সোজা যেতে হলো কিবলাতাইন মসজিদে। এখানেও ভিড়। হাজার হাজার মানুষ। বিরাট বিরাট বাসে করে আসছে লোকজন। একটা বড় সড়কের পাশে মসজিদ। পার্কিং রাস্তার বিপরীত দিকে হওয়ায় রাস্তার ওপরে আমাদের মেট্রোরেলের স্টেশনের মতো বিরাট করে ফুটওভার করা হয়েছে। কয়েক তলা। প্রতি তলায় এস্কেলেটর আছে, এলিভেটর আছে। ওয়াশরুমও আছে। কিন্তু পাকিস্তানি হাউস কিপাররা ঢুকতে দেয় না, কয় মসজি খোদে গিয়ে অজু-গোসল লাগলে করো, এখানে না। প্রতি তলায় একই অবস্থা।

আমি ফুড়ুৎ করে একটা ওয়াশরুমে ঢুকলাম। চাপ ছিল বেশি। কিন্তু অজু করতে দিল না আরব গার্ড। এইখানে কে যে গার্ড বোঝা মুশকিল। এক ধরনের গার্ড আছে জুব্বা পরা, খালি জুব্বার উপর আমাদের ডিবি পুলিশের মতো একটা খাকি কোট পরা থাকে। আর মাথায় রুমাল। ওয়াকিটকিও থাকে। ওইটা দেখেই আন্দাজ করতে হয়।

সবাই এখানে দুই রাকাত নামাজ পড়ে। বরকতের জন্য আর আর কি। ভিড়ে সঙ্গীরা সব কোথায় কে যে গেলো খুঁজে পেলাম না। ওভারপাস পেরিয়ে মসজিদ যে কোনটা, সেটা বুঝতেই কয়েক মিনিট লেগে গেলো। কিন্তু বিস্মিত হলাম মাসুম ভাইকে দেখে। তার সঙ্গে এর আগে কোনো দিন দেখা হয় নাই। তিনি থাকেন লন্ডনে, আমি ঢাকায়। সোশ্যাল মিডিয়ার গুণেই পরিচয়। বহু বছর আগের পরিচয়। আমার মনে আছে, একবার কায়দা-কানুন করে ইজতেমার ময়দানে দেখা করার একটা লাইন করলাম। প্রচণ্ড ভিড়ে খিত্তা-খুঁটি খুঁজে বের করতে করতে আমার মোবাইলের চার্জ ফুরিয়ে গেল। তাকে হারিয়ে ফেললাম। তিনিই এখানে আমাকে দেখেই এগিয়ে এলেন, এবং আমিও অবাক হয়ে দেখি মাসুম ভাই।

মানুষকে দেখে মানুষের কীরকম আনন্দ হয়, তা মানুষ ছাড়া আর কে বুঝতে পারে। আমার জিয়ারার একমাত্র আনন্দ এটাই ছিল। আগামীকাল আমাদের মক্কা যাবার গাড়ি, তাই তার সঙ্গে মদিনায় দেখা হওয়ার উপায় নেই। ওইখানে দাঁড়িয়ে খুব কথাও বলার গেল না। দুপুর হয়ে গেছে, রোদ চড়ছে আকাশে। ফেরার তাড়া।

ঘুরতে ঘুরতেই মুয়াল্লিম সাহেব নানান ইতিহাস বললেন। আমরা যেই রাস্তা ধরে চলছি, তার নাম খালিদ বিন ওয়ালিদ রোড। একদিকে ইশারা করে বললেন, ওই তো খন্দক। এখন আর নামতে দেয় না। যদিও নবিজীবনীতে পড়েছি, মদিনার চার দিকের এক দিকে উঁচু পাহাড়, এক দিকে হাররা (মানে আগ্নেয়গিরির লাভা থেকে সৃষ্ট অমসৃণ অঞ্চল), আরেক দিকে ঘন খেজুর বন। অন্য যেই দিকটি খোলা সেই দিকে পরিখা খনন করা হয়েছিল সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শে। তো এটিই যে সেই দিক এখন আর বোঝার উপায় নাই। বরং চারদিকেই তো মনে হয় খোলা।

তবে ‘উহুদ পাহাড়’ নামক স্পটে গিয়ে একটা পর্বত সারি দেখা গেল। পাহাড়ের একটা জায়গা দেখিয়ে বলা হলো, উহুদ যুদ্ধে আহত হওয়ার পর নবিজিকে ওইখানে কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তার আগে মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে ৫০ জনকে একটা পাহাড়ের উপত্যকায় পাহারা দিতে রাখা হয়েছিল, জয়-পরাজয় যা-ই হোক, তারা এখান থেকে নড়বেন না। পরে যুদ্ধ শেষ হলো মনে করে তারা বিক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন। খালিদ বিন ওয়ালিদ পিছন থেকে এসে মুসলিমদের ওপর হামলা করলেন, তখনো তিনি মুসলিম হন নাই। পাহারা দেওয়ার জন্য নির্ধারিত সেই টিলাটা দেখলাম।

তবে আমার ভালো লাগলো এই জন্য যে, জীবনে এই প্রথম মনে হলো একটা সত্যিকারের পাহাড় দেখার স্বাদ পেলাম। আমাদের দেশের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি বা বান্দরবানের নানান পাহাড়ি অঞ্চলে তো গিয়েছি, কিন্তু এই যে চোখের সামনে একটা নাঙ্গা পাহাড় দেখছি, এটা একেবারে অবাস্তব লাগছিল। এত বড় পাহাড়, বিরাট টাওয়ারের মতো উঁচু, দেখতে গেলে টুপি পড়ে যায় মাথা থেকে। ন্যাড়া পাহাড়, পাথর ছাড়া কিচ্ছু নাই, তবু কী আকর্ষণীয়, কত ভালো লাগে তাকিয়ে থাকতে। একেবারে কাছে যাওয়া যায়, চাইলে ছুঁয়ে দেখা যায়। অনেকেই ছোট ছোট টিলায় উঠেছে। আমাদের সময় কম ছিল।

তবে উপত্যকরা জুড়ে দূরে দূরে এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাসমান দোকান। এক জায়গায় দেখি খাবার দেয়। এখানে এই ধরনের দানের খাবারকে বলে ‘সাবিল’। এইটা নিয়ে আমার বিরাট কৌতুহল। কারা দেয়, কেন দেয়। আলাপ করতে হবে। লাইনে দাঁড়িয়ে সেই খাবার নিলাম। বিস্বাদ টাইপের বিরিয়ানি। একটা পানিও দিল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সম্ভবত বাজেট ভালোই ছিল, কিন্তু আয়োজকরা টাকা মেরে খেয়েছে বলে বিরিয়ানিটা ভালো হয় নাই, গোশত দেয় নাই।

সুক্কারি খেজুর কিনলাম ১০ রিয়াল দিয়ে, মানে ৩৩০ টাকায় দেড় কেজি। এই দেশে এসে খেজুরের নাম চেনা শুরু করেছি। আগে সব খেজুরই এক রকম লাগত। কোনটার নাম কেন লোকে কী কী বলে, বুঝতাম না। এখন অল্পবিস্তর বুঝি। নরম সুক্কারি কেনায় কেউ কেউ বলল ঠকে গেছি। রিয়াদ ভাই তার কেনা খেজুর বাসের সবাইকে বিলিয়ে দিলেন।

***

আরও মনে হয়, নানান জায়গা আমাদের দেখা হয়েছে, মানে বলল তো বাসে এদিকে তাকান, ওই দেখেন, কিন্তু বাসের কাচের জানালা দিয়ে এই বিদেশ-বিভূঁইতে কী-ইবা চেনা যায়, শুধু ইট-দালান আর মিনার দেখা ছাড়া। মধ্যে একবার সাবআ মসজিদের নাম শুনলাম, আগে কখনো এই মসজিদের নাম শুনিনি।

আচ্ছা, মিনার বলায় একটা কথা মনে পড়ল। সেটা হলো, এখানে কোনটা প্রশাসনিক দপ্তর, আর কোনটা মসজিদ, এটা বোঝার সহজ কায়দা হলো এই মিনার। সরকারি যতগুলো ভবন দেখলাম, এমনকি মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় ঘোরার সময় প্রাচীরের ওপরেই দেখলাম মদিনার প্রশাসকের কার্যালয় (নাকি বাড়ি?), তাতেও গম্বুজ আছে। অর্থাৎ গম্বুজ দেখলেই ভাববেন না এটা মসজিদ। মসজিদে অবধারিতভাবে এখানে মিনার থাকে।

হুট করে একটা খেজুর বাগানে এনে নামালেন চালক। বলা হয়, বাগান-পাকা খেজুর এখানে বিক্রি হয়। সাথে একটা বড় দোকানও দেখা গেল, আড়তের মতো স্তূপ করে রাখা খেজুর বিক্রি করছে। কেউ কেউ টিপ্পনী কাটল, এখানে নামালে চালককে দুপয়সা দেওয়া হয় খেজুর-বিক্রেতাদের তরফ থেকে, এজন্যই অন্য সবখানে তাড়াহুড়া করলেও এখানে ঠিকই আনলেন। আমাদের দেশে যেমন মহাসড়কের পাশে বড় বড় রেস্টুরেন্টে বিরতি দেয় বাস, তেমন ঘটনা আরকি।

চালক এমনিতে দেখতে শুনতে মাশাআল্লাহ বেশ ভালো। একহারা গড়ন বলিউড নায়ক সুশান্তের মতো। কথায় মনে হলো তেমনই টান। মুখটা একটু লম্বাটে না হলে পরনের কাবলি আর উর্দু উচ্চারণ শুনলে ভ্রমই হতো। কিবলাতাইনে এক ঘণ্টার বেশি লাগায় পার্কিংয়ে তাকে জরিমানা গুণতে হয়েছে। কয়েকজন সঙ্গী বাস খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এই কারণে তার মেজাজ একটু খারাপ। দাঁত কামড়ে শুধু বললেন, আব জলদি করনে সে কেয়া ফায়দা, ভাই?

প্রচুর খেজুর পড়ে আছে চারপাশে, খেজুরের পঁচা গন্ধও নাকে লাগছে। পাশের বাগানটায় ঢুকলাম। এলাহি কাণ্ড। ভেতরে একটা পাশে গালিচায় মোড়া সোফা বসানো। তাতে হেলান দিয়ে ‘গাওয়া’ খাওয়ার আয়োজন। আজওয়া খেজুরও রাখা আছে টেবিলে। এক নারী ও পুরুষ অতিথিদের আরবি বলে বলে আপ্যায়ন করছেন, যদিও নারীটিকে দেখে আমার কেন যেন আরব মনে হলো না, ব্লন্ড চুল বেরিয়ে আছে। যা-ই হোক। ঠান্ডা বেশ। খেজুর পাতায় যে বাতাস ধরতে পারে, ধারণা ছিল না। রোদতপ্ত রাস্তার পাশে খেজুর বাগানের ভেতরে যে এমন এসির মতো ঠান্ডা হতে পারে, আন্দাজই করতে পারি নাই। অনেকগুলো খেজুর পকেটে নিলাম। আজওয়া খেজুরের দাম ও বরকত দুইটাই বেশি। আস্তে আস্তে খাওয়া যাবে।

***

সব শেষে যাওয়া হলো কুবা পল্লীর মসজিদে। পল্লী বলতে যা বোঝায়, তার ছিটেফোঁটাও এখন আর নাই। মাথা-ন্যাড়া খেজুর গাছ আছে অনেকগুলো মসজিদের আঙিনায়। কয়েক লাইন তাবুর শেইপও আছে। নিচে মোটা কার্পেট বিছানো। এই মসজিদের বারান্দার মেঝের টাইলসও হুবহু মসজিদে নববির মতো—চৌকা, লম্বা লম্বা, সাদা, শীতল। প্রচণ্ড রোদেও এই টাইল গরম হয় না।

অনেক রকমের গল্প আছে এই টাইলকে ঘিরে, কোন পাহাড় কেটে নাকি বানানো হয়েছে, তাতে মক্কা-মদিনায় সেই পাথরের টাইল দেওয়ার মধ্য দিয়ে পাহাড়ে আর কোনো পাথর এখন আর বাকি নাই, আবার সেই পাথর আবিষ্কার করার নেপথ্যেও আছেন এক বাঙালি প্রকৌশলী ইত্যাদি।

কুবার ওয়াশরুমও পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে। আমরা চালকের বিরক্তি উপেক্ষা করে এখানেই জোহর পড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। যদিও আমার মন বলছিল, মসজিদে নববি বা হারাম এলাকায় গিয়ে নামাজ পড়ি। কারণ তাতে সওয়াব অনেক বেশি। কিন্তু যেখানে আজান শোনা যায়, সেই মসজিদ ছেড়ে অন্য কোথায় গিয়ে নামাজ পড়া নবিজির সুন্নত পরিপন্থি। তা ছাড়া তিনি এই মসজিদের আলাদা বৈশিষ্ট্যের ঘোষণা দিয়েছেন, এখানে দুই রাকাত নামাজ পড়লে একটা উমরা করার সমান পুণ্য মিলবে।

***

গত পরশু দিন নবির মসজিদের সামনে খোলা চত্বরে বসে আছি। খুবই গুরুগম্ভীর আলাপ চলছে আমাদের। অদূরে এক নারী দাঁড়িয়ে আছেন, সবুজ গম্বুজের দিকে ফিরে। মুখ খোলা। কাঁদছেন। তার কান্নার মিহি শব্দ আমরা শুনছি। সঙ্গে অল্পবয়সী একটা ছেলে ইঁতিউঁতি তাকাচ্ছে। মায়ের বেদনায় তার কোনো ভাবান্তর নাই।

এখানে বোরকা পরা নারীদের মুখ খোলা থাকা একটা সাধারণ ব্যাপার। এমনিতে হজের সময়, মানে ইহরাম বাঁধার পর নারীদের মুখ খোলা রাখতে হয়, কাবাঘরের চারিদিকে তাওয়াফ করা বা সাফা-মারওয়ার মধ্যখানে ছোটাছুটি করার সময়ও তেমনই থাকার বিধান। তবে সেই বিধান মদিনায় নাই। তবুও অধিকাং নারী, বলা যায় দেশে থাকতে যারা মুখ ঢেকে চলতে অভ্যস্ত তারাও মুখমণ্ডল খোলা রেখেই চলাফেরা করেন।

আমাদের অফিসের সামনে একটা ছেলে ডাব বিক্রি করে, খুবই ময়লা একটা লুঙ্গি পরে, গায়ের জামাটাও রং-জ্বলা পুরান। মানে কারওয়ান বাজারে রাস্তার পাশে একজন দোকানির যেমন পোশাক হয় আরকি। একদিন দেখি ছেলেটা নাই, এক মুরব্বি বসে আছেন। ডাবের পানিতে চুমুক দিতে দিতে জানতে চাইলাম ছেলেটা কই। তিনি বললেন, তার আজকে একটা চাকরির পরীক্ষা আছে। একটু পরই দেখি, ছেলেটা পরিষ্কার স্যুট-বুট পরে হাতে একটা ফাইল নিয়ে এলেন সম্ভবত তার কাকাকে কিছু একটা বলতে। আমার তাজ্জব লাগল। ওইদিন থেকে ছেলেটাকে দেখলে মনে হতো, এই ময়লা ড্রেস ছেলেটার গায় মানাচ্ছে না, বরং তার ভদ্র পোশাক পরা উচিত। কিন্তু ছেলেটার সেদিকে বিকার নাই, কেননা, তার কাছে মনে হচ্ছে, ডাব বিক্রির অফিসিয়াল ইউনিফর্মেই সে আছে, এখানে ধোয়া কাপর পরে কেউ আসে না।

মদিনায় বোরকা পরা নারীদের চেহারা খুলে রাখার বিষয়টি আমার তেমনই মনে হলো। অর্থাৎ এখানে যেন মুখ ঢাকাটা মানায় না। যেমন অনেক স্যুটেড-বুটেড পুরষ এখানে এসে প্রথম দিন থেকে জু্ব্বা ধরেন, তবে মাথায় টুপি দেন না। টুপি না দেওয়াই এখানকার চল।

পাওলো কোয়েলোর একটা বই আছে ‘ভেরোনিকা ডিসাইডস টু ডাই’। এখানে একটা মেয়ে আত্মহত্যা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয় এবং তাকে মানসিক বিকারগ্রস্ত ভেবে মেন্টাল হসপিটালে পাঠানো হয়। এইখানে সে নগ্ন থাকতেও সংকোচ করে না, কেননা, তাতে কারও কিছু আসে যায় না, কেউ তাকে লজ্জা দেবে না। মানুষ যখন বুঝে ফেলে, তাকে অন্যরা পাগল হিসেবে দেখছে, তখন সে যা খুশি করার সামাজিক অনুমোদন পেয়ে যায়।

আমার মনে আছে, ছোটবেলায় বড় কাকার সঙ্গে আমি ধানের বীজ বিক্রি করতে বা ধান মাড়াই করতে নৌকায় করে হাঁটে যেতাম। আমার পরনে থাকত লুঙ্গি আর টিশার্ট। পলিথির বিছিয়ে ধান, চাল বা ধানের বীজের স্তূপের পিছনে বসে থাকতে আমার খারাপ লাগত না। যদিও পরদিনই হয়তো হাঁটে তেল কিনতে আম্মু পাঠাচ্ছেন, তখন আবার ধোপাদুরস্ত প্যান্ট-শার্ট পরে বের হচ্ছি। ওই দোকানদারি করার সময়টা আর এই ক্রেতা সেজে যাবার সময়টা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই মানুষ মনে হতো নিজেকে।

***

যাইহোক, কোত্থেকে কই চলে গেলাম। সেদিন আমাদের আলাপের বিষয় ছিল একটু অদ্ভুত, মানে এই যে নামাজের সময় মসজিদে সাউন্ডবক্সে ইমামের ‘আল্লাহু আকবার’ বলা বা কুরআন তেলওয়াত করা সবই তো শুনতে পাচ্ছি, তারপরও কেন আরেকজনকে তা পিছন থেকে তাকবির দিতে হয়, এইটা কেন।

যারা জানেন না, তাদের জন্য বুঝিয়ে বলি। ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে বড় জমায়েতের বক্তব্য ছড়িয়ে দিতে একটা পদ্ধতি চালু আছে—বক্তা যা বলবেন, হুবহু তা জমায়েতের নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে কেউ একজন জোরে অন্যদের বলবেন। তার আওয়াজ যেখানে পৌঁছবে, সেখানে আবার অন্য একজন ঠিক এইভাবে চিৎকার করে অন্যদের জানিয়ে দেবেন। আল্লাহর নবির বিদায় হজের ভাষণ, বা আরাফার মাঠে দেওয়া বক্তব্য এইভাবে সাহাবিরা শুনেছেন, কেননা, তখন মাইকের প্রযুক্তি ছিল না এবং লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশে তাঁর আওয়াজ দূরে বসা লোকজনের শোনার উপায় ছিল এটাই।

নামাজেও একই ব্যবস্থা, তবে নামাজে যিনি বা যারা এইভাবে উচ্চস্বরে ‘আল্লাহু আকবার’ শব্দটি বলে অন্যদের ইমামের অবস্থান জানান, যাতে লোকে বুঝতে পারে ইমাম এখন রুকুতে, নাকি সিজদায়, তাকে বলে ‘মুকাব্বির’। মাইকের যুগে এখনো এই মুকাব্বির হওয়ার প্রথা চালু আছে। কেন? বাংলাদেশেও তাবলিগের বিশ্বইজতেমার টুঙ্গীতে গেলে দেখা যেত, একজন না, বরং একসঙ্গে একটা উঁচু চৌকির ওপর থেকে এক দল মুকাব্বির জোর আওয়াজে তাকবির দিয়ে যাচ্ছেন। তাতে ঝামেলাও হতো। দেখা যেত দূরের লোকজন যখন সেই আওয়াজে সিজদায় যাচ্ছে, ইমামের কাছের মুসল্লিরা ততক্ষণে সিজদা থেকে উঠে দাঁড়াইছেন। মাইক থাকলেও প্রথম প্রথম তারা ব্যবহার করতেন না।

এখন মাইক আছে, মুকাব্বিরের দরকার হয় না, তারপরও ইজতেমায় বা মদিনায় সবখানে মুকাব্বির-প্রথা আছে এবং ইমাম ও মুকাব্বির দুইজনেই মাইকে আওয়াজ দেন। ইমামের আওয়াজ ও যথারীতি তার মতো করে হয়, কিন্তু মুকাব্বির আল্লাহু আকবার বলেন দীর্ঘ স্বরে, টেনে টেনে। এতই সেই টান যে, ইমামের সালাম শুনে মুসল্লিরা জায়নামাজ গুটিয়ে চলে যাচ্ছেন, ওদিকে মুকাব্বির তখনো ‘ওয়ারাহমাতুল্লাহ’ বলা শেষ করতে পারেন নাই।

আমার মত ছিল, প্রথাটা ধরে রাখা হয়েছে শুধু মুকাব্বির হবার আমলটা বাকি রাখার জন্য। অন্যরা কে কী মত দিয়েছিল মনে নাই।

***

এই আলাপের মধ্যেই কালো মতন একটা ছেলে, বয়স বিশ হবে কি হবে না, সামনে এসে সালাম দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। পরিচয় দিল, সে মুয়াজ আব্দুল্লাহর ভাই। মুয়াজ নামে সর্ব সাকুল্যে তিনজনকে চিনি আমি। দুনিয়া তামাম করে হাতড়াতে লাগলাম। বললাম, আসলাফের মুয়াজ? সে ‘না’ বলল। তারপর মনে হলো, জুলাইতে একজন এক্টিভি মুয়াজ ছিলেন, যার পোস্ট এখন আর ফেসবুকে দেখি না, বিদেশে পড়তে যাবেন বলেছিলেন একদিন টিএসসিসে দেখা হওয়ার সময়। সেটাও সে নাকচ করে দিল। পরে জানাল, ‘কায়রোর খেরোখাতা’ বইয়ের লেখকের ভাই। এই মুয়াজকে আমি কখনো দেখি নাই, তার বইটাও পড়া হয় নাই, তবু মনে হলো, এই ছেলেটা আমার কত আপন, যেন যুগ যুগের চেনা। যদিও ছেলেটার কী নাম এখন মনে নাই।

ছেলেটাকে দেখে আবার বারবার হাসানের কথা মনে পড়ল। হাসান যখন প্রথমবার হজে আসে, তখন নিশ্চয় এমন বয়স ছিল তার। এর মতোই বাবা-মায়ের সঙ্গে এসেছে। কত দুষ্টামি করেছে কে জানে। কোথায় গেলো হাসান? শাহবাগে ওর বাইক চাপা দিল একটা দানব ট্রাক। একটা পা উরু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। শাহপরীর দ্বীপের সেই দুষ্ট হাসানকে ইহজনমে আর কখনো দেখব না।

আসর নামাজে আসার সময় আরও একজনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তার নাম মনে আছে ইউসুফ বিন মনির। তিনি অবশ্য নিজেই একটি কাফেলা নিয়ে উমরায় এসেছেন। এই হুটহাট করে দেখা অচেনা বা অল্পচেনাদের এই দেশে এসে আত্মার-আত্মীয়র মতো লাগে। আমার বেশ কয়েকজন সত্যিকারের আত্মীয় এ দেশে থাকেন। আজ এই লেখা যখন লিখছি, তখন পর্যন্ত কারও সঙ্গেই দেখা হয় নাই, কথাও না। যদিও বাংলাদেশ থেকে আসার আগেক্ষণে তাদের সকলের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। পারি নাই। কিন্তু আসার আগে থেকে অনেক বন্ধুরা, যাদের কারও সঙ্গে একবার মাত্র দেখা হয়েছে কোনো আড্ডায়, বা দেখাই হয়নি, শুধু ফেসবুকের মেসেঞ্জারে হাই হ্যালো হয়েছে, তারা নিরন্তর খোঁজ নিচ্ছেন, কথা বলছেন।

আব্বুর এক অতি পরিচিত লোক আছেন এখানেই কাছে বেলাল মসজিদ সংলগ্ন বাজারে মাছের ব্যবসা তার। আব্বু বারবার বলে দিছেন, যেকোনো প্রয়োজনে তার কাছে যেন যাই, কিংবা গিয়ে দেখা করি। তাকে মেসেজ দিলাম। উত্তরও দিলেন। কিন্তু মনে হলো নিরুত্তাপ। অগত্যা আর যাই নাই, অবশ্য আমার কোনো দরকারও ছিল না। শুধু গতকাল জিয়ারায় যাওয়ার সময় মুয়াল্লিম বাসের জানালা দিয়ে দেখালেন, ওই বেলাল মসজিদ, ওইখানে মাছের বাজার। দুচোখ ভরে তাকিয়ে দেখলাম।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *