কদিন ধরেই দেখছি মাদী কুকুরটা টিনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে আসা-যাওয়া করছে বাড়িটাতে। বাড়ি পাহাড়া দেওয়ার জন্য আমাদের একটা মদ্দা কুকুর আছেই অলরেডি। ওর নাম ম্যাক্স। মাদী কুকুরটা হয়তো ম্যাস্কের বান্ধবী টান্ধবী হবে। আমি যে প্রতিদিন যাই তা না, সপ্তাহে এক-দুবার হয়তো যাই। তাতেই আমি মাদীটাকে দুবার দেখেছি। ওটা আমাকে দেখে ভয় পায় কেন জানি! দ্বিতীয় দিন দেখে মনে হলো, কুকুরটার পেট ফোলা ফোলা। হয়তো প্রেগনেন্ট। নিশ্চয়ই ম্যাস্কের কাজ! একবার ভাবলাম তাড়িয়ে দিই, পরে ভাবলাম থাক। আরও অনেকেই তো আছে বাড়িটাতে।
বাড়ি বলতে যেমনটা বোঝায় তেমন না আসলে, অগোছালোভাবে বেড়ে ওঠা প্রচুর গাছগাছালিতে ভরা পনেরো কাঠার মতো একটা জায়গা। ছোট একটি পুকুরও আছে।
আমাদের পারিবারিক এই জায়গাটা ডেমরাতে। বনশ্রীতে থেকে আট কিলোমিটার দূরে। বাসে গেলে আধঘণ্টা। ছোটবেলা থেকেই আমি কৃষি খুব পছন্দ করি বলে, সেখানে বিভিন্ন ফলের গাছ লাগিয়েছি। আপেল, অ্যাভোকাডো, আতা, কমলা, মাল্টা, ড্রাগন, গোলাপজাম, জামরুল, জলপাই, জাম, আম, কাঁঠাল, কলা, লিচু, পেঁপে, বরই, পেয়ারা, আমড়া, আঙ্গুর, মালবেরি—এইসব। সব গাছে যে ফল হয় তা নয়, গাছগুলোকে দেখলেই মনে একটা শান্তি শান্তি লাগে। সিজনাল সবজিও করি। শীতের সবজিগুলা খাওয়ার চেয়ে দেখতেই বেশি সুন্দর। ফুলকপি, টমেটো, লালশাক, পালংশাক, বাঁধাকপি। মুরগি, ছাগল, কবুতর, পাখি, রঙিন মাছ—এসবও আছে আমার পোষা প্রাণীর তালিকায়। জঙ্গল মতো জায়গাটায় হঠাৎ কেউ ঢুকলে ভাববে পাগলামি, কিন্তু আমার এমনটাই ভালো লাগে। একটু বিশৃঙ্খল, একটু অগোছালো। অগণিত গাছপালা। মাঝে ইট বিছানো সরু রাস্তা।
এক শুক্রবার খুব সকালেই চলে গেলাম অবিন্যস্ত সেই প্রায় বাগানবাড়িটাতে। সারাদিনই থাকার ইচ্ছা। দেখলাম, মাদী কুকুরটা দুপুরের মধ্যেই তিন-চারবার ভেতরে ঢুকছে আর বের হয়েছে। কুকুরটার পেট মোটা ছিল। এখন পেট সমান। তার মানে আমার ধারণাই ঠিক। হয়তো মুরগিপালার মাচাটার নিচেই বাচ্চা দিয়েছে কুকুরটা।
কাজে-কামে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় অনেকদিন যাওয়া হয়নি জায়গাটায়। একজন কেয়ারটেকার আছে, তার জিম্মায়ই আছে সব।
অফিস করি, বাজার করি—হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে আমার লাগানো লাউ গাছের কথা। ব্রোকলির কথা। মনে পড়ে পোষা বিড়ালটার কথা। যাব যাব করেও ব্যস্ততায় আর যাওয়া হয় না বাগানবাড়িটায়।
প্রায় বিশ দিন পর সুযোগ হলো যাওয়ার। কুকুরের বাচ্চাগুলো এখন অনেকটাই লায়েক হয়েছে। সারাবাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখলাম। হঠাৎ আমাকে দেখে বাচ্চাগুলো খানিকটা ভয় পেয়েছে মনে হলো। খানিকক্ষণ পর অবশ্য সমস্বরে ডেকে আমাকেই ভয় দেখাতে শুরু করল। ভেবেছে হয়তো, কোন আপদ আবার জুটল। ম্যাক্স বোধহয় টিনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে চুরি করে বাইরে কোথাও গিয়েছিল। আমার আগমনে কোত্থেকে এসে পায়ের কাছে শুয়ে পড়ল। বিড়ালটা রোদ পোহাচ্ছিল, দৌড়ে এসে পায়ে গা ঘেঁষতে লাগল। কুকুরের বাচ্চাগুলো একটু যেন বিভ্রান্ত হয়ে গেল। তবে ওরা লুকিয়ে গেল কোথাও।
সাতটা বাচ্চা সারাবাড়ির দখল নিয়ে নিল একেবারে। যে ম্যাক্স একটা বিড়ালকেই সহ্য করতে পারে না, সে দেখি শুয়ে শুয়ে বাচ্চাগুলোর শয়তানি সহ্য করে। হয়তো জন্মের পর থেকেই দেখে বলে বিড়ালটাও বাচ্চাগুলোকে দেখে তেড়ে যায় না।
এর মধ্যেই ঘটল আরেক ঘটনা! বিড়ালও বাচ্চা দিল তিনটা।
একটু একটু শীত পড়তে শুরু করেছে। কুকুর ছানার সাথে সাথে বিড়াল ছানাগুলোও লায়েক হয়ে যাচ্ছে। সব ছানাতে মিলে বাড়িটাতে দিনমান লাফালাফি করে। একজন আরেকজনের পেছনে লাগে। ম্যাক্স, মাদী কুকুর আর বিড়ালটা পাশাপাশি বসে ছানাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কুকুরের বাচ্চাগুলোকে বাড়ি থেকে বের করে দেব দেব করেও দেওয়া হয় না। দেখতে কেমন পুতুল পুতুল বাচ্চাগুলো। বের করে দিলে ওরা যদি বাইরে গিয়ে সারভাইব না করতে পারে! তাই ওরা রয়ে গেছে।
সবসময় তো যাওয়া হয় না। যখনই যাই, কুকুরের বাচ্চাগুলো আমার কাছাকাছি লাফালাফি করে, কচি গলায় ডেকে ডেকে আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে। বিড়াল ছানাগুলো অবশ্য দূরে দূরেই থাকে। হয়তো ওর মা কাছে আসতে নিষেধ করেছে। পুরুষ কুকুরটা আমার চারপাশে লাফালাফি করে। বিড়ালটা পায়ে গা ঘষে। মা কুকুরটা কাছাকাছি বসে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমার লাগানো গাছগুলোতে নানা জাতের পাখি এসে ঝগড়া করে। সকালবেলা মাছরাঙা আর বক এসে ছোট পুকুরটার মাছ খেয়ে যায়। তারা আমাকে দেখেও ভয় পায় না।
এদের দেখে বুঝি, এটাই জীবন আসলে। সবারই তো বেঁচে থাকার অধিকার আছে। কোনো কোনো সময় যে এরা ক্ষতি করে না, তা না। ঘুরেফিরে এরা সবাই আমার কিছু না কিছু ক্ষতি করেই। মাছরাঙা, বক পুকুরে মাছের পোনা ছাড়লেই খেয়ে ফেলে, বুলবুলি পাখি পাকা ফল খেয়ে ফেলে, ঘুঘুরা পাখির খাবার খেয়ে ফেলে, কুকুর মুরগি ছাগলকে দৌড়ানি দেয়, বিড়ালটা মুরগির বাচ্চা খেয়ে ফেলে।
কোনো কোনো সময় যখন রাতে থাকি, খুব সকালে ঘুম ভাঙে। ঘুমটা অবশ্য ভাঙে মাঝারি ঝোপালো গাছগুলোতে চড়ুই, দোয়েল, ঘুঘুদের ডাকাডাকিতে। দরজা খুলে বের হলেই মনে অন্যরকম একটা প্রশান্তি। কুকুরের বাচ্চাগুলো ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে ডাকতে বিড়ালের বাচ্চাগুলোকে খেলার ছলে তাড়া করে। সোনালি রোদ এসে গাছের পাতায় পিছলে পিছলে পড়ে।
আসলে তো এভাবেই চলে আসছে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে। বলা যায়, সৃষ্টির শুরু থেকেই। আল্লাহ পৃথিবীটা তো শুধু মানুষের জন্যই সৃষ্টি করেননি। এখানে পাখি থাকবে, পোকা থাকবে, বিড়াল থাকবে, বেজি থাকবে, কুকুর থাকবে, কাক থাকবে, থাকবে রোদ, থাকবে প্রজাপতি!