সাব্বির আহমাদের কবিতাগুচ্ছ

মায়ার পালক

কোলাহল থেকে পালিয়ে একটা ছায়া নিথর হয়ে পড়ে আছে। এখানে নিরবধি ধ্যান ভঙ্গ করে একটা জানালা। তার কপাট বেয়ে ঝুলছে বেতাপ এক গুচ্ছ দুপুর।

চোখে, চোখে চোখ পড়লে—

শুনি পাঁজরের ভিতর গেয়ে উঠছে এক নীলকন্ঠ মানব;

যার কণ্ঠে বেদনার গান। এমন আনচান করা তার সুর, এমন দগ্ধ বিধুর যেন লক্ষ লক্ষ মায়ার পালক উড়ে যাচ্ছে কোথাও। উপশম ঘটে হৃদয়ে। নিভৃতে উপশম ঘটে মন ও মগজে। আর প্রেমের ছলে বারবার ভেঙে পড়ে বুকের ভিতর সযত্নে গড়া ওঠা মোহের প্রাসাদ।

রিক্ততার পরে

সব শেষে মনের কাছেই জানতে চেয়েছি—

ব্যাহত বাতাস আমার ঠিক কতটুকু কেড়ে নিয়েছে।

আমি তো রিক্তই ছিলাম; যা গ্যাছে—

সবই ছিল অবসাদে ঢেকে থাকা এক অন্যমনস্ক আত্মার দান।

সে তো দৃশ্যমান, মূর্ত স্বরূপ;

তবু বিষমাখা ফুলগুলো কেন এত স্থির হয়ে থাকে?

যেদিকে হেলে পড়ে অসাড় যন্ত্রণা,

সেদিকে খুঁজে দ্যাখি—

সমস্ত কাহিনি যেন সাজানো এক নাটক,

আর তার উৎস—সারি সারি শূন্যতার নিঃশব্দ আয়োজন।

ঘোড়া

আমার বুকের ভিতর একটা ঘোড়া, মহাকাল অব্দি ছুটছে ভীষণ ক্ষিপ্রতায়। একটা ঘোড়া ছুটছে, ছুটছে অনন্ত কালের দিকে। তোমার অধোমুখ খোলা জানালার পাশে একটা নিমগ্ন ফুল; উর্ধ্বলোকের পথে ভেদ ভেদ করে ছড়িয়ে দিচ্ছে তার বুকের নিঃশ্বাসিত খুশবুর আরুধা। আর একটা ঘোড়া, মহাকাল অব্দি ছুটছে ভীষণ ক্ষিপ্রতায়। একটা ঘোড়া, জেগে উঠছে বারেবার আমার চেতনার ভিতর। তার হ্রেষাধ্বনির প্রকম্পনে খানখান করে ভেঙে পড়ছে লোহিত আলোর প্রভা। তোমার পাশ কেটে একটা ঘোড়া; সর্বোচ্চ গতি নিয়ে চলে যাচ্ছে মহাকাল অব্দি। যাওয়ার সময় তার খুরের আঘাতে জন্ম নিচ্ছে একটা স্ফূলিঙ্গ; আর তুমি তোমার তন্দ্রার ঘোরে শুনতে পাচ্ছো লক্ষ-কোটি বালুকণার ভিতর থেকে একটা প্রলয় ধ্বংসি আওয়াজ; টগবগ, টগবগ।

অর্ঘ্য

তুমি তো সৌন্দর্যের প্রতিমা—

ফুল ছাড়া তোমায় অর্ঘ্য দেবো কী দিয়া?

লাল শাপলার ঝিল শুকিয়ে গ্যাছে,

আমার গাছে বকুলও ধরে না বহুদিন।

তাই নাও—এই শূন্য দুই হাত।

অন্তরে খোঁজো না ভালোবাসার পরিমাণ;

সন্ধ্যার আলো যতটুকু প্রেমময়—

প্রতিমা, আমার প্রতিমা,

তোমায় অর্ঘ্য দিলাম দূর আকাশের চন্দ্রিমা।

শোক

এই আবহমান রাত সাঁতার কাটে চোখে। কল্লোলিত যে দৃশ্যরা—

পাখির ডানা ছিড়ে উড়ে যায় বাতাসে। তাদের। তাদের সব স্বপ্ন মিছিমিছি, একেবারেই অলীক। আমাদের বঞ্চিত করে এই চরম উল্লাস অভ্যর্থনা পাক। যেজন প্রেমিক; ধীরে ধীরে পাথর বুকে তুলে শুয়ে আছে এই নির্জন রাত্রির ভেতর। কোথাও কোনো আত্মীয় নেই তাদের। তবু ফুটপাতে ফুটপাতে তাদের শোকে বিলাপ করে একদল কুকুর। এমনই অবাঞ্ছিত মুহূর্ত এখন—সকালের তরতাজা গোলাপের আর কোনো মর্যাদা অবশিষ্ট নেই। হয়তো মখমলি এক চাদরের নিচে, প্রেমিকার স্তনের ভাঁজে নেতিয়ে আছে মহিমান্বিত এক গোলাপের ছিন্নভিন্ন পাপড়ির দেহাংশ।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *