‘বাংলাদেশে ইসলাম’ : তেরোশত নদী শুধায় আমাকে

এক অন্তর্নিহিত কৌতূহল বইটির শেষ পর্যন্ত আমাকে সঙ্গ দেয়। বিস্তৃত সূচি, সারগর্ভ ভূমিকা, ধর্মকেন্দ্রিক আঞ্চলিক ইতিহাসের বর্ণনা আমার কৌতূহল সতত জাগিয়ে রাখে। যেসব আত্ম-জিজ্ঞাসার সম্মুখীন বারবার হতাম, তত্ত্ব-তালাশে নেমে ঘর্মাক্ত হতাম, বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও গবেষকের বক্তব্যের সূত্র ধরে ফলাফলে পৌঁছতে চেষ্টা করেও সন্তোষজনক কোনো উত্তরে নিজেকে স্থির রাখতে ব্যর্থ হতাম, ঠিক সেসব আত্ম-জিজ্ঞাসার জবাবই তথ্য ও তত্ত্বের সহযোগে থরে থরে সাজানো ‘বাংলাদেশে ইসলাম’ বইটিতে; পাশাপাশি আছে প্রমাণসিদ্ধ বিশ্লেষণ ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা। প্রতিটি পাতা আমার শেকড়ের কথা বলে, আমার হয়ে বাহাস করে—যখন তেরোশত নদী শুধায় আমাকে কোথা থেকে তুমি এলে?

লেখক প্রচলিত ইতিহাস-বর্ণনার বিপরীতে শুধু ধর্মীয় উত্থান-পতনের বর্ণনায় সাজিয়েছেন প্রতিটি অধ্যায়। বিস্তারিত বর্ণনার ক্ষেত্রেও মূল উদ্দেশ্যে ফোকাস ধরে রেখেছেন। সেজন্য অনেক টুকরো টুকরো তথ্যও তুলে ধরেছেন। আবার অপ্রাসঙ্গিক হওয়ায় বিভিন্ন প্রসিদ্ধ ইতিহাসও সযত্নে এড়িয়ে গেছেন। এই অপ্রসঙ্গ এড়িয়ে আপন প্রসঙ্গ ধরে এগিয়ে যাওয়ার মাঝে কোনো অসংলগ্নতা ছিল না। যথার্থ সাবলীলতা ছিল।

ইসলামের আগমন, প্রচার ও প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তিনটি ভিন্ন ভিন্ন পর্বে আলোচনা করেছেন। এই তিন পর্বের পুরোধা ব্যক্তি ও ব্যক্তির অবদানের ওপরও আলোকপাত করেছেন। মুসলিম শাসকদের সাথে তাদের সম্পর্কের ইতিবৃত্তও স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে তিনি খুব সুন্দরভাবে পর্ববিভক্তির মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন যে, মোট তিন শ্রেণির হাত ধরে এদেশে ইসলাম আজ এ পর্যন্ত এসেছে—

প্রথমত, আরব বণিক বা বিদেশি সুফি-সাধকদের হাত ধরে। এদের সময়কাল নির্ধারণ করেছেন এগারোশ থেকে তেরোশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত। স্থানীয় ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে এদের কুরবানি ইতিহাসখ্যাত। ইসলামের জন্য প্রথম রক্তের নজরানা পেশ করেন এরা।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় নওমুসলিম ও নবাগত মুসলমানদের হাতে ইসলামের প্রচার-প্রসার। ব্যাপকভাবে দলিত-নিপীড়িত হিন্দু ও বৌদ্ধরা ইনসাফের ধর্মে দীক্ষিত হতে থাকে। পরিবেশ আনুকুল্যে না থাকলেও ইসলামের প্রচার-প্রসার হয় এই পর্বে দিগুণ হারে। অর্থাৎ জমি উর্বর হয়ে গেছে তত দিনে। ক্ষেত্র প্রস্তুত করে গেছেন প্রথম আড়াইশ বছরের মুসলমানরা। আর এদের সময়কাল নির্ধারণ করেছেন লেখক তেরোশ শতকের মাঝামাঝি থেকে চোদ্দশ শতক পুরোটা।

এরপর তৃতীয়ত ও সর্বশেষ, রাজশক্তির সহযোগে, তথা মুসলিম সুলতানদের হাতে। এর সময়কাল পনেরোশ শতক থেকে সতেরোশ শতক পর্যন্ত। এ সময়ে ইসলামের আলো চূড়ান্ত রূপে উদ্ভাসিত যেমন হয়েছে, তেমনই মন্দীভূতও হয়েছে। অর্থাৎ তিনি সাতশ বছরের ইতিহাসের নির্দিষ্ট একটি ধারার বিশ্লেষণ করেছেন। সেটি হলো ইসলামের ধারা। এখানেই বইয়ের নামকরণের যথার্থতা।

মুসলিম শাসকদের ধর্মীয় মূল্যায়ন করেছেন। ইসলামের প্রতি তাদের অনুরাগ এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সাথে আচরণও ঠাঁই পেয়েছে। যৌক্তিক কারণ তুলে ধরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনাও করেছেন। ইসলাম ও মুসলিম শাসকের কর্মকাণ্ডের মাঝে বৈপরীত্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এটা প্রধানত শেষ অংশের শেষে করেছেন, যার কিছু কিছু বক্তব্য পূর্বের ইতিহাস-বিশ্লেষণের সাথে ঠিক যায় না। এর জন্য যথেষ্ট প্রমাণাদিরও উপস্থিতি নেই। তবে ফলাফল ধরে এগোলে এমন বক্তব্যই নির্দেশ করে। কিন্তু তথ্য-প্রমাণের দরকার আছে।

যেমন মুসলিম শাসকদের আমলে আরবি-ফারসি থেকে বাংলায় ভাষান্তরের পৃষ্ঠপোষকতা না হওয়ার দাবি। মুসলিম শাসকরা সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদকারীদের পৃষ্ঠপোষকতা করলে আরবি-ফারসি থেকে বাংলায় অনুবাদকারীদের কেন করবেন না? এর পেছনে অজ্ঞতার কারণ দর্শানো তো আরও ঠুনকো যুক্তি। তাহলে এত এত মুসলিম সুলতান এত এত মসজিদ মাদরাসা খানকা তৈরি করেছেন, সেগুলোর ফলাফল কোথায়? সেগুলো চালাত কারা? এক্ষেত্রে গতানুগতিক বয়ানের অনুসরণ করেছেন বলে মনে হয়েছে।

এখানে এসে কেমন যেন আহমদ ছফার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধের বক্তব্যের মতো মনে হয়েছে (সারবক্তব্য): বাঙালি মুসলমান হলেও তাদের মনটা হিন্দুই রয়ে গেছে। দেবদেবীর মতো অলীক ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো অবতারের গুণকীর্তন করতে চাওয়া থেকেই তারা রচনা করেছে মুহাম্মদ হানিফা আর সিন্দবাদের গল্প।

মুসলিম জনসাধারণের ধর্মীয় জীবনযাপন ও সংস্কৃতির ব্যাপারে সুন্দর আলোচনা করেছেন। তিনটি পর্বে সাতশো বছরকে তিনি মূল্যায়ন করেছেন। প্রথম পর্ব শৈশব ও কৈশোর, দ্বিতীয় পর্ব যৌবন আর তৃতীয় পর্ব বার্ধক্য। এই শেষের দিকের আলোচনায় এসে তার একটা বক্তব্য তার লিখিত শব্দেই আমার মন কেড়েছে, চিন্তায় সাড়া ফেলেছে। লিখেছেন

‘ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে এসে ইসলাম ও মুসলমান বাংলার জনজীবনের সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল এবং রাজশক্তিকে বাদ দিলেও রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনে বাংলার মুসলমানরা যে একটি বিরাট শক্তি তা সর্বক্ষেত্রে স্বীকৃত হয়েছিল।’

আরেকটি বিশ্লেষণের উল্লেখ না করে এগোতে পারছি না। পুরো সাতশ বছরের ইতিহাসে ইসলাম প্রচারে নিয়োজিত ব্যক্তিদেরকেও তিনি তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন: মুজাহিদ, আলিম ও সুফি। তিনটি সময়ে যথাক্রমে তিনটি শ্রেণিরই প্রাধান্য আধিক্য গ্রহণযোগ্যতা বা কৃতিত্ব বেশি ছিল। যতটুকু আমার মনে হয়েছে প্রথম দুই পর্বের সময়কালের প্রত্যেক প্রচারকের মধ্যেই এই তিন শ্রেণির বৈশিষ্ট্য কমবেশি উপস্থিত ছিল। এটাই স্বাভাবিক। শেষ সময়ে এসে সুফিগণের উপস্থিতি বেড়েছে প্রয়োজনের ভিত্তিতে, অবস্থার বিচারে। কিন্তু তিনি সুফিদের ক্ষেত্রে এসে যে ভাষায় আলোচনা করেছেন, মনে হয়েছে স্বয়ং মওদুদি সাহেবের লেখার সফট ভার্সন! ভাষার কারণে বক্তব্য আবেদন হারিয়েছে।

শেষের দিকে এসে বাদশাহ আলমগীরের মূল্যায়নটা ছিল একদম একশতে একশ! অত্যুক্তি হবে না যদি বলি, বাদশাহ আলমগীর ছিলেন আমাদের ওমর বিন আব্দুল আজিজ। এমন একজন মুসলিম সুলতানের শাসনাধীন হতে পেরে ভারতবর্ষের মাটিও গর্বিত হয়েছে নিশ্চয়ই। আর এই মহান সুলতানের জীবদ্দশায়ই জন্ম নেন পরবর্তী কয়েক শতাব্দীর সংস্কারক, ভারতবর্ষের সৌভাগ্যরত্ন, কালোত্তীর্ণ চিন্তানায়ক শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি, যার আন্দোলনের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনার মধ্য দিয়ে ইতি টেনেছেন বইয়ের। শেষ করতে করতে লেখক আরেক ইতিহাসের শুরুতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন—তরিকায়ে মোহাম্মদিয়া ও ফরায়েজি আন্দোলনের ইতিহাস।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *