মক্কা থেকে মদিনার উদ্দেশে আমাদের গাড়ি ছাড়ল জোহরের বেশ কিছুক্ষণ পর। বলে রাখা ভালো, মক্কা-মদিনায় নামাজ হয় একদম আউয়াল ওয়াক্তে। ওয়াক্ত হওয়া মাত্রই হয় আজান, তারপর মিনিট পাঁচেক সময় গেলেই ইকামাত শুরু। ‘আল্লাহু আকবার’ আর ‘ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ’ বাদে ইকামাতের সবগুলো বাক্য একবার করে বলা হয়। বহুদূর থেকে এই ইকামত শোনা যায়। তো স্থানীয় সময়ের হিসেবে মক্কায় আমরা জোহর পড়েছিলাম দুপুর বারোটার পরপর। নামাজের পর যে খাবার খাওয়ার কথা ছিল সেটা আমরা জোহরের আগেই সেরে নিয়েছিলাম, সফরের প্রস্তুতি হিসেবে।
জোহরের বেশ কিছুক্ষণ পর গাড়ি এলো। হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের জন্য নির্ধারিত এই ধরনের বাস হারামের আশেপাশে ২৪ ঘণ্টাই দেখা যায়। দৃশ্যটা এমন : কোনো বাস এই এলো মাত্র, কোনোটা আবার হাজিদের নিয়ে ছুটে যাচ্ছে নতুন গন্তব্যে। তুমুল ব্যস্ত সড়ক। কেউ কারও দিকে মনোযোগ দেওয়ার তাকাদাও অনুভব করছে না। যে যার মতো আসছে, যাচ্ছে, হোটেলে উঠছে, হোটেল ছাড়ছে। একটু খেয়াল করে, এ যেন জীবন ও পৃথিবীর এক জ্বলজ্বলে প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীতে যেমন কেউ এসে থামছে, কেউ চলে যাচ্ছে, কেউ কেউ কেবলই দিন গুনছে আগমন বা প্রস্থানের। আর যার জন্য এই ছোটাছুটি সেই তীর্থ, সেই পৃথিবী নিরব দাঁড়িয়ে দেখে যাচ্ছে সব। কবির ভাষায়—
ইয়ে চামান ইয়ু হি রাহে গি, অওর হাজারো জানোয়ার
আপনি আপনি বুলিয়াঁ সাব বোল কার উড় যায়েঙ্গে
“এই বাগান, এখানেই রবে, সহস্র পাখি এসে,
নিজের গানটুকু গাওয়া শেষে চলে যাবে।”
যেটা বলছিলাম, হারামের আশেপাশে হজ-ওমরাহর যাত্রীবাহী বাসগুলোর আনা-গোনা ২৪ ঘণ্টাই চোখে পড়ার মতো। তারই একটু দূরে ঘুরঘুর করতে থাকে ‘উজরাহ’ ও সাধারণ ট্যাক্সি। ‘উজরাহ’ হলো এ দেশের সরকার অনুমোদিত বিশেষ ট্যাক্সি। চকচকা সবুজ রঙ আর আধুনিকতা এগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য। সাদা রঙের উজরাহও দেখা যায় কিছু কিছু। ট্যাক্সি বলে গাড়িগুলো যে মানসম্মত নয়, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। আমাদের দেশে সচরাচর এ ধরনের ‘নন লাক্সারি’ গাড়িও দেখা যায় একশোতে দুই-চারটা। আর বাসগুলোও দেখার মতো, প্রতিটা বাসের নামেই হজ ও উমরার যাত্রীদের প্রতি সূক্ষ্ম বা প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত থাকে। বোঝা যায় এই গাড়িগুলোর কাজই হলো হজ-ওমরার যাত্রীদের আনা-নেওয়া করা। যেমন : কোনো গাড়ির নাম ‘মাশাইরুল হিজাজ’, কোনোটার নাম ‘সাকরুল হিজায লিন নাকলি’, আবার কোনোটার নাম ‘বাসমাহ লি নাকলিল হুজ্জাজ ওয়াল মুতামিরিন।’ তবে যারা আগে এসেছিল তাদের অভিজ্ঞতা হলো, এ বছর অন্যান্য বছরের তুলনায় ‘বাসমাহ’ কোম্পানির গাড়ি একদম হাতেগোনা। পরে অবশ্য মদিনায় গিয়ে আমরা জানতে পারি, বাসমাহ কোম্পানি তাদের ট্রান্সপোর্ট ব্যবসা ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিচ্ছে।
প্রতিটা বাসই প্রযুক্তি ও ডিজাইনে একদম উন্নত ও সিমিলার। চাকাগুলোর ভিতরের অংশে সিলভার কালারটা একদম চকচকা, ভিতরে এসি ব্যবস্থাপনা, প্রতিটা সিটের সাথে চার্জার পুট, সামনে ও মাঝে মিলে দুটি করে অটো দরজা, মাঝের দরজার সাথেই নিচের দিকে টয়লেট সিস্টেম, তার পাশে ড্রাইভারের জন্য ছোট্ট একটা রুম। আর যা না বললেই নয়, বাসগুলোর নিচের অংশটা মালামাল ধারনের বিশাল এক যান্ত্রিক পেট আর ওপরের অংশটা যাত্রী বহনের আরামদায়ক পিঠের মতো। কে বলবে, গাড়ি আবিস্কারের আগে এই মরুভূমিতে উট আর গাধার পিঠে চড়ে কেউ কি কল্পনাও করতে পেরেছিল এমন আধুনিক বাহন একদিনে এখানে চলবে? সুবহানা আল্লাযি সাখখারা লানা হাযা ওয়া মা কুন্না লাহু মুকরিনীন। (সকল প্রশংসা তার, যিনি এই বাহন আমাদের ব্যবহারের উপযোগী করে দিয়েছেন, আমাদের কোনো সাধ্য ছিল না একে নিজেদের ইচ্ছা মতো চালানোর।)
অপেক্ষা করতে করতে বেশ কিছুক্ষণ পর আমাদের গাড়ি চলে এলো। লাগেজ গুছিয়ে আমরা মদিনার উদ্দেশে হোটেল থেকে নিচে নেমে এলাম। একে একে বাসের পেটের ভিতর লাগেজগুলো চালান করা হলো। এবার বাসে ওঠার পালা। পেছনে পবিত্র কাবা শরিফ, মাতাফ, হারামের চত্বর, হাজারে আসওয়াদ, রুকনে ইয়ামানি, উম্মে হানি, অনন্ত তৃষ্ণার ঝরনা আবে জমজম, মা হাজেরার স্মৃতিবিজড়িত সাফা-মারওয়া, লক্ষ লক্ষ আশেকানের তাওয়াফ-মিছিল এবং যে ছোট্ট স্মৃতির কথা আমি কখনোই ভুলতে পারব না—হারামের পুলিশদের খাঁটি আরবীয় উচ্চারণে ‘হাজ্জী! হাজ্জী!’ বলে বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া এক পরম সৌভাগ্যের কথা…
সব যেন এক লহমায় স্মৃতির মেঘ হয়ে ভেসে এলো মনের আকাশে, তুমুল বজ্রপাতে বর্ষাতে চায়। বাইরে থেকে কেউ জানছে তা। কেউ বুঝছে না। এ বিরহ-কষ্ট একান্ত নিজের। অসহায়ত্বে চোখের তারা ঝাপসা হয়ে এলো। মনের মধ্যে কেবলই পাখির চোখের মতো নিরীহ এই প্রশ্ন, এই অক্ষম জিজ্ঞাসা—আবার কবে আসব এখানে? আসব তো? নাকি গত রাতের তাওয়াফটাই শেষ তাওয়াফ হয়ে গেছে? গতকালের কাবা দেখাই ছিল জীবনের শেষ দেখা? মাতাফে দাঁড়িয়ে জমজমের গেলাশে চুমুক দেওয়ার সৌভাগ্য আবারও হবে তো? আবারও হারামের মিনার দেখে হাঁটতে হাঁটতে পড়ব তো—লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা, লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক. . .
ভিতরে হুহু করে ঝড়ো বাতাস শুরু হয়। ভয়ে, উদ্বেগে বুক দুলে ওঠে। আর শেষবারের মতো পিছনে তাকিয়ে ভাগ্যকে শুধু জিজ্ঞাসা করা—‘কেন এত বুক দোলে, আর আসব না বলে?’
কষ্টের এক গমক চেপে রেখে বাসের মাঝ দরজা দিয়ে একদম পেছনের সারিতে গিয়ে বসলাম, যেখানে আর কেউ নেই। কিছুক্ষণ মুরতাজা ভাই বসা ছিলেন। তারপর ড্রাইভারের পেছনের সিটটা ফাঁকা পেয়ে তিনি উঠে সামনের দিকে চলে গেলেন। এখন পেছনের প্রায় দুই সারি সিটই ফাঁকা। আমি একাকী বসে আছি, জানালার পাশ ঘেঁষে।
গাড়ি ছাড়ার আগে ড্রাইভার আমাদের সবাইকে সতর্ক করে দিলেন, কেউ সঙ্গে করে মেডিসিন নেবেন না৷ পথে পুলিশি ঝামেলা হলে মোটা অংকের গারামা নিতে হবে। স্থানীয় ভাষায় জরিমানাকে ‘গারামা’ বলে। এদেশের ট্রাফিক আইন অনেক কড়া। উনিশ থেকে বিশ হলেই গারামা। একবার গারামা লেগেছে তো কয়েকদিনের কামাই বিফলে। আমাদের দেশের মতো হাত-সাফাই ব্যবস্থা নেই। সরকারি আইন আসলে এমনই হওয়া উচিত। কিন্তু মেডিসিন সঙ্গে থাকলে পুলিশি ঝামেলা কেন হবে তা আমাদের কারো মাথায়ই ধরল না।
বাস থেকে গাড়ির গ্লাস দিয়ে বাইরে তাকালাম। আজ চমৎকার রোদ উঠেছে আকাশে। বাসের আঁধারি জানালা দিয়ে হোটেলের সামনের রাস্তাটাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। যেই পাহাড়ের ঢালু বেয়ে নেমে এসেছে এই রাস্তাটা সেটাও বাস থেকে দেখা যাচ্ছে। খাড়া পাহাড়, তারই কোল ঘেঁষে নেমে গেছে এই রাস্তা। যদিও ওপরের দিকটা এখন অচল। কয়েকটি নির্বিকার গাড়ি পার্কিংয়ে পড়ে আছে আর দুই একজন মানুষ সেখানে কাজবাজ করছে। পাহাড়ের পাদদেশে একটি নাফাক বা সুরঙ্গের শেষ মাথা। রেলিং দিয়ে সীমানা করে দেওয়া। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে এই রেলিং টপকাতে পারলেই নাফাক ধরে হারামে পৌছাতে পাঁচ-সাত মিনিট বেঁচে যায়। এই অভিজ্ঞতা অবশ্য আমার হয়নি। আমাদের ওমরাহ গ্রুপের প্রধান আহমাদ ভাইর হয়েছে একাধিকবার। হোটেলের সামনে একটা বড়সড় গাছ। কয়েকজন পাকিস্তানি হাজি গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে কথা বলছে। বাতাসে পাতাগুলো দুলছে। দৃশ্যটা দারুণ।
কিছুক্ষণের ভেতরই গাড়ি ছেড়ে দিলো। কয়েকদিনের পরিচিত পাহাড়ি রাস্তাগুলোর বাঁক ধরে বাস বেশ কয়েকবার মোড় নিল। ট্রাফিক সিগন্যালেও বসে থাকল কিছুক্ষণ। মূলত মক্কা-মদিনার বেশিরভাগ রাস্তাতেই একমুখী চলাচল। ফলে কোথাও যেতে হলে গাড়িগুলোকে বেশকিছু পথ ঘুরে বের হতে হয়। গলির মুখগুলো থেকে বের হতেই এই সিগন্যাল। আমাদের বাস সবগুলো পথ ঘুরে অবশেষে একটি কুবরি তথা ফ্লাইওভারে উঠেছে। এবার শো শো করে চলার পালা।
এতক্ষণে পেছনে আমরা যে রাস্তাটি ফেলে এসেছি সেটির নাম শারিউল হিজরাহ। ইংরেজি-বাংলায় হিজরাহ রোড। ছোট, ছিমছাম রাস্তা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াত লাভ করার পর চরম জুলুম ও নির্যাতনের মধ্যে মক্কায় ১৩ বছর কাটান। একসময় ইসলামকে দিগ্বিদিক প্রসারিত করতে ও কুফর ধর্ম থেকে সমুন্নত করতে মক্কার এই জুলুম ও কোনঠাসা-পরিবেশ ছেড়ে ছেড়ে অন্যত্র স্বাধীন কোথাও হিজরত করা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ থাকে না। তাই থেকে থেকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহাবিদের জন্য হিজরতের অনুমতি আসে। চরম নির্যাতিত সাহাবিরা একে একে দুই দফায় আফ্রিকান অঞ্চল হাবশায় হিজরত করেন। হাবশায় ছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা। কিন্তু ইসলামকে কোনো রাষ্ট্রের আশ্রয়ে থাকলে হবে না। ইসলামের চাই স্বতন্ত্র রাষ্ট্র। সে রাষ্ট্র কোথায় গঠিত হবে? কোথায় পাবে ইসলাম এমন অবারিত সুযোগ, মাথা উচু করে দাঁড়াবার ও বিস্তার ঘটানোর? এটাই ছিল ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ঠিক সেই মুহুর্তে এগিয়ে এলেন মদিনার সাহাবিরা। হয়ে উঠলেন ইসলামের জন্য সীসাঢালা প্রাচীর। নবির নিরাপত্তার জন্য অভেদ্য দূর্গ। তারা তাদের নিজেদের শহরে আশ্রয় দিতে চান তাদের। এবার সাহাবিরা দলে দলে মদিনার দিকে হিজরত করলেন। ইসলামের জন্য মুহূর্ত না ভেবে পিছনে ফেলে গেলেন অজস্র স্মৃতিবিজড়িত শৈশব, কৈশোরকে। চিরচেনা মানুষদেরকে। কেউ কেউ শেষবারের মতো মাতৃভূমিকে পিছন ফিরে দেখতেই দেখতেই ছাড়লেন মক্কা-নগরী।
এদিকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মক্কায় বসে কুরাইশি কাফেরদের গঞ্জনা ও নির্যাতন সহ্য করে যাচ্ছেন। তাঁর হিজরতের অনুমতি এখনো আসেনি। আল্লাহর আদেশের প্রতীক্ষায় তাই একেকটি অধীর প্রহর গুনছেন। অবশেষে এক সময় আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসুলকেও হিজরতের অনুমতি দিলেন। আল্লাহর রাসুল তখন এই পথ দিয়েই হিজরত করলেন। নানান ঘটনার আর বাধার ইতিহাস পেরিয়ে সেই থেকে এই পথের সাথে জড়িয়ে গেছে হিজরতের মহিমা। এই পথে হাঁটলে হিজরতের সেই কঠিন সময়কে মনে করে বিহ্বল হয়ে পড়ে। মক্কা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার এ বেলায় যেমন মনে পড়ছে, রাসুলের বিদায়বেলার কথা। সুনানে তিরমিজিতে আছে, মক্কা থেকে বের হওয়ার সময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ছলছল চোখে বাইতুল্লাহর দিকে তাকিয়েছিলেন। আর মুখে বলেছিলেন, ‘মক্কা, তুমি ছিলে পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে প্রিয় দেশ। সবচেয়ে ভালো জায়গা। শুধু তোমার মন্দ মানুষগুলো আমাকে বের করে দিয়েছে বলে, আজ তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছি।’
শারিউল হিজরার পাশের রাস্তাটির নাম মনে নেই, তার পাশের রাস্তাটি মক্কার বিখ্যাত শারিউ ইবিরাহিম খলিল। বলা যায় এটাই মিসফালা থেকে হারামে যাওয়ার প্রধান রাস্তা। এই রাস্তাটা তুলনামূলক চওড়া ও জনবহুল। হারামের কাছাকাছি এলে এর সঙ্গে যুক্ত হয় কবুতর চত্বর। শত শত কবুতর এ চত্বরে নির্ভয়ে এসে বসে পড়ে, আবার উড়ে যায়। এই কবুতরগুলোর একটা ইতিহাস পড়েছিলাম সিরাতে মুগলতাঈতে। সিরাতবিদ আল্লামা সুহাইলি রহ. বলেন—
হিজরতের সময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যখন গারে সাওরে আত্মোগোপন করেন, তখন আল্লাহর আদেশে গুহার মুখে কিছু লতাগুল্ম গজিয়ে ওঠে, কিছু মাকড়সা বাসা বাঁধে এবং এক জোড়া কবুতর বাসা বেঁধে ডিম পাড়ে। হারামের কবুতরগুলো সেই কবুতর জোড়ার বংশধর। ঐতিহাসিক বাস্তবতা অনুযায়ী তা প্রমাণিত কি না, তা জানা নেই। তবে এই সবকিছুই আর কিছুক্ষণের ভিতর যে নিছকই স্মৃতি হয়ে যাবে, ভাবতেই মন খারাপ হয়ে গেল।
বাস চলতে শুরু করার সাথে সাথেই মক্কার সেই পাহাড়বেষ্টিত আধুনিক রাস্তার দেখা মিলল। বিভিন্ন বাস বিভিন্ন গন্তব্যে ছুটছে। কেউ হয়ত যিয়ারায় যাচ্ছে, কেউ দ্বিতীয় ওমরার ইহরাম করতে কোনো মিকাতে, কেউ শপিংয়ে, আবার কেউ সবকিছু পেছনে ফেলে আমার মতো যুগপৎ আনন্দ ও বেদনার সহযাত্রী হয়ে। আনন্দ, কারণ এ বাসের গন্তব্য রাসুলের প্রিয় শহর মদিনা। যেখানে মুমিনের আজীবনের পিপাসা নিবারণের ‘জল’ আছে। সবসময়ই আছে। সেই সাহাবি যুগেও যেমন ছিল, আজও ঠিক একইরকমভাবে আছে। যারা আগামী পৃথিবীর যাত্রী তাদের জন্যেও থাকবে। আর বেদনা, পবিত্র বাইতুল্লাহ চোখের আড়াল হয়ে যাওয়ার বেদনা।
বাসে বসে মদিনার কথা ভাবতেই মনে পড়ল সেই দৃশ্যগুলো, যেখানে সাহাবিরা এসে একে একে জড়ো হলেন রাসুলের পাশে, নিজেদের মনের দুঃখ-কষ্ট বলতে। কী সোনালি দিন ছিল পৃথিবীতে, সবার কষ্ট লাঘব করার জন্য পৃথিবীতেই পাওয়া যেত রাসুলকে। পুরুষ-নারী, ছোটবড়, ধনী-গরিব—সবাই তার মনের কষ্ট নিয়ে ছুটে আসত একজনের কাছে, পরম বিশ্বাসে। বেদনার জীবন কাটিয়ে যাওয়া রাসুল আমার সেই সকল কষ্ট মুহূর্তেই ভুলিয়ে দিতেন, মুচকি হাসিতে। মানুষের দুঃখে দুঃখী আর মানুষের সুখে সুখী আমার রাসুল তখন প্রত্যেকের সমস্যার সমাধান বলে দিতেন, পাশে থাকার আশ্বাস দিতেন, অপরের দুঃখকে নিজের করে নিয়ে তাকে দিতেন নিজের আনন্দের ভাগটুকু। আহা, সাহাবিদের কী সৌভাগ্য ছিল! শুধু এটুকু যখন মনে করি, মনে হয় তামাম দুনিয়াও এর কাছে কিছুই নয়, কিছুই নয়।
যাইহোক, কবি বলেছেন, তৃষ্ণার জল নাকি কোথাও কিনতে পাওয়া যায় না। অর্থাৎ যে জলের জন্য তৃষ্ণা তা যদি মূল্য চুকিয়েই বাজার থেকে কেনা যেত, তবে পৃথিবীতে এত এত তৃষ্ণার্ত এক ফোঁটা জলের জন্য ছটফট করত না। শুধু কি ছটফট? কেউ কেউ তো মরেও যায় সারাজীবন ওই এক ফোঁটা জলের তৃষ্ণায় কাতরে কাতরে। সেই যে মনসুর হাল্লাজ, জিলানি, রুমি, তাবরিজি…
আমি হতভাগা, না আছে তৃষ্ণা, না আছে জলের হদিস। খালি হাতে, পেয়ালা ছাড়াই যাচ্ছি এ ঘাট থেকে ও ঘাট। এ দুয়ার থেকে ও দুয়ার। এ ঘর থেকে ও ঘর। আমার ভাগ্য সেই কবির মতো—
মুমিনের আছে ঈমান
কাফেরেরও আছে কুফরি
আমি হতভাগা,
থাকার মধ্যে আছে এই আফসোসটুকু।
তবু মনে হয় মুমিন মাত্রই তৃষ্ণার্ত। রাসুলের দিদারের তৃষ্ণা, তাঁকে শোনার তৃষ্ণা, তাঁকে দেখার তৃষ্ণা, তাঁকে একটিবার একটু কাছে পাওয়ার তৃষ্ণা। আর কিছু না হলেও তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে অন্তত একটিবার তাঁকে সালামের তৃষ্ণা। পৃথিবীতে কত ঐশ্বর্য আছে, প্রাচুর্য আছে, চাকচিক্য আছে, আছে স্বাদ, আনন্দের উপকরণ, নেই শুধু এই তৃষ্ণা নিবারণের বিকল্প। এইটুকু ‘জল’। কোনো কিছু দিয়েই যেন মেটে না এই পিপাসা। অগত্যা এই পিপাসা মেটাতে মানুষ ছুটে যায় সুদূর বিভূঁইয়ে, পৃথিবীর আরেক প্রান্ত থেকে। কিন্তু প্রেমের কী নিদারুণ ঠাট্টা। এখানে আসার পর তৃষ্ণা আরো বেড়ে যায়, এক ফোঁটা জলের তৃষ্ণা এক সমুদ্র জলের তৃষ্ণা হয়ে যায়। যদি নাই হতো, তাহলে ওই যে সাহাবিরা, যারা রাসুলের এর সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে ছিলেন, দিনেরাতে অসংখ্যবার তাকে দেখেছিলেন, তাদের তৃষ্ণা এই না দেখা আমাদের চাইতেও বেশি হবে কেন?
চলবে…