ভ্রমণসাহিত্য : সংস্কৃতি ও জ্ঞানের পথে এক দুঃসাহসিক অভিযাত্রা

ভ্রমণসাহিত্য—এই নামটির মধ্যেই আসলে লুকিয়ে আছে এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। একদিক দিয়ে এটি নিছক তথ্য নয়, বরং নির্ভেজাল সাহিত্য। ফলে এতে স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে ভাষার কারুকাজ, বয়ানশৈলী আর দৃশ্যপট নির্মাণের এক বিশেষ দায়বদ্ধতা। কিন্তু এর শরীরী কাঠামোটা দাঁড়িয়ে থাকে লেখকের এক প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ওপর—তার সেই শরীরী ভ্রমণের ওপর। লেখক যা দেখেন, যা অনুভব করেন, সেই বাস্তবতাকে যখন তিনি শব্দের রসায়নে জারিত করে এক বিশেষ সাহিত্যিক অবয়ব দেন, তখনই তা হয়ে ওঠে পরিব্রাজকের অভিজ্ঞতার এক বিশ্বস্ত দলিল।

পরিভাষার ভাষায় বলতে গেলে, ভ্রমণসাহিত্য হলো সেসব রচনার সংকলন যেখানে লেখক বিভিন্ন জনপদে তাঁর বিচরণের অভিঘাতগুলো সংজ্ঞায়িত করেন। এখানে শুধু মানুষের প্রাত্যহিক আচরণ, নীতি-নৈতিকতা বা সংস্কৃতির ব্যবচ্ছেদ থাকে না, থাকে প্রকৃতির নিখুঁত মানচিত্রায়ন কিংবা যাত্রাপথের এক দীর্ঘ ধারাবাহিক বয়ান। কখনোবা এই সমস্ত অনুভবের এক আশ্চর্য মিথস্ক্রিয়া ঘটে এই সাহিত্যে। লেখক এখানে নিছক দর্শক নন, বরং তিনি তাঁর চারপাশের জগৎকে ভাষার আয়নায় নতুন করে আবিষ্কার করেন।

আরবদের মজ্জায় এই ঘরছাড়া হওয়ার নেশা ছিল প্রবল, আর সেই নেশা থেকেই জন্ম নিয়েছে তাদের ঋদ্ধ ভ্রমণসাহিত্য। এক্ষেত্রে ইবনে বতুতার সেই মহাকাব্যিক ভ্রমণের কথা তো সবার আগে মনে আসে। কিন্তু এই যে ভ্রমণের বয়ান—একে কেবল অবসরের বিনোদন কিংবা সুডৌল গদ্যের সংকলন ভাবলে বড় ভুল হবে। এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে ইতিহাস খুঁড়ে দেখার এক ভিন্নতর রসদ। বিশেষ করে মধ্যযুগের ইতিহাসকে যখন আমরা তুলনামূলক বিশ্লেষণের টেবিলে বসাই, তখন এই ভ্রমণকাহিনিগুলোই হয়ে ওঠে সময়ের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাক্ষী। আধুনিককালের তুলনামূলক সাহিত্যের পণ্ডিতেরা তো একে সাহিত্যের এক আলাদা ব্যাকরণ হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন।

আরবীয় মনস্তত্ত্বে ভ্রমণ সাহিত্য কোনো ধার করা অনুষঙ্গ নয়, বরং তা এক আদি ও অকৃত্রিম শিল্প। এর পরতে পরতে তাকালে দেখা যায় এক বিস্তীর্ণ ব্যবধান—যেখানে একই সাথে মিশে থাকে গল্পের বয়ান আর সভ্যতার ব্যবচ্ছেদ। কোনো কোনো পাঠে তো একে মনে হয় স্রেফ এক আত্মজৈবনিক আখ্যান। এই যে নিজের অভিজ্ঞতার গহীনে ডুব দিয়ে বাইরের জগতকে দেখা, এটাই এই শিল্পকে এক অদ্ভুত প্রাণশক্তির জোগান দেয়। এখানে দেখার এক আশ্চর্য জ্যোতি আছে, আছে অজানাকে আবিষ্কারের বিস্ময় আর শব্দের মধ্য দিয়ে সেই পথকে নতুন করে হাঁটার আনন্দ। ভ্রমণসাহিত্য আদতে লেখকের সেই বিশেষ দৃষ্টিরই এক শৈল্পিক প্রতিফলন।

এই ভ্রমণগল্প মূলত দেশ আর কালের সীমানা ডিঙিয়ে যাওয়ার এক খেলা। সে যাত্রা কখনো আরব বা মুসলিম বিশ্বের চেনা ম্যাপে, কখনোবা এক্কেবারে অচেনা কোনো ভূখণ্ডে। সেখানে পরিব্রাজকের মুখোমুখি হতে হয় কত বিচিত্র সব হালহাকিকত আর রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার। তিনি দেখেন অন্য কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর জীবনযাপন। আর এই পুরো অভিজ্ঞতাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য গল্প বা সেরেফ বর্ণনা ছাড়া আর কোনো জুতসই পথ নেই। এই যে অন্য কোনো মানুষ বা গোষ্ঠীকে চেনা—এটি কেবল বিনোদন নয়, বরং এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদান। বিশেষ করে লেখক যখন যাত্রাপথে শোনা কোনো উপকথা, পুরাণ কিংবা অদ্ভুত কোনো লোককাহিনির ডালপালা মেলেন, তখন এই গদ্য কেবল অভিজ্ঞতার বিবরণ থাকে না, তা হয়ে ওঠে এক মায়াবী আখ্যান।

আদি উৎসের সন্ধানে

ভ্রমণগল্পের শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় প্রাক-ইসলামি আরব কবিতার দিকে। সে সময়ের ধ্রুপদি আরব কবিতায় ভ্রমণের দৃশ্যপট কেবল অলঙ্কার ছিল না, ছিল কবিতার এক অবিচ্ছেদ্য শরীর। সেই আদিম জনমানবহীন মরুযাত্রা, যেখানে কবি সম্পূর্ণ একা। তার একমাত্র সঙ্গী এক শক্তসমর্থ মাদী উট, যা দিগন্তবিস্তৃত মরুভূমি পাড়ি দিতে দিতে যাত্রার শেষে গিয়ে নিজেই এক কঙ্কালসার জীর্ণ অবয়বে পরিণত হয়। প্রাচীন কবিতায় এই ভ্রমণের বয়ানটি ছিল এক পৌনঃপুনিক ও ছকবাঁধা আখ্যান।

গবেষক আর তাত্ত্বিকরা এই প্রথাগত যাত্রাকে নিয়ে এক কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। তাদের মতে, এই যাত্রা হয়তো নিছক কোনো বাস্তব পথচলা ছিল না; বরং এটি ছিল কবির একান্ত মগজজাত বা অন্তর্গত এক প্রতীকী ভ্রমণ। গবেষকদের নজর কেড়েছে একটি বিচিত্র বৈপরীত্য—জাহেলি যুগের কবির এই মরুযাত্রা বাহ্যত ধু-ধু বালুচরে ঘটলেও, কবি সেখানে আসলে সমর্পণ করেন আকাশের কাছে। তিনি পথ খোঁজেন নক্ষত্রপুঞ্জ আর মহাজাগতিক ইশারায়, যার নিখুঁত মানচিত্র আরবরা আঁকতে জানত। ফলে এই ভ্রমণ তখন আর কেবল মাটির ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ায় আটকে থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে এক মহাজাগতিক অভিসার।

ফলে জাহেলি যুগের কবির এই যাত্রাকে অনেকটা সুমেরীয় মহাকাব্যের সেই গিলগামেশের অভিযানের সাথে তুলনা করা চলে। যা এক গভীর প্রতীকী ভ্রমণ। এই যাত্রার গন্তব্য আসলে অমরত্ব আর জীবনের নিগূঢ় রহস্যের সন্ধান। কবি যেন তাঁর কবিতার ছত্রে ছত্রে সেই পথের হদিস পেতে চান, যা তাঁকে পৌঁছে দেবে সূর্যের কাছে। প্রাচীন আরবীয় চিন্তাকাঠামোয় এই সূর্য তো কেবল একটি নক্ষত্র নয়, বরং তা ধর্মীয় আর পৌরাণিক প্রতীকের এক ঘনীভূত রূপ।

কবির এই প্রধান যাত্রার সমান্তরালে ফুটে ওঠে আরও কিছু ছোট ছোট মরমি আখ্যান। সেখানে মরুভূমির বন্য প্রাণীদের পারস্পরিক লড়াইয়ের যে চিত্র পাই, তা আদতে মানুষের চিরন্তন অস্তিত্বের লড়াইয়েরই এক অন্য পিঠ। প্রাণের যে নিগ্রহ, যে আদিম উদ্বেগ—বিশেষ করে মৃত্যুর সেই চিরকালীন আতঙ্ক যা মানুষকে যুগে যুগে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে রেখেছে—তাই যেন এখানে ছায়া ফেলে। প্রয়াত নসরত আব্দুর রহমান এবং আরও অনেক গবেষক এই সফরের লৌকিক বাস্তবতা বজায় রেখেই এর ভেতরের এই প্রতীকী ও পৌরাণিক সত্যকে সামনে এনেছেন। তারা দেখিয়েছেন, যা আপাতদৃষ্টিতে রক্ত-মাংসের ভ্রমণ বলে মনে হয়, তার গভীরে আসলে লুকিয়ে আছে এক দার্শনিক অভিযাত্রা।

ইসলামের প্রাথমিক তুরাসের দিকে তাকালে আমরা এক অপূর্ব ও বিস্ময়কর গল্পের মুখোমুখি হই। তা হচ্ছে—ইসরা ও মিরাজ। এক অলৌকিক পরিভ্রমণ, যেখানে আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস এবং সেখান থেকে এক ঊর্ধ্বজাগতিক সফরে পাড়ি জমান। মানুষের চেনা ভ্রমণের যে শর্তাবলি—কাল, স্থান আর গতির সীমাবদ্ধতা—তার কোনোটিই এই যাত্রার ক্ষেত্রে খাটে না। এই অতিপ্রাকৃত আখ্যানটি মুসলিম লেখকদের হাতে এক রুদ্ধশ্বাস বয়ানে রূপান্তরিত হয়েছে, যা অজস্র রহস্যময় আর চমকপ্রদ ঘটনায় ঠাসা। মূলত এই মহাজাগতিক যাত্রাই আরব ও বিশ্বসাহিত্যের জন্য এক নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে—যেখানে মানুষের কল্পনা প্রথমবারের মতো পরলৌকিক জগৎ, সেখানকার বিচিত্র প্রাণিকুল আর রহস্যময় পরিবেশের এক পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র আঁকতে শুরু করে।

এই চিন্তার সূত্র ধরেই দার্শনিক আবুল-আলা আল-মাআররি লিখেছিলেন তার সেই বিখ্যাত রিসালাতুল গুফরান বা ‘ক্ষমার পত্র’। এই গল্পের নায়ক এক অপার্থিব যাত্রায় স্বর্গ আর নরকের গোলকধাঁধায় ঘুরে বেড়ান, মুখোমুখি হন অসংখ্য চরিত্রের এবং লিপ্ত হন বৌদ্ধিক তর্কে। জান্নাতের সেই প্রান্তরে তিনি দেখা পান প্রাক-ইসলামি যুগের সেইসব কবিদের—যেমন মদ্যপানের বন্দনা করা কবি আল-আশা। বর্ণনাকারী যখন জান্নাতে তার অস্তিত্ব দেখে বিস্মিত হন, আল-আশা তখন জানান যে নবির প্রশংসায় লেখা তার সেই বিশেষ কবিতাটিই শেষমেশ তার ত্রাতা হিসেবে দেখা দিয়েছে; যদিও শর্ত ছিল জান্নাতে তিনি আর মদ্যপান করতে পারবেন না। সেখানে এভাবেই দেখা মেলে যুহাইর ইবনু আবি সুলমা, উবায়েদ ইবনুল-আবরাস কিংবা কবি খানসার মতো কালজয়ী সব চরিত্রের।

নরকের বাসিন্দাদের মিছিলে মাআররি দেখান ইমরাউল কায়েস, আনতারা ইবনু শাদ্দাদ, আমর ইবনু কুলসুম কিংবা তরফা ইবনুল আবদদের মতো কবিদের। এই যে পারলৌকিক জগতের এক কল্পনাপ্রসূত মানচিত্র তিনি আঁকলেন, তার রসদ তিনি পেয়েছিলেন কুরআনের বয়ান আর পরকাল সংক্রান্ত ইসলামি আখ্যানগুলো থেকে। একদিকে পাপ-পুণ্যের সেই ধ্রুপদি ধারণা, আর অন্যদিকে মাআররির নিজের অগাধ ভাষাজ্ঞান ও সংক্ষুব্ধ কল্পনাশক্তি—এই দুইয়ের মিলনে জন্ম নেয় এক কালজয়ী আখ্যান। আজ অবধি যা বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য মাইলফলক হয়ে আছে। শুধু প্রাচ্য নয়, প্রতীচ্যের দান্তের ডিভাইন কমেডি কিংবা জন মিল্টনের প্যারাডাইস লস্ট-এর মতো রচনার গভীরেও মাআররির এই কল্পবিশ্বের ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়।

আব্বাসীয় আমল থেকে ভ্রমণসাহিত্য তার কাব্যিক খোলস ছেড়ে গদ্যের এক সুসংগত রূপ নিতে শুরু করে। এ ক্ষেত্রে ইবনু ফাদলানের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। দশম শতকের শুরুর দিকে তুর্কি আর রুশ ভূখণ্ডে তার সেই দুঃসাহসিক অভিযানের বিবরণ আমাদের হাতে আসা প্রাচীনতম এক গদ্য-দলিল। ইবনু ফাদলান কেবল ভ্রমণ করেননি, তিনি তার অভিজ্ঞতার প্রতিটি ভাঁজ এক বিশেষ গদ্যশৈলীতে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তবে ভ্রমণসাহিত্যের আলোচনা যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, তখন অবধারিতভাবেই সামনে আসে ইবনে বতুতার নাম। মজার ব্যাপার হলো, বতুতা নিজে পেশাদার লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন আগাগোড়া এক যাযাবর পরিব্রাজক। ফলে নিজের ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে সাহিত্যের মোড়ক দিতে তাঁকে সাহায্য নিতে হয়েছিল একজন কলমচির বা সম্পাদকের। তবুও এটিই হয়ে উঠেছে আরব ভ্রমণসাহিত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী গ্রন্থ। এতটাই প্রভাবশালী যে, আধুনিক কালের কথাসাহিত্যিক নাজিব মাহফুজ তাঁর এক উপন্যাসে ইবনে বতুতার এই ভ্রমণকাঠামোকেই বিনির্মাণ করেছেন, যার নাম দিয়েছেন—রিহলাতু ইবনি ফাত্তুমা বা ইবনে ফাত্তুমার সফরনামা।

ষষ্ঠ হিজরির দিকে তাকালে আমরা দেখা পাই ইবনু জুবাইর আন্দালুসির। এই আন্দালুসিয়ান মানুষটি টানা তিন বছর কাটিয়েছিলেন ইসলামি প্রাচ্যের পথে পথে। তাঁর সেই অভিজ্ঞতার ফসল রিহলাতু ইবনি জুবাইর আদতে কোনো সাধারণ ভ্রমণ ডায়েরি নয়, বরং এক অস্থির সময়ের জীবন্ত আখ্যান। ইবনু জুবাইর যখন প্রাচ্যের জনপদগুলো চষে বেড়াচ্ছেন, তখন সেখানে চলছে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। তাঁর কলমে সেই সংক্ষুব্ধ সময়ের রাজনীতি আর জনজীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা অনন্য। বিশেষ করে বাইতুল মুকাদ্দাস বা জেরুজালেম তাঁর বর্ণনায় এক বিশেষ দ্যুতি নিয়ে আবির্ভূত হয়।

মুসলিম পরিব্রাজকদের কাছে জেরুজালেম অভিমুখে যাত্রা করাটা কেবল ভৌগোলিক কোনো সফর ছিল না, ছিল এক আধ্যাত্মিক দায়বদ্ধতা। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সেই অলৌকিক মিরাজ-যাত্রার স্মৃতিবিজড়িত এই পুণ্যভূমিকে স্পর্শ করার এক তীব্র আকুতি থাকত প্রতিটি পর্যটকের হৃদয়ে। প্রসিদ্ধ সেই হাদিস—যেখানে বিশেষ তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ইবাদতের উদ্দেশ্যে সফরের গুরুত্বকে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে—সেই ধর্মীয় টানেই জেরুজালেম হয়ে উঠেছিল পরিব্রাজকদের এক অনিবার্য গন্তব্য। ইবনু জুবাইরের বয়ানে এই শহরটি তাই কেবল পাথরের স্থাপত্য হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছে বিশ্বাস আর ইতিহাসের এক সন্ধিস্থল।

ভ্রমণের নেপথ্য কারণ কী ছিল?

যাঁরা ভ্রমণসাহিত্যের ব্যবচ্ছেদ করেছেন, তাঁরা এই দীর্ঘ পথচলার পেছনে অসংখ্য গূঢ় কারণ খুঁজে পেয়েছেন। মানুষ কেন ঘর ছাড়ে, আর কেনই বা সেই অভিজ্ঞতার ধুলোবালিকে শব্দের ফ্রেমে আটকে রাখতে চায়—তার পেছনে কাজ করে এক সমষ্টিগত মানবিক অভিজ্ঞতার নির্যাস। এই ঘরছাড়া হওয়ার যে তাড়না, তাকে কয়েকটি বিশেষ ভাগে চেনা সম্ভব।

এক. ধর্মীয় বোধ

প্রথমত এবং সম্ভবত সবচেয়ে জোরালোভাবে কাজ করে—ধর্মীয় বোধ। মুসলিম মানসে হজ পালন করা কেবল একটি ধর্মীয় বিধান নয়, বরং এক পরম আকাঙ্ক্ষা। ঘরবাড়ি থেকে দূরত্ব যত যোজন যোজনই হোক না কেন, এই পবিত্র যাত্রার জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়াটাই যেন এক অলিখিত নিয়ম। তাই অধিকাংশ বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনির অঙ্কুরোদগম ঘটেছে এই হজের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করেই। তবে অনেক সময় দেখা যায়, এই আধ্যাত্মিক যাত্রা আর কেবল সীমানার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকছে না; তা ছড়িয়ে পড়ছে পার্থিব জগতের অন্য সব অলিগলিতে। ইবনু বতুতা কিংবা ইবনু জুবাইরের কথাই ধরা যাক—তাঁরা পথে নেমেছিলেন মক্কার টানে, কিন্তু সেই পথ তাদের নিয়ে গেছে দেশ-কাল-সভ্যতার এক অন্তহীন বৈচিত্র্যের দিকে। তারা ধর্মীয় গণ্ডি থেকে যাত্রা শুরু করে শেষমেশ ধরা দিয়েছেন এক বিশ্বজনীন পরিচয়ে।

আরব্য সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডারে এমন অসংখ্য বই আছে যা কেবল মক্কা, মদিনা কিংবা জেরুজালেমের এই হিজাজি সফর নিয়েই লেখা। বিশেষ করে মাগরিব বা উত্তর আফ্রিকার হাজিদের কাছে হজের সফরের সাথে জেরুজালেম দর্শন ছিল এক অবিচ্ছেদ্য রীতি। মজার ব্যাপার হলো, এই একই ধর্মীয় অভীপ্সা আমরা দেখি পশ্চিমা পর্যটকদের মাঝেও। তারাও তাদের পবিত্র ভূমিগুলোর টানে পাড়ি দিয়েছেন আরব এবং অনারব ভূখণ্ড। খ্রিস্টধর্মের ইতিহাস আর যিশুর স্মৃতিবিজড়িত সেইসব প্রাচীন জনপদে তাদের এই পদযাত্রা ভ্রমণসাহিত্যের ইতিহাসে এক সমান্তরাল রেখা তৈরি করেছে।

দুই. জ্ঞানতৃষ্ণা আর মগ্নতার টান

ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ার আরেক বড় কারণ হলো—জ্ঞানের অন্বেষণ। এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক জনপদ থেকে অন্য জনপদে হেঁটে যাওয়া কেবল এই আশায়—যদি কোনো প্রাজ্ঞ শায়খ বা মনীষীর দেখা মেলে, যদি তার থেকে আহরণ করা যায় প্রজ্ঞার কোনো নিগূঢ় পাঠ। প্রাচীনকাল থেকে আজ অবধি, জ্ঞান অর্জনের এই যাযাবরবৃত্তিই হয়ে আছে শিক্ষার অন্যতম এক ধ্রুপদি পথ। আমাদের এই নিকটকালেই যেমন আমরা দেখি মিসরীয় লেখিকা ও সমালোচক রিদওয়া আশুরকে। সত্তর দশকের মাঝামাঝি পিএইচডি করতে আমেরিকা পাড়ি দেওয়ার সেই অভিজ্ঞতাকে তিনি ধরে রেখেছেন তাঁর মুজাক্কিরাতু তালিবাতিন মিসরিয়াহ ফিল আমেরিকা (আমেরিকায় এক মিসরীয় ছাত্রীর ডায়েরি) গ্রন্থে। এটি কেবল এক ছাত্রীর বিদেশ বিভুঁইয়ের বয়ান নয়, বরং জ্ঞানের সন্ধানে এক ভিন্ন গোলার্ধে পা রাখার মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান।

তিন. রাজনীতি ও কূটনীতি

সব যাত্রা তো আর কেবল নিজের ইচ্ছায় হয় না, কিছু যাত্রা নির্ধারিত হয় ক্ষমতার অলিন্দ থেকে। শাসক কিংবা খলিফার নির্দেশে রাজকীয় কোনো দায় মেটাতে যখন কাউকে সীমান্তে পাড়ি দিতে হয়, তখন জন্ম নেয় রাজনৈতিক ভ্রমণ। কোনো বিশেষ বার্তা পৌঁছে দেওয়া কিংবা অন্য কোনো জনপদের সাথে মৈত্রীর সেতু গড়া—এই ছিল এসব সফরের আদি রূপ। সালাম আত-তারজুমান কিংবা ইবনে ফাদলানের যে মহাকাব্যিক সফরের কথা আমরা জানি, তার নেপথ্য কারিগর ছিল এই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। এর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে কূটনৈতিক দর কষাকষি আর রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

সপ্তদশ শতকের মুহাম্মাদ আল-গাসসানির রিহলাতুল উজির ফি ইফতিকাকিল আসির (বন্দি মুক্তিতে উজিরের সফর) গ্রন্থটির কথাই ধরা যাক। স্পেনে বন্দি থাকা মুসলিমদের মুক্ত করার এক রুদ্ধশ্বাস কূটনৈতিক মিশনকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এই সফরের বয়ান। এখানে ভ্রমণ আর কেবল ভ্রমণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্র আর মানুষের মুক্তির এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

চার. মানচিত্রের নেশা আর আধিপত্যের রাজনীতি

মানুষের ঘরছাড়া হয়ে ভ্রমণের পথ বেছে নেওয়ার আরেকটি পুরনো কারণ হলো অজানাকে চেনা—যাকে আমরা অভিযান বা ভ্রমণ বলে তকমা দিই। এই যাত্রার মূলে থাকে নতুন কোনো ভূখণ্ডকে আবিষ্কার করা, সেখানকার পাহাড়-নদী আর লোকালয়ের এক নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করার অভীপ্সা। তবে এই তথাকথিত আবিষ্কারের আড়ালে অনেক সময় লুকিয়ে থাকে কুটিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। আরববিশ্বের দিকে তাকালে আমরা দেখি, ঔপনিবেশিক শাসনের ঠিক আগে বা সেই সমান্তরালে একদল পর্যটকের আবির্ভাব ঘটেছিল। তাদের এই ভ্রমণের উদ্দেশ্য যতটা না ছিল সৌন্দর্য দেখা, তার চেয়ে ঢের বেশি ছিল তথ্য সংগ্রহ। অচেনা জনপদের নাড়িনক্ষত্র জেনে নিয়ে সেগুলো সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের হাতে তুলে দেওয়া—যাতে শাসনের জোয়ালটা ঠিকঠাক বসানো যায়। ফলে এই ভ্রমণ তখন আর কেবল দেখার আনন্দ থাকে না, তা হয়ে ওঠে আধিপত্য বিস্তারের এক নিপুণ হাতিয়ার।

অবশ্য এর বাইরেও ছড়িয়ে আছে আরও নানা জাগতিক কারণ—কখনো নিছক পর্যটন, কখনো ব্যবসার প্রসার, কিংবা কখনো স্রেফ স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধারের আশায় নিছক হাওয়া বদলের চেষ্টা। দেশান্তরী হওয়ার এই অজস্র উসিলা থাকতে পারে, কিন্তু সব ভ্রমণ তো আর ভ্রমণসাহিত্য হয়ে ওঠে না। এই রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন পরিব্রাজকের সেই বিশেষ চোখ, যা সাধারণের ভিড়েও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে ছেঁকে তুলতে জানে। আর দরকার সেই অভিজ্ঞতার নির্যাসকে ভাষার আধারে ধরে রাখার ক্ষমতা—যাতে তার সেই ব্যক্তিগত পথচলা সাহিত্যের এক চিরকালীন ইশারা হয়ে ওঠে।

ভ্রমণসাহিত্য : সীমানা ডিঙিয়ে যাওয়া এক বিদ্যা

ভ্রমণসাহিত্যকে আসলে কোনো একটি নির্দিষ্ট খাপে বন্দি করা সম্ভব নয়। এটি এক ক্রস-ডিসিপ্লিনারি বা আন্তঃশাস্ত্রীয় এলাকা, যেখানে সাহিত্য, ভাষা, ভূগোল, ইতিহাস আর রাজনীতির মতো নানাবিধ ধারা এসে একে অপরের সাথে হাত মেলায়। ধরা যাক ভূগোলের কথা—কোনো জনপদের সীমানা, তার মাটির গঠন কিংবা ভূপ্রকৃতির যে নিরেট বর্ণনা, তা তো প্রাচীন ভ্রমণসাহিত্যের এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। এই দিক থেকে দেখলে ভ্রমণসাহিত্য আসলে এক ধরনের ভৌগোলিক সাহিত্য। রুশ প্রাচ্যবিদ ইগনাতি ক্রাচকভস্কি যখন এই পুরো ক্ষেত্রটিকে আদাবুল জুগরাফি বা ভৌগোলিক সাহিত্য বলে নামকরণ করেন, তখন তিনি মোটেও ভুল করেননি। তাঁর মতে, পৃথিবীর শরীর আর মানুষের বসতিকে চেনার সবচেয়ে আদি ও অকৃত্রিম উৎস ছিল এই ভ্রমণগুলোই। আরব্য ভূগোলের গোড়ার দিকের আকর গ্রন্থগুলো কিন্তু কেবল ঘরে বসে লেখা নয়, বরং সেগুলো গড়ে উঠেছিল মরুভূমি আর জনপদ চষে বেড়ানো দীর্ঘ পদযাত্রার অভিজ্ঞতায়।

আবার যদি আমরা কথাসাহিত্যের চশমায় তাকাই, তবে ভ্রমণসাহিত্যকে এক স্বতন্ত্র ন্যারেটিভ বা বয়ানশৈলী হিসেবেই মানতে হবে। এর নিজস্ব স্বভাব আছে, আছে বলার ভঙ্গি। এই বিশেষ সাহিত্যধারাটি বর্ণনার এক অনন্য শৈলী তৈরি করেছে—যাকে আমরা বলি ডেসক্রিপটিভ স্টাইল বা বিশদ বর্ণনার শৈলী। আজ আমরা ছবি তোলার জন্য হাতে ডিজিটাল ক্যামেরা বা স্মার্টফোন পাই, কিন্তু প্রাচীনকালে যখন চিত্রগ্রহণের কোনো প্রযুক্তি ছিল না, তখন ভাষাকেই হতে হতো ক্যামেরা। লেখককে তার শব্দের তুলিতেই আঁকতে হতো মানুষের অবয়ব, বাজারের ভিড় কিংবা প্রকৃতির নির্জনতা। ভাষাকে তখন দৃশ্যগ্রাহ্য হতে হয়েছে, শব্দের ভেতর প্রাণ দিতে হয়েছে ঘটনা আর পরিস্থিতিকে। ফলে ভ্রমণসাহিত্য কেবল তথ্য দেয়নি, বরং ভাষাকে চিত্র নির্মাণের এক অভাবনীয় সক্ষমতা জুগিয়েছে।

ভ্রমণসাহিত্যের আরেকটি নিগূঢ় অবদান হলো অদ্ভুতুড়ে বা বিস্ময়কর সাহিত্যের (Fantasy/Marvelous literature) ভিত গড়ে দেওয়া। পরিব্রাজকেরা তাদের যাত্রাপথে এমন সব বিচিত্র প্রাণী, অবিশ্বাস্য ঘটনা আর রহস্যময় অস্তিত্বের মুখোমুখি হতেন, যা সাধারণ মানুষের কল্পনাকেও হার মানাত। এই যে আজব দুনিয়ার গল্প—তা কখনো স্বতন্ত্র বই হিসেবে, আবার কখনো মূল ভ্রমণবৃত্তান্তের ভেতরেই ডালপালা মেলেছে। সমুদ্র আর স্থলের এই সব আশ্চর্য আখ্যান মূলত মানুষের অজানাকে জানার সেই আদিম কৌতূহলকেই উসকে দেয়।

ভাষাবিজ্ঞান আর অভিধানতত্ত্বের দিক থেকেও ভ্রমণের গুরুত্ব অপরিসীম। একজন পরিব্রাজক যখন চেনা জগতের গণ্ডি ছাড়ান, তখন তাঁর কলমে উঠে আসে এমন সব শব্দ বা পরিভাষা—যা কোনো প্রথাগত অভিধানে খুঁজে পাওয়া ভার। ভিন্ন ভাষার শব্দ, আঞ্চলিক বুলি কিংবা কোনো বিশেষ সভ্যতার যান্ত্রিক নাম—সব মিলিয়ে এক বর্ণিল ভাষিক রসায়ন তৈরি হয়। এই শব্দগুলোই পরবর্তীতে গবেষকদের সুযোগ করে দেয় সেইসব মৃত বা জীবন্ত ভাষার শেকড় খুঁজে বের করার। আর ঠিক এখান থেকেই জন্ম নেয় সাংস্কৃতিক গবেষণার পথ। আমরা আজকে যাকে নৃবিজ্ঞান (Anthropology), জাতিসত্তা বিজ্ঞান (Ethnography) কিংবা লোকসংস্কৃতি (Folklore) বলে চিনি—তার প্রথম পাঠ কিন্তু লেখা হয়েছিল এইসব পর্যটকদের ডায়েরিতেই। তাঁরাই প্রথম অন্য কোনো জনপদ বা গোষ্ঠীর জীবনযাপনকে তথ্যচিত্রে রূপান্তর করেছিলেন।

তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভ্রমণসাহিত্য আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আয়নার সামনে—যাকে আমরা বলি পরিচয় বা আইডেন্টিটির সংকট। নিজের চেনা বৃত্তের বাইরে যখন কেউ অন্য বা ভিন্ন কোনো মানুষের মুখোমুখি হয়, তখনই সে নিজের অস্তিত্বকে নতুন করে আবিষ্কার করে। সেই অন্যকে চেনার মাধ্যমেই আসলে নিজের ভেতরের আমির সীমানাটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভ্রমণসাহিত্য তাই কেবল অন্যকে দেখার গল্প নয়, বরং বৈচিত্র্যের সেই গোলকধাঁধায় নিজের পরিচয় আর স্বকীয়তাকে নতুন করে চিনে নেওয়ার এক বৌদ্ধিক লড়াই।

শেষকথা

আসলে ভ্রমণসাহিত্যের এই যে দীর্ঘ পরম্পরা—প্রাক-ইসলামি আরবের সেই নিঃসঙ্গ মরুযাত্রা থেকে শুরু করে আধুনিক কালের অন্যকে আবিষ্কারের রাজনীতি—তা আমাদের এক অমোঘ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ভ্রমণ আদতে কোনো একরৈখিক বিচরণ নয়; এটি দেশ আর কালের এক জটিল গোলকধাঁধা। এখানে ভূগোলের সীমানা শেষ হলে শুরু হয় ভাষার কারুকাজ, আর ইতিহাসের পাঠ চুকলে জেগে ওঠে অস্তিত্বের গহীন প্রশ্ন।

আমরা যখন ইবনে বতুতার সফরের ধুলোবালি দেখি কিংবা ইবনে ফাদলানের অভিজ্ঞতায় ক্ষমতার ছায়া খুঁজি, তখন বোঝা যায় যে মানুষ আসলে কখনো একা ভ্রমণ করে না। সে সাথে করে নিয়ে যায় তার নিজের সংস্কৃতি, তার সংস্কার আর তার একান্ত একাকীত্বের বোঝা। অন্যকে দেখতে গিয়ে মানুষ যখন নিজের ভেতরেই এক অচেনা সত্তাকে আবিষ্কার করে, তখনই ভ্রমণের প্রকৃত সার্থকতা ঘটে। ফেরার পথ যখন কেবলই ঘরে ফেরা থাকে না, বরং নিজেকে নতুন করে চিনে নেওয়ার এক আয়না হয়ে ওঠে, ঠিক সেখানেই এই সাহিত্যের সার্থকতা।

সবশেষে বলা যায়, এই যে অজানাকে জানার নেশা আর নিজের পরিচয়কে বিশ্বজনীন করার আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়েই ভ্রমণসাহিত্য সংস্কৃতি ও জ্ঞানের পথে এক দুঃসাহসিক অভিযাত্রা হিসেবে পূর্ণতা পায়। পথ চলা হয়তো এক সময় শেষ হয়, কিন্তু শব্দের ভেতর দিয়ে সেই যাত্রার পুনর্জন্ম হতে থাকে বারংবার।

আল-জাজিরার একটি নিবন্ধ থেকে অনুপ্রাণিত

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *