সূর্যের সিঁড়ি (দ্বিতীয় পর্ব)

পূর্ব প্রকাশের পর…

কিন্তু আপনি তো আইন আল-যাইতুনের লোক নন… না, আপনি ওখানকারই। ১৯৪৮ সালে যখন আইন আল-যাইতুন গ্রামে গণহত্যা নামল, আপনার অন্ধ বাবা হিজরত করে দেইর আল-আসাদে চলে এসেছিলেন। কিন্তু জন্ম আপনার আইন আল-যাইতুনেই। জন্মের পর নাম রাখা হলো ইউনুস। একদিন গল্পের ছলে বলেছিলেন—মৃত্যুর দেয়াল ভেঙে আপনি ফিরেছিলেন বলেই আপনার অন্ধ বাবা এই নাম রেখেছিলেন। ইউনুস নবির নামে নাম।

আপনার মায়ের কথা আপনি আমাকে কখনো বলেননি, বলেছিল আমেনা। মেয়েটা বলত, সে নাকি আপনার চাচাতো বোন, আপনার ঘরদোর গুছিয়ে দিতে আসে। বেশ রূপবতী ছিল সে।

সেদিন আমার প্রতি অমন রেগে গিয়েছিলেন কেন? হঠাৎ দেখি আপনার ভেতরে দানা বেঁধে উঠেছে এক চাপা অসন্তোষ। আমার মনে মোটেও কোনো বাজে উদ্দেশ্য ছিল না, আমি শুধু একটু হেসেছিলাম; এতেই বর্ষার কালো মেঘের মতো থমথমে হয়ে গেল আপনার মুখ। আমাকে ওর সাথে রেখেই গোমড়ামুখে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

একটু পরে ঘরে ঢুকে দেখলেন আমি আমেনার সাথেই বসা। সে আমাকে গল্প শোনাচ্ছিল। বলছিল আমার নাড়িনক্ষত্র সব নাকি তার জানা। আপনিই তাকে বলেছেন।

আমেনা খুব করে বলল, আমি যেন আপনার খেয়াল-খবর রাখি। কারণ আইন আল-হিলওয়ে ক্যাম্প থেকে এই শাতিলা ক্যাম্পে রোজ-রোজ ছুটে আসা তার পক্ষে সম্ভব না। আমি আপনার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে মিটমিটিয়ে একটু হাসলাম। সেদিনের পর থেকে আমেনাকে আর কখনো আপনার ত্রিসীমানায় দেখিনি। সত্যি বলছি, আমার মনে একেবারেই বাজে কোনো ব্যাপার ছিল না। মানছি, ছিল হয়তো সামান্য। কিন্তু দিনশেষে আপনি তো একজন পুরুষ মানুষ; রাগ করে থাকা আপনার সাজে না। মানুষ চিরকাল এমনই—সেই আদমের সময় থেকেই ভালোবাসার মানুষদের সঙ্গে সে বিশ্বাসঘাতকতা করে আসছে। করে, তারপর অনুতপ্তও হয়। বিশ্বাসঘাতকতা করে কারণ ভালোবাসে—এতে দোষের কী?

এ অন্যায়, ঘোর অন্যায়। আপনি আমেনাকে আর কখনো আসতে মানা করলেন কেন? বেচারি আপনাকে ভালোবাসত বলে? আমি জানি; প্রেমে-পড়া নারী দেখলে সহজেই বুঝতে পারি। প্রেম তখন তার ভেতর উপচে পড়তে থাকে। সে হয়ে ওঠে পেলব, থইথই, ঢেউখেলানো, ছলছলে এক নদী। কিন্তু পুরুষ? সে ভিন্ন। সে বড়ই অভাগা। সে জানেই না সেই সুললিত পেলবতা কী জিনিস, পেটানো পেশিকেও যা করে নিতে পারে সমাচ্ছন্ন, শিরায় শিরায় চারিয়ে দিতে পারে মোহময়তার এক উষ্ণ দ্রবীভূত প্রবাহ।

আমেনা আপনাকে ভালোবাসত, কিন্তু আপনি তাকে বিয়ে করতে রাজি হননি। সে-ই আমাকে বলেছিল। বলেছিল এমন আরো অনেক কথা, যা আপনার সামনে না বলতে আমাকে দিয়ে রীতিমতো কসম কাটানো হয়েছিল। আজ সেই কসমের দায় থেকে আমি মুক্ত। কারণ আপনি এখন আর কিছুই শুনতে পাচ্ছেন না। শুনতে যদিও পেতেন, লাভ কিছু হতো না, কিছু করতে পারতেন না। বড়জোর বিকৃত মুখ করে বলতেন—আমেনা আস্ত একটা মিথ্যুক। এরপর প্রসঙ্গটাই ধামাচাপা দিয়ে দিতেন।

আমেনা আমাকে আপনার আদ্যোপান্ত সব গল্পই বলেছিল। বলেছিল আপনার বাবার কথা।

শেখ ইবরাহিম বিন সালেম বিন সুলাইমান আল-আসাদি যখন বিয়ে করেন, তার বয়স তখন চল্লিশ। তার স্ত্রী টানা বিশ বছর ধরে একের পর এক সন্তান জন্ম দিয়ে গেছেন, যারা কি-না পৃথিবীর আলো দেখার কয়েকদিনের মাথায় একই রকমভাবে মারা যেত। আপনার মায়ের অজ্ঞাতনামা অদ্ভুত এক ব্যাধি ছিল। সন্তান বুকের দুধ খেতে শুরু করতেই তার স্তনের বোঁটায় জ্বলুনি শুরু হয়ে খসে পড়ত বোঁটা। দুধের অভাবে তখন শুকিয়ে মারা যেত বাচ্চা।

তারপর আপনি এলেন। আমেনা বলল, একমাত্র আপনিই নাকি বোঁটাহীন সেই স্তন জাপটে কামড়ে ধরে চুষতে পেরেছিলেন। আপনি স্তন কামড়ে ধরে দুধ টানতেন, অন্যদিকে ব্যথার পীড়নে আর্তনাদ করে উঠতেন আপনার মা। এভাবেই আপনি মৃত্যুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বেঁচেবর্তে গেলেন।

আমেনার এই গালগল্প আমি মোটেও বিশ্বাস করিনি। বড্ড অবাস্তব ও অসার ঠেকছিল। আপনার মা কেন স্তনের সেই অসুখের চিকিৎসা করালেন না? আর বাচ্চারাই বা কেন এভাবে না খেয়ে মরবে একের পর এক? আপনার বাবা কি পারতেন না গ্রামের অন্য মহিলাদের কাছে নিয়ে যেতে তাদের, যেন অন্তত বুকের দুধটুকু পেয়ে তারা বেঁচে থাকতে পারে?

আমি আমেনার কথা প্রথমে বিশ্বাস করিনি, কিন্তু পরে যখন আপনি নিজেই সত্যি বলে স্বীকার করলেন, আমার সন্দেহ আরও গাঢ় হলো।

আপনি বললেন আমেনার সব কথা সত্য। আপনিই ছিলেন সেই বেঁচে যাওয়া একমাত্র বিস্ময়-শিশু, যে কি-না বোঁটাহীন স্তন মুখে পুরে নিতে পেরেছিল; অন্যদিকে আপনার মা আপনাকে দুধ খাওয়াতে গিয়ে কতটা নরকযন্ত্রণার ভেতর দিয়ে গেছে তার শরীর, সেই কথা মনে করিয়ে দিয়ে আপনাকে খোঁটা দিয়ে গেছেন আমৃত্যু। আমি যখন অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, আপনার বাবা কেন দ্বিতীয় বিয়ে করলেন না, আপনি তখন এমনভাবে হাতটা উঁচিয়ে ধরলেন যেন আমি একটা চূড়ান্ত অবান্তর প্রশ্ন করে ফেলেছি, আপনি চান না এই প্রশ্নটা আমি করি। শান্ত গলায় বললেন, আমরা শুধু জীবনে একবারই একজনকেই বিয়ে করি, এটাই আমাদের বংশানুক্রম। এমনই হয়ে আসছে শুরু থেকে।

আমি মস্ত বড় মাথার একটা ভয়ংকর বুনো শিশুর কথা কল্পনা করলাম, যে ক্ষুধার্ত ঠোঁট নিয়ে খুবলে খাচ্ছে এক নারীর স্তন, আর প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ডুকরে কাঁদছে সেই অসহায় নারী।

এরপর আপনি আমাকে আরও একটা ভয়ংকর কথা বললেন। মূল সমস্যা নাকি স্তনবৃন্ত না থাকা ছিল না। আপনার ভাইবোনেরা মারা যেত কারণ আপনার মায়ের ওই প্রদাহযুক্ত স্তন থেকে তাদের কচি শরীরে চারিয়ে যেত এক রহস্যময় ঘাতক রোগ।

এ মুহূর্তে আমি আপনাকেই দেখতে পাচ্ছি। দেখছি একটা শিশু, মস্ত বড় তার মাথা, নাক ও ঠোঁটের কাছে এসে আছড়ে পড়া হলুদ আলোর বন্যায় ভেসে আছে তার মুখটা। দেখছি, যুগপৎ ব্যথা ও এক অদ্ভুত আদিম সুখে কেমন কুঁকড়ে যাচ্ছেন আপনার মা, যখন তিনি বুঝতে পারছেন তার বুকের সবটুকু দুধ শুষে নিচ্ছে আপনার ঠোঁট দুটো; শুনতে পাচ্ছি তার ভারী দীর্ঘশ্বাসের ওঠানামা, চোখের সামনে ভাসছে তার ভারী ঘুম-জড়ানো চোখের পাতায় ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসা এক অনাবিল তৃপ্তির ঘোর। দেখছি আপনাকে, আপনার মৃত্যু আর এক অমোঘ অবসান।

না, মরার কথা বলবেন না, প্লিজ। মরা-টরা চলবে না। উম্মে হাসান আমাকে ভয় পেতে মানা করেছেন, ভয় আমি পাচ্ছি না। আমাকে আপনার পাশেই থাকতে বলেছেন তিনি, কারণ আমাকে ধরতে এখানে এই হাসপাতালে ঢোকার সাহস কারও হবে না। এমনকি উম্মে হাসান নিজেও মনে করেন, আমি আপনার মৃত্যুকে বানিয়েছি আমার আত্মগোপনের আশ্রয়; তিনিও বোঝেন না আমি আসলে আপনার মৃত্যু ঠেকাতে চাইছি, আমার না।

ওদের আমি ভয় পাই না। তাছাড়া শামসের মৃত্যুর সাথে আমার কী সম্পর্ক? তাছাড়া শামসের ঘটনা এমন আহামরি কিছু নয় যে, আপনার গল্পের ভেতরে এসে জুড়ে বসতে পারে, কিংবা আপনার কাহিনির এগিয়ে যাওয়ার পথে হয়ে উঠতে পারে বাধা। আপনার কাহিনি যে এক মিথোলজিক্যাল কাহিনির সমান।

জানি আপনি বলবেন—ছাই! কীসের মিথিক! কীসের পৌরাণিক! সব বাজে কথা। ঠিক আছে, মানলাম। কিন্তু আপনি মরবেন না প্লিজ; আমার জন্য, আপনার জন্য, অন্তত ওরা যেন আমাকে খুঁজে না পায়, সেজন্য হলেও বাঁচুন।

আমি দিশা হারাচ্ছি, খেই হারাচ্ছি, নিরুপায় বোধ করছি, ভয় পাচ্ছি, হতাশায় ডুবছি, দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছি, ছটফট করছি, মনে পড়ছে আবার ভুলে যাচ্ছি—ভেঙে পড়ার কিনারে দাঁড়ানো এমন কত যে সঙ্গিন মুহূর্ত আমার!

আমার দিবারাত্রির বেশিরভাগ সময় আপনার এই কক্ষেই কাটে। হাসপাতালের ডিউটি শেষ করে আপনার কাছে ছুটে আসি। পাশে এসে বসি। আপনাকে গোসল করাই, শরীর মালিশ করি, সেন্ট মাখাই, পাউডার ছিটিয়ে দিই, গায়ে মলম লাগিয়ে দিই। তারপর সাদা চাদরে আলগোছে আপনার গা ঢেকে দিয়ে নিশ্চিত হই যে, এবার আপনি ঘুমাচ্ছেন। ঠিক তখনই শুরু হয় আপনার সঙ্গে আমার গল্প বলা। লোকে ভাবে, আমি বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছি, বসে বসে আপনমনে যা-তা বকে চলেছি। আপনার সাথে থাকতে থাকতে আমার ভেতরেই আমি পেয়েছি অনেকগুলো অচেনা সত্তার খোঁজ, যাদের সাথে আলাপ চালিয়ে যাওয়া যায় অনন্তকাল।

সত্যি বলতে, একটা বইয়ে আমি পড়েছিলাম—নামটা এখন আর মনে নেই—যে, আপনার মতো কোমায় চলে যাওয়া লোককে নাকি ক্রমাগত সংলাপে সংজ্ঞায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ডাক্তার আমজাদ হেসেই উড়িয়ে দিলেন এ কথা। বললেন—অসম্ভব, আষাঢ়ে গল্প ছাড়া কিছু না। আমিও জানি, যা পড়েছি তা হয়তো পুরোপুরি বিজ্ঞানসম্মত নয়, কিন্তু তবু চেষ্টা করে যাচ্ছি, থামছি না। কথার জাদুতে আপনাকে জাগিয়ে তুলবার এ এক মরিয়া চেষ্টা। তাহলে আমার কথায় আপনি সাড়া দিচ্ছেন না কেন? অন্তত একটা শব্দ তো উচ্চারণ করতে পারেন; তাহলেই তো ঝামেলা চুকে যায়, আপনি সংজ্ঞায় আছেন জেনে আমরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচি।

কথা বলতে পারছেন না, নাকি বলতে চাইছেন না? নাকি ভুলেই গেছেন কীভাবে বলতে হয়?

তার মানে আপনার এখন আমার কথা শোনা ছাড়া কাজ নেই। জানি, আমার গল্প শুনতে শুনতে আপনি ত্যক্তবিরক্ত, তাই এবার আপনার নিজের গল্পই আপনাকে শোনাব। যা কিছু আপনি আমার কাছে জমা রেখেছেন, তা-ই ফিরিয়ে দেব। গল্প বলে যেতে যেতে আড়চোখে খেয়াল করব—আপনার ওই শক্ত করে চেপে রাখা বদ্ধ ঠোঁটের কোণায়, কোথাও একটু ফুটে ওঠে কি-না মৃদু হাসির ঝিলিক।

আমার গলা কি শুনতে পাচ্ছেন? আমার শব্দগুলো কি আপনার কাছে কালো ছায়ার মতো দেখাচ্ছে?

আসলে আমিও কথা বলতে বলতে ক্লান্ত। একটু চুপ করে বসতে না বসতেই লোমকূপ গলে দরদর করে বেরিয়ে আসা অনিবার্য ঘামের মতো আবারও ধেয়ে আসতে থাকে অপ্রতিরোধ্য কথার তোড়। তখন, আমার নিজের আওয়াজের বদলে আমার কণ্ঠনালি চিরে বেরিয়ে আসে অবিকল আপনার কণ্ঠস্বর। আমি চেয়েছিলাম অবিরাম আপনাকে দিয়ে কথা বলাতে, অথচ আপনি তো জাগলেনই না, উল্টো তলিয়ে রইলেন আপনার এই প্রগাঢ় ঘুমের অতলে।

আমি আপনার পাশে নীরবে বসে থাকি, শুনি আপনার শ্বাস-প্রশ্বাসের চাপা ঘড়ঘড়; ভেতরে অনুভব করি একটা গা কাঁপুনি দেওয়া কান্নার বেগ—কিন্তু কাঁদি না। বলি—যথেষ্ট হয়েছে! আর কোনোদিন আপনার এই ঘরে পা দেব না। এখানে আমার কাজ কী? কিছুই না।

আমি তো এখানে খোদ মৃত্যুর সঙ্গে বসে আছি। মৃত্যুকে সঙ্গ দিচ্ছি। মৃত্যুসঙ্গ দেওয়া বড় কঠিন কাজ, বাবা। আপনিই আমাকে জলপাই বাগানের সেই তিনটে লাশের কথা বলেছিলেন—ভুলে যেয়েন না। আপনি তো একজন ফেরারি, ফেরারিরা কিছু ভোলে না। আপনার কি মনে আছে, জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আইন আল-হিলওয়ে ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর ঠিক কী ঘটেছিল? মনে আছে কীভাবে আপনি আকাশে ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে সবাইকে গালিগালাজ করে যাচ্ছিলেন আর তারপর ওরা আপনাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল? লোকজন ব্যস্ত ভঙ্গিতে তাঁবু খাটাচ্ছিল। তাঁবুগুলোর দুদিক দিয়েই হু হু করে ঢোকে বেরোয় বাতাস। আপনি এদের উদ্দেশে বললেন—আমরা রিফিউজি নই, আমরা ফেরারি, ব্যস; এর বাইরে আমাদের অন্য কোনো তকমার মানে নেই। আমরা লড়াই করি, মারি এবং মরি। কিন্তু কোনোভাবেই রিফিউজি নই। আপনি মানুষকে বোঝালেন, রিফিউজি শব্দটা একটা চরম লজ্জার ও অসম্মানের ব্যাপার, এবং গ্যালিলির সব গ্রামের পথ এখনো খোলা রয়েছে।

সিডন শহরের পুলিশ সুপারের রিপোর্টে স্পষ্ট লেখা ছিল—আপনার মুখভর্তি ছিল দাড়ি, গায়ে রাজ্যের ময়লা, হাতে একটা রাইফেল নিয়ে অবিরাম পাগলের মতো প্রলাপ বকছিলেন।

রিপোর্টে লেবানিজ অফিসার আপনাকে পাগল সাব্যস্ত করে ছেড়ে দিল। আপনি অবিশ্বাস নিয়ে শুনলেন তার রিপোর্ট, কিন্তু সে নিচের ঠোঁটে কামড়ে আপনার দিকে চোখ টিপে থানা থেকে দ্রুত কেটে পড়তে বলল। সেদিন আপনি চিৎকার করে বললেন রাইফেলটি ছাড়া জেলখানা থেকে এক পা-ও নড়বেন না। তাই একপ্রকার বলপ্রয়োগ করে তারা আপনাকে বের করে দিল। কিন্তু রাতে গায়ের জোর খাটিয়ে ফিরে এসে রাইফেলটা তো উদ্ধার করলেনই, সঙ্গে থানা থেকে লুট করে আনলেন দেখে দেখে আরও তিনটে। সেই রাইফেলগুলো দিয়েই শুরু।

না, আমি এখন শুরুর গল্প পাড়তে চাই না। আমি শুধু আপনাকে মনে করিয়ে দিতে চাই, ফেরারিরা ঘুমায় না। আপনিই বলেছিলেন, কীভাবে আপনি এক চোখ বন্ধ করে ঘুমাতেন, অন্য চোখটা রাখতেন খোলা, সম্ভাব্য বিপদের দিকে তাক করা।

সেই খোলা চোখটা এখন কোথায়? দেখবেন না আমাকে?

আমি কাছে এসে আপনার চোখের পাতা দুটো আলতো করে ধরে খুললাম—একদম সাদা। হায় আল্লাহ, কী সাদা! এতটা অসহ্য সাদা হতে পারে সাদা রঙটা! আমি জানি আপনি তখন দেখেছিলেন আমি আপনাকে খুঁজছি। ওই সাদা চোখ দুটোর ভেতর আমি আপনার সবগুলো ছায়া দেখতে পেলাম। আপনিই না আমাকে বলেছিলেন ওই এক লোকের কথা, যে নিজের ছায়াগুলো সঙ্গে নিয়ে চলাচল করত দূরের ওই পথে পথে? আমি আপনার চোখে এমন এক লোকের ছবি দেখছি—যে না জীবিত, না মৃত।

মরে যাচ্ছেন না কেন আপনি? না না, মরবেন না প্লিজ। আপনি মরে গেলে আমি করব কী? ইঁদুরের মতো এই হাসপাতালেই লুকিয়ে পড়ে থাকব, নাকি দেশ ছেড়ে পাড়ি জমাব অন্য কোথাও?

প্লিজ, না! মৃত্যু আমি ভয় পাই। আমার বুকে কাঁপন ধরায়।

আপনি কি ওই জলপাই বাগানের স্মৃতি ভুলে গেছেন? ওই যে এক নারী আর তিন পুরুষের কথা?

আপনি বলেছিলেন ওই নারী আপনাকে রীতিমতো ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। ‘দুনিয়ার কোনো যুদ্ধে আমি ভয় পাইনি, কিন্তু ওই নারী… ও খোদা! আমার হাঁটু কেমন অবশ হয়ে আসছিল, চেহারাও কাঁপছিল থিরথির করে।

জলপাই গাছের নিচে ঘুমিয়ে আছে একজন মহিলা। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। একরাশ লম্বা চুলে তার শরীর ঢাকা। কাছে গিয়ে একটু ঝুঁকে চুলগুলো সরাতেই দেখি—মহিলাটি মরে শক্ত হয়ে পড়ে আছে। গায়ের ওপর ছড়ানো চুলগুলোর নিচে ছোট্ট একটা মেয়ে, মায়ের বুকের ওপর লেপটে শুয়ে আছে কুণ্ডলী পাকিয়ে। সেদিনই প্রথম দেখেছিলাম মৃত্যু। সঙ্গে সঙ্গে ধড়মড় করে পিছিয়ে এসে একটা সিগারেট ধরিয়ে রোদের মধ্যেই বসে রইলাম। পাশেই দেখি একটু দূরে একটা পাথরের পেছনে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে আরও তিনটে পুরুষ।’

আপনি এদের সাথেই আটকে ছিলেন। সামনে পালানোর কোনো পথ ছিল না। কারণ সেদিন ইসরায়েলি মেশিনগানগুলো বর্ডার টপকে আসা-যাওয়ার চেষ্টারত যাকেই দেখছিল, নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ঝাঁঝরা করে নামিয়ে ফেলছিল। এরাও নিশ্চয় বর্ডার ক্রস করে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছিল। ওদিকে আপনি ততক্ষণে  চুপিসারে ভেতরে গিয়ে আবার ফিরে আসছেন।

বললেন, টানা এক সপ্তাহ তখন শুধু জলপাই খেয়েই বেঁচে ছিলেন। লাঠি দিয়ে জলপাই পিটিয়ে ভেঙে পানিতে ভিজিয়ে রাখতেন, তারপর গিলতেন সেই তিতকুটে স্বাদ।

‘জলপাই আসলে তেতো না। জলপাইয়ের তিতকুটে রেশটা মুখে আর জিভে একটা পাতলা আস্তর ফেলে যায়। কিন্তু মূলত জলপাই কোমল, টাটকা স্বাদের। প্রতিটি জলপাই খাওয়ার পর মুখ ভরে ঢকঢক করে পানি খাওয়ার তৃষ্ণা তৈরি হয়।’

আপনি এদের জন্য কোনো কবর খুঁড়তে পারেননি। দুহাতে খামচে মাটি খুঁড়তে শুরু করেছিলেন, কারণ রাইফেলটা পুঁতে রেখে এসেছিলেন দেইর আল-আসাদ থেকে তিন ঘণ্টা দূরের এক গোপন গুহায়। মাটি খুঁড়লেন, কিন্তু চারজন সংকুলান হওয়ার মতো কবর তৈরি করতে পারলেন না। বাচ্চা মেয়েটার জন্য আলাদা একটা ছোট্ট কবর খুঁড়লেন। তারপর পড়লেন এক দ্বিধায়—ওকে কি মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে দাফন করা ঠিক হবে? শেষপর্যন্ত আর কাউকেই কবর দিলেন না। জলপাইয়ের ডালপালা ভেঙে লাশগুলো ঢেকে দিয়ে ভাবলেন, পরে কোদাল নিয়ে এসে এদের জন্য কবর খুঁড়বেন। জলপাইয়ের ডালপালায় কোনোরকমে ঢেকে দিয়ে আপনি পথ ধরলেন লেবাননের। এরপর বহুবার দেইর আল-আসাদে ফিরে গেছেন, কিন্তু এদের আর কোনো চিহ্নই খুঁজে পাননি।

‘মৃতেরা কথা বলে’, আপনি আমাকে বলেছিলেন।

রাত হলে আপনি তাদের গলার আওয়াজ শুনতে পেতেন, ভয়ে তখন আমূল কুঁকড়ে যেতেন। বলেছিলেন কীভাবে তাদের সাথে ওই সময়গুলো আপনি কাটিয়েছেন, অন্ধকারে তাদের ওই রহস্যময় ফিসফিসানি কীভাবে আপনার চোখের ঘুম কেড়ে নিত রাতের পর রাত। দিনের আলোয় তারা যখন ঘুমাত, শুধু তখনই একটু ঝিমিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু রাত হলে ভয়ে থাকতেন তটস্থ, জেগে জেগে গুনতেন প্রহর।

নাম কী ছিল ওদের?

বলেছিলেন তাদের পকেটে এমন কিছু পাননি, যা দেখে শনাক্ত করা যায় তাদের নাম কিংবা গ্রাম। তাই  আপনার পছন্দমতো কিছু নাম রাখলেন তাদের, তারপর ওদের সঙ্গে একতরফা কথা বলতে শুরু করলেন। আচ্ছা, ছোট্ট মেয়েটার নাম কী ছিল? কী নাম রেখেছিলেন ওর?

আমি এখন আপনার পাশে বসে আছি। এখন রাত্রি। ইলেক্ট্রিসিটি নেই। টিমটিমে মোমবাতির আলোয় আপনার ছায়া কাঁপছে। কিন্তু আপনি চোখ খুলছেন না।

চোখ খুলুন, বলুন—আমার নামটাও কি ভুলে গেছেন? আমি ডক্টর খলিল। আপনিই বলেছিলেন আমাকে নাকি দেখতে অবিকল আপনার প্রথম ছেলে ইবরাহিমের মতো লাগে— যে মারা গেছে। না, আমাকে আপনার ওই ছেলে ভাবুন যে মরেনি। তাহলে একটা চোখও কেন খুলছেন না? আমার দিকে তাকাচ্ছেন না কেন? আমি বড্ড ক্লান্ত, বাবা! এখন থেকে আপনাকে বাবা বলেই ডাকব। নাম ধরে আর ডাকব না।

আপনার নাম কী?

ক্যাম্পে আপনাকে ডাকে আবু সালেম, আইন আল-যাইতুনে আবু ইবরাহিম, দূরের অভিযানে আবু সালেহ, বাব আল-শামসে ইউনুস, দেইর আল-আসাদে ‘অমুক লোক’, পশ্চিম সেক্টরে ইজ্জুদ্দিন। আপনার এত নাম যে, আমি ধাঁধায় পড়ে যাই আপনাকে কী বলে ডাকব।

আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার দিন, আপনার নাম ছিল আবু সালেম। তবে আমি ঠিক নিশ্চিত নই, কারণ প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি আমার ঝাপসা, আপনারও মনে নেই। আপনি আমাকে বলেছিলেন—‘মনে করে দ্যাখ, তুই বয়েজ ক্যাম্পে একদম একা ছিলি।’ মা আমাকে দাদির কাছে রেখে জর্ডান চলে গিয়েছিলেন। তখন আমার মাত্র নয় বছর বয়স। মনে আছে, মা আমার জন্য একটা সাদা কাগজে কীসব যেন হিজিবিজি আঁচড় কেটে রেখে গিয়েছিলেন, যা আমি পড়তে পারিনি। মা তো আর পড়তে লিখতে জানতেন না। মায়ের কথা এখন বড় অস্পষ্টভাবে মনে পড়ে। চোখে ভাসে একজন আপাদমস্তক ভয়-পাওয়া নারীর মুখ—আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছেন, আশেপাশে যাকেই দেখছেন তার দিকেই সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছেন আর ত্রস্ত গলায় বলে উঠছেন, ওরা আমাদেরকেও মেরে ফেলবে ঠিক যেভাবে বাবাকে মেরেছিল। মায়ের চোখের দিকে তাকাতে আমার ভয় হতো। ওই চোখে এমন গভীর কিছু একটা ছিল, যার দিকে সরাসরি তাকানোর সাধ্য আমার ছিল না। ভয় জিনিসটা তো মানুষের চোখেই লুকিয়ে থাকে, বাবা। আমার মা নামের ওই নারীটির চোখে আমি এমন এক ঠান্ডা ভয় দেখেছিলাম, যা থেকে আমি শামসের চোখের দিকে তাকানোর আগ পর্যন্ত কখনো মুক্তি পাইনি।

জানি আপনি হাসবেন, বলবেন, আমি নাকি শামসকে ভালোই বাসিনি। বলবেন আপনাকে আবু সালেম বলে ডাকতে, কারণ ‘সালেম’, যাকে ছুঁতে পারেনি মৃত্যুর হাত; এবং আমাদের কিছুতেই মরা চলবে না।

আপনি নাহিলাকে ডাকতেন উম্মে সালেম বলে। গুহার অন্ধকারে কিংবা জলপাই গাছের নিচে বসে তাকে বলতেন, সে যেন এখন থেকে দ্বিতীয় ছেলের নামেই নিজের পরিচয় দেয়—যে এখন হয়ে গেছে প্রথম ছেলে।

সত্যি বলতে আমি আর মূল সত্যিটা জানি না। আপনি আসলে আমাকে কখনো আপনার গল্পটা বলেননি। এভাবেই বেরিয়ে এসেছে নানা সময়ের টুকরো টুকরো কথায়। চেয়েছিলাম আপনি আমাকে পুরো গল্পটা বলুন, কিন্তু সে কথা আপনার কাছে তোলার সাহস আমার হয়নি। ‘সাহস হয়নি’ বলাটা বোধহয় ঠিক হবে না, বলা উচিত আপনাকে জিজ্ঞেস করার শক্তিই আমি ভেতরে খুঁজে পাইনি; কিংবা হয়তো পাইনি যুতসই কোনো সুযোগ, অথবা এই কাহিনির গুরুত্বই বোধহয় তখন বুঝিনি। কে জানে!

আজ পূর্ণিমা, বাবা। চাঁদ পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আপনাকে বাবা বলি, অথচ আপনি আমার বাবা নন। বলেছিলেন, আপনার ইচ্ছে ছিল সালেম বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হবে, ডাক্তার হবে। কিন্তু পরিস্থিতি—সামরিক শাসন, কারফিউ, হাড়হাভাতে দারিদ্র্য… সব মিলিয়ে পড়াশোনার পাট সে চুকাতে পারেনি। সে হলো এক মেকানিক, এখন দেইর আল-আসাদে তার একটা গ্যারেজ আছে। হিব্রু ও ইংরেজি ভাষাতেও চোস্ত কথা বলতে জানে সে।

আপনি আমাকে বলেছিলেন—ডাক্তার, তুমি আমার ছেলের মতো। তোমার বয়স যখন নয়, অনেকের ভেতর থেকে তোমাকে আমি বেছে নিয়েছিলাম; ভালোবেসেছিলাম। বয়েজ ক্যাম্পের কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে একদিন বললাম তোমাকে আমার কাছে রাখতে চাই, সেই থেকে তুমি হয়ে গেলে আমার ছেলে। তুমি তোমার বাবা-মাকে হারিয়েছ, আমিও হারিয়েছি আমার সন্তানদের। আসো, আমার পুত্র হয়ে যাও!

আপনি আমাকে ডাকতে শুরু করলেন ‘আমার ছেলে ডাক্তার খলিল’ বলে। যদিও আমি ডাক্তার নই আপনি ভালো করেই জানেন। চীনে মাত্র তিন মাসের ট্রেনিং নিলেই কেউ ডাক্তার হয়ে যায় না। জোর করে আমাকে আপনি ক্যাম্পের ডাক্তার বানিয়ে দিলেন, আর বললেন ফেদায়িনদের মতো নাম বদলে নিতে। কিন্তু আমি নাম বদলাইনি। ফেদায়িনরা সব গ্রিক জাহাজে করে চলে গেল, এখানে রয়ে গেলাম শুধু আমি আর আপনি।

যুদ্ধ শেষ হলো, সেইসাথে আমার ডাক্তারিও শেষ হলো। হ্যাঁ, গ্যালিলি হাসপাতালের ডিরেক্টর ডাক্তার আমজাদ অবশ্য আমাকে নার্স হিসেবে কাজ করতে বলেছিলেন। ডাক্তার থেকে নার্স—এটা কে মেনে নেয় বলুন? আমি মুখের ওপর না করে দিলাম। কিন্তু আপনি আমার ঘরে এসে ধমকধামক দিলেন, বললেন এখনই হাসপাতালে গিয়ে যোগ দিতে।

আপনি যখন কথা বলতেন, চোখ দুটো যতটা বড় করা সম্ভব ততটাই বড় করে মেলতেন, কথাগুলো যেন চোখ দিয়েই বেরোত; অনেক উঁচুতে উঠে যেত গলার স্বর। আমি টু শব্দটিও করতাম না। মাথা নিচু করে আড়চোখে আপনার ওই চোখের দিকেই তাকিয়ে থাকতাম, যে চোখ দেখে মনে হতো পৃথিবীর সর্বশেষ প্রান্ত নাগাদ যেন মেলানো।

বয়েজ ক্যাম্পের অফিসে দাঁড়িয়ে আপনি একটা গ্লোব ঘোরাতেন, বনবন করে ঘুরিয়েই চলতেন। তারপর হঠাৎ করেই ভারিক্কি কণ্ঠে থামার হুকুম দিতেন; ছোট্ট বলটা থেমে যেত, আপনি তখন আঙুল নির্দেশ করে বলতেন, ‘ওই যে একর, এখানে তাইরে, সমতলভূমি এতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত, আর এগুলো সব একর জেলার গ্রাম। ওই যে আইন আল-যাইতুন, দেইর আল-আসাদ, আল-বিরওয়া, আল-গাবিসিয়া, আল-কাবরি, তারশিহা, আর ওই তো বাব আল-শামস। বাচ্চারা, আমরা আইন আল-যাইতুনের লোক। আইন আল-যাইতুন ছোট্ট একটা জায়গা, চারপাশ থেকে জড়িয়ে একে আগলে রেখেছে পাহাড়সারি। এসবের ভেতর আইন আল-যাইতুন সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম, কিন্তু ১৯৪৮ সালে ওরা একে ধ্বংস করে দিল, ডিনামাইট দিয়ে বাড়িঘর উড়িয়ে বুলডোজার চালিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিল। তাই আমরা গ্রাম ছেড়ে দেইর আল-আসাদে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি এমন এক জায়গায় একটা গ্রাম গড়েছি, যার ঠিকানা পৃথিবীর কেউ জানে না। পাথরের বুকে একটা গ্রাম। যেখানে সূর্য ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ে।’

ডক্টর আমজাদ বললেন তিনি নিশ্চিত নন। ডাক্তার বলেছেন আমিও বলি—আপনি হয়তো শব্দ শুনতে পান, কিন্তু আমরা কেউ জানি না শব্দগুলো আপনার চেতনায় পৌঁছায়, নাকি স্রেফ কিছু ‘ধ্বনি’ হয়েই থেকে যায়?

ডাক্তার বলেছেন আপনি দেখতে পান না। কিন্তু এর মানে কী সেটা আমি তাকে জিজ্ঞেস করিনি। এর মানে কি আপনি আছেন নিরেট অন্ধকারের ভেতর? অন্ধকার কি বিশেষ কোনো রং? নাকি আপনি রংহীন এক জগতে রয়েছেন? রংহীনতা বা রংয়ের অনুপস্থিতির মানে কী? আপনি কি সাদা ও কালোর সেই ভয়ংকর মিশেলটা দেখতে পাচ্ছেন, যাকে আমরা বলি ধূসর? না অন্যকিছু? রঙ যদি না-ই দেখতে পান, তাহলে তো আপনি অন্ধকারেও নেই। বরং এমন এক জায়গায় আছেন, যা আমাদের সবারই অজানা। অমন অচেনা একটা জায়গা, ভয় করে না আপনার? বুক কাঁপে না?

আপনি বলেছিলেন মৃত্যুকে আপনি ভয় পান না, তবে একবার পেয়েছিলেন, যখন জলপাই বাগানে মৃত লাশগুলোর সঙ্গে আপনার কালযাপন করতে হয়েছিল।

বলেছিলেন, মানুষ আসলে ভয়েই মরে। ভয় হলো এক সুগভীর নিস্তব্ধ পাতাল। আচ্ছা, আপনি কি এখন ওই পাতালেই আছেন? কী দেখেন ওখানে?

‘ব্যাপারটা গাণিতিক, হিসেব সোজা’, বললেন, ‘আমরা ভয় পাই, কারণ আমরা একটা ইল্যুশন তথা বিভ্রমের ভেতর বাঁচি। জীবন এক দীর্ঘ স্বপ্ন বৈ কিছু নয়। মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায়, অথচ তাদের ভয় করা উচিত ছিল জন্মের আগের সময়টাকে। কারণ জন্মের আগে তারা ছিল এক চিরন্তন অন্ধকারের ভেতর। কিন্তু ওই যে ইল্যুশন… ইল্যুশন আমাদের মনে করায় যে, জীবিতরা লাভ করে পূর্ববর্তী সবারই জীবনের উত্তরাধিকার। এজন্য মানুষ ইতিহাসও আবিষ্কার করেছে। আমি কোনো ইন্টেলেকচুয়াল নই, কিন্তু আমি জানি ইতিহাস একটা কারসাজি মাত্র, যাতে মানুষ মনে করে যে, আমরা একদম শুরু থেকেই বেঁচে আছি, আর মৃত মানুষদের আমরা উত্তরাধিকারী। এটা বিভ্রম মাত্র। মানুষ কোনো কিছুর উত্তরাধিকারী হয় না, তার কোনো ইতিহাস থাকে না, কিছু না। জীবন দুই মৃত্যুর মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া একচিলতে পথ মাত্র। আমি দ্বিতীয় মৃত্যু নিয়ে একদমই ভীত নই, কারণ প্রথম মৃত্যুকেও ভয় পাইনি।’

জবাবে আমি বললাম, ‘কিন্তু ইতিহাস তো কোনো বিভ্রম না। তা-ই যদি হয়, তাহলে কেন…’

‘তাহলে কেন কী?’ ভুরু কুঁচকে আপনি জিজ্ঞেস করলেন।

‘তাহলে কেন আমরা লড়াই করি? কেনই বা মরি? ফিলিস্তিন কি আমাদের আত্মবলিদানের যোগ্য নয়? আপনিই আমাকে ইতিহাস শিখিয়েছেন, আর এখন এসে বলছেন, ইতিহাস নাকি ‘মৃত্যু’ এড়ানোর একটা কারসাজি মাত্র!’

সেদিন আমার কথা শুনে আপনি হো হো করে হাসলেন। বললেন, আপনার অন্ধ বাবা শেখ সাহেবও নাকি একই কথা বলতেন আর আমাদের উচিত বড়দের কাছ থেকে শেখা। আমি জানি না, এই আলাপটা আমরা এক বৈঠকেই করে উঠেছিলাম কি না, কারণ আমাদের মধ্যে ওভাবে প্রথাগত কোনো ডিসকাশন হতো না। আমরা শুধু এলোপাতাড়ি কথাবার্তা বলে যেতাম। আপনি আপনার কোনো কথাই শেষ করতেন না। সবসময়ই, কার্যকারণ ও ফলাফলের তোয়াক্কা না করেই এক কথা থেকে লাফিয়ে অন্য কথায় চলে যেতেন। কিন্তু আপনি হাসতেন। এমনভাবে হাসতেন যেন উচ্ছ্বাসে ভেতর থেকে ফেটে পড়ছেন। আপনার ওই হাসি দেখে আমি অবাক হতাম। কারণ এতদিন আমার বদ্ধমূল ধারণা ছিল বীর পুরুষেরা কখনো হাসে না। ক্যাম্পের দেয়ালে ঝোলানো শহিদদের ছবিগুলোর দিকে দেখতাম—তারা কেউ হাসছে না। তাদের মুখগুলো গম্ভীর, থমথমে, কুঞ্চিত, যেন মৃত্যুকে তারা নিজেদের ভেতর আটকে রেখেছে।

কিন্তু আপনি এরকম ছিলেন না।   

আপনি বীর ছিলেন, আবার বীরদের নিয়ে হাসাহাসিও করতেন। আপনার চোখের কোণে যে সূক্ষ্ম ভাঁজগুলো পড়েছিল, সেখানে যেন গড়ে নিয়েছিলেন পাকা ধানের মতো মুঠি মুঠি হাসি ছড়িয়ে দেয়ার একচিলতে উঠোন। আপনি ছিলেন প্রাণ খুলে হাসতে জানা এক বীর। তবু আপনার এবং আপনার বাবার মৃত্যু ও ইতিহাস বিষয়ক এই তত্ত্বে আমি বিশ্বাস করতে পারিনি।

উত্তরে আপনি আমাকে বলেছিলেন—যা পাওয়ার জন্য আমরা বাঁচতে চাই, তার জন্য মরাও যায়।  

‘আমি ওর সাথেই বেঁচেছিলাম, ওর জন্যই বেঁচেছিলাম। ফিলিস্তিন কোনো ইস্যু নয়। হ্যাঁ, এক অর্থে হয়তো তা-ই, কিন্তু আসলে তা নয়। কারণ মাটি কখনো তার জায়গা থেকে সরে যায় না। এই মাটি এখানেই থাকবে। প্রশ্ন এটা না যে, কার দখলে থাকবে। কারণ জমিনকে ‘অধিকার’ করা যায়, এই ভাবনাটাই একটা ভ্রম। মাটির ওপর কারো সত্যিকারের আধিপত্য থাকে না; শেষপর্যন্ত তো এই মাটির ভেতরেই তাকে প্রোথিত হতে হয়। মাটিই সবাইকে অধিকার করে, সবাইকেই টেনে নেয় নিজের ভেতর। আমি ইতিহাসের জন্য লড়াই করিনি, বৎস; আমি লড়াই করেছি এমন এক নারীর জন্য, যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম।’

আপনার ওই কথাগুলো আমি ঠিক অক্ষরে অক্ষরে মনে করতে পারছি না। শব্দগুলো ছিল খুব সহজ, নির্মল, নদীর টলটলে জলের মতো বহমান। আপনি এমনভাবে কথা বলতেন যেন মনেই হতো না কিছু বলছেন, অন্যদিকে আমি যখন বলতাম, মনে হতো খুব সচকিত ভঙ্গিতে বলার কসরত করে যাচ্ছি। কিন্তু গন্ধ নিয়ে আপনি যে কথাটা বলেছিলেন তা আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমরা হাসপাতালের সামনে বসে চা খাচ্ছিলাম। সে ছিল এক মিথ্যে বসন্তের সময়। সেবার ফেব্রুয়ারি মাসেই বসন্ত নেমে এসেছিল। শীতের বুক চিরে অসময়ে সূর্য উঁকি দিয়ে মাটি ও ফুলকে ধোঁকা দিচ্ছিল। ফেব্রুয়ারির চড়া রোদে ভেঙে-চিরে যেতে লাগল হিমায়িত শীত। ক্যাম্পের ভগ্নস্তূপ থেকে লাল সাদা ও হলুদ ফুলগুলো সসংকোচে লাজুক মুখে মাথা উঁকি দিতে লাগল। সেদিন আপনি আমাকে শেখালেন কীভাবে প্রকৃতির ঘ্রাণ নিতে হয়। চায়ের কাপটা একপাশে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বাতাস আর সুবাস টেনে ভরে নিলেন ফুসফুস। গন্ধটা বুকের ভেতর অনেকক্ষণ যাবৎ আটকে রাখলেন, আপনার মুখ লালচে হয়ে উঠতে শুরু করল। এরপর যখন বসলেন, চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বুনো থাইম, জুঁই, ব্ল্যাকবেরি ও বুনোফুলের গল্প বলতে শুরু করলেন। বলতে বলতে বললেন, নাহিলাও ঠিক এমনই, একেক ঋতুতে একেক রকম ছিল। প্রতি মৌসুমে নানা বন-পাহাড়ের পথ মাড়িয়ে সে আপনার গুহায় আসত নতুন নতুন গন্ধ নিয়ে। তার চুলে, কাপড়ে ও শরীরে লেগে থাকত নির্দিষ্ট সেই ঋতুর বুনো বুনো ঘ্রাণ। সে যখন তার লম্বা কালো চুলগুলো ছড়িয়ে দিত, ওই চুলে লেগে থাকা বুনোফুল আর লতাপাতার ঘ্রাণে মুহূর্তেই ভরে যেত পুরো গুহার বাতাস। বলেছিলেন, প্রতিবার এসব নতুন নতুন সুবাসে জাদুমুগ্ধের মতোই আপনি মোহিত হতেন, পুলকিত হতেন, প্রতিবারই মনে হতো যেন সম্পূর্ণ অন্য একজন নারী হয়ে উঠেছে সে।

‘বাছা, নারী সবসময়ই নতুন। তার শরীরের ঘ্রাণই তোমাকে চিনিয়ে দেবে তার লক্ষণ ও অন্তর্গত প্রতিকৃতি। নারী হলো পৃথিবীর সুবাস। তার সঙ্গে থেকেই আমি ফুসফুস ভরে ভূমির ঘ্রাণ নিতে শিখেছিলাম।’

সেদিন আমি বুঝেছিলাম তার মৃত্যু নিয়ে আপনি আমাকে কী বলতে চেয়েছিলেন—নাহিলা মরেনি, কারণ আপনার বুকের ভেতর এখনো রয়ে গেছে তার সুবাস। কিন্তু উম্মে হাসান তো মারা গেছেন। আমার সঙ্গে তার জানাজায় আপনি যাবেন না? নাজি ছাড়া ক্যাম্পের সব লোকই এখন তার বাড়িতে এসে জড়ো হয়েছে। নাজি এখন আমেরিকায়, জানেনই তো। আমাকে যেতেই হবে। আমি উম্মে হাসানের খাটিয়া কাঁধে বহন করতে চাই। আজ আমার মনে কোনো ভয় নেই। কারও তোয়াক্কা করি না। দয়া করে উঠুন, চলুন উম্মে হাসানের জানাজায় যাই। তারপর নাহয় আপনি সন্তানদের কাছে ফিরে গিয়ে ওখানেই মরলেন। যান, উম্মে হাসানের কথামতো ওদের কাছে গিয়েই মরুন, আমাকে মুক্তি দিন।

উম্মে হাসানের কথা মনে আছে?

উম্মে হাসান ছিলেন চিকিৎসাবিদ্যায় আমার শিক্ষক। হ্যাঁ, শিক্ষক। আমি তখন হাসপাতালে, এমন সময় একটা ডেলিভারির কেস আসে। এর আগে কখনো আমি কোনো নারীকে বাচ্চা প্রসব করতে দেখিনি। চীনে আমাদের শুধু ক্ষতস্থানে ড্রেসিং করা আর ছোটখাট কিছু অস্ত্রোপচার করতে শিখিয়েছিল, যাকে বলে ‘ফিল্ড মেডিসিন’—যুদ্ধক্ষেত্র বা জরুরি পরিস্থিতির চিকিৎসা। কিন্তু আসল চিকিৎসাবিদ্যা তো আমাদের শেখানো হয়নি।

মহিলাটি আমার সামনে যন্ত্রণায় ছটফট করছিল, আমি কিছুই করতে পারছিলাম না। তখনই আমার মনে পড়ল উম্মে হাসানের কথা। তাকে ডেকে পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি হাজির। তিনিই সব সামলালেন। দক্ষ হাতে পরিচালনা করলেন সন্তান জন্মদানের পুরো প্রক্রিয়া, পাশাপাশি আমাকে সবকিছু শেখালেন। প্রসবের কাজে সাহায্য করার সময় তিনি এমনভাবে সবকিছু আমাকে ব্যাখ্যা করছিলেন, যেন কোনো অভিজ্ঞ চিকিৎসক তাঁর ছাত্রদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। সেদিন থেকেই আমি কাজটা শিখে যাই, এবং নিজের ওপর এতটা ভরসা জন্মায় যে, তখন থেকে নিজেই বাচ্চা ডেলিভারি করাতে শুরু করি। কিন্তু পুরো কৃতিত্ব তার। কুওয়াইকাত গ্রামের একমাত্র লিগ্যাল লাইসেন্সধারী ধাত্রী ছিলেন এই উম্মে হাসান৷ তার কাছে ব্রিটিশ আমলের সার্টিফিকেটও ছিল। এ তার যোগ্যতারই পরিচায়ক।

এ মুহূর্তে তাকেই দেখতে পাচ্ছি।

মাথায় অ্যালুমিনিয়ামের গামলা নিয়ে জলপাই বাগানের ভেতর নিচু হয়ে শিশুদের কুড়িয়ে কুড়িয়ে তুলছেন। আসলে তিনি শুধু নাজিকেই কুড়িয়ে পেয়েছিলেন, যে পরে তার সন্তান হয়ে ওঠে। আপনাকে গল্পটা বলেছিলাম, মনে নেই? কুওয়াইকাত গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়ে তারা তখন ফিলিস্তিনের ভেতরেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছেন। দিকভ্রান্তের মতো চষে বেড়াচ্ছেন ধূলি-কাদা-কঙ্করময় মাঠঘাট জমিজমা। ঘুরতে ঘুরতে দেইর আল-ক্বাসির উপকণ্ঠে এসে উঠলেন। এখান থেকেও তাদের তাড়িয়ে দিলে পাড়ি জমালেন তারশিহায়। কিন্তু ইসরায়েলি বিমানবাহিনী এসে তারশিহাও পুড়িয়ে ছাই করে দিল। শেষমেশ তারা দক্ষিণ লেবাননের পথে পা বাড়ালেন। সেখানে কানা গ্রাম ছিল তাদের প্রথম গন্তব্য।

এই যাত্রাপথেই সারা আল-খাতিব নামে এক নারী বাচ্চা প্রসব করেন। উম্মে হাসান তখন তার পাশেই ছিলেন। একদিকে লোকজন মাথায় গাঁটরি-বোঁচকা নিয়ে দিগ্বিদিক ছুটছে, অন্যদিকে একটা গাছের তলায় লুটিয়ে পড়ে যন্ত্রণায় সারা কাতরাচ্ছে। উম্মে হাসান গরম পানি দিয়ে শিশুটিকে ধুয়ে পুরোনো কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে মায়ের কোলে তুলে দিলেন।

সবাই তখন চলেছে তাদের শেষযাত্রায়। গ্যালিলির গ্রামগুলোর লোকেরা লেবাননের উদ্দেশে তাদের এই গণ-হিজরতকে এভাবেই আখ্যা দিয়েছিল—আখেরি সফর, শেষযাত্রা। কিন্তু এ আসলে তাদের আখেরি সফর ছিল না, বরং ছিল এমন এক গন্তব্যহীন যাত্রার শুরু, যার শেষ কোথায় একমাত্র খোদা তায়ালাই জানেন।

সেই শেষযাত্রায় উম্মে হাসান যখন সেই গামলা মাথায় নিয়ে হাঁটছিলেন—পাশে তার চার ছেলেমেয়ে, স্বামী, দেবরকুল ও তাদের পরিবার—তখন এক জলপাই গাছের নিচে পুরোনো কাপড়ের একটা পোঁটলা পড়ে থাকতে দেখলেন। খেয়াল করে দেখলেন, এই কাপড় দিয়েই তো তিনি সারার বাচ্চা মুড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ঝুঁকে কাপড়ে মোড়ানো বাচ্চাটি তুলে নিলেন, মাথার ওপর রাখলেন গামলাটির ভেতর। এরপর তার নাম দিলেন নাজি—উদ্ধারপ্রাপ্ত। বাচ্চাটার মুখে গুঁজে দিলেন নিজের শুকিয়ে যাওয়া স্তন, তারপর পানিতে ময়দা গুলে তাকে খাওয়ালেন। কানা গ্রামে প্রথমবার যাত্রাবিরতি করতেই শিশুটির মা কোনদিক থেকে যেন এসে কাঁদতে কাঁদতে নিজের বাচ্চা ফেরত চাইল। উম্মে হাসান প্রথমে মানলেন না। কিন্তু পরে যখন দেখলেন, সারার স্তন উপচে পড়া দুধে ছোপ-ছোপ দাগে তার জামা ভিজে যাচ্ছে,  তখনই কেবল বাচ্চাটি ফেরত দিলেন।

কিন্তু কড়া গলায় বলে দিলেন, তিনি ছেলেটির নাম রেখেছেন নাজি, এই নাম বদলানোর অধিকার তার মায়ের নেই। সারা ঘাড় কাত করে সায় দিল। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে দুধ খাওয়াতে খাওয়াতে সে চলে গেল।

‘নাজিই আমার একমাত্র বেঁচে-থাকা সন্তান, উম্মে হাসান গর্ব করে বললেন, ‘সে আমাকে আমেরিকা থেকে চিঠি লেখে। আল্লাহ ওর মঙ্গল করুক। ওখানকার এক সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়েছে। ওখান থেকে সে আমার জন্য টাকা পাঠায়, আমি এখান থেকে ওর জন্য পাঠাই জলপাইয়ের তেল।’

আমি দেখতে পাই, উম্মে হাসান গামলা মাথায় হেঁটে হেঁটে বাচ্চা কুড়িয়ে তুলছেন; যেন আমাকেই তিনি কুড়িয়ে পেয়েছিলেন, আমিই যেন সেই নাজি। সেই পানিতে গোলা ময়দার স্বাদ এখনো যেন আমার মুখে লেগে আছে। জানি না, খোদার কসম, আমি কিছুই জানি না। উম্মে হাসান আজ সকালে মারা গেছেন। জোহরের নামাজের পরপর তাকে দাফন করতে হবে। অথচ আপনি এমনভাবে ঘুমিয়ে আছেন, যেন জানেনই না এই নারীর মৃত্যু আমার জন্য, আপনার জন্য, ক্যাম্পের সব মানুষের জন্য কী মানে রাখে।

উম্মে হাসান আমাকে ফিলিস্তিন সম্পর্কে সবই বলেছিলেন। তিনি যখন তার ভাইকে দেখতে কুওয়াইকাত কিংবা কুওয়াইকাতের ভগ্নাবশেষের ভেতর যাচ্ছিলেন, তখন মসজিদের কাছে কুলগাছের একটা ডালে আমার তরফে একফালি কাপড় বেঁধে দিয়ে আসতে আল-গাবিসিয়া গ্রাম হয়ে তাকে যেতে বলেছিলাম। বলেছিলাম এ আমার বাবার মানত। মানত পূরণের আগেই বাবা মারা গেছেন; কিন্তু মৃত্যুর আগে বলে গেছেন মাকে। মা আবার আমাকে বলে গেছেন আম্মানে তার আত্মীয়দের কাছে চলে যাওয়ার আগে। কিন্তু আমি নিজে কখনো যাইনি, আপনাকেও বলতে সাহস হয়নি। ভয় ছিল, আপনি হয়তো আমাকে এবং বাবার এই কুসংস্কার নিয়ে ঠাট্টা করবেন। উম্মে হাসানকে বলেছিলাম, তিনি যেন সেখানকার মসজিদে গিয়ে দুরাকাত নামাজ পড়ে কুলগাছের ডালে কালো কাপড়ের একটি ফিতে বেঁধে দেন, আমার পক্ষ থেকে জ্বালিয়ে দেন দুটি মোমবাতি।

ফিরে এসে আমাকে তিনি সতেজ কমলালেবুর ভারে নুয়ে পড়া একটি ডাল উপহার দিলেন। বললেন মসজিদে নামাজ পড়েছেন।

‘গরু-বাছুর রাখলে কি মসজিদ অপবিত্র হয়ে যায় না?’ উম্মে হাসান এই প্রশ্ন নিজেকে করেননি। তিনি আল-গাবিসিয়ার মসজিদে গিয়ে ঢুকেছেন—গরু-বকরিতে ভরা চতুর্দিক—সেই পশুর পাল সব তাড়িয়েছেন, অজু করে পবিত্র হয়ে নামাজ পড়েছেন। তারপর বেরিয়ে এসে পাশের কুলগাছে কালো একটি ফিতে বেঁধে দিয়ে নিচে জ্বেলেছেন দুটো মোমবাতি।

তিনি বলেছিলেন, গাছটা নাকি এরকম অসংখ্য কাপড়ের টুকরোয় ভরতি হয়ে আছে।

‘বুঝি না বাবা, তোমাদের গ্রামটি পরিত্যক্ত। চারদিকে খাঁ খাঁ শূন্যতা। রাস্তাগুলো হারিয়ে গেছে। বাড়িঘর ভাঙা নয় কিন্তু ধীরে ধীরে ধসে পড়ার উপক্রম; ভগ্নস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ধুঁকছে ক্রমাগত। জানি না মানুষ ছেড়ে গেলে বাড়িগুলো কেন এমন হয়ে যায়। পরিত্যক্ত বাড়ি পরিত্যক্ত নারীর মতো, কুঁকড়ে নিজের মধ্যে সেঁধিয়ে যায়, যেন ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়বে যখন-তখন। তোমাদের গ্রামে জীবনের কোনো চিহ্ন নেই। তবে পাশাপাশি ওই কুলগাছ আর মসজিদটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে। গাছের ডালে বাঁধা অসংখ্য কাপড়ের ফালি, নিচে চারদিকে অনেকদূর পর্যন্ত গড়িয়ে যাওয়া গলা মোমের দাগ।’

উম্মে হাসান বললেন আমার চাচা শেখ আজিজ আইয়ুবের কথা শুনে তিনি নাকি গাছটা দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন; মানুষজন জানিয়েছিল চাচাকে এই গাছের নিচেই কীভাবে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু যখন গাছটার কাছাকাছি গেলেন, ভেতরে এক অদ্ভুত বিগলিত ভাব কাজ করল। হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন, বাষ্পরুদ্ধ হয়ে কাঁদলেন, মোমবাতি জ্বাললেন।

তিনি বলেছেন মৃতদের আত্মায় ভারী হয়ে ওঠা গাছের ডালপালার খসখস শব্দ তিনি শুনেছেন। ‘মৃতদের আত্মারা গাছেদের মাঝে বাস করে,’ বললেন, ‘আমাদের সবার ফিরে যাওয়া উচিত, ফিরে গিয়ে গাছগুলো এমনভাবে ঝাঁকানো উচিত, যাতে আত্মাগুলো ঝরে পড়ে নিজেদের কবরে শান্তি পায়।’

ফিলিস্তিনের কমলার স্বাদ নেওয়ার জন্য আমি যখন ডাল থেকে একটা কমলা ছিঁড়তে গেলাম, উম্মে হাসান চিৎকার করে উঠলেন, ‘না, খাওয়ার জন্য না। এটা ফিলিস্তিন।’ আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম, অগত্যা বসার ঘরের দেয়ালে সযত্নে ঝুলিয়ে রাখলাম ডালটা। পরে যখন আপনি একদিন এসে ছাতাপড়া ওই নষ্ট ডালটা দেখলেন, মুখ বিকৃত করে চিৎকার করে উঠলেন : ‘এ কীসের গন্ধ?’ আমি আপনাকে সবটা খুলে বললাম, দেখলাম কথাগুলো শেষ করতে না করতেই রাগে আপনি ফেটে পড়ছেন।

‘তোমার উচিত ছিল কমলাগুলো খেয়ে ফেলা’, আপনি বললেন।

‘কিন্তু উম্মে হাসান আমাকে বারণ করেছেন। বলেছেন এগুলো মাতৃভূমির অংশ।’

‘উম্মে হাসানকে বুড়ো বয়সের ভীমরতিতে পেয়েছে,’ জবাবে আপনি বললেন, ‘তোমার কমলাগুলো খেয়ে ফেলা উচিত ছিল, কারণ মাতৃভূমিকে আমাদের গ্রাস করতে হবে, মাতৃভূমি যেন আমাদের গ্রাস করতে না পারে। এ হতে দেয়া যাবে না। ফিলিস্তিনের কমলালেবু আমাদের খেয়ে ফেলতে হবে, ফিলিস্তিন ও গ্যালিলিকেও খেয়ে ফেলতে হবে।’

তখন মনে হলো আপনিই ঠিক বলছেন। কিন্তু কমলালেবুর ডালে ততদিনে পচন ধরেছে। আপনি দেয়ালের কাছে গিয়ে ডালটা টেনে নামালেন, আপনার হাত থেকে নিয়ে আমি হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, বুঝতে পারছিলাম না এই একগাদা দুর্গন্ধময় পচা উপহার নিয়ে আমি কী করব?

‘এখন কী করবে এটা দিয়ে?’ আপনি জিজ্ঞেস করলেন।

‘মাটির নিচে পুঁতে রাখব।’

‘পুঁতে রাখবে কেন?’

‘এটা তো আমি ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারি না, এ আমার মাতৃভূমির জিনিস।’

আপনি আমার হাত থেকে ডালটা ছিনিয়ে নিয়ে আবর্জনায় ছুঁড়ে ফেলে দিলেন।

‘ছি! ছি!’ লজ্জা হওয়া উচিত। এসব কুসংস্কার কেবল বুড়িদের মুখেই মানায়। স্বদেশকে দেয়ালের গায়ে ঝুলিয়ে না রেখে বরং ওই দেয়ালটাই ভেঙে বেরিয়ে পড়ো! পৃথিবীর সব কমলালেবু আমাদের খেয়ে ফেলতে হবে, নির্ভয়ে, নিঃশঙ্ক চিত্তে। আমাদের মাতৃভূমি ওই কয়েকটা কমলালেবু না, আমরাই আমাদের মাতৃভূমি।’

উম্মে হাসান আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমার সঙ্গে যাবেন না? গ্যালিলি সফরে গিয়ে আল-কুওয়াইকাত গ্রামে উম্মে হাসান কী করেছিলেন তা আর বলব না। আমার এখন তাড়া আছে।   

উঠুন জনাব! ভারী যন্ত্রণার লোক তো আপনি! আমাকে ক্লান্তই করে দিলেন। মহিলাটা মারা গেছেন, সবাই এখন তার বাড়িতে। হাসপাতালের দেয়াল ভেদ করে আসা কান্নার শব্দও শোনা যাচ্ছে। অথচ আপনি কিছুই শুনতে পাচ্ছেন না।

আসবেন না? ঠিক আছে, একাই যাব। কিন্তু বলুন তো, আপনাকে কেন এরকম সাদা চাদরে মোড়ানো ছোট্ট শিশুটির মতো লাগছে? গত তিনমাস ধরে দেখছি আপনি দিনদিন ছোট হয়ে যাচ্ছেন। ও খোদা! আপনি যদি মরার আগে একটিবার নিজেকে দেখতে পেতেন! বড় আফসোস, কী ঘটছে আপনি জানলেনই না, দেখলেনই না কী রকম হয়ে যায় মানুষ। মানুষ তো মরে না, বরং সে যেখান থেকে এসেছে সেখানেই ফিরে যায়। ভাবতাম, কবিরা বোধহয় মিথ্যা বলেন যখন তারা লেখেন যে, মানুষ মূলত পৃথিবীর ‘গর্ভাশয়ে’ ফিরে যায়। না, তারা মোটেও মিথ্যা বলেন না। কারণ মরার আগে মানুষ আবার শিশু হয়ে যায়। শিশুরাই মরে, সব মৃত্যুই শিশুর মৃত্যু। মায়ের গর্ভ খুঁজতে থাকা এইসব শিশুরা ভ্রুণের মতো কেমন গুটিয়ে যায়। এই যে দেখেন, আপনি আবার শিশু হয়ে যাচ্ছেন, নিজের ভেতরে নিজে গুটিয়ে আছেন, অথচ দেখতেই পাচ্ছেন না। একবার যদি দেখতে পেতেন!

আপনার কথা ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছি না। এভাবে বিড়বিড় করছেন কেন? বাঁ হাতটা নাড়াচ্ছেন কেন এভাবে? চাইছেন নাহিলার গল্প বলি? সে গল্প আপনি জানেন। আজকের পর তার গল্প আর কোনোদিন বলব না। আপনি কি নিজেকে কোনো প্রেমকাহিনীর নায়ক ভাবছেন? নিজের অন্য বীরত্বগুলোর কথা ভুলে গেলেন কেন? নাকি সেগুলো কোনো বীরোচিত ব্যাপার ছিল না? আপনি বলেছিলেন, ‘মানুষ মনে করে যোদ্ধারা বীর; কিন্তু সত্য নয়। মানুষ যুদ্ধ করে ঠিক যেভাবে সে শ্বাস নেয়, খাবার খায় কিংবা শৌচাগারে যায়। যুদ্ধ বিশেষ কিছু নয়। যোদ্ধা হতে স্রেফ যুদ্ধ করলেই চলে। বীরত্ব অন্য জিনিস। বীরত্ব বলে কিছু নেই। এমনকি সাহসও কোনো শাশ্বত মূল্যবোধ নয়, একজন সাহসী যেকোনো সময় কাপুরুষ হয়ে যেতে পারে, কাপুরুষও হয়ে যেতে পারে সাহসী। আসল কথা হলো…’

‘আসল কথা হলো’ পর্যন্ত এসে আপনি থেমে গেলেন। কথাটা আর শেষ করলেন না।

সেদিন আপনাকে জিজ্ঞেস করিনি আসল কথাটা আসলে কী। কী জবাব দেবেন জানতাম, তাই নতুন করে শুনতে চাইনি। এখন কি চাইছেন গল্প শোনাই? না, বলব না। আজ আর না, আজ আমার কাজ আছে। একটু দয়া করুন, উঠুন, আমাকে মুক্তি দিন। দোহাই, মুক্তি দিন আমাকে। আমি বড়ই ক্লান্ত।

সবকিছুতে ক্লান্ত। আপনার এই অসুখ, আপনার করুণ চেহারা, ঘাড়ের ওপর ঝুলতে থাকা ওই শিশুর মতো গোল মুখটি দেখতে দেখতে ক্লান্ত। আপনার জন্য নামাজ আর দোয়া করতে করতে ক্লান্ত।

আপনি জানেন আমি নামাজ পড়ি?

দাদি বলতেন, নামাজ হলো আমাদের আকুতিভরা শব্দগুলো জমিনের ওপর জায়নামাজের মতো বিছিয়ে দেওয়া। আমি আমার শব্দগুলো বিছিয়ে দিচ্ছি, এর ওপর দিয়ে যেন আপনি হেঁটে আসতে পারেন…

তবে কেন আপনি উঠছেন না?

চলবে…

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *