হাসান মাহমুদের কবিতাগুচ্ছ

হুর

তুমি পদ্মরাগ তুমি সৌন্দর্যের স্বীকৃত প্রবাল।

মোতির গাঁথুনিতে যে তাঁবু সেথায় তোমার

আবাসন—

যে বৃক্ষের ছায়ায় একশো বছর সওয়ারি হয়েও

উৎরাতে পারব না বৃক্ষছায়াকে; কী সুন্দর হবে

সেই সজীবতা হে চিরসবুজ!

তুমি আছো নন্দিত আবরণে রক্ষিত মোতির মতো,

তুমি আছো এমন উদ্যানে; যেখানে আছে কাঁটাবিহীন কুলবৃক্ষ, আছে সমস্ত ফলের সমাহার!

তুমি আছো সেখানটায়, যেখানে কোনো কিছু নিষিদ্ধ নয়!

চিরকুমারী, কামিনী তুমি থাকবে সেজে সমুন্নত শয্যায়—

তোমার পাশ ঘিরে বয়ে যাবে প্রবাহিত পানি;

এমন মিঠা পানি আর নেই যে কোথাও!

এমনও সৌন্দর্যে নন্দিত আছো তুমি; যে চক্ষু

আজও দেখেনি তোমায়—

কোনো কান শোনেনি তোমার মধুর গান!

তোমার সৌন্দর্যের নন্দন কত সুন্দর হবে

কোনো ধারণা জন্মেনি আজও কারও মনে—

তোমার অবয়ব পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল

কিবা আরও প্রোজ্জ্বল!

তোমায় নিয়ে বেড়াব নহরে নহরে; দুধের নহরে

সাঁতরে যাব মধুর নহর ছুঁতে—

শরাবের নহরে শরাবের পেয়ালে হাতে

গাইব মহীয়ানের চিরন্তন গান।

যে শরাবে থাকবে না মৌতাত এই শরাব পান

করব দুজনে মিলে!

তোমার শরীরের শ্বেতবিন্দু ঘাম মেশকের মতো সুগন্ধিতে ছুঁয়ে যাবে আমার হৃদয়—

তোমার অধিক সৌন্দর্যে মাংস ভেদ করে হাড়ের ভেতরের মজ্জা দেখা যাবে;

আমরা তখন একমনে একপ্রাণে কাটিয়ে দেব

অনন্ত জীবন।

তোমার বাসনকোসন হবে সোনা ও রূপার—

সেই সোনা-রূপার থালায় আমায় খেতে দেবে!

তোমার চিরুনি হবে স্বর্ণের, আংটি হবে

মুক্তার, সমস্ত সৌন্দর্যে চিকচিক করবে

সেসমস্ত তোমার ব্যবহৃত অলংকার।

চিকন, পুরু রেশমি কাপড় পরে মুখোমুখি হবে

আমার!

আবরিত মোতির মতো থাকবে তুমি রক্ষিতা।

তোমার রূপরং চারবর্ণে করবে চিরসুন্দর—

তোমার নন্দিত রং সাদা, হলদে, সবুজ ও লাল।

তোমার রূপ ও রং অথই মাধুকরী—

তোমার দেহে আছে জাফরান, মৃগনাভি, আম্বর,

আছে কাফুর!

তোমার লবঙ্গের কেশ অথই ঘ্রাণ ছড়াবে আমার মনে—

আমার বুকে আর তোমারও তাই, স্বাক্ষর থাকবে মহামহিমের নাম;

থাকবে লেখা তোমার আমার নাম!

সমস্ত আনন্দের পর থাকবে তোমার আমার হাতে দশটি করে স্বর্ণের কাঁকন—

আরও থাকবে চরণে চরণে জহরতের নূপুর।

শামসে তাবরিজি

উর্মিয়া হ্রদের তীর বেয়ে মিনারের মতো দাঁড়িয়ে প্রাচীন তাবরিজ। এখানে গালিচা বিছিয়ে ইশকের মজমা

বসেছে শামসে তাবরিজির বুকে—

হস্তশিল্পের নন্দনে বুনা দরবেশীয় পশমি পোশাক তাবরিজের; তাঁর বুকে পরমের বন্দনা।

নিঃসীম অন্ধকারে আলোর রশ্মি ফুটে মরমিয়া—

তাবরিজের মনে ইশকের আগুন।

তাঁর আগুন কে পোহাবে? তাকে কে দেবে একটু স্বস্তি?

ইশক কেবল জ্বালায়, পোড়ায়, কাঁদায়, হাসায়, ভাবনার অথই সমুদ্দুরে ভাসায়।

মানুষ সৃষ্টির মহত্ত্ব কী? কী তার রহস্য?

অন্তর্লোকের পরম গভীরতা এ যেন পিরামিডের মতোই দুর্বোধ্য—

তাবরিজ, তাবরিজ, সে তো প্রেমের রহস্য খোঁজে;

মানুষ যেন প্রেমের গুহায় বন্দি!

পৃথিবীর পরতে পরতে জটিলতায় ভরপুর—

মানুষ যেন স্বর্গ থেকে নির্বাসিত হয়েছে তার রুহের

ভ্রমণ তাড়নায়!

মানুষের চিরকালীন সঞ্চয়, চিরায়ত প্রেম-বিরহ, স্মৃতি-বিস্মৃতি প্রবুদ্ধ রেখেছে অদৃশ্য প্রেম—

মানুষের জন্য মানুষ হব কে করে এই প্রতিজ্ঞা?

এই প্রশ্নের রেশ ধরে দৃশ্যমান হন রুমি—

তবে কী হৃদয়ের গুপ্ত ধন বন্ধক দেয়া যায় তাকে?

তাবরিজের আকুতি—

ও রুমি তুমি প্রলুব্ধ করেছ সামসে তাবরিজির হৃদয়;

আমার প্রেমে পুড়ছ দেখো তোমার অনাগত মসনভি!

কবিতার ইলহাম

আমার মস্তকে তারকা আপেলের দুরঙা পাতার ছায়া যেন অশ্বত্থের মতো ছায়াদার—

অশ্বত্থের নিচে আমি হামাগুড়ি খাই :

অশীতিপর

সেই বৃক্ষে

বৃষ্টিভেজা জল

জলটুপটুপ।

পিতামহ,

পিতামহী;

শাদা পোশাকে সজ্জিত।

যেন বেহেশত থেকে নেমে আসা নতুন দম্পতি—

পানমুখি ঠোঁটে জপছে তারা প্রেমের তসবিদানা :

সেই তসবিদানায় গোলাপের মতো ফুটছে

একের পর এক কবিতা…

আমি নীরব

নির্বাক,

ঘুম ভেঙে পাই কবিতার ইলহাম—

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *