রুপালি হুকের টান

মাঘের ম্লান বিকেলে কুয়াশার চাদর যখন জানলার আধভাঙা কপাটে এসে মিশে যাচ্ছিল, নিরার মনে হচ্ছিল এই বুঝি সেই পরিচিত শীতল হাত, আবার তার কাঁধে ভর করেছে। সন্তর্পণে ভরসা হচ্ছে, আদর, আবেগ আর মায়াময়তায়।

‎নিরার কোলের ওপর শ্বেতশুভ্র সুতোর পাহাড়। বাইরে একটা নিমগ্ন কুয়াশাপাত, আর নিরার ডান হাতের আঙুলে ধরা পুরানো রুপালি হুক। কুশিকাটার সুঁই। নিরা যখন কুশিকাটায় ঘর তোলে, তখন তার চারপাশের জগত মায়াবী কুহকে বিলীন হয়ে যায়। নিরা আজকাল বুননশিল্পীর চেয়েও সুতোর প্রতিটা লুপে সময় আর গল্পস্মৃতি গেঁথে রাখা জাদুকর হয়ে উঠেছে।

‎বাইরে শিমুল গাছের তলায় ঝরা পাতার মড়মড় শব্দে কারও পায়ের আওয়াজ শোনা যায়। বাতাসের ঝাপটায় ঘরের ভেতর ধূপের মায়াবী গন্ধ আর পুরানো পাণ্ডুলিপির সোঁদা ঘ্রাণ মিলেমিশে অদ্ভুত গুমোট আবহ তৈরি করেছে। নিরা একটা ‘স্লিপ নট’ (slip knot) তৈরি করে প্রথম ঘরটা তুলল কেবল। স্লিপ নটে সুতো দিয়ে একটি ফাঁস তৈরি করে তার ভেতর দিয়ে হুকটি গলিয়ে দেওয়া হয়। একে টেনে ছোট-বড় করা যায়। সুতোটা অবাধ্য শ্বেত-সাপিনীর মতো তার আঙুলে পেঁচিয়ে আছে। এই সুতোর শুভ্রতা দেখলেই নিরার বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠে। ঠিক এই রঙের একটা জামদানি পরেই তার বড় আপা শেষবার পুকুরঘাটে গিয়েছিল। এর পর থেকেই নিরার জগতে বিচ্ছেদের ধলপহর।

‎‘নিরা, যে সুতো দিয়ে তুই জাল বুনছিস, জানিস তো এর পেছনে কত তৃষ্ণা আর কত হাহাকার লুকিয়ে আছে?’

নিরা মাথা তুলল। দরজার পাল্লা ধরে দাঁড়িয়ে আছে অপু, তার ভগ্নিপতি। এই গ্রামের জমিদার বংশের শেষ বাতি, যার চোখের মণি দুটো বিড়ালের মতো কটা আর রহস্যময়। নিরা হাসল না, তার চোখের মোহনীয় কাজলজুড়ে বৈরাগ্যের স্থিরতা। সে হাতের রুপালি হুকটা দিয়ে একটা ‘চেইন স্টিচ’ (chain stitch) টেনে আনল। হুকের মাথায় সুতো পেঁচিয়ে আগের ফাঁসের ভেতর দিয়ে টেনে আনলে একটা শিকল বা চেইন তৈরি হয়। একেকটা বুনন যেন নিরার একেকটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে বসছে, বড় আপার স্মৃতি থেকে ছিঁড়ে আনা কারুকার্য হয়ে শোভিত হচ্ছে।

‎সে ধীর, গম্ভীর স্বরে বলল, ‘তৃষ্ণা তো থাকবেই অপু। যে শিল্পের জন্ম হয়েছিলো গির্জার কনকনে ঠান্ডা আর কনভেন্টের নিস্তব্ধতায়, তাতে তো একটু নির্জনতা থাকবেই। ষোড়শ শতাব্দীতে সন্ন্যাসিনীরা যখন তাদের সাদা লেইস বুনতেন, তখন তারা প্রতিটা ঘরে নিজেদের আজন্ম একাকিত্বকে গেঁথে রাখতেন। একে তখন বলা হতো নানের কাজ (Nun’s work)।’

নিরা একটু থামল। তার আঙুলের ডগায় হুকটা এক মুহূর্ত স্থির। সে আবার বলতে শুরু করল, ‘আমার বোনটাও অনেকটা ঐ সন্ন্যাসিনীদের মতোই ছিলো অপু। একা, মৌনী। তার হাতের কুশিকাটার শেষ ঘরটা আজও অসম্পূর্ণ পড়ে আছে। সে কি জানত, জীবনের নকশাটাও এত দ্রুত মাঝপথে ছিঁড়ে যাবে? বিচ্ছেদ তো আর বলে-কয়ে আসে না, ওটা আসে ঐ জানলার কুয়াশার মতো। নিরবে, সবটুকু ঢেকে দিতে।’

‎অপু ভেতরে এসে বসল। তার হাতের আঙুলগুলো অস্থিরভাবে টেবিলের উপর তবলার মতো বাজছে। নিরা নির্বিকার। সে এখন ডাবল ক্রোশে (double crochet) দিয়ে একটা গোলাপের নকশা তুলছে। এটা বুননকে দ্রুত উচ্চতা দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত একটা ঘর। এতে হুকের ওপর একবার সুতো পেঁচিয়ে নিচের ঘরে ঢোকানো হয় এবং দুই ধাপে সুতো টেনে বের করে আনা হয়। এটা বেশ ঘন এবং মজবুত হয়। সাদা সুতোর অরণ্যে গোলাপ ফুটে উঠছে ঠিকই, কিন্তু নিরার মনে হচ্ছে সে যেন বড় আপার না বলা কথাগুলোকে পাপড়ি করে যত্নে সাজিয়ে তুলছে।

‎অপু নিরার এই নিরাসক্ত কণ্ঠস্বরে সামান্য কুঁকড়ে গেল। নিরা হাতের হুকটা খানিক অদ্ভুত ছন্দে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, ‘তুমি কি জানো অপু, কুশিকাটার সবচেয়ে বড় বেদনা কোথায়? এর পুরো বুননটা টিকে থাকে একটা মাত্র সুতোর ওপর। সেই সুতোটা যদি একবার হালকা হয়ে যায়, তবে পুরো সৃষ্টিটাই বেকার। মানুষের জীবনটাও তাই—একেকটা ঘর, মানে একেকটা সম্পর্ক, একেকটা বন্ধন। বড় আপা চলে যাওয়ার পর আমার মনে হয়, আমাদের সংসারের শেষ ঘরটা কেউ একজন নিষ্ঠুরভাবে ভেঙে দিয়েছে। ছিঁড়ে দিয়েছে আমাদের মায়ার শেষ বুননটুকু।’

‎জানলার বাইরে শিমুল গাছটা এখন সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঘেরা। নিরা তার বুনন থামাল না। আঙুলের রুপালি হুক অন্ধকারের বুক চিরে সুতো টেনে আনছে। বিচ্ছেদের যে বিষাদমাখা সুর, যেন তা কুশিকাটার প্রতিটা ছিদ্র চিরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে। অপুর কটা চোখ তখন স্তব্ধ, আর নিরার হাতের বুনন গম্ভীর রহস্যের আকার নিচ্ছে।

‎নিরা এবার খানিক থামল। রুপালি হুকটা বাতাসের বুকে অদৃশ্য বৃত্ত এঁকে আবার সুতোর গভীরে ডুব দিল। জানলার বাইরে কুয়াশার ঘনত্ব বেড়েছে, শিমুল গাছটার কঙ্কালসার ডালগুলো যেন অন্ধকারের আঙুল হয়ে আকাশের দিকে ইশারা করছে। ঘরের ভেতরের ধূপের ধোঁয়াটা এখন কুণ্ডলী পাকিয়ে ছাদের দিকে উঠছে, যেন কোনো অতৃপ্ত, অপূর্ণ আত্মার দীর্ঘশ্বাস।

‎নিরা বলতে লাগল, ‘কিন্তু অপু, কুশিকাটার আসল ইতিহাস তো ফুলের নকশায় নাই। সেটা লিখা আছে লোনা চোখের জলে। আঠারোশো পঁয়তাল্লিশের আইরিশ দুর্ভিক্ষের কথা জানো? যখন আইরিশ মায়েদের ঘরে এক মুঠো আটার সংস্থান ছিল না, সন্তানদের ক্ষুধার্ত হাহাকার যখন চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তুলত, তখন তারা এই কুশিকাটা নিয়ে বসেছিলেন। একে তখন বলা হতো ফ্যামিন লেইস (Famine Lace)। তারা জানতেন, এই লুপগুলো যদি ঠিকঠাক না বাঁধে, তবে তাদের সন্তানদের পেট ভরবে না। একেকটা নকশা ছিলো একেকটা রুটির দাম, একেকটা ঘর ছিল জীবন আর মরণের মধ্যবর্তী এক চিলতে সেতু।’

‎অপু এবার নড়েচড়ে বসল। কাঠের চেয়ারটা কর্কশ শব্দ করলো। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, অল্প আলোয় সেগুলো হীরের দানার মতো চকচক করছে। গলা পরিষ্কার করে বলল, ‘তুই কি সেই দুর্ভিক্ষের নকশাই বুনছিস নিরা?’

‎নিরার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষণ্ণ তবে হিমশীতল হাসি ফুটলো। সে হাসিতে না ছিল কোনো আনন্দ, না ছিল মমতা।

‎‘নাহ অপু, আমি বুনছি বিচারের নকশা। তুমি জানো, কুশিকাটার সবচেয়ে গূঢ় সৌন্দর্য কী? এটা একটা অবিচ্ছিন্ন সুতো, এক চিরস্থায়ী শৃঙ্খল। যদি কোথাও বুননে ভুল হয়, তবে পুরোটাই ধুলিস্মাৎ হয়ে যেতে পারে মুহূর্তেই। কিন্তু যদি একবার ফিনিশ স্টিচ(finish stitch) বা শেষ ঘরটা বুনে দেওয়া হয়, তবে সেই বাঁধন খোলা খোদ শিল্পীর পক্ষেও অসম্ভব।’

‎নিরা মগ্ন হাতে বুনেই যাচ্ছে পপকর্ন স্টিচ (popcorn stitch)। একই জায়গায় ৪-৫টা ডাবল ক্রোশে বুনে সেগুলোকে একত্রে একটা লুপ দিয়ে টেনে ধরা হয়। এতে সুতোর বুননটি ফুলে ওঠে। সাদা সুতোর গায়ে ছোট ছোট গুটির মতো দানাগুলো ফুটে উঠছে, যেন কোনো অভিশাপের লিপি লিখিত হচ্ছে। নিরা সুতোটা এবার এমনভাবে আঙুলে পেঁচিয়ে টান দিল, মনে হলো কোনো অদৃশ্য প্রাণীর কণ্ঠনালি নিপুণ হাতে চেপে ধরেছে সে।

নিরা তার কণ্ঠস্বরকে আরও নিচু, আরও গম্ভীর করে বলল, ‘অপু, আমার বড় আপা যখন ওই শ্যাওলাধরা পুকুরঘাটে নিথর হয়ে পড়ে ছিল, লোকে বলেছিল সে পা পিছলে ডুবে গেছে। কিন্তু তার শক্ত হয়ে যাওয়া মুঠোয় এক টুকরো রেশমি সুতো পাওয়া গিয়েছিল। ঠিক এই কুশিকাটার হুক দিয়ে তোলা একটা অসমাপ্ত নকশাই। আপা কোন নকশাই অসম্পূর্ণ রাখত না। লোকে যা-ই বলুক, আমি জানি, সুতো কখনো মিথ্যে বলে না। সুতো প্রতারণা চেনে, ঘাতকতা চেনে।’

‎অপুর মুখটা এবার শরতের মেঘের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে উঠে দাঁড়ানোর একটা ব্যর্থ চেষ্টা করল, কিন্তু মেঝের ওপর ছড়িয়ে থাকা নিরার শুভ্র সুতোর স্তূপ যেন জ্যান্ত হয়ে উঠল। শ্বেত-সর্পিল সেই সুতোর জাল লতাগুল্মের মতো অপুর পায়ের গোড়ালি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।

নিরা খুবই শান্ত গলায়, ফিসফিস করে বলল, ‘তুমি সেদিন ওর গলায় যে লেইসটা পরিয়ে দিয়েছিলে অপু, তুমি ভেবেছিলে ওটা শুধুই অলংকার? না, ওটা ছিল ফাঁসের শুরু। তুমি জানো না অপু, কুশিকাটার জ্যামিতি কত নিষ্ঠুর হতে পারে। সুতোর একেকটা প্যাঁচ যখন আমার আপার গলার চামড়ায় বসে যায়, তখন আপার শব্দরা আর বাইরে আসার পথ পায়নি। আমি সেই পথই বুনেছি এযাবত।’

‎অপু তোতলাতে শুরু করল। তার চোখ দুটো ভয়ে কাঁপছে, ‘নিরা… তুই… তুই ভুল ভাবছিস…’

নিরার হাতের রুপালি হুক তখন অন্ধকারের বুক চিরে এক মায়াবী ঝিলিক দিল। সে এবার তার বুননের শেষ ঘরটির দিকে এগিয়ে গেল।

‎নিরা তার হুক দিয়ে একটা চূড়ান্ত লুপ তৈরি করল। সে ধীরলয়ে উঠে দাঁড়াল। জানলার ওপাশে টিমটিমে চেরাগের আলোয় তার দীর্ঘ ছায়া দেয়ালে আছড়ে পড়েছে; সেই ছায়ায় তাকে কোনো রক্তমাংসের মানবী মনে হচ্ছে না এখন, একজন প্রাচীন ও ক্রুদ্ধ দেবীর অবয়ব ফুটে উঠছিল যেন।

‎নিরা আচমকাই চোখ বুজে তার ডান হাতের রুপালি হুকটা দিয়ে শূন্যে একটা অবিনশ্বর টান দিল। অপু এক বীভৎস আর্তনাদ করে নিজের গলায় হাত রাখলো। সেখানে চাক্ষুষ কোনো বন্ধন নেই, কোনো দৃশ্যমান রশি নেই; কিন্তু অপুর মনে হলো অদৃশ্য, বরফশীতল সুতো তার শ্বাসনালিকে কুশিকাটার জটিল ‘চেইন স্টিচ’-এর মতো বুনে ফেলছে। তার চোখদুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল, সামান্য বাতাসের জন্য তার ছটফটানি ঘরের গুমোট নিস্তব্ধতাকে চিরে খানখান করে দিল।

‎নিরা পরম মমতায় তার হাতের কুশিকাটাটি পুরানো মেহগনি টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। সুতোর শেষ মাথাটি সে অভিশপ্ত ও অমোঘ স্লিপ স্টিচ (slip stitch) দিয়ে চিরতরে বন্ধ করে দিল। এটা বুননের সবচেয়ে ছোট এবং অদৃশ্য প্রায় ঘর। সাধারণত একটা রাউন্ড বা নকশা শেষ করে অন্য প্রান্তের সাথে জোড়া দেওয়ার জন্য এটা ব্যবহার হয়। এতে কোনো নতুন উচ্চতা তৈরি হয় না, শুধু সুতোকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় আটকে দেওয়া হয়। এক অদৃশ্য টানে অপুর অস্তিত্বের শেষ সুতোটুকুও যেন স্টিচের নিচে চাপা পড়ল।

‎বাইরে তখন আকাশ ভেঙে ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে। মাঘের হিমেল বৃষ্টি আর মেঠো পথের কর্দমাক্ত ঘ্রাণে অপুর জীবনের শেষ গোঙানিটুকু অবলীলায় চাপা পড়ে গেল। প্রকৃতি যেন একটা বিশাল যবনিকা টেনে দিল এই বিভীষিকার ওপর। নিরা জানলার বাইরে তাকাল। অন্ধকার ধানক্ষেতে বৃষ্টির অবিরত নাচন দেখা যাচ্ছে—যেন হাজার হাজার রুপালি হুক আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে মাটির বুকে। নিরার অন্তরের দহন এখন প্রশান্তিতে, তৃপ্তিতে রুপ নিয়েছে। ‎সে আবার তার পুরানো মোড়ায় গিয়ে বসল।

‎টেবিলের ওপর পড়ে থাকা রুপালি হুকটা এখন শান্ত প্রদীপের শিখার মতো স্থির, নিষ্কম্প। নিরার জীবনের এই মহাকাব্যিক বুনন আজ একরকম অলৌকিক পূর্ণতা পেল। যেখানে তার বোনা নকশা ছিল এক একটা গোপন সত্যের সাক্ষী, আর হুকের প্রতিটা টান ছিল এক একটা বিচার। নিরা বুনতে শুরু করল, তার আঙুলের ডগায় জীবন-মৃত্যু-বিচার যেন চিরন্তন আলপনায় মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *