দুই পৃথিবীর সূর্য : একই দ্রোহের দুই আখ্যান

সাব্বির জাদিদের নতুন উপন্যাসটা পড়লাম। পড়তে গিয়া শুরুতে আমার খুব কষ্ট হইছে। প্রথম ৫০ পেইজ পড়তে গিয়া মনে হইছে এই বই পড়া মানে আমার নিজের ওপর অত্যাচার করা! মানে জনপ্রিয় ধারার বই এখন আর পড়া হয় না। ২০০/২৫০ পেইজের একটা উপন্যাস পড়া তো এই সময় কঠিন কাজই। এই বই পড়তে গিয়া অন্তত তিনবার বইটা আর পড়ব না বইলা রাইখা দিছি। মনে হইছে—এইটা আমার টাইপের বই না! মনে হচ্ছিল, কিশোরদের জন্য লেখা উপন্যাস। বহু কষ্টে নিজেকে বুঝায়া শেষ পর্যন্ত পড়ছি। 

পড়া শেষে মনে হইছে, যতটা খারাপ ভাবছিলাম ততটাও খারাপ না! মানে শেষ না কইরা মন্তব্য করাটা অন্যায় হইত। ‘বইটা কেন খারাপ না’—সেইটা নিয়াই কথা বলা দরকার। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ আর ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে এক সুতায় বাঁধার একটা চেষ্টা করছেন লেখক। সেই চেষ্টাটা সফল হইছে না ব্যর্থ হইছে, সেইসবই বলার কৌশিশ করব।

গল্প নিয়ে

এই বইয়ের সব থেকে শক্তিশালী দিক গল্প। আবার দুর্বলতাও গল্পই। সংক্ষেপে আগে গল্পটা বইলা নেই। 

গল্পটা একটা পরিবারের। মুক্তিযোদ্ধা দাদা মতিউরের গল্প। যুদ্ধশিশু সালেহার সংকীর্ণ সামাজিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা, বিয়া এবং সংসারের গল্প। জুলাই শহীদ তামিমের বেড়ে ওঠা এবং প্রতিবাদী হয়ে ওঠার গল্প। 

সেই পরিবারের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তি মতিউর মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক সাহসিকতা দেখানোর জন্য পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক তার বউ রহিতন ধর্ষিত হয়। রহিতনের গর্ভে জন্ম নেয় যুদ্ধশিশু সালেহা। তাকে বড় করতে সামাজিক যেইসব ঝামেলা হওয়ার কথা সবই হয়। ২৭ বছর বয়সে সালেহার বিয়ে হয় এক প্রগতিশীল গবেষকের সাথে। সে স্কুল শিক্ষকও। সেই গবেষক কুষ্টিয়ার বীরাঙ্গনাদের নিয়া কাজ করতে গিয়া এই পরিবারের খোঁজ পায় এবং সালেহাকে বিয়া করে। সালেহা এই শর্তে বিয়া বসে যে বিয়ার পরে তাদের সাথে পরিবারের আর কোনো যোগাযোগ থাকবে না। কারণ সে কলঙ্কটা আর ছড়াইতে চায় না। 

এইদিকে মতিউর যেদিন মারা যায় সেদিনই তার ছেলে আজিজুরের বউয়ের গর্ভে আসে উপন্যাসের প্রটাগনিস্ট তামিম। উপন্যাস শুরু হয় তামিম আর তার ছোট বোন তামিমার পাখির বাসা ঘিরা খুনসুটি দিয়া। তামিম নামের সেই কিশোরের হাসিনার আমলে যুবক হয়ে ওঠা, স্কুল থেকে কলেজে যাওয়া, কলেজ শেষ করে ভার্সিটিতে পড়তে ঢাকায় পাড়ি জমায়। 

তামিমের ব্যক্তিত্ব গঠনে এবং প্রতিবাদে বড় ভূমিকা রাখছে তার মুক্তিযুদ্ধের পারিবারিক ইতিহাস। বড় হওয়ার পরে নাতি আর মৃত দাদার ভেতর একটা অলৌকিক যোগাযোগ তৈরি হয়। যেইটা উপন্যাসে যেমন পাঠকেরও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। কিন্তু আমরা সেইটাকে সিম্বলিক অর্থেই রিড করতে চাই। সেই যোগাযোগ থেকেই দাদার সমস্ত কিছু জেনে যায় নাতি। প্রায় প্রতিদিন তাদের কথা হয়। দেখাও হয়।

কলেজে পড়তে গিয়া সেই ফুফার সাথে পরিচয় হয় তামিমের। আস্তে আস্তে ফুপু এবং তার পরিবারে সম্পর্ক জোড়া লাগাতে ঘটকালি করে তামিম। 

এদিকে ভার্সিটিতে উঠলে দেশে জুলাই আন্দোলন শুরু হয়। তামিম আন্দোলনে যোগ দিলে ছাত্রলীগের হাতে খুন হয়। ফ্যাসিবাদের প্রতিবাদে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রলীগের হাতে তামিমের শহিদ হওয়ার ভেতর দিয়া উপন্যাসটা শেষ হইছে।

বইটা পড়ার পেছনের একটা বড় কারণ ছিল গল্প। আবার বিভিন্ন জায়গায় গল্পের গরু গাছে ওঠায়, পড়া চালায়া যাওয়া কঠিন হয়া পড়তেছিল। 

বিশেষ করে ঘুমন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর মতিউরের মহিষগুলার আক্রমণ।  

আরেক জায়গায় মতিউরের বিয়ার দিন। বাসর রাইতে বউ জেদ ধরে মহিষকে সালাম করবে! কারণ মহিষের কারণেই তাদের বিয়া হইছে। মহিষই তাদের ঘটক! এত ন্যাকামি সহ্য করা সত্যিই কঠিন!

এক পরিবারে এতগুলা ঘটনা এবং দুর্ঘটনার পজিবিলিটিস নিয়াও সন্দেহ হইতেছিল। অসম্ভব না। কিন্তু সহজও না।যাইহোক।

গল্প বলার সময়, গল্পের মোড়গুলা হুটহাট আইসা পড়ছে। গল্পের যে মজা সেইটা নিতে দেন নাই লেখক।

লেখার ধরন

‘দুই পৃথিবীর সূর্য’ আসলে কোন ধরনের উপন্যাস? এইটাকে কি শুধু একটা মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলব? নাকি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ডকুমেন্টারি?

আমার কাছে মনে হইছে, লেখক এই বইয়ে একটা ‘পলিটিক্যাল ফ্যান্টাসি’ তৈরি করছেন। বইটার একদিকে আছে, মুক্তিযুদ্ধের সেইসব আগুনঝড়া দিন, অন্যদিকে আছে মহিষ ও সজারুর অলৌকিক আচরণ। একদিকে আছে শেখ হাসিনার আমলের সেই রূঢ় বাস্তবতা, অন্যায়-অত্যাচার আর জুলাইয়ের রক্তঝরা দিন—আবার অন্যদিকে আছে দাদা আর নাতির সেই অলৌকিক যোগাযোগ, যা অনেকটা ফ্যান্টাসির মতো। 

সহজ করে বললে, এইটাকে আমি বলব একটা ‘উত্তরাধিকারের রাজনীতি’ বা ‘জেনারেশনাল পলিটিক্যাল ফিকশন’। যেখানে ১৯৭১-এর অসমাপ্ত স্বপ্ন আর ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার লড়াই এক বিন্দুতে আইসা মিলে গেছে। লেখক এখানে দেখাতে চাইছেন, জেনারেশন গ্যাপ থাকলেও লড়াইয়ের চেতনাটা আসলে একই। তাই দুই পৃথিবীর সূর্য আমাদের সময়ের একটা ভালো রাজনৈতিক দলিল।

ন্যারেটিভ টেকনিক

উপন্যাসের বর্ণনাভঙ্গিতে তেমন কোনো নতুনত্ব নাই। লেখকের ভূমিকা থার্ড পারসন অমনিসিয়েন্ট। লেখক কখনো কখনো সরাসরি পাঠকের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন। যেইটা তারাশঙ্কর, শওকত আলী-সহ বহু লেখককে করতে দেখছি। বর্ণনার টোনটার ভেতর ফ্রেন্ডলি একটা ভাব আছে। কখনো কখনো মনে হইতে পারে ফেসবুক পোস্ট পড়তেছি। মানে সমসাময়িক যেই পাঞ্চলাইনগুলা আছে, উপন্যাসেও তা ঢুইকা পড়ছে। আরেকটা ব্যাপার আছে। সাব্বির জাদিদ এক জায়গায় ক্যারেক্টারকে নিজের পাঠক হিসাবে দেখাইছেন। এই জিনিসটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প উপন্যাসে দেখছি। 

লেখক সেইসব ব্যবহারের স্বাধীনতা নিতেই পারেন। কিন্তু একজন পাঠক হিসাবে এই সরাসরি যোগাযোগ খুব একটা পছন্দ করি না আমি।

লেখার ভাষা

উপন্যাসের ভাষা মোটামুটি ভালো। একটানে পড়া যায়। লেখক যে প্রচুর কবিতা পড়েন, বিশেষ করে জীবনানন্দ দাশের, সেইটার চিহ্ন ধরা পড়ছে ভাষায়। বিভিন্ন জায়গায় চমৎকার উপমা ব্যবহার করছেন। যদিও কয়েক জায়গায় এমন সব উপমা দিছেন যে অবস্থার সাথে তা মানানসই হয় নাই। বিরক্তি উৎপাদন করছে।

অতি আবেগ তৈরির চেষ্টা করছেন জায়গায় জায়গায়। সেইসব আবেগ কখনো কখনো রিয়েলিস্টিক লাগলেও অনেক সময় হাস্যকর মনে হইছে, অতি নাটকীয় লাগছে, বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় নাই। জোর করে কান্দানোর চেষ্টা মনে হইছে।

লেখকের প্রকল্প

সাব্বির জাদিদ মূলত জনপ্রিয় ধারার লেখক। তিনি কওমি মাদরাসায় পড়াশোনা করে কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিছেন। তার কিছু গল্প আগে পড়া ছিল। ১০/১২ বছর আগে ২টা উপন্যাসও পড়ছিলাম। নতুন কোনো উপন্যাস আমার পড়া হয় নাই। লেখক আমাকে ভালো পাঠক মনে করেন। সেজন্য উপন্যাসটা আমাকে পড়তে পাঠাইছেন। উপন্যাসটা শেষ করার এইটাও একটা কারণ।

উপন্যাসটা পড়ার পর মনে হইল, লেখক উপন্যাসে অনেক ইসলামী অবজেক্ট ঢুকাইছেন। সাধারণত, বাংলাদেশের মূল ধারার সাহিত্যে এই জিনিস দেখা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস হইলে তো আরও না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক যেইসব উপন্যাস লেখা হইছে, মোটাদাগে ধর্মপ্রাণ মানুষকে রাজাকার বা মানবতার শত্রু, দেশের শত্রু দেখানোর চেষ্টা করা হইছে। সেইখানে সাব্বির জাদিদ ব্যতিক্রম দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করলেন। ‘দুই পৃথিবীর সূর্য’ উপন্যাসে তিনি দেখাইছেন, একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক বা মুক্তিযোদ্ধা একইসাথে একজন ধর্মপ্রাণ মানুষও হইতে পারেন। 

এখানে প্রটাগনিস্ট তামিমের দাদা মতিউর—যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং তামিমের সেই রহস্যময় ‘গার্ডিয়ান এঞ্জেল’—তাকে এবং তামিমের মা’কে লেখক বেশ ইসলামি মনোভাবাপন্ন হিসেবে দেখাইছেন। এই চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে লেখক হয়তো একটা বড় বার্তা দিতে চাইছেন যে, আমাদের আত্মপরিচয় বা লড়াইয়ের চেতনার সাথে ধর্মের কোনো মৌলিক বিরোধ নাই। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানে আমরা দেখেছি কীভাবে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ থেকে শুরু করে মাদরাসার ছাত্ররা পর্যন্ত সামনের কাতারে আইসা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াইছে। লেখক হয়তো সেই রিয়ালিটিটাই সাহিত্যে ধরতে চাইছেন—যেখানে টুপি-দাড়ি বা তসবিহ হাতে থাকা মানুষটাও ইনসাফ আর স্বাধীনতার লড়াইয়ে সমানভাবে অংশীদার। এইটা বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে পলিটিক্যাল ফিকশনে একটা নতুন ডাইমেনশন যোগ করছে। 

যদিও জায়গায় জায়গায় বর্ণনা আর উপমার ভেতর দিয়াও ইসলামিকরণের একটা চেষ্টা চোখে পড়ছে। যেইটা উপন্যাস পড়ার গতিতে বাধা দিছে। আরোপিত মনে হইছে। লেখায় সেইসবের ব্যবহার উপকারের বদলে ক্ষতি করার আশঙ্কাই বেশি দেখি। সব ধরনের পাঠকের জন্য সেইটা সুখকর হবে না বলেই মনে করি।  

অনেক সংস্কৃত শব্দও ব্যবহার করছেন। যেইগুলা হিন্দুয়ানি শব্দ বইলা চিহ্নিত। সেইদিক থেকে একটা ব্যালেন্স হইছে।

চরিত্র নির্মাণ

চরিত্র গঠনে লেখক খারাপ করছেন সেইটা বলার সুযোগ নাই। 

প্রথমে বলি মুক্তিযোদ্ধা মতিউরের কথা। মুক্তিযোদ্ধা মতিউরকে একজন দেশপ্রেমী আদর্শ মুসলমান হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করছেন। সেই চেষ্টাকে আমি সফল বলতে চাই। তবে একজন মানুষের এতটা ভালো হওয়াটা সম্ভব কিনা আমার জানা নাই। বিশেষ করে ওইরকম গ্রামে ১৯৭১ সালে এতটা উদার, উচ্চশিক্ষিত না হয়াও এতটা মহৎ হইতে পারাটা আসলে অবিশ্বাস্য ব্যাপারই। যদিও একজন মুসলমান হিসাবে সেইটা অসম্ভবও না। 

অন্যদিকে তামিমের চরিত্রটা একরোখা, সৎ, সাহসী, বুদ্ধিদীপ্ত। তামিমের বাইড়া ওঠা এবং তার রাজনৈতিক বিবর্তনটা আমার কাছে খুব বিশ্বাসযোগ্য লাগছে। ২০১৮ সালে রাতের ভোটের নির্বাচনে সে ধাক্কা খায় এবং আওয়ামী লীগের প্রতি তার যে একটা টান ছিল সেইটা নাই হয়া যায়। আস্তে আস্তে প্রতিবাদী হয়া ওঠে তামিম। চরিত্রের এই পরিবর্তন বিশ্বাসযোগ্য। এইরকম কোটি কোটি মানুষ আছে আমাদের দেশে। তার ভেতর আমিও একজন। তামিমকে দাদার মতো ধর্মপ্রাণ দেখান নাই লেখক। আবার ধর্মবিরোধীও দেখান নাই। চেনাজানা আর ১০জন স্বাভাবিক বাংলাদেশি যুবকের মতোই। সেই হিসাবে তামিমের চরিত্রটাকে আমি পছন্দই করি। কিন্তু দাদার মতোই তারও চরিত্রে কোনো দাগ না রাখার ঘটনা, বা গ্রে এরিয়া না থাকাটা ভাবনার বিষয়। একজন মানুষ কখনোই ১০০% ভালো হইতে পারে না। মানবিক দুর্বলতা থাকেই। একদম নিখুঁত মানুষ তো হয় না। তাদের সিদ্ধান্তে ভুল হয়। আচরণে ভুল হয়। সেইসব না রাখাটা লেখকের দুর্বলতা হিসাবেই দেখতে চাই। চরিত্র নিয়া আরও কাজের সুযোগ ছিল বলে মনে করি। 

মূল ভাব

আমাদের মনে থাকার কথা—উপন্যাসের নাম দুই পৃথিবীর সূর্য। ১৯৭১ সালের দাদা মতিউরের মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ওঠার গল্প, আর ২০২৪ সালে নাতি তামিমের জুলাই যোদ্ধা হয়ে ওঠার গল্প। উপন্যাসের মূল মেসেজটা নামের ভেতরেই লুকায়া আছে। আলাদা দুইটা চরিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দুইটা সময়কে দেখাইছেন লেখক। সেই চরিত্র দুইটাকে সূর্য বা আদর্শ পুরুষ হিসাবে পেইন্ট করছেন। 

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মৃত্যুর পর জুলাই অভ্যুত্থান ঘটে। ফলে লেখকের একটা ইনটেনশন থাকতে পারে যে মুক্তিযুদ্ধ যেখান থেকে শেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেইখান থেকেই শুরু। 

উপন্যাসে ‘বিজ্ঞান’ বা ‘যুক্তি’র চাইতে ‘প্রতীকবাদ’ (Symbolism) বেশি প্রাধান্য পাইছে। দাদার মৃত্যু আর নাতির জন্ম একই দিনে হওয়া—সাহিত্যে একটা পরিচিত কৌশল। এইটা বোঝায় যে, বিপ্লব বা মুক্তিপাগল সত্তার কোনো মরণ নাই। ১৯৭১ সালের অসমাপ্ত স্বপ্ন বা আকাঙ্ক্ষা ২০২৪-এর ‘জুলাই অভ্যুত্থানে’ নাতির মাধ্যমে পুনর্জন্ম নিছে। এখানে নাতি ও দাদার কথোপকথন আসলে দুই প্রজন্মের লড়াইয়ের মেলবন্ধন। এইটা বোঝায় যে, লক্ষ্য একই—শোষণমুক্তি।

দাদার আত্মার সাথে নাতির যোগাযোগ হওয়াটা উপন্যাসে ‘ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা’ হিসেবে কাজ করছে। অনেক সময় নতুন প্রজন্ম ইতিহাস ভুলে যায়। কিন্তু এখানে দাদা সরাসরি নাতিকে গাইড করছেন। 

এই প্লটটার মাধ্যমে লেখক একটা সাহসী দাবি করছেন যে, ‘মুক্তিযোদ্ধা’ এবং ‘জুলাই যোদ্ধা’ আলাদা কেউ নয়; তারা একই আদর্শের দুইটা ভিন্ন সময়ের রূপ।

মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা অর্থাৎ সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার, যখন ধূলিসাৎ হচ্ছিল, ঠিক তখনই জুলাই যোদ্ধাদের আবির্ভাব হয়। দাদার সাথে নাতির কথা হওয়া মানে হলো—পুরানা প্রজন্মের ভুলগুলা সংশোধন করে নতুন প্রজন্মের আগায়া যাওয়া।

লেখকের এই বর্ণনাটা কিছুটা ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’-এর মতো মনে হয়। একজন আলেম সাহিত্যিকের লেখার কারণে এবং লেখায় প্রচুর ইসলামি এলিমেন্টের কারণে ইলহাম আর কাশফের কথা মনে হইলেও চরিত্র যেহেতু সুফি দরবেশ কেউ না, কাজেই সেইটা হওয়ার চান্স খুবই কম।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখকের দায় ও দরদ এই উপন্যাসে যেভাবে ধরা পড়ছে তাতে প্রমাণিত যে, এই দেশের আলেম সমাজ অর্থাৎ কওমি ঘরানার মানুষজন মুক্তিযুদ্ধকে কতটা ওউন করে। উনি নিজে একজন আলেম। দুই পৃথিবীর সূর্য আমাদের বার্তা দেয়, কওমি মাদরাসার ছাত্র ও হুজুররা ধর্মকে যেভাবে লালন করে, বাংলাদেশপ্রেমও সেভাবেই ধারণ করে। কারণ বাংলাদেশপন্থা তাদের কাছে ইবাদত।

ব্যক্তিগত মন্তব্য 

২০২৫ সালে প্রকাশিত আরও দুইটা উপন্যাস আমি পড়ছি এবং পাঠকের কাঠগড়া থেকে রিভিউ করছি। একটা হইল ওয়াসি আহমেদের ‘কার্পাসমহল’। আরেকটা রায়হান রাইনের ‘একটি বিষণ্ন রাইফেল’। কার্পাসমহলে জুলাই গণঅভ্যুত্থান আসছে। কিন্তু জুলাই নিয়া হতাশা ব্যক্ত করা হইছে। 

একটি বিষণ্ন রাইফেলেও হতাশা ব্যক্ত করা হইছে। তবে সেইখানে কিছুটা বাস্তবতার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করা হইছে। রায়হান রাইনের উপন্যাসের সাথে দুই পৃথিবীর সূর্যের একটা ভালো মিল হইল, দুইটা উপন্যাসেই মুক্তিযুদ্ধ জুলাই অভ্যুত্থানে শক্তি জোগাইছে। প্রেরণা হিসাবে কাজ করছে। 

তবে সাব্বির জাদিদের এই উপন্যাস অন্য দুইটা উপন্যাসের থেকে ভিন্ন এই জায়গায় যে, এই উপন্যাস জুলাইকে ওউন করতে পারছে। প্রশ্ন ছাড়া। হতাশা ছাড়া। এই দিক থেকে এইটা ভালো। 

ভাষা ও জনপ্রিয় হয়া ওঠার খায়েশের জন্য পাঠক সমালোচকরা এই বইকে মূল ধারার সাহিত্যে জায়গা দিবে কিনা সেইটা নিয়া বাহাস হইতে পারে। তবে টেক্সট আর ভাবের কারণে বইটা গুরুত্ব আদায় করে নিবে, সেই ব্যাপারে সন্দেহ না রাখাই ভালো।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *