চেয়ার কাঁধে মহামহিম সম্রাট

হাশরের দিন… এক ভয়ংকর নৈঃশব্দ্য আর থমথমে স্থবিরতা!

কোনো স্বৈরশাসক বা কায়সারের অস্তিত্ব নেই আজ, নেই কোনো সুলতান, রাজা বা রাজপুত্র। নেই কোনো ব্যাংক, শেয়ারবাজার, কারেন্সি এক্সচেঞ্জ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। নেই কোনো ক্লাব, স্টেডিয়াম কিংবা বিনোদনকেন্দ্র; নেই কোনো গান বা মিউজিক ভিডিও। আজ নেই কোনো রাজনীতিক কিংবা রাজনীতি; নেই কোনো স্যাটেলাইট চ্যানেল বা রেডিও স্টেশন। নেই কোনো বাগ্মী বক্তা কিংবা মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা। মানবাধিকার বা প্রাণী অধিকার রক্ষার কোনো সংগঠনও আজ নেই। নেই গাড়ি, সাইকেল, ঘোড়া, খচ্চর, গাধা, এমনকি কোনো ‘টুকটুক’ (অটোরিকশা) বা রাজপথ। হাইপার মার্কেট, সুপার মার্কেট কিংবা রাস্তার ধারের সিগারেটের টংদোকান, সাঁজোয়া যান, ট্যাংক, যুদ্ধবিমান, কুঁড়েঘর, খুপরি কিংবা আকাশচুম্বী অট্টালিকা—কিছুই নেই! কিচ্ছু নেই… কিচ্ছু না!

আর হঠাৎ!

এক ভয়ংকর, প্রকম্পিত ফুৎকার! এমন এক আওয়াজ, যার কোনো তুলনা নেই, কোনো দৃষ্টান্ত নেই!

সেই সুউচ্চ নিনাদ অনন্ত মহাবিশ্ব আর বিশাল শূন্যতায় প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সেই প্রবল পরাক্রমশালী ফুৎকার—যাকে রুখে দেওয়ার কেউ নেই—আছড়ে পড়ল সবকিছুর ওপর। সমস্ত প্রাণী, সমস্ত সৃষ্টি, আর যা কিছু লুক্কায়িত, প্রোথিত বা সঞ্চিত ছিল—সবকিছুর ওপর। ছিন্নভিন্ন ও বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া অংশগুলো কাছাকাছি আসতে শুরু করল। অণু-পরমাণু, ভস্মীভূত, খণ্ডিত, ভক্ষিত বা হজম হয়ে যাওয়া অংশ, হিংস্র প্রাণীর পেটে যাওয়া দেহ, সাগরের অথৈ জলে হারিয়ে যাওয়া বা বিশাল ঢেউয়ের নিচে তলিয়ে যাওয়া অবশিষ্টাংশ, বাতাসে উড়ে যাওয়া ধূলিকণা, মহাশূন্যে হারিয়ে যাওয়া কিংবা মাটির গভীর স্তরে বিলীন হয়ে যাওয়া সত্তা—সব একীভূত হতে লাগল।

বিলুপ্তি আর শূন্যতার অতল থেকে উঠে এসে সব বস্তু একে অপরের কাছে ভিড়তে লাগল। তারা কাছাকাছি এসে একে অপরকে স্পর্শ করল, জুড়ে গেল এবং মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। পরিণত হলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গে, এরপর পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ও শরীরে। ঠিক আগের মতো সব বৈশিষ্ট্য ও রূপ নিয়ে তারা সম্পূর্ণ ত্রুটিহীন ও অক্ষত অবস্থায় পুনর্গঠিত হলো। যেন তাদের কখনোই পচন ধরেনি, তারা কখনো বিচ্ছিন্ন বা ধ্বংস হয়নি, কিংবা কবরের কীট তাদের ভক্ষণ করেনি। আল্লাহ যেন এইমাত্র তাদের নতুন করে সৃষ্টি করেছেন—ঠিক প্রথম সৃষ্টির মতোই!

তারপর…

তারপর আত্মারা নেমে এলো। প্রতিটি আত্মা তার পুরনো শরীরে প্রবেশ করল, যাকে সে একসময় ছেড়ে গিয়েছিল। না সে তার শরীরকে চিনতে ভুল করল, না সে বিস্মৃত হলো। এক বিশাল প্রান্তরে, বিন্দুমাত্র বিলম্ব বা আলস্য ছাড়াই তারা নিজ নিজ শয্যা (কবর) থেকে উঠে দাঁড়াল। শূন্যতা আর বিলুপ্তির গহ্বর থেকে, মৃত্যুর পর যেখানে তারা শেষবার আশ্রয় নিয়েছিল—সেখান থেকে তারা বেরিয়ে এলো। বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে তারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তাদের চোখেমুখে তীব্র বিস্ময়, দৃষ্টি স্থির। ভয় আর হতবিহ্বলতা তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। কিন্তু সবাই নিশ্চুপ! কারও মুখে কোনো কথা নেই!

তারপর! তারা জমায়েত হতে লাগল, ভিড় বাড়তে লাগল! 

তারপর! হাশরের ময়দানে তাদের সমবেত করা হলো! কারও সাধ্য ছিল না সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার!

ফেরেশতারা তাদের অভ্যর্থনা জানাল। তারা তাদের পথ দেখিয়ে দিল এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে লাগল। জানিয়ে দিল, তাদের কী করতে হবে, তাদের পরিণতি কী হবে এবং আজকের দিনে হিসাব-নিকাশের প্রক্রিয়াটি কীভাবে সম্পন্ন হবে। তারপর! সেই সুবিশাল মিছিল চলতে শুরু করল। দলে দলে তারা এগোতে লাগল, একে অন্যের গায়ে আছড়ে পড়তে লাগল। তাদের গন্তব্য—বিচার ও হিসাবের বিশাল প্রান্তর। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল যেন পঙ্গপালের ঝাঁক, অথবা সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ।

এই ভয়ংকর জনসমুদ্রের মাঝে একজন মানুষ ছিল। সবার যা দশা, তারও তা-ই। মৃত্যুর পর যে কবরে তাকে শায়িত করা হয়েছিল, সেখান থেকে সে-ও উঠে এসেছে। অন্য সবার মতোই ভীত, সন্ত্রস্ত ও হতবিহ্বল। তবে তার ভয়, আতঙ্ক ও বিহ্বলতা যেন অন্যদের চেয়েও বহুগুণ বেশি; সে যেন একটু বেশিই থরথর করে কাঁপছিল।

বিশাল সেই জনস্রোত সামনে এগোচ্ছে।

আর সেই লোকটি তাদের মাঝেই হাঁটছে। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে তার পিঠ সামনের দিকে নুয়ে পড়েছে, যা তার ক্লান্তি ও যন্ত্রণাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যতবারই সে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, ব্যর্থ হচ্ছে। কী এমন জিনিস তাকে এভাবে নুইয়ে রেখেছে, তা বোঝার জন্য সে পিঠে হাত দিল। আর তখনই সে বুঝতে পারল—একটি বিশাল, ভারী ‘চেয়ার’ তার পিঠ ও নিতম্বের সঙ্গে আঠার মতো সেঁটে আছে! কোনোভাবেই সে নিজেকে এর থেকে মুক্ত করতে পারছে না। ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে সে এমন কাউকে খুঁজল, যে তাকে এই অভিশপ্ত চেয়ারের হাত থেকে নিষ্কৃতি দেবে। এই ভয়ংকর বিপদের মুহূর্তে চেয়ারটি তার অস্তিত্বের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে! সে আশেপাশের মানুষদের ডাকতে শুরু করল—‘এই যে শুনছেন! আপনি, হ্যাঁ আপনি! ও ভাই! এই যে আপা, শুনছেন!’

কিন্তু কেউ তার কথা শুনল না, কেউ সাড়াও দিল না। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মতো কেউই সেখানে ছিল না। লোকটি আবারও ডাকতে লাগল, এই আশায় যে কেউ হয়তো তাকে একটু সাহায্য করবে। সে একে-ওকে ডাকতে থাকল, কিন্তু এই অগণিত মানুষের ভিড়ে তার আর্তনাদ কারও মনোযোগই আকর্ষণ করতে পারল না।

এরই মাঝে! পিঠের ওই ভারী বোঝার কারণে লোকটি এমনিতেই চরম ক্লান্তি, হতাশা ও যন্ত্রণায় ভুগছিল। তার ওপর তার বিহ্বলতা ও বিস্ময় আরও বেড়ে গেল, যখন সে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল!

সে নিজের চোখেই দেখল, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই সম্পূর্ণ নগ্ন! সবাই খালি পা, বস্ত্রহীন এবং খতনাবিহীন। তাদের শরীরে আবরণ বলতে কিছুই নেই, আর তাদের দেখায় কোনো বাধাও নেই। অথচ কেউ নিজের গুপ্তাঙ্গ বা লজ্জাস্থান অন্যের দৃষ্টি থেকে আড়াল করার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও করছে না। কেউ নিজের গায়ে কোনো পাতা বা আবরণ জড়ানোর তাড়নাও অনুভব করছে না। তারা এমনভাবে হাঁটছে যেন তারা নিশ্চিত যে কোনো এক অদৃশ্য আবরণে তারা সুরক্ষিত, কেউ তাদের দিকে আড়চোখে তাকাবে না। এমনকি নারীরাও একই অবস্থায় নির্লিপ্তভাবে হেঁটে চলেছে। সবাই এমনভাবে হাঁটছে যেন এই মিছিলে সে সম্পূর্ণ একা! আশেপাশের অগণিত মানুষের ব্যাপারে তাদের কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই!

লোকটি ভীষণ অবাক হলো! চোখের সামনে এমন দৃশ্য দেখার পরও তার ভেতরে এমন কোনো অনুভূতি জাগল না, যা অন্য কোনো সময় হলে নিশ্চিতভাবেই জাগত। তার মনে বিন্দুমাত্র কামনার উদ্রেক হলো না, কোনো প্রবৃত্তি তাকে পরাভূত করতে পারল না!

সে নিজের দিকে তাকাল! দেখল, আশেপাশের মানুষদের মতো সে নিজেও ঠিক একই অবস্থায় আছে। সে-ও সম্পূর্ণ নগ্ন, গায়ে সুতোর লেশমাত্র নেই! সে আর্তনাদ করে উঠলো—‘হায় আল্লাহ! আমার এ কী দশা! আমি এদের মতোই সম্পূর্ণ নগ্ন। আমার গায়ে কোনো পোশাক নেই, আমার যাবতীয় সম্মান ও প্রতিপত্তি আজ ধুলোয় লুণ্ঠিত। আমি এদেরই একজন হয়ে গেছি, এদের চেয়ে আমার কোনো আলাদা মর্যাদা নেই… আমি তো রাজা! আমি সম্রাট!

আজ এদের ওপর আমার কোনো আধিপত্য নেই, এদের চেয়ে আমার কোনো উচ্চ মর্যাদাও নেই। আমরা সবাই এখানে সমান। কোথায় আমার সেই সুরম্য প্রাসাদ, আর সেই ঝরনাধারা, যা আমার পায়ের নিচ দিয়ে বয়ে যেত? কোথায় আমার দাসদাসী, পাইক-পেয়াদা? কোথায় আমার সেই দেহরক্ষীর দল, যারা আমাকে সম্মান ও সম্ভ্রমে মাথা নুইয়ে কুর্নিশ করত? কোথায় আমার সেই রাজকীয় পোশাক? কোথায় সেই সোনা-রুপা? কোথায় আমার রাজমুকুট আর রাজদণ্ড? কোথায় আমার সেই জাঁকজমক, যা নিয়ে আমি অহংকার আর দম্ভ করতাম? কোথায় গেল আমার সেই প্রতাপ? কোথায় সেই ‘চেয়ার’ (সিংহাসন), যার ওপর বসে আমি শাসন করতাম, মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতাম? হ্যাঁ, কোথায় সেই চেয়ার?’

ঠিক তখনই লোকটির মনে পড়ে গেল!

সে আতঙ্কে শিউরে উঠল!

তারপর চিৎকার করে উঠল—‘এই তো! এই তো সেই চেয়ার, যা আমি এখন পিঠে বয়ে বেড়াচ্ছি! হ্যাঁ, এই সেই সিংহাসন, যা আজ আমার পিঠের বোঝা, আমার পথের কাঁটা। আমার সেই বিলাসবহুল জীবনের একমাত্র এই জিনিসটিই আমি সাথে করে নিয়ে এসেছি। এত এত নিয়ামতের মধ্যে কেবল এটিই আমার সঙ্গী হয়েছে। কিন্তু আমি যার ওপর বসতাম, যাকে আমি পদানত করে রাখতাম, আজ সে-ই আমার ওপর সওয়ার হয়েছে। আজ সে আমার পিঠকে তার বাহন বানিয়েছে!’

আরও একবার, অবচেতনভাবেই, যেন তার মনে পড়ে গেল যে সে একজন রাজা। নিজের অজান্তেই সে সর্বোচ্চ স্বরে হাঁক ছাড়ল—‘রক্ষী! রক্ষী! আমার পিঠ থেকে এটা নামাও! এই অভিশপ্ত চেয়ারের হাত থেকে আমাকে মুক্ত করো!’

কিন্তু অগণিত মানুষের গাদাগাদি ভিড়ে, যেখানে একে অপরের শরীর প্রায় লেপ্টে ছিল, সেখানে কেউ তার কথা শুনল না, কেউ ফিরেও তাকাল না।

এবার তার উপলব্ধি হলো যে, যা ঘটছে তা আসলেই ঘটছে। এ এক নির্মম এক বাস্তবতা, কোনো প্রহসন নয়। অগত্যা তার ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া এই পরিণতির কাছে সে আত্মসমর্পণ করল!

চরম ক্লান্তি আর যন্ত্রণায় গোঙাতে গোঙাতে সে তার বোঝা নিয়ে এগোতে লাগল। এই বোঝা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় তার নেই, এমনকি একটু দম নেওয়ার বা মুহূর্তের জন্য বিশ্রাম নেওয়ারও কোনো ফুরসত মিলছে না। এভাবে চলতে চলতে সে অসংখ্য রাস্তার একটি মোড়ে এসে পৌঁছাল। সেখানে অনেক ফেরেশতা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ মানুষকে সামনের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, কেউবা গন্তব্য অনুযায়ী পথনির্দেশনা দিচ্ছিলেন। এই বিশাল জনস্রোতের প্রত্যেকের জন্যই আলাদা আলাদা নির্দিষ্ট পথ ছিল, যা এই মোড় থেকেই শুরু হয়েছে এবং প্রত্যেককে কেবল তার জন্য নির্ধারিত পথেই চলতে হবে।

লোকটিকেও তার নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে হাঁকিয়ে নেওয়া হলো। একজন ফেরেশতা তাকে এবং তার মতো আরও অনেককে তাদের জন্য নির্দিষ্ট একটি পথে তাড়িয়ে নিয়ে চললেন। লোকটি খেয়াল করল, তার সাথে যারা এই পথে চলছে, তাদের সবার পিঠই একেকটি বাহনে পরিণত হয়েছে! তবে তারা যা বয়ে বেড়াচ্ছে, তা একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম। চলতে চলতে তারা একটি খাড়া বাধা বা চড়াইয়ের সামনে এসে পড়ল। সবাই যখন সেটি টপকে ওঠার চেষ্টা করছিল, তখন তা তাদের কাছে ভীষণ দুরূহ মনে হলো। লোকটি অন্যদের মতো চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে পেছনে ফিরে যেতে চাইল। কিন্তু পেছনে থাকা প্রহরীরা বাধা দিল এবং তাকে জোর করে সামনের দিকে ধাক্কা দিল। পিঠের ভারী বোঝা নিয়ে লোকটি উপুড় হয়ে পড়ে গেল। তাকে প্রহার করা হলো যাতে সে উঠে দাঁড়ায়। সে উঠে দাঁড়াল, কিন্তু সেই অভিশপ্ত চেয়ারটি তখনও তার পিঠ কামড়ে পড়ে রইল—কোনোভাবেই তাকে ছেড়ে যেতে চাইল না। সে বাধ্য হয়ে আবার সেই পাহাড় বেয়ে উঠার চেষ্টা শুরু করল। প্রতিটি পদক্ষেপে কষ্ট ও যাতনা বেড়েই চলল। শেষ পর্যন্ত চরম ভোগান্তির পর সে চূড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হলো এবং সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যদের সাথে গিয়ে দাঁড়াল।

লোকটি নিচের দিকে তাকাল। দেখল, দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত এক অনন্ত উপত্যকা, যার কোনো শেষ নেই। সেখানে গিজগিজ করছে অগণিত মানুষ। তারা সবাই ঘাড় উঁচু করে ওপরের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা দেখছে ওই মানুষগুলোকে, যারা এই দুর্লঙ্ঘ্য পাহাড়ের চূড়ায় নিজেদের পিঠে নিজ নিজ বোঝা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই উচ্চতায় দাঁড়িয়ে তারা সবাই আজ নিচের সেই অগণিত দর্শকের চোখের সামনে উন্মুক্ত, দৃষ্ট। যেন তারা কোনো উন্মুক্ত মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে, আর দর্শকদের শ্যেনদৃষ্টি থেকে তাদের কারও লুকোনোর কোনো উপায় নেই। এমনকি তাদের নিজেদের নাম! তাদের পিতা-মাতার নামসহ সবকিছুই আজ উন্মোচিত!

লোকটির বিস্ময়ের ঘোর যেন আরও গাঢ় হলো। সে চরম হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল!

যে প্রহরী তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, এই দৃশ্য সম্পর্কে তাকে কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য সে যেই না পেছনে ঘুরতে গেল, অমনি বজ্রকঠিন এক কণ্ঠস্বর তাকে আতঙ্কে কাঁপিয়ে দিল—‘সামনের দিকে তাকাও, ওহে পিতার পুত্র! খবরদার, পেছনে ফিরে তাকাবে না।’

তীব্র ভয়ে লোকটির বুক কেঁপে উঠল। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতেই সে বলল—‘দোহাই তোমার… দয়া করো, দয়া করো… আমি শুধু তোমার মুখটা দেখে কিছু কথা জিজ্ঞেস করতে চাই। আমি এখন যে বিভীষিকার মধ্যে আছি, তার রহস্যটা একটু বুঝতে চাই।’

‘না, তুমি আমাকে দেখতে পাবে না। এভাবেই কথা বলো দুর্ভাগা—মাটির দিকে তাকিয়ে, লাঞ্ছিত, অপমানিত আর হতভাগ্য হয়ে!’

‘এ তো চরম অপমান আর লাঞ্ছনা! আমার মতো মানুষের সাথে এমন আচরণ মানায় না। আমি একজন রাজা! হ্যাঁ, আমি রাজা! আমি একজন সম্রাট! তুমি কি আমাকে চেনো না?’

‘আজ স্বয়ং আল্লাহ তাঁর পরম ন্যায়বিচারে তোমাকে লাঞ্ছিত করেছেন। অথচ তুমি, হে স্বঘোষিত রাজা, তুমি তোমার ওই সিংহাসনের জোরে মানুষের ওপর দিনের পর দিন জুলুম ও নিপীড়ন চালিয়ে তাদের লাঞ্ছিত করেছ। দীর্ঘকাল তুমি ওই চেয়ারটি আঁকড়ে ছিলে। ওই চেয়ারে বসে তোমার আয়ু যত বেড়েছে, মানুষের দুর্দশা আর হাহাকার তত দীর্ঘ হয়েছে। তোমার মাথার চুল যত পেকে সাদা হয়েছে, তোমার শাসনামলের অন্ধকার তত কালো হয়েছে। মানুষ তোমার কাছ থেকে কখনোই সুবিচার পায়নি। রাজত্ব ছিল তোমার কাছে দেওয়া এক আমানত, যা তুমি বিন্দুমাত্র রক্ষা করোনি।’

‘তার মানে, এই চেয়ারটাই আজ আমার এই দুর্দশা আর লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তির মূল কারণ?’

‘আজ এই চেয়ারের কারণেই তুমি অপমান আর মর্মন্তুদ শাস্তির স্বাদ পাচ্ছ। অথচ তুমি চাইলে এই চেয়ারের মাধ্যমেই অনন্ত সুখ আর মহামূল্যবান পুরস্কার লাভ করতে পারতে—যদি তুমি এর সদ্ব্যবহার করতে।’

‘কিন্তু আগে এটাকে আমার পিঠ থেকে খোল! এটাকে দূর করো আমার থেকে! এমন জঘন্যভাবে এটা আমার সাথে সেঁটে আছে যে, আজ কুল মাখলুকাতের সামনে আমি চরমভাবে অপদস্থ হচ্ছি!’

‘এটিকে তো তুমি প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতে, তাই না? কখনোই তো এটি অন্যের জন্য ছেড়ে দিতে চাওনি! এই চেয়ার আজ কেবলই তোমার, বুঝতে পেরেছ? আজ এই চেয়ারই নির্ধারণ করবে তোমার ভোগান্তি নাকি প্রশান্তি।’

প্রহরীর কথা শুনে লোকটি অবাক হলো। কয়েকটি শব্দ তার কানে বাজতে লাগল— ‘দেখতে পাবে না, আজ, প্রশান্তি, ভোগান্তি’!

সে চিৎকার করে উঠল—‘আজ বলতে তুমি কী বোঝাতে চাইছ? আর আজই কেন পুরস্কার বা শাস্তির কথা আসছে? আমরা এখন ঠিক কোন দিনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি?’

‘এই দিনটি হলো সেই দিন, যা তোমার কল্পনায়ও কখনো আসেনি, যার কথা তুমি বেমালুম ভুলে ছিলে। আজ হাশরের দিন, আজ হিসাব-নিকাশের দিন, আজ মহাবিচারের দিন… আজ কিয়ামত দিবস!’

‘কিয়ামত? সেটা আবার কী? আর তুমিই বা কে, আমাকে খুলে বলো!’

‘আমি সেই ফেরেশতাদেরই একজন, যারা কখনোই স্রষ্টার অবাধ্য হয় না এবং কেবল নির্দেশিত কাজই পালন করে। বিচারের পরবর্তী ধাপে না পৌঁছানো পর্যন্ত আমাকে তোমার পাহারায় নিযুক্ত করা হয়েছে। আর কিয়ামত হলো তা-ই, যা এখন ঘটছে এবং তোমার সাথে সামনে যা ঘটতে যাচ্ছে। আর এটা তো কেবল শুরু মাত্র।’

‘কিন্তু আমি এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে আছি কেন? আর আমার পিঠে এই চেয়ারটাই বা কেন? সমস্ত সৃষ্টি আমার দিকে এভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে কেন, তারা তো আমার দিক থেকে চোখই ফেরাচ্ছে না!’

‘এটি হলো ‘আমানতের চূড়া’। এটি এমন একটি সুউচ্চ স্থান, যা সমস্ত সৃষ্টির ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। যারা পৃথিবীতে আমানতের খেয়ানত করেছে, তারা সবাই আজ তাদের সেই আমানতের বোঝা পিঠে নিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছে, যাতে সমস্ত বিশ্ববাসীর সামনে তাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়।’

‘এই চেয়ারও কি কোনো আমানত ছিল, যা আমি নষ্ট করেছি?’

‘এই চেয়ার ছিল সবচেয়ে বড় আমানতগুলোর একটি। একে রক্ষা করা বা ধ্বংস করার হিসাব আল্লাহর কাছে অত্যন্ত কঠোর। আল্লাহ তোমাকে এই আমানত দিয়েছিলেন, তোমাকে পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি বানিয়েছিলেন, যাতে তুমি মানুষের মাঝে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করো। কিন্তু তুমি সেই আমানতের চরম খেয়ানত করেছ।’

‘তাহলে, আজ যদি সত্যিই কিয়ামতের দিন হয়, তবে আল্লাহ কোথায়? কেবল তিনিই তো আমার বিচার করবেন। আমি তাঁকে দেখতে চাই! আমি আমার আল্লাহকে দেখতে চাই!’

‘ওহে নির্বোধ! পৃথিবীতে তুমি যেটুকু ঈমান আর সওয়াব অর্জন করেছ, তার যোগ্যতা দিয়ে আমার মতো একজন শাস্তিদাতা ফেরেশতাকেও দেখার অধিকার তোমার নেই। আর তুমি চাইছ স্বয়ং মহাসত্তা আল্লাহকে দেখতে! তুমি তো সেই হতভাগ্যদের একজন, যাদের সাথে আল্লাহ আজ কোনো কথা বলবেন না, যাদের দিকে তিনি ফিরেও তাকাবেন না। তুমি পৃথিবীতে তাঁকে ভুলে ছিলে, আজ তিনিও তোমাকে ভুলে গেছেন! তবে, তোমার চুলচেরা হিসাব ঠিকই নেওয়া হবে!’

লোকটি এবার হাহাকার করে চিৎকার করে উঠল—‘কীভাবে? এটা কীভাবে সম্ভব? আমি তো সর্বদা আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখতাম। আমি জানতাম তিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু। এটুকু কি যথেষ্ট নয়? এটাই কি ঈমান নয়? আমার তো দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আমাকে যদি তাঁর কাছে ফিরিয়েও নেওয়া হয়, তবুও আমি পৃথিবীতে যেমন সুখে ছিলাম, তার চেয়েও উত্তম কিছু পাব। আল্লাহই তো পৃথিবীতে আমাকে এত সব নিয়ামত দিয়েছিলেন, তাই না? তিনিই তো আমাকে ক্ষমতা আর এই সিংহাসন দিয়েছিলেন, যাতে আমি আমার নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে শাসন করতে পারি। আমি যা করেছি, তা কি সৎকর্ম ছিল না? হ্যাঁ, পৃথিবীতে আমি যা করেছি সবই সঠিক ছিল, কারণ আল্লাহর প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা ছিল। আর তুমি বলছ, আল্লাহ আমাকে ভুলে গেছেন! তিনি তো সর্বশক্তিমান স্রষ্টা! আর আমি তো তাঁর চেয়ে অতি ক্ষুদ্র এক রক্তমাংসের মানুষ। আমার কি ভুল বা বিস্মৃতি হতে পারে না?’

এই ধৃষ্টতাপূর্ণ কথায় ফেরেশতা ভীষণ ক্ষিপ্ত হলেন। তিনি গর্জন করে উঠলেন—‘মিথ্যা বলছ তুমি! এখনো তুমি আল্লাহর নামে ডাহা মিথ্যা, অপবাদ আর বানোয়াট কথা রটিয়ে চলেছ। তুমি এমন কথা বলছ, যা তাঁর সত্তার সাথে একেবারেই বেমানান। ওহে মূর্খ! ‘তোমার প্রতিপালক কখনোই বিস্মৃত হন না’। তিনি যে তোমাকে ভুলে গেছেন, তা তাঁর ঐশ্বরিক কোনো ত্রুটি বা অক্ষমতার কারণে নয়, আল্লাহ এসবের ঊর্ধ্বে। বরং, তোমাকে ভুলে যাওয়াটাই হলো তোমার চূড়ান্ত শাস্তি। তুমি তো এই যোগ্যতাই রাখো না যে আল্লাহ তোমাকে স্মরণ করবেন বা তোমার দিকে ফিরে তাকাবেন। তুমি যেমন কর্ম করেছ, ঠিক তেমনি ফল ভোগ করছ।

শোনো! আল্লাহর প্রতি যদি তোমার সত্যিই সুধারণা থাকত, তবে তুমি তাঁর আনুগত্য করতে, সৎকর্ম করতে। তুমি মানুষের মাঝে তাঁর নির্দেশিত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে। এই চেয়ার তোমাকে ধোঁকা দিয়ে স্বৈরাচারী বানাতে পারত না—যাকে আজ তুমি ‘অভিশপ্ত’ বলে গালমন্দ করছ। অথচ, এই চেয়ারটি তোমার চেয়েও ঢের বেশি আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করত। এই সিংহাসনটি আজ তোমার অনন্ত সুখের কারণও হতে পারত।’

‘কিন্তু আমি তো রাজা ছিলাম! হ্যাঁ, আমি ছিলাম মানুষের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। এভাবে সাধারণ সৃষ্টির কাতারে তাদেরই একজন হয়ে মিশে থাকা আমার সাথে মানায় না। তাদের যা দশা হবে, আমারও সেই একই দশা হবে, এটা তো হতে পারে না!’

‘আজ তোমাদের মাঝে বংশমর্যাদা বা পদবির কোনো মূল্য নেই। কারও কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, একমাত্র সে ছাড়া, যে তার সৎকর্মের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেছে। আল্লাহ কি তার কালামে পাকে তোমাদের জানিয়ে দেননি—“তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সবচেয়ে বেশি আত্মশুদ্ধি অর্জন করেছে?” আজ আকাশ ও জমিনে রাজাধিরাজ কেবল একজনই। তিনি পরম সত্তা, তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। আজ তিনিই মানুষের মাঝে চরম ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করবেন।’

মরিয়া হয়ে লোকটি এবার ফেরেশতার কাছে একটি প্রস্তাব রাখল—‘আমার কথা শোনো! আমার অগাধ ধনসম্পদ রয়েছে। আমি কি সেই সম্পদের বিনিময়ে এই বিভীষিকা থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিতে পারি না?’

ফেরেশতা উত্তর দিলেন—‘ওহে মূর্খ… আজ যদি সমস্ত পৃথিবী পূর্ণ করা সোনা আর রুপাও তোমার ভাণ্ডারে থাকত এবং তুমি তা মুক্তিপণ হিসেবে দিতে চাইতে, তবুও তা তোমার বিন্দুমাত্র উপকারে আসত না।’

এরপর তাকে সামনের দিকে সজোরে ধাক্কা দিতে দিতে ফেরেশতা বলতে লাগলেন—‘চলো! এবার সামনে এগোও। কঠিন হিসাব-নিকাশের যাত্রাপথে পা বাড়াও।’

এই বলে তিনি তাকে ঠিক সেভাবেই সামনের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে চললেন, যেভাবে গবাদিপশুকে খোঁয়াড়ের দিকে তাড়িয়ে নেওয়া হয়।

দুই.

সুবিশাল ও সুরম্য রাজপ্রাসাদের অন্দরমহল। বিলাসবহুল ও সুকোমল শয্যা।

রাজা হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। কোনো বিষধর সরীসৃপ যেন দংশন করেছে—এমন এক তীব্র আতঙ্কে ধড়ফড় করে উঠে বসলেন তিনি। সর্বাঙ্গ বেয়ে ঘাম ঝরছে। সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে চারপাশটা একবার দেখে নিলেন। না, সবকিছু তো ঠিক জায়গাতেই আছে! যেমনটা দেখে তিনি ঘুমোতে গিয়েছিলেন, তার বিন্দুমাত্রও পরিবর্তন হয়নি। এরপর তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো সেই ‘চেয়ার’ বা সিংহাসনটির দিকে। দেখলেন, সেটিও আগের মতোই স্বস্থানে বহাল তবিয়তে দাঁড়িয়ে আছে। একচুলও নড়েনি। অবশ্য এর বিশাল আকার আর বিপুল ওজনের কারণে কারও পক্ষে একে সরানো সম্ভবও নয়! তাহলে…সবই কি কেবলই প্রলাপ? নাকি রাতের গুরুপাক আহারের প্রভাবে দেখা কোনো দুঃস্বপ্ন! নাহ্, ভয়ের কিছু নেই, চিন্তার বিন্দুমাত্র কারণ নেই!

কিন্তু পরক্ষণেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তার মাথায় এলো। স্বপ্নে তিনি যা দেখেছেন বা যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, তা থেকে তাকে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে, আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি তিনি কিছুতেই হতে দেবেন না!

নিজের সেই স্বভাবসুলভ গম্ভীর ও বজ্রকঠিন কণ্ঠে তিনি সর্বশক্তি দিয়ে হাঁক ছাড়লেন—‘রক্ষী! রক্ষী!’

প্রহরীর দল ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এলো। সামনে এসে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল এবং গভীর সম্ভ্রমে মাথা নুইয়ে কুর্নিশ করল।

‘আদেশ করুন মহামহিম সম্রাট!’

রাজা তার সেই সিংহাসনটির দিকে আঙুল তাক করে বললেন—‘এই অভিশপ্ত চেয়ার! এক্ষুনি, এই মুহূর্তেই এটাকে এখান থেকে সরাও। বহুদূরে নিয়ে গিয়ে আগুনে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করো, যাতে এর কোনো অবশিষ্টাংশই না থাকে। এরপর এর ছাইটুকু নিয়ে সাগরের অথৈ জলে ভাসিয়ে দেবে। আজ থেকে এর কোনো চিহ্ন যেন আমার চোখে না পড়ে!’

‘মহামহিম সম্রাটের আদেশ শিরোধার্য। এক্ষুনি তা পালন করা হচ্ছে।’

রাজা তার আদেশের বাকি অংশটুকুও বুঝিয়ে দিলেন—‘এরপর, তোমরা আমার জন্য নতুন একটি রাজকীয় সিংহাসন নির্মাণ করবে। সেটি হতে হবে আগেরটির চেয়েও ঢের বেশি জমকালো এবং রাজসিক। কিন্তু…..ভালো করে কান খুলে শুনে রাখো! ভালো করে শোনো! নতুন সিংহাসনটি যেন ওজনে আগেরটির চেয়ে অনেক, অনেক বেশি হালকা হয়!’

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *