অবিনশ্বর (প্রথম পর্ব)

মুফতি আবদুল হাকিম ফারুকী ঘরের বারান্দায় চেয়ারে বসা। ঘরের ভেতর থেকে ঘর গোছানোর খুটখাট শব্দ আসছে। আবদুল হাকিম গভীর মনোযোগ দিয়ে খুটখাট শব্দ শুনছে। তার মনে হচ্ছে, কতদিন পর সে এমন মধুর শব্দ শুনতে পাচ্ছে।

নারী জিনিসটা আল্লাহপাকের এক আজব সৃষ্টি—বসে বসে ভাবছে আবদুল হাকিম। তার স্ত্রী আয়েশা ঘর গুছাচ্ছে, বিছানার চাদর পাল্টাচ্ছে, মেঝে ঝাঁট দিচ্ছে—বারান্দায় বসে এসব সাংসারিক খুটখাট শুনতেও তার ভালো লাগছে। আধঘণ্টা হবে সে এসেছে, দুটো ঘর আর একটা বারান্দা নিয়ে ছোট্ট বাড়িটা এরই মধ্যে আয়েশা আয়েশা গন্ধে ভরে গেছে। ঘরের প্রতিটি দেয়াল, আসবাব, দরজা-জানালা, কাপড়-চোপর খুশিতে খলবলিয়ে উঠছে যেন। তারও খুব ইচ্ছে করছে আয়েশার সঙ্গে হাত লাগিয়ে ঘরদোর গুছিয়ে দেয়। কিন্তু ও জোরে ধমক দিয়ে তাকে এখানে বসে থাকতে বলেছে। যে পর্যন্ত তার ঘর গোছানো শেষ না হবে ততক্ষণ এখান থেকে নড়াচড়া নিষেধ।

ঘরের ভেতর থেকে আয়েশা কপট বিরক্তসুরে বলে উঠল, ‘বিছানার এই অবস্থা করছেন ক্যামনে? বিছানায় কোনো পরী টরী নিয়া আসছিলেন নাকি?’

আবদুল হাকিম হেসে ওঠে, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ! কী আজগুবি কথা যে তুমি বলো না।’

‘আনতেও পারেন। আমি দুই সপ্তাহ ছিলাম না, এর মধ্যে কাউরে আনলে কে জানবে!’

‘উফফ… আস্তা একটা মাথা খারাপ মহিলা তুমি।’

‘আমার মাথা যে কিঞ্চিত খারাপ, এইটা আপনে বিয়ের আগেই টের পাইছিলেন। এ কারণেই তো আমারে বিয়া করতে এত উতলা হয়া গেছিলেন। এইটা আমি ভালো কইরাই জানি।’

‘হ, কইছে তোমারে!’ আবদুল হাকিম খানিকটা লজ্জা নিয়ে বলে।

‘আচ্ছা মুফতি সাব, আপনে একটা ভ্যাবদা টাইপের লোক হয়া আমার মতো এমন মাথা খারাপ মেয়েরে বিয়া করতে চাইলেন কোন কারণে? সত্যি কইরা বলেন তো?’

আবদুল হাকিম বারান্দা থেকে উঠে ঘরের দরজার সামনে গিয়ে অসহায় সুরে বলল, ‘আয়েশা, পাগলামিটা এইবার বন্ধ করবা?’

‘মিস্টার মুফতি সাব, ভালোবাসা জিনিসটাই হচ্ছে পাগলামি। যার ভালোবাসার মধ্যে পাগলামি নাই, সে সত্যিকারের ভালোবাসতে পারে না, ভালোবাসা পায়ও না। কালকে যে আপনে আমারে আনতে রাতের বেলা পাগলের মতো ছুইটা আমার বাপের বাড়ি গেছিলেন, ক্যানো গেছিলেন?’

আবদুল হাকিম কী বলবে বুঝতে পারছে না। আমতা আমতা করে বলল, ‘গেছিলাম, যায় না মানুষ শশুরবাড়ি… কতদিন পর, এই কারণে… কেন আবার!’

আয়েশা ফিক করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই আলনার কাপড়গুলো ভাঁজ করে বিছানায় এসে বসল। তার কপাল ঘামে ভিজে গেছে, ঠোঁটের ওপরও জমেছে ঘামের বিন্দু। মুফতি সাহেব দরজায় দাঁড়িয়েও ঠোঁটের ওপর জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকা ঘামের বিন্দু স্পষ্ট দেখতে পেল। এই ঘাম যদি তার ঠোঁটের ওপর হতো, কী বিশ্রীই না লাগতো। অথচ আয়েশার ঠোঁটের ওপর কী অদ্ভুত সুন্দরভাবে মানিয়ে গেছে।

‘অমনে তাকায়া আছেন ক্যানো? ভিতরে আসেন। দরজায় দাঁড়ায়া দাঁড়ায়া ইভটিজিং করা ভালো না। দরজা বন্ধ কইরা আসবেন নাকি?’ চোখে-মুখে দুষ্টুমির রেণু ছড়িয়ে অব্যক্ত আমন্ত্রণ থাকে আয়েশার কথায়।

আবদুল হাকিমের খুব ইচ্ছা হলো হো হো করে হেসে উঠতে। হাসতে হাসতে খুব জোরে চিৎকার করে বলতে চাইল—এই কারণে, শুধু তোমার এমন পাগলামির কারণেই তোমাকে বিয়ে করেছিলাম।

***

বাজারে যাওয়ার পথে পূর্বপাড়ার আজগর আলি মহাজনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। গেরস্থ মানুষ, সজ্জন ব্যক্তি। নামাজ-রোজায় যেমন পাবন্দ, তেমনই দান-খয়রাতেও হাত দরাজ। ফুলতলী মাদরাসায় প্রতি মাসে দুয়েক বস্তা চাল তার দোকান থেকে আসবেই। এছাড়া মাদরাসার দুজন ছাত্র তার বাড়িতে নিয়মিত জায়গির থাকে।

মুফতি আবদুল হাকিমকে আসতে দেখে তিনি এগিয়ে এলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম বড় হুজুর, বাজারে যান নাকি?’

‘ওয়ালাইকুম সালাম, জি মহাজন চাচা!’

মাদরাসার মুহতামিম হিসেবে এলাকার গণ্যমান্য লোকজনের সঙ্গে সদ্ভাব রাখা গুরুদায়িত্ব। সবার মন যুগিয়ে চলতে হয়। কিন্তু আজগর আলি মহাজন অন্যরকম, তার সঙ্গে কথা বলতে আবদুল হাকিমের বরাবরই ভালো লাগে। তার বাড়িতে গেলে কখনো খালি হাতে আসতে দেন না। পরিবারের জন্য কোনো ফল, নয়তো রান্না করা দুয়েক পদের তরকারি বা দুয়েক কেজি রাজভোগ চাল দিয়ে দেন। এ কারণে লজ্জায় তিনি মহাজনের বাড়ির দিকে যান না বড়জোর। তবু আজগর মহাজন মাঝেমধ্যে মাদরাসার বড় হুজুর আবদুল হাকিমকে জোর করে ধরে নিয়ে যান।

আজগর আলি মহাজন আবদুল হাকিমের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বলতে লাগলেন, ‘আমিও বাজারে যাইতেছি। ছোট নাতিটার দুই দিন ধইরা জ্বর, কিছুই মুখে দেয় না। আইজকা বায়না ধরছে খেজুরের গুড় দিয়া দুধ-ভাত খাইব। কন তো, এই জৈষ্ঠ্য মাসে কই খেজুরের গুড় পাই?

‘এই সিজনে খেজুরের গুড় পাওন তো কষ্ট হইয়া যাইব।’

‘যাই দেখি, সোবহানের দোকানে পাওয়া যাইতে পারে। না পাইলে সদরে যাওন লাগবে। জ্বর নিয়া নাতিটা খাইতে চাইছে, না খাওয়াইতে পারলে অন্তরটা শান্তি পাইব না।’

‘জি, তা তো ঠিকই।’

‘শুনলাম, বিবি সাব নাকি আইছে?’

‘জি, সকালে নিয়া আসলাম।’

‘ভালো কাম করছেন। এই বয়সে বউ ঘরে না থাকলে দুনিয়াদারি তো দুনিয়াদারি, এবাদত-বন্দেগিও ঠিকমতো হয় না। কী কন হুজুর?’ মুফতি সাহেবকে প্রশ্ন করে আজগর মহাজন আরেকবার হেসে নেন।

আবদুল হাকিম এমনিতেই লাজুক মানুষ, দশ কথার জবাব তিনি দুকথায় দেন। আর এমন রসালো বিষয়ে তিনি বরাবরই নতমুখী। মুচকি হেসে মাথা নিচু করে ফেললেন।

বাজারে ঢুকতেই দক্ষিণ ফুলতলীর হোসেন মিয়া এগিয়ে আসে—‘মহাজন সাব, কামলা নিছেন নাকি আইজকা?’

‘আরে রাখো তোমার কামলা, আটশো নয়শো ট্যাকা কইরা কামলার রোজানা কি তোমার বাপে দিব? ধান কাটা তো এহনও লাগেই নাই, এহনই যদি ছয়শো কইরা কামলা নিতে হয়, তাইলে আরও তো দিন পইড়াই রইছে। তহন তো হাজার ট্যাকা কইরা কামলা নিতে হইব। তহন কী করুম?’

‘আর কয়েন না মহাজন সাব, আমার তো আইজকা কামলা আনতে গিয়া মাথা ঘুরানি লাগছিল। মনে হইছিল কামলাগো সামনেই ঘুরাণ্টি দিয়া পইড়া যাই। নয়শো ট্যাকা দাম শুইনা ছাতাডা কান্ধে ফালায়া হনহন কইরা হাইটা আইসা পড়ছি। পিছনে আর ফিরা তাকাই নাই।’

‘ধান চাষ কইরা কী যে বিপদে পড়ছি! ধানের দাম মাত্র আটশো ট্যাকা। এহন কামলার যে দাম, তাতে ধান বেচার ট্যাকা দিয়া তো কামলাগো রোজানাই দেওয়া যাইব না। ধান বোনা বাদ দিমু!’

আজগর মহাজনের কণ্ঠে হতাশা ঝরে পড়ে। এ অঞ্চলের সবেচেয় অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থ তিনি, এক নামে সবাই চিনে। প্রায় আট-দশ বিঘা জমিতে ইরি ধান চাষ করেন। প্রতিবছর পাঁচশো মণের ওপরে শুধু ইরি ধান গোলায় তোলেন। কিন্তু গত দু-তিন বছর ধরে ধান বোনা আর কাটার সময় খেতশ্রমিকের দাম যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তাতে ধান বুনে লাভের চেয়ে ক্ষতিই হচ্ছে। জমিচাষ, ধানের চারা রোপন, নিয়মিত ডিপমেশিন দিয়ে পানি সেচ, খেতের আগাছা নিড়ানি, সার-বিষ আর ধানকাটার পেছনে যে খরচ হয়, সবশেষে হিসাব করে দেখা যায় মণপ্রতি ধানের দামের চেয়ে খরচই বেশি পড়ে যায়।

হোসেন মিয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতে সামনে এগিয়ে যান আজগর মহাজন।

তরি-তরকারি কিনে মাছহাটায় এসে একটু চুপসে যায় মুফতি আবদুল হাকিম। আয়েশার পছন্দের পাঙ্গাশ মাছ নেই বাজারে, সব ছোট মাছ। ছোট মাছের যে দাম তাতে তো পকেটে কুলোবে না মনে হচ্ছে। তিনি মাছহাটায় দাঁড়িয়ে আগপিছ করতে করতে পেছন থেকে আজগর মহাজন এসে পড়েন—‘হুজুর, মাছ কিনা হইছে নাকি?’

‘জি না।’

‘কী মাছ নিবেন?’

‘জি, আপনাদের বউমা পাঙ্গাশ মাছ পছন্দ করে। কিন্তু বাজারে তো আইজকা পাঙ্গাশ দেখতেছি না।’

মহাজন বাজারে একবার নজর দিয়ে বলেন, ‘পাঙ্গাশ পছন্দ করে, ঠিক আছে। তাই বইলা অন্য মাছ তো অপছন্দ করে না। পাঙ্গাশ মাছে কাঁটা থাকে না, তাই সবাই পাঙ্গাশ খাইতে চায়। মেয়েমানুষ এমনে পেঁচিল্যা হইলে কী হইব, খাওয়ার সময় কাঁটাকুটার প্যাঁচানি ভালো পায় না।’

এ কথা বলেই তিনি সামনে মাছের খাঁড়ি নিয়ে বসা জেলের প্রতি হাঁক ছাড়েন—‘ওই নিতাই, তোর বাতাসি কত কইরা রে?’

‘জি মহাজন সাব, সাতশো কইরা।’

‘চোপড়ায়া তোর দাঁত ফালায়া দিমু। তিন দিন আগের মাছ, মইরা ল্যাটকায়া গেছে, এগুলা সাতশো?’

‘কী কন মহাজন সাব, সকালে মাওয়া থিকা নিয়া আসছি। আপনে একটা মাছ ধইরা দেখেন, এক্কেবারে টাটকা।’

‘রাখ তোর টাটকা। পাঁচশো কইরা দুই কেজি মাপ।’

‘মাফ চাই, ছয়শো ট্যাকার কমে দিতে পারুম না মহাজন সাব।’

‘কথা বাড়াইস না, দুই পলিথিনে দুই কেজি মাছ দে। ট্যাকা আমাগো দোকানের ক্যাশ থিকা নিয়া যাইস।’

নদীর জ্বলজ্বলে বাতাসি মাছ কিনে এক কেজি জোর করে আবদুল হাকিমের বাজারের ব্যাগে ভরে দেন আজগর মহাজন। আবদুল হাকিম সংকোচে জেরবার হয়ে যায়। তার বাবা নেই, বাবা মারা গেছেন ছোটবেলায়। এতিম অবস্থায় মাদরাসায় পড়াশোনা করে অনেক দুঃখ-কষ্টে মানুষ হয়েছে। বাবার বয়সী আজগর মহাজনের এমন প্রাণখোলা ব্যবহারে তার বাবার কথা মনে পড়ে। চোখের কোণ ভিজে আসে আবদুল হাকিমের।

ফেরার পথে এটা-সেটা নিয়ে কথা বলতে বলতে আবদুল হাকিম বলে, ‘চাচা, একটা কথা বলতে চাই।’

‘বলেন বলেন…।’

‘এই যে আপনেরা ধান চাষ করেন, যা শুনলাম—ধান চাষ করে এখন তো লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি। সবকিছুর দাম যে হারে বাড়তেছে, কিন্তু ধানের দাম তো সেভাবে বাড়তেছে না। তাইলে ধান চাষ না কইরা অন্য কিছু চাষ করেন, যেটা চাষ করলে লাভ হবে।’

আজগর মহাজন ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ধরে রেখে বলেন, ‘হুজুর, আপনে তো মাদরাসায় মানুষ হইছেন, চাষবাস জীবনের করেন নাই। ধানের কী মহত্ত্ব, এইটা আপনে বুঝবেন না। আগামীতে এখনকার চেয়ে দ্বিগুণ খরচও যদি হয়, তবুও মানুষ ধানই বুনবে। কেন জানেন?’

‘কেন?’

‘ধানের প্রতি ভালোবাসা। ধান না বুনলে মানুষ খাইব কী? ষোল-সতেরো কোটি মানুষ আমাগো এই ছোট্ট দেশে, এত মানুষের খাবার যোগানোর জন্য কত ধান দরকার, সেইটা কী কখনো চিন্তা করছেন? এই কৃষকরা যদি ধান না বুনে, তাইলে সারা দেশের মানুষ কি ভুট্টা-গম খাইয়া বাঁচবে?’

‘সেইটা ঠিক আছে, কিন্তু এভাবে লস দিয়া ধান বুইনা কতদিন চলতে পারব কৃষকরা?’

‘সেইটা আল্লায় ব্যবস্থা করব। এই বছর কামলার দাম বেশি, ধানের দাম কম। আগামী বছর ধানের দাম বাড়তেও পারে।’

‘কিন্তু অনেক গরিব কৃষকেরই তো এই বছর মাথায় হাত। তাদের সম্বলই তো দুই-চারটা খেত। সেগুলোর ধান কেটে গোলায় তুলতে যদি হাজার হাজার টাকা লাগে, তাইলে তো তাদের পথে বসার মতো অবস্থা হইব।’

‘হুমম… চিন্তার বিষয়। আমারই তো মনে হয় লাখখানেক টাকার বেশি লাগবে শুধু কামলার পিছনে।’

‘তাইলে বুঝেন, অন্যদের অবস্থা কী হইব!’

কথা বলতে বলতে বাড়ির পথে এগিয়ে যায় দুজন।

***

রাতে খেতে বসেছে আবদুল হাকিম। কাঁঠাল বিচির ভর্তা, বাতাসি মাছের সঙ্গে চিকন করে কাটা বেগুন-মাছের ঝোল আর মাষকালাইয়ের ডাল। আয়েশাও খেতে বসেছে। খাওয়ার সময় আবদুল হাকিম কথা বলে কম। আয়েশার অবশ্য কথা কম বলার তোয়াজ নেই। সে তার ইচ্ছেমতো কথা চালিয়ে যায়। আবদুল হাকিম কখনো জবাব দেয়, কখানো দেয় না। তাতে তার কিছু যায় আসে না।

‘মাদরাসার ছুটি কবে হবে, মুফতি সাব?’

‘সপ্তাহ দুয়েক পর পরীক্ষা, পরীক্ষার পর ছুটি।’

‘ছাত্রদের খেয়ার (পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পাঠদান বন্ধ রাখা) দিবেন কবে?’

‘কাল-পরশু দিতে চাইছিলাম, কিন্তু একটা সমস্যায় পইড়া গেছি।’

‘কী সমস্যা?’

‘ধান কালেকশন করতে হইব না? খেয়ারের আগে এক সপ্তাহ কালেকশন করে তারপর খেয়ার দিতে চাইছিলাম।’

‘তাইলে দিয়া দেন। সমস্যা কোন জায়গায়?’

‘আজকে বাজারে মহাজন সাবসহ কমিটির আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলছি। কামলার যে দাম, তাতে গ্রামের মানুষের ধান কাটা এখনো শেষ হয় নাই। ধান কাটা শেষ না হইলে ধান কালেকশনে যাইয়া তো কোনো লাভ নাই।’

‘ও… কামলার দাম কি দুই-চারদিনের মধ্যে কমবে?’

‘তেমন কোনো সম্ভাবনা নাই। সবাই বলল বরং বাড়তে পারে। আইজকা বাজারে গিয়া কামলার দাম শুইনা দক্ষিণপাড়ার হোসেন মিয়ার নাকি মাথা ঘুরাণ্টি লাগছিল।’

‘হিহিহি… সত্যি?’

‘হুম, উনি নিজেই বলল। গরিব মানুষ যারা দুই-চার খেত ধান বুনছে, তাগো তো অবস্থা কেরাসিন। এক মণ ধানের দামের চাইতে কামলার দাম কম। গরিব মানুষের কথা কী কমু, আমাগো মহাজন সাবেরই তো লাখের ওপরে চইলা যাবে শুধু কামলার রোজানা দিতে।’

‘ইয়াল্লাহ! এত দাম কামলার?’

‘শুধু দাম হইলেও তো কথা ছিল না, বিদেশি কামলা ছাড়া এখন তো দেশি কামলা পাওয়া যায় না। অথচ দেখো, পুরা বিলের ধান পাইকা গেছে কিন্তু ধান কাটার মতো কামলা পাওয়া যাইতেছে না। ধান পাইকা খেতে পইড়া যাইতেছে।’

‘তাহলে তো আপনাগো কালেকশন করতে আরও দেরি হবে। আর কালেকশন দেরি হলে তো পরীক্ষা-ছুটিও দেরি হবে।’

‘হুম, সেটা নিয়াই চিন্তা করতেছি। আগামীকাল শুক্রবার, জুমআর নামাজের পর কমিটির মিটিংয়ে বিষয়টা নিয়া আলাপ করতে হবে।’

‘আপনে তরকারি নেন না কেন? আরেকটু নেন। তরকারি মজা হয় নাই?’

‘তুমি তরকারি রান্না করছ আর সেইটা মজা হবে না, এইটা হইতে পারে নাকি?’ আবদুল হাকিম আয়েশার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে।

আয়েশার চোখ-মুখ খলবলিয়ে উঠে, ‘আরিব্বাপরে! মুফতি সাব দেখি ভালো পাম মারাও শিখা গেছে!’

এরপর দুজনই কিছুক্ষণ চুপ। ভাত খাওয়া শেষের দিকে। আবদুল হাকিম ভাতের থালায় হাত ধুয়ে সকালে শশুরবাড়ি থেকে নিয়ে আসা একটি আম ছিলতে থাকে। আয়েশারও খাওয়া শেষ। থালায় পানি ঢালতে ঢালতে আয়েশা বলে ওঠে, ‘হুজুর, একটা কথা বলি?’

‘বলো।’

‘আগে বলেন, আমার কথা শুনে হাসবেন না।’

‘হাসির কথা বললেও হাসব না?’

‘না, হাসবেন না।’

‘আচ্ছা যাও, মুখ বন্ধ।’

‘মুখ বন্ধ করতে হবে না, মুখের মধ্যে আমের আঁটি দিয়া রাখেন।’

‘দিলাম মুখের মধ্যে আঁটি।’ এ কথা বলেই আবদুল হাকিম পুরো আমের আঁটি মুখের মধ্যে পুরে দেন। সেটা দেখে আয়েশা হাসতে হাসতে বলে ওঠে, ‘বাইর করেন, বাইর করেন! আমারে বলেন শয়তান, আসলে আপনে হইলেন শয়তানের গুরুঠাকুর। জুব্বা-টুপি পইরা থাকেন বইলা বোঝা যায় না।’

‘হাহাহা… আচ্ছা, এবার তোমার কথাটা বলো।’

‘বলতেছি… তার আগে আমারে বলেন, প্রতি বছর আপনারা মাদরাসায় কত মণ ধান কালেকশন করেন?’

‘উমম… গত বছর একশো মণের ওপরে কালেকশন হইছিল।

‘কালেকশন করতে ছাত্রদের কয়দিন সময় লাগে?’

‘তিনশো ছাত্রের মিনিমাম এক সপ্তাহ তো লাগেই।’

‘তিনশো ছাত্রের মধ্যে বড় কতজন আর ছোট কতজন?’

‘বড় ছোট বলতে…?’

‘বলছি কী, এমন বড় ছাত্র কতজন আছে, যারা ধরেন খেতে গিয়ে ধান কাটতে পারবে?’

‘ধরো অর্ধেক, মানে দেড়শো জনের মতো।’

‘হুজুর, কথাটা আমি বলি। আপনে কিন্তু আগেই বলছেন হাসবেন না, আর রাগও করবেন না। আমি শুধু এমনেই একটা সম্ভাবনার কথা বলতেছি।’

‘আহা বলো না, আমি কখনো তোমার সঙ্গে রাগ করি?’

‘সেইটা অবশ্য ঠিক। আচ্ছা ধরেন—আপনে আগামীকাল মাদরাসার কমিটিরে বললেন, ফুলতলী বিলে যত ধানের ক্ষেত আছে, সব ক্ষেতের ধান আপনার মাদরাসার ছাত্ররা কাইটা দিবে। বিনিময়ে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান মাদরাসায় দিতে হবে। তাইলে মাদরাসার ছাত্রদের বাড়ি বাড়ি গিয়া ভিক্ষুকের মতো ধান কালেকশন করতে হইল না। আর আমার মনে হয় অন্যান্য বছরের কালেকশনের চাইতে এভাবে করলে ধান আরও বেশি পাওয়া যাবে। আবার গ্রামের সব মানুষের ধানও কোনো ধরনের টাকা-পয়সা ছাড়াই কাটা হয়ে যাবে।’

আবদুল হাকিম স্ত্রীর কথা শুনে প্রথমে এটাকে হাস্যকর বলেই উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। পরক্ষণেই তার মনে হলো, ব্যাপারটা তো এভাবেও হতে পারে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কালেকশন মানেই তো এক ধরনের ভিক্ষাবৃত্তি, এলাকাবাসীর বাড়ির দুয়ারে গিয়ে ধান চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কেউ দু-চার কেজি দেয়, আবার কেউ মুখ ঝামটা দিয়ে বিদায় করে দেয়। মাদরাসার কোমলমতি বাচ্চাদের মনে নিশ্চয় এর বাজে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। শিশুদের এভাবে ভিক্ষাবৃত্তির শিক্ষা দেওয়াটা যেমন অন্যায়, তেমনই এর সুদূরপ্রসারী মন্দ প্রভাব তাদের মনের মধ্যে গেঁথে যায়। পরবর্তীতে দেখা যায়, এসব ছাত্র বড় হলেও মানুষের কাছে হাত পাততে মোটেও শরমিন্দার ধার ধারে না। তাদের জীবনই চলে অন্যের কাছে হাত পাততে পাততে।

আবদুল হাকিম ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে অবাক হয়ে তাকাল আয়েশার দিকে, ‘তোমার মাথায় এই বুদ্ধি আসল কেমনে?’

‘রাগ করছেন?’

‘আরে কী বলো! এটা তো একটা দারুণ বুদ্ধি। যদিও এটা বাস্তবায়ন করতে অনেক ঝামেলার সৃষ্টি হবে, কিন্তু যদি একবার করতে পারি তাইলে ভাবতে পারো, কী একটা কাজের কাজ হবে?’

‘সত্যি?’

‘হাজারবার সত্যি। কালকেই আমি কথাটা কমিটির মিটিংয়ে বলব।’

***

জুমআর নামাজের পর মাদরাসার সভাপতি জলিল চেয়ারম্যান, সেক্রেটারি আজগর আলি মহাজনসহ কমিটির গণ্যমান্য প্রায় সবাই বসেছেন মসজিদের বারান্দায়। আজকের আলোচনার বিষয়—মাদরাসার আরেকটি নতুন ভবন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করা। মাদরাসার ফান্ডে কত টাকা আছে আর কত টাকা যোগাড় করতে হবে, নতুন ভবন কোথায় নির্মাণ করা হবে, কয় তলার ফাউন্ডেশন দেওয়া হবে—এ বিষয়গুলো নিয়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক আলোচনা হলো।

আলোচনার সময়টায় মাদরাসার পরিচালক হিসেবে মুফতি আবদুল হাকিম ফারুকীকেও থাকতে হয়। মাদরাসার অন্য দু-চারজন শিক্ষকও আছেন মিটিংয়ে। মিটিং যখন শেষের দিকে, তখন আবদুল হাকিম গলা খাকারি দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে।

আজগর আলি মহাজন আবদুল হাকিমের পাশেই বসা। মহাজনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চাচাজান, একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম।’

‘বলেন হুজুর! তবে আগেই বইলা নেই, হুজুরদের বেতন কিন্তু এখন বাড়াইতে পারুম না।’

সামনে থেকে টিপ্পনী কাটেন জলিল চেয়ারম্যান, ‘জি হুজুর, ব্যবসাপাতির অবস্থা খারাপ, গেরস্থগো কিষানীর অবস্থাও খারাপ। বেতন-টেতন এখন বাড়ানো যাইব না। আর আপনের পরিবারে তো মাত্র দুইজন মানুষ, বালবাচ্চা নাই, টোনাটুনির সংসার।’ চেয়ারম্যানের কথায় হেসে ওঠে মিটিংয়ের সবাই।

আবদুল হাকিম লজ্জা পেলেও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘না না, আমি বেতন বাড়ানোর কথা বলতেছি না। অন্য একটা বিষয় নিয়া কথা বলতে চাইতেছি।’

‘আচ্ছা, বলেন তাহলে।’

‘বলছিলাম কী, কালকে থেকে মাদরাসার ধান কালেকশনের ডেট করছিলাম। কিন্তু এলাকার ধান কাটা তো এখনো ভালোভাবে শুরু হয় নাই, মাইনষে ধান দিব কীভাবে! এদিকে মাদরাসার পরীক্ষাও চইলা আসছে।’

‘তাইলে পরীক্ষা নিয়া নেন। পরীক্ষার পর কালেকশন করেন।’

‘তাতে আবার দেরি হয়ে যাবে। আর পরীক্ষার পর ছাত্ররা বাড়িতে যাইতে না পারলে সবার মন খারাপ হয়া থাকবে। অনেকে আবার না বলেই চলে যায়। তাই আমি একটা বিকল্প প্রস্তাব দিতে চাইতেছিলাম, যদি আপনারা কিছু মনে না করেন।’

‘বিকল্প প্রস্তাবটা কেমন, হুজুর?’

‘মানে বলছিলাম কী, এবার তো শুনলাম ধান কাটার কামলার দাম অনেক। তাছাড়া সময়মতো কামলাও পাওয়া যাইতেছে না। এদিকে বিলের ধান সব পাইকা গেছে। দু-চারদিনের মধ্যে কাটতে না পারলে ধান পইড়া যাবে। তাই বলছিলাম যে, মাদরাসার ছাত্রদের দিয়া যদি ধান কাটায়া নিতাম, তাহলে আমরা দুই দিক থিকাই লাভবান হইতে পারতাম…’

মুফতি সাব হুজুরের কথা শেষ না হতেই মিটিংয়ের মধ্যে একটা শোরগোল পড়ে গেল। একেকজন একেকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে লাগল। উত্তরপাড়ার আকবর শেখ রৈ রৈ করে উঠল, ‘কী কন হুজুর, মাদরাসার ছাত্রগো দিয়া ধান কাটামু! আমরা কি মইরা গেছি নাকি?’

আজগর আলি মহাজনও বিষয়টা ভালোভাবে নিলেন না। তিনি বললেন, ‘না না হুজুর, এটা করন যাইব না। মাদরাসার ছাত্ররা তো এক প্রকার আমাদের মেহমান। তারা দীনি এলেম শিক্ষা করতে আসছে এখানে, তাদের দিয়া এমন কইরা ধান কাটানো শোভা দেখায় না।’

জলিল চেয়ারম্যান হাত উঁচু করে সবাইকে থামতে বললেন। তিনি শিক্ষিত মানুষ এবং একাধারে তিনবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান। মানুষ চরিয়ে খাওয়া তার কাজ। তাছাড়া এলাকায় তার বড় সুনাম—এলাকার কাজ করতে জলিল চেয়ারম্যান সরকারের বরাদ্দের আশায় বসে থাকে না। খাল কাটা বা রাস্তা মেরামত কিংবা স্কুল-মাদরাসার উন্নয়নমূলক যেকোনো কাজ সামনে এলে এলাকাবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় নিজেই করে ফেলেন। মুফতি সাহেবের কথায় বুঝতে পারলেন, হুজুরের কথার মধ্যে অনেকগুলো ‘কিন্তু’ থাকলেও প্রস্তাবটা একেবারে মন্দ না।

আবদুল হাকিম সবার বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় কিছুটা থতমত খেয়ে গেছে। চেয়ারম্যান সাব আবদুল হাকিমের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হুজুর, আপনে যে প্রস্তাব দিছেন বাস্তবায়ন করাটা সম্ভব কি না জানি না। কিন্তু আপনার প্রস্তাবটা আমার পছন্দ হইছে। আপনের ভিতরে মনে হয় আরও কথা আছে। বাদবাকি কথাগুলাও বলেন দেখি।’

জলিল চেয়ারম্যানের কথায় এবার একটু সাহস পায় আবদুল হাকিম। সে বলতে থাকে, ‘দেখেন, প্রতিবছরই কিন্তু আমাদের ধান কালেকশন করতে হয়। এক সপ্তাহ-দশদিন কালেকশন চলে। তাতে মোটামুটি এক ৯০-১০০ মণের মতো ধান তুলতে পারি। এই ধান তুলতে ছাত্রদের আশপাশের দশ-পনেরোটা গ্রামের প্রতিটা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বস্তা নিয়া দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কেউ এক কেজি কেউ দুই-চার কেজি করে ধান দেয়, কেউ আবার মুখ ঝামটা দিয়া ছাত্রদের তাড়িয়ে দেয়; আবার আরেক বাড়িতে গিয়ে ধরনা দিতে হয়। অনেক বাড়ির লোকজন ধান দিলেও ছাত্রদের নানা কথা বলে বিরক্তি প্রকাশ করে। এভাবে ধান তোলা অনেকটা ভিক্ষাবৃত্তির মতোই। তাছাড়া এভাবে ধান তোলার দ্বারা ছাত্রদের সম্মানের হানি হয়, তাদের মন ছোট হয়া যায়। তারা মাদরাসায় আসছে পড়ালেখা করার জন্য, তাদের দিয়া যদি মানুষের বাড়িতে বাড়িতে ধান তুলতে পাঠাই, তখন তাদের আত্মসম্মান বলে আর কিছু থাকে না।

‘এ কারণে আমি বলছিলাম যে, ধান কালেকশন করতে তারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে কষ্ট না করে সেই কষ্টটা আমাদের বিলে করুক, আমাদের বিলের ধান কাটুক। আপনারা যদি তাদের দিয়া ধান না কাটান, তবুও কিন্তু এক সপ্তাহ বা দশদিন তাদের ধান কালেকশনের কষ্ট করতেই হবে। তবে সে কষ্টটা হবে অপমানের। কিন্তু এক সপ্তাহ যদি তারা ফুলতলী বিলের ধান কাটে, তখন আমাদের লাভ হবে কয়েক দিক থেকে। ছাত্ররা নিজেদের মেহনত দিয়া, নিজেদের শ্রম দিয়া কাজ করল। এইখানে কারও কোনো বিরক্তি বা মুখ ঝামটার বিষয় নাই; বরং কাজটা হবে সম্মানের। কারও বাড়ির সামনে গিয়া বস্তা ধইরা দাঁড়ায়া থাকতে হবে না। প্রত্যেক কৃষকের ক্ষেতে যে কয় মণ ধান হবে, তার থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান মাদরাসায় দিয়া দিবে। সেটা মণপ্রতি এক থেকে পাঁচ সের বা যা আপনেরা নির্ধারণ করেন। এতে আমার মনে হয় অন্যবারের চেয়ে ধান কালেকশন অনেক বেশি হবে, আর ছাত্ররাও সম্মানের সঙ্গে এলাকার মানুষের সঙ্গে কাজ করতে পারবে।’

আবদুল হাকিম কথা শেষ করতেই আজগর মহাজন বলে উঠলেন, ‘কিন্তু মাদরাসার পোলাপান তো সব বাচ্চা, তারা ধান কাটব ক্যামনে?’

‘তারা হয়তো কামলাগো মতো ধান কাটতে পারবে না, কিন্তু সবাই যে একেবারে আনাড়ি—এমনও না। মাদরাসার ছাত্ররা সবাই প্রায় গ্রামের ছেলে, ধান-পাট কাটার অভিজ্ঞতা সবারই কিছু না কিছু আছে। যাদের নাই তারা ধানের আঁটি খোলায় নিয়া আসবে, সেখানে মেশিনে ধান মাড়াই করবে।’

জলিল চেয়ারম্যান এবার মুখ খুললেন, ‘হুজুর, আপনার প্রস্তাবটা যদিও অন্যরকম কিন্তু এর মধ্যে অনেক ফায়দা আছে। যদি করা যায় আর কী! তাছাড়া এর মধ্যে আমি খারাপের কিছু দেখি না। ছাত্ররা তো আমাদের ক্ষেতে আর কামলা দিতেছে না, তারা স্বেচ্ছাসেবকদের মতো একটা কাজ করতেছে, এইটা তো সম্মানের বিষয়। তবে এখনই আপনারে কিছু জানাইতে পারতেছি না। মাগরিবের পর কয়েকজন মিলে আবার বসি, তখন আলাপ করব। আপাতত মিটিং শেষ করি।’

মাগরিব নামাজের পর জলিল চেয়ারম্যান, আজগর মহাজনসহ আরও আট-দশজন গণ্যমান্য লোক বসলেন মাদরাসার দফতরে। মুহতামিম সাহেবের প্রস্তাবটার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করলেন। চেয়ারম্যান সাহেবকে দারুণ উদ্যমী মনে হলো এ কাজে। তিনি এ ধরনের সামাজিক স্বেচ্ছাশ্রমের কাজে বরাবরই উৎসাহী মানুষ। মানুষকে যত বেশি সামাজিক কাজে উদ্বুদ্ধ করা যাবে, তত বেশি তাদের মধ্যে একতা বজায় থাকবে। আর তার এলাকায় একতা বজায় থাকা মানে নির্বাচনে তার ভোটের একতা। তাছাড়া একটাবার দেখাই যাক না, ছাত্ররা যদি পারে তাহলে তো ভালো। আর না পারলে তো অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা হবেই। খেতের ধান তো আর আকাটা থাকবে না।

অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো, আগামীকাল থেকে মাদরাসার ছাত্ররা ফুলতলী বিলে ধান কাটা শুরু করবে। তবে সবাই না, মাদরাসার শিক্ষকরা ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে তাদের পরখ করে তারপর বাছাই করবেন। ধান কাটার অভিজ্ঞতা যাদের নেই, তারা খেত থেকে ধানের বোঝা বেঁধে মাথায় করে নিয়ে আসবে মাড়াইয়ের খোলায়। এলাকার লোকজন যারা চায়, তারাও এ কাজে শরিক হতে পারবে।

এশার নামাজের পর মসজিদের মাইকে এ ব্যাপারে ঘোষণা দেওয়া হলো। জলিল চেয়ারম্যান ও অন্যান্য মুরব্বিরা ফুলতলী ও আশপাশের গ্রামের গৃহস্থদের ডেকে এ ব্যাপারে কীভাবে কী করতে হবে, করণীয় বলে দিলেন। রাতের মধ্যেই পুরো গ্রামে আগামীকালের এ উদ্যোগের কথা জানাজানি হয়ে গেল।

চলবে…

মন্তব্য লিখুন (3)
  1. আতাউল্লাহ মাহমুদ

    সালাউদ্দিন জাহাঙ্গীর মানেই নতুন কিছু ।
    মাদ্রাসা নিয়ে এরকম করে ভাবতে পারে কয়জন!

  2. আহসান তালহা

    আমি জানতাম! যেহেতু সালাউদ্দিন জাঙ্গীর এটা লিখতেছে তারমানে মাদরাসা নিয়ে নতুন কোনো ভাবনাবোধ এতে থাকবেই । পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম

  3. সত্যিই অসাধারন! আগামী পর্বের অপেক্ষায়,,,,,,,

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *