দীর্ঘ ১৬ বছর একজন ফ্যাসিস্ট সরকারের অধীনে থাকার পর বাংলাদেশের জনগণ রক্তাক্ত জুলাই বিপ্লবের মুখোমুখি হয়েছিল ২০২৪ সনে। একই বছর আগস্টের ৫ তারিখে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন ঘটেছিল স্বৈরাচার হাসিনার সরকারের। জনগণ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার পতন দেখে ভেবেছিল—এবার বুঝি মুক্তি মিলবে, দেশে আইনের শাসন কায়েম হবে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, রাজনীতিতে নতুন বন্দোবস্ত দেখা যাবে এবং বিগত সরকারের সকল অপকর্মের বিচার হবে। কিন্তু বিধি বাম!
আমাদের লাল জুলাই গেল, চব্বিশ পার হলো, পঁচিশ সালও শেষ পর্যায়ে, ডিসেম্বর চলছে। কথা ছিল ইন্টেরিম সরকার দেড় বছর ক্ষমতায় থেকে দেশের সকল ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানের সংস্কার করবে, প্রশাসনকে ঢেলে সাজাবে। কিন্তু জনগণ গত দেড় বছরে বারবার নিরাশ হয়েছে, হতাশার স্তর পার করে জনগণ এখন বিরক্তির স্তরে পৌঁছেছে। যেকোনো সময় ফেটে পড়বে বলে মনে হচ্ছে। এই পর্যায়ে এসে জনতা বুঝতে পেরেছে—যত দ্রুত এই সরকার বিদায় হবে ততই মঙ্গল, ব্যাপারটা বোধহয় সরকারও বুঝতে পেরেছে, এবং সরকারও তাই চাইছে বলে মনে হচ্ছে।
ইন্টেরিম সরকার যে উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল তার আশিভাগ কাজই অসম্পূর্ণ এখনো, ফলে প্রতিদিন নতুন ইস্যু হাজির হচ্ছে আমাদের সামনে আর প্রতিদিনই ইন্টেরিম সরকারের ব্যর্থতা ফুটে উঠছে জনগণের চোখে। ইস্যুগুলোতে নজর দিলে চিন্তাভাবনা ছাড়া খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে ইন্টেরিমের ব্যর্থতা।
তবে শুধু যে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আর সরকার হিসেবে ইন্টেরিম ব্যর্থ হয়েছে তাই নয়, জনগণ হিসেবে আমরাও ব্যর্থ হয়েছি। বারবার পুরোনো বন্দোবস্তের সাথেই হাত মিলিয়েছি। আমরাও আমাদের দায়িত্ব পালন করিনি, সচেতন হইনি, নিজেদেরকে শুধরাইনি একটুও! শুধু এই ডিসেম্বর মাসের কয়েকটা বহুল আলোচিত ইস্যু এড্রেস করলেই মোটামুটি আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতা মেপে ফেলা যায়—
২৪ ডিসেম্বর, ২৫
বুধবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজধানীর মগবাজার এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণে সিয়াম মজুমদার নামে একজন পথচারী নিহত হয়েছেন। দিলু রোড সংলগ্ন নিউ ইস্কাটন রোডে ঘটনাটি ঘটেছে।
এর আগে চলতি বছর অক্টোবরের ২৬ তারিখে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের পিলারের একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে গিয়েছিল। এতে নিচে থাকা একজন পথচারী নিহতও হয়েছেন সেসময়।
যেকোনো রাষ্ট্রে এই ধরনের ঘটনা ঘটার পর কাউকে জিম্মাদারি নিতে হয়, কারও চাকরি যায়, কাউকে পদত্যাগ করতে হয় দায়িত্বে অবহেলার কারণে, অন্তত জবাবদিহিতার আওতায় তো আসতেই হয়। আমাদের দেশে এমন কিছু হয় না, হয়নি। একটা রাষ্ট্রের গোয়েন্দা বাহিনী থাকে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনার আগাম খবর যেন দিতে পারে সেজন্য, সেই হিসেবে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় গোয়েন্দা বাহিনীর ব্যর্থতা তো ফুটে উঠেছেই, এবং এরপরও কাউকে জবাবদিহিতা করা লাগে নাই দেখে বোঝা যাচ্ছে রাষ্ট্র যেভাবে ফাংশন করা দরকার সেভাবে করছে না আসলে। মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড দুর্ঘটনাতেও যে বা যারা এটা দেখাশোনার দায়িত্বে ছিল তাদের কারও চাকরি যায়নি। জবাবদিহিতা ছাড়া একটা রাষ্ট্র কীভাবে চলবে বা কীভাবে উন্নতি করবে—সেটাই এখন সচেতন নাগরিকের একমাত্র চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে।
১৯ ডিসেম্বর, ২৫
শুক্রবার গভীর রাতে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের চরমনসা গ্রামে আগুনে পুড়ে সাত বছরের শিশু আয়েশা আক্তারের মৃত্যু ও তিনজনের দগ্ধ হওয়ার ঘটনাটিও জননিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। পরিবারটির অভিযোগ, দুর্বৃত্তরা ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।
ঘর মানুষের নিরাপদ আশ্রয়। গভীর রাতে ঘুমন্ত একটা পরিবারকে তালাবদ্ধ করে বাইরে থেকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া চরম নিষ্ঠুর অপরাধ। অপরাধীরা যখন ভাবতে শুরু করে অপরাধ করে তারা পার পেয়ে যাবে, কেবল তখনই এ ধরনের ভয়ংকর অপরাধ সংঘটনে তারা উৎসাহিত হতে পারে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস অবশ্য দাবি করেছে, নাশকতার ‘বিশ্বাসযোগ্য’ প্রমাণ তারা পায়নি। কিন্তু পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে অবশ্যই গভীরতর তদন্ত করে, তবেই উপসংহারে আসতে হবে। লক্ষ্মীপুরের এই ঘটনায় যারাই জড়িত থাক, তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
একই সাথে বলা যায়, রাজনীতিতে যে প্রতিশোধের কালচার আমাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল, সেটা এখনো আছে। এবং যতদিন এই প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের রাজনীতি চলবে ততদিন এসব ঘটনা বারবার আমাদেরকে ব্যথিত করবে।
১৮ ডিসেম্বর, ২৫
এইদিন তিনটা মেজর ইস্যুর মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ :
প্রথমত একজন শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা করেছে উত্তেজিত জনগণ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, ১৯ তারিখ বৃহস্পতিবার ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পাইওনিয়ার্স নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেডের কর্মী দীপু চন্দ্র দাসকে কারখানা থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একপর্যায়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভাজকে একটি গাছে বিবস্ত্র করে ঝুলিয়ে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী এ ঘটনায় র্যাব-পুলিশ ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। র্যাব ১৪-এর অধিনায়ক নয়মুল হাসান বলেছেন, ‘ধর্ম অবমাননার বিষয়টি খুবই অস্পষ্ট। তিনি কী বলেছেন, এটা খোঁজার চেষ্টা করলেও কেউ এটা বলতে পারেনি।’
আমরা যে জাতি হিসেবে কতটা বর্বর হয়ে যাচ্ছি, সেই চিত্রটাই যেন এই ঘটনায় ফুটে উঠেছে। কেন একটা মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে কেউ কারণটা বলতে পারছে না, শুধু ‘ধর্ম অবমাননা’ শব্দটা শুনেই হামলে পড়েছে মানুষ। অথচ এভাবে এতজন মিলে একজন মানুষকে হত্যা করে উল্লাস করাতে ধর্মের কতটুকু সম্মতি আছে, সেটা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নাই।
অবশ্য এটা শুধু ধর্ম অবমাননার ক্ষেত্রেই ঘটে এমনটা না, বরং গুগলে ‘চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে যুবক নিহত’ এই শিরোনাম লিখে সার্চ করলে যতগুলো ঘটনার সংবাদ পাওয়া যায়, সেটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য এলার্মিং। ‘অনেকগুলো মানুষ একসাথে জড়ো হয়ে কাউকে জাস্ট পিটিয়ে খুন করে ফেলেছে’—এমন একটা সংবাদ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য হলেও আমাদের এই সোনার বাংলাদেশে এটা যেন দিন দিন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠছে। অবশ্য এই ধরনের ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে যে বিচারহীনতার দায় আছে, সেটা তো বলাই বাহুল্য!
প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের ঢাকাস্থ অফিসে মবের হামলা ও ভাঙচুর, একই সাথে ছায়ানট ও উদিচীতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের ঘটনায় মামলার অভিযোগে তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে—দাঙ্গা সৃষ্টি করে সরকারি কর্মচারীদের কাজে বাধা দেওয়া, ডেইলি স্টার কার্যালয়ে অবৈধভাবে ঢুকে কর্মীদের ভয়ভীতি দেখানো, হত্যার উদ্দেশ্যে অগ্নিসংযোগ ও অপরাধের প্রমাণ নষ্ট করা হয়েছে। এ ছাড়া ডেইলি স্টার পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ, অফিসের কাজে বাধা দিতে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, অনলাইনে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশনা দেওয়া বিষয়েও অভিযোগ আনা হয়েছে। হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সময় শুধু লুটপাট করা সম্পদের মূল্য ৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৪০ কোটি টাকা।
অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশে মাজার, সংখ্যালঘু ও ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের ওপর হামলা চলমান। এসব হামলা বন্ধে সরকারকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি। যতদূর মনে পড়ে, গত ২৩ নভেম্বর মানিকগঞ্জে বাউলশিল্পী আবুল সরকার মহারাজের ভক্ত-অনুরাগীদের ওপরও হামলা হয়েছিল। এই সকল মববাজির ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি।
এবারের ঘটনায়ও সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। যদিও প্রথম আলো–ডেইলি স্টারে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দুইদিনে গ্রেপ্তার হয়েছে ২৯ জন। কিন্তু পূর্বের ঘটনাগুলোতে যদি সঠিক তদন্ত করে বিচার করা হতো, তাহলে হয়তো এইবারের ঘটনা ঘটত না।
দূর্ভাগ্যবশত প্রায় সবগুলো ঘটনাতেই আমরা দেখি মবের সামনে সরকারি বাহিনীগুলো অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এইসব ঘটনার সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে, সেটা যেকোনো রাষ্ট্র এবং সরকারের জন্য একটা লজ্জাজনক অধ্যায়। দেশের প্রশাসন যে কতটা অথর্ব, সেটা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দিচ্ছে এইসব মবকান্ড! অথবা প্রশাসন কিংবা এজেন্সির ইশারাতেই হয়তো ঘটনাগুলো ঘটানো হচ্ছে বিশেষ কোনো রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য। কে জানে?
ঐদিন সবচেয়ে বেদনাদায়ক যে ঘটনাটি ঘটে সেটি হচ্ছে—ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী নেতা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি শাহাদাত বরণ করেন।
মূলত এই ঘটানাকে পুঞ্জি করেই ঐদিন উত্তেজিত জনতাকে কে বা কারা উসকানি দিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করতে নামিয়েছে।
উল্লেখ্য, জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ওসমান হাদি গত বছরের আগস্টে ইনকিলাব মঞ্চ গঠন করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবং ভারত বিরোধিতায় সরব হয়ে সারা দেশে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ঢাকা–৮ আসনে প্রার্থী হতে প্রচারও চালাচ্ছিলেন তিনি। ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগে নামার সময় তাঁকে গুলি করা হয়।
উন্নত চিকিৎসার জন্য ওসমান হাদিকে সিঙ্গাপুরে পাঠিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে তাঁকে বাঁচানো যায়নি। বৃহস্পতিবার সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে শনিবার লাখো মানুষের অংশগ্রহণে জানাজার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে সমাহিত করা হয় তাঁকে।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ১২ তারিখে হাদির গায়ে গুলি লাগার পরপরই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে খুনির পরিচয় প্রকাশ পায়, এত দ্রুত পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার পরেও খুনিকে বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাহিনীগুলো ধরতে ব্যর্থ হয় অথবা ইচ্ছে করেই ধরেনি। এবং তারও এক সপ্তাহ পর তাঁর ইন্তেকাল হয়, ইন্তেকালের পরও জনগণ শুধু দিন গুনছে, ভাবছে আজ বুঝি অপরাধী ধরা পড়বে, হয়তো জীবনে একটাবারের জন্য সঠিক বিচারটা দেখতে পারবো, কিন্তু জনগণ প্রতিদিন একবার করে হতাশ হচ্ছে। এখনো পর্যন্ত প্রশাসন তাঁর খুনিকে না ধরে বরং খুনির সহযোগী, বান্ধবী, বউ-শ্যালক, বাবা-মা সহ খুনির সহযোগীর সহযোগীকেও ধরা হচ্ছে লোক দেখানোর জন্য। কিন্তু যাকে ধরার দরকার তাকে ধরতে পারছে না কিংবা ধরছে না।
মিডিয়ায় একবার বলা হচ্ছে কেরানীগঞ্জের শাহিন চেয়ারম্যান এটার পিছনের কারিগর, একবার বলা হচ্ছে যুবলীগ নেতা খুনিকে পালানোর ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে, আবার বলা হচ্ছে ১২৭/২১৮ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে খুনির একাউন্টে, কিন্তু পুরো নেটওয়ার্কটাকে ধরা যাচ্ছে না কেন সেটা কেউ বলছে না। এর দ্বারা বিচার বিভাগকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে, প্রশাসনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। জনতা জানতে চায় আসল তথ্য কিন্তু কেউ এই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না। ইনকিলাব মঞ্চের চাপে পড়ে সরকারের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে তাদের ব্যর্থতার জানান দিচ্ছে অথর্ব প্রশাসন। একদিকে প্রথম আলো-ডেইলি স্টারের ঘটনায় দুইদিনে ২৯ জনকে সরকার গ্রেপ্তার করে ফেলে অপরদিকে ১৮ দিন পার হওয়ার পরও ওসমান হাদির খুনির সন্ধানটা পর্যন্ত দিতে পারছে না ইন্টেরিম। কিংবা ইচ্ছে করেই দিচ্ছে না, কে জানে?
শেষ পর্যন্ত অভিভাবকহীন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বানে বিপ্লবী জনতা গত কয়েকদিন ধরে দিনরাত লাগাতার শাহবাগে অবস্থান করেছে হাদি হত্যার বিচার চেয়ে। এই সর্বনিম্ন তাপমাত্রার মধ্যেও তারা সারা রাত সেখানে অবস্থান করেছে, মায়েরা এসেছে, ছোট ছোট বাচ্চারা এসেছে। জুলাইয়ের নেতা হাসানাত আব্দুল্লাহ এসে যোগ দিয়েছে জনতার কাতারে।
কিন্তু বড় বড় দলগুলো এখনো সংহতি জানাচ্ছে না, এটাও আশঙ্কাজনক। কী কারণে তারা এই ব্যাপারে এখনো নিশ্চুপ সেটা বোঝা যাচ্ছে না। বড় বড় নেতারা সবাই বক্তৃতা করছে বড় বড়, খুবই জ্বালাময়ী বক্তব্য। কিন্তু কাজের বেলায় দেখা যাচ্ছে রাজপথে শুধুই বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা। রাজনীতিবিদরা খুনিকে ধরার জন্য চাপ প্রয়োগ করা বাদ দিয়ে ওসমান হাদিকে নিয়ে রাজনীতি করা কিংবা তাঁর লাশের রাজনীতি করাতেই বেশি মনোযোগী বলে হচ্ছে। রাজনীতিবিদদের জন্য এখন মোক্ষম সুযোগ শহিদ ওসমান হাদিকে ব্যবহার করে তাদের স্বার্থ হাসিল করার।
শহিদ ওসমান হাদি জীবিত থাকতে বলেছিলেন—আমাদেরকে কেউ গুলি করে মেরে ফেললে অন্তত বিচারটা কইরেন, আমরা এখনো তাঁর হত্যার বিচার দেখতে পাইনি, ভবিষ্যতে কি পাব? পরকালে তাঁর সাথে দেখা হলে কী জবাব দেব আমরা? কী জবাব দেবে আজকের নেতারা, উপদেষ্টা-সহ দায়িত্বশীলরা?
মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এই কয়েকটা বহুল আলোচিত ঘটনা ঘটে গেছে, কিন্তু এগুলোই তো ঘটনা না; আরও অনেক ইস্যু রয়েছে যেগুলো আমাদের সামনে আসেই নাই। দেশে বর্তমানে প্রতিটা ইস্যুর চরিত্র হচ্ছে এমন—প্রতি দশটা-বিশটা ঘটনার মধ্যে একটা ইস্যু হয়ে সামনে আসবে, এবং এমনভাবে সেটা নিয়ে কথা হবে যেন এইবার সমস্যাটার কোনো একটা সমাধান হবেই, কিন্তু সমাধান আসলে হয় না। বরঞ্চ নতুন দিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে স্যোশাল মিডিয়ায় গেলে দেখা যায় নতুন কোনো ইস্যু হাজির। আগেরটা সবাই ভুলে গেছে। এভাবেই চলছে দেশ।
এই যে একই রকম দশ-বিশটা ঘটনার মধ্য থেকে একটা ঘটনা ভাইরাল হয়; ইস্যু হয়ে ওঠে এটারও একটা মেকানিজম আছে। বলা যায় ইস্যু আসলে নিজে নিজে তৈরি হয় না বরং ইস্যু তৈরি করা হয়, ভাইরাল বানানো হয়। এটাকে বলা যায় ‘হালের অনলাইন কালচার’। এই কালচারকে ব্যাখ্যা করা যায় দুইটা শব্দ দিয়ে—সিলেক্টিভ এক্টিভিজম।
এমন না যে সিলেক্টিভ এক্টিভিজম আগে ছিল না, আগে কখনো বেছে বেছে নির্দিষ্ট বিষয়কে হাইলাইট করা হতো না; আগেও এসব ছিল। তবে সেটা ছিল নিউজ মিডিয়া কেন্দ্রিক। প্রত্যেকটা মিডিয়া তার নিজস্ব আইডিওলোজি সামনে রেখে নিউজ করত, সেটা এখনো করে। কিন্তু এখন যেহেতু মানুষ নিউজ মিডিয়া থেকে বেশি অভ্যস্ত স্যোশাল মিডিয়ায় তাই নিউজ মিডিয়ার কালচারটা এখন ব্যাপকভাবে স্যোশাল মিডিয়ায় চর্চিত হচ্ছে। তাই এখন ‘সিলেক্টিভ এক্টিভিজম’ হচ্ছে অনলাইন তথা স্যোশাল মিডিয়া কেন্দ্রিক।
যদিও অপরাধীর কোনো ধর্ম হয় না, অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় থাকা উচিত না; অপরাধীর একমাত্র পরিচয় হচ্ছে সে অপরাধী এবং সকলের উচিত তাকে শুধুমাত্র অপরাধী হিসেবেই দেখা। এমনকি এই নীতিকথা প্রতিটা রাজনৈতিক দলও স্বীকার করে; যদি অপরাধী নিজ দলের হয় তাহলে। কিন্তু মুজরিম যদি বিরোধী দলের হয় তখন আমরা স্যোশাল মিডিয়ায় দেখি যে, অপরাধীর অপরাধের চাইতে তার দলীয় পরিচয় বড় হয়ে ওঠে। আমরা তো হরহামেশাই দেখি, কেউ অপরাধী প্রমানিত হবার পর কোনো দলই তার কর্মীর অপরাধের দায় নেয় না। কিন্তু স্যোশাল মিডিয়ার এই সিলেক্টিভ এক্টিভিজমের ফলে অপরাধী তার দলীয় পরিচয়ের জোরে পার পেয়ে যায়, তার অপরাধ হয়ে উঠে দলীয় অপরাধ, তখন দলকে বাঁচাতে বাকিরাও অপরাধীর পক্ষ নেওয়া শুরু করে। এভাবে শেষ পর্যন্ত রাজনীতি হয় ঠিকই কিন্তু অপরাধীর বিচার আর হয় না।
এই একটা কারণেই মূলত কোনো অপরাধ সংঘটিত হবার পর দেখা যায়, ওই ঘটনার মধ্যে যদি কোনো ইসলামিস্টের হাত থাকে, অথবা অপরাধীর দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের মধ্যেও যদি কেউ জামাত-শিবির কিংবা যেকোনো ইসলামিক দলের পোস্টেড নেতা থাকে কিংবা কোন পরিচিত হুজুরের সাথে ওই অপরাধীর কোনো ছবি থাকে, তাহলেই শুধু দেশের প্রোগতিশীল-বাম-সেক্যুলার বলয়ের লোকেরা সেই অপরাধের বিচার চেয়ে ফেসবুকে একের পর এক পোস্ট দিতে থাকেন, প্রতিবাদী মিছিলের আয়োজন করে মশাল হাতে শাহবাগে জড়ো হন। ইস্যুটা নারীকেন্দ্রিক হলেই কেবল নারীবাদীরা কপালে বিরাট বিরাট টিপ লাগিয়ে মিছিলের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে স্লোগান দেন।
ওইদিকে অপরাধীর সাথে বিএনপি কিংবা বামপন্থি দলগুলোর কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়ার আগ পর্যন্ত জামাত-শিবিরের লোকজন সেই ইস্যু নিয়ে কোনো পোস্ট দেন না, দেশের নিরাপত্তা কতটুকু ‘খতরে মে হ্যায়’ এই ব্যাপারে আওয়াজ তুলেন না।
আবার কোনো অপরাধ যদি বিএনপি-ছাত্রদল-যুবদলের কেউ করে, তখন বিএনপির কোনো এক্টিভিস্ট কোনো আওয়াজ করে না, এমনভাবে চুপ করে থাকে যেন তারা পৃথিবীতেই নেই। কিন্তু ওই একই অপরাধ যদি অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী বা সাপোর্টার করে, তখন দেখা যায় বিএনপির চাইতে বেশি প্রতিবাদী দল দেশে একটাও নাই। তাদের কর্মীদের এক্টিভিজমের কারণে পুরো অনলাইন তখন গরম থাকে।
একই কথা আমাদের ইসলামপন্থি সেলিব্রেটি লেখক কিংবা এক্টিভিস্টের ব্যাপারেও। মোটাদাগে ইসলামের ওপর কেউ আক্রমণ না করলে তারা সরব হন না, মানে জনগণের সাথে কোনো অন্যায় হলে সেটার বিরোধিতা করা যেন ইসলামের কাজ না, শুধুমাত্র কেউ ইসলাম নিয়ে কটাক্ষ করলে সেটার প্রতিবাদ করে যে দেশে ইসলাম কায়েম সম্ভব না, সেটা সম্ভবত তারা বুঝেন না কিংবা ভুলে যান।
এনসিপির এক্টিভিস্টদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। স্বয়ং সরকারও এই ‘সিলেক্টিভ এক্টিভিজমের’ রোগে আক্রান্ত, তারাও সব ঘটনায় সমান প্রতিক্রিয়া দেখান না, সকল অপরাধীর ব্যাপারে সমান গুরুত্ব দেন না। ইয়া আসাফা!
এই যে সিলেক্টিভ এক্টিভিজমের চর্চা, এই জিনিস আমাদেরকে ম্যাসেজ দেয়—সাধারণ জনগণের কোনো দল নাই, তাদের জন্য কোনো নেতা নাই। জনতা ইনসাফ তখনই পাবে যখন কোনো দলের সাথে যুক্ত থাকবে এবং অপরাধী বিরোধী দলের হবে, তা না হলে দেশের পুলিশও মামলা নিতে চায় না। সিম্পল!
আমরা যদি একটা সুন্দর রাষ্ট্র চাই—তাহলে আমাদেরকে দেশে আইনের শাসন কায়েম করতে হবে, এবং সেজন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি বিষয় হচ্ছে—প্রত্যেকটা ইস্যুকে সিরিয়াসলি নিয়ে সেটার সমাধান করা, এবং অপরাধী যেই দলেরই হোক, সমান প্রতিক্রিয়া দেখানো। দেশে সকলের অধিকার যেদিন সমান হবে, সকল নাগরিক যেদিন রাষ্ট্রের চোখে সমান হবে, যেদিন অপরাধী নিজ দলের হলেও মানুষ তার নিঃশর্ত বিচার চাইতে শুরু করবে সেদিন আমরা একটা সুন্দর রাষ্ট্র গড়তে পারব বলে আশা রাখি।