গত সপ্তাহের পুরোটাই কেটেছে অদ্ভুত এক শূন্যতার অনুভূতি নিয়ে। প্রাণের সুরটা কোথায় যেন কেটে গিয়েছিল। অচেনা অপার্থিব এক দুঃখবোধে হৃদয় নুয়েছিল অষ্টপ্রহর। বুকের ভিতরে ছিল সুন্দর একটি শূন্যতার হাহাকার। মনে মনে ঠিক করলাম, প্রাণের এই যন্ত্রণায় শব্দই হবে সুন্দর উপশম। শব্দের সাথে হৃদয়ের এই হাহাকারের গভীরতর একটি যোগাযোগ আছে। আমি কবি নই; কিন্তু মানুষমাত্রই একটি গোপন কাব্যবোধ তার ভিতরে লুকিয়ে থাকে। কখনো কখনো সেই অনুভূতি প্রগাঢ় হয়, তখন তার অজান্তেই জন্ম নেয় বিচিত্র শব্দসম্ভার, শব্দে শব্দে অভূতপূর্ব যোগাযোগ। সেই তাড়নাতেই ব্যক্তিগত নোটবুকে লিখলাম—
এই শীতের রাতে কুয়াশা ঝরে বিস্তীর্ণ অবয়বে, সময় একাকী কাঁপে, কোথাও কোনো এক দূর পাহাড়ে ঘুমন্ত ঝরনাটি জাগবে ভেবে। এই পাণ্ডুর রাত, কোমল অন্ধকার, এখানেই আছে শব্দেরা, স্মৃতির আচ্ছন্ন ঘ্রাণ, আর সকল রূপছায়া দ্রুতই বদলে যায় নিঃসঙ্গ এক নক্ষত্রের আহ্বানে।
যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, এই পুরোনো পৃথিবীতে, অতিক্রান্ত দিনের কোলাহল আর শেষ রাতে পেরোনো ঘোড়াদের খুরধ্বনিতে মুখরিত এই চেনা আঙিনায়, চারপাশে ধুলোর মতো উড়ছে সময়৷ অচেনা নিঃশ্বাসে বাক্যেরা এলোমেলো, জলপতনের শব্দে খুলে যায় শব্দের নরম শরীর, অলস বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে হরফেরা, শীতের পাতার মতোই বর্ণহীন। একাকী বর্ণ মূলত মৃত্যুর মেটাফোর। শূন্যে শূন্য মিলে নতুন আরেক শূন্যই কেবল, যেন ছোঁয়া যায়, যেন পাথরের মতোই মূর্ত বিস্ময় এক।
দূর নক্ষত্রের তলে আচানক ডুবে যায় চাঁদ, কুয়াশার ভারে দুলে ওঠে এই অন্ধকার, নিস্তব্ধ পৃথিবী, তখন অযথাই ডেকে ওঠে একটি পাখি—একাকী রাতের দূর নিঃসঙ্গ নিলীমায়।
কোথাও ভাঙছে কিছু?
এরই মধ্যে মুজিব হাসান লেখার জন্য তাড়া দিয়ে মেসেজ দিলেন। কেয়ারি নামে নতুন একটি সাহিত্য ওয়েবজিন করতে যাচ্ছেন, সেখানে একটি লেখা দেব বলেছিলাম। বারবার দিই দিচ্ছি করে শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠছিল না। অবশেষে তিনি বললেন, মূল লেখা কয়েক দিন পর দিলেও শিরোনাম দিতে হবে এখনই। ভাবসাব দেখে বোঝা গেল, আর ঝুলিয়ে রাখার উপায় নেই। ভাবলাম কী লেখা যায়। তখনো আমি ব্যক্তিগত সেই শূন্যতাটুকু পেরোতে পারিনি। তাই খুব কিছু না ভেবে শিরোনাম দিলাম—শূন্যের মায়ায়। যখন শব্দ দুটো ঠিক করি, তখন মাথায় ছিল প্রেম, ছিল বিরহ, ছিল কোনো এক অচেনা অসম্ভবের সুন্দরকে ছুঁতে না পারার নিরীহ বেদনা ও কোমল বিক্ষোভ।
.
সপ্তাহ শেষ হলো, বৃহস্পতিবারের উপস্থিতি মনে হলো গরমের দিনে এক পশলা বৃষ্টির মতো। ছেলেমেয়েরা কাছে নেই। ফলে দেরি না করে রোদ আর বাতাস পেরিয়ে দূর শ্রীমঙ্গলে গিয়ে ওদের মাঝখানে বসে রইলাম, যেমন করে নতুন তারুণ্যে বসে রইতাম ঝুম বৃষ্টির ভিতর। এরপর শুক্রবার এলো। জুমআর আগে শিশুদের হাত ধরে বের হলাম রিকশা নিয়ে। চা বাগানের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদীটি আছে আগের মতোই—সুন্দর, শান্ত, নীরব। একটি পাহাড়ি শপ থেকে ওদের জন্য কিছু খেলানপাতি কেনা হলো। পুতুলের জন্য একটি নাগরদোলা, দুটো সুন্দর আয়না, তিনটে বল, একটি কাঠের খোলামচি সেট। রাবার বাগানের ভিতরে বহু দিনের পুরোনো ছায়া। কী স্নিগ্ধ আর কোমলতা সেখানে! শিশুরা খুব আনন্দিত হলো। আর, এসবের ভিতর দিয়ে কখন যে মনটা ভালো হলো, টের পেলাম না। একই সাথে ভিতরের সে শূন্যতার বোধটুকুও সুন্দর একটি পরিণতিতে পূর্ণ হয়ে উঠল।
জুমআর নামাজের পর সবে এসে বিছানায় বসেছি। এমন সময় একটা খবরে চমকে উঠলাম। শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ। বজ্রাহতের মতো তাকিয়ে রইলাম সংবাদটার দিকে। বিশ্বাস করতে সময় লাগল। সংবিৎ ফিরে পেতে আরও সময় গেল। এরপর পাগলের মতো অনেকগুলো সংবাদ চেক করে বুঝলাম, খুব বেশি আশা নেই। মাথায় গুলি লাগলে স্পটডেড হওয়ার কথা। হাসপাতাল পর্যন্ত নেওয়ার সুযোগ হয়েছে এই ঢের। বুঝতে পারলাম না আমার আসলে এখন কী করা উচিত? বুকের ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল কেউ যেন খামচি মেরে ধরেছে। তখনই প্রথমবারের মতো টের পেলাম, এই ছেলেটাকে আমি শুধু যে পছন্দ করতাম তাই না, হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোও বেসে ফেলেছিলাম। মনে হচ্ছিল আমার আপন ভাইটাই মরে যাচ্ছে!
বিকেলের দিকে শ্রীমঙ্গল থেকে চলে আসতে হলো। শনিবার ক্লাস করাতে হবে। বাড়িতে আসার পুরো পথটা কীভাবে পেরিয়ে গেল, টের পেলাম না।
.
আজ শনিবার। মনের আকাশে কালো মেঘ। প্রথম ক্লাসটা করিয়ে রুমে এসে বসলাম। মাদরাসায় আমার রুমটা বেশ বড়সড়। জানালায় পর্দা দেওয়া। ভিতরে একটু একটু অন্ধকার। বাতি জ্বালতে ইচ্ছা হলো না। দুই ক্লাসের মাঝখানে দু-তিন মিনিটের একটু বিরতি নিই। পরের ক্লাসে ঢুকতে হবে। এই বিরতিটা মানসিক প্রস্তুতির জন্য দরকার হয়। একটি ছবিতে অজস্র মানুষের ভিড়ে হাদি তার শিশুটিকে মাথার ওপর উঁচিয়ে ধরেছে। শিশুটির মুখ হাসিহীন। একটা নিষ্পাপ বিস্ময় আর কৌতুহল আছে। তবে ভয় নেই। বাবার কাঁধে চড়লে শিশুরা ভয় পায় না। কিন্তু হাদির মুখে অদ্ভুত সুন্দর এক হাসি। সরল, সুন্দর, আত্মবিশ্বাসী, কিছুটা বোকা বোকাও। বাংলাদেশের অগণিত মানুষের সামনে, যারা নিজের শিশুকে এমন ভিড়ের মধ্যে না আনার এবং নিজের আন্দোলন ও রাজনীতি থেকে পরিবারকে নিখুঁতভাবে সুরক্ষিত রাখার মতো বুদ্ধিমান, সেই বুদ্ধিমান মানুষদের সামনে হাদি এই কাজটা করে যে নিজেকে বোকাই প্রমাণ করছে, সে অনুভূতিটুকু যেন তার হাসিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এবং হাদি এটাও জানে, এই বোকামিটাই তার শক্তি, যেমন জানি আমরাও। এর একটু পরেই দেখলাম, এই বোকা আর পাগল ছেলেটা অনুচ্চ আওয়াজে কী যেন বলছে। কান পেতে শুনতে গেলাম। ‘আমাকে যেকোনো সময় মেরে ফেলতে পারে। আমি যদি চলে যাই, আমার বাচ্চাটাকে আপনারা একটু দেইখেন।’ এ কথা বলে একটু ওপরের দিকে তাকাল। কিছু সময়ের জন্য থেমে গেল। এরপর আরও কী কী যেন বলছে।
দরজার পর্দাটা একটু গুটানো। বাইরে কুয়াশার ভিতর হালকা রোদ। চারপাশ নীরব। শুধু পাশের ক্লাস থেকে টুকটাক কথাবার্তা ভেসে আসছে। আমার শরীরটা একটু একটু কাঁপছে। নিজের ওপর খুব বিরক্ত হলাম। এসবের কোনো মানে হয় না। কিন্তু নিজেকে শক্ত করার আগেই দুফোঁটা অশ্রু বেরিয়ে এলো। দ্রুত চোখ মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলাম।
.
হাদিকে এমন পাগলের মতো ভালোবাসার কারণ কী আসলে? এসব বলে কী লাভ? থাক। এই বুদ্ধিমান, চালাক, স্মার্ট, রাজনীতি সচেতন আর ভালোবাসা প্রকাশ করে ছোট না হতে চাওয়া আধুনিক মানুষদের ভিড়ে এসব বলা আর উলুবনে মুক্তা ছড়ানো একই কথা। শুধু একটি বাক্য বলা যাক—হাদির ভিতরে আমি আমার নিজের ছায়া দেখতে পেয়েছি। এই ছেলেটা আমার জন্য জীবন দিয়েছে।
কিছুদিন আগে কোমার জগৎটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছিলাম। কত অদ্ভুত সব কাহিনি! কেউ সীমাহীন শূন্যতার ভিতরে ছিল। কেউ পুরো সময়টা পার করেছে অসম্ভব ও অচেনা এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের ভিতর। কেউ আলতো করে ভেসেছিল মেঘের ওপর। কেউ কাটিয়েছে এমন এক কোমল আনন্দের জগতে—যেখানে দুঃখ নাই, নৈঃসঙ্গ্য নাই, অনিশ্চয়তা নাই। শুধু আনন্দ আর উৎফুল্ল। হাদি সেই কোমার মধ্যে পড়ে আছে। তার আত্মাটা ঝুলে আছে এক ফোঁটা জলের মতো। যেকোনো সময় টপ করে খসে পড়তে পারে।
পরের ক্লাসে যখন ঢুকছি, একটা প্রশ্নই মাথায় ঘুরছে—ফোঁটাটা ঝরে পড়বে? নাকি ধীরে শোষিত হয়ে ফিরে আসবে দেহের ভিতর?
এই দুদিন ধরে আরেকটা বিষয় ভিতরে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। খুনি লীগ তার নৃশংসতার দ্বিতীয় পর্ব শুরু করেছে। তার হাতে বিপুল টাকা আছে, ভয়াবহ পরিমাণে অস্ত্র আছে, তার পুরো খুনিবাহিনী সারাদেশে আছে বহাল তবিয়তে। অফিস-আদালত, সচিবালয়, মিডিয়াজগৎ, বুদ্ধিজীবীপাড়া, সাংস্কৃতিক অঙ্গন, পুলিশসহ সবখানে ওরা ওঁৎ পেতে আছে। খুনিবাহিনী সক্রিয় হয়েছে। জুলাই যোদ্ধারা পথে পথে মরে যাবে। প্রশাসন কিছুই করবে না। মিডিয়া বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন এলিট আরবান সবাই মিলে এসবকে নরমালাইজ করবে, এর পক্ষে বয়ান তৈরি করবে, রাজনৈতিক বিবাদ বলে চালিয়ে দেবে। এরপর বাংলাদেশ ঢুকে পড়বে পুরোনো পলিটিক্যাল কালচারে। সব আগের মতোই। মাঝখান থেকে আমার ভাইদের বাঁচানো যাবে না। এবং আগামী পঞ্চাশ বছরে এই দেশে আরেকটা জুলাই হবে না।
ক্লাস করাতে গিয়ে সুবিধা করা গেল না। তৃতীয় ক্লাসে ছেলেদের সামনে আবারও শরীর অবাধ্য হলো। কাঁপল। চোখ কুঞ্চিত হলো। আমি তো হাদির কথা বলছি না। কিতাবটাই পড়াচ্ছি। ‘কখন একটা সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণকে হিসেবে না ধরে পরোক্ষ কারণকেই দায়ী করতে হবে’—এই জটিল আলোচনার সাথে দুঃখ ও আবেগজনিত অশ্রুর সম্পর্ক কী? তবে, এবার সতর্ক ছিলাম। ছেলেরা অতটা টের পায় নাই। ওদেরকে বললাম, ‘তোমাদের ভাই হাদির জন্য দোয়া করো। হাদিকে আমাদের খুব দরকার। এই বাংলাদেশের জন্য হাদি না থাকলে আমাদের চলবে না।’
ভিতরে বিরাট এক শূন্যতা বাসা বেঁধেছে। এ যেন এক মহাজাগতিক শূন্যতার মতো—ক্রমশ বাড়ছেই। এ শূন্যের প্রতি আমার কোনো মায়া নাই। ভাবালুতাও নাই। একে আমি ভয় পাই। পুরো বাংলাদেশ মূলত এমনই এক শূন্যতার দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বুকের ভিতর ডানা ঝাপটাচ্ছে আহত বিহঙ্গকুল—
উড়তে উড়তে ক্লান্ত হয়েছে পাখি,
বিবর্ণ হয়েছে রঙিন প্রজাপতিগুলো,
ঝরাপাতা মিশে গেছে মাটির সাথে—হতাশায়,
শব্দের শরীর বেয়ে গড়িয়ে পড়েছে সুগভীর মর্মেরা।
শূন্য শব্দে কী থাকে আর?
কিছুই থাকে না, কেবল কোমল কুয়াশার মতো স্মৃতি ছাড়া।
হাতের মুঠোয় যে শব্দ ছিল পাখির মতো,
উড়বার তাড়নায় ভীষণ ছটফটে,
সেও ঝিমিয়েছে ক্লান্তিতে।
এতসব ঘটে গেছে,
তবু পাষাণ উঠোনের ওপর থেমে আছে একটি দীঘল দুপুর।
দাগ কেটে গেলো